নির্বাচনী খবর
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
এরই মধ্যে টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (28, January,2026) তারেক রহমান কথা বলেছেন তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
চার্লি ক্যাম্পবেল / ঢাকা
এডিটর অ্যাট লার্জ
তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেতার জন্য এটি আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টিতে একধরনের ব্যঙ্গও আছে, কারণ স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের কার্যত বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তৃতা এক দশক ধরে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল।
“আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে,” বলেন রহমান, ঢাকায় তার পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বাগানজুড়ে বুগেনভিলিয়া আর গাঁদা ফুল। ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরার পর এটি তার প্রথম সাক্ষাৎকার।
“আসলে আমি কথাবার্তায় খুব ভালো নই,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন তিনি, “কিন্তু আমাকে যদি কিছু করতে বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”
রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল একেবারেই ঝড়ের মতো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে আসেন, ঢাকার বিমানবন্দরে সারারাত অপেক্ষা করা লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থকের অভ্যর্থনায়। মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান তার মা—বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে আরও বেশি মানুষ ঢল নামে।
“আমার হৃদয়ে এটা খুব ভারী,” চোখ ছলছল করে বলেন রহমান। “কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো—আপনার যখন দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে সেটা পালন করতেই হবে।”
সে দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথ অনুসরণ করার মতোই বড় কিছু। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রহমানই স্পষ্টভাবে এগিয়ে, যা ১৮ মাস আগে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ডাকা হয়। রহমান নিজেকে এমন এক সেতু হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি করবে।
সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে বহু সংকট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যা শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ এমন এক অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা এখনো পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তরুণদের বেকারত্ব ১৩.৫%—আর প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করায় নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে রহমানের সঙ্গে রয়েছে বিতর্কের বোঝা। তার প্রধান পরিচয় বংশগত—খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র হিসেবে তিনি সেই দ্বন্দ্বময় দ্বিদলীয় রাজনীতির এক প্রান্তের প্রতিনিধি, যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে (অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা)।
সমর্থকদের কাছে রহমান একজন নিপীড়িত উদ্ধারকর্তা, যিনি বিপর্যস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরেছেন। সমালোচকদের কাছে তিনি এক ‘অন্ধকার রাজপুত্র’—দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাভোগী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া একজন ব্যক্তি, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে পাওয়া।
রহমান জোর দিয়ে বলেন, তিনিই বিভক্ত দেশকে সুস্থ করার উপযুক্ত মানুষ। “আমি এখানে আছি বাবা-মায়ের ছেলে বলেই নয়,” তিনি বলেন। “আমার দলের সমর্থকরাই আমাকে এখানে এনেছে।”
বাংলাদেশিরা তার কথায় বিশ্বাস রাখতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জরিপে তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ৭০% সমর্থন পায়। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী পায় ১৯%।
তবু উদ্বেগ স্পষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬—বিএনপির শেষ শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নিহত প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর রক্ত হয়তো আরেক আত্মকেন্দ্রিক উত্তরাধিকারী জন্ম দেবে।
রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন, এবং অন্তর্বর্তী সরকার তার আগের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছে। “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি,” অভিযোগকারীদের সম্পর্কে বলেন তিনি। সত্যি বলতে, হাসিনার আওয়ামী লীগ এক অনুগত গণমাধ্যমের সহায়তায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রচার করেছিল। আবার এটাও সত্য, জুলাই বিপ্লব যে বংশগত বিশেষাধিকারবিরোধী ছিল, রহমান নিজেও সেই উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অন্যতম বড় অবদানকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি আবার মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের উৎস এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে এগোচ্ছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল সরাতে সহায়তা করছে। তবে চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়—কারণ বঙ্গোপসাগরে এর কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলায় কাজে আসতে পারে।
আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে, তা স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার পথ রোধে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—রাজনৈতিক নির্বাসনের বছরগুলোতে রহমান কি যথেষ্ট আত্মসমালোচনা ও পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যাতে সত্যিই তিনি জনগণের নেতা হতে পারেন?
“যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”
রহমান শান্ত স্বভাবের ও অন্তর্মুখী; কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে বা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’।
“আমি সম্ভবত আটবার দেখেছি!”—হেসে বলেন তিনি।
তিনি এমন একজন নীতিনির্ভর মানুষ হিসেবে ধরা দেন, যিনি যেকোনো বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের পরিকল্পনা করছেন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের জন্য, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান ভূমি অবক্ষয় রোধে, এবং ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির কথা ভাবছেন বায়ুদূষণ কমাতে। বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—সবই তার পরিকল্পনায় আছে।
“আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০% বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” তিনি বলেন।
রহমানের এই টেকনোক্র্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি তার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি বিমান বাহিনীর একটি স্কুলে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি; দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলবিদে পরিণত হন। কিন্তু তার এই ক্ষমতা তাকে একই সঙ্গে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত করে তোলে—সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতেন।
অনেক বাংলাদেশির কাছে রহমান এখনো বিদ্রূপাত্মকভাবে “খাম্বা তারেক” নামে পরিচিত। কথিত আছে, একটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) একটি সহযোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে কেনা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কখনোই বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়নি। রহমান এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে “লুটেরা শাসনব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয় যে তিনি “প্রকাশ্য ও ঘন ঘন ঘুষ দাবি করতেন” বলে কুখ্যাত।
২০০৭–২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রহমান ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং আওয়ামী লীগ বহরের ওপর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার অভিযোগসহ মোট ৮৪টি মামলা ছিল। কারাগারে নির্যাতনের কারণে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান।
“শীতকালে খুব ঠান্ডা হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়,” বলেন তিনি। “কিন্তু আমি এটাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন কষ্ট না পায়, সেজন্য আমাকে সর্বোচ্চটা দিতে হবে।”
২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হলে—যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন—রহমান বিদেশ থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন।
এই সময়ের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। দেশটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়; ২০০৬ সালে যেখানে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার শাসনের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। সব প্রতিষ্ঠান রাজনীতিকরণে আক্রান্ত হয়—ফলে সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তোলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হতে থাকে—জীবনযাত্রার খরচ, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব দ্রুত বাড়ে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শাসকগোষ্ঠীর অনুগতদের জন্য চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু হাসিনার কঠোর দমননীতি রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ—কিশোর থেকে বৃদ্ধ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক—সবাই এক কাতারে।
বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকায় হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি এখনো অবস্থান করছেন, ঘনিষ্ঠদের নিয়ে তার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
“ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে,” হাসিনা টাইমকে বলেন। “বাংলাদেশে যতক্ষণ না সব বড় রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।”
গণতন্ত্র ক্ষয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ রহমানের কাছে বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে যে বিপুল রক্তপাত ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি ও পাথর হাতে থাকা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান ব্যবহার করেছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে।
“যে-ই অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে,” বলেন রহমান। “তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” নভেম্বর মাসে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়—শেখ হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।
তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে জানান, দলীয় কর্মীদের ভোট ব্যাহত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেব না,” তিনি বলেন। “আমাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে… শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সহিংসতা হবে।”
এই ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ভালো করবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এই প্রমাণ হিসেবে যে দেশে উগ্র ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে। আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালী ভারতীয় মহল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য লবিং করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০% ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। রহমান বলেন, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্ভাব্য ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।
“ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
জুলাই বিপ্লবের স্মারক এখনো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। দেয়ালচিত্রে শেখ হাসিনাকে শয়তানের শিং ও লুটের বস্তা দিয়ে আঁকা হয়েছে। স্লোগানে লেখা—“বাংলাদেশি পুলিশ লজ্জা করো!” এবং “এটা জেন-জি তৈরি নতুন বাংলাদেশ।”
“জুলাইয়ের পর মানুষ চেয়েছিল ব্যবস্থা বদলাতে—বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও পুলিশ যেন স্বাধীন হয়,” বলেন ২৬ বছর বয়সী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন। রহমান সম্পর্কে তিনি এখনো চূড়ান্ত মত দেননি, তবে ইতিবাচক।
“তারেক রহমান ভালো করছেন,” তিনি বলেন। “বিএনপির মতো দল নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা যায় না, তবে এখন পর্যন্ত তিনি ভালোই করছেন।”
সংস্কারগুলোর সাফল্য নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন বিপ্লবী দেয়ালচিত্রগুলো রোদে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ছাত্রদের বিজয়ের উচ্ছ্বাসও অন্তর্কলহ ও বিভাজনে ম্লান হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, আর মুহাম্মদ ইউনূসের নিজস্ব সরকারি অভিজ্ঞতা না থাকায় নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও সীমিত ছিল। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নারীরা অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় উপেক্ষিত হন—ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির নেতৃত্ব পান তারা (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন)। তাও ইসলামপন্থীদের কুরুচিপূর্ণ বিক্ষোভের মুখে পড়ে; তারা দাবি করে, লিঙ্গসমতার সুপারিশ শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো স্থগিত হয়ে যায়।
কিছু সাফল্যও এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পর্যালোচনা করে এবং ১,৫৬৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে; এর মধ্যে ২৮৭ জনকে “নিখোঁজ ও মৃত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (প্রায় সবাই জামায়াত বা বিএনপির সদস্য ছিলেন।) সেনাবাহিনীর চাপ সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতেই বিচার হচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনাও খুলে গেছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক মুবারশার হাসান—যিনি হাসিনার আমলে ৪৪ দিন বিচারবহির্ভূতভাবে আটক ছিলেন—স্মরণ করেন, সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনীতিকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
“এরপর আমি শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি,” তিনি বলেন। “হাসিনার আমলে এটা কল্পনাও করা যেত না।”
তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। স্বেচ্ছাচারী গণপিটুনি ও দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনলাইন ডক্সিং উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১২ ডিসেম্বর, যখন যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি—ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কড়া সমালোচক—ঢাকায় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর একটি উত্তেজিত জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেগুলোকে তারা দিল্লিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ছাদের ওপর বহু সাংবাদিক আটকা পড়েন। সাধারণ ধারণা হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকার কারণে জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রবল থাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালনে আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে না।
“আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা,” বলেন রহমান। “মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে নিরাপদ বোধ করে—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা ভবিষ্যতে অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা একটি সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটেও ভোট দেবেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা। সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, না ভোট “খুবই হতাশাজনক” হবে।
“তাহলে দেশ এমন এক অবস্থায় পড়ে যাবে, যেখানে আবার অতীতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”
আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক দ্রুত উন্নত না হলে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
“দেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন কখনোই মুক্ত বা সুষ্ঠু হতে পারে না,” বলেন হাসিনা।
রিয়াজ এতে অনুতপ্ত নন। “এই দলটি এমন ভয়াবহ কাজ করেছে, যা কার্যত মানবতাবিরোধী অপরাধ,” তিনি বলেন। “তারা এর জন্য ক্ষমাও চায়নি। বরং মানুষকে উসকানি দিচ্ছে।”
আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না—এ বিষয়ে রহমান সরাসরি মন্তব্য করতে চান না। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।
“কারণ আজ আপনি যদি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তাহলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?” তিনি বলেন। “অবশ্যই, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।”
রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদ তৈরি করলেও, বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে চোখে পড়া পরিবর্তন হলো ইসলামী রাজনীতির পুনরুত্থান। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়েও বেশি; পাশাপাশি প্রায় ১০% সংখ্যালঘু—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এই বৈপরীত্যই চরমপন্থীদের বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
হাসিনার বহু ত্রুটি সত্ত্বেও তিনি উগ্রবাদ দমনে কঠোর ছিলেন এবং এমনকি হিজড়া সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই জামায়াতে ইসলামী—ইসলামপন্থী দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ প্রচারণার কারণে দলটি তরুণদের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভূমিধস বিজয় অর্জন করে—যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সূচক হিসেবে বিবেচিত। তারা আরও চারটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েও জয়ী হয়। এনসিপিও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে বেশিরভাগই নারী—এমন ডজনখানেক নেতা দল ছাড়েন। প্রকাশ্যে সমকামী এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
“এটা নারী ছাত্রনেত্রী, সংখ্যালঘু এবং তরুণদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক,” বলেন ঢাকাভিত্তিক নার্স ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামী তাদের সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা আরও চরম বক্তব্য থেকে সরে এসে নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” হিসেবে পুনর্ব্র্যান্ডিং করেছে। তারা সামাজিক কল্যাণে জোর দিচ্ছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে। এমনকি একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক। তবে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি ধর্মীয় ভিত্তির কারণে তৈরি হওয়া দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছেন।
জানুয়ারির শুরুতে জামায়াতের নেতা প্রকাশ করেন যে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন—যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। রহমান এতে বিচলিত নন।
“মানুষ শুধু এমন একটি গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে,” তিনি বলেন।
যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা হবে একটি বড় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ার এই পরাশক্তি দিয়ে বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের ভূখণ্ডই বাংলাদেশের পণ্যের প্রধান স্থলপথ, পাশাপাশি তুলা, শস্য, জ্বালানি, শিল্প উপকরণ ও বিদ্যুতের বড় সরবরাহকারী দেশটি।
“আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা আগে,” বলেন রহমান, “তারপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ছেষ্টা করবো “
ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ায়, তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান খলনায়ক।
“তারেক রহমানের মতো একজন নেতাও প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আহ্বান জানালে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নেন,” বলেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।
এটি প্রজন্মগত গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র ও ৩,৮০০-এর বেশি সেনার প্রাণ দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। অথচ আজকের তরুণদের চোখে জামায়াত দুর্নীতিমুক্ত আর ভারত প্রধান শত্রু।
এই অতীত-বিচ্ছিন্নতা দেখায় যে রহমান তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিরা অর্ধশতাব্দী আগের বীরত্বগাথায় আগ্রহী নয়; তারা চায় এমন একজন নেতা, যিনি কথা শোনেন, সেতুবন্ধন তৈরি করেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও আস্থা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলতে থাকলে, মানুষ হয়তো হাসিনার শাসনামলের রেকর্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
“বংশগত দলগুলোকে কখনোই পুরোপুরি বাতিল করা যায় না,” বলেন কুগেলম্যান। “মাত্র দুই বছর আগেও বিএনপিকে মৃত ও সমাহিত মনে করা হচ্ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও হয়তো শেষ হয়ে যাননি—এখন তিনি প্রাসঙ্গিক নন, কিন্তু ভবিষ্যতে ফিরেও আসতে পারেন।”
দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে রহমান সচেতন হলেও, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হলো বিএনপির সেই হাজারো তৃণমূল কর্মী, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছিল এবং এখন মনে করছে তারা ‘প্রাপ্য সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী। দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
তবে রহমান যে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন—তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মে মাসে তিনি নিজের ও তার মাকে ব্যঙ্গ করে আঁকা একটি কার্টুন পুনরায় পোস্ট করেন এবং লেখেন—“আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে না মিললেও নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে সম্মান করা জরুরি।” খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনার আমলে তার মায়ের প্রতি আচরণের সমালোচনা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ঐক্যের আহ্বান জানান। হাসিনার “আয়রন লেডি” ভাবমূর্তির বিপরীতে রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নরম ও মানবিক ইমেজ গড়ছেন। যুক্তরাজ্য থেকে তার সঙ্গে আসা আদুরে কমলা রঙের সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
লন্ডনের আগের জীবনের কোন দিকটি তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন—জিজ্ঞেস করা হলে রহমান এক মুহূর্তও দেরি করেন না।
“আমার স্বাধীনতা,” বলেন তিনি, পরিবারের বাড়ির চারপাশে ঘেরা ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে। “এই বাড়িতে এসে এত নিরাপত্তা দেখে আমার দম বন্ধ লাগছিল।” পাড়ার দোকানে হেঁটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ লেক্সাস চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম পর্যন্ত গিয়ে মেয়ে জায়মাকে চমকে দেওয়া—এসব এখন অতীত। প্রতিদিনের ১০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ করতে তাকে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
তবু রহমান অভিযোগ করছেন না। তার প্রত্যাবর্তন যে হঠাৎ কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং উদ্দেশ্য ও সংকল্পে ভরপুর—মানুষের জীবনমান উন্নত করার দৃঢ় ইচ্ছা থেকেই এসেছে—তা তিনি দেখাতে চান। বক্তব্য শেষ করতে তিনি তার আরেকটি প্রিয় সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করেন—এবার এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়, স্পাইডার-ম্যান থেকে:
“বড় ক্ষমতার সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব,” তিনি বলেন। “আমি এতে গভীরভাবে বিশ্বাস করি।”
-টাইম
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।
একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
- পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
- জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
- মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট
মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
- দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
- জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।
৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
| ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব | পৈতৃক শিকড় / জন্মস্থান | শেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান |
| কাজী নজরুল ইসলাম | চুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত) | ঢাকা, বাংলাদেশ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | পূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর) | কলকাতা, ভারত |
| শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায় | বরিশাল | বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল। |
| মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | গুজরাট (ভারত) | করাচি, পাকিস্তান |
| হযরত ইব্রাহিম (আ.) | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) | হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) |
ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)
মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।
৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?
- ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
- পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
- রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।
মূল নির্যাস
পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: মহান মুক্তিযুদ্ধ: প্রথম শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠদের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ঐতিহ্য
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও জাতীয় ইতিহাস মহাফেজখানা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কোটি মানুষের ত্যাগ এবং হাজারো অকুতোভয় সেনানী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস।
১. স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তিম সূচনা: প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা দেশে তখন তীব্র অসহযোগ আন্দোলন ও সর্বাত্মক হরতাল চলছিল। সেদিন রংপুরের কাচারি বাজার থেকে স্বাধিকারের দাবিতে বের হওয়া এক উত্তাল মিছিলে যোগ দিয়েছিল কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শঙ্কু সমজদার।
মিছিলটি আলমনগর ও জাহাজ কোম্পানির মোড় অতিক্রম করার সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী অ-বাঙালিদের অতর্কিত গুলিতে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। ঘটনাস্থলেই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দেন কিশোর শঙ্কু। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ও প্রথম শিশু শহীদ। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করা হয়।
২. সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক: সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মহান সন্তানকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’।
- প্রথম ও শেষ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধে সর্বপ্রথম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ (৮ এপ্রিল, ১৯৭১)। তবে সাধারণ জ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে অপশনে তাঁর নাম না থাকলে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে (১৮ এপ্রিল, ১৯৭১) বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন সর্বশেষ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)।
সাত বীরশ্রেষ্ঠর সংক্ষেপিত পরিচিতি ও সমাধিস্থল
| নাম ও পদবি | বাহিনী ও সেক্টর | শাহাদাতের তারিখ | চিরনিদ্রায় শায়িত যেখানে |
| ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ | ইপিআর (১ নং সেক্টর) | ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙামাটি |
| সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল | সেনাবাহিনী (২ নং সেক্টর) | ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | দরুইন গ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান | বিমানবাহিনী | ২০ আগস্ট, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ল্যান্স নায়ক নূর মোহাম্মদ শেখ | ইপিআর (৮ নং সেক্টর) | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ | কাশীপুর, শার্শা, যশোর |
| সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান | সেনাবাহিনী (৪ নং সেক্টর) | ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার-১ মোহাম্মদ রুহুল আমিন | নৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর) | ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | বাগমারা, রূপসা, খুলনা |
| ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর | সেনাবাহিনী (৭ নং সেক্টর) | ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
৩. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক শাহাদাত

পাকিস্তানের রিসালপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ডিসেম্বরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৪ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দোতলা ভবন থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছিল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগুনো অসম্ভব করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক হাতে এসএমজি এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে বুক ডলে হামাগুড়ি (ক্রলিং) দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারের একদম কাছে পৌঁছে যান। প্রখর নিশানায় গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের ভবন থেকে এক পাকিস্তানি স্নাইপারের বুলেট তাঁর কপালে এসে বিদ্ধ হয়। দেশের এই অকুতোভয় বীর বাঙ্কারের সামনেই শাহাদাতবরণ করেন, যার পরদিনই (১৫ ডিসেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।
৪. রণাঙ্গনের অবিশ্বাস্য সব বীরত্বগাথা

- নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’: ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে খালি গায়ে, পায়ে ফিন্স ও বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে সাঁতরে গিয়ে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে হামলা চালান বীর নৌ-কমান্ডোরা। তাঁদের গুঁড়িয়ে দেওয়া ২৬টি ধান ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব।
- ঢাকার বুকে আতঙ্কের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’: ঢাকার তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ অবরুদ্ধ রাজধানীতে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালায়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বড় বড় নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের সফল গ্রেনেড হামলা পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখত।
- অস্ত্র হাতে নারীদের প্রতিরোধ: তারামন বিবি (বীর প্রতীক) সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ডা. সিতারা বেগম ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি বিশটিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ইথারের তরঙ্গে ‘চরমপত্র’ (এম আর আখতার মুকুল) এবং উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানগুলো ছিল রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য আসল অক্সিজেন।
- বিদেশী বন্ধুদের অবদান: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। এছাড়া বাটা সু কোম্পানির অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড গোপনে অস্ত্র ও তথ্য দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, যিনি একমাত্র বিদেশী হিসেবে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার ছিল না; এটি ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী ও অকুতোভয় সেনাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক লাল-সবুজ পতাকা। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা শঙ্কু সমজদার থেকে শুরু করে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
তথ্য ও প্রকাশনা সংক্রান্ত বক্স (Editorial Meta Box)
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): জন লক ও রুশোর রাজনৈতিক দর্শন, অধ্যাপক গার্নার ও অধ্যাপক ডানিং-এর রাষ্ট্রবিজ্ঞানিক সংজ্ঞা।
রাষ্ট্র ও সরকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বাহ্যিকভাবে এদের সমার্থক মনে হলেও মৌলিক ও গঠনগত বিচারে এদের মধ্যে গভীর পার্থক্য বিদ্যমান। চুক্তিবাদী দার্শনিক জন লক (John Locke) সর্বপ্রথম এবং পরবর্তীতে জাঁ জ্যাঁক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Social Contract” এ রাষ্ট্র ও সরকারের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করেছেন।

ধারণাগত ভিত্তি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতবাদ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডানিং (Dunning) রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন,
“State denotes the community as a whole created by the social pact and manifesting itself in the supreme general will; ‘Government’ denotes merely the individual or group of individuals that is designated by the community to carry into effect the sovereign will.”
অর্থাৎ, রাষ্ট্র হলো সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ জনসমষ্টি বা সামগ্রিক রূপ, আর সরকার হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমেচ্ছা বা ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য মনোনীত একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ
নিচে একটি ছকের সাহায্যে রাষ্ট্র ও সরকারের মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | রাষ্ট্র (State) | সরকার (Government) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা ও প্রকৃতি | রাষ্ট্র একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, সরকার ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে গঠিত। | সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ বা চালিকাশক্তি। এটি রাষ্ট্রের ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করে। |
| স্থায়িত্ব | রাষ্ট্র স্থায়ী। একটি রাষ্ট্রের সীমানা বা অস্তিত্ব সহজে বিলুপ্ত হয় না। | সরকার অস্থায়ী। নির্দিষ্ট সময় পর পর বা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তিত হয়। |
| গঠন উপাদান | রাষ্ট্রের চারটি মূল উপাদান থাকে: নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌমত্ব। | সরকার নিজে রাষ্ট্রের চারটি উপাদানের মধ্যে একটি উপাদান মাত্র। |
| সদস্যপদ | রাষ্ট্রের সীমানার ভেতরে বসবাসকারী সব নাগরিকই রাষ্ট্রের সদস্য। | দেশের সব মানুষ সরকারের সদস্য নয়, কেবল শাসনকাজে যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি সরকারের অংশ। |
| সার্বভৌমত্ব | রাষ্ট্রের নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতা থাকে, যা সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত। | সরকারের কোনো নিজস্ব সার্বভৌম ক্ষমতা নেই। সরকার রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে মাত্র। |
| মূর্ত বনাম বিমূর্ত | রাষ্ট্র একটি বিমূর্ত ধারণা। একে চোখে দেখা যায় না, কেবল উপলব্ধি করা যায়। | সরকার একটি মূর্ত বা দৃশ্যমান ধারণা। কারণ এটি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি। |
| বিরোধিতা | রাষ্ট্রের বিরোধিতা করাকে দেশদ্রোহিতা বলা হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। | সরকারের নীতি বা কাজের সমালোচনা ও বিরোধিতা করা একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। |
সহজ একটি উদাহরণ:
একটি রাষ্ট্রকে যদি একটি মোটরগাড়ির সাথে তুলনা করা হয়, তবে সরকার হলো সেই গাড়ির চালক (Driver)। চালক পরিবর্তন হলেও গাড়িটি কিন্তু একই থাকে। একইভাবে, শাসক বা রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র অপরিবর্তিত থাকে।
সংসদীয় বনাম রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার) রূপান্তর ও পার্থক্য
সংসদীয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার হলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দুটি প্রধান রূপ। এই দুই ব্যবস্থার মূল পার্থক্য নিহিত রয়েছে সরকারের দুটি প্রধান অঙ্গ—আইন বিভাগ (সংসদ) এবং শাসন বিভাগ (রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীপরিষদ) এর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

নিচে একটি ছকের সাহায্যে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের মূল পার্থক্যগুলো সরাসরি তুলে ধরা হলো:
| বৈশিষ্ট্য | সংসদীয় সরকার (Parliamentary) | রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার (Presidential) |
|---|---|---|
| প্রধান নির্বাহী | প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী (সরকারপ্রধান)। রাষ্ট্রপতি কেবল আনুষ্ঠানিক প্রধান। | রাষ্ট্রপতি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী (সরকারপ্রধান)। |
| শাসন ও আইন বিভাগের সম্পর্ক | শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হন। | শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ পরস্পর থেকে স্বাধীন। মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হন না। |
| জবাবদিহিতা | শাসন বিভাগ (প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভা) তাদের কাজের জন্য সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। | শাসন বিভাগ (রাষ্ট্রপতি ও তার সচিবরা) তাদের নীতি বা কাজের জন্য সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। |
| স্থায়িত্ব ও মেয়াদ | সরকারের মেয়াদ অনিশ্চিত। সংসদের অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে যেকোনো সময় সরকারের পতন ঘটতে পারে। | সরকারের মেয়াদ নির্দিষ্ট ও স্থায়ী। অভিশংসন (Impeachment) ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে মেয়াদের আগে সহজে সরানো যায় না। |
| ক্ষমতার এককত্ব | প্রধানমন্ত্রীকে সবসময় আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতের ওপর নির্ভর করতে হয়। | রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত শক্তিশালী হন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে আইনসভার সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য ভেটো (Veto) ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। |
| দলীয় প্রভাব | দলীয় শৃঙ্খলা অত্যন্ত কঠোর থাকে, কারণ দলীয় সংসদ সদস্যদের সমর্থন হারালে সরকার ভেঙে যায়। | দলীয় শৃঙ্খলা তুলনামূলক শিথিল হতে পারে, কারণ রাষ্ট্রপতির টিকে থাকা সংসদের ভোটের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়। |
| উদাহরণ | বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, ভারত, কানাডা ইত্যাদি দেশ। | যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি দেশ। |
সহজ একটি তুলনা চিত্র:
- সংসদীয় ব্যবস্থা একটি দলগত বা পরিষদ-ভিত্তিক শাসন। এখানে প্রধানমন্ত্রী হলেন “সমানদের মধ্যে প্রথম” (First among equals), যাকে তার মন্ত্রীসভা ও সংসদের আস্থা নিয়ে চলতে হয়।
- রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা একক নেতৃত্ব-ভিত্তিক শাসন। এখানে রাষ্ট্রপতি নিজেই সর্বময় ক্ষমতার উৎস এবং তার সচিব বা মন্ত্রীরা মূলত তার আদেশ পালনকারী উপদেষ্টা মাত্র।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



