বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নেতা, যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতার অগ্রদূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর জীবন এবং সংগ্রাম, আজও ভারতীয় ইতিহাস এবং বিশ্ব ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তবে, সুভাষ চন্দ্র বসু সম্পর্কে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা রয়েছে, যা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সুভাষ চন্দ্র বসু: জাতির নেতা
সুভাষ চন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৯০১ সালের ২৩ জানুয়ারি উড়িষ্যার কটক শহরে। তিনি ছিলেন এক দ্রুত বুদ্ধিসম্পন্ন এবং সাহসী ছাত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর সুভাষ চন্দ্র বসু আইসিএস (Indian Civil Services) পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তবে, তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-এর অংশ হিসেবে আইসিএস পদটি বর্জন করেন, কারণ তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ভারতীয় জনগণের জন্য ব্রিটিশ শাসন অসহনীয় এবং ভারতের স্বাধীনতা প্রয়োজন।
সুভাষ চন্দ্র বসুর রাজনৈতিক যাত্রা
সুভাষ চন্দ্র বসুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে। প্রথমদিকে, তিনি মোহনদাস কুমার গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের কর্মসূচি অনুসরণ করছিলেন। তবে, তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সত্ত্বেও, বসু খুব দ্রুত কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত হন।
তবে, সুভাষ চন্দ্র বসুের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য আরও অগ্রসর ও সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি মনে করতেন যে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ পর্যাপ্ত নয় এবং ব্রিটিশ শাসনকে উচ্ছেদ করতে হলে সশস্ত্র সংগ্রাম প্রয়োজন।
ازادی کی جنگ: Subhas Chandra Bose and Indian National Army (INA)
১৯৪০ সালে সুভাষ চন্দ্র বসু আইন ও তারিখ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতীয় জাতীয় সেনা (INA) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জাপানের সাহায্য নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করেন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (INA) এর নেতৃত্বে, সুভাষ চন্দ্র বসু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক নতুন দিক উন্মোচন করেন।
তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে মোকাবেলা করার জন্য জাপান, জার্মানি এবং ইতালি এর সঙ্গে অলিভিটি তৈরি করেন। তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য “Give me blood, and I will give you freedom” (আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব) স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তাঁর INA (Indian National Army) ছিল এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ, যা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তির সংগ্রামকে প্রেরণা দিয়েছে।
সুভাষ চন্দ্র বসু এবং ব্রিটিশদের প্রতিক্রিয়া
ব্রিটিশ শাসন সুভাষ চন্দ্র বসুকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতা থেকে জার্মানি চলে যান, যেখানে তিনি জার্মান সরকার থেকে সমর্থন লাভ করেন। পরবর্তীতে, তিনি জাপানে গিয়ে ভারতীয় জাতীয় সেনা গঠনের জন্য কাজ শুরু করেন। সুভাষ চন্দ্র বসুর INA (Indian National Army) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী বিদ্রোহগুলোর চেয়ে বড় বিপ্লবী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয়।
তাশখন্দ চুক্তি এবং সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবন
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন জাপান ও জার্মানির বিপর্যয় শুরু হয়, সুভাষ চন্দ্র বসুর INA প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তাছাড়া, INA পরাজয়ের পর, তাশখন্দ চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়, যা ভারতীয় সংগ্রামীদের হাল ছাড়ানোর মতো একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
তবে, সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবন অসমাপ্ত ছিল, এবং ১৯৪৫ সালে তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সুভাষ চন্দ্র বসু রহস্যজনকভাবে মারা যান, এবং আজও তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
সুভাষ চন্দ্র বসু এবং তার অবদান
সুভাষ চন্দ্র বসুর অবদান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনস্বীকার্য। তাঁর INA, ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, এবং সশস্ত্র সংগ্রাম ভারতীয় মুক্তির আন্দোলনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম, ভারতীয় জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, এবং জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সূত্র:
- Wikipedia: Subhas Chandra Bose
- India’s Struggle for Independence by Subhas Chandra Bose
- Subhas Chandra Bose and the INA: A Comprehensive Study, by R.C. Majumdar
- Indian National Army and Subhas Chandra Bose, The Daily Star Archives
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম স্পিকার হলেন শাহ্ আব্দুল হামিদ। তিনি ১০ এপ্রিল ১৯৭২ থেকে ১ মে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তদানীন্তন গণপরিষদের (যা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ হিসেবে রূপান্তরিত হয়) প্রথম স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অনেকেই মোহাম্মদ উল্লাহকে প্রথম স্পিকার মনে করে ভুল করেন। তবে মূলত শাহ্ আব্দুল হামিদের আকস্মিক মৃত্যুর পর মোহাম্মদ উল্লাহ বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে দ্বিতীয় স্পিকার (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম স্পিকার) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
শাহ্ আব্দুল হামিদ বনাম মোহাম্মদ উল্লাহ: দায়িত্বের সময়কাল
শাহ্ আব্দুল হামিদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম গণপরিষদের স্পিকার এবং মোহাম্মদউল্লাহ ছিলেন দেশের ৩য় রাষ্ট্রপতি। নিচে তাঁদের দায়িত্বকাল ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
শাহ্ আব্দুল হামিদ
তিনি ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের গণপরিষদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
- দায়িত্বের সময়কাল: ১০ এপ্রিল ১৯৭২ – ১ মে ১৯৭২
- অন্যান্য পরিচয়: তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গঠিত প্রথম সংসদের স্পিকার ছিলেন এবং ১৯৭২ সালের ১ মে মৃত্যুবরণ করেন।
মোহাম্মদউল্লাহ
তিনি প্রথমে বাংলাদেশের প্রথম সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং পরে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতির সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।
- স্পিকার হিসেবে দায়িত্বকাল: ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ (শাহ আব্দুল হামিদের মৃত্যুর পর তিনি স্পিকার হন)।
- রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বকাল: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ – ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫
শাহ্ আব্দুল হামিদ সম্পর্কে আরও জানতে এবং মোহাম্মদউল্লাহর বিস্তারিত রাজনৈতিক কর্মজীবন পড়তে উইকিপিডিয়ার তথ্যগুলো দেখতে পারেন।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম স্পিকার শাহ্ আব্দুল হামিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী

শাহ্ আব্দুল হামিদ (১৯০০ – ১ মে ১৯৭২) ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনোত্তর গণপরিষদের (জাতীয় সংসদ) প্রথম স্পিকার. তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, সমাজসেবক, দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন.
নিচে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
- জন্ম: শাহ্ আব্দুল হামিদ ১৯০০ সালে তৎকালীন রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমার গোবিন্দগঞ্জের খালশী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন. তাঁর পিতা ছিলেন হাজী আবদুল গফুর শাহ এবং মাতা রহিমা খাতুন.
- শিক্ষা: তিনি ১৯১৬ সালে গোবিন্দগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯১৮ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন. এরপর ১৯২০ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি এবং ১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল (আইন) ডিগ্রি লাভ করেন.
- পেশা: ১৯২৮ সালে তিনি গাইবান্ধা মহকুমা আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন.
রাজনৈতিক জীবন
- শুরুর দিক: ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়.
- মুসলিম লীগ: ১৯৩৬ সালে তিনি সর্বভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং গাইবান্ধা মহকুমা শাখার সভাপতি হন. ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন.
- আওয়ামী লীগ: ১৯৫৬ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন. তিনি ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন.
- ১৯৭০-এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে গোবিন্দগঞ্জ-পলাশবাড়ী আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন. ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন.
প্রথম স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে. সেই ঐতিহাসিক অধিবেশনে শাহ্ আব্দুল হামিদ সর্বসম্মতিক্রমে গণপরিষদের প্রথম স্পিকার নির্বাচিত হন. পরের দিন (১১ এপ্রিল) তাঁর সভাপতিত্বেই বাংলাদেশের ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠিত হয়.
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদান
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক উন্নয়নে নিবেদিত ছিলেন. ১৯৪৭ সালে গাইবান্ধা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং কলেজ পরিচালনা কমিটির প্রথম সম্পাদক হন. এছাড়া তিনি গাইবান্ধা টাউন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, গাইবান্ধা নাট্য সংস্থার পরিচালনা পর্ষদ এবং পাবলিক লাইব্রেরির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন.
জীবনাবসান ও সম্মাননা
স্পিকার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের মাত্র ২০ দিনের মাথায়, ১৯৭২ সালের ১ মে গাইবান্ধায় এই মহান দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ মৃত্যুবরণ করেন. তাঁর অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে গাইবান্ধার স্থানীয় স্টেডিয়ামটির নাম “শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম” রাখা হয়েছে.

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ: এসইও এবং টেকনিক্যাল কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমি দেখেছি, বিভিন্ন সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে এই তথ্যটি নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়। যেহেতু ১৯৭১ সালের পর প্রথম পরিষদটিকে ‘গণপরিষদ’ বলা হতো, তাই টেকনিক্যাল বিচারে শাহ্ আব্দুল হামিদই প্রথম স্পিকার। আর ১৯৭৩ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত সংসদের স্পিকার ছিলেন মোহাম্মদ উল্লাহ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে দলের হয়ে ভোটের প্রচারে গিয়ে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন—গত কয়েক ঘণ্টা ধরে এই নির্মম খবরটি বিশ্বজুড়ে সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে ভাবছি, যে জাপানকে সারা বিশ্ব চেনে এক পরম শান্তিময়, সুশৃঙ্খল ও অহিংসার প্রতীক হিসেবে, সেই বুকে এমন একটি পৈশাচিক ঘটনা ঘটতে পারে, তা হয়তো খোদ জাপানিরাও কোনোদিন কল্পনা করেনি।
শিনজো আবে ছিলেন আধুনিক জাপানের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী। তিনি শুধু জাপানের অর্থনীতিকে শক্তিশালী (Abenomics) করেননি, বরং জাপানকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যগত কারণে ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি রাজনীতিতে সমান সক্রিয় ছিলেন। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে তাঁর এই চলে যাওয়া কেবল একজন বৈশ্বিক নেতার বিদায় নয়, এটি আমাদের এক অকৃত্রিম ও দুর্দিনের পরম বন্ধুকে হারানোর গভীর শোক।
১. পদ্মা সেতু বিতর্ক ও মেট্রোরেলে শিনজো আবের ঐতিহাসিক সংহতি

বাংলাদেশের প্রতিটি বড় মেগা প্রকল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে শিনজো আবে সরকারের অবদান। যখন বিশ্বব্যাংক রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ তৈরি করে আমাদের অহংকার ২০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নিল এবং ম্যানিলা কনফারেন্সে অন্য সব দাতা সংস্থাকে আকারে-ইঙ্গিতে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রজেক্ট থেকেও সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাল—তখন অন্যেরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও জাপান সরে যায়নি।
উল্টো শিনজো আবের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সাহসী সিদ্ধান্তেই জাইকা (JICA) বাংলাদেশের ইতিহাসে একক বৃহত্তম অর্থায়নে ২২ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল (MRT Line-6) প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে আসে। এটি ছিল পদ্মা সেতুর চেয়েও ২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
২. হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি ও জাপানি সততার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে ন্যাক্কারজনক জঙ্গি হামলায় ৭ জন জাপানি নাগরিক নিহত হন, যাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন মেট্রোরেল প্রকল্পের শীর্ষ পরামর্শক ও প্রকৌশলী। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলের প্রচণ্ড চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রতি ঐতিহাসিক সমর্থন থেকে এক চুলও নড়েননি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।
হামলার প্রভাব পড়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্বিতীয় মেঘনা-গোমতী সেতু প্রজেক্টেও। নিরাপত্তার কারণে জাপানি ৩টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬ মাস কাজ বন্ধ রেখেছিল এবং পরে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিল। কিন্তু জাপানিদের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও সততা এতই প্রবাদপ্রতিম যে, তারা বর্ধিত ৬ মাস তো দূরে থাক, মূল চুক্তির মেয়াদেরও ১ মাস আগেই কাজ শেষ করে রেকর্ড গড়ে। শুধু তাই নয়, তিন সেতুর মোট বাজেট থেকে বেঁচে যাওয়া ৭৩৮ কোটি টাকা সততার সাথে বাংলাদেশ সরকারকে ফেরত দেয়, যা বর্তমান বৈশ্বিক কর্পোরেট সংস্কৃতিতে এক বিরলতম নজির।
৩. টোকিও থেকে হিরোশিমা: জাপানি আতিথেয়তার কিছু মধুর স্মৃতি

জাপানের সাথে আমার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু মধুর স্মৃতি আজ বারবার মনের কোণে ভেসে উঠছে। এক যুগ আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ১৫ দিনের এক সফর আমাকে সম্পূর্ণ এক নতুন জাপানের সন্ধান দিয়েছিল:
- নাম না জানা সেই জাপানি নারী: একবার টোকিও স্টেশনের কাছে হাতে ম্যাপ নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে একটা ঠিকানা খুঁজছিলাম। ভাষা জটিলতায় কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। হঠাৎ এক মধ্যবয়সী জাপানি নারী এসে আমাদের গন্তব্য জেনে নিজে হেঁটে পথ দেখিয়ে দিলেন। এরপর নিজের জরুরি কাজের কথা বলে প্রায় দৌড়ে চলে গেলেন।
- বুলেট ট্রেনে পাসপোর্ট ফিরে পাওয়া: দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনে হিরোশিমা যাওয়ার পথে আমাদের দলের এক সহকর্মী তাঁর পাসপোর্ট ভুল করে সিটেই ফেলে এসেছিলেন। আমাদের গাইড হাসিমুখে বললেন, “চিন্তা করো না।” সত্যিই, ট্রেন থেকে নামার ঠিক আধঘণ্টার মধ্যে অক্ষত অবস্থায় পাসপোর্ট আমাদের হাতে চলে আসে।
- হাসিমুখের সমাজ: ফরেন প্রেস সেন্টারের দারোয়ান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর ওয়েটার—সবার মুখে রোজ সকালে মাথা নুইয়ে এক চিলতে অমায়িক হাসি। মনে প্রশ্ন জাগত, মানুষ এত ভালো হয় কী করে?
কেন জাপানিরা এত অনন্য? শৈশবের সামাজিক শিক্ষা ম্যাট্রিক্স

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে জাপান যে আজ বিশ্বের অন্যতম মানবিক রাষ্ট্র, তার মূল ভিত্তি তৈরি হয় তাদের কিন্ডারগার্টেন ও প্রাইমারি স্কুল লেভেল থেকে।
সারসংক্ষেপ: বিদায় বন্ধু, বিদায় আবে
যে দেশ শিশুদের মনে শৈশব থেকে শান্তি, শৃঙ্খলা আর ভালোবাসার বীজ বুনে দেয়, সেই শান্তিকামী জাপানের মাটিতে শিনজো আবের মতো একজন মহানায়কের বুলেটের আঘাতে প্রস্থান অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। বাংলাদেশ তার অবকাঠামো, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ দাতা দেশকে এই বিপদের দিনে গভীর সমবেদনা জানায়। জাপান নিশ্চয়ই এই রাজনৈতিক সংকট ও শোক কাটিয়ে আবার শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।
প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed
শিনজো আবে হত্যাকাণ্ড, জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক, জাইকা মেগা প্রজেক্ট, মেট্রোরেলের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক মানবিক অনুভূতির এমন গভীর ও এসইও ফ্রেন্ডলি কন্টেন্ট নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট (২২শে শ্রাবণ) বিশ্বকবির প্রয়াণের পর কলকাতার জোড়াসাঁকো থেকে নিমতলা ঘাট পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মূলত উন্মত্ত জনতার জোড়াসাঁকোর গেট ভেঙে ভেতরে ঢোকা, শেষ স্নানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা, কবির চুল ও দাড়ি টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা এবং শ্মশানে অর্ধদগ্ধ চিতাভস্ম নিয়ে কাড়াকাড়ির কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শবযাত্রা ও অন্তিম সৎকার বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আত্মগ্লানির অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী এ কারণেই ২২শে শ্রাবণকে কেবল জাতীয় শোকের দিন নয়, বরং ‘জাতীয় গ্লানির দিন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে এই বিতর্কের পেছনে অতি-আবেগ ও কিছু যৌক্তিক বাস্তবতার মেলবন্ধন ছিল, যা ইতিহাসের পাতা ওল্টালে স্পষ্ট হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শবযাত্রা ও অন্তিম সৎকার বিতর্কিত হওয়ার মূল কারণ

সেদিন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে বিশ্বকবিকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক উগ্র ও নির্লজ্জ আচরণ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণী থেকে তৎকালীন ৫টি বড় আপত্তির কথা জানা যায়:

- ব্যক্তিগত মুহূর্ত ক্ষুণ্ন হওয়া: কবির শেষ স্নানের নিভৃত পারিবারিক সময়কেও উন্মত্ত জনতা গোপন থাকতে দেয়নি, তারা মেইন গেট ভেঙে ছাদে উঠে পড়ে।
- চুল-দাড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা: কবিকে শেষ স্পর্শ করার হুজুগে অনেকে তাঁর চুল ও দাড়ি টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করে, যা ঠেকাতে নন্দলাল বসুকে লাঠি হাতে পাহারায় বসতে হয়েছিল।
- চিতাভস্ম নিয়ে হুড়োহুড়ি: নিমতলা শ্মশানে কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা সুরক্ষাবেষ্টনী না থাকায় কবি সম্পূর্ণ দাহ হওয়ার আগেই একদল মানুষ চিতাভস্ম ও অস্থি সংগ্রহের জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে।
- পুত্র রথীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি: পিতার অন্তিম সৎকারে পুত্র রথীন্দ্রনাথ মুখাগ্নি না করে কেন ভ্রাতুষ্পুত্র সৌরিন্দ্রনাথ করলেন—তা নিয়ে পরিবার ও সমাজ মহলে গভীর বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
- ব্রাহ্ম মতের অবহেলা: বিশ্বকবি আদি ব্রাহ্মমতের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শেষকৃত্য কেন সনাতন হিন্দু মতে করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
উল্টো-পুরাণ: সজনীকান্ত দাসের প্রত্যক্ষ বিবরণ ও যৌক্তিক প্রতিরক্ষা

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সজনীকান্ত দাস একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, তীব্র সমালোচক এবং ‘শনিবারের চিঠি’-র সম্পাদক হিসেবে সুপরিচিত। ‘উল্টো-পুরাণ’ তাঁর স্বকীয় চিন্তাধারার এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে তিনি সনাতন হিন্দু পৌরাণিক আখ্যান ও চরিত্রগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন, যৌক্তিক এবং বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
সজনীকান্ত দাসের ‘উল্টো-পুরাণ’-এর মূল ভাবনা ও তার যৌক্তিক প্রতিরক্ষা নিচে কয়েকটি স্পষ্ট ও সুসংগঠিত ধাপে তুলে ধরা হলো:
১. ‘উল্টো-পুরাণ’-এর মূল দর্শন ও উদ্দেশ্য
- পরম্পরা ভাঙার সাহস: প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনীতে দেবতাদের যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়, সজনীকান্ত তার ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছেন। তিনি দেবতাদের মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি, অহংকার এবং দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছেন।
- মানবিকরণ: পৌরাণিক চরিত্রগুলোকে অলৌকিক সত্তা না ভেবে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
- সমাজ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: রূপকের আড়ালে তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার ভন্ডামি, নৈতিক স্খলন এবং ক্ষমতার রাজনীতির সমালোচনা করেছেন।
২. যৌক্তিক প্রতিরক্ষা (Rational Defense)
সজনীকান্তের এই পুরাণ-বিরোধিতা নিছক খেয়ামাত্র ছিল না, এর পেছনে ছিল সুদৃঢ় যৌক্তিক ভিত্তি:
- অন্ধবিশ্বাসের অবসান: পৌরাণিক দেব-দেবীদের অন্ধভাবে পূজার বদলে তাদের যুক্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, দেবতারাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন।
- সাহিত্যিক যুক্তি: সাহিত্যে প্রথাগত বা গতানুগতিক ধারাকে ভেঙে নতুনত্ব ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। সজনীকান্ত বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি যুক্তি ও বিশ্লেষণের আলোয় বিকশিত হয়।
- সমাজ সংস্কার: দেবতাদের নৈতিক দুর্বলতাগুলো তুলে ধরে তিনি পরোক্ষভাবে তৎকালীন সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা, অন্যায় এবং অন্ধ অনুশাসনের যৌক্তিক বিরোধিতা করেছেন।
৩. দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্ক

সজনীকান্ত দাসের এই দৃষ্টিভঙ্গি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। রক্ষণশীলরা একে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির অবমাননা হিসেবে দেখলেও, মুক্তচিন্তক ও বুদ্ধিজীবীরা এটিকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে সাধুবাদ জানান।
তাঁর এই সাহিত্যিক প্রয়াস ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিস্তারিত বিবরণ ও প্রমাণসমূহ জানার জন্য আপনি Marxsbadi Sahitya-bitarka বা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন। এছাড়া, বাংলা সাহিত্যের গদ্যরীতির ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে Bangla Gadyaritir Itihas সহায়ক হতে পারে।
১. রথীন্দ্রনাথের মুখাগ্নি না করার আসল কারণ

‘উল্টো-পুরাণ’ বা ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখাগ্নি করতে না পারার মূল কারণ ছিল নিমতলা শ্মশানে জনজোয়ারের কারণে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও তাঁর আকস্মিক অসুস্থতা। প্রচণ্ড ভিড়ে দমবন্ধ অবস্থায় রথীন্দ্রনাথ অচৈতন্য হয়ে পড়লে, সে সময় সুবীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিগুরুর মুখাগ্নি সম্পন্ন করেন। এই ঘটনা কোনো পারিবারিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না, বরং অনিয়ন্ত্রিত আবেগ ও চরম অব্যবস্থাপনার ফল। ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ জানতে পড়ুন Prohor।
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পুলিশের তাগাদা
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পুলিশের তাগাদা” অধ্যায় বা প্রসঙ্গটি মূলত কবি ও সমালোচক সজনীকান্ত দাসের বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘আত্মস্মৃতি’-র একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯archive৪৫) উত্তাল দিনগুলোতে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রকাশনা জগতের যে সংকট তৈরি হয়েছিল, এটি তারই এক প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক দলিল।
সজনীকান্ত দাসের বিবরণী থেকে এই প্রসঙ্গের মূল বিষয় ও যৌক্তিক প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ‘শনিবারের চিঠি’ ও যুদ্ধকালীন সংকট [1]
- কাগজের তীব্র আকাল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ব্রিটিশ ভারতে কাগজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ (Paper Control Order) জারি করা হয়। এর ফলে সজনীকান্ত দাসের আজীবন সাধনার শনিবারের চিঠি পত্রিকার প্রকাশনা চরম সংকটের মুখে পড়ে।
- আর্থিক বিপর্যয়: যুদ্ধের বাজারে মুদ্রণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্ল্যাক-মার্কেট বা কালোবাজারির কারণে সজনীকান্তকে প্রতিনিয়ত প্রেস ও কাগজের জোগান বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হতো। [
২. পুলিশের তাগাদা ও রাজনৈতিক নজরদারি
- সেন্সরশিপের কড়াকড়ি: বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বিরোধী কোনো লেখা বা জনমনে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে—এমন কোনো উপাদান ছাপা হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করতে তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগ ও লালবাজারের পুলিশ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল।
- সরকারি পরোয়ানা ও নোটিশ: সজনীকান্ত দাস তাঁর নির্ভীক ও ব্যঙ্গাত্মক লেখার জন্য পরিচিত ছিলেন। ফলে, সরকারি নিয়ম অমান্য করে অতিরিক্ত কাগজ ব্যবহার বা যুদ্ধ-নীতি বিরোধী কোনো ছদ্মনামীয় লেখা প্রকাশের সন্দেহে প্রায়শই তাঁর প্রেসে ও বাড়িতে পুলিশের “তাগাদা” বা নোটিশ আসত।
- নথিপত্র দাখিলের চাপ: প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কতটুকু কাগজ ব্যবহৃত হচ্ছে, গ্রাহক সংখ্যা কত এবং কী ছাপা হচ্ছে—তার নিখুঁত হিসাব পুলিশের প্রেস শাখায় জমা দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত তাগিদ দেওয়া হতো।
৩. সজনীকান্তের যৌক্তিক প্রতিরক্ষা ও কৌশল
- আইনি কূটকৌশল: সজনীকান্ত দাস কেবল একজন সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি আইনের মারপ্যাঁচও ভালো বুঝতেন। পুলিশের এই হয়রানি ও তাগাদাকে তিনি আইনি পথেই মোকাবিলা করতেন এবং প্রমাণ করতেন যে তাঁর পত্রিকা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে লিপ্ত নয়।
- রসাত্মক প্রতিরোধ: পুলিশের এই শ্বাসরুদ্ধকর তাগিদ এবং যুদ্ধকালীন ভয়ভীতিকে তিনি ‘শনিবারের চিঠি’-র পাতায় তীব্র ব্যঙ্গ ও রসাত্মক কবিতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতেন, যা তৎকালীন পাঠকসমাজে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন কলকাতার সেই অস্থির সময় এবং বুদ্ধিজীবীদের ওপর পুলিশের দমনপীড়ন সম্পর্কে আরও গভীর ও সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্ক বুঝতে আপনি Marxsbadi Sahitya-bitarka আকর গ্রন্থটি দেখতে পারেন।
৩. চুল ছেঁড়ার দাবির অসারতা
পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, চিকিৎসার সুবিধার্থে মৃত্যুর আগেই কবির চুল ও দাড়ি এতটাই ছোট করে ছেঁটে দেওয়া হয়েছিল যে, ভিড়ের মধ্যে তা হাত দিয়ে টেনে ছেঁড়ার কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না।
সারসংক্ষেপ: উগ্রতা নাকি আবেগের অতিশয্য?
আমাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ বলে, এই বিশৃঙ্খলা কোনো অসম্মান থেকে তৈরি হয়নি, বরং প্রিয় কবিকে হারানোর আকস্মিক ধাক্কা ও শেষবার দেখার তীব্র ব্যাকুলতা থেকে লক্ষাধিক মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল। ব্রাহ্ম ও বৈদিক সনাতন রীতির সৎকারের মূল মন্ত্র কাছাকাছি হওয়ায় ধর্মীয় বিতর্কটি অনেকটাই তাত্ত্বিক ছিল।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



