জাতীয়
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: হাদী উল ইসলাম
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাস: জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং এনসিপির ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং তাদের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে একটি জটিল ও শক্তিশালী দ্বন্দ্বের মধ্যে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি—এই দলগুলো প্রতিনিয়ত দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে। তবে, তাদের গতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, এবং জনপ্রিয়তার ওপর বিশ্লেষণ করতে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে।
১. আওয়ামী লীগ: স্বাধীনতা ও শাসনকালের অভিজ্ঞতা
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এই দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, বিশেষত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা হিসেবে পরিচিত।
আওয়ামী লীগের শক্তি:
- স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতীয় ঐক্য গঠনে তাদের ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর শিকড় বিস্তার করেছে।
- বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এই দলের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি।
- দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, সমাজসেবা, ও অবকাঠামো নির্মাণ-এ আওয়ামী লীগের ব্যাপক অবদান রয়েছে।
আওয়ামী লীগের দুর্বলতা:
- একদলীয় শাসন, বাক স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ, এবং বিরোধী দলের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
- জনগণের আস্থা হারানো এবং স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসেবে তাদের ইতিহাস অনেকের কাছে তর্কিত।
- আওয়ামী লীগের শাসনামলে, মাঝে মাঝে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দলের প্রতি জনগণের নিরাশা দেখা দিয়েছে।
২. বিএনপি: ক্ষমতা হারানো ও প্রত্যাবর্তনের কৌশল
বিএনপি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এর ইতিহাস ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে চলে আসে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একনায়ক শাসক হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান ঘটান এবং ক্ষমতায় আসেন।
বিএনপির শক্তি:
- জিয়াউর রহমানের শাসন জনগণের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাকে বিএনপি ও সামরিক শাসনের মহান নেতা হিসেবে মানা হয়।
- তার পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে দলের শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির নেতৃত্ব পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন।
- বিএনপি কিছু ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে প্রতিবাদী রাজনীতি চালিয়ে গেছে, যা জনগণের মধ্যে এদের সমর্থন পুনর্গঠন করেছে।
বিএনপির দুর্বলতা:
- ক্ষমতায় থেকে জনগণের মধ্যে হতাশা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ বিএনপির কপালে রয়ে গেছে।
- একাধিক গোছলহীন তীব্র আন্দোলন এবং আন্তরিকতা ও ঐক্যের অভাব তাদেরকে ভোটের মাঠে শক্তিহীন করেছে।
- জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে তারা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।
৩. জামায়াতে ইসলামী: ইতিহাসের অন্ধকারে
জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যদিও এই দলের সাথে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে জামায়াত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির অংশ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে, জামায়াত বিভিন্ন গণহত্যায় অংশ নেয়।
জামায়াতের শক্তি:
- অর্গানাইজড এবং শৃঙ্খলিত সদস্যবৃন্দ এবং তাদের নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক যেটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরিলক্ষিত হয়েছে।
- তাদের ধর্মীয় অনুশাসন এবং সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব রয়েছে, যা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে প্রচারিত হয়।
জামায়াতের দুর্বলতা:
- স্বাধীনতা বিরোধী চর্চা, গণহত্যার অভিযোগ, এবং সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের জন্ম দিয়েছে।
- দেশের শাসন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের বিরোধীতা অনেক ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করেছে।
- আন্তর্জাতিকভাবে অস্বীকৃতি এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্বব্যাপী নিন্দিত।
৪. এনসিপি: নবীন শক্তি
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশের একটি নবীন রাজনৈতিক দল, যা বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আলাদা কৌশল নিয়ে তাদের অবস্থান তৈরি করেছে। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
এনসিপির শক্তি:
- উন্নয়ন কর্মসূচি এবং দীর্ঘকালীন আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
- বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ তাদের শক্তির নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এনসিপির দুর্বলতা:
- নতুন দল হিসেবে, তাদের ভোট ব্যাংক তৈরিতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।
- প্রতিষ্ঠানগত শক্তির অভাব এবং ব্যাপক জনগণের আস্থা গড়তে তারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
উপসংহার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এবং এনসিপি সবারই গুরুত্ব রয়েছে, তবে তাদের কর্মপন্থা ও লক্ষ্য পৃথক। তবে, স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যন্ত এই দলগুলো প্রতিনিয়ত একই পথে চলতে চাইলেও তাদের মধ্যে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত দিক সামনে এসেছে।
তবে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি নতুন মোড় নিতে পারে, যেখানে এই দলগুলো এক সাথে বা পৃথকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।
সূত্র:
- বাংলাদেশ জাতীয় ইতিহাস, রাজনীতি ও দলগুলোর ভূমিকা
- ইতিহাসের পাতা, জামায়াত ও বিএনপির রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
- বাংলাদেশ টেলিভিশন, রাজনৈতিক আলোচনার পর্যালোচনা
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
ঢাকা, ১০ এপ্রিল ২০২৬: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে বাংলাদেশ এখন এক কুশলী খেলোয়াড়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া সেই কালজয়ী দর্শন—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—নীতিকে পুঁজি করে ২০২৬ সালের জটিল বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ রাষ্ট্র আসলে কে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশ সেই মানুষটির মতো, যে গ্রুপের সবার সাথেই সুসম্পর্ক রাখে। কারণ সে জানে, জীবনে কে কখন কাজে লাগবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।
১. ভারত: নাড়ির টানে বাঁধা পুরোনো বন্ধু

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সেই পুরোনো দিনের। ১৯৭১ সালের কঠিন সময়ে ভারতের অবদান এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি করেছে। সীমান্ত ইস্যু বা পানি বণ্টন নিয়ে মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য হলেও, দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কটি সবসময়ই একটি ‘স্পেশাল’ মর্যাদা পায়। ২০২৬-এর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক টান অটুট রয়েছে।

২. চীন: উন্নয়নের ‘ক্যাশ-রিচ’ পার্টনার

যখনই বড় কোনো অবকাঠামো, ব্রিজ বা টানেলের কথা আসে, তখনই বাংলাদেশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চীনের মুখ। এই বন্ধুটি বেশ হেল্পফুল এবং বড় বড় প্রজেক্টে অর্থায়নে কার্পণ্য করে না। বাংলাদেশ জানে, দেশের উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের কোনো বিকল্প নেই।
৩. জাপান: নিঃস্বার্থ ও নীরব কর্মবীর

জাপান হচ্ছে সেই বন্ধু, যে খুব বেশি কথা বলে না কিন্তু একদম কাজের মানুষ। মেট্রো রেল থেকে শুরু করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর—বাংলাদেশের রূপান্তরের পেছনে জাপানের অবদান অত্যন্ত স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন। কোনো ভূ-রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই জাপান সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র: নিয়মের কড়াকড়ি ও বড় বাজার

যুক্তরাষ্ট্র সেই বন্ধু, যে সবসময় পাশে থাকার আশ্বাস দেয় কিন্তু সাথে একগাদা ‘রুল বুক’ বা নিয়ম ধরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ওয়াশিংটন সবসময়ই একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ (BDS Analysis):
২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে নেই। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশ যেভাবে সবার সাথে ব্যালেন্স করছে, তা অসাধারণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি, চীন-জাপান থেকে বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রপ্তানি সুবিধা—সবগুলোকেই বাংলাদেশ সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সোজা কথায়, বাংলাদেশ এখন ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র এক সফল উদাহরণ।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা (Sources):
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ): বৈদেশিক নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেস রিলিজ।
- ডয়েচে ভেলে ও রয়টার্স: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিষয়ক প্রতিবেদন (এপ্রিল ২০২৬)।
- মহাসাগরীয় ও কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্র: ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান।
- বিডিএস ডিজিটাল এজেন্সি জিওপলিটিক্যাল ডাটা ব্যাংক।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
আজ ১২ মার্চ ২০২৬। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদের চলে যাওয়ার দিন। যিনি কেবল একজন মন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক বিশাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মশিউর রহমান যাদু মিয়া—যাঁর নাম শুনলে ভেসে ওঠে এক আপসহীন নেতার ছবি, যিনি রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র ছিলেন সমান তেজস্বী।

১. ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় মঞ্চে উত্থান
১৯২৪ সালে নীলফামারীর ডিমলায় জন্মগ্রহণ করা এই নেতা ছাত্রজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ—সবখানেই যাদু মিয়ার উপস্থিতি ছিল অনন্য। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর হাত ধরে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২. মজলুম জননেতার সুযোগ্য উত্তরসূরি
মওলানা ভাসানীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন যাদু মিয়া। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা থাকাকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা এবং ইয়াহিয়া খানকে ‘গাদ্দার’ বলার দুঃসাহস তাঁকে গণমানুষের নায়কে পরিণত করেছিল।
৩. ফারাক্কা লং মার্চ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তি
১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের মূল সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল যাদু মিয়ার কাঁধে। ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের হাল ধরেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুরোধে তিনি দেশ গড়ার কাজে যুক্ত হন।
৪. বিএনপি গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় ‘সিনিয়র মন্ত্রী’
যাদু মিয়া ছিলেন আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম স্থপতি। ন্যাপের কার্যক্রম স্থগিত করে প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫. এক ঐতিহাসিক প্রস্থান
১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর চিকিৎসায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনা হলেও নিয়তির অমোঘ লিখন পাল্টানো যায়নি। তাঁর মৃত্যুতে তৎকালীন সময়ে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: যাদু মিয়া ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি কেবল দল গঠন করেননি, দিয়েছেন এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দর্শন। আজকের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটেও তাঁর সেই ‘দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তি’র ঐক্যের ডাক সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন উত্তরের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ, যাঁর নামানুসারে আজও টিকে আছে ‘যাদুর চর’।
মশিউর রহমান যাদু মিয়া: এক নজরে (১৯২৪-১৯৭৯)
| পর্যায় | রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবদান |
| জন্ম | ৯ জুলাই ১৯২৪, ডিমলা, নীলফামারী। |
| আন্দোলন | তেভাগা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন। |
| উপাধি | ‘যাদু মিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত। |
| সাফল্য | পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা (১৯৬২)। |
| অবদান | ফারাক্কা লং মার্চের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান (১৯৭৬)। |
| রাষ্ট্রীয় পদ | সিনিয়র মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায়), জিয়াউর রহমান সরকার। |
| জীবনাবসান | ১২ মার্চ ১৯৭৯, ঢাকা। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
গবেষণা ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট)
ঢাকা, ৭ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের কেবল একজন সমরনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক দার্শনিক। তাঁর জীবন এবং ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাইয়ের সেই বিতর্কিত ফাঁসি—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল ক্ষত। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কেন তাহেরকে ‘বাংলার চে গুয়েভারা’ বলা হয় এবং কেন তাঁর বিচারকে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ‘ঠাণ্ডা মাথার খুন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
১. সম্মুখ সমর থেকে ১১ নম্বর সেক্টরের রূপকার

১৯৬১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তাহের ছিলেন একজন গেরিলা যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ। ১৯৭১ সালে যখন দেশ আক্রান্ত, তখন নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ভারত সীমান্তে পাড়ি দেন। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে এক দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী। ২রা নভেম্বর কামালপুরের সম্মুখ সমরে নিজের বাম পা হারানো তাহের প্রমাণ করেছিলেন—সেক্টর কমান্ডাররা কেবল ওয়াকিটকিতে নির্দেশ দেন না, তাঁরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন।
২. ৭ই নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লব ও ১২ দফা দাবি

১৯৭৫ সালের অস্থির সময়ে ৩রা নভেম্বর যখন জিয়াউর রহমান বন্দি হন, তখন তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ৭ই নভেম্বর এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল ১২ দফা দাবি, যার মধ্যে ছিল:
- শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী: অফিসার ও জোয়ানদের মধ্যকার ঔপনিবেশিক ভেদাভেদ দূর করা।
- ব্যাটম্যান প্রথা বিলোপ: ব্যক্তিগত কাজে সৈনিকদের দাসের মতো ব্যবহার বন্ধ করা।
- গণবাহিনী গঠন: সেনাবাহিনীকে শোষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর।
- দুর্নীতি দমন: পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা এবং রাজবন্দিদের মুক্তি।
৩. জিয়াউর রহমান বনাম কর্নেল তাহের: এক ট্র্যাজিক বিশ্বাসঘাতকতা

জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তাহের আশা করেছিলেন ১২ দফা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। জিয়াউর রহমান সংহতি প্রকাশের বদলে দমানোর নীতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাহেরকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং এক গোপন সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়।
৪. প্রহসনের বিচার ও উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় (সূত্র বিশ্লেষণ)
২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে কর্নেল তাহেরের গোপন বিচারকে ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে।
- সূত্র ১ (High Court Verdict, 2011): রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাহেরের ফাঁসি ছিল একটি ‘ঠাণ্ডা মাথার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ (Cold-blooded murder)।
- সূত্র ২ (Lawrence Lifschultz): প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর ‘Bangladesh: The Unfinished Revolution’ বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই বিচারের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।
৫. শেষ মুহূর্তের বীরত্ব: এক অমর মহাকাব্য
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাহেরের আচরণ ছিল কিংবদন্তীতুল্য। তিনি তওবা পড়তে অস্বীকার করে বলেছিলেন, “আমি কোনো পাপ করিনি, আমি কেন তওবা পড়ব?” হাসিমুখে ফজলি আম খেয়ে এবং নিজের জুতা-প্যান্ট গুছিয়ে তিনি নিজেই ফাঁসির দড়ি তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল— “বিদায় দেশবাসী। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।”
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জাতীয় ঐক্য খুঁজি, তখন কর্নেল তাহেরের সেই ‘শ্রেণিহীন সমাজ’ ও ‘জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র’-এর স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব হলেও তাঁর আদর্শকে স্তব্ধ করা যায়নি। ইতিহাসের আদালতে আজ কর্নেল তাহের একজন বিজয়ী বীর।
তথ্যসূত্র (References for Verification):
- সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০১১): রিট পিটিশন নং-৬৭৮৭/২০১০ (কর্নেল তাহেরের বিচার অবৈধ ঘোষণা)।
- Lawrence Lifschultz: Bangladesh: The Unfinished Revolution (Oxford University Press).
- Anwar Hossain: Sun up, Sun down: My days with Colonel Taher.
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ: ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধের ঘটনাবলি ও বীর উত্তম খেতাবপত্র।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।




২ Responses
https://shorturl.fm/DggDQ
https://shorturl.fm/u7YcJ