আন্তর্জাতিক

যুক্তরাজ্যের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস: ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের একীভূতকরণের বিশ্লেষণ
যুক্তরাজ্যের স্বাধীনতা লাভের ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

November 29, 2025

শেয়ার করুন

৯২৭ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডের রাজত্ব শুরু হয়। অ্যাংলো স্যাক্সন উপজাতিসমূহ একতাবদ্ধ হয়ে কিংডম অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর, ১৩ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা প্রথম এডওয়ার্ড ওয়েলসের পশ্চিম অঞ্চলে অভিযান শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দখলকৃত অঞ্চলসমূহকে তিনি ইংল্যান্ডের অংশ হিসেবে ঘোষণা দেন। তখন ওয়েলসের শাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন ডেফিড এপি গ্রুফেইড।১২৮৩ সালের ৩ অক্টোবর, ওয়েলসের প্রিন্স ডেভিড এপির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে ওয়েলস দখল করেন রাজা এডওয়ার্ড।

(রাজা প্রথম এডওয়ার্ড; Image Source: ThoughtCo.com is the World’s Largest Education Resource)

ওয়েলস দখলের এক যুগ পর রাজা এডওয়ার্ড স্কটল্যান্ড অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করেন। স্কটল্যান্ডের ভূমিতে ইংল্যান্ডের সশস্ত্র আক্রমণের মধ্য দিয়ে প্রথম স্কটিশ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।

১৩২৮ সালে সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে এডওয়ার্ড বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় স্কটিশরা। এর পরের বছর মৃত্যুবরণ করেন রাজা রবার্ট ব্রুস

(যুদ্ধে স্কটল্যান্ডকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রবার্ট ব্রুস; Image Source: Culture Club)

তার মৃত্যুর পর স্কটল্যান্ডের সিংহসানে বসেন পুত্র ডেভিড। তরুণ রাজাকে দুর্বল ভেবে ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে আবারও স্কটল্যান্ড অভিমুখী অভিযান শুরু করেন তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ড। স্কটিশদের বিপক্ষে প্রথমবার পরাজয়ের পর ওয়েলসে নিজেদের পূর্ণক্ষমতা অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন রাজপরিবারের সদস্যরা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ নিয়ম অনুসারে একজন করে রাজপরিবারের সদস্যকে প্রশাসনিক কাজে ওয়েলসে নিয়োগ দেয়া হতো। যিনি ওয়েলসের দায়িত্ব পেতেন, তাকে বলা হয় ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের পুত্র চার্লস এখন অবধি প্রিন্স অব ওয়েলস হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। এছাড়াও তার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকার সুবাদে ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্যতম পরিচিত মুখ প্রয়াত লেডি ডায়ানাকে ‘প্রিন্সেস অব ওয়েলস’ বলা হতো।

১৫৩৬ সালে তখনকার রাজা অষ্টম হেনরি নতুন ইউনিয়ন আইন পাস করে ওয়েলসকে ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করে ইংল্যান্ডে প্রচলিত সকল আইন সেখানেও প্রবর্তন করেন। সেই হিসেবে বলা যায়, ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়া প্রথম দেশ ওয়েলস। রাজা হেনরি প্রবর্তিত নতুন আইনের মধ্য দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্যের পথচলা শুরু হয়।

১৬০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন রানী প্রথম এলিজাবেথ। তার মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডের নতুন শাসক নির্বাচিত হন তার বোনের একমাত্র ছেলে জেমস। ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে জেমস স্কটল্যান্ডের রাজার দায়িত্ব পালন করেন। উভয় দেশের রাজা হওয়া সত্ত্বেও জেমস রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে স্কটল্যান্ডকে ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেননি। এর পরের একশো বছরে একাধিকবার চেষ্টা করেও স্কটল্যান্ডকে ইংল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেনি দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।

(রানী অ্যানির সঙ্গে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের প্রতিনিধি দল; Image Source: The Print Collector/Getty Images)

এই প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে। রানী অ্যানির তত্ত্বাবধানে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ড এক হয়ে ‘গ্রেট ব্রিটেন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও দেশ দুটির এক হওয়াকে ইংল্যান্ডের রাজপরিবার কর্তৃক কূটনৈতিক কিংবা সামরিক সফলতা হিসেবে দেখছেন না কয়েকজন ইতিহাসবিদ।

আয়ারল্যান্ডের প্রথম রাজা ছিলেন রানী প্রথম এলিজাবেথ ও রানী মেরির পিতা অষ্টম হেনরি; সর্বশেষ রাজা ছিলেন তৃতীয় জর্জ। জর্জ ১৮০১ সালে গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডকে একীভূত করে ইউনাউটেড কিংডম কিংবা যুক্তরাজ্য গঠন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

(যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র; Image Source: Pop_jop/Getty Images)

মূলত স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ১৭০৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিটিই আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ১৮০১ সালে একতাবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

Magna Carta’ একটি ল্যাটিন শব্দ,যার অর্থ মহা সনদ। ১৫ জুন ১২১৫ সালে সামন্তদের ( ভূস্বামী বা ব্যারন নামেও পরিচিত) ইংল্যান্ড এর রাজা জন এই চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য হন। এই চুক্তি মানবাধিকারের মহাসনদ নামেও পরিচিত। এই চুক্তির ধারাগুলো্র উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয় এবং আইনের শাসনের ভিত্তি রচিত হয়। ম্যাগনাকার্টা হল ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের বাইবেল এবং ইংল্যান্ডের প্রথম শাসনতন্ত্র

(১২১৫ সালের ১৫ই জুন রাজা জন ম্যাগনা কার্টায় স্বাক্ষর করেছিলেন)

এই ম্যাগনাকার্টা চুক্তির মধ্য দিয়েই সংসদীয় গণতন্ত্রের পাশাপাশি আইনের শাসনের ধারণার যাত্রাও শুরু হয়।

এই ঐতিহাসিক সনদেই বিশ্ব ইতিহাসে সর্বপ্রথম ঘোষণা করা হয় কোনো দেশের রাজাসহ সে দেশের সকলেই রাষ্ট্রীয় আইনের অধীন, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।

কিং জন (১১৬৭-১২১৬)

পটভূমিঃ

ইংল্যান্ডের অজনপ্রিয় রাজা জন ও বিদ্রোহী ব্যারনদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখার জন্য যে চুক্তি করা হয়, সেটিই ম্যাগনাকার্টা বা গ্রেট চার্টার নামে পরিচিত। রাজা জনের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বেশ কিছু জমি ছিল ফ্রান্সে। ১২০৪ সালে ওই সম্পত্তির অধিকাংশই হাতছাড়া হয়। সম্পত্তি ফিরে পেতে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন জন। অর্থ জোগান দিতে রাজ্যে কর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ব্যয়ভার বহন করতে হয় ব্যারনদের। যুদ্ধ ঠিকই হয়; কিন্তু জিততে পারেনি জন। ফলে রাজা ও ব্যারনদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। রাজা অন্যায়ভাবে জবরদখল শুরু করে। কদিন পর পরই চালু করে নতুন কর। একপর্যায় ব্যারনরা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ও শান্তিচুক্তির প্রস্তাব দেয়। ব্যারনদের বিদ্রোহের মুখে জন শান্তিপ্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১২১৫ সালের ১৫ জুন রানিমেইড নামক স্থানে বসে কিং জন চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে।আর্চবিশপ অব ক্যান্টারবেরি দ্বারা লিখিত চুক্তিটিতে চার্চের অধিকার সুরক্ষিত রাখা হয়। অন্যায়ভাবে ব্যারনদের কারাবাস থেকে সুরক্ষাসহ রাখা হয় সকলের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার। সামন্তরা কোন শর্তে কী পরিমাণ অর্থ রাজকোষাগারে দেবেন এ ব্যাপারে উল্লেখ থাকে চুক্তিটিতে। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য রাখা হয় ব্যারনদের ২৫ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদ।

যুক্তরাজ্য অনেকগুলো দ্বীপ নিয়ে গঠিত। দ্বীপগুলোকে একত্রে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ নামে অভিহিত করা হয়। এদের মধ্যে সর্ববৃহৎ দ্বীপটির নাম বৃহৎ ব্রিটেন বা গ্রেট ব্রিটেন। গ্রেট ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল ভাগটির নাম ইংল্যান্ড, যা দ্বীপের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশ গঠন করেছে। পশ্চিম অংশে আছে ওয়েলস এবং উত্তরে স্কটল্যান্ড। আয়ারল্যান্ড দ্বীপের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে উত্তর আয়ারল্যান্ড (যুক্তরাজ্য অধিকৃত আয়ারল্যান্ড) অবস্থিত, । আয়ারল্যান্ড দ্বীপ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ২য় বৃহত্তম দ্বীপ। এই দ্বীপের সিংহভাগ জুড়ে অবস্থিত আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্তরাজ্যের একমাত্র স্থল সীমান্ত রয়েছে। যুক্তরাজ্যের বাকী অংশকে আটলান্টিক মহাসাগর, উত্তর সাগর, ইংলিশ চ্যানেল এবং আইরিশ সাগর ঘিরে রেখেছে। গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপটি চ্যানেল টানেলের মাধ্যমে ফ্রান্সের সাথে যুক্ত। এছাড়াও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকালীন সময়ে হস্তগত ১৪টি বহিঃস্থ এলাকা এখনও যুক্তরাজ্যের অধীনে রয়েছে।

(রাজকীয় কুলচিহ্ন)

ব্রিটেন একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাষ্ট্রপ্রধান। এখানে একটি সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা বিদ্যমান। লন্ডন শহর যুক্তরাজ্যের রাজধানী; এটি ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। সমগ্র যুক্তরাজ্যকে ব্রিটেন নামেও ডাকা হয়। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের অধিবাসীরা সবাই ব্রিটিশ। আবার ইংল্যান্ডের অধিবাসীরা ইংরেজ, ওয়েলসের অধিবাসীরা ওয়েলশ, যুক্তরাজ্য অধিকৃত আয়ারল্যান্ডের অধিবাসীরা আইরিশ এবং স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা স্কটিশ হিসেবে পরিচিত।

(ইউনাইটেড কিংডমের চার দেশের পতাকা; Image Source: metro.uk.com)

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা। উইকিপিডিয়া। roar.media › main › history › h… স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক

নিউজ ডেস্ক

June 12, 2026

শেয়ার করুন

অর্থনীতি ও জাতীয় নীতি বিশ্লেষণ | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬

জাতীয় বাজেট কেবল কিছু শুষ্ক সংখ্যার হিসাব কিংবা আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, এটি একটি দেশের রাজনৈতিক দর্শন, সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক পরিস্থিতির এক একটি জীবন্ত দলিল। বাংলাদেশের বাজেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর একটি অত্যন্ত অনন্য, জটিল এবং ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক (আজিজুর রহমান মল্লিক) কর্তৃক উপস্থাপিত এই বাজেটটি যেমন ছিল আকারের দিক থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একটি সাহসী পদক্ষেপ, তেমনি এর ভেতরের অর্থনৈতিক কৌশল এবং উপস্থাপনা শৈলীও ছিল রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য নজির।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন প্রথম দশকের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন বাজেটের দর্শন এবং মেকানিজম ছিল এক রকম। আর আজ ২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে যখন দেশের নতুন অর্থবছর (২০২৬-২৭)-এর প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তন। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই ১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকার বাজেট এবং ২০২৬ সালের জুনে ঘোষিত বর্তমান সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন) মেগা বাজেটের মধ্যে একটি নিবিড় তুলনামূলক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. এক নজরে দুই বাজেটের মূল উপাত্ত ও সংখ্যাতাত্ত্বিক তুলনা

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বাজেট কেবল আকারেই বাড়েনি, বরং এর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও অর্থনীতির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। নিচে একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:

অর্থনৈতিক নির্দেশক (Indicators)১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটপরিবর্তনের ধরন ও রূপান্তর
বাজেটের মোট আকার১,৫৪৯.৪৮ কোটি টাকা৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন)প্রায় ৬০৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উন্নয়ন বাজেট (ADP)প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা২,৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি (চলতি মেয়াদে)ভৌত এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশাল বরাদ্দ বৃদ্ধি।
রাজস্ব/অনুন্নয়ন ব্যয়প্রায় ৫৯৯.২৪ কোটি টাকা৬,০৮,০০০ কোটি টাকা (অনূমিত)রাষ্ট্রীয় পরিচালনা ও সেবার পরিধি ব্যাপক বৃদ্ধি।
বাজেট উপস্থাপনের মাধ্যমসংসদে সরাসরি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পঠিত।মাল্টিমিডিয়া ও আধুনিক ডাটা অ্যানালিটিক্সসহ চলিত ভাষায়।আভিজাত্য বনাম আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।
মূল অর্থনৈতিক দর্শনযুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও সমাজতান্ত্রিক ত্রাণ-ভিত্তিক।মুক্তবাজার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি লক্ষ্য।বেঁচে থাকার লড়াই থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন।

২. গভীর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (Macroeconomic Analysis)

ক. স্বনির্ভরতা বনাম বৈদেশিক নির্ভরতার চিত্র বদল:

  • ১৯৭৫-৭৬ এর চিত্র: তৎকালীন সময়ে ড. এ. আর. মল্লিকের উন্নয়ন বাজেটের সিংহভাগই (প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%) আসত বৈদেশিক সাহায্য, অনুদান এবং বিদেশী ঋণের মাধ্যমে। বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণ “সাহায্য-নির্ভর” (Aid-dependent) একটি দেশ ছিল। নিজস্ব সম্পদ সীমিত থাকায় বৈশ্বিক দাতাগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত।
  • ২০২৬ এর চিত্র: বর্তমানের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, বাজেটের সিংহভাগ অর্থই এখন দেশের নিজস্ব কর (NBR Tax) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসে। বৈদেশিক ঋণ এখন বাজেটের ঘাটতি পূরণের একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র (ঘাটতি প্রাক্কলন ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা), যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্বাবলম্বী।

খ. ব্যয়ের অগ্রাধিকার পরিবর্তন (Sectoral Shifts):

  • ১৯৭৫-৭৬ এর অগ্রাধিকার: সেই সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের খাদ্য ঘাটতি দূর করা এবং মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। তাই বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ খাতে। এর পাশাপাশি ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা (রেলওয়ে ও ব্রিজ) মেরামতের জন্য বড় অংকের বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।
  • ২০২৬ এর অগ্রাধিকার: ২০২৬ সালের বাজেটে শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি। এখনকার বড় বরাদ্দ যায় মেগা অবকাঠামো (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি সেক্টর) এবং সামাজিক security বা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ এখন উন্নত ও স্মার্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

গ. জীবনযাত্রার মান ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব:

১৯৭৫ সালের ১,৫৪৯ কোটি টাকা এবং ২০২৬ সালের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল পার্থক্যের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো দেশের জিডিপি (GDP)-র আকার বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি (Inflation)। ১৯৭৫ সালে যে পণ্যটির দাম ছিল ১ টাকা, মুদ্রাস্ফীতির কারণে আজ তার মূল্য বহু গুণ বেড়েছে। তবে একই সাথে মানুষের মাথাপিছু আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই রাষ্ট্র আজ এত বড় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাহস দেখাতে পারছে।

৩. বাংলাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রম: সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় বাজেট বক্তৃতা

বাংলাদেশের বাজেট বক্তৃতার ইতিহাসে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেটটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে এর ভাষারীতি ও উপস্থাপন শৈলীর কারণে।

  • ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং একমাত্র অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর পুরো বাজেট বক্তৃতাটি সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় পেশ করেছিলেন।
  • ভাষাগত গাম্ভীর্য: সাধারণত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিবরণী চলিত ভাষায় পেশ করা হলেও, ড. মল্লিক বাংলা ভাষার তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাকরণগত আভিজাত্য বজায় রেখে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ সাধু ভাষায় এই বাজেট উপস্থাপন করেন, যা দেশের সংসদীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি স্থায়ী ব্যতিক্রমী রেকর্ড হিসেবে গণ্য হয়।

৪. political বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও এই বাজেটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের এই বাজেটটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম এবং স্পর্শকাতর পটপরিবর্তনের সাক্ষী।

  • বাজেট পেশের সময়কাল: ড. এ. আর. মল্লিক এই বাজেটটি পেশ করেছিলেন ১৯৭৫ সালের জুন মাসে। এটি ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) সরকারের সময়কার শেষ বাজেট।
  • বাস্তবায়নের সময়কাল: বাজেটটি পাস হওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। ফলে, ড. মল্লিকের পেশ করা এই বাজেটটি প্রণয়ন হয়েছিল এক রাজনৈতিক দর্শনে, কিন্তু এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটেছিল ১৫ আগস্ট পরবর্তী সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এই কারণেও এই বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ‘উত্তাল মেয়াদের বাজেট’ বলা হয়।

৫. রাজনৈতিক দর্শন ও শাসন ব্যবস্থার রূপান্তর

  • ১৯৭৫-৭৬ এর প্রেক্ষাপট: সেটি ছিল যুদ্ধোত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং পরবর্তীতে এক উত্তাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের বছর। রাষ্ট্র তখন সমাজতান্ত্রিক ধারার অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সচল ছিল।
  • ২০২৬ এর প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের নতুন সরকার ও বাজেট সম্পূর্ণ মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free-market economy) এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এখনকার মূল দর্শন হলো “অর্থনৈতিক লোকসানি রাষ্ট্র” থেকে বের হয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরি করা।

পরিচিতি: অর্থমন্ত্রী ড. এ. আর. মল্লিক

ড. আজিজুর রহমান মল্লিক (ড. এ. আর. মল্লিক) ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং কুশলী টেকনোক্র্যাট।

  • তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য (Founder Vice-Chancellor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসে (বিশেষ করে ভারতে) ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং তহবিল সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
  • দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি প্রথমে共和国 বা প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ আমলা (যুগ্ম-সচিব ও রাষ্ট্রদূত) এবং পরবর্তীতে টেকনোক্র্যাট কোটায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন

১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের ১,৫৪৯ কোটি টাকার বাজেটটি যদি বাংলাদেশের শৈশবকালীন “হামাগুড়ি” দেওয়ার গল্প হয়, তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটটি হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের “সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দৌড়ানোর” প্রত্যয়। ভাষার আভিজাত্য থেকে শুরু করে ডলারের অঙ্কে রূপান্তর—সব মিলিয়ে এই দুই বাজেটের ব্যবধান আসলে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী ও উদীয়মান অর্থনৈতিক সিংহ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ৫০ বছরের জীবন্ত ইতিহাস। ড. এ. আর. মল্লিকের সেই সাধু ভাষার বাজেট বক্তৃতা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক ওঠানামা প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় বাজেট কেবল কিছু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ইতিহাসের এক একটি বাঁক বদলের গল্প।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. বাংলাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আর্কাইভ: স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ থেকে শুরু করে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত জাতীয় বাজেট ও অর্থমন্ত্রীদের বক্তৃতা সংকলন এবং বার্ষিক প্রতিবেদন।

২. জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও পরিকল্পনা কমিশন রেকর্ডস: ঐতিহাসিক সংসদীয় কার্যবিবরণী, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ১৯৭৫ সালের অর্থ বিলের নথিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ঐতিহাসিক ডাটাবেজ।

দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, জাতীয় বাজেট এবং সমসাাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

বেগম খালেদা জিয়া

নিউজ ডেস্ক

June 12, 2026

শেয়ার করুন

রাজনীতি ও জাতীয় কূটনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন গৌরবময় ও অর্জনে ভরা, তেমনি তা তীব্র সমালোচনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক রসালাপে ভরপুর। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রাজপথের আপসহীন নেতৃত্ব থেকে শুরু করে গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এক অনন্য ইতিহাস রয়েছে তাঁর।

১২ জুন ২০২৬ তারিখে এসে যখন তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়কে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তাঁর নেওয়া দেশের কাঠামোগত ইতিবাচক নীতিগুলোর পাশাপাশি তাঁর আমলের তীব্র রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও অন্দরমহলের নানা বিতর্কিত অধ্যায়ও সমানভাবে সামনে চলে আসে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রথম অংশ: রাষ্ট্র গঠনে অবদানের খতিয়ান (ইতিবাচক দিকসমূহ)

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পেছনে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক অবদান রয়েছে, যা দেশের উন্নয়ন সূচকে বড় ভূমিকা রেখেছে:

১. নারী শিক্ষার বিপ্লব ও উপবৃত্তি প্রবর্তন:

নব্বইয়ের দশকে গ্রামীণ নারীদের স্কুলমুখী করতে এবং বাল্যবিয়ে রোধে তাঁর সরকার দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা এবং বিশেষ উপবৃত্তি (Stipend) চালু করে। এই একটিমাত্র পলিসি বাংলাদেশের নারী শিক্ষার হারে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল।

২. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যমুনা সেতু:

উত্তরবঙ্গের সাথে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া ‘যমুনা বহুমুখী সেতু’ (বঙ্গবন্ধু সেতু)-র সিংহভাগ অর্থায়ন ও নির্মাণ কাজ তাঁর সরকারের (১৯৯১-৯৬) আমলেই বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

৩. মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মিডিয়ার আধুনিকায়ন:

তাঁর আমলেই বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সূচনা ঘটে। বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং মোবাইল ফোন কোম্পানির লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল।

৪. কৃষি খাতের সংস্কার ও সামাজিক বনায়ন:

কৃষকদের জন্য সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, সেচ কাজে শুল্ক ছাড় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ‘সামাজিক বনায়ন’ কর্মসূচিকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় আন্দোলনে রূপ দিয়েছিল তাঁর সরকার।

দ্বিতীয় অংশ: ক্ষমতার অন্দরমহলের ব্যর্থতা, সমালোচনা ও রসালাপ

ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়ার অবদান যেমন সত্য, ঠিক তেমনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কার কিছু সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তীব্র সমালোচনা ও রসালো ট্রোলের খোরাক জুগিয়েছে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে এবং রাজনৈতিক রসালাপে তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সংসদীয় বক্তব্য ও ২১ আগস্টের ‘ভ্যানিটি ব্যাগ’ তত্ত্ব:

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল সংসদে দাঁড়িয়ে বা জনসভায় দেওয়া কিছু বক্তব্য, যা গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে লোককাহিনির মতো শোনাত। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করেছিলেন যে—”শেখ হাসিনা নিজেই তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ট্রাকে করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন।” একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এমন অবাস্তব ও কৌতুকপূর্ণ বক্তব্য তৎকালীন সময়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে তীব্র প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এবং আজও তা ট্রোলের প্রধান উৎস।

২. সংসদ আর সংসারের ‘তালগোল’:

নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ গৃহবধূ থেকে হুট করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি দেশের শাসনভার আর পারিবারিক অনুভূতির মধ্যে ‘তালগোল’ পাকিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের মেয়াদে তাঁর দুই সন্তানের, বিশেষ করে তারেক রহমানের ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক সমান্তরাল প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও সমালোচনার কারণ হিসেবে দেখা হয়।

৩. “ঈদের পর আন্দোলন” এবং ঐতিহাসিক ডেডলাইন:

বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধী দলে থাকাকালীন সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার “ইনশাল্লাহ, ঈদের পর কঠোর আন্দোলন শুরু হবে”—এই বক্তব্যটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর রোজা এবং কোরবানি ঈদের পর আন্দোলনের এই ধারাবাহিক ‘ডেডলাইন’ বা আলটিমেটাম সাধারণ মানুষ এবং ট্রোল পেজগুলোর কাছে এক পরম জনপ্রিয় ও মজাদার রসালাপে রূপ নিয়েছে।

৪. অনমনীয় জেদ ও ‘ননদ-ভাবি’র চিরস্থায়ী যুদ্ধ:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার সম্পর্ককে আমজনতা প্রায়শই বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন ‘ননদ-ভাবি’র ঝগড়ার সাথে তুলনা করে রসাস্বাদন করে থাকে। তবে এই অনমনীয় জেদ কখনো কখনো সব ধরনের রাজনৈতিক সৌজন্যতাকে ধূলিসাৎ করেছে। ২০১৫ সালে বেগম জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সমবেদনা জানাতে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে যান, তখন ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে ফিরে যেতে হয়। রাজনীতিতে এই “আপসহীন” জেদ সাধারণ মানুষের কাছে চরম রাজনৈতিক অনাচারের এক অনন্য নজির হিসেবে সমালোচিত।

৫. জামায়াত প্রীতি ও ‘মৌলবাদ’ দূরীকরণের তত্ত্ব:

২০০১ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট গঠন এবং তাদের মন্ত্রিত্ব দেওয়া খালেদা জিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক সমালোচনা। ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা হয়ে থাকে যে, জামায়াতের নেতাদের সাথে এমন সখ্যতার মাধ্যমে তিনি হয়তো তাদের ‘উদারপন্থী’ বানাতে চেয়েছিলেন এবং বাঙালি নারীকে নিকাবের বাইরে এনে এক অদ্ভুত ‘নারীবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন! কিন্তু বাস্তবে এই জোট দেশে উগ্রবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল বলেই আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজপথের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি ক্ষমতার মসনদে বসে অন্দরমহলের দুর্নীতি ও কৌতুকপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য তাঁর ভাবমূর্তিকে বহুলাংশে ম্লান করেছে। ভালো আর মন্দের এই দোলাচলেই নির্মিত হয়েছে তাঁর বর্ণাঢ্য এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবন।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. বাংলাদেশ পলিটিক্যাল হিস্ট্রি ও পলিসি রিভিউ: ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারি উন্নয়ন গ্যাজেট ও জাতীয় সংসদ কার্যবিবরণী আর্কাইভ।

২. আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীক্ষা: দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা।

দেশের রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির এমন সব তথ্যবহুল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

বাংলাদেশের রাজনীতি' বনাম 'রাজনীতির বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

June 11, 2026

শেয়ার করুন

রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ‘বাংলাদেশের রাজনীতি’-র থেকে ‘রাজনীতির বাংলাদেশ’ বলাটাই হয়তো বেশি গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ আজ এক জটিল রাজনীতির পাঁকে পড়ে গিয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বমঞ্চে ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, দেশি-বিদেশি নানা শক্তির টক্করের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই ভূখণ্ড। চীন, পাকিস্তান, ভারত এবং পর্দার আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে এক জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যার কুপ্রভাব আগামী দিনে দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ৪টি খণ্ডের মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাব নিয়ে একটি গভীর পর্যবেক্ষণমূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ৪ খণ্ড ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের শাসন ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। তবে ক্ষমতার এই নতুন বিন্যাসের ভেতরেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রধানত ৪টি খণ্ডে বিভক্ত এবং তাদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন স্পষ্ট:

  • ক্ষমতায় বিএনপি ও তাদের কৌশল: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তবে ক্ষমতায় বসার পর তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ, ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ‘জুলাই চার্টার’ বা সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করা।
  • মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদের পর ছাত্রদল: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফলভাবে নির্বাচন দিয়ে বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তবে আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছাত্ররা এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। তবে অভিজ্ঞতাহীন এই তরুণ নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদে কতটা রাজনৈতিক পরিপক্বতা দেখাতে পারে, তার ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
  • আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে চরম কোণঠাসা। তবে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব, জোট গড়ার ক্ষমতা ও একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক (বিশেষ করে সংখ্যালঘু সমীকরণ ও দীর্ঘদিনের দলীয় সমর্থক) একেবারে মুছে যায়নি। গত কয়েক মাসে ইতিহাসের কাটা ঘা বা ক্ষত কিছুটা হলেও শুকিয়েছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বর্তমান ছাত্রনেতারাও অনুধাবন করতে পারছেন। একই সাথে, বাংলাদেশে হিন্দু ভোটারের সংখ্যা ১০%-এর কম হলেও নির্বাচনী অংকে তা মোটেও অ-গুরুত্বপূর্ণ নয়।

২. রাজনীতিতে ‘চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র’ বলে কিছু নেই

রাজনীতি বিষয়টি সরল নয়, বরং অত্যন্ত জটিল। আন্তর্জাতিক শক্তি বা অভ্যন্তরীণ হাওয়া যতই পক্ষে থাকুক না কেন—গাছে উঠতে না জানলে বা শক্ত ডাল জড়িয়ে ধরে থাকার পরিপক্বতা না থাকলে ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না। ছাত্ররা জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে তাদের অন্যদের ওপর নির্ভরশীল থাকতেই হবে; কারণ জন্ম নিয়েই কোনো শিশু হাঁটতে পারে না। অন্যদের অবলম্বন তাকে করতেই হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ঘটতে পারে দলগুলোর কৌশলগত জোটে। বিএনপি নীতিগতভাবে ভারতবিরোধী অবস্থান দেখালেও মূলত তারা ক্ষমতাবিরোধী নয়। ক্ষমতার জন্য ভারতের সমর্থন বা সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তারা প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা করলেও প্রকৃত অর্থে বা পর্দার আড়ালে তা করবে না। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার স্বার্থে চরম আদেশিক বিপরীত মেরুর দলও (যেমন ভারতের মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও মিমের পরোক্ষ সমীকরণ কিংবা ঔরঙ্গজেবের বিরোধিতার ইতিহাস) এক হয়ে যায়। সেই হিসেবে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে অভিজ্ঞ ও পরিপক্ব দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যদি এক থালায় বা জোটে বসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। উভয় দলই যথেষ্ট পরিপক্ব এবং অভিজ্ঞ।

৩. আন্তর্জাতিক শক্তির আগ্রাসন ও ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়ার শঙ্কা়

বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও অস্থিরতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলো।

  • ত্রিমুখী চাপ: এখানে পাকিস্তান নতুন করে এন্ট্রি নেওয়ার চেষ্টা করছে, পাশাপাশি ভারতের শক্তিশালী গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নজরদারি তো রয়েছেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাভের গন্ধে ছটফট করা aggression বা আগ্রাসী চীন এবং চীন-বিরোধী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
  • ঝুঁকির মেঘ: এই বহুপাক্ষিক ভূ-রাজনৈতিক টানাটানি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সিরিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সি-ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

তবে ভারত নিজের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেনস নেক) সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে কখনোই হাতছাড়া হতে দিতে চাইবে না। ভারত নিজের প্রভাব খাটিয়ে এখানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা তাদের অনুকূল সরকার ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। আর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘ভারতবিরোধী সরকার’ কীভাবে সময়ের প্রয়োজনে ‘ভারতপন্থী’ হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়। ভারতের জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি করার চেষ্টা চালানো হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে, তার বার্তা তিস্তা, যমুনা ও পদ্মার জলবণ্টন এবং প্রাকৃতিক ভূগোলের ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃতির ওপর যেমন মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণও অনেক সময় পরাশক্তিগুলোর ওপর খাটে না।

৪. দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা: পাকিস্তান ও নেপাল প্রসঙ্গ

বাংলাদেশের বাইরে পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই এখন এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অস্থিরতা চলছে:

পাকিস্তানের শোচনীয় দশা:

ইসলামাবাদ বর্তমানে ত্রিমুখী ঝামেলা, চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে। ভারত ইতিমধ্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর (POK) পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তান খাইবার পখতুনখোয়া নিয়ে চাপ দিচ্ছে এবং ঐতিহাসিকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন তীব্র করছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার বেলুচিস্তানের এই স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবি এবং আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা সামলাতে পাকিস্তানের পেছনে চীনের সমর্থন থাকলেও ইসলামাবাদ পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে।

নেপালের রাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ও হিন্দুরাষ্ট্রের দাবি:

নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের আদর্শিক মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতন্ত্র আনার বয়স ২০ বছরও পার হয়নি, কিন্তু এই অল্প সময়ে এতবার সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে যে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। ফলে উন্নতির আশায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র আনা হলেও তা নেপালের জন্য হিতে বিপরীত বা অভিশাপ হয়েছে। বর্তমানে নেপালী হিন্দুরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আস্থা হারিয়ে পুনরায় রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন এবং নেপালকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলছেন, যা তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জোরালো ও সমর্থনযোগ্য হয়ে উঠছে।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত विश्लेषण

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় পার করছে। পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়ার পথে, নেপাল তার পরিচয়ের সংকটে ভুগছে, আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে। এই পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ দলগুলোর ক্ষমতার লোভ বা বিদেশী শক্তির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করতে পারে। বাংলাদেশকে যদি ‘ভবিষ্যতের সিরিয়া’ হওয়া থেকে বাঁচতে হয়, তবে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)

১. দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা সমীক্ষা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কূটনীতি গবেষণা সেল (South Asian Strategic Studies)।

২. আঞ্চলিক সীমান্ত ও রাজনৈতিক ডাটা: দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রদবদল, বেলুচিস্তান সংকট এবং নেপালের সাংবিধানিক রূপান্তর বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন।

দেশ-বিদেশের রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতির এমন সব নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে

২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ