বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: [BDS Bulbul Ahmed]
সর্বশেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ঢালিউড ইতিহাসের ধূমকেতু, আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের ফ্যাশন আইকন এবং কোটি প্রাণের স্পন্দন চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ওরফে সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন, তা গত তিন দশকে আর কেউ করতে পারেনি। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায় এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেটগুলো তুলে ধরছি।
১. ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট: হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা

সালমান শাহর মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এই বিতর্ক ৩০ বছর হতে চললেও এখনো অমীমাংসিত। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী:
- তদন্তের নতুন মোড়: গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ১৪ মে ২০২৬ তারিখ ধার্য করেছেন।
- আসামিদের অবস্থা: মামলার বাদী (সালমান শাহর পরিবার) অভিযুক্ত ১১ জন আসামির (যার মধ্যে স্ত্রী সামিরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই অন্যতম) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়েছেন। আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।
২. পর্দার পেছনের মানুষ: ইমন থেকে সালমান শাহ
সালমান শাহর চলচ্চিত্রে আসার গল্পটি বেশ নাটকীয়।

- শৈশব ও কৈশোর: ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া ইমনের রক্তে ছিল অভিনয়। তাঁর মাতামহ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম অভিনেতা।
- প্রথম আলোচিত কাজ: ১৯৮৫ সালে হানিফ সংকেতের মিউজিক ভিডিও ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’-তে এক মাদকাসক্ত তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথম নজর কাড়েন।
- নাম পরিবর্তন: ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ করার সময় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান এবং স্ত্রী সামিরার সাথে পরামর্শ করে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সালমান শাহ’।
৩. অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ও উত্তরসূরিদের ওপর প্রভাব

১৯৯৬ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর সময় বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল।
- যেভাবে শেষ হয়েছিল সিনেমাগুলো: সালমানের অকাল প্রয়াণের পর ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ সিনেমায় ডামি ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘শুধু তুমি’ ছবিতে অন্য এক অভিনেতাকে কাস্ট করা হয় এবং ‘প্রেম পিয়াসী’র গল্প আংশিক পরিবর্তন করে সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
- অনুপ্রেরণার উৎস: বর্তমান সময়ের সুপারস্টার শাকিব খান থেকে শুরু করে হালের সব অভিনেতাই সালমান শাহকে তাঁদের অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন। শাকিব খান একবার জানিয়েছিলেন, তাঁর দেখা প্রথম সিনেমাটি ছিল সালমান শাহ অভিনীত।
৪. কেন তিনি আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী? (ইউনিক ফ্যাক্টস)

- বক্স অফিস রেকর্ড: তাঁর অভিনীত ২৭টি চলচ্চিত্রের প্রায় প্রতিটিই ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিল। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ঢালিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার তালিকায় আজও শীর্ষে।
- ফ্যাশন আইকন: আজকের যুগে যা ‘ট্রেন্ড’, সালমান শাহ তা নব্বই দশকেই শুরু করেছিলেন। কানে দুল, চুলে ব্যান্ডেনা, ব্যাক ব্রাশ হেয়ার স্টাইল এবং রঙিন সানগ্লাস দিয়ে তিনি একটি পুরো প্রজন্মকে বদলে দিয়েছিলেন।
- কণ্ঠশিল্পী সালমান: খুব কম মানুষই জানেন যে সালমান শাহ একজন চমৎকার গায়কও ছিলেন। ‘প্রেমযুদ্ধ’ এবং ‘ঋণ শোধ’ সিনেমায় তিনি প্লে-ব্যাক করেছিলেন।
৫. একনজরে পরিসংখ্যান (Quick Facts)
| তথ্য | বিস্তারিত |
| সর্বাধিক জুটি | শাবনূরের সাথে (১৪টি সিনেমা) |
| সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা | বুকের ভেতর আগুন (১৯৯৭ – মরণোত্তর) |
| মৃত্যুর পর আত্মহত্যা | প্রিয় নায়কের শোকে প্রায় ১২ জন তরুণী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। |
| সর্বশেষ মামলার তারিখ | ১৪ মে ২০২৬ (তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন) |
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সালমান শাহ কেবল একটি নাম নয়, তিনি ঢালিউডের একটি অধ্যায়। ৩০ বছর পরও যখন তাঁর সিনেমা টেলিভিশনে চলে, তখন মানুষ সব কাজ ফেলে টিভি সেটের সামনে বসে পড়ে। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে মহানায়করা মরেও অমর হয়ে থাকেন।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: লাইফ স্টাইল (ভ্রমণ)
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন (Bangladesh Parjatan Corporation), ট্রাভেল গ্রুপস রিভিউ এবং লোকাল ব্যাকপ্যাকার্স কমিউনিটি ডাটাবেস
শীতের মিষ্টি রোদ আর হালকা ঠান্ডা আবহাওয়া ভ্রমণের জন্য বছরের সবচেয়ে সেরা সময়। এই সময়ে অনেকেই দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমি কাটাতে কোথাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা করেন। তবে ভ্রমণ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় অঙ্কের বাজেট। কিন্তু আমাদের সুন্দর বাংলাদেশে এমন কিছু চমৎকার জায়গা রয়েছে যেখানে খুব কম খরচেই শীতের সৌন্দর্য সম্পূর্ণ উপভোগ করা সম্ভব। গুগলের ২০২৬ সালের বাজেট ট্রাভেল নির্দেশিকা এবং বর্তমান যাতায়াত খরচের ওপর ভিত্তি করে শীতে বাংলাদেশে ঘোরার মতো ৫টি সেরা ও কম খরচের জায়গা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) – চায়ের দেশে কুয়াশা মোড়ানো সকাল
শীতকালে শ্রীমঙ্গলের রূপ অনন্য হয়ে ওঠে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ চা বাগান, লেবু বাগান এবং আনারস বাগানের ওপর যখন সকালের ঘন কুয়াশা চাদর বিছিয়ে দেয়, সেই দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়।
- মূল আকর্ষণ: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল (শীতের যাযাবর পাখি দেখার সেরা জায়গা), মাধবপুর লেক এবং নীলকণ্ঠ টি কেবিনের ৭ রঙের চা।
- কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা বা যেকোনো প্রান্ত থেকে লোকাল বা আন্তঃনগর ট্রেনে সরাসরি শ্রীমঙ্গল চলে যান। ট্রেনের টিকিট কাটলে যাতায়াত খরচ অনেক কমে যায়। শ্রীমঙ্গল শহরে সাধারণ কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অনেক বাজেট হোটেল বা ডরমিটরি রয়েছে যেখানে ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যে রাত্রিযাপন করা সম্ভব। বাগানের আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর জন্য লোকাল অটো রিকশা বা সিএনজি শেয়ার করে নিলে খরচ একদম নামমাত্র হবে।
২. টাঙ্গুয়ার হাওর (সুনামগঞ্জ) – হাউসবোটে শীতের স্নিগ্ধতা

বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর সাগরের মতো রূপ নিলেও, শীতে এর জল কমতে শুরু করে এবং চারপাশ শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। এই সময়ে সাইবেরিয়া থেকে আসা হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে পুরো হাওর। কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নিচে জলজ উদ্ভিদ দেখার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা মেলে এই শীতে।
- মূল আকর্ষণ: অতিথি পাখি, টেকেরঘাট শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক), বারিক্কা টিলা এবং জাদুকাটা নদী।
- কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের নন-এসি বাস ভাড়া সাধারণ সাশ্রয়ী। সুনামগঞ্জ সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে ট্রলার বা লোকাল লাইফ বোট শেয়ার করে টাঙ্গুয়ার হাওর ও নীলাদ্রি লেক ঘুরে আসা যায়। কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রুপ করে গেলে বড় হাউসবোটের বদলে মাঝারি সাইজের সাধারণ নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করলে জনপ্রতি খরচ ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে থাকা-খাওয়াসহ সম্পূর্ণ ট্যুর শেষ করা সম্ভব।

৩. কক্সবাজার (মেরিন ড্রাইভ ও ইনানী) – সাশ্রয়ী উপায়ে সমুদ্র বিলাস
শীতকালে কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকলেও একটু বুদ্ধি খাটালে খুব কম খরচে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত উপভোগ করা সম্ভব। শীতের শান্ত সমুদ্র এবং কুয়াশাচ্ছন্ন মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।
- মূল আকর্ষণ: সুগন্ধা ও লাবণী বিচ, হিমছড়ি ঝরনা, ইনানী পাথুরে সৈকত এবং পাটুয়ারটেক।
- কম খরচে ঘোরার উপায়: মূল সিজন হওয়ায় প্রধান বিচ সংলগ্ন হোটেলের ভাড়া বেশি থাকে। তবে সুগন্ধা বা কলাতলী মোড়ের মেইন রোড থেকে একটু ভেতরের দিকের গলির হোটেলগুলোতে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে রুম পাওয়া যায়। কলাতলী থেকে ইনানী বা হিমছড়ি যাওয়ার জন্য জিপ বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ না করে লোকাল ইজি বাইক (টমটম) বা শেয়ার্ড সিএনজি ব্যবহার করলে যাতায়াত খরচ এক-চতুর্থাংশে নেমে আসবে। এছাড়া খাওয়ার জন্য বড় রেস্টুরেন্ট পরিহার করে লোকাল ‘ভাতের হোটেল’গুলো বেছে নিলে খরচ অনেক বাঁচবে।
৪. বিরিশিরি (নেত্রকোনা) – চীনামাটির পাহাড় ও সোমেশ্বরী নদী
শীতকালে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরির সৌন্দর্য দেখার মতো হয়। বর্ষার কাদা-মাটি পেরিয়ে শীতে সোমেশ্বরী নদীর পানি একদম শান্ত ও স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে যায়। আর চীনামাটির পাহাড়ের হ্রদের হালকা নীল ও সবুজ জল আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
- মূল আকর্ষণ: সাদা ও গোলাপী চীনামাটির পাহাড়, নীল জলের হ্রদ, সোমেশ্বরী নদী এবং কালচারাল একাডেমি।
- কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা থেকে সরাসরি দুর্গাপুরের বাস রয়েছে। এছাড়া ট্রেনে করে জারিয়া ঝাঁঝাইল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে লোকাল সিএনজি বা অটোতে খুব সহজে ও কম খরচে বিরিশিরি পৌঁছানো যায়। বিরিশিরি বাজারে এবং জিরো পয়েন্টের আসেপাশে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে সাধারণ লজিং বা বোর্ডিং পাওয়া যায়। পাহাড় ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখার জন্য লোকাল রিকশা বা মোটর সাইকেল শেয়ারিং সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম।
৫. সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) – পাহাড় ট্র্যাকিং ও শীতের কুয়াশা

যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন এবং কম খরচে পাহাড়ের চূড়ায় শীতের কুয়াশা ছুঁতে চান, তাঁদের জন্য সীতাকুণ্ড সেরা চয়েস। শীতের সকালে পাহাড়ি ট্রেইলে হাঁটা এবং চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া থেকে কুয়াশায় ঢাকা বঙ্গোপসাগর দেখার অনুভূতি অতুলনীয়।
- মূল আকর্ষণ: চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির, গুলিয়াখালী বিচ (সবুজ ঘাসের সৈকত), এবং মহামায়া লেক (কায়াকিং করার সুবিধা)।
- কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা বা অন্য শহর থেকে মেইল ট্রেন বা লোকাল বাসে সরাসরি সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে যাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড বাজারে বেশ কিছু সস্তা ও ভালো মানের লোকাল হোটেল রয়েছে যেখানে ১,০০০ টাকার নিচে ডাবল বেডের রুম পাওয়া যায়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার জন্য কোনো গাইডের প্রয়োজন হয় না, ফলে বাড়তি কোনো খরচ নেই। মহামায়া লেক বা গুলিয়াখালী বিচে যাওয়ার জন্য লোকাল লেগুনা বা অটো ব্যবহার করলে যাতায়াত খরচ অনেক কম পড়বে।
শীতের সিজনে যেকোনো জায়গায় যাওয়ার আগে ট্রেনের বা বাসের টিকিট অন্তত এক সপ্তাহ আগে কেটে রাখুন। গ্রুপ বা বন্ধুদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে ভ্রমণ করলে (Group Tour) থাকা, খাওয়া ও গাড়ি ভাড়ার খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। এছাড়া প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১৫শ খণ্ড), লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসির ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’, এবং সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংবাদপত্র আর্কাইভস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী, অস্থির এবং নাটকীয় পালাবদলের সময়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশে কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ নেয় ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ বা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, যা বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন গতিপথে চালিত করে। এই ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল দিবসের নেপথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি: ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর জেরে ৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং ঢাকা ওয়ান বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে।

খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর পদ থেকে পদচ্যুত করা হয় এবং ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে তাঁকে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি (House Arrest) করে রাখা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

২. নেপথ্যের অনুঘটক: জাসদ ও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবের ডাক
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের এই পাল্টা অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর সাধারণ জওয়ান বা সিপাহিদের একটি বড় অংশ ভারতের মদদপুষ্ট এবং মোশতাক চক্রের আরেকটি অংশের ক্ষমতার লড়াই হিসেবে চশমায় দেখছিল। এই সুযোগে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ এবং এর অন্যতম প্রধান নেতা লে. কর্নেল (অব.) আবু তাহের সেনানিবাসের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে এক গোপন প্রচারণা চালান।
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সিপাহিদের বৈষম্য দূরীকরণ, ১২ দফা দাবি আদায় এবং ‘শ্রেণিহীন সামরিক ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ল্যান্স নায়েক ও সুবেদারদের সংগঠিত করে। ৭ নভেম্বর ভোররাতে এক গণ-অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা, কারণ জিয়াউর রহমান সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
৩. ৭ নভেম্বরের সেই ভয়াল রাত এবং সিপাহি-জনতার জাগরণ
৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হয়ে ৭ নভেম্বর ভোররাতে (আনুমানিক রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে) ঢাকা সেনানিবাসে সিপাহিদের বিদ্রোহ আনুষ্ঠানিকভাবে ফেটে পড়ে। ট্যাংকের গর্জন এবং শত শত রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে সিপাহিরা ব্যারাকে ব্যারাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- জিয়াউর রহমানের মুক্তি: সিপাহিদের একটি দল দ্রুত মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসভবনে যায় এবং পাহারারত সেন্ট্রিদের নিরস্ত্র করে তাঁকে অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে আসে। মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান সিপাহিদের শান্ত থাকার এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
- খালেদ মোশাররফের পতন ও মৃত্যু: সিপাহিদের এই ভয়াবহ বিদ্রোহের মুখে টিকতে না পেরে নবনিযুক্ত সেনাপ্রধান জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার (যাঁরা সবাই বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) শেরেবাংলা নগরের ১০ বেঙ্গলের সদর দপ্তরে আশ্রয় নেন। কিন্তু ৭ নভেম্বর সকালেই উত্তেজিত ও বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে এই তিন লিজেন্ডারি সামরিক কর্মকর্তা নির্মমভাবে নিহত হন।
- রাজপথে জনতার ঢল: সকাল হওয়ার সাথে সাথে সেনানিবাসের সিপাহিরা ট্রাকে করে, ট্যাংকের ওপর চড়ে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তাদের মুখে স্লোগান ছিল—‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। রাজপথের সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সাথে যোগ দেয় এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়। সিপাহি ও জনতার এই অভূতপূর্ব সংহতির কারণেই দিনটিকে ইতিহাসে ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে অবিহিত করা হয়।
৪. রাজনৈতিক তাৎপর্য ও পরবর্তী ফলাফল
৭ নভেম্বরের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়:
- জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার কেন্দ্রে আগমন: এই বিপ্লবের পর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল থাকলেও, জিয়াউর রহমান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (Chief Deputy Martial Law Administrator) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
- কর্নেল তাহেরের সাথে দূরত্ব: সিপাহিদের ১২ দফা দাবি এবং জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ধারার সাথে জিয়ার শাসনতান্ত্রিক ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী চিন্তাভাবনার দূরত্ব তৈরি হয়। যার ফলে পরবর্তীতে কর্নেল তাহেরসহ জাসদের অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সামরিক আদালতে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
ইতিহাসের পাতা সবসময় একমুখী নয়। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন একটি পক্ষ ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে অত্যন্ত গৌরব ও শ্রদ্ধার সাথে উদ্যাপন করে, ঠিক তেমনই আরেকটি পক্ষ এই দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে, কারণ এই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। গুগলের ২০২৬ সালের নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক কনটেন্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া এই দিবসের সকল পক্ষের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সঠিকভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন
৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত, অন্ধকারের दिन এবং দ্বিতীয় কলঙ্কময় অধ্যায়, যা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার চার জাতীয় নেতা হলেন:
- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুজিবনগর সরকারের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
- তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী)
- ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (মুজিবনগর সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী)
- এ এইচ এম কামারুজ্জামান (মুজিবনগর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী)
নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন এই খুনি সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে, যার ধারাবাহিকতায় এই শীর্ষ চার নেতাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান (Counter-coup) শুরু হয়। খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পতন আসন্ন। যদি আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ চার নেতা জীবিত থাকেন, তবে তারা পুনরায় দেশের হাল ধরবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত হবে। তাই দেশকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করার চূড়ান্ত নীল নকশা হিসেবে কারাগারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

সেই ভয়াল রাতে কারাগারে যা ঘটেছিল
৩ নভেম্বর ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে খাকি পোশাক পরিহিত এবং স্টেনগান ও এসএলআর (SLR)-এ সজ্জিত পাঁচজন সেনাসদস্য একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। এদের নেতৃত্বে ছিলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।
তৎকালীন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) কাজী আবদুল আউয়াল প্রথমে তাদের কারাগারে ঢুকতে বাধা দেন। তবে বঙ্গভবন থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি নির্দেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খুনিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর জেলার আমিনুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় আলাদা আলাদা সেলে থাকা চার নেতাকে ডেকে এনে একটি কক্ষে একত্রিত করার জন্য। চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার পর ঘাতকেরা তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। গুলি করার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাদের শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
মামলার এজাহার (FIR) ও তদন্তের বিবরণ
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনস কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহারে (FIR) উল্লেখ করা হয় যে, ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রপতির মৌখিক নির্দেশের কথা বলে কয়েকজন অবাধ্য সেনাসদস্য জোরপূর্বক কারাগারে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন জেনারেলে সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে স্টেনগান ও রাইফেল দিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
মামলার পর তৎকালীন উপ-পুলিশ সুপার সাইফুদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলেও তাকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোর অনীহার কারণে দীর্ঘ ২১ বছর মামলার নথিপত্র, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচার বিভাগীয় কমিশনের ফাইল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আইনগত বাধা দূর হওয়ার পর সিআইডি (CID)-র তৎকালীন কর্মকর্তা আব্দুল কাহাত আকন্দ নতুনভাবে তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন।
তৎকালীন আইনি নথি ও আদালতের চূড়ান্ত রায়
দীর্ঘ আইনি জটিলতা শেষে বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ১৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়:
- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (৩ জন): সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (১২ জন): অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতার জন্য (দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারা) খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, মোহাম্মদ কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
(উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদকে অন্য একটি মামলা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে)।
২০০৮ সালের হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় ও ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০০৪ সালের বিচারিক (নিম্ন) আদালত রায় দিলেও ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে (تৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রায় প্রদান করেন।
হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে কেবল ১ জন আসামির (রিসালদার মোসলেম উদ্দিন) মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্যদিকে, নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ২ জন আসামি—দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়। সেই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন আসামি—সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও এই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এই চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
২০০৯ সালে এই বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের রায়টিকে আইনি ভিত্তির অভাব ও ভুল পর্যালোচনার কারণে সম্পূর্ণ বাতিল (Dismiss) করে দেন।
আপিল বিভাগ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা এবং একই খুনি চক্রের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক নীল নকশা। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে আসামিদের খালাস দেওয়া আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আপিল বিভাগ ২০০৮ সালের হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের মূল রায়টিকেই হুবহু বহাল রাখেন। এর ফলে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড পুনরায় পুনর্বহাল হয় এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে।
পলাতক আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণের আইনি বাধা
আইনি নথির ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক রয়েছেন এবং ১ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে। এদের বর্তমান সর্বশেষ অবস্থা নিম্নরূপ:
১. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; ভারতে আত্মগোপনে থাকার গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।
২. দফাদার মারফত আলী শাহ (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
3. দফাদার আবুল হাসেম মৃধা (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; নিখোঁজ ও অবস্থান অজানা।
৪. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (যাবজ্জীবন): পলাতক; লিবিয়া ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করার তথ্য রয়েছে।
৫. লে. কর্নেল (অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম (যাবজ্জীবন): পলাতক; পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।
৬. লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক;加拿大য় রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৭. লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক; যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৮. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার (যাবজ্জীবন): পলাতক; কানাডায় অবস্থান করছেন।
৯. মেজর (অব.) আহমেদ শরিফুল হোসেন (যাবজ্জীবন): পলাতক; অবস্থান অজ্ঞাত।
১০. াক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ কিসমত হাশেম (যাবজ্জীবন): পলাতক থাকা অবস্থায় কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ (যাবজ্জীবন): সাজা কার্যকর। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি বাধা:
লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক থাকলেও দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
কানাডার ‘Extradition Act’ (কানাডিয়ান প্রত্যর্পণ আইন) এবং ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী—কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ বা ফেরত পাঠাতে পারে না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু নূর চৌধুরী বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাই কানাডা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) নিয়ে অবস্থান করছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে নিজ দেশে ফেরত গেলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অবিচারের শিকার হতে পারেন, তবে তাকে সুরক্ষামূলক আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফাইলটি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও, সে দেশের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের আপিল ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঝুলে রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের সাথে কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকাও একটি বড় আইনি প্রতিবন্ধকতা।
জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক সততা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল আনুগত্য চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



