আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বিশ্বের ইতিহাস শাসনতন্ত্র বা সংবিধান ছাড়া অচল। মানুষ যখনই সমাজবদ্ধ হয়েছে, তখনই প্রয়োজন পড়েছে সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির। ১৯০০ সালের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—বাঙালির প্রতিটি লড়াই ছিল একটি সুন্দর সংবিধান ও সুশাসনের জন্য। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় দলগুলোর ভেতরে শুরু হয়েছে শৃঙ্খলার লড়াই। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করা ৭৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে একযোগে বহিষ্কার করে বিএনপি আজ এক কঠোর রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান: মদিনা সনদ
শাসনতন্ত্রের ইতিহাসে ফিরে তাকালে আমরা দেখি, বিশ্বের ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান হলো মদিনা সনদ। কলহে লিপ্ত দুটি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি স্থাপন এবং মদিনায় বসবাসরত সকল গোত্রের মধ্যে সুশাসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলামের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এই সনদ গঠন করেছিলেন।
- ধারার সংখ্যা: মদিনা সনদে মোট ৪৭টি ধারা ছিল। এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত দলিল যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সুস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: শাসনের ব্যর্থতা ও মহাদুর্ভিক্ষ
সংবিধান ও সুশাসনের অভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় ও ফসলের অভাবে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি প্রাণ অকালে ঝরে পড়েছিল। ১৭৬৮ সালের চেয়ে ১৭৭১ সালে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ কয়েক লক্ষ রুপি বৃদ্ধি পাওয়া তৎকালীন শোষক গোষ্ঠীর অমানবিকতার সাক্ষী হয়ে আছে।
২০২৬-এর নির্বাচনী রণক্ষেত্র: একযোগে বহিষ্কৃত বিএনপির সকল বিদ্রোহী
ইতিহাসের সেই বিশৃঙ্খলা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। বুধবার (২১ জানুয়ারি ২০২৬) রাতে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনী মাঠে থাকা সকল বিদ্রোহী প্রার্থীকে একযোগে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কৃত বিএনপির সকল নেতার পূর্ণাঙ্গ তালিকা:
রংপুর বিভাগ: ১. আ ন ম বজলুর রশিদ (দিনাজপুর-২), ২. এ জেড এম রেজওয়ানুল হক (দিনাজপুর-৫), ৩. রিয়াদ আরাফান সরকার রানা (নীলফামারী-৪)।
রাজশাহী বিভাগ: ১. পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি (নওগাঁ-৩), ২. তাইফুল ইসলাম টিপু (নাটোর-১), ৩. ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজন (নাটোর-১), ৪. দাউদার মাহমুদ (নাটোর-৩), ৫. ইসফা খাইরুল হক শিমুল (রাজশাহী-৫), ৬. ব্যারিস্টার রেজাউল করিম (রাজশাহী-৫), ৭. কে এম আনোয়ারুল ইসলাম (পাবনা-৩), ৮. জাকারিয়া পিন্টু (পাবনা-৪)।
ঢাকা বিভাগ: ১. মোহাম্মদ দুলাল হোসেন (নারায়ণগঞ্জ-১), ২. মো. আতাউর রহমান খান আঙ্গুর (নারায়ণগঞ্জ-২), ৩. অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম (নারায়ণগঞ্জ-৩), ৪. অ্যাড. মোহাম্মদ আলী (টাঙ্গাইল-১), ৫. লুৎফর রহমান খান আজাদ (টাঙ্গাইল-৩), ৬. অ্যাড. ফরহাদ ইকবাল (টাঙ্গাইল-৫), ৭. মো. জামাল আহমেদ চৌধুরী (নরসিংদী-৫), ৮. মো. মুমিন আলী (মুন্সিগঞ্জ-১), ৯. মো. মহিউদ্দিন (মুন্সিগঞ্জ-৩)।
খুলনা বিভাগ: ১. নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা (কুষ্টিয়া-১), ২. মনিরুল ইসলাম (নড়াইল-২), ৩. অ্যাড. শহিদ ইকবাল (যশোর-৫), ৪. ডা. শহীদুল আলম (সাতক্ষীরা-৩), ৫. ইঞ্জি. মাসুদ (বাগেরহাট-১), ৬. খায়রুজ্জামান শিপন (বাগেরহাট-৪)।
বরিশাল বিভাগ: ১. আব্দুস সোবহান (বরিশাল-১), ২. মোহাম্মদ মাহমুদ হোসেন (পিরোজপুর-২)।
ময়মনসিংহ বিভাগ: ১. রেজাউল করিম চুন্নু (কিশোরগঞ্জ-১), ২. শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (কিশোরগঞ্জ-৫), ৩. সালমান ওমর রুবেল (ময়মনসিংহ-১), ৪. এবি সিদ্দিকুর রহমান (ময়মনসিংহ-১০), ৫. মো. মোর্শেদ আলম (ময়মনসিংহ-১১), ৬. মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া (নেত্রকোনা-৩), ৭. মো. আমিনুল ইসলাম বাদশাহ (শেরপুর-৩)।
ফরিদপুর বিভাগ: ১. লাভলু সিদ্দিকী (মাদারিপুর-১), ২. কামাল জামাল নুরুউদ্দিন মোল্লা (মাদারিপুর-১), ৩. মিল্টন বৈদ্য (মাদারিপুর-২), ৪. নাসিরুল হক সাবু (রাজবাড়ী-২), ৫. এম এস খান মঞ্জু (গোপালগঞ্জ-২), ৬. সিরাজুল ইসলাম সিরাজ (গোপালগঞ্জ-২), ৭. অ্যাড. হাবিবুর রহমান হাবিব (গোপালগঞ্জ-৩)।
সিলেট বিভাগ: ১. আনোয়ার হোসেন (সুনামগঞ্জ-৩), ২. দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন (সুনামগঞ্জ-৪), ৩. মামুনুর রশীদ চাকসু (সিলেট-৫), ৪. মহসিন মিয়া মধু (মৌলভীবাজার-৪), ৫. শেখ সুজাত মিয়া (হবিগঞ্জ-১)।
কুমিল্লা বিভাগ: ১. ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), ২. অ্যাড. কামরুজ্জামান মামুন (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১), ৩. কাজী নাজমুল হোসেন তাপস (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫), ৪. কৃষিবিদ সাইদুজ্জামান কামাল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), ৫. ইঞ্জি. আব্দুল মতিন (কুমিল্লা-২), ৬. আতিকুল আলম শাওন (কুমিল্লা-৭), ৭. এম এ হান্নান (চাঁদপুর-৪)।
চট্টগ্রাম বিভাগ: ১. অ্যাড. মিজানুল হক চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৪), ২. শফিকুল ইসলাম রাহী (চট্টগ্রাম-১৪), ৩. লিয়াকত আলী (চট্টগ্রাম-১৬), ৪. কাজী মফিজুর রহমান (নোয়াখালী-২), ৫. প্রকৌশলী ফজলুল আজীম (নোয়াখালী-৬), ৬. ইঞ্জিনিয়ার তানবীর উদ্দীন রাজীব (নোয়াখালী-৬)।
বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট
মদিনা সনদের সেই ৪৭ ধারার সুশাসন থেকে শুরু করে আধুনিক গণতন্ত্র—সবখানেই ‘শৃঙ্খলা’ মূলমন্ত্র। তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপির এই গণবহিষ্কার দলের সংহতি রক্ষার চেষ্টা হলেও, বিদ্রোহীরা মাঠে থাকায় অনেক আসনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। একদিকে এনসিপি ও জামায়াতের নতুন জোটের দাপট, অন্যদিকে হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ‘হাঁস’ বা ‘ফুটবল’ প্রতীকের লড়াই—সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে এক নতুন ইতিহাসের জন্মলগ্ন।
সূত্র: যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন ডিজিটাল আর্কাইভ, ঐতিহাসিক এনসাইক্লোপিডিয়া, বিএনপি মিডিয়া সেল এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশ্লেষণে: BDS Bulbul Ahmed
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। তবে প্রথাবিরোধী লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে এই বিতর্ককে এক নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করে ‘ঘোষক’ হওয়া যায়, কিন্তু একটি জাতির ‘মহাস্থপতি’ হওয়া যায় না।

১. বন্দী মুজিব: ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী এক প্রেরণা

হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে যদি পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিতেন, তবে তিনি হতেন একজন ‘সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী’। কিন্তু তাঁর বন্দীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় ও অদম্য ভাবপ্রতিমা।
তিনি লিখেছেন, “যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।” ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালির মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ‘মুজিব কোথায়?’ তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি।
২. মেজর জিয়া: এক ঐতিহাসিক আকস্মিকতা

২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে একটি ‘আকস্মিক কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- সুযোগ ও আকস্মিকতা: লেখক মনে করেন, কালুরঘাটের বেতারযন্ত্রীরা একজন মেজরকে খুঁজছিলেন একটি জোরালো ঘোষণার জন্য। সেই মুহূর্তে অন্য কোনো মেজর থাকলেও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতেন।
- উত্তেজনা ও স্বস্তি: জিয়ার সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছিল মূলত এই কারণে যে, তারা জানতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এবং তাঁর নামেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ বা মুজিব বা আইনস্টাইন হওয়ার জন্য লাগে দীর্ঘ সাধনা, কিন্তু কেউ কেউ হঠাৎ মেজর জিয়া হয়ে উঠে সারা দেশকে আলোড়িত করতে পারেন।”
৩. কেন মুজিবই মহাস্থপতি?

আজাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি গুলিতে এবং প্রতিটি আত্মত্যাগে কেবল একটি নামই কাজ করেছে—তা হলো মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ হাজারবার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে আসত না এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “মুজিব বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বন্দী থেকেও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, মহাস্থপতি; তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না।”
৪. ‘শহীদ’ বনাম ‘নিহত-অমর’
প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে ইহলৌকিক শব্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো মুজিবকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব হতেন আরও বেশি শক্তিশালী। যারা দেশের জন্য প্রাণ দেন, তারা মূলত ‘নিহত-অমর’ হয়ে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকেন।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, ঘোষণা কে দিয়েছেন সেই তর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো—কার নেতৃত্বে এবং কার নামে একটি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই একক নেতৃত্বের নাম, যিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রকে মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।
এক নজরে লেখকের মূল বক্তব্য:
| বিষয় | হুমায়ুন আজাদের মত |
| বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব | বাংলাদেশের মহাস্থপতি, যাঁর স্থান ঘোষকের অনেক ওপরে। |
| মেজর জিয়া | ঐতিহাসিক আকস্মিকতায় উদ্ভূত একজন ট্র্যাজিক নায়ক ও কিংবদন্তি। |
| মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তি | বঙ্গবন্ধুর নাম ও ভাবপ্রতিমা। |
| বন্দীত্বের গুরুত্ব | পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বন্দীত্ব ছিল বেশি মর্যাদাপূর্ণ। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং শান্তির ধর্ম। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিচয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জিত ও ব্যর্থ মনে হয়। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বর্তমানে ইসলামকে যার যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ‘একাধিক বিবাহ’ নিয়ে যেভাবে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর পেছনে যে কঠিন শর্ত ও ইনসাফের (ন্যায়বিচার) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে অমুসলিম বিশ্ব ও নওমুসলিমদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, মুসলিম পুরুষ মানেই কেবল একাধিক বিয়ে।
২. আত্মপক্ষ সমর্থনের দায়ভার ও ‘ইসলামোফোবিয়া’

বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর এসে পড়ে। অনলাইনে বা অফলাইনে একজন মুসলিমকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘জঙ্গি’ নয়। হিজাব পরিধান করা যে একজন নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকুও আমরা বিশ্বকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারা আমাদের এক বড় ব্যর্থতা।
৩. অনৈক্য ও পরশ্রীকাতরতা

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ প্রকট। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বড় মানবিক সংকটে যখন কোনো শক্তিশালী মুসলিম দেশ নয়, বরং গাম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে, তখন আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা অন্যের ভুল খুঁজতে যতটা পটু, নিজেদের সংশোধনে ততটাই উদাসীন।
৪. ভূ-রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা

মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত ‘মোড়ল’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অনেক সময় সাধারণ মুসলমানদের ব্যথিত করে। ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা কিংবা বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া—আমাদের লজ্জিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনছে।
৫. দেশপ্রেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনীহা

‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’—এই শিক্ষা ভুলে গিয়ে অনেক মুসলিম দেশ আজ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া সোনালী অতীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে মুসলিম মনীষীদের যে কালজয়ী অবদান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে নিজেরাই জানি না, ফলে পশ্চিমাদের চোখে আমরা আজ একটি ‘পিছিয়ে পড়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছি।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ইসলামের সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হবে যখন আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকবে। আমরা যদি অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের চরিত্র ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারি, তবেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। কেবল ধর্মের গান গেয়ে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
এক নজরে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:
| চ্যালেঞ্জ | বর্তমান অবস্থা |
| সামাজিক | ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব। |
| রাজনৈতিক | মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি। |
| সাংস্কৃতিক | মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় ব্যর্থতা। |
| শিক্ষাগত | আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা। |
তথ্যসূত্র (Source):
- আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ: ন্যায়বিচার ও ইনসাফ সংক্রান্ত বিধান।
- আল জাজিরা ও রয়টার্স: ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন।
- বিডিনিউজ২৪: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed
বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।
২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।
৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।
৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।
৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।
৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:
| বিষয় | তথ্য |
| জন্ম | ৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২। |
| প্রধান পরিচয় | সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক। |
| সুরারোপিত গান | বন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)। |
| সংগঠন | লক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। |
| বিখ্যাত বই | জীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন। |
| মৃত্যু | ১৮ আগস্ট ১৯৪৫। |
তথ্যসূত্র (Source):
- উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
- বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
- অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



