ইসলাম ও জীবন
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইসলামিক ডেস্ক | ০৮ মে ২০২৬
বর্তমান বিশ্বে ইসলাম নিয়ে যে কয়টি শব্দ সবচেয়ে বেশি ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রচারের শিকার, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘জিহাদ’। ইসলামবিদ্বেষী ও উগ্রপন্থীরা অনেক সময়ই জিহাদকে খুন, অরাজকতা বা নিরপরাধ মানুষ হত্যার সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জিহাদ আসলে একটি সুশৃঙ্খল, আধ্যাত্মিক এবং আদর্শিক সংগ্রামের নাম।

জিহাদ শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ

‘জিহাদ’ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো—পরিশ্রম করা, চেষ্টা করা বা কোনো লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ সংগ্রাম করা। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের প্রবৃত্তি (নফস), অন্যায়, দুর্নীতি এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই জিহাদ বলা হয়।
জিহাদের প্রকারভেদ: বড় জিহাদ বনাম ছোট জিহাদ

ইসলামে জিহাদকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: ১. জিহাদে আকবর (বড় জিহাদ): এটি হলো নিজের কু-প্রবৃত্তি বা নফসের বিরুদ্ধে লড়াই। লোভ, অহংকার, মিথ্যা ও পাপাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর অনুগত রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা।” (বায়হাকি) ২. জিহাদে আসগর (ছোট জিহাদ): এটি হলো শারীরিক বা সামরিক সংগ্রাম। যখন মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্র আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করা।
পবিত্র কোরআন কী বলে?
পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে জিহাদের ব্যাপকতা বর্ণিত হয়েছে:
- আল্লাহর পথে সর্বাত্মক চেষ্টা: “আর তোমরা আল্লাহর পথে চেষ্টা-সংগ্রাম কর, যেভাবে সংগ্রাম করার হক।” (সূরা হাজ্জ, আয়াত: ৭৮)। এই আয়াতে কেবল যুদ্ধের কথা বলা হয়নি, বরং ইবাদত, ধৈর্য এবং চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে।
- ত্যাগ ও ঈমান: “যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদ করেছে।” (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৭২)। এখানে সমাজ গঠন ও ত্যাগের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
জিহাদ বনাম ফিতনা (বিশৃঙ্খলা)

ইসলামে নিরপরাধ মানুষ হত্যা বা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর ফিতনা (অন্যায়-অত্যাচার বা বিশৃঙ্খলা) হত্যা থেকেও গুরুতর।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯১)। অর্থাৎ, জিহাদ আসে ফিতনা দূর করতে, ফিতনা ছড়াতে নয়।
ইসলামে যুদ্ধেরও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং উপাসনালয়ে থাকা মানুষদের ওপর আক্রমণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তাকে জিহাদ বলে চালিয়ে দেয়, তারা ইসলামের শিক্ষার বিপরীত কাজ করে।
উপসংহার
জিহাদ মানেই রক্তপাত নয়। জিহাদ মানে সমাজ থেকে মাদক, জুয়া, ব্যভিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। জিহাদ মানে নিজের চরিত্রকে সুন্দর করা। অর্থাৎ, অন্যায়ের সামনে আপসহীন থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল ও মেধা দিয়ে চেষ্টা করাই হলো প্রকৃত জিহাদ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সময়টা তখন ১৯৪৭ এর দিকে। মৃত সাগরের উত্তর-পশ্চিম তীর ঘেঁষে অবস্থিত কুমরান গুহা। এই গুহাতেই পাথর নিক্ষেপ করার খেলায় মত্ত দুই বেদুইন বালক। মেষ চড়ানোর বায়না ধরে প্রায়ই এদিকটায় চলে আসে দুই ভাই মিলে। হঠাৎ বড় একটা পাথর ছোঁড়ার পর অদ্ভুত রকমের শব্দ হলো। প্রথমদিকে তারা মনের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিলেও, প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের পর একই রকম শব্দ হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাটির তৈরি কিছু একটা ভেঙে গেছে। দুই বালক খেলা থেমে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বাতাসে ভেসে আসা মৃত সাগরের লোনা গন্ধ আর পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া বিকেলের সূর্য চারিদিক করে তুলেছিল রহস্যময়। তখনো সন্ধ্যা হতে অনেক দেরি। তাই এই অদ্ভুত শব্দের উৎস জানার জন্য দুজনে মিলে ঢুকে পড়লো গুহার ভেতর।
সেদিন সেই দুই বালকের সাহসী পদক্ষেপ উন্মোচন করে দিল এক গুপ্ত ইতিহাস। তারা গুহার ভেতর প্রবেশ করে উদ্ধার করলো বড় বড় মাটির পাত্র। পাত্র গুলো উল্টে দিতেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়লো অগণিত চামড়ার তৈরি স্ক্রোল। এরকম প্রায় ৭টি বড় পাত্র ভর্তি স্ক্রোল উদ্ধার করলো দুজন মিলে। তখন বাইরের আকাশে সূর্য প্রায় অস্ত যাই-যাই করছে। দুই বালক ছুটে চলে গেল বেদুইন পল্লীর দিকে। চিৎকার করতে লাগলো হাত-পা ছুঁড়ে, “গুপ্তধন! গুপ্তধন!”
বেদুইন সর্দার সব শুনে রাতটা অপেক্ষা করলেন। পরদিন ভোর হতেই দলে দলে কুমরান গুহাতে হানা দিলেন। উদ্ধার করে নিয়ে আসলেন শত শত স্ক্রোল। আশেপাশের সব গুহাতে তল্লাশী চালানো যখন শেষ, তখন বেদুইনদের ঝুলিতে স্ক্রোলের সংখ্যা ৯০০ ছুঁই ছুঁই করছে। জেরুজালেমে তীর্থের উদ্দেশ্যে অনেক মানুষ জড়ো হতেন। এই খবর চারিদিকে ছড়িয়ে গেলে সবাই বেদুইন পল্লীতে ছুটে আসলেন। এভাবেই মানবসভ্যতার চোখের আড়াল হয়ে থাকা রহস্যময় ডেড সী স্ক্রোল নতুন করে ফিরে আসলো আমাদের মাঝে; সাথে নিয়ে এলো এক অজানা ইতিহাস!
সেই দুই বেদুইন, যারা বাল্যকালে খেলার সময় স্ক্রোলগুলো উদ্ধার করেন।
ডেড সী স্ক্রোল কী?
‘ডেড সী স্ক্রোল’ নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে উঠে বিখ্যাত মৃত সাগরের ছবি। নামকরণ থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, স্ক্রোলগুলো সম্ভবত মৃত সাগর থেকে উদ্ধারকৃত অথবা এর সাথে কোন যোগসূত্রতা রয়েছে। কিন্তু এই স্ক্রোলগুলোর নাম প্রথমদিকে ডেড সী স্ক্রোল ছিল না। প্রথমে একে ‘কুমরান গুহার স্ক্রোল’ নামে ডাকা হলেও এর অনুসন্ধানস্থল সকল গুহা মৃত সাগরের তীর ঘেষে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম হয়ে যায় ‘ডেড সী স্ক্রোল’।
কুমরান গুহা থেকে অদূরেই অবস্থিত মৃত সাগর দিগন্তের সাথে মিশে আছে।
প্যাপিরাস পাতার তৈরি শক্ত কাগজ এবং বুনো শূকরের চামড়ার উপর গাঢ় কালি দিয়ে লেখা স্ক্রোলগুলো গুহার আঁধার থেকে স্থান পেল প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণাগারে। ততদিনে এতটুকু জানা হয়ে গেছে যে, স্ক্রোলগুলো অতিপ্রাচীন হিব্রু-বাইবেলের পান্ডুলিপি যা হিব্রু, আরমানি আর গ্রিক ভাষায় লেখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইবেলের মধ্যে এই স্ক্রোলগুলো প্রাচীনতম।
এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, ‘হিব্রু-বাইবেল’ দ্বারা ইহুদি গ্রন্থ তানাখ এর শিপারা এবং খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের আনুশাসনিক বাণী সম্বলিত পান্ডুলিপিকে বুঝায়।
তখন এর পাঠোদ্ধারের পাশাপাশি চলছিল নানান জল্পনা-কল্পনা। কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এই গুহাতে লুকিয়ে রেখেছে? কেন রেখেছে? স্ক্রোলগুলো কি শুধু হিব্রু-বাইবেলেরই অংশ? নাকি রোমাঞ্চকর কিছু লুকিয়ে আছে এর মাঝে?
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান
প্রথমদিকে বেদুইনরাই ছিলেন একমাত্র অনুসন্ধানকারী। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারাই সকল স্ক্রোল উদ্ধার করেন। বেদুইনদের কাছে স্ক্রোলগুলো ছিল আয়-উপার্জনের মাধ্যম। তারা শিক্ষিত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ধুলিমাখা ছেঁড়া পান্ডুলিপি তাদের কাছে মূল্যহীন হলেও গণ্যমান্য সাহেবরা চড়াদামে কিনে নিবেন। তাদের এই ব্যবসাতে প্রথম হস্তক্ষেপ করে জর্ডানের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ।
তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ল্যাঙ্কেস্টার হার্দিং সকল স্ক্রোল জর্ডান সরকারের অধীনে আনার লক্ষ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। সরকারি অর্থায়নে অনুসন্ধান পুরোদমে চলছিল। কিন্তু বেদুইনরাও থেমে যাননি। তারাও তাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত জর্ডান সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুসন্ধান করেন ফরাসী ধর্মযাজক ফাদার রলা দ্য ভুঁ। তিনি সর্বমোট ১১টি গুহা চিহ্নিত করেন এবং এর উৎপত্তিস্থল, মালিকানা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণায় ভূমিকা পালন করেন। ১১টি গুহার মধ্যে ৫টি গুহার বেশিরভাগ স্ক্রোলই তখন বেদুইনদের দখলে ছিল। তারা সেগুলো বিভিন্ন দেশের হিব্রু যাজক এবং ইসরাইলিদের কাছে বিক্রয় করে দেন।
মার স্যামুয়েল এর সেই বিজ্ঞপ্তি।
এর মধ্যে সিরিয়ান বিশপ মার স্যামুয়েল তার ক্রয়কৃত চারটি স্ক্রোল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এই বিজ্ঞপ্তি ইসরাইলি সামরিক বাহিনী প্রধান ইয়েগাল ইদিনের নজরে আসে। তার পিতা এল সুকেনিক ছিলেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক। তিনি ২৫০,০০০ ডলারের বিনিময়ে সেগুলো কিনে নেন। এর পরেই ইসরাইল এবং জর্ডান পৃথক পৃথকভাবে এই স্ক্রোল নিয়ে গবেষণায় নেমে পড়ে।
স্ক্রোল গবেষণায় মগ্ন অধ্যাপক সুকেনিক।
প্রাথমিক প্রশ্নোত্তরের খোঁজে
গবেষকদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই তখন সকলের মনে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কে বা কারা এই স্ক্রোলগুলো এখানে রেখে গেল? কখন লেখা হয়েছিল এই স্ক্রোলগুলো? কী লেখা আছে সেখানে?
এই সব প্রশ্নের উত্তর বের করার ক্ষেত্রে প্রথম সফলতার মুখ দেখেন ইসরাইলি অধ্যাপক সুকেনিক। তিনি এগুলোর বয়স বের করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ইহুদিদের ঐতিহাসিক দ্বিতীয় মন্দির যুগে প্রথম লেখা হয় এই স্ক্রোলগুলো। তবে অন্য বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরবর্তীতে সুকেনিকের তথ্য সত্য বলে মেনে নেন সবাই। সেই অনুযায়ী সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দী থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য, আধুনিক যুগে কার্বন ডেটিং এর ফলাফলও সুকেনিকের অনুমানকে সমর্থন করে।
কিন্তু কারা এই পাণ্ডুলিপিগুলো সংকলন করেছিলেন, এ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিতর্কে লিপ্ত আছেন গবেষকরা। অনেকের মতে, রোমান বাহিনীর হাতে কুমরান এলাকা পতনের পূর্বে এখানে বসবাসরত ইহুদিদের দ্বারা এগুলো সংকলিত। তখন ইহুদিদের চারটি বড় গোত্রের মধ্যে ইসেন সম্প্রদায়ের পণ্ডিতগণ এগুলো সংকলন করেন বলে ধারণা করা হয়। রোমানদের আক্রমণের পর সেগুলো এই গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয় এবং এটাকে ‘মিনি পাঠাগার’ হিসেবে ব্যবহার করেন ইহুদি ধর্মানুসারীরা।
মহামূল্যবান ডেড সী স্ক্রলের একটি পাণ্ডূলিপি।
এছাড়া বাকি গোত্রদেরও বাদ দেয়া হয়নি সম্ভাব্য সংকলকের তালিকা থেকে। আবার অনেকের মতে, এগুলো সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি।
ইসরাইল বিতর্ক এবং স্ক্রোলের পাঠোদ্ধার
বেদুইনদের ব্যবসার সুবাদে ততদিনে স্ক্রোল ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে। যদিও সিংহভাগ স্ক্রোল জর্ডান এবং ইসরাইলের হস্তগত ছিল, কিন্তু বাকিরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না। বড় বড় গবেষকরা বিভিন্ন তথ্য উদ্ধার করতে লাগলেন স্ক্রোল ঘেঁটে।
তবে সেগুলো একই তথ্য বিভিন্ন রূপে জানানো ছাড়া তেমন কোন ঝড় তুলতে পারেনি বিশ্ব দরবারে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই।
অপরদিকে ইসরাইলে তখন গবেষকদের মধ্যে প্রশাসনিক কারণে কলহ চলছিল। ড. জন স্ত্রাঙ্গলের নেতৃত্বে হাতেগোণা কয়েকজন গবেষক ছাড়া আর কেউ স্ক্রোল নিয়ে কাজ করার অনুমতি পাননি। এমনকি স্ক্রোল সম্পর্কিত আলোকচিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ছিল কড়াকড়ি। ১৯৭৭ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গেজা ভারমেস এটাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় একাডেমিক কেলেঙ্কারি বলেন।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করছেন এক তরুণ গবেষক।
তৎকালীন শীর্ষ গবেষক হার্শেল শ্যাঙ্কস প্রায় তিন দশক ধরে এ নিয়ে আইনী লড়াই করেন। দীর্ঘদিনের লড়াই শেষে ১৯৯১ সালে ইসরাইলের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগীয় প্রধান ইমানুয়েল তভ সর্বপ্রথম স্ক্রোল গবেষণার ফল এবং পাণ্ডুলিপি অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেন।
এরপর ঝিমিয়ে পড়া গবেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা দেখা গেল। কাজে লেগে পড়লেন সবাই। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে দ্রুত বেশিরভাগ পাণ্ডুলিপির পাঠ পুনরোদ্ধার সম্ভব হলো। এক এক করে প্রকাশিত হতে থাকলো সকল স্ক্রোলের মার্জিত পাণ্ডুলিপি।
সমস্ত পাণ্ডুলিপিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়- বাইবেলিক এবং নন-বাইবেলিক। এর মধ্যে ১০ কপি ঈসায়ী, ৩০ কপি শামের কিতাব এবং ২৫ কপি দ্বিতীয় বিবরণ সম্পর্কিত হিব্রু দলিল রয়েছে। গবেষকদের মতে, স্ক্রোলগুলো মূলত হিব্রু বাইবেলের পান্ডুলিপি হলেও সম্পূর্ণ বাইবেলের The Book of Esther অধ্যায়ের কোনো পান্ডুলিপি এর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নতুন টেস্টামেন্টের ঈসায়ী থেকে এগুলো ১০০০ বছর পুরাতন। তবে যিশুখ্রিস্টের আগমনবার্তা সম্পর্কিত জশুয়ার ভবিষ্যদ্বাণী হিব্রু শামের কিতাবে রয়েছে, যা এর আগে কোথাও দেখা যায়নি। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক দূর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া তথ্য এই স্ক্রোলের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে অনেকে ধারণা করেন, খ্রিস্টধর্মের শুরু হয়েছে এই স্ক্রোলগুলোর মাধ্যমে। তবে এই বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিতর্ক চললেও সঠিকভাবে কোন কিছু জানা যায়নি।
আর নন-বাইবেলিক অংশে বিভিন্ন আইন-কানুন, রীতিনীতি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র এবং কিছু ব্যক্তিগত পুঁথি রয়েছে। গবেষকদের মতে, কুমরান গুহার বিরানভূমি আগে ঠিক এরকম ছিল না। এখানে বড় সম্প্রদায় বাস করতো। কুমরান নামে গোটা একটা সভ্যতার অস্তিত্বের কথা জানা যায় স্ক্রোল থেকে।
এছাড়া ১৬টি সামরিক চিঠিপত্র পাওয়া যায়, যেগুলো বার কুখবা নামে পরিচিত। ‘বাবাথা’ নামক এক ইহুদির ব্যক্তিগত নথি সম্বলিত কয়েকটি পাণ্ডুলিপিও পাওয়া যায়। নব্যপ্রস্তর যুগের বিভিন্ন হাতিয়ারের অংশবিশেষও উদ্ধার করা হয় বলে জানান গবেষকরা।
প্রায় ৪০% এর মতো স্ক্রোল থেকে পাঠোদ্ধার করা অসম্ভব বলে জানান ইসরাইলি গবেষকগণ। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে Biblical Archaeological Society প্রথমবারের মতো পাণ্ডুলিপি বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। তবে ১৯৯৪ এর শেষের দিকে ইসরাইলি পুরাতত্ত্ববিদরা পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু গ্রিক পাণ্ডুলিপি কুমরান সম্প্রদায় বহির্ভুত বলে নিশ্চিত হন। তবে সেগুলো ঠিক কোন উদ্দেশ্যে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তার উত্তর এখনো বের করা সম্ভব হয়নি।
সতর্কতার সাথে ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া লাগানো হচ্ছে।
ইসরাইল প্রদত্ত ছবি নিয়ে হান্টিংটন লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ প্রথম কম্পিউটার অ্যানালাইসিস সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে দুর্বোধ্য অনেক পাণ্ডুলিপির নিখোঁজ অংশের সম্ভাব্য পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করা হয়।
ডেড সী স্ক্রোলের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে ওল্ড টেস্টামেন্টের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসে, যা র্যাবাই তত্ত্ব এবং জুডাতত্ত্বের নতুন দিক উন্মোচন করে। যিশুখ্রিস্টের আগমন এবং প্রাথমিক খ্রিস্টান ধর্মের অনেক অজানা তথ্যও জানা যায়। প্রাচীন ইহুদি ধর্মের সাথে খ্রিস্টানদের ওল্ড টেস্টামেন্ট এর সূক্ষ যোগসূত্রতাও পাওয়া যায় এগুলো থেকে।
রহস্যময় কপার স্ক্রোল এবং গুপ্তধনের সন্ধান
ধর্মীয় স্ক্রোলগুলো ইসরাইলিদের হাতে থাকলেও সবচেয়ে রহস্যময় স্ক্রোল তখন জর্ডানীদের হস্তগত ছিল। অন্যান্য স্ক্রোলের মতো তা প্যাপিরাস পাতা বা চামড়ার উপর লিখিত ছিল না। সেটা লেখা হয়েছিল তামার তৈরি পাতের উপর। যাকে ইতিহাসবিদগণ The Copper Scroll নামে চিনেন
একে পাণ্ডুলিপি বললেও ভুল হবে। কারণ এর মাঝে লেখার সাথে আছে খোদাই করা কয়েকটি মানচিত্র। আসলে এটা ছিল একাধিক গুপ্তধনের নকশা। ১৯৫২ সালে অনুসন্ধান অভিযানের সময় এক জর্ডানী পুরাতত্ত্ববিদ ৩ নং গুহার ভেতর থেকে এটি উদ্ধার করেন।
জাদুঘরে কাঁচের ক্যাবিনেটে রক্ষিত রহস্যময় কপার স্ক্রোল।
জর্ডান সরকার তখন কড়া নিরাপত্তায় স্ক্রোলটিকে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালেগ্রো-এর নিকট প্রেরণ করেন। অ্যালেগ্রো পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারেন স্ক্রোলটি একটি গুপ্তধনের মানচিত্র। তিনি তৎক্ষণাৎ স্ক্রোলের রহস্য সমাধানে লেগে যান। পরবর্তীতে জর্ডান সরকারের নির্দেশে ১৯৬০ সালে অ্যালেগ্রোর গবেষণার ফলাফল জার্নাল আকারে প্রকাশ করা হয়।
অ্যালেগ্রোর জার্নালে ঢুঁ মেরে জানা যায় যে, স্ক্রলে মোট ৬৩ টি স্থানের নির্দেশনা রয়েছে। স্ক্রোলের ভাষ্যমতে সেগুলো সোনা আর রুপা বোঝাই করা কুঠুরি, যার সর্বমোট পরিমাণ কয়েক টনের কাছাকাছিও যেতে পারে। স্ক্রোলটি যেন বছরের পর বছর টিকে থাকে সেজন্য এটা তামার পাতের উপর লেখা হয় বলে জানান অ্যালেগ্রো।
স্ক্রোলের নির্দেশনায় স্পষ্টাকারে স্থানগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কপার স্ক্রোল থেকে হুবহু অনুবাদ করা আলোচিত একটি লাইন তুলে ধরলাম, “যেখানে লবণের স্তূপ, সেখান থেকে প্রথম সিঁড়ির নিচে চার হাত গভীরে ৪১ টালি রূপা”।
আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে সহজ মনে হলেও গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া এতো সহজ নয়। কারণ, মানচিত্রের এসব নির্দেশনা তখনকার গুহাবাসীদের জন্য লেখা হয়েছিল। কেউ নিজের ঘরের মতো গুহাগুলোকে না চিনলে, তার পক্ষে এই অবস্থানগুলো বের করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এখনকার কারো জন্য এত সহজ নয় এর সন্ধান করা। উপরন্তু স্ক্রোল মোতাবেক গুপ্তধনের প্রথম অবস্থানের সাথে বাকিগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রথম অবস্থানই বের করা সম্ভব হয়ে উঠেনি
কপার স্ক্রোলের একাংশ।
তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, দুই হাজার বছর আগেই রোমানরা হয়তো সকল গুপ্তধন লুট করে ফেলেছেন। এর পক্ষে প্রমাণও দিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এই প্রমাণ কি আর অনুসন্ধান থামাতে পারে! এখনো সবধরনের সূত্র নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।
আর এই মহামূল্যবান কপার স্ক্রোল নিয়ে সাহিত্যকরাও মনের মাধুরী মিশিয়ে আপন কল্পনার মাধ্যমে রোমাঞ্চকর অভিযান পরিচালনা করে রচনা করেছেন বেশ কিছু উপন্যাস। এর মধ্যে Nathaniel Norsen Weinreb এর The Copper Scroll এবং Lionel Davidson এর A long way to Shiloh বিখ্যাত।
মালিকানা বিরোধ
প্রথমদিকে ধর্মীয় স্ক্রোল মনে হলেও কপার স্ক্রোলের সন্ধান আরো রোমাঞ্চকর রহস্যের হাতছানি দিচ্ছে ইতিহাসবিদদের। এরই জের ধরে ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল জর্ডান থেকে প্রায় ১৫০০ এর মতো স্ক্রোল নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ইসরাইলের রকফেলার জাদুঘরে কড়া নিরাপত্তায় শুরু হয় গবেষণা।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক শুরু হয় যখন ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অনুবাদ প্রকাশ করতে দীর্ঘ ৪০ বছর বিলম্ব করে। এদিকে জর্ডান সরকারও বসে থাকেনি। তারাও বরাবরই জর্ডানকে স্ক্রোলগুলোর বৈধ মালিক হিসেবে দাবি করে আসছে।
কানাডায় ডেড সী স্ক্রোল প্রদর্শনীর একটি কেবিনেট।
বর্তমানে জর্ডানের দখলে রয়েছে কপার স্ক্রোলসহ মাত্র ২৫টি স্ক্রোল! এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিস্তিন, কানাডা এবং সিরিয়ার বিভিন্ন গবেষণাগার এবং প্রতিষ্ঠানের নিকট বেশ কয়েকটি স্ক্রোল হস্তগত আছে।
অপরদিকে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা নীতির ২৩৩৪ অনুশাসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র Veto প্রদান না করায়, ইসরাইল স্ক্রোলগুলোর অধিকার হারাতে পারেন বলে মনে করেন টাইমস অফ ইসরাইলের বিশেষজ্ঞরা। তবে স্ক্রোলের ব্যাপারে ইসরাইলের মাত্রাতিরিক্ত গোপনীয়তা ব্যাপারটিকে রহস্যময় করে তুলেছে।
২০১০ সালে জর্ডান সরকার কানাডায় ইসরাইল আয়োজিত স্ক্রোল প্রদর্শনী বয়কট করে এবং সেগুলো পুনরায় দখলে নেওয়ার সংকল্প জানায়। বর্তমানে জর্ডান, ইসরাইল , ফিলিস্তিন , কানাডা এবং সিরিয়া স্ক্রোলগুলোর মালিকানার বিষয়ে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত আছে, যা সমাধা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখেন না বিশেষজ্ঞরা।
টাইম ম্যাগাজিনের মতে, ডেড সী স্ক্রোল ইতিহাসের অন্যতম সেরা অনুসন্ধান। রাজনৈতিক বিরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া খ্যাত ইসরাইলের অতিমাত্রায় গোপনীয়তার কারণে উন্মুক্ত বিশ্ব বঞ্চিত হচ্ছে অজানা সব রোমাঞ্চকর তথ্য থেকে।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইল অনুসন্ধানকারী দল ১২ নং গুহার সন্ধান পান বলে দাবি করেন। এর মাধ্যমে গবেষণায় এক নতুন সম্ভাবনার দেখা দেয়। কিন্তু এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি কর্তৃপক্ষ
যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ঘনীভূত হয়ে পড়ছে রহস্য। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিচরণের যুগে ইসরাইলের এরূপ মনোভাব নিন্দাজনক। তবে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে কোন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপে হয়তো এই সমস্যার সমাধান হবে এবং বিশ্বদরবারে উন্মোচিত হবে স্ক্রোলের রহস্য।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. Dead Sea Scrolls: The Living Manuscripts of the Dead Sea – মূল গবেষণা প্রবন্ধ। ২. Israel Antiquities Authority (IAA) – ডিজিটাল লাইব্রেরি আর্কাইভ। ৩. Biblical Archaeological Society – বিশেষ প্রদর্শনী রিপোর্ট। ৪. ‘ইতিহাসের সন্ধানে’ (টক-শো) – মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্নতাত্ত্বিক রাজনীতি বিষয়ক পর্ব।
সম্পাদনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ডেস্ক রিপোর্ট | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ইসলামের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবে বাংলাদেশের মতো ‘ঘন ঘন’ মাদ্রাসা দেখা যায় না কেন—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত এবং সামাজিক পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিচে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হলো:

১. সৌদি আরবের সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা

সৌদি আরবে প্রচলিত অর্থে আলাদা মাদ্রাসার আধিক্য না থাকার প্রধান কারণ হলো দেশটির সরকারি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা।
- একীভূত কারিকুলাম: সৌদি আরবের সাধারণ সরকারি স্কুলগুলোতেই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কুরআন, হাদিস এবং আরবি ভাষা সেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে আলাদাভাবে মাদ্রাসায় যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে অনুভূত হয় না।
- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার দায়িত্ব নিজেই পালন করে।
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সেখানকার মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারগুলো নিয়মিত ক্লাস ও সেমিনারের আয়োজন করে, যা প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তবে উচ্চতর গবেষণার জন্য মদিনা বা মক্কার মতো শহরগুলোতে বিশেষায়িত ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট বিদ্যমান।
২. বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপকতা মূলত ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে লক্ষ্য করা যায়। এর পেছনে কাজ করে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রভাবক:

- আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা একটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প। অধিকাংশ মাদ্রাসায় এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, যা একটি ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করে।
- ধর্মীয় আবেগ ও নৈতিকতা: দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে, মাদ্রাসা শিক্ষা সন্তানদের নৈতিক চরিত্র গঠনে বেশি সহায়ক।
- বেসরকারি উদ্যোগ: বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো মূলত সাধারণ মানুষের দান এবং বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়। কওমি ও আলিয়া—উভয় ধারার মাধ্যমে এখানে ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য সংরক্ষিত হচ্ছে।
- সরকারের স্বীকৃতি: বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এর সনদের মান উন্নয়ন ও মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
উপসংহার
সহজ কথায়, সৌদি আরব তার ধর্মীয় শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূলধারার সাধারণ শিক্ষার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সমান্তরাল ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সৌদিতে মাদ্রাসা নেই—এটি ভুল ধারণা; বরং সেখানকার প্রতিটি সরকারি স্কুলই একাধারে আধুনিক স্কুল এবং মানসম্পন্ন মাদ্রাসা।
তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ট্যাটু বা উল্কি আঁকা বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটি জনপ্রিয় ফ্যাশন। তবে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়ার আগে আপনার শরীরের এই শিল্পকর্মটি কোনো দেশে আপনার জন্য বিপদের কারণ হতে পারে কি না, তা জানা জরুরি। সাধারণভাবে ‘ট্যাটু করা সরাসরি নিষিদ্ধ’ এমন কোনো দেশ না থাকলেও, বেশ কিছু দেশে এর ওপর ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিধিনিষেধ রয়েছে।
১. থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা: বুদ্ধের ট্যাটুতে সতর্কতা

শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে ট্যাটু নিষিদ্ধ নয়। তবে যেহেতু এই দেশগুলোর সিংহভাগ মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তাই শরীরে গৌতম বুদ্ধের ছবি ট্যাটু করাকে তারা চরম অবমাননাকর মনে করে। ২০১৪ সালে ব্রিটিশ পর্যটক নাওমি কোলম্যানকে শরীরে বুদ্ধের ট্যাটু থাকার কারণে শ্রীলঙ্কা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আইনত ট্যাটু নিষিদ্ধ না হলেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে আপনি বড় আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
২. ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য: আইন বনাম ধর্মীয় বাধা

ইরান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে ট্যাটু করা আইনত নিষিদ্ধ নয়। তবে ইরানে ফুটবলার আশকান দেজাগাহ যখন ট্যাটু প্রদর্শনের জন্য সমালোচিত হন, তখন বিষয়টি বিশ্ব গণমাধ্যমে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে (সৌদি আরব, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া) ট্যাটু আইনত বৈধ হলেও সামাজিকভাবে একে ভালো নজরে দেখা হয় না। বিশেষ করে অশ্লীল ছবি বা পবিত্র কোনো ধর্মগ্রন্থের আয়াত ট্যাটু করানো সেখানে বিপজ্জনক হতে পারে।
৩. উত্তর কোরিয়া: রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন
কিম জং উনের দেশে ট্যাটু করানো যায়, তবে সেখানে আপনার পছন্দ নয়, বরং রাষ্ট্রের পছন্দই শেষ কথা। কিম পরিবার বা সাম্যবাদী দলের গুণকীর্তনমূলক ট্যাটু করাতে কোনো বাধা নেই। তবে ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত কোনো বিশেষ প্রতীকের ট্যাটু করাতে গেলে আপনাকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
৪. জাপান: সামাজিক বয়কটের ভয়
জাপানে ট্যাটু করা বৈধ। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে জাপানি অপরাধী চক্র ‘ইয়াকুজা’র সদস্যরা সারা শরীরে ট্যাটু করায়, সাধারণ জাপানিরা একে ভয়ের চোখে দেখে। এ কারণে জাপানের অনেক পাবলিক বাথ (অন্সন), জিম বা পুলে ট্যাটু থাকলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এটি কোনো রাষ্ট্রীয় আইন নয়, বরং একটি সামাজিক রীতি।
৫. দক্ষিণ কোরিয়া: কেবল ডাক্তাররাই শিল্পী
দক্ষিণ কোরিয়ার আইনটি বেশ অদ্ভুত। সেখানে ট্যাটু করা নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু ট্যাটু আর্টিস্ট হওয়া কঠিন। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে কেবল সনদপ্রাপ্ত ডাক্তারদেরই ট্যাটু করার অনুমতি দেওয়া হয়। সাধারণ আর্ট স্টুডিওতে ট্যাটু করানো সেখানে অনেক সময় ‘অবৈধ চিকিৎসা সেবা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
৬. অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডস: বয়সের কড়াকড়ি
উন্নত দেশগুলোতে মূলত বয়সের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়া বা নেদারল্যান্ডসে ১৮ বছরের নিচে কারো ট্যাটু করাতে চাইলে বাবা-মায়ের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ১৮ বছর হয়ে গেলে সেখানে আর কোনো বিধিনিষেধ নেই।
৭. চীন ও জার্মানি: রাজনৈতিক প্রতীকে নিষেধাজ্ঞা
জার্মানি বা ফ্রান্সে নাৎসিদের কোনো প্রতীক (যেমন: স্বস্তিকা) ট্যাটু করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। চীনেও রাজনৈতিক উস্কানিমূলক বা ধর্মীয় কোনো ট্যাটু করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ কাজ করে।
উপসংহার: ট্যাটু করানোর আগে সেই দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি ও আইন সম্পর্কে অবগত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্যাটু আপনার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হলেও, তা যেন অন্য কারো ধর্মীয় বা জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত না হানে—সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, ডয়চে ভেলে (DW), কোরা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নির্দেশিকা। তারিখ: ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



