বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সারসংক্ষেপ:
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী নির্মাতা জহির রায়হানের ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারির রহস্যজনক অন্তর্ধানকে স্বাধীন বাংলাদেশে ‘গুমের অপসংস্কৃতির প্রথম সফল অভিষেক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লেখক দাবি করেছেন, বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে মিরপুরে যাওয়ার আগে জহির রায়হান ঘোষণা দেন যে, তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ড, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং প্রতিপক্ষ নির্মূলের ষড়যন্ত্রের প্রামাণ্য দলিল রয়েছে, যা তিনি প্রেসক্লাবে ফাঁস করবেন। এই তথ্যগুলোই তাঁকে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের রোষানলে ফেলেছিল। তাঁর প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ নির্মাণকালে সরকারি বাধা, মুক্তি আটকাতে সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ এবং রহস্যময় টেলিফোনকারী ‘রফিক’-এর সপরিবারে আমেরিকায় নির্বাসিত হওয়া—এসবই তাঁর অন্তর্ধানের পেছনে ‘জঘন্য রাজনৈতিক চক্রান্তের’ ইঙ্গিত দেয় বলে প্রবন্ধে তথ্য-প্রমাণ সহকারে দাবি করা হয়েছে।
১. স্বাধীন দেশে প্রথম গুম: জন্ম ও প্রেক্ষাপট
বাংলা চলচ্চিত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা জহির রায়হানকে (জন্ম: ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট, ফেনী) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর অন্তর্ধানের রহস্য। লেখক এই ঘটনাকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম গুমের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ‘একটি জঘন্য রাজনৈতিক চক্রান্তের সফল অভিষেক’। তিনি অভিযোগ করেন, গোষ্ঠী বিশেষ বা ব্যক্তি বিশেষকে দায়ী করে এই রহস্যকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে, কিন্তু অনুসন্ধানী রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় “ডাল মে কুচ কালা হ্যায়”। তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ভ্রান্তির নিরসন করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
২. ‘স্টপ জেনোসাইড’ বিতর্ক: মুজিবনগর সরকারের রোষানল
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান ভারতে চলে যান এবং পাকিস্তানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। লেখক দাবি করেন, এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় তিনি তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের রোষানলে পড়েন।
- বিলাসিতা উন্মোচনের চেষ্টা: প্রামাণ্যচিত্রটিতে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দুর্দশা এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার অমানুষিক পরিশ্রমের পাশাপাশি কলকাতায় পালিয়ে থাকা বড় বড় আওয়ামী লীগ নেতাদের আরাম-আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের চিত্র তুলতে গিয়ে তিনি সরকারের সমালোচনার মুখে পড়েন।
- বাধা ও সেন্সর বোর্ডের হস্তক্ষেপ: আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দেন, বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেননি এবং ছবিটি মুক্তি না দেওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। (সূত্র: একুশে ফেব্রুয়ারী / জহির রায়হান, পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২। পৃ: ১৩-১৬)
- লিখিত প্রতিবাদের প্রমাণ: ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় বসবাসরত আওয়ামী সমর্থিত বুদ্ধিজীবী ফজলুল হক (চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর ও কেকা ফেরদৌসীর বাবা) অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। (সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র, ৩য় খন্ড, পাতা ১২৭-১২৮, তথ্য মন্ত্রণালয়, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। প্রথম প্রকাশ – নভেম্বর ১৯৮২)।
৩. বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত ও ‘কুকীর্তি’ ফাঁস করার ঘোষণা
দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে জহির রায়হান তার অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়ার খবর পান। এরপর তাঁর উদ্যোগে গঠিত হয় বেসরকারি বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি।
- গোপন দলিল সংগ্রহ: তিনি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য ঘটনার প্রচুর প্রমাণাদি সংগ্রহ করেন, যার মধ্যে ছিল ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকান্ড, বিলাসবহুল জীবনযাপন, এবং প্রতিপক্ষ বাঙালি নির্মূল করার ষড়যন্ত্রের প্রামাণ্য দলিল।
- সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণা: ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারী ঢাকা প্রেসক্লাবে তিনি ঘোষণা করেন যে, সংগৃহীত প্রমাণাদি প্রকাশ করলেই ‘অনেকের কুকীর্তি ফাঁস হয়ে যাবে’। এই ঘোষণা তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
৪. রহস্যময় টেলিফোন ও অন্তর্ধানের শেষ মুহূর্ত
১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারীর সাংবাদিক সম্মেলনের কয়েকদিন পরই, ৩০ জানুয়ারী রোববার সকালে রফিক নামের এক পূর্ব পরিচিত ব্যক্তি (যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন) জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায় টেলিফোন করেন।
- ফাঁদ পাতা: রফিক তাঁর ছোট বোন ডা. সুরাইয়ার মাধ্যমে জহির রায়হানকে জানান, তাঁর বড়দা (শহীদুল্লাহ কায়সার) মিরপুর ১২ নম্বরে বন্দী আছেন এবং একমাত্র তিনিই গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন।
- সেনাবাহিনীর বাধা: টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ী নিয়ে মিরপুরে রওনা দেন। কিন্তু মিরপুর ২নং সেকশনে পৌঁছার পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট) এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ‘নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে জহির রায়হানকে তার টয়োটা গাড়ি সহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন।
এভাবেই জহির রায়হান চিরতরে হারিয়ে যান। অথচ সেদিন বিকেলে প্রেসক্লাবে তাঁর কাছে থাকা দুর্লভ তথ্য-প্রমাণ ফাঁস করার কথা ছিল, যা আর কখনোই প্রকাশিত হয়নি।
৫. রাজনৈতিক চক্রান্তের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
লেখক তার প্রবন্ধে বেশ কিছু তথ্যভিত্তিক ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা জহির রায়হানের অন্তর্ধানের পেছনে একটি রাজনৈতিক চক্রান্তের তত্ত্বকে জোরদার করে:
- তথ্য ফাঁস রোধ: অন্তর্ধানের দিন বিকেলে তথ্য ফাঁস করার ঘোষণা থাকায় এটি স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের তীর তৎকালীন ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর দিকে যায়।
- রহস্যময় রফিকের নির্বাসন: জহির রায়হানকে টেলিফোনকারী রফিককে নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলে, তাকে দ্রুত নাগরিকত্ব দিয়ে সপরিবারে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা রফিকের ভূমিকাকে আরও সন্দেহযুক্ত করে তোলে। (সূত্র: দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩)
- হুমকির অভিযোগ: দৈনিক আজকের কাগজ-এর (৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩) এক প্রতিবেদনে জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে নিখোঁজ করে ফেলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।
এই তথ্যসমূহ প্রমাণ করে, জহির রায়হানের অন্তর্ধান ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের রাজনীতিতে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ ফাঁস হওয়ার ভীতি এবং ক্ষমতা-সংরক্ষণের এক জঘন্য প্রয়াস, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে গুমের রাজনীতির সূচনা হয়।
সূত্র ও তথ্যসূত্র:
১. জহির রায়হান (পল্লব পাবলিশার্স – আগস্ট, ১৯৯২): ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৩-১৬। ২. তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার (প্রথম প্রকাশ – নভেম্বর ১৯৮২): বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র (৩য় খন্ড), পৃষ্ঠা ১২৭-১২৮। ৩. দৈনিক আজকের কাগজ (৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩): জহির রায়হানের নিখোঁজ সম্পর্কিত প্রতিবেদন। ৪. আবদুর রাহীম সাব্বীর: জহির রায়হান চাচার গুম ও তাত্ত্বিক পর্যালোচনা (প্রবন্ধ)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: [BDS Bulbul Ahmed]
সর্বশেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ঢালিউড ইতিহাসের ধূমকেতু, আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের ফ্যাশন আইকন এবং কোটি প্রাণের স্পন্দন চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ওরফে সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন, তা গত তিন দশকে আর কেউ করতে পারেনি। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায় এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেটগুলো তুলে ধরছি।
১. ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট: হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা

সালমান শাহর মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এই বিতর্ক ৩০ বছর হতে চললেও এখনো অমীমাংসিত। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী:
- তদন্তের নতুন মোড়: গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ১৪ মে ২০২৬ তারিখ ধার্য করেছেন।
- আসামিদের অবস্থা: মামলার বাদী (সালমান শাহর পরিবার) অভিযুক্ত ১১ জন আসামির (যার মধ্যে স্ত্রী সামিরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই অন্যতম) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়েছেন। আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
২. পর্দার পেছনের মানুষ: ইমন থেকে সালমান শাহ
সালমান শাহর চলচ্চিত্রে আসার গল্পটি বেশ নাটকীয়।

- শৈশব ও কৈশোর: ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া ইমনের রক্তে ছিল অভিনয়। তাঁর মাতামহ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম অভিনেতা।
- প্রথম আলোচিত কাজ: ১৯৮৫ সালে হানিফ সংকেতের মিউজিক ভিডিও ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’-তে এক মাদকাসক্ত তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথম নজর কাড়েন।
- নাম পরিবর্তন: ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ করার সময় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান এবং স্ত্রী সামিরার সাথে পরামর্শ করে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সালমান শাহ’।
৩. অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ও উত্তরসূরিদের ওপর প্রভাব

১৯৯৬ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর সময় বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল।
- যেভাবে শেষ হয়েছিল সিনেমাগুলো: সালমানের অকাল প্রয়াণের পর ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ সিনেমায় ডামি ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘শুধু তুমি’ ছবিতে অন্য এক অভিনেতাকে কাস্ট করা হয় এবং ‘প্রেম পিয়াসী’র গল্প আংশিক পরিবর্তন করে সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
- অনুপ্রেরণার উৎস: বর্তমান সময়ের সুপারস্টার শাকিব খান থেকে শুরু করে হালের সব অভিনেতাই সালমান শাহকে তাঁদের অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন। শাকিব খান একবার জানিয়েছিলেন, তাঁর দেখা প্রথম সিনেমাটি ছিল সালমান শাহ অভিনীত।
৪. কেন তিনি আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী? (ইউনিক ফ্যাক্টস)

- বক্স অফিস রেকর্ড: তাঁর অভিনীত ২৭টি চলচ্চিত্রের প্রায় প্রতিটিই ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিল। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ঢালিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার তালিকায় আজও শীর্ষে।
- ফ্যাশন আইকন: আজকের যুগে যা ‘ট্রেন্ড’, সালমান শাহ তা নব্বই দশকেই শুরু করেছিলেন। কানে দুল, চুলে ব্যান্ডেনা, ব্যাক ব্রাশ হেয়ার স্টাইল এবং রঙিন সানগ্লাস দিয়ে তিনি একটি পুরো প্রজন্মকে বদলে দিয়েছিলেন।
- কণ্ঠশিল্পী সালমান: খুব কম মানুষই জানেন যে সালমান শাহ একজন চমৎকার গায়কও ছিলেন। ‘প্রেমযুদ্ধ’ এবং ‘ঋণ শোধ’ সিনেমায় তিনি প্লে-ব্যাক করেছিলেন।
৫. একনজরে পরিসংখ্যান (Quick Facts)
| তথ্য | বিস্তারিত |
| সর্বাধিক জুটি | শাবনূরের সাথে (১৪টি সিনেমা) |
| সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা | বুকের ভেতর আগুন (১৯৯৭ – মরণোত্তর) |
| মৃত্যুর পর আত্মহত্যা | প্রিয় নায়কের শোকে প্রায় ১২ জন তরুণী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। |
| সর্বশেষ মামলার তারিখ | ১৪ মে ২০২৬ (তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন) |
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সালমান শাহ কেবল একটি নাম নয়, তিনি ঢালিউডের একটি অধ্যায়। ৩০ বছর পরও যখন তাঁর সিনেমা টেলিভিশনে চলে, তখন মানুষ সব কাজ ফেলে টিভি সেটের সামনে বসে পড়ে। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে মহানায়করা মরেও অমর হয়ে থাকেন।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশ্লেষণে: BDS Bulbul Ahmed
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। তবে প্রথাবিরোধী লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে এই বিতর্ককে এক নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করে ‘ঘোষক’ হওয়া যায়, কিন্তু একটি জাতির ‘মহাস্থপতি’ হওয়া যায় না।

১. বন্দী মুজিব: ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী এক প্রেরণা

হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে যদি পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিতেন, তবে তিনি হতেন একজন ‘সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী’। কিন্তু তাঁর বন্দীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় ও অদম্য ভাবপ্রতিমা।
তিনি লিখেছেন, “যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।” ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালির মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ‘মুজিব কোথায়?’ তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি।
২. মেজর জিয়া: এক ঐতিহাসিক আকস্মিকতা

২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে একটি ‘আকস্মিক কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- সুযোগ ও আকস্মিকতা: লেখক মনে করেন, কালুরঘাটের বেতারযন্ত্রীরা একজন মেজরকে খুঁজছিলেন একটি জোরালো ঘোষণার জন্য। সেই মুহূর্তে অন্য কোনো মেজর থাকলেও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতেন।
- উত্তেজনা ও স্বস্তি: জিয়ার সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছিল মূলত এই কারণে যে, তারা জানতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এবং তাঁর নামেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ বা মুজিব বা আইনস্টাইন হওয়ার জন্য লাগে দীর্ঘ সাধনা, কিন্তু কেউ কেউ হঠাৎ মেজর জিয়া হয়ে উঠে সারা দেশকে আলোড়িত করতে পারেন।”
৩. কেন মুজিবই মহাস্থপতি?

আজাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি গুলিতে এবং প্রতিটি আত্মত্যাগে কেবল একটি নামই কাজ করেছে—তা হলো মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ হাজারবার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে আসত না এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “মুজিব বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বন্দী থেকেও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, মহাস্থপতি; তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না।”
৪. ‘শহীদ’ বনাম ‘নিহত-অমর’
প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে ইহলৌকিক শব্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো মুজিবকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব হতেন আরও বেশি শক্তিশালী। যারা দেশের জন্য প্রাণ দেন, তারা মূলত ‘নিহত-অমর’ হয়ে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকেন।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, ঘোষণা কে দিয়েছেন সেই তর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো—কার নেতৃত্বে এবং কার নামে একটি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই একক নেতৃত্বের নাম, যিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রকে মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।
এক নজরে লেখকের মূল বক্তব্য:
| বিষয় | হুমায়ুন আজাদের মত |
| বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব | বাংলাদেশের মহাস্থপতি, যাঁর স্থান ঘোষকের অনেক ওপরে। |
| মেজর জিয়া | ঐতিহাসিক আকস্মিকতায় উদ্ভূত একজন ট্র্যাজিক নায়ক ও কিংবদন্তি। |
| মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি | বঙ্গবন্ধুর নাম ও ভাবপ্রতিমা। |
| বন্দীত্বের গুরুত্ব | পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বন্দীত্ব ছিল বেশি মর্যাদাপূর্ণ। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed
বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।
২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।
৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।
৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।
৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।
৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২। |
| প্রধান পরিচয় | সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক। |
| সুরারোপিত গান | বন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)। |
| সংগঠন | লক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। |
| বিখ্যাত বই | জীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন। |
| মৃত্যু | ১৮ আগস্ট ১৯৪৫। |
তথ্যসূত্র (Source):
- উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
- বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
- অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



