অর্থনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
সিনিয়র এসইও ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতে সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। সম্প্রতি ব্রিকস (BRICS) জোটে নতুন সদস্য ও অংশীদার রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগদানের জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও, নতুন অংশীদার দেশগুলোর তালিকায় ব্রিকস (BRICS) এবং পাকিস্তান: ভূরাজনৈতিক জটিলতা, আইএমএফ নির্ভরতা ও ফিনটেক সম্ভাবনার নিরেট বিশ্লেষণ

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত জোটগুলোর একটি হলো ব্রিকস (BRICS)। বৈশ্বিক জিডিপির এক বড় অংশের অংশীদার এই জোটে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম পাকিস্তান। ২০২৩ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন করলেও, জোটে দেশটির অন্তর্ভুক্তি এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেকেই এই বিষয়টিকে কেবল ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বৈরিতার চোখে দেখলেও, এর গভীরে রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) শর্ত এবং ব্রিকসের নিজস্ব দর্শনের নানাবিধ সমীকরণ। আজকের ব্লগে আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করব কেন পাকিস্তান ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটুকু।

১. ব্রিকস জোটে পাকিস্তানের সদস্যপদ না পাওয়ার প্রধান কারণসমূহ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসে পাকিস্তানের স্থান না পাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ কাজ করেছে— কৌশলগত বাধা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আদর্শগত দ্বন্দ।
ক. ঐকমত্যের নিয়ম (Consensus-based Rule) ও ভারতের অবস্থান
ব্রিকসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জোটে নতুন কোনো সদস্য বা অংশীদার রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করতে হলে বর্তমান সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত ঐকমত্য বা সম্মতির প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত জোটে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিতে দৃঢ় আপত্তি বজায় রেখেছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সীমান্ত বৈরিতার কারণে নতুন সদস্যদের তালিকায় পাকিস্তানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি বড় কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হয়েছে।
খ. ভঙ্গুর অর্থনৈতিক সূচক
ব্রিকস মূলত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল এবং শক্তিশালী উদীয়মান অর্থনীতির (যেমন: চীন, ভারত, ব্রাজিল) একটি প্ল্যাটফর্ম। জোটে অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অত্যন্ত জরুরি। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতি বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৬% থেকে ৪.২%-এর আশেপাশে ওঠানামা করছে, যা ব্রিকসের ‘উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি’ ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গ. আইএমএফ (IMF) নির্ভরতা ও ব্রিকসের আদর্শিক দ্বন্দ্ব
ব্রিকস জোটের অন্যতম প্রধান দূরদর্শিতা বা লক্ষ্য হলো পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার (যেমন: মার্কিন ডলারের আধিপত্য, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক) বিকল্প গড়ে তোলা এবং নিজস্ব আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো (De-dollarization)।
কিন্তু পাকিস্তান বর্তমানে তার দেউলিয়াত্ব এড়াতে এবং রিজার্ভের বাফার বাড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আইএমএফ-এর ইএফএফ (EFF) বেলআউট কর্মসূচির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আইএমএফের এই কঠোর কাঠামোগত শর্তসমূহ ব্রিকসের বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
┌──────────────────────────────────┐
│ সদস্যপদ না পাওয়ার প্রধান ৩ কারণ │
└────────────────┬─────────────────┘
│
┌────────────────────────────┼────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐
│ ভারতের আপত্তি │ │ ভঙ্গুর অর্থনীতি │ │ IMF নির্ভরতা │
│ ঐকমত্যের নিয়মে │ │ জিডিপি প্রবৃদ্ধি │ │ ব্রিকসের বিকল্প │
│ ভেটো ক্ষমতা │ │ ৩.৬% - ৪.২% │ │ দর্শনের সাংঘর্ষিক│
└──────────────────┘ └──────────────────┘ └──────────────────┘
২. ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তান যদিও চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী সদস্যদের কাছ থেকে কূটনৈতিক সহানুভূতি পেয়ে থাকে, তবে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়ে সাধারণত নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ফলে পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া পাকিস্তানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক লড়াই।
তবে পূর্ণ সদস্যপদ না পেলেও পাকিস্তানের সামনে দুটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে:
- অংশীদার রাষ্ট্র (Partner Country) মর্যাদা: পূর্ণ সদস্য না হয়েও পাকিস্তান ব্রিকসের ‘পার্টনার কান্ট্রি’ হিসেবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা তাদের জোটের বাণিজ্য আলোচনা ও আঞ্চলিক সংযোগে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে।
- চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC): সিপেক-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং রাশিয়ার সাথে বাড়তে থাকা জ্বালানি ও সামরিক সম্পর্কের কারণে বেইজিং ও মস্কো ভবিষ্যতে পাকিস্তানের পক্ষে অর্থনৈতিক লবিং অব্যাহত রাখতে পারে।
৩. নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB): পাকিস্তানের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সেতু
রাজনীতি বা কূটনীতিতে পাকিস্তানের পথ কিছুটা কঠিন হলেও, দেশটির সাম্প্রতিক ডিজিটাল ও ফিনটেক (FinTech) সংস্কারগুলো ব্রিকস-এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে এনডিবি-এর সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে এবং প্রায় ৫৮২ মিলিয়ন ডলারের ক্যাপিটাল শেয়ার ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে।
┌──────────────────────────────────────┐
│ NDB-এর সাথে পাকিস্তানের সংযোগ সেতু │
└──────────────────┬───────────────────┘
│
┌─────────────────────────┼─────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌───────────────────┐ ┌───────────────────┐ ┌───────────────────┐
│ ডিজিটাল অবকাঠামো │ │ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি │ │ স্থানীয় মুদ্রায় │
│ (Raast System) │ │ (Digital Banks) │ │ লেনদেন │
└───────────────────┘ └───────────────────┘ └───────────────────┘
- ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংযোগ: এনডিবি টেকসই উন্নয়নের জন্য আইসিটি (ICT) অবকাঠামো তৈরিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়। পাকিস্তানের নিজস্ব ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম ‘রাস্ত’ (Raast) এবং নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দেশটির পাবলিক ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করেছে, যা এনডিবি-এর তহবিলের শর্ত পূরণ করে।
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion): স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান (SBP) ফিনটেক ও ৫টি নতুন ডিজিটাল রিটেইল ব্যাংকিং লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছে। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার এই উদ্যোগ এনডিবি-এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
- স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন: পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সুইফট (SWIFT) বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এনডিবি স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করে থাকে। পাকিস্তানও তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে চীনের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় (RMB/PKR) বাণিজ্যের উদ্যোগ নিয়েছে, যা এনডিবি-এর দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সংক্ষেপে বলা যায়, পাকিস্তান বর্তমানে মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আইএমএফ-এর শর্ত পূরণের লক্ষ্যে সংস্কার চালাচ্ছে (Survival Mode), যা ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র হওয়ার মতো স্বনির্ভর ও প্রভাবশালী স্তরে (Growth Mode) পৌঁছাতে এখনও যথেষ্ট নয়। তবে, রাজনৈতিক সদস্যপদ পেতে বাধার সম্মুখীন হলেও, দেশটির ডিজিটাল ফিনটেক সংস্কারগুলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (NDB) টেকনিক্যাল বা অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।
- মেটা টাইটেল (Meta Title):
- মেটা ডেসক্রিপশন (Meta Description): পাকিস্তান কেন ব্রিকস (BRICS) জোটের সদস্য হতে পারল না? জানুন ভারতের অবস্থান, আইএমএফ (IMF) নির্ভরতা এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (NDB) পাকিস্তানের ফিনটেক সম্ভাবনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ।
- ফোকাস কি-ওয়ার্ডস (Keywords): BRICS and Pakistan, ব্রিকস জোট, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, NDB Pakistan, ভারত-পাকিস্তান ভূরাজনীতি, IMF bailout Pakistan.
নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক বিষয়ক রিসোর্স (Sources)
১. ব্রিকস ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট (Global Financial Institutions Research): ব্রিকস জোটে নতুন অংশীদার অন্তর্ভুক্তি নীতি এবং আইএমএফের বর্ধিত তহবিল সুবিধা (EFF) সংক্রান্ত নীতিমালা।
২. স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান ও এনডিবি আর্কাইভস (SBP & NDB Digital Economy Papers): পাকিস্তানের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ‘রাস্ত’ (Raast) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ক্যাপিটাল শেয়ার সংক্রান্ত অফিসিয়াল ডেটা।
বিশ্বরাজনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
- খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন।
- রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়।
৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়:
- জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
- কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ডিজিটাল ও সাইবার জগৎ
তথ্যসূত্র: বিকাশ (bKash) সিকিউরিটি গাইডলাইন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে অনলাইন শপিং এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অভিনব সব সাইবার জালিয়াতি ও প্রতারণা। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষ বিভিন্ন লোভনীয় অফার বা চতুর ফিশিংয়ের ফাঁদে পড়ে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। গুগলের ২০২৬ সালের সর্বশেষ ইউজার সেফটি ও সিকিউরিটি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন শপিং ও বিকাশ ব্যবহার করার সময় জালিয়াতি চক্রকে ধরার ৭টি পাকা ও প্রমাণিত উপায় নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. অস্বাভাবিক মূল্যছাড় এবং “অবাস্তব” অফার (Too Good to be True)
প্রতারক চক্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো লোভ। বাজারে যে প্রোডাক্টটির আসল দাম ৫,০০০ টাকা, কোনো পেজ বা ওয়েবসাইটে যদি সেটি মাত্র ১,৫০০ টাকায় ‘অফারের’ নামে বিক্রি করার বিজ্ঞাপন দেখেন, তবে শুরুতেই সতর্ক হন। আইফোন, প্রিমিয়াম গ্যাজেট বা ব্র্যন্ডেড পোশাকের ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব ছাড় মূলত ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলার প্রথম ধাপ।

২. শুধু ‘অ্যাডভান্স ফুল পেমেন্ট’ বা অগ্রিম টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া
বিশ্বস্ত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় ক্যাশ অন ডেলিভারি (COD) বা কন্ডিশনাল ডেলিভারির সুবিধা দেয়। কিন্তু কোনো নতুন বা স্বল্প পরিচিত পেজ যদি পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার আগেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা বা অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য অনবরত চাপ দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে এখানে বড় ধরনের গড়মিল রয়েছে। নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান কাস্টমারকে পেমেন্টের জন্য বারবার তাগাদা দেয় না।
৩. ভুয়া বিকাশ কল এবং পিন/ওটিপি (PIN/OTP) চাওয়া
বিকাশ প্রতারণার অন্যতম সাধারণ পদ্ধতি হলো গ্রাহককে ফোন করে বলা যে, “আমি বিকাশ অফিস থেকে বলছি, আপনার অ্যাকাউন্টটি ব্লক হয়ে গেছে” অথবা “ভুল করে আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে গেছে, ওটিপি (OTP) কোডটি বলুন।” মনে রাখবেন, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা বা কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কখনোই আপনার ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) কিংবা ৪ বা ৫ ডিজিটের গোপন পিন (PIN) নম্বর জানতে চাইবে না। কেউ এটি চাইলেই নিশ্চিতভাবে সে একজন প্রতারক।

৪. ভুয়া এসএমএস (Fake SMS) ও স্পুফিং লিংকের ব্যবহার
অনেক সময় প্রতারকেরা হুবহু বিকাশের মেসেজ ফরম্যাট নকল করে আপনার ফোনে বার্তা পাঠায়, যাতে লেখা থাকে “You have received TK. 5,000″। এই মেসেজগুলো কিন্তু আপনার আসল বিকাশ অ্যাপের ব্যালেন্স বাড়ায় না। এছাড়া ‘বিকাশ বোনাস’ বা ‘সরকারি অনুদান’ পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হয়। কোনো লিংকে ক্লিক করে আপনার বিকাশ নম্বর এবং পিন সাবমিট করার আগে অবশ্যই ওয়েবসাইটের ইউআরএল (URL) চেক করুন। বিকাশের আসল ওয়েবসাইট লিংক সবসময় https://www.bkash.com/ দিয়ে শুরু হয়।
৫. ফেসবুক পেজের লাইক, কমেন্ট ও রিভিউ সেকশন হাইড বা অফ থাকা
অনলাইন শপিং পেজটি আসল নাকি নকল তা চেনার একটি সহজ উপায় হলো তাদের রিভিউ সেকশন। প্রতারক চক্রের পেজগুলোতে সাধারণত কাস্টমার রিভিউ অপশন বন্ধ থাকে এবং পোস্টের কমেন্ট সেকশন হাইড (Hide) বা লিমিটেড করা থাকে, যাতে প্রতারিত হওয়া অন্য ভুক্তভোগীরা সেখানে নেতিবাচক মন্তব্য করতে না পারেন। এছাড়া পেজের ‘Page Transparency’ অপশনে গিয়ে পেজটি কবে তৈরি হয়েছে এবং এর আগে কতবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তা দেখে এর নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা যায়।
৬. ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে (Personal Number) ‘সেন্ড মানি’ করার তাগিদ
যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রফেশনাল অনলাইন শপের নিজস্ব ‘বিকাশ মার্চেন্ট’ (Merchant Account) অ্যাকাউন্ট থাকে, যেখানে গ্রাহক ‘মেক পেমেন্ট’ অপশন ব্যবহার করে কেনাকাটা করেন। কিন্তু বিক্রেতা যদি কোনো মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট না দেখিয়ে আপনাকে বারবার পার্সোনাল নম্বরে ‘সেন্ড মানি’ বা ‘ক্যাশ ইন’ করতে বলে, তবে সাবধান হোন। পার্সোনাল নম্বরে টাকা পাঠালে পরবর্তীতে প্রতারণার শিকার হলেও সেই টাকা ট্র্যাক করা বা রিফান্ড পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
৭. লাইভ চ্যাটে ফেসবুক আইডির সত্যতা এবং ট্র্যাকিং আইডি না দেওয়া
পণ্য অর্ডার করার পর যদি তারা কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের (যেমন- সুন্দরবন, স্টিডফাস্ট, পাথao) মেমো বা ট্র্যাকিং আইডি দিতে টালবাহানা করে অথবা বারবার কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার নাম করে অতিরিক্ত ‘প্রসেসিং ফি’ দাবি করে, তবে ধরে নেবেন আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। জালিয়াতি চক্র সাধারণত টাকা পাওয়ার পরপরই গ্রাহকের ফেসবুক আইডি বা ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়।
প্রতারিত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় ও আইনি প্রতিকার:
১. বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭: যদি ভুলবশত কোনো প্রতারককে টাকা পাঠিয়ে দেন বা ওটিপি শেয়ার করে ফেলেন, তবে এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে সরাসরি বিকাশের হটলাইন নম্বর ১৬২৪৭-এ কল করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সাময়িকভাবে লক করুন এবং যে নম্বরে টাকা গেছে সেটি রিপোর্ট করুন।
২. জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP): অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারিত হলে মেমো, চ্যাটের স্ক্রিনশট এবং পেমেন্ট প্রুফসহ ভোক্তা অধিকারে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।
৩. সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন: বিকাশ বা অনলাইন শপিং জালিয়াতির শিকার হলে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করুন এবং ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ফেসবুক পেজে বা সরাসরি হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানান। ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম টিম এই ধরনের অপরাধীদের আইপি ও লোকেশন ট্র্যাক করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



