অর্থনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
চাইনিজ, তামিল ও মালয় তিন জাতির সৌহার্দ্যপূর্ণ দেশ সিঙ্গাপুর। অতীতের বৈরিতা ত্যাগ করে তারা এক সমৃদ্ধশালি দেশ গড়ে তুলেছে।
মানসুরা আক্তার, এশিয়ার দেশ হলে উন্নত হতে পারবে না এমন তো কোন কথা নেই। এশিয়ার দেশ চীন পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র জাপান তিন নম্বরে। সাউথ কোরিয়ার অবস্থান দ্বাদশ নম্বরে। এছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ইজরায়েল, ইরান, ভারত অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইউরোপ অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসেছে অল্প কয়েক শত বছর আগে। মধ্যযুগ পর্যন্ত এশিয়ার দেশগুলোর ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী। সভ্যতা এবং সমৃদ্ধির নিরিখে এশিয়া যখন মধ্য গগনে তখন ইউরোপের বৃহত্তর অংশ দারিদ্র্, অশিক্ষা, কুশিক্ষা লর্ড, ব্যারন ও জমিদার শ্রেণীর অন্যায় অত্যাচারের নিগড়ে আবদ্ধ ছিল। ভাইকিংস, ভ্যানডাল, গথ, ভিসিগথ, নর্মান বর্বর জনগোষ্ঠী ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
ইউরোপে শুধুমাত্র ভূমধ্যসাগরীয় গ্রিস এবং রোম সাম্রাজ্য প্রগতির আলোকবর্তিকা হিসেবে পৃথিবীতে অবদান রাখতে পেরেছিল। এদিকে এশিয়ায় মেসোপটেমিয়া, পারস্য, চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সিন্ধু অববাহিকার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা, উত্তর ভারতে আর্য বা বৈদিক সভ্যতা ও আনাতোলিয়া ও মঙ্গোলীয় অঞ্চল ছিল সভ্যতার সূতিকাগার। সপ্তম শতাব্দি থেকে চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ ইসলামিক সভ্যতা পৃথিবী শাসন করে। তুর্কির অটোমান সাম্রাজ্য ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ১৯১৮ সাল নাগাদ প্রায় ৭০০ বছর পুরো বলকান অঞ্চল পদানত করে রাখে।
ইউরোপ উন্নতির এবং সভ্যতার পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পায় ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জায়েদের নেতৃত্বে ইউরোপের আন্দালুসিয়া দখল করার পর ইসলামি শাসন আমলে । তাদের সংস্পর্শে শিক্ষা-দীক্ষার সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত হয়ে রেনেসাঁর সূচনা হয়। রেনেসাঁর হাত ধরেই সূচনা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন। এমনকি সক্রেটিস, অ্যারিস্টোটল এবং অন্যান্য গ্রিক মনীষীর চিন্তা ভাবনা, দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় ঘটে স্পেনের মুরদের মাধ্যমে।
ওদিকে আটলান্টিকের অপর প্রান্তে কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করে, তখন প্রাক কলাম্বিয়ান যুগে মায়া, ইনকা, আজটেক, মাচুপিচু সভ্যতা ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের চেয়ে উন্নত ছিল। অস্ত্র, বর্বরতা ও শঠতার মাধ্যমে তারা সেসব সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়।
এবার আপনার সিঙ্গাপুরের কথায় আসা যাক। এক চিলতে দ্বীপ হয়েও সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের বিস্ময়কর সাফল্যে অবাক হওয়ারই কথা।
মালয়েশিয়ার লেজে এক চিলতে দ্বীপ সিঙ্গাপুর
মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর যুগল-বন্ধন
সিঙ্গাপুর প্রায় ১০০ বছর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সিঙ্গাপুর দখল করে নিলে ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ার সাথে যোগ দেয়। নাম হয় ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া।
দুই ভূখণ্ডের মিল মহব্বত বেশি দিন টেকে নাই। প্রধান কারণ, জাতিগত বিভেদ। সিঙ্গাপুরের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল চাইনিজ , এক-তৃতীয়াংশ মালয় বংশোদ্ভূত। দুই গ্রুপের ধর্ম ও কালচার আলাদা। দুই দলের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি লেগেই থাকত। একত্রিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠল। ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করে দেয়।
মালয়েশিয়া বহিষ্কার করে দেওয়ার পর সিঙ্গাপুরের সমস্যা ছিল পাহাড় পরিমাণ। দ্বীপের দুইপাশে দুইটি বৈরী রাস্ট্র ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া কর্তৃক কোণঠাসা, নগরীর ৩০ লক্ষ লোকের মধ্যে বেশির ভাগই বেকার, দুই-তৃতীয়াংশ লোকের বাস বস্তিতে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, পানি সরবরাহ পয় প্রণালীর বালাই নেই, অবকাঠামো নড়বড়ে। তবে, সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ছিলেন দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতা। লী আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করলে কেউ সাড়া দেয়নি। নিজের ঘর নিজেরা সামলানোর দায়িত্ব ঘাড়ে নেন লী কুয়ান।
লী কুয়ান ১৯৬৯
১৯২৩ সালে লী কোয়ান এ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
বিশ্বায়ন এবং বাণিজ্য
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির মূল শক্তি ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। এক দেশের পণ্য আমদানি করে অন্য দেশে চালান করা। ধারনের ব্যবসার পোশাকি নাম entrepot—আড়তদারি বলাই ভালো। এ-ভাবে দালালি করে কতই বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়? কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার উপায় শিল্পায়ন কিন্তু সিঙ্গাপুরে এজন্য কোন ট্রাডিশন ছিল না, দক্ষ জনবলের অভাব ছিল। শিল্প পণ্য বিক্রি করবেই বা কার কাছে? দুপাশে দুটো রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রতি নাখোশ। বড্ড কঠিন অবস্থা।
উপায়ান্তর না দেখে সিঙ্গাপুর আশে পাশের দেশগুলো পাশ কাটিয়ে বৃহত্তর বিশ্ব অর্থনীতির অঙ্গনের প্রতি দৃষ্টি প্রসারিত করে। লী কুয়ান ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেন এবং বহুজাতিক কোম্পানীদের শিল্প স্থাপনের জন্য সাদরে আমন্ত্রণ জানান।
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা
সিঙ্গাপুর নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সহনীয় ট্যাক্সের হার ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় বাতাবরণ তৈরি করে।
এজন্য অবশ্য নাগরিকদের অনেক মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। স্বৈরাচারী সরকার বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে এও ঠিক, অমলেট বানাতে হলে ডিম ভাঙতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, মারের উপর ঔষধ নেই।
লী কুয়ান ডিম ভাঙ্গা নীতি অবলম্বন করেন। কাউকে মাদক ব্যবসা কিংবা দুর্নীতির জন্য ধরা পড়লে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু শ্রমিক ইউনিয়ন একীভূত করে একটি মাত্র ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। তারা সংঘর্ষের পরিবর্তে সরকারের সাথে সহযোগিতা করে। এক একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের কোনো সুযোগ রাখা হয় নাই। সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্টে লীর রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র অধিপতি। অভিমান করে সমাজতান্ত্রিক পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাতে লীর বয়েই গেল। বরং আপদ দূর হলো। দুই-এক জন বিরোধী দলের সাংসদদের পার্লামেন্টে বসে হাই তুলে ঝিমোনো ছাড়া তেমন কোনো দায়িত্ব ছিল না।
দক্ষিণ এশিয়ার মত সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক গণতন্ত্র, ধর্মের জিগির তুলে কেউ রাজনীতি কলুষিত কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করলে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। লোয়ার কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, রিট পিটিশন নানা বাহানায় আইনের জাল থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। ২০১০ সালে লী আমেরিকার এক সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন যে, ‘আমি বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কাউকে কাউকে আটকে রাখার জন্য দুঃখিত, কিন্তু দেশের স্বার্থটাই আমার কাছে বড় কথা।
কঠোর আইনের শাসন
সিঙ্গাপুরে আইনের শাসন বড় কড়া। রাস্তায় চকলেটের মোড়ক বা সিগারেটের বাকি অংশ রাস্তায় ফেললে জরিমানা ৩০০ সিঙ্গাপুর ডলার। (সিঙ্গাপুর ডলার ১=টাকা ৬৪, ইন্ডিয়ান রুপি ৫৫)। বিচিত্র কঠোর আইনের আরো কয়েকটা শোনা যাক। সে দেশে যাওয়ার আগে তা জানা থাকলে কাজে লাগবে।
সিঙ্গাপুরে রাস্তায় গান-বাজনা বা কুরুচিপূর্ণ সংগীত চর্চা করলে জরিমানা ও তিন মাস পর্যন্ত জেলের ঘানি টানতে হতে পারে। অন্য কারো ওয়াইফাইয়ে সংযোগ করে হ্যাকিং করলে তিন বছরের জেল, ১০,০০০ ডলার জরিমানা।
রাস্তায় কবুতরকে উচ্ছিষ্ট খাবার খাওয়াতে নিক্ষেপ করলে জরিমানা ৫,০০০ ডলার। পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ না করে সটকে পড়লে জরিমানা ১৫০ ডলার।
জনসমাগমস্থলে ধূমপান করলে জরিমানা অন্তত ১৫০ ডলার। চুইংগাম নিষিদ্ধ; দোকানি চুইংগাম বিক্রি করলে জরিমানা ১০,০০০ ডলার।
রাস্তায় থুতু ফেললে জরিমানা ১,০০০ ডলার। কেউ দেখছে না ভেবে থুথ ফেললে, কোন এক অদৃশ্যালোক থেকে পুলিশ এসে হাজির হবে।
ফাঁকা লিফট পেয়ে মূত্রাশয়ের চাপ লঘু করতে যদি ভেবে থাকেন কেউ তো আর দেখছে না, কাজটা সেরে নেই, তাহলে ধরা খেয়ে যাবেন। লিফটে পেশাবের গন্ধ শোকার যন্ত্র লাগানো আছে। ব্যস, লিফটের দরজা বন্ধ পুলিশ এসে হাজির। তারপর জেল-জরিমানা।
এজন্য বলা হয় সিঙ্গাপুর ফাইন সিটি। ফাইনের এক অর্থ সুন্দর, অন্য অর্থ জরিমানা।
সিঙ্গাপুরের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে, ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প প্রসারের জন্য অবকাঠামো উন্নত। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কোন বাঁধা আমলে আনে নি। স্থানাভাবের কারণে মালয়েশিয়া থেকে মাটি কিনে এনে সমুদ্র ভরাট করে সিঙ্গাপুরে অত্যাধুনিক চাঙ্গি এয়ারপোর্ট তৈরি করেছ।
সিঙ্গাপুর চাঙ্গি এয়ারপোর্ট। মালয়েশিয়া থেকে মাটি আমদানি করে সমুদ্র ভরাট করে তৈরি করা হয়।
চাঙ্গি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ফ্লাওয়ার গার্ডেন
অর্থনৈতিক সাফল্য
কঠোর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। ১৯৬০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র মার্কিন ডলার ৩২০। এখন সে দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে অনুমিত মাথাপিছু আয় ৬২,০০০ মার্কিন ডলার। অবিশ্বাস্য অর্জন বৈকি!
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামো
শিল্প-বাণিজ্য উন্নয়নের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর মানব সম্পদ উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রচুর সংখ্যক টেকনিক্যাল স্কুল খুলেছে, বিদেশ থেকে এক্সপোর্ট এনে তথ্যপ্রযুক্তি পেট্রোকেমিক্যাল ইলেকট্রনিক এবং অন্যান্য প্রয়োজন মোতাবেক দক্ষ জনবল গড়ে তুলেছে। আমাদের দেশের মত উদ্দেশ্যহীন ভাবে বাস্তবতাবিমুক ডিসিপ্লিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয় না।
সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। ওজনের ভিত্তিতে পণ্য ওঠানামা হিসেবে পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়, শুধু মাত্র সাংহাই বন্দরের পিছনে। উপমহাদেশের অনেক পণ্য বড় বড় জাহাজে প্রথমে সিঙ্গাপুরে এনে ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়।
সিঙ্গাপুর সমুদ্র বন্দর। সিঙ্গাপুরের দুটো সমুদ্র বন্দর পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দর।
পর্যটন শিল্প উন্নয়ন করার জন্য অনেক ধরনের আকর্ষণীয় ভ্রমণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বছরে প্রায় এক কোটি ভ্রমণপিপাসু মানুষ সিঙ্গাপুরে আসে। সম্প্রতি পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বহুমুখী দুটো ক্যাসিনো উদ্বোধন করা হয়েছে।
আলো ঝলমল বিলাসবহুল হোটেল
সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং যুগোপযোগী। সুইজারল্যান্ডের অনেক আমানত এখন সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের কালো টা আন্তর্জাতিক অর্থ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে লেনদেনের জন্য সিঙ্গাপুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে আশেপাশের দেশ থেকে অজস্র মানুষ ভিড় জমায়। সে ভীড়ে যোগ দেয় বাংলাদেশের বিত্তবানরা। শোনা যায়, একবার লি কোয়ান কোন একটা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিদেশে চিকিৎসা করার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। নিজ দেশেই সে অসুখের চিকিৎসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ হন।
আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিখ্যাত মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল
দীর্ঘ ২৫ বছর কঠোর হস্তে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে লী ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন তবে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসাবে ২০০৪ সাল নাগাদ শাসনকার্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সার্বিক মূল্যায়ন
১৯৬০ সালে যেখানে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৩২০ মার্কিন ডলার, তা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। লি কুয়ান ইউ-এর কঠোর কিন্তু দূরদর্শী নীতি প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ দিয়ে একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিভাগ: পরিবেশ ও প্রকৃতি
প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক ও পরিবেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দল
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | বিকেল ০৪:১৬ (বিএসটি)
বিশেষ প্রতিবেদন: আন্তর্জাতিক নদীর বহমান স্রোত কোনো নির্দিষ্ট দেশের একক সম্পদ নয়—আন্তর্জাতিক নদী আইনে এটি স্বীকৃত নীতি। তবে দীর্ঘ ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের একতরফা ফারাক্কা বাঁধের পরিচালনা বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য নদী মরুময়তা, খরা, লবণাক্ততা এবং আকস্মিক বন্যার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চলমান ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা বাঁধের সৃষ্টি, এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
১. ফারাক্কা বাঁধ কী এবং কেন এটি নির্মাণ করা হয়েছিল?
ফারাক্কা বাঁধ হলো গঙ্গা নদীর ওপর ভারত কর্তৃক নির্মিত ২,২৪০ মিটার (প্রায় ২.২৪ কিমি) দীর্ঘ একটি ব্যারেজ। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলায় অবস্থিত। ১৯৬১ সালে কাজ শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়।
ভারতের ঘোষিত উদ্দেশ্য:
- কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষা: ভারতের প্রধান যুক্তি ছিল গঙ্গার শাখা নদী হুগলী-ভাগীরথীতে পলি জমে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা কমে যাচ্ছে। গঙ্গা নদী থেকে ফিডার ক্যানেলের (Feeder Canal) মাধ্যমে পানি সরিয়ে হুগলী নদীতে ফেলে পলি পরিষ্কার করা এবং সেখানে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ ভেড়ানোর পথ সুগম করাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।
- নগরীর পানি সরবরাহ ও যোগাযোগ: কলকাতা মহানগরীর সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ এবং উত্তর ও দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগ সহজ করা।
২. ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশে সৃষ্ট বহুমুখী ক্ষতি

উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও বাস্তুতন্ত্রে যে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
[ ফারাক্কা বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব ]
│
┌────────────────────────────────────────┼────────────────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ নদী ও ভৌগোলিক খরা ] [ সুন্দরবন ও বাস্তুতন্ত্র ] [ কৃষি ও মৎস্য সম্পদ ]
• শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি হ্রাস ও মরুময়তা • মিষ্টি পানি কমে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ • ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি লবণাক্ত
• বর্ষায় একযোগে গেট খুলে আকস্মিক বন্যা • সুন্দরী গাছের 'শীর্ষ মরণ' রোগ বৃদ্ধি • ইলিশ ও গাঙ্গেয় ডলফিনের বিনাশ
ক) মরুময়তা ও বর্ষায় কৃত্রিম বন্যা
- শুষ্ক মৌসুমে খরা: জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশে পদ্মার পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে পদ্মা এবং এর শাখা নদীগুলো (গড়াই, মধুমতি, মাথাভাঙা) শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়।
- বর্ষায় বন্যা ও নদীভাঙন: বর্ষাকালে উজানে পানি অতিরিক্ত বেড়ে গেলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজ্য বাঁচাতে ফারাক্কার সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙন তৈরি করে।
খ) সুন্দরবনের ওপর মারাত্মক আঘাত
- লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি: গড়াই ও মধুমতি নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে মিষ্টি পানির প্রবেশ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি সুন্দরবনের গভীরে ঢুকে পড়ে।
- সুন্দরী গাছের ‘শীর্ষ মরণ’ (Top Dying Disease): মাত্রাতিরিক্ত লোনা পানির কারণে বনের প্রধান প্রজাতি সুন্দরী গাছ ওপর থেকে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বনের প্রায় ২৮-৩০% সুন্দরী গাছ এই রোগে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- বন্যপ্রাণীর পানীয় জলের সংকট: মিষ্টি পানির জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ অন্যান্য প্রাণীর পানের পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
গ) কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি
- আবাদি জমিতে লোনা পানি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ হেক্টরের বেশি কৃষি জমি লোনা পানির আগ্রাসনে পড়ে অনুর্বর হয়ে পড়েছে।
- ইলিশের পরিযায়ন পথ অবরুদ্ধ: ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সাগর থেকে নদীর গভীর ও মিষ্টি পানির উজান স্রোতে উঠে আসে। ফারাক্কার কারণে পানির গভীরতা কমে মোহনায় চর জাগায় ইলিশের এই ঐতিহ্যবাহী পরিযায়ন পথ ধ্বংস হয়ে গেছে।
৩. ফারাক্কা বাঁধ ইস্যুতে ভারত কেন অনমনীয় ও আগ্রাসী অবস্থান নেয়?

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গঙ্গা পানি বণ্টন ও ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের অনমনীয় কৌশলের পেছনে প্রধান ৪টি ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করে:
১. ‘আপার রিপারিয়ান’ বা উজানের দেশের সুবিধাজনক অবস্থান
ভৌগোলিক কারণে ভারত গঙ্গার উজান অঞ্চলে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক জলনীতিতে ভারত এই ‘উজান রাষ্ট্রের অবস্থান’-কে একটি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যাতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা যায়।
২. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অঙ্গরাজ্যগুলোর বিরোধিতা
ফারাক্কা ইস্যুটি শুধু দুই দেশের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের নিজস্ব রাজ্যগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সাথে যুক্ত:
- বিহারের আপত্তি: বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজানে (বিহারে) গঙ্গা নদীতে অস্বাভাবিক পলি জমছে এবং প্রতি বছর রেকর্ড বন্যা হচ্ছে। তাই বিহার চায় বাঁধটি হয় ভেঙে ফেলা হোক, না হয় পানির পুনর্মূল্যায়ন করা হোক।
- পশ্চিমবঙ্গের অনমনীয়তা: পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেদের কৃষি ও কলকাতা বন্দরের দোহাই দিয়ে গঙ্গার প্রবাহের একটি ফোঁটাও বাংলাদেশকে দিতে সম্মত হতে চায় না।
৩. দ্বিপাক্ষিক বনাম অববাহিকাভিত্তিক (Basin-wide) আলোচনা
গঙ্গার পানির বড় অংশ আসে নেপালের নদীগুলো থেকে। আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞরা বহুপাক্ষিক বা অববাহিকাভিত্তিক (বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল) চুক্তির পরামর্শ দিলেও ভারত বিষয়টি শুধুমাত্র ‘দ্বিপাক্ষিক’ আলোচনার মধ্যে আটকে রাখতে চায়, যাতে তারা দরকষাকষিতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে।
৪. ২০২৬ সালের চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ এড়ানোর চেষ্টা
১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা চুক্তিতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ (শুষ্ক মৌসুমে নদীপ্রবাহ যাই থাক না কেন বাংলাদেশকে আইনগতভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দেওয়ার গ্যারান্টি) ছিল না। ২০২৬ সালের নতুন চুক্তি নবায়নে বাংলাদেশ যাতে এই গ্যারান্টি ক্লজ জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারে, সেজন্য ভারত কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করে।
৪. সংক্ষেপে: বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপট
| বিষয় | চ্যালেঞ্জ / সমস্যা | বাংলাদেশের সম্ভাব্য সমাধান |
| ২০২৬ গঙ্গা চুক্তি নবায়ন | ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে আইনি নিশ্চয়তা না থাকা | নতুন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ও রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ডেটা শেয়ারিং যুক্ত করা। |
| একমুখী পানির নির্ভরতা | উজান থেকে পানি না পেলে নদী শুকিয়ে যাওয়া | নিজস্ব ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করে বর্ষার উদ্বৃত্ত পানি সঞ্চয় রাখা। |
| আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়োগ | দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া | ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের ‘আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার কনভেনশন’ অনুযায়ী বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করা। |
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB): গঙ্গা পানিপ্রবাহ ও ফারাক্কা পয়েন্টের ঐতিহাসিক সমীক্ষা ফাইল।
- আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন (UN 1997 Convention): আঞ্চলিক ও অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবহারের নীতিমালা।
- বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI): উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও কৃষি বিপর্যয় সম্পর্কিত রিপোর্ট।
- পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় (MOEFCC): সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের টপ-ডাইং ও ইকোসিস্টেম ক্ষয়ক্ষতি সমীক্ষা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | প্রতিবেদক: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ
বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মানচিত্রে বাঙালি বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বখ্যাত নামগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশে এমন কিছু উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাদের প্রাকৃতিক দূরদর্শিতা ও ল্যাবরেটরির আবিষ্কার বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বিজ্ঞান চর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এমন ৫ জন কৃতী ব্যক্তিত্বের বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক: কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী (১৯২২ – ২০১৭)
পূর্বে অনেকের ধারণায় “ড. হরিপদ সরকার” নামে বিভ্রান্তি থাকলেও, অতি ফলনশীল ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক কোনো ডিগ্রিধারী ডক্টর ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামের এক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন সাধারণ কৃষক।

আবিষ্কারের নেপথ্য ও বৈশিষ্ট্য:
- প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection): ১৯৯২-১৯৯৬ সালের দিকে বিআর-১১ (BR-11) ধানের জমিতে একটি ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী ধানের গোছা লক্ষ্য করেন তিনি। সেই গোছার বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ ও বপন করে তিনি এই নতুন জাতের বিকাশ ঘটান।
- কম খরচে উচ্চ ফলন: এই ধানে সার ও কীটনাশক অনেক কম লাগে এবং বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ২২ মণ ফলন পাওয়া যায়।
- জাতীয় স্বীকৃতি: তাঁর এই অবদান এখন ষষ্ঠ ও নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়।
২. বৈজ্ঞানিক গবেষণার জনক’: ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০ – ১৯৭৭)
জৈব রসায়নবিদ, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. কুদরাত-এ-খুদা দেশের স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্পায়নের পথ দেখিয়েছিলেন।

যুগান্তকারী অবদানসমূহ:
- পারটেক্স (Partex) ও বিকল্প জ্বালানি: পাটকাঠি থেকে শক্ত বোর্ড (Partex) এবং পাট থেকে বায়ো-ফুয়েল বা বিকল্প পেট্রোল তৈরির সফল সূত্র আবিষ্কার করেন।
- তেলাকুচা থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ: দেশীয় ঔষধি গাছ ‘তেলাকুচা’ থেকে ১২টি আলাদা রাসায়নিক যৌগ পৃথক করেন।
- কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭৪): স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১ম থেকে ৮ ১ম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ঐতিহাসিক সুপারিশ করেন।
৩. ‘পাটের জাদুকর’: ড. মোবারক আহমদ খান (জন্ম: ১৯৫৮)
বিজেএমসি (BJMC)-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান পাট ও পলিমার কেমিস্ট্রির ওপর গবেষণা করে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।

[ ড. মোবারক আহমদ খানের প্রধান উদ্ভাবন ]
│
┌───────────────────────────────┼───────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ সোনালী ব্যাগ ] [ জুটিন (Jutin) ] [ পাটের হেলমেট ও টাইলস ]
• পলিথিনের পচনশীল বিকল্প • পারটেক্সের মতোই মজবুত • মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য
• মাটিতে ৩-৪ মাসে মিশে যায় হালকা ও মরিচারোধী টিন হালকা ও বুলেটপ্রুফ কভার
৪. ‘সনো ফিল্টার’ ও আর্সেনিক মুক্তি: ড. আবুল হুসাম

কুষ্টিয়ার সন্তান অধ্যাপক ড. আবুল হুসাম ভূগর্ভস্থ পানির বিষাক্ত আর্সেনিক দূর করার জন্য ‘সনো ফিল্টার’ (SONO Filter) উদ্ভাবন করেন।
- বৈশ্বিক প্রভাব: অত্যন্ত কম খরচে তৈরি এই ফিল্টারটি লাখ লাখ মানুষকে আর্সেনিকযুক্ত বিষাক্ত পানি থেকে রক্ষা করেছে।
- আন্তর্জাতিক সম্মাননা: এই উদ্ভাবনের জন্য ২০০৭ সালে জাতীয় প্রকৌশল একাডেমি তাঁকে বিশ্বখ্যাত ‘গ্রেঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ’ ($1 Million) প্রদান করে।
৫. পেঁপে ও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন: ড. মাকসুদুল আলম (১৯৫৪ – ২০১৪)
ফরিদপুরের সন্তান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অণুজীব বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

- ঐতিহাসিক সাফল্য: তিনি পরপর পেঁপে, রাবার এবং বাংলাদেশের প্রাণ ‘তোষা ও সাদা পাট’-এর জেনোম সিকোয়েন্স (Genome Sequence) সফলভাবে আবিষ্কার করেন।
- কৃষি খাতে প্রভাব: এর ফলে রোগপ্রতিরোধী এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার মতো পাটের নতুন জাত উদ্ভাবনের পথ উন্মুক্ত হয়।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- বিসিএসআইআর অফিশিয়াল পেপার্স: ড. কুদরাত-এ-খুদার পেটেন্ট ও গবেষণা আর্কাইভ।
- কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালীর উদ্ভাবন ও হরি ধানের ব্যাকগ্রাউন্ড।
- ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং (USA): ড. আবুল হুসামের সনো ফিল্টার ও গ্রেঞ্জার প্রাইজ রিকগনিশন।
- বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (BJMC): ড. মোবারক আহমদ খানের সোনালী ব্যাগ প্রজেক্ট ফাইল।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাক
“বিদ্রোহী” কিংবা “সাম্যবাদী” পরিচয়ের বাইরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন এতটাই বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় যে, সাধারণ কোনো ফ্রেমে তাঁকে বন্দি করা অসম্ভব। আমরা তাঁকে চিনি আমাদের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে, অনুধাবন করি তাঁর অগ্নিঝরা কবিতার শক্তি। কিন্তু পর্দার নেপথ্যে নারদমুনির বেশে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়, ফুটবল মাঠে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে উল্লাস কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিনের নীরব মৌনব্রতের কথা কজনই বা জানেন?
ইতিহাসের পাতা ও নজরুল গবেষকদের অনুসন্ধানে বিদ্রোহী কবির জীবনের এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, যা সাধারণ পাঠকের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে।
১. আইনি জটিলতার অবসান: এখন তিনি দাপ্তরিকভাবেও ‘জাতীয় কবি’
দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে গণমানুষের হৃদয়ে ও পাঠ্যপুস্তকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট ছিল না। অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ঐতিহাসিক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
উক্ত গেজেটে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭২ সালের ২৪ মে (কবির সপরিবারে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে আগমনের দিন) থেকেই এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদাটি ভূতাপেক্ষভাবে (Retroactively) কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে নজরুলের জাতীয় কবির খেতাব সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দাপ্তরিক অস্পষ্টতার চিরসংগ্রাম শেষ হয়।
২. রূপালি পর্দায় অল-রাউন্ডার নজরুল: পরিচালক, অভিনেতা ও ‘সুর ভাণ্ডারি’

১৯৩১ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কলকাতার চলচ্চিত্রে নজরুল একাধারে সফল অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন:
[ নজরুল: টকি সিনেমার স্বর্ণযুগ (১৯৩১-১৯৪২) ]
│
┌─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ অভিনয় ] [ পরিচালনা ] [ সংগীত ]
• 'ধ্রুব' (১৯৩৪): নারদ চরিত্র • সত্যেন্দ্রনাথের সাথে যৌথভাবে • 'জামাই ষষ্ঠী'-তে সুর ভাণ্ডারি
• 'পাতালপুরী': খনি শ্রমিক 'ধ্রুব' চলচ্চিত্র পরিচালনা • 'গোরা', 'বিদ্যাপতি', 'সাপুড়ে'
• 'হাল বাংলা': রসাত্মক চরিত্র • 'বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স'-এর প্রধান ছবিতে বিখ্যাত কালজয়ী সুর
- দেবর্ষি নারদ চরিত্রে আত্মপ্রকাশ: ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে নজরুল স্বয়ং ‘নারদ’ চরিত্রে অভিনয় করেন। কেবল অভিনয়ই নয়, এই ছবির ১৮টির মধ্যে ১৭টি গান তাঁর লেখা ছিল এবং তিনি নিজে ৪টি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।
- সুর ভাণ্ডারি: ১৯৩১ সালে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’-তে সুরকার ও গায়কদের উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করায় তাঁকে সেসময় চলচ্চিত্র পাড়ায় ‘সুর ভাণ্ডারি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘গোরা’ (১৯৩৮) সিনেমার সংগীতেও তাঁর সুরের জাদুকরী ছোঁয়া ছিল।
৩. লাল-হলুদ ব্রিগেডের ইস্টবেঙ্গল সমর্থক
আজকের ফুটবল উন্মাদনার বহু আগেই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘ইস্টবেঙ্গল ক্লাব’-এর অন্ধ ভক্ত। মাঠে গিয়ে খেলা দেখার পাশাপাশি ১৯৩৪ সালে ইস্টবেঙ্গল দল যখন আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ওঠে, তখন প্রিয় ক্লাবের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উৎসাহ দিতে তিনি একটি উদ্দীপনামূলক গানও রচনা করেছিলেন।
৪. সুস্থ অবস্থাতেও বৃহস্পতিবারের ‘মৌনব্রত’
জীবনের শেষ ৩৪টি বছর নজরুল ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick’s Disease) নামের স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক কাটিয়েছেন। তবে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী ও কবি পরিবারের স্মৃতি থেকে জানা যায়—নজরুল যখন শতভাগ সুস্থ ও চঞ্চল ছিলেন, তখনও তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ হিসেবে সপ্তাহে একদিন (বৃহস্পতিবার) সম্পূর্ণ নীরব বা মৌনব্রত পালন করতেন। এই দিনটিতে তিনি কারো সাথে কথা বলতেন না।
৫. আসানসোলের রুটির দোকান থেকে ময়মনসিংহের স্কুল

আমাদের জাতীয় কবির প্রতিভা বিকাশের নেপথ্যে অন্যতম অবদান ছিল এক পুলিশ অফিসারের। আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ করা কিশোর নজরুলের অসাধারণ মেধা লক্ষ্য করে দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন তাঁকে নিজ দায়িত্বে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে এনে ভর্তি করিয়ে দেন।
পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নজরুল ‘৪৯তম বাঙালি ব্যাটালিয়ন’-এর সৈনিক হিসেবে করাচি সেনানিবাসে যোগ দেন এবং পদোন্নতি পেয়ে ‘হাবিলেদার’ পদে উন্নীত হন।
৬. রবীন্দ্রনাথের সেই ঐতিহাসিক অনশন ভাঙার বার্তা
১৯২৩ সালে রাজনৈতিক কারণে হুগলি জেলে বন্দী থাকাকালীন ব্রিটিশদের অন্যায়ের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৩৯ দিন আমরণ অনশন করেন। কবির সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন:
“GIVE UP HUNGER STRIKE. OUR LITERATURE CLAIMS YOU.”
ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ চরম হীনম্মন্যতার পরিচয় দিয়ে টেলিগ্রামটির গায়ে “Addressee not found” লিখে ফেরত পাঠায়। পরবর্তীতে মাতৃসম বিরজাসুন্দরী দেবী জেলে গিয়ে লেবুর রস খাইয়ে কবির অনশন ভাঙান।
৭. অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক
১৯২৮ সালে রচিত তাঁর ‘চল চল চল’ গানটি স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল রণসঙ্গীত (National Marching Song) হিসেবে সংরক্ষিত। তিনি একদিকে যেমন লিখেছিলেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’, তেমনি অন্য হাতে সৃষ্টি করেছিলেন ৫০০-র বেশি কালজয়ী ‘শ্যামাসঙ্গীত’ ও ভজন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালন করতেই তিনি নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের সংস্কৃতির সমন্বয়ে—’কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ’ এবং ‘কাজী অনিরুদ্ধ’।
সংগৃহীত তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
- সরকারি প্রজ্ঞাপন দাপ্তরিক কপি: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেট (২৪ ডিসেম্বর ২০২৪)।
- জাতীয় আর্কাইভ ও নজরুল ইনস্টিটিউট: কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য কর্মসংকলন।
- চলচ্চিত্র ইতিহাস গ্রন্থ: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিবৃত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম (বাংলা একাডেমি প্রকাশনা)।
- স্মৃতিগ্রন্থ: মোস্তফা জামান আব্বাসী লিখিত নজরুলের স্মৃতিকথা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



