রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস: ১৯৫০ থেকে ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

August 4, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বরাবরই অস্থিরতা, আন্দোলন এবং পরিবর্তনের ধারায় বয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের বর্তমান পর্যন্ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট একাধিক রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলন, সংঘর্ষ, এবং সমঝোতার মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর পাশাপাশি, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য, আলোচনা এবং শীর্ষস্থানীয় বক্তাদের মতামত সময়-সময় রাজনৈতিক ধারণা এবং সমাজের পরিবর্তনগুলোর প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে।

স্বাধীনতার পর: ১৯৭১-১৯৮১

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনায় দায়িত্ব নেন। তবে তার শাসনকাল অতিদ্রুতই শেষ হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে, যখন তাকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে, একটি আলফোর্স অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে হত্যা করা হয়, এবং পরবর্তী সময়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, জিয়া-ইসলামী দলগুলো দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। এই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অস্থির, এবং একদিকে অভ্যুত্থান, বিপ্লব এবং অন্যদিকে সামরিক শাসন সব মিলিয়ে এক বিপর্যস্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

জিয়া-উর-রহমান ছিলেন প্রথম সেনাপ্রধান যিনি রাষ্ট্রপতি হন, এবং ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা এবং জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে নানা প্রয়াস নেওয়া হলেও তার হত্যাকাণ্ড ১৯৮১ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে, জিয়া হত্যাকাণ্ড ঘটলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এক নতুন দিকে মোড় নেয়।

এরশাদ যুগ: ১৯৮২-১৯৯০

১৯৮২ সালে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন, ধর্মীয় বিভাজন, এবং দুর্নীতি ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়। তার রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ধর্মীয় সমাজে বিতর্ক সৃষ্টি করে। ১৯৮৭ সালে বাংলা সনের তারিখ পরিবর্তন এবং উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন ছিল তার শাসনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এরশাদ সরকার যখন সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসে, তখন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই নতুন সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের আন্দোলন শুরু করে। তবে এরশাদ ১৯৯০ সালে জনগণের বিপুল আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা: ১৯৯১-২০০১

১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বিএনপি দলের নেতৃত্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনে নব্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হয়, তবে তার শাসনকালেও বেশ কিছু দুর্নীতিঅভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ছিল। এরপর, ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে উন্নয়ন প্রকল্প চালু করেন।

১৯৯১-২০০১ সাল পর্যন্ত এই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে। তবে, শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

২০০১ থেকে ২০২৫: বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের পালাবদল

২০০১ সালের নির্বাচনে, বিএনপি জয়লাভ করে এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, এবং শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। তার শাসনে ভিশন-২০২১ এবং স্বাধীন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অএকদলীয় নির্বাচন হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এর পর, ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও জয়লাভ করে, তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন ওঠে।

২০২৫: রাজনৈতিক উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে, ২০২৫ সালের বাংলাদেশে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ এবং অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযোগ তুলে চলছে, এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। জনগণের বিশ্বাসগণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বক্তাদের আলোচনা:

  • শেখ হাসিনা (২০২৩): “আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।”
  • খালেদা জিয়া (২০১৮): “আমরা জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছি, এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।”
  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭১): “আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাই, যেখানে আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের অধিকার থাকবে।”
  • হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১৯৮৫): “বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, এবং একসাথে কাজ করতে হবে।”

বিশ্লেষণ:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায় একটি বিশাল পরিবর্তনচ্যালেঞ্জের সূচনাস্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, সেনা শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন—এইসব একে অপরকে প্রভাবিত করেছে। প্রতি নেতার সময়ে তার শাসনকালে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা আজও দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার মতো নেতারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন। ২০২৫ সালে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট তাদের আগের কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অপেক্ষা করছে।


সূত্র:
১. বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিবেদন
২. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির দলীয় প্রতিবেদন
৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বিষয়ঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

হুমায়ুন আজাদের দৃষ্টি

নিউজ ডেস্ক

April 17, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষণে: BDS Bulbul Ahmed

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। তবে প্রথাবিরোধী লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে এই বিতর্ককে এক নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করে ‘ঘোষক’ হওয়া যায়, কিন্তু একটি জাতির ‘মহাস্থপতি’ হওয়া যায় না।

১. বন্দী মুজিব: ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী এক প্রেরণা

হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে যদি পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিতেন, তবে তিনি হতেন একজন ‘সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী’। কিন্তু তাঁর বন্দীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় ও অদম্য ভাবপ্রতিমা।

তিনি লিখেছেন, “যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।” ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালির মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ‘মুজিব কোথায়?’ তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি।

২. মেজর জিয়া: এক ঐতিহাসিক আকস্মিকতা

২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে একটি ‘আকস্মিক কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

  • সুযোগ ও আকস্মিকতা: লেখক মনে করেন, কালুরঘাটের বেতারযন্ত্রীরা একজন মেজরকে খুঁজছিলেন একটি জোরালো ঘোষণার জন্য। সেই মুহূর্তে অন্য কোনো মেজর থাকলেও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতেন।
  • উত্তেজনা ও স্বস্তি: জিয়ার সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছিল মূলত এই কারণে যে, তারা জানতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এবং তাঁর নামেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ বা মুজিব বা আইনস্টাইন হওয়ার জন্য লাগে দীর্ঘ সাধনা, কিন্তু কেউ কেউ হঠাৎ মেজর জিয়া হয়ে উঠে সারা দেশকে আলোড়িত করতে পারেন।”

৩. কেন মুজিবই মহাস্থপতি?

আজাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি গুলিতে এবং প্রতিটি আত্মত্যাগে কেবল একটি নামই কাজ করেছে—তা হলো মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ হাজারবার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে আসত না এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “মুজিব বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বন্দী থেকেও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, মহাস্থপতি; তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না।”

৪. ‘শহীদ’ বনাম ‘নিহত-অমর’

প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে ইহলৌকিক শব্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো মুজিবকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব হতেন আরও বেশি শক্তিশালী। যারা দেশের জন্য প্রাণ দেন, তারা মূলত ‘নিহত-অমর’ হয়ে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকেন।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, ঘোষণা কে দিয়েছেন সেই তর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো—কার নেতৃত্বে এবং কার নামে একটি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই একক নেতৃত্বের নাম, যিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রকে মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।


এক নজরে লেখকের মূল বক্তব্য:

বিষয়হুমায়ুন আজাদের মত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিববাংলাদেশের মহাস্থপতি, যাঁর স্থান ঘোষকের অনেক ওপরে।
মেজর জিয়াঐতিহাসিক আকস্মিকতায় উদ্ভূত একজন ট্র্যাজিক নায়ক ও কিংবদন্তি।
মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তিবঙ্গবন্ধুর নাম ও ভাবপ্রতিমা।
বন্দীত্বের গুরুত্বপালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বন্দীত্ব ছিল বেশি মর্যাদাপূর্ণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মুসলিম উম্মাহর সংকট

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং শান্তির ধর্ম। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিচয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জিত ও ব্যর্থ মনে হয়। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বর্তমানে ইসলামকে যার যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ‘একাধিক বিবাহ’ নিয়ে যেভাবে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর পেছনে যে কঠিন শর্ত ও ইনসাফের (ন্যায়বিচার) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে অমুসলিম বিশ্ব ও নওমুসলিমদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, মুসলিম পুরুষ মানেই কেবল একাধিক বিয়ে।

২. আত্মপক্ষ সমর্থনের দায়ভার ও ‘ইসলামোফোবিয়া’

বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর এসে পড়ে। অনলাইনে বা অফলাইনে একজন মুসলিমকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘জঙ্গি’ নয়। হিজাব পরিধান করা যে একজন নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকুও আমরা বিশ্বকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারা আমাদের এক বড় ব্যর্থতা।

৩. অনৈক্য ও পরশ্রীকাতরতা

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ প্রকট। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বড় মানবিক সংকটে যখন কোনো শক্তিশালী মুসলিম দেশ নয়, বরং গাম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে, তখন আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা অন্যের ভুল খুঁজতে যতটা পটু, নিজেদের সংশোধনে ততটাই উদাসীন।

৪. ভূ-রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা

মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত ‘মোড়ল’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অনেক সময় সাধারণ মুসলমানদের ব্যথিত করে। ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা কিংবা বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া—আমাদের লজ্জিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনছে।

৫. দেশপ্রেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনীহা

‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’—এই শিক্ষা ভুলে গিয়ে অনেক মুসলিম দেশ আজ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া সোনালী অতীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে মুসলিম মনীষীদের যে কালজয়ী অবদান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে নিজেরাই জানি না, ফলে পশ্চিমাদের চোখে আমরা আজ একটি ‘পিছিয়ে পড়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছি।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ইসলামের সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হবে যখন আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকবে। আমরা যদি অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের চরিত্র ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারি, তবেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। কেবল ধর্মের গান গেয়ে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


এক নজরে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:

চ্যালেঞ্জবর্তমান অবস্থা
সামাজিকইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব।
রাজনৈতিকমুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি।
সাংস্কৃতিকমিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় ব্যর্থতা।
শিক্ষাগতআধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা।

তথ্যসূত্র (Source):

  • আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ: ন্যায়বিচার ও ইনসাফ সংক্রান্ত বিধান।
  • আল জাজিরা ও রয়টার্স: ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন।
  • বিডিনিউজ২৪: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সরলা দেবী চৌধুরাণী

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।

২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।

৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।

৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।

৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।


এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:

বিষয়তথ্য
জন্ম৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২।
প্রধান পরিচয়সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক।
সুরারোপিত গানবন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)।
সংগঠনলক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল।
বিখ্যাত বইজীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন।
মৃত্যু১৮ আগস্ট ১৯৪৫।

তথ্যসূত্র (Source):

  • উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
  • বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
  • অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ