আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ অনুসন্ধানী ডেস্ক

ঢাকা: দীর্ঘ ৫৪ বছরের স্বাধীন পথচলায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুদ্ধিজীবী মহল, বিভিন্ন টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে— বাংলাদেশের প্রকৃত অবকাঠামোগত ভিত্তি কি পাকিস্তান আমলেই স্থাপিত হয়েছিল? ব্রিটিশদের ২০০ বছরের অবজ্ঞা এবং পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের উন্নয়নের পরিসংখ্যান বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন উঠে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সেই আলোচনার সূত্র ধরে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
১. ব্রিটিশ আমলের অবজ্ঞা ও কলকাতার ‘দাদা-বাবু’ সংস্কৃতি

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭—এই ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলাকে কেবল কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। কলকাতার প্রভাবশালী ‘দাদা-বাবু’ বা এলিট শ্রেণি কখনোই চায়নি ঢাকা বা পূর্ব বাংলা উন্নত হোক।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করতে ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
- ইতিহাস ও বিরোধিতা: এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের যুক্তি ছিল, পূর্ব বাংলার কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। কলকাতার তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি পর্যন্ত এর বিপক্ষে ছিলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ আমলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়।
২. পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর: উচ্চশিক্ষার মহাবিপ্লব

ইতিহাস আমাদের শেখায় পাকিস্তান ২৪ বছর শোষণ করেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও প্রকৌশল খাতের মেরুদণ্ড এই ২৪ বছরেই তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইতিহাস:
পাকিস্তান আমলে মোট ৫টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়:
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩): উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রাণের দাবি মেটাতে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী ছিলেন এর প্রথম উপাচার্য।
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬): প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর কার্যক্রম শুরু করে।
- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০): দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮): মূলত ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়, যা আজ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১): ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা:
বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি প্রধান সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার ৪টিই (৮০%) পাকিস্তান আমলের অবদান।
- বুয়েট (BUET – ১৯৬২): ১৮৭৬ সালের সার্ভে স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
- রুয়েট (১৯৬৪), চুয়েট (১৯৬৮), কুয়েট (১৯৬৯): এই আঞ্চলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলো পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে নির্মিত হয়। পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১টি নতুন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)।
৩. চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন
ব্রিটিশদের ২০০ বছরে মাত্র ১টি মেডিকেল (ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ১৯৪৬) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিপরীতে পাকিস্তান আমলে ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়।
নাম ও ইতিহাস:
- চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭): বন্দর নগরীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল কাম কলেজ।
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮): উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র।
- ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।
- সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): তৎকালে সিলেট মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত ছিল।
- স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩): মিডফোর্ড হাসপাতালের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে।
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক IPGMR – ১৯৬৬): স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণার জন্য এটি পাকিস্তান আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮): দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আস্থার প্রতীক।
- রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০): পাকিস্তান আমলের শেষ বড় উপহার।
৪. বিশেষায়িত ও কারিগরি শিক্ষা
পাকিস্তান আমলে কারিগরি শিক্ষায় যে জোয়ার এসেছিল, তা স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে অনেকটা ম্লান।
- পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট: পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে ১৭টি পলিটেকনিক করেছিল। বাংলাদেশ ৫০ বছরে করেছে ৩২টি।
- ক্যাডেট কলেজ: ফৌজদারহাট (১৯৫৮), মির্জাপুর (১৯৬৩), ঝিনাইদহ (১৯৬৩) এবং রাজশাহী (১৯৬৫)—এই ৪টি ঐতিহাসিক ক্যাডেট কলেজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়।
- বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (১৯৬২): নৌ-অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
- বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বুটেক্স – ১৯৫০): এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
৫. শিল্পায়ন ও ভারী অবকাঠামো
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলো পাকিস্তান আমলের পরিকল্পনার ফসল।
- শিল্পনগরী: তেজগাঁও, হাজারীবাগ এবং খালিশপুর শিল্প এলাকা পাকিস্তান আমলে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।
- আদমজী জুট মিল (১৯৫১): নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল।
- চন্দ্রঘোনা পেপার মিল (১৯৫৩): এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল।
- ইস্টার্ন রিফাইনারি (১৯৬৮): দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার যা আজও সচল।
- জাতীয় স্থাপনা: সংসদ ভবন, সচিবালয়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (বর্তমান শাহজালাল) এবং বাইতুল মোকাররম মসজিদ—প্রতিটিই পাকিস্তান আমলের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা।
৬. পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৯৭১-এর যুদ্ধের পর পাকিস্তান ‘ঘাস খেয়ে হলেও’ পারমাণবিক বোমা তৈরির শপথ নিয়েছিল। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।
- পারমাণবিক অস্ত্র: ১৭০টি ওয়ারহেড এবং শাহীন-৩ (২৭৫০ কিমি পাল্লার) মিসাইল নিয়ে পাকিস্তান এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
- বিমান বাহিনী: জেএফ-১৭ থান্ডার এবং জে-১০সি নিয়ে তারা বিশ্বের সপ্তম শক্তিশালী বাহিনী। সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত।
- কূটনীতি: বর্তমানে পাকিস্তান ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিগ প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিপরীতে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে যতটা মাতামাতি করেছে, অবকাঠামোগত স্বনির্ভরতা ও আধুনিকায়নে কি ততটা এগোতে পেরেছে? আজ সংসদে আধুনিকতা বড় নাকি চেতনা বড়—তা নিয়ে শত শত অধিবেশন পার হয়ে যাচ্ছে।
উপসংহার ও পর্যালোচনা
ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শোষণ এবং ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের বৈষম্যের গল্প যেমন সত্য, তেমনি এই অঞ্চলের আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন যে পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল—তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে যেখানে মাত্র ১২% শিক্ষিত ছিল, পাকিস্তান আমলে তা দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত, আমরা কি কেবল আগের আমলের করা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রকৃত আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে পারছি?
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: ১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ঐতিহাসিক ডাটা। ২. ড. এম.এ. রহিম, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৭১)। ৩. আল-জাজিরা ও এনডিটিভি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা রিপোর্ট ২০২৬। ৪. বিগত ২৬-২৮ এপ্রিল ২০২৬-এর টেলিভিশন টকশো ‘ইতিহাসের সত্য’।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬
আমাদের চারপাশের পৃথিবী এবং এর বাইরের মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত এমন সব অবিশ্বাস্য ঘটনার জন্ম দিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। সাধারণ চোখে প্রকৃতিকে যেমনটা মনে হয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ততটাই নিখুঁত বিজ্ঞান ও রোমাঞ্চ।
নিচে পৃথিবী, মহাকাশ এবং জীবজগতের এমন ৮টি আকর্ষণীয় ও বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হলো, যা আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:
১. প্রতি সেকেন্ডে ১০০ বার বিদ্যুৎ চমকানো

আমরা সাধারণত ঝড়-বৃষ্টির সময় দু-একবার বিদ্যুৎ চমকাতে বা মেঘ ডাকতে দেখি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য হলো—এই পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮.৬ মিলিয়ন (৮৬ লক্ষ) বার বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ চমকায়! এর সহজ সমীকরণ হলো, প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রায় ১০০ বারেরও বেশি বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
২. পানিতে ভাসমান অলৌকিক পাথর: পিউমিস

পাথর মানেই তা ভারী হবে এবং পানিতে ডুবে যাবে—এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু পিউমিস (Pumice) হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যতিক্রমী পাথর যা পানিতে অনায়েসে ভেসে থাকে। মূলত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় নির্গত লাভা দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ার সময় এর ভেতরে প্রচুর বাতাস বা গ্যাস আটকে যায়। ফলে পাথরটির ভেতরে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি হয় এবং এর ঘনত্ব পানির চেয়ে কম হওয়ায় এটি পানিতে ভাসতে পারে।
৩. উটের চোখের সুরক্ষায় ‘তিনটি পাতা’ বা পলক

মরুভূমির তীব্র ঝড় এবং উড়ো ধুলাবালি থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি হলো উট। তীব্র ধূলিঝড়ের মধ্যেও যেন উট অনায়াসে চলাচল করতে পারে, সেজন্য উটের চোখে সাধারণ মানুষের মতো দুটি নয়, বরং তিনটি চোখের পাতা (Eyelids) থাকে। এর মধ্যে একটি পাতা এতটাই পাতলা যে, সেটি বন্ধ রাখলেও উট তার চারপাশ স্পষ্ট দেখতে পায়।
৪. রেজর ব্লেড গলিয়ে দেওয়ার মতো পাকস্থলীর অ্যাসিড

মানুষের পাকস্থলীতে খাদ্য পরিপাক বা হজম করার জন্য যে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) থাকে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। রসায়নের স্কেলে এর পিএইচ (pH) মাত্রা সাধারণত ১ থেকে ২ এর মধ্যে হয়ে থাকে। জীববিজ্ঞানীদের মতে, এই অ্যাসিডের তীব্রতা এতটাই বেশি যে এটি একটি আস্ত স্টিলের রেজর ব্লেডকেও পুরোপুরি গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে!
৫. মহাকাশে পানি ফোটানোর অদ্ভুত দৃশ্য

সাধারণত পৃথিবীতে যখন আমরা পানি ফুটাই, তখন বাষ্পীভূত হয়ে পানির ফোঁটাগুলো ছোট ছোট বুদবুদ আকারে অনবরত উপরে উঠে আসে। কিন্তু শূন্য মহাকর্ষ বা গ্র্যাভিটিহীন মহাকাশে কেউ পানি ফোটাতে গেলে এমনটা একদমই হবে না। সেখানে উত্তপ্ত পানি ছোট ছোট বুদবুদ হওয়ার পরিবর্তে সবগুলো মিলে একটি মাত্র দানবাকৃতির বা বিশাল ফোঁটায় রূপান্তরিত হবে।
৬. রাতের ঘুম এবং স্বপ্নের গোলকধাঁধা

এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন যিনি রাতে ঘুমানোর পর মাত্র একটি স্বপ্ন দেখেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন সুস্থ মানুষ প্রতি রাতে ঘুমের মধ্যে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭টি স্বপ্ন দেখেন। এমনকি কারো কারো ক্ষেত্রে স্বপ্নের এই সংখ্যাটি এক ডজনও (১২টি) ছাড়িয়ে যায়! তবে ঘুম থেকে ওঠার পর মানুষ তার দেখা স্বপ্নের প্রায় ৯০ শতাংশই ভুলে যায়।
৭. বরফের ক্রিস্টাল বের হওয়া আগ্নেয়গিরি: মাউন্ট ইরেবাস

আগ্নেয়গিরি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ফুটন্ত লাল লাভা। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম সচল ও রহস্যময় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ইরেবাস (Mount Erebus)। এই আগ্নেয়গিরিটি অনন্য কারণ এর লাভা হ্রদের উত্তপ্ত গ্যাসের সাথে তীব্র শীতের সংস্পর্শে আসার ফলে এটি থেকে লাভার পাশাপাশি অনবরত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের ক্রিস্টাল বা খণ্ড নির্গত হয়।
৮. ৫ লক্ষ ভূমিকম্পের বার্ষিক পরিসংখ্যান

আমাদের এই শান্ত পৃথিবীর মাটির নিচে টেকটোনিক প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত নড়াচড়া করছে। যার ফলে পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৫,০০,০০০ (৫ লক্ষ) বার ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। তবে আশার কথা হলো, এর মধ্যে আমরা সাধারণ মানুষ মাত্র ১,০০,০০০ (১ লক্ষ) টি টের পেয়ে থাকি এবং এর মধ্যে গড়ে মাত্র ১০০টি ভূমিকম্প পৃথিবীর বুকে বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
বিজ্ঞান এবং প্রকৃতির এই রহস্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিখিল বিশ্ব কতটা নিখুঁত নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে। আপনি যত বেশি জানবেন, প্রকৃতির প্রতি আপনার বিস্ময় ততটাই বেড়ে যাবে।
বিজ্ঞান, মহাবিশ্বের রহস্য, সমসাময়িক প্রযুক্তি এবং শিক্ষণীয় তথ্যের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।
আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই ৮টি রোমাঞ্চকর তথ্যের মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস্য বা আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
ফ্যাক্ট-চেক ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬
আমাদের চিরচেনা এই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আমরা অনেকেই পুরোপুরি জানি না। রাজনীতি, কূটনীতি, ফ্যাশন কিংবা প্রকৃতির অপার বিস্ময়—সবখানেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। নিচে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের সম্পর্কে এমন কিছু অসাধারণ তথ্য তুলে ধরা হলো, যার কিছু হয়তো আপনার জানা, আর কিছু তথ্য আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:
১. সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসেছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। চীন ও ভারতের পরই বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈশ্বিক রফতানিতেও অবদান রাখছে।
২. বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল এবং জাপানের চিরকৃতজ্ঞতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে (টোকিও ট্রায়াল) একমাত্র বাঙালি তথা এশীয় বিচারপতি ছিলেন রাধাবিনোদ পাল। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একপাক্ষিকভাবে কেবল জাপানিদের যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাঁর এই অকুতোভয় ও সুবিচারের রায়ের কারণে জাপান এক বিরাট ক্ষতিপূরণের বোঝা ও গ্লানি থেকে মুক্তি পায়। এই ঐতিহাসিক উপকারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জাপান চিরকাল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে।
৩. বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর: বঙ্গোপসাগর

আমাদের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম উপসাগর। এর বিস্তৃতি এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৪. আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন: বিবি রাসেল

জর্জিও আরমানি বা পিয়েরে কারডিনের মতো বিশ্ববিখ্যাত ডিজাইনারদের পাশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। ইউরোপের র্যাম্প মডেলিং কাঁপানোর পর তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এবং খাদি কাপড়কে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।
৫. দৈনিক পত্রিকার বিশাল সমাহার

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ২,৮০০-এরও বেশি, যা দেশের মানুষের তথ্যের প্রতি আগ্রহ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এক অনন্য নজির।
৬. নদীর দেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদী। ছোট-বড়, শাখা ও উপনদী মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭,০০০টি নদী রয়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে সত্যি বিরল।
একটু সংশোধন: মালয়েশিয়ার রাজনীতি ও বাঙালি সংযোগের সঠিক ইতিহাস
ইন্টারনেটে মালয়েশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়ে কিছু ভুল তথ্য বা ‘মিথ’ প্রচলিত আছে, যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সংশোধন করে নেওয়া উচিত:
- ডা. মাহাথির মোহাম্মদ: মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নের রূপকার মাহাথির বিন মোহাম্মদের দাদা (পিতার দিক থেকে) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলিম (কেরালা থেকে আগত), যিনি একজন মালয় নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাই তিনি মূলত মালয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত, বাংলাদেশি নন।
- খায়ের জামালউদ্দিন চৌধুরী: মালয়েশিয়ার সাবেক যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খায়ের জামালউদ্দিনের জন্ম কুয়েতে হলেও তাঁর পৈতৃক পরিবার মালয়েশিয়ারই নাগরিক। তাঁর নামের শেষে ‘চৌধুরী’ পদবিটি যুক্ত থাকার কারণে ইন্টারনেটে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি বাংলাদেশি, যা আসলে সঠিক নয়।
- চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হলেও, এটি একমাত্র “প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর” নয়। পৃথিবীর আরও অনেক বিখ্যাত বন্দর (যেমন- সিডনি হারবার বা নিউইয়র্ক হারবার) প্রাকৃতিক বন্দর হিসেবে স্বীকৃত। তবে এটি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
বাঙালিদের মেধা, সততা এবং এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমসাময়িক ইতিহাস এবং ক্যারিয়ারের সব গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।
আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই তথ্যগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক বা নতুন মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ইতিহাসের পাতা থেকে | বিশেষ ফিচার
ডেস্ক রিপোর্ট, পালস বাংলাদেশ
সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬
ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে বাঙালি এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবদান চিরকাল বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে একজন অকুতোভয় নারীর বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ—সবখানেই জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব ইতিহাস।
হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক নারী স্নাইপার

“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”
১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে এই বজ্রকণ্ঠের ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

ক) নার্স নয়, স্নাইপার হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ২,০০০ নারীকে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাদের মধ্যে লুডমিলা ছিলেন সবচেয়ে সেরা। শুরুর দিকে সেনাবাহিনীতে তাঁকে নার্স হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং একটি কঠিন অডিশন বা ট্রায়ালের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের নিখুঁত নিশানাভেদের দক্ষতা প্রমাণ করেন।
খ) মাত্র এক বছরে ৩০৯টি “কনফার্মд কিল”
স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর ওডেসায় লড়াইকালীন প্রথম ৭৫ দিনের মধ্যেই লুডমিলা ১৮৭ জন শত্রুকে পরাস্ত করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নিশ্চিত হত্যার (Confirmed Kills) সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯ জনে, যার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন খোদ জার্মানদের তুখোড় স্নাইপার!
সামরিক পরিভাষায় “কনফার্মড কিল” কী?
যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার কাউকে গুলি করলেই সেটি রেকর্ডে যোগ হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড তখনই “কনফার্মড” বা নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা কোনো সামরিক অফিসার সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রমাণ দেন। ফলে, সাক্ষী ছাড়া লুডমিলা আসলে আরও কত নাৎসি সেনা খতম করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩০৯ এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
গ) হিটলারের বাহিনীর ভয় এবং চকোলেটের লোভনীয় প্রস্তাব
লুডমিলার নিখুঁত নিশানার কারণে জার্মান নাৎসি বাহিনীর কাছে তিনি এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। জার্মানরা তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান রেডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে বিলাসবহুল ঘর-সংসার, উচ্চপদস্থ সামরিক পদ এবং প্রচুর পরিমাণে চকোলেটের অফার দিতে শুরু করে।
এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাব যখন লুডমিলা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ক্ষিপ্ত জার্মানরা রেডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তাকে বন্দি করতে পারলে “৩০৯ টুকরো” করা হবে। এই হুমকি শুনে লুডমিলা পরে হেসে বলেছিলেন, “বাহ! এমনকি ওরাও তাহলে আমার নিখুঁত স্কোরটা ভালোভাবে জানত!”
ঘ) হোয়াইট হাউসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক
যুদ্ধের একপর্যায়ে আহত হওয়ার পর লুডমিলাকে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠানো হয়। তিনি ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও ফার্স্ট লেডি এলিয়েনর রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক অবদান
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণ তৈরি হয়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি, সাহসী কূটনীতিবিদ এবং অকুতোভয় সাংবাদিকদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী।
১. ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী: সর্বাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বহুমুখী। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন:
- আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৌড়ঝাঁপ: ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার পর, ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করান। মে মাসে বেলগ্রেডের বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর বাণীতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানালে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
- ম্যারাথন বিশ্ব সফর: ২৪ অক্টোবর থেকে তিনি ১৯ দিনের এক ম্যারাথন বিশ্ব সফরে বের হন এবং ব্রাসেলস, ভিয়েনা, ব্রিটেন, আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে ১২৫ মিনিটের বৈঠক), ফ্রান্স ও জার্মানিতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
- সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য তিনি আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
- জে এফ আর জ্যাকব (লে. জেনারেল): একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ জোগান দেওয়া এবং যৌথ সংস্কৃতির নকশা তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পেছনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিল।
২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া): আন্তর্জাতিক ভেটো ও ভূরাজনৈতিক ঢাল

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল:
- জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভেটো: বাংলাদেশের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জাতিসংঘের security council বা নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই প্রস্তাবে পরপর ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান করে মার্কিন-চীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। রাশিয়া এই ভেটো না দিলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন বিলম্বিত বা নেতিবাচক খাতে মোড় নিতে পারত।
- মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর প্রতিহত: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সক্রিয় নৌ-উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই থমকে যেতে হয়েছিল।
- পুনর্গঠনে রুশ অবদান: যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।
৩. আমেরিকা: সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন নাগরিকদের অকৃত্রিম সমর্থন

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রিহার্ড নিক্সনের রিপাবলিকান সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ জনগণ, সিনেটর, কবি ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন:
- সিনেটর এডওয়ার্ড ‘টেড’ কেনেডি: মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো স্বচক্ষে পরিদর্শন করে মার্কিন সিনেটে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে এক ঐতিহাসিক রিপোর্ট জমা দেন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিবরণ ছিল।
- কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে ভারতের সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর এবং বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এই চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা খাঁ, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটনদের সুরের মূর্ছনায় unarmed বাঙালিদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় এবং জর্জ হ্যারিসনের বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বকে নাড়া দেয়।
- অ্যালেন গিন্সবার্গ: এই মার্কিন কবি বাংলাদেশের শরণার্থীদের হাহাকার নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যা পড়ে বিশ্বজুড়ে অজস্র মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল।
৪. যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কলমযোদ্ধারা

লন্ডন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবদান ছিল অনন্য:
- অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পাকিস্তানি সাংবাদিক একাত্তরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশ থেকে পালিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৩ জুন তা প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম পাকিস্তানের আসল বর্বরতার কথা জানতে পারে।
- সায়মন ড্রিং: ডেইলি টেলিগ্রাফের এই তরুণ সাংবাদিক ২৫ মার্চের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থেকে ঢাকার বুকে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন। ব্যাংকক থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
- সিডনি শ্যানберг: নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিকও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড সশরীরে দেখেন এবং যুদ্ধজুড়ে তাঁর পাঠানো অসংখ্য শরণার্থী-ভিত্তিক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বীরত্ব এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মহান বন্ধুদের অকৃত্রিম সহায়তাই আজ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমসাময়িক কূটনীতি এবং জাতীয় খবরের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।



