উচ্চশিক্ষা
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার পাদপীঠ নয়, বরং এটি সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির জীবন্ত দর্পণ। সম্প্রতি ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স পর্যায়ের একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অধ্যাপক ড. এ.আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ তাঁর পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দুর্নীতি এবং সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের ভারতে খুনের ঘটনার মতো স্পর্শকাতর ও আলোচিত বিষয়গুলোকে যুক্ত করেছেন।

১. কেন এই প্রশ্ন ব্যতিক্রম?
প্রথাগত উচ্চশিক্ষায় আমরা প্রায়ই দেখি শিক্ষার্থীরা বইয়ের তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই পরীক্ষার প্রশ্নটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই বিদ্যা, যা বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা সমাধানে বা বিশ্লেষণে কাজে লাগে।
- সমাজতাত্ত্বিক লেন্স: অধ্যাপক মাহবুব উদ্দিন আহমেদ কেবল সংবাদপত্রের খবরের ভিত্তিতে প্রশ্নটি করেননি, বরং একে কার্ল মার্কসসহ বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীদের তত্ত্বের সাথে সমন্বয় করেছেন। এটি শিক্ষার্থীদের ‘বিচ্যুতি’ (Deviance), ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ এবং ‘সামাজিক অস্থিরতা’র মতো জটিল বিষয়গুলো বাস্তব ঘটনার নিরিখে বুঝতে সহায়তা করে।
২. বাস্তবতার নিরিখে শিক্ষার সাহসী পদক্ষেপ
বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির পাহাড় এবং এমপি আনারের রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকা অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক চরম বাস্তব। বিশ্ববিদ্যালয় যখন শ্রেণিকক্ষে এই বিষয়গুলোকে নিয়ে আলোচনার সুযোগ করে দেয়, তখন তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এই প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় নেটিজেনরা একে ‘সৃজনশীল শিক্ষার জয়গান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
৩. একাডেমিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
একজন শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল সিলেবাস শেষ করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা সমাজের অসংগতিগুলো চিহ্নিত করতে পারে। এই প্রশ্নটি সেই দায়বদ্ধতারই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রে সমসাময়িক বিষয়গুলো আসার ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তার চর্চা করতে শেখে।
বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:
বেনজীর বা আনারের মতো আলোচিত ব্যক্তিদের ঘটনা যখন সমাজবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে আসে, তখন তা কেবল বিতর্ক তৈরি করে না, বরং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো কতটা ভঙ্গুর এবং নৈতিক অবক্ষয় কতটা গভীর হতে পারে। অধ্যাপক মাহবুব উদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। এটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং সমাজ দেখার স্বচ্ছ দৃষ্টি তৈরি করে।
বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেশের শিক্ষা, সমাজ ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
সূত্র: ১. দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস ও বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদন (০৩ জুন ২০২৪)। ২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া। ৩. সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে সাম্প্রতিক সামাজিক অস্থিরতার বিশ্লেষণ।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা এখন সেবার বদলে মুনাফা অর্জনের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে ক্লিনিক ও হাসপাতালের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারগুলো এখন ব্যবসার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমকে কেন্দ্র করে এই কোচিং সেন্টারগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণার চিত্র দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
১. মেধাবী শিক্ষার্থী ‘ক্রয়’ ও বিজ্ঞাপনী মিথ্যাচার

কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তারা নিজেদের সাফল্য প্রমাণ করতে শীর্ষ মেধাবীদের ‘ক্রয়’ করে থাকে।
- মিথ্যা সুনাম: ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হওয়া শিক্ষার্থীদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিজেদের কোচিংয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে বাধ্য করা হয়।
- একাধিক দাবি: অনেক সময় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক কোচিং সেন্টার তাদের ব্যানারে ব্যবহার করছে, যা সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে চরম প্রতারণা।
২. কৃতিত্বের ভাগীদার, কিন্তু ব্যর্থতার দায়হীনতা

কোচিংগুলোর মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি:
- কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলে কোচিং সেন্টারগুলো তার সব কৃতিত্ব নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
- কিন্তু যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী চান্স পায় না, তখন তার কোনো দায়ভার বা ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে তারা আগ্রহী থাকে না।
৩. ‘টাকা হাতানো’র বহুমুখী ফাঁদ

ভর্তি হওয়ার সময় বড় অংকের ফি নেওয়ার পরও কোচিংগুলোর অর্থলিপ্সা থামে না।
- বই ও মডেল টেস্ট বাণিজ্য: নিয়মিত ভর্তির বাইরেও নতুন নতুন বই, তথাকথিত ‘মডেল কোশ্চেন’ এবং স্পেশাল টেস্টের নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
- মিথ্যা অনুপ্রেরণা: কোচিংয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এমন এক মায়াজাল দেখান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেই চাকরি নিশ্চিত—যা বাস্তবতার চেয়ে অনেক ভিন্ন।
৪. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট খবর
এই অস্থির সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতি ও অন্যান্য খাতেও বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
- রাজনৈতিক বিবর্তন: এনসিপিতে (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সম্প্রতি ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন।
- হজ আপডেট: এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮,৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে হজ পালনের অনুমতি পেয়েছেন।
- সাংস্কৃতিক ও ক্যারিয়ার: অভিনেত্রী ও মডেল নীলা ইসরাফিল ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছেন, যিনি এর আগে প্রায় ৫০টি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।
৫. বিশ্লেষণ: মুক্তি কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, কোচিং বাণিজ্যের এই জঘন্য মানসিকতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান কমাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র ও এনালাইসিস: ১. বাংলাদেশ হজ অফিস ও পরিচালক মো. লোকমান হোসেনের প্রেস ব্রিফিং – মে ২০২৬ ২. জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজনৈতিক যোগদানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ৩. নীলা ইসরাফিলের নির্বাচনী ঘোষণা ও ক্যারিয়ার প্রোফাইল ৪. বিডিএস নিউজ সোশ্যাল ও এডুকেশন ডেস্ক অ্যানালাইসিস
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com WhatsApp: +8801829349380
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সংস্কৃতি প্রতিবেদক | ১ মে ২০২৬
ঢাকা: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লোগো কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক নয়, বরং এর প্রতিটি রেখায় মিশে আছে এদেশের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এবং মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে এই লোগো। আজ আমরা আলোকপাত করব সেই বিবর্তনের ধারায়।
১. ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের লোগো

১৯২১ সালে যাত্রা শুরুর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে ব্রিটিশ ছাপ স্পষ্ট ছিল। তখন লোগোতে ছিল চাঁদ-তারা ও স্বস্তিকা (卐) চিহ্ন। এর ট্যাগলাইন ছিল ইংরেজিতে— “Truth Shall Prevail”। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এবং পাকিস্তান আমলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বস্তিকা চিহ্নটি বাদ দেওয়া হয়। সেখানে আরবি হরফে বই এবং বাংলার চিরচেনা নদী-নৌকার দৃশ্য সংযোজন করা হয়েছিল।
২. ১৯৭২: জয়নুল আবেদীনের সেই পেন্সিল স্কেচ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন উপাচার্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শরণাপন্ন হলে তিনি লোগোর একটি পেন্সিল খসড়া বা স্কেচ তৈরি করে দেন। তিনি নিজে গ্রাফিক ডিজাইনার না হওয়ায় তাঁর ছাত্র এবং যোগ্য উত্তরসূরি শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীকে এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার দায়িত্ব দেন। এই লোগোতেই প্রথমবারের মতো বাংলা লিপি এবং ‘শিক্ষাই আলো’ স্লোগানটি যুক্ত করা হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সূর্যরশ্মিতে শাপলা’।
৩. ১৯৭৩: বর্তমান লোগো ও শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী

১৯৭২ সালের লোগোটি সর্বজনীনভাবে পছন্দ না হওয়ায় ১৯৭৩ সালে পুনরায় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী বর্তমান লোগোটি তিনটি অংশে সাজান:
- ওপরের অংশ: একটি প্রজ্বলিত প্রদীপের আলো এবং তার ওপরে লেখা ‘শিক্ষাই আলো’।
- ডান পাশ: একটি সজাগ চোখ। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর মতে, এই চোখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সচেতন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতীক। চোখের মনিতে স্থান পেয়েছে বাংলা স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর ‘অ’।
- বাম পাশ: জাতীয় ফুল শাপলা, যা আমাদের প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
৪. কারিগর পরিচিতি: একুশে পদকপ্রাপ্ত সমরজিৎ রায়চৌধুরী

এই লোগোর রূপকার সমরজিৎ রায়চৌধুরী ১৯৩৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন। ৪৩ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর নেন। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো নয়, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করা শিল্পীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। শিল্পকলায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৪ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
উপসংহার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোর প্রতিটি অংশ আমাদের শিক্ষা ও চেতনার ধারক। ১৯২১ থেকে ১৯৫২, আর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩—এই পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁক আসলে আমাদের জাতীয় পরিচয় নির্মাণের এক একটি ধাপ। বর্তমানের এই লোগোটি আগামী বহু শতাব্দী ধরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও সংগ্রামের আলো হয়ে পথ দেখাবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ, শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার এবং চারুকলা অনুষদ রেকর্ড। সংগ্রহ ও উপস্থাপনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ডেস্ক রিপোর্ট | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ইসলামের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবে বাংলাদেশের মতো ‘ঘন ঘন’ মাদ্রাসা দেখা যায় না কেন—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দুই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত এবং সামাজিক পার্থক্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিচে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হলো:

১. সৌদি আরবের সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা

সৌদি আরবে প্রচলিত অর্থে আলাদা মাদ্রাসার আধিক্য না থাকার প্রধান কারণ হলো দেশটির সরকারি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা।
- একীভূত কারিকুলাম: সৌদি আরবের সাধারণ সরকারি স্কুলগুলোতেই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কুরআন, হাদিস এবং আরবি ভাষা সেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে আলাদাভাবে মাদ্রাসায় যাওয়ার প্রয়োজন সেখানে অনুভূত হয় না।
- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার দায়িত্ব নিজেই পালন করে।
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সেখানকার মসজিদ এবং ইসলামিক সেন্টারগুলো নিয়মিত ক্লাস ও সেমিনারের আয়োজন করে, যা প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তবে উচ্চতর গবেষণার জন্য মদিনা বা মক্কার মতো শহরগুলোতে বিশেষায়িত ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট বিদ্যমান।
২. বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপকতা মূলত ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে লক্ষ্য করা যায়। এর পেছনে কাজ করে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রভাবক:

- আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা: বাংলাদেশের অনেক দরিদ্র পরিবারের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা একটি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প। অধিকাংশ মাদ্রাসায় এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, যা একটি ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ হিসেবে কাজ করে।
- ধর্মীয় আবেগ ও নৈতিকতা: দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ রয়েছে। অনেক পরিবার বিশ্বাস করে, মাদ্রাসা শিক্ষা সন্তানদের নৈতিক চরিত্র গঠনে বেশি সহায়ক।
- বেসরকারি উদ্যোগ: বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো মূলত সাধারণ মানুষের দান এবং বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়। কওমি ও আলিয়া—উভয় ধারার মাধ্যমে এখানে ধর্মীয় জ্ঞান চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য সংরক্ষিত হচ্ছে।
- সরকারের স্বীকৃতি: বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এর সনদের মান উন্নয়ন ও মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন আধুনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
উপসংহার
সহজ কথায়, সৌদি আরব তার ধর্মীয় শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূলধারার সাধারণ শিক্ষার ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী সমান্তরাল ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। সৌদিতে মাদ্রাসা নেই—এটি ভুল ধারণা; বরং সেখানকার প্রতিটি সরকারি স্কুলই একাধারে আধুনিক স্কুল এবং মানসম্পন্ন মাদ্রাসা।
তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com



