রাজনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বরাবরই অস্থিরতা, আন্দোলন এবং পরিবর্তনের ধারায় বয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের বর্তমান পর্যন্ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট একাধিক রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলন, সংঘর্ষ, এবং সমঝোতার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর পাশাপাশি, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য, আলোচনা এবং শীর্ষস্থানীয় বক্তাদের মতামত সময়-সময় রাজনৈতিক ধারণা এবং সমাজের পরিবর্তনগুলোর প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতার পর: ১৯৭১-১৯৮১
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব নেন। তবে তার শাসনকাল অতিদ্রুতই শেষ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে, যখন তাকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে, একটি আলফোর্স অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যা করা হয়, এবং পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, জিয়া-ইসলামী দলগুলো দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। এই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অস্থির, এবং একদিকে অভ্যুত্থান, বিপ্লব এবং অন্যদিকে সামরিক শাসন সব মিলিয়ে এক বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
জিয়া-উর-রহমান ছিলেন প্রথম সেনাপ্রধান যিনি রাষ্ট্রপতি হন, এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা এবং জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে নানা প্রয়াস নেওয়া হলেও তার হত্যাকাণ্ড ১৯৮১ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে, জিয়া হত্যাকাণ্ড ঘটলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এক নতুন দিকে মোড় নেয়।
এরশাদ যুগ: ১৯৮২-১৯৯০
১৯৮২ সালে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন, ধর্মীয় বিভাজন, এবং দুর্নীতি ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। তার রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি করে। ১৯৮৭ সালে বাংলা সনের তারিখ পরিবর্তন এবং উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল তার শাসনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
এরশাদ সরকার যখন সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসে, তখন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই নতুন সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের আন্দোলন শুরু করে। তবে এরশাদ ১৯৯০ সালে জনগণের বিপুল আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা: ১৯৯১-২০০১
১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বিএনপি দলের নেতৃত্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনে নব্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হয়, তবে তার শাসনকালেও বেশ কিছু দুর্নীতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ছিল। এরপর, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে উন্নয়ন প্রকল্প চালু করেন।
১৯৯১-২০০১ সাল পর্যন্ত এই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। তবে, শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
২০০১ থেকে ২০২৫: বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের পালাবদল
২০০১ সালের নির্বাচনে, বিএনপি জয়লাভ করে এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, এবং শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। তার শাসনে ভিশন-২০২১ এবং স্বাধীন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।
২০১৪ সালের নির্বাচনে অএকদলীয় নির্বাচন হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর পর, ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও জয়লাভ করে, তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন ওঠে।
২০২৫: রাজনৈতিক উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে, ২০২৫ সালের বাংলাদেশে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ এবং অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ তুলে চলছে, এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। জনগণের বিশ্বাস ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বক্তাদের আলোচনা:
- শেখ হাসিনা (২০২৩): “আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।”
- খালেদা জিয়া (২০১৮): “আমরা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছি, এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।”
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭১): “আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাই, যেখানে আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের অধিকার থাকবে।”
- হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১৯৮৫): “বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, এবং একসাথে কাজ করতে হবে।”
বিশ্লেষণ:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় একটি বিশাল পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের সূচনা। স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সেনা শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন—এইসব একে অপরকে প্রভাবিত করেছে। প্রতি নেতার সময়ে তার শাসনকালে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা আজও দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার মতো নেতারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন। ২০২৫ সালে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট তাদের আগের কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষা করছে।
সূত্র:
১. বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিবেদন
২. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দলীয় প্রতিবেদন
৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।
একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
- পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
- জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
- মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট
মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
- দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
- জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।
৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
| ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব | পৈতৃক শিকড় / জন্মস্থান | শেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান |
| কাজী নজরুল ইসলাম | চুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত) | ঢাকা, বাংলাদেশ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | পূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর) | কলকাতা, ভারত |
| শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায় | বরিশাল | বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল। |
| মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | গুজরাট (ভারত) | করাচি, পাকিস্তান |
| হযরত ইব্রাহিম (আ.) | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) | হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) |
ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)
মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।
৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?
- ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
- পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
- রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।
মূল নির্যাস
পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: মহান মুক্তিযুদ্ধ: প্রথম শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠদের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ঐতিহ্য
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও জাতীয় ইতিহাস মহাফেজখানা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কোটি মানুষের ত্যাগ এবং হাজারো অকুতোভয় সেনানী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস।
১. স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তিম সূচনা: প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা দেশে তখন তীব্র অসহযোগ আন্দোলন ও সর্বাত্মক হরতাল চলছিল। সেদিন রংপুরের কাচারি বাজার থেকে স্বাধিকারের দাবিতে বের হওয়া এক উত্তাল মিছিলে যোগ দিয়েছিল কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শঙ্কু সমজদার।
মিছিলটি আলমনগর ও জাহাজ কোম্পানির মোড় অতিক্রম করার সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী অ-বাঙালিদের অতর্কিত গুলিতে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। ঘটনাস্থলেই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দেন কিশোর শঙ্কু। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ও প্রথম শিশু শহীদ। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করা হয়।
২. সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক: সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মহান সন্তানকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’।
- প্রথম ও শেষ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধে সর্বপ্রথম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ (৮ এপ্রিল, ১৯৭১)। তবে সাধারণ জ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে অপশনে তাঁর নাম না থাকলে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে (১৮ এপ্রিল, ১৯৭১) বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন সর্বশেষ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)।
সাত বীরশ্রেষ্ঠর সংক্ষেপিত পরিচিতি ও সমাধিস্থল
| নাম ও পদবি | বাহিনী ও সেক্টর | শাহাদাতের তারিখ | চিরনিদ্রায় শায়িত যেখানে |
| ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ | ইপিআর (১ নং সেক্টর) | ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙামাটি |
| সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল | সেনাবাহিনী (২ নং সেক্টর) | ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | দরুইন গ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান | বিমানবাহিনী | ২০ আগস্ট, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ল্যান্স নায়ক নূর মোহাম্মদ শেখ | ইপিআর (৮ নং সেক্টর) | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ | কাশীপুর, শার্শা, যশোর |
| সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান | সেনাবাহিনী (৪ নং সেক্টর) | ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার-১ মোহাম্মদ রুহুল আমিন | নৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর) | ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | বাগমারা, রূপসা, খুলনা |
| ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর | সেনাবাহিনী (৭ নং সেক্টর) | ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
৩. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক শাহাদাত

পাকিস্তানের রিসালপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ডিসেম্বরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৪ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দোতলা ভবন থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছিল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগুনো অসম্ভব করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক হাতে এসএমজি এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে বুক ডলে হামাগুড়ি (ক্রলিং) দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারের একদম কাছে পৌঁছে যান। প্রখর নিশানায় গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের ভবন থেকে এক পাকিস্তানি স্নাইপারের বুলেট তাঁর কপালে এসে বিদ্ধ হয়। দেশের এই অকুতোভয় বীর বাঙ্কারের সামনেই শাহাদাতবরণ করেন, যার পরদিনই (১৫ ডিসেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।
৪. রণাঙ্গনের অবিশ্বাস্য সব বীরত্বগাথা

- নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’: ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে খালি গায়ে, পায়ে ফিন্স ও বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে সাঁতরে গিয়ে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে হামলা চালান বীর নৌ-কমান্ডোরা। তাঁদের গুঁড়িয়ে দেওয়া ২৬টি ধান ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব।
- ঢাকার বুকে আতঙ্কের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’: ঢাকার তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ অবরুদ্ধ রাজধানীতে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালায়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বড় বড় নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের সফল গ্রেনেড হামলা পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখত।
- অস্ত্র হাতে নারীদের প্রতিরোধ: তারামন বিবি (বীর প্রতীক) সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ডা. সিতারা বেগম ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি বিশটিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ইথারের তরঙ্গে ‘চরমপত্র’ (এম আর আখতার মুকুল) এবং উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানগুলো ছিল রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য আসল অক্সিজেন।
- বিদেশী বন্ধুদের অবদান: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। এছাড়া বাটা সু কোম্পানির অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড গোপনে অস্ত্র ও তথ্য দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, যিনি একমাত্র বিদেশী হিসেবে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার ছিল না; এটি ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী ও অকুতোভয় সেনাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক লাল-সবুজ পতাকা। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা শঙ্কু সমজদার থেকে শুরু করে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
তথ্য ও প্রকাশনা সংক্রান্ত বক্স (Editorial Meta Box)
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): জন লক ও রুশোর রাজনৈতিক দর্শন, অধ্যাপক গার্নার ও অধ্যাপক ডানিং-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানিক সংজ্ঞা।
রাষ্ট্র ও সরকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বাহ্যিকভাবে এদের সমার্থক মনে হলেও মৌলিক ও গঠনগত বিচারে এদের মধ্যে গভীর পার্থক্য বিদ্যমান। চুক্তিবাদী দার্শনিক জন লক (John Locke) সর্বপ্রথম এবং পরবর্তীতে জাঁ জ্যাঁক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Social Contract” এ রাষ্ট্র ও সরকারের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন।

ধারণাগত ভিত্তি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতবাদ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডানিং (Dunning) রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,
“State denotes the community as a whole created by the social pact and manifesting itself in the supreme general will; ‘Government’ denotes merely the individual or group of individuals that is designated by the community to carry into effect the sovereign will.”
অর্থাৎ, রাষ্ট্র হলো সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ জনসমষ্টি বা সামগ্রিক রূপ, আর সরকার হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমেচ্ছা বা ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য মনোনীত একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ
নিচে একটি ছকের সাহায্যে রাষ্ট্র ও সরকারের মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | রাষ্ট্র (State) | সরকার (Government) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা ও প্রকৃতি | রাষ্ট্র একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গঠিত। | সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ বা চালিকাশক্তি। এটি রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করে। |
| স্থায়িত্ব | রাষ্ট্র স্থায়ী। একটি রাষ্ট্রের সীমানা বা অস্তিত্ব সহজে বিলুপ্ত হয় না। | সরকার অস্থায়ী। নির্দিষ্ট সময় পর পর বা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়। |
| গঠন উপাদান | রাষ্ট্রের চারটি মূল উপাদান থাকে: নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। | সরকার নিজে রাষ্ট্রের চারটি উপাদানের মধ্যে একটি উপাদান মাত্র। |
| সদস্যপদ | রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে বসবাসকারী সব নাগরিকই রাষ্ট্রের সদস্য। | দেশের সব মানুষ সরকারের সদস্য নয়, কেবল শাসনকাজে যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি সরকারের অংশ। |
| সার্বভৌমত্ব | রাষ্ট্রের নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে, যা সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত। | সরকারের কোনো নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। সরকার রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে মাত্র। |
| মূর্ত বনাম বিমূর্ত | রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা। একে চোখে দেখা যায় না, কেবল উপলব্ধি করা যায়। | সরকার একটি মূর্ত বা দৃশ্যমান ধারণা। কারণ এটি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি। |
| বিরোধিতা | রাষ্ট্রের বিরোধিতা করাকে দেশদ্রোহিতা বলা হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। | সরকারের নীতি বা কাজের সমালোচনা ও বিরোধিতা করা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। |
সহজ একটি উদাহরণ:
একটি রাষ্ট্রকে যদি একটি মোটরগাড়ির সাথে তুলনা করা হয়, তবে সরকার হলো সেই গাড়ির চালক (Driver)। চালক পরিবর্তন হলেও গাড়িটি কিন্তু একই থাকে। একইভাবে, শাসক বা রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র অপরিবর্তিত থাকে।
সংসদীয় বনাম রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার) রূপান্তর ও পার্থক্য
সংসদীয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দুটি প্রধান রূপ। এই দুই ব্যবস্থার মূল পার্থক্য নিহিত রয়েছে সরকারের দুটি প্রধান অঙ্গ—আইন বিভাগ (সংসদ) এবং শাসন বিভাগ (রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীপরিষদ) এর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

নিচে একটি ছকের সাহায্যে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মূল পার্থক্যগুলো সরাসরি তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | সংসদীয় সরকার (Parliamentary) | রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার (Presidential) |
|---|---|---|
| প্রধান নির্বাহী | প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী (সরকারপ্রধান)। রাষ্ট্রপতি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রধান। | রাষ্ট্রপতি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী (সরকারপ্রধান)। |
| শাসন ও আইন বিভাগের সম্পর্ক | শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হন। | শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পরস্পর থেকে স্বাধীন। মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হন না। |
| জবাবদিহিতা | শাসন বিভাগ (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা) তাদের কাজের জন্য সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। | শাসন বিভাগ (রাষ্ট্রপতি ও তার সচিবরা) তাদের নীতি বা কাজের জন্য সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। |
| স্থায়িত্ব ও মেয়াদ | সরকারের মেয়াদ অনিশ্চিত। সংসদের অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে যেকোনো সময় সরকারের পতন ঘটতে পারে। | সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট ও স্থায়ী। অভিশংসন (Impeachment) ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদের আগে সহজে সরানো যায় না। |
| ক্ষমতার এককত্ব | প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতের ওপর নির্ভর করতে হয়। | রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত শক্তিশালী হন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে আইনসভার সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য ভেটো (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। |
| দলীয় প্রভাব | দলীয় শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠোর থাকে, কারণ দলীয় সংসদ সদস্যদের সমর্থন হারালে সরকার ভেঙে যায়। | দলীয় শৃঙ্খলা তুলনামূলক শিথিল হতে পারে, কারণ রাষ্ট্রপতির টিকে থাকা সংসদের ভোটের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। |
| উদাহরণ | বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, কানাডা ইত্যাদি দেশ। | যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি দেশ। |
সহজ একটি তুলনা চিত্র:
- সংসদীয় ব্যবস্থা একটি দলগত বা পরিষদ-ভিত্তিক শাসন। এখানে প্রধানমন্ত্রী হলেন “সমানদের মধ্যে প্রথম” (First among equals), যাকে তার মন্ত্রীসভা ও সংসদের আস্থা নিয়ে চলতে হয়।
- রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা একক নেতৃত্ব-ভিত্তিক শাসন। এখানে রাষ্ট্রপতি নিজেই সর্বময় ক্ষমতার উৎস এবং তার সচিব বা মন্ত্রীরা মূলত তার আদেশ পালনকারী উপদেষ্টা মাত্র।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



