নির্বাচনী খবর

দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরপর যুক্ত হয়েছেন নির্বাচনী প্রচারণায়।
তারেক রহমান

নিউজ ডেস্ক

January 29, 2026

শেয়ার করুন

এরই মধ্যে টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (28, January,2026) তারেক রহমান কথা বলেছেন তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”

চার্লি ক্যাম্পবেল / ঢাকা

এডিটর অ্যাট লার্জ

তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেতার জন্য এটি আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টিতে একধরনের ব্যঙ্গও আছে, কারণ স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের কার্যত বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তৃতা এক দশক ধরে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল।

“আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে,” বলেন রহমান, ঢাকায় তার পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বাগানজুড়ে বুগেনভিলিয়া আর গাঁদা ফুল। ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরার পর এটি তার প্রথম সাক্ষাৎকার।

“আসলে আমি কথাবার্তায় খুব ভালো নই,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন তিনি, “কিন্তু আমাকে যদি কিছু করতে বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”

রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল একেবারেই ঝড়ের মতো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে আসেন, ঢাকার বিমানবন্দরে সারারাত অপেক্ষা করা লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থকের অভ্যর্থনায়। মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান তার মা—বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে আরও বেশি মানুষ ঢল নামে।

“আমার হৃদয়ে এটা খুব ভারী,” চোখ ছলছল করে বলেন রহমান। “কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো—আপনার যখন দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে সেটা পালন করতেই হবে।”

সে দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথ অনুসরণ করার মতোই বড় কিছু। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রহমানই স্পষ্টভাবে এগিয়ে, যা ১৮ মাস আগে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ডাকা হয়। রহমান নিজেকে এমন এক সেতু হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি করবে।

সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে বহু সংকট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যা শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ এমন এক অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা এখনো পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তরুণদের বেকারত্ব ১৩.৫%—আর প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করায় নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।

তবে রহমানের সঙ্গে রয়েছে বিতর্কের বোঝা। তার প্রধান পরিচয় বংশগত—খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র হিসেবে তিনি সেই দ্বন্দ্বময় দ্বিদলীয় রাজনীতির এক প্রান্তের প্রতিনিধি, যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে (অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা)।

সমর্থকদের কাছে রহমান একজন নিপীড়িত উদ্ধারকর্তা, যিনি বিপর্যস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরেছেন। সমালোচকদের কাছে তিনি এক ‘অন্ধকার রাজপুত্র’—দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাভোগী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া একজন ব্যক্তি, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে পাওয়া।

রহমান জোর দিয়ে বলেন, তিনিই বিভক্ত দেশকে সুস্থ করার উপযুক্ত মানুষ। “আমি এখানে আছি বাবা-মায়ের ছেলে বলেই নয়,” তিনি বলেন। “আমার দলের সমর্থকরাই আমাকে এখানে এনেছে।”

বাংলাদেশিরা তার কথায় বিশ্বাস রাখতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জরিপে তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ৭০% সমর্থন পায়। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী পায় ১৯%।

তবু উদ্বেগ স্পষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬—বিএনপির শেষ শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নিহত প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর রক্ত হয়তো আরেক আত্মকেন্দ্রিক উত্তরাধিকারী জন্ম দেবে।

রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন, এবং অন্তর্বর্তী সরকার তার আগের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছে। “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি,” অভিযোগকারীদের সম্পর্কে বলেন তিনি। সত্যি বলতে, হাসিনার আওয়ামী লীগ এক অনুগত গণমাধ্যমের সহায়তায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রচার করেছিল। আবার এটাও সত্য, জুলাই বিপ্লব যে বংশগত বিশেষাধিকারবিরোধী ছিল, রহমান নিজেও সেই উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার অংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অন্যতম বড় অবদানকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি আবার মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের উৎস এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে এগোচ্ছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল সরাতে সহায়তা করছে। তবে চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়—কারণ বঙ্গোপসাগরে এর কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলায় কাজে আসতে পারে।

আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে, তা স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার পথ রোধে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—রাজনৈতিক নির্বাসনের বছরগুলোতে রহমান কি যথেষ্ট আত্মসমালোচনা ও পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যাতে সত্যিই তিনি জনগণের নেতা হতে পারেন?

“যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”

রহমান শান্ত স্বভাবের ও অন্তর্মুখী; কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে বা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’।

“আমি সম্ভবত আটবার দেখেছি!”—হেসে বলেন তিনি।

তিনি এমন একজন নীতিনির্ভর মানুষ হিসেবে ধরা দেন, যিনি যেকোনো বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের পরিকল্পনা করছেন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের জন্য, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান ভূমি অবক্ষয় রোধে, এবং ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির কথা ভাবছেন বায়ুদূষণ কমাতে। বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—সবই তার পরিকল্পনায় আছে।

“আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০% বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” তিনি বলেন।

রহমানের এই টেকনোক্র্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি তার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি বিমান বাহিনীর একটি স্কুলে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি; দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলবিদে পরিণত হন। কিন্তু তার এই ক্ষমতা তাকে একই সঙ্গে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত করে তোলে—সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতেন।

অনেক বাংলাদেশির কাছে রহমান এখনো বিদ্রূপাত্মকভাবে “খাম্বা তারেক” নামে পরিচিত। কথিত আছে, একটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) একটি সহযোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে কেনা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কখনোই বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়নি। রহমান এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে “লুটেরা শাসনব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয় যে তিনি “প্রকাশ্য ও ঘন ঘন ঘুষ দাবি করতেন” বলে কুখ্যাত।

২০০৭–২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রহমান ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং আওয়ামী লীগ বহরের ওপর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার অভিযোগসহ মোট ৮৪টি মামলা ছিল। কারাগারে নির্যাতনের কারণে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান।

“শীতকালে খুব ঠান্ডা হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়,” বলেন তিনি। “কিন্তু আমি এটাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন কষ্ট না পায়, সেজন্য আমাকে সর্বোচ্চটা দিতে হবে।”

২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হলে—যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন—রহমান বিদেশ থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন।

এই সময়ের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। দেশটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়; ২০০৬ সালে যেখানে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার শাসনের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। সব প্রতিষ্ঠান রাজনীতিকরণে আক্রান্ত হয়—ফলে সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তোলে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হতে থাকে—জীবনযাত্রার খরচ, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব দ্রুত বাড়ে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শাসকগোষ্ঠীর অনুগতদের জন্য চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু হাসিনার কঠোর দমননীতি রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ—কিশোর থেকে বৃদ্ধ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক—সবাই এক কাতারে।

বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকায় হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি এখনো অবস্থান করছেন, ঘনিষ্ঠদের নিয়ে তার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।

“ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে,” হাসিনা টাইমকে বলেন। “বাংলাদেশে যতক্ষণ না সব বড় রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।”

গণতন্ত্র ক্ষয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ রহমানের কাছে বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে যে বিপুল রক্তপাত ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি ও পাথর হাতে থাকা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান ব্যবহার করেছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে।

“যে-ই অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে,” বলেন রহমান। “তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” নভেম্বর মাসে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়—শেখ হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে জানান, দলীয় কর্মীদের ভোট ব্যাহত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেব না,” তিনি বলেন। “আমাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে… শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সহিংসতা হবে।”

এই ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ভালো করবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এই প্রমাণ হিসেবে যে দেশে উগ্র ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে। আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালী ভারতীয় মহল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য লবিং করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০% ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। রহমান বলেন, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্ভাব্য ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।

“ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”

জুলাই বিপ্লবের স্মারক এখনো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। দেয়ালচিত্রে শেখ হাসিনাকে শয়তানের শিং ও লুটের বস্তা দিয়ে আঁকা হয়েছে। স্লোগানে লেখা—“বাংলাদেশি পুলিশ লজ্জা করো!” এবং “এটা জেন-জি তৈরি নতুন বাংলাদেশ।”

“জুলাইয়ের পর মানুষ চেয়েছিল ব্যবস্থা বদলাতে—বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও পুলিশ যেন স্বাধীন হয়,” বলেন ২৬ বছর বয়সী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন। রহমান সম্পর্কে তিনি এখনো চূড়ান্ত মত দেননি, তবে ইতিবাচক।

তারেক রহমান ভালো করছেন,” তিনি বলেন। “বিএনপির মতো দল নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা যায় না, তবে এখন পর্যন্ত তিনি ভালোই করছেন।”

সংস্কারগুলোর সাফল্য নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন বিপ্লবী দেয়ালচিত্রগুলো রোদে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ছাত্রদের বিজয়ের উচ্ছ্বাসও অন্তর্কলহ ও বিভাজনে ম্লান হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, আর মুহাম্মদ ইউনূসের নিজস্ব সরকারি অভিজ্ঞতা না থাকায় নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও সীমিত ছিল। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নারীরা অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় উপেক্ষিত হন—ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির নেতৃত্ব পান তারা (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন)। তাও ইসলামপন্থীদের কুরুচিপূর্ণ বিক্ষোভের মুখে পড়ে; তারা দাবি করে, লিঙ্গসমতার সুপারিশ শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো স্থগিত হয়ে যায়।

কিছু সাফল্যও এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পর্যালোচনা করে এবং ১,৫৬৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে; এর মধ্যে ২৮৭ জনকে “নিখোঁজ ও মৃত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (প্রায় সবাই জামায়াত বা বিএনপির সদস্য ছিলেন।) সেনাবাহিনীর চাপ সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতেই বিচার হচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনাও খুলে গেছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক মুবারশার হাসান—যিনি হাসিনার আমলে ৪৪ দিন বিচারবহির্ভূতভাবে আটক ছিলেন—স্মরণ করেন, সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনীতিকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।

“এরপর আমি শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি,” তিনি বলেন। “হাসিনার আমলে এটা কল্পনাও করা যেত না।”

তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। স্বেচ্ছাচারী গণপিটুনি ও দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনলাইন ডক্সিং উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১২ ডিসেম্বর, যখন যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি—ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কড়া সমালোচক—ঢাকায় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর একটি উত্তেজিত জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেগুলোকে তারা দিল্লিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ছাদের ওপর বহু সাংবাদিক আটকা পড়েন। সাধারণ ধারণা হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকার কারণে জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রবল থাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালনে আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে না।

“আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা,” বলেন রহমান। “মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে নিরাপদ বোধ করে—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”

তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা ভবিষ্যতে অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা একটি সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটেও ভোট দেবেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা। সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, না ভোট “খুবই হতাশাজনক” হবে।

“তাহলে দেশ এমন এক অবস্থায় পড়ে যাবে, যেখানে আবার অতীতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”

আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক দ্রুত উন্নত না হলে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।

“দেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন কখনোই মুক্ত বা সুষ্ঠু হতে পারে না,” বলেন হাসিনা।

রিয়াজ এতে অনুতপ্ত নন। “এই দলটি এমন ভয়াবহ কাজ করেছে, যা কার্যত মানবতাবিরোধী অপরাধ,” তিনি বলেন। “তারা এর জন্য ক্ষমাও চায়নি। বরং মানুষকে উসকানি দিচ্ছে।”

আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না—এ বিষয়ে রহমান সরাসরি মন্তব্য করতে চান না। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।

“কারণ আজ আপনি যদি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তাহলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?” তিনি বলেন। “অবশ্যই, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।”

রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদ তৈরি করলেও, বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে চোখে পড়া পরিবর্তন হলো ইসলামী রাজনীতির পুনরুত্থান। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়েও বেশি; পাশাপাশি প্রায় ১০% সংখ্যালঘু—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এই বৈপরীত্যই চরমপন্থীদের বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

হাসিনার বহু ত্রুটি সত্ত্বেও তিনি উগ্রবাদ দমনে কঠোর ছিলেন এবং এমনকি হিজড়া সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই জামায়াতে ইসলামী—ইসলামপন্থী দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ প্রচারণার কারণে দলটি তরুণদের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

সেপ্টেম্বরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভূমিধস বিজয় অর্জন করে—যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সূচক হিসেবে বিবেচিত। তারা আরও চারটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েও জয়ী হয়। এনসিপিও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে বেশিরভাগই নারী—এমন ডজনখানেক নেতা দল ছাড়েন। প্রকাশ্যে সমকামী এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

“এটা নারী ছাত্রনেত্রী, সংখ্যালঘু এবং তরুণদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক,” বলেন ঢাকাভিত্তিক নার্স ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম।

জামায়াতে ইসলামী তাদের সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা আরও চরম বক্তব্য থেকে সরে এসে নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” হিসেবে পুনর্ব্র্যান্ডিং করেছে। তারা সামাজিক কল্যাণে জোর দিচ্ছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে। এমনকি একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক। তবে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি ধর্মীয় ভিত্তির কারণে তৈরি হওয়া দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছেন।

জানুয়ারির শুরুতে জামায়াতের নেতা প্রকাশ করেন যে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন—যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। রহমান এতে বিচলিত নন।

“মানুষ শুধু এমন একটি গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে,” তিনি বলেন।

যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা হবে একটি বড় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ার এই পরাশক্তি দিয়ে বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের ভূখণ্ডই বাংলাদেশের পণ্যের প্রধান স্থলপথ, পাশাপাশি তুলা, শস্য, জ্বালানি, শিল্প উপকরণ ও বিদ্যুতের বড় সরবরাহকারী দেশটি।

“আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা আগে,” বলেন রহমান, “তারপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ছেষ্টা করবো “

ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ায়, তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান খলনায়ক।

“তারেক রহমানের মতো একজন নেতাও প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আহ্বান জানালে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নেন,” বলেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।

এটি প্রজন্মগত গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র ও ৩,৮০০-এর বেশি সেনার প্রাণ দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। অথচ আজকের তরুণদের চোখে জামায়াত দুর্নীতিমুক্ত আর ভারত প্রধান শত্রু।

এই অতীত-বিচ্ছিন্নতা দেখায় যে রহমান তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিরা অর্ধশতাব্দী আগের বীরত্বগাথায় আগ্রহী নয়; তারা চায় এমন একজন নেতা, যিনি কথা শোনেন, সেতুবন্ধন তৈরি করেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও আস্থা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলতে থাকলে, মানুষ হয়তো হাসিনার শাসনামলের রেকর্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।

“বংশগত দলগুলোকে কখনোই পুরোপুরি বাতিল করা যায় না,” বলেন কুগেলম্যান। “মাত্র দুই বছর আগেও বিএনপিকে মৃত ও সমাহিত মনে করা হচ্ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও হয়তো শেষ হয়ে যাননি—এখন তিনি প্রাসঙ্গিক নন, কিন্তু ভবিষ্যতে ফিরেও আসতে পারেন।”

দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে রহমান সচেতন হলেও, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হলো বিএনপির সেই হাজারো তৃণমূল কর্মী, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছিল এবং এখন মনে করছে তারা ‘প্রাপ্য সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী। দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।

তবে রহমান যে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন—তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মে মাসে তিনি নিজের ও তার মাকে ব্যঙ্গ করে আঁকা একটি কার্টুন পুনরায় পোস্ট করেন এবং লেখেন—“আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে না মিললেও নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে সম্মান করা জরুরি।” খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনার আমলে তার মায়ের প্রতি আচরণের সমালোচনা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ঐক্যের আহ্বান জানান। হাসিনার “আয়রন লেডি” ভাবমূর্তির বিপরীতে রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নরম ও মানবিক ইমেজ গড়ছেন। যুক্তরাজ্য থেকে তার সঙ্গে আসা আদুরে কমলা রঙের সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

লন্ডনের আগের জীবনের কোন দিকটি তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন—জিজ্ঞেস করা হলে রহমান এক মুহূর্তও দেরি করেন না।

“আমার স্বাধীনতা,” বলেন তিনি, পরিবারের বাড়ির চারপাশে ঘেরা ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে। “এই বাড়িতে এসে এত নিরাপত্তা দেখে আমার দম বন্ধ লাগছিল।” পাড়ার দোকানে হেঁটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ লেক্সাস চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম পর্যন্ত গিয়ে মেয়ে জায়মাকে চমকে দেওয়া—এসব এখন অতীত। প্রতিদিনের ১০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ করতে তাকে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।

তবু রহমান অভিযোগ করছেন না। তার প্রত্যাবর্তন যে হঠাৎ কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং উদ্দেশ্য ও সংকল্পে ভরপুর—মানুষের জীবনমান উন্নত করার দৃঢ় ইচ্ছা থেকেই এসেছে—তা তিনি দেখাতে চান। বক্তব্য শেষ করতে তিনি তার আরেকটি প্রিয় সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করেন—এবার এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়, স্পাইডার-ম্যান থেকে:

“বড় ক্ষমতার সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব,” তিনি বলেন। “আমি এতে গভীরভাবে বিশ্বাস করি।”

-টাইম

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

June 26, 2026

শেয়ার করুন

ভবিষ্যৎ ও প্রযুক্তি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞ প্যানেল: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬

২০২৬ সালের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসার (যেমন: বাংলা কিউআর ও ডিজিটাল ব্যাংক) এবং মেগাপ্রজেক্টগুলোর দ্রুত অগ্রগতির ধারা বিশ্লেষণ করলে আগামী ২০ বছর পরের বাংলাদেশের এক রোমাঞ্চকর ও বৈপ্লবিক রূপরেখা দৃশ্যমান হয়। ২০৪৬ সালের বাংলাদেশ হবে সম্পূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এক দূরদর্শী ও হাই-টেক রাষ্ট্র।

স্মার্ট অবকাঠামো, ক্যাশলেস অর্থনীতি, রোবোটিক চিকিৎসা এবং আধুনিক আবাসন শিল্পের ওপর ভিত্তি করে ২০৪৬ সালের বাংলাদেশের একটি বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. স্মার্ট অবকাঠামো ও এআই-নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত ব্যবস্থা

আগামী ২০ বছরে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় এক আমূল ও পরিবেশবান্ধব পরিবর্তন আসবে:

  • উচ্চগতির রেলওয়ে নেটওয়ার্ক (High-Speed Rail): ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-যশোর রুটে ৩০০+ কিমি গতির বুলেট ট্রেন চালু হবে। ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা। এছাড়া বিভাগীয় শহরগুলোতে মাটির নিচ দিয়ে বিস্তৃত হবে আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে বা পাতালরেল।
  • এআই ট্রাফিক ও চালকবিহীন যানবাহন: ঢাকার চিরচেনা যানজট দূর করতে এআই ক্যামেরা রিয়েল-টাইম ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে। নির্দিষ্ট লেনে চলবে চালকবিহীন বাস ও মালবাহী ট্রাক। জরুরি ওষুধ ও ই-কমার্স পণ্য ডেলিভারির জন্য আকাশে ড্রোনের আলাদা হাইওয়ে বা রুট তৈরি হবে।
  • গ্রিন মোবিলিটি ও স্মার্ট হাইওয়ে: পেট্রোল-ডিজেলের গাড়ি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা সীমিত হয়ে রাস্তায় শুধু ১০০% বৈদ্যুতিক (EV) এবং হাইড্রোজেন-চলতি যানবাহন চলবে। স্মার্ট হাইওয়ের পিযোইলেকট্রিক (Piezoelectric) প্রযুক্তির কারণে গাড়ি চলার সময় রাস্তার ঘর্ষণ থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে গাড়ি চার্জ হতে থাকবে।

২. শতভাগ ক্যাশলেস ও ডাটা-চালিত ডিজিটাল অর্থনীতি

২০৪৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ কাগজের টাকামুক্ত হয়ে উঠবে:

  • কাগজের টাকার অবসান ও সিবিডিসি (CBDC): বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি বা ‘ডিজিটাল টাকা’ চালু করবে। লেনদেনের জন্য কোনো মোবাইল বা মানিব্যাগ লাগবে না; ফেস স্ক্যান (Face ID) বা বায়োমেট্রিক হাতের ছাপের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে পেমেন্ট কেটে নেওয়া হবে।
  • ব্লকচেইন ও অদৃশ্য ব্যাংকিং: কোনো ফিজিক্যাল ব্যাংক ব্রাঞ্চ থাকবে না। এআই ব্যাংকিং অ্যাসিস্ট্যান্ট সেকেন্ডের মধ্যে লোন অনুমোদন করবে। ব্লকচেইন ও স্মার্ট কন্ট্রাক্টের কারণে জমি-জমা বা ফ্ল্যাট কেনাবেচায় কোনো দালালের প্রয়োজন হবে না; ডিজিটাল দলিলের মাধ্যমে মুহূর্তেই মালিকানা বদল সম্পন্ন হবে।
  • গ্লোবাল এআই কর্মসংস্থান: প্রচলিত আইটি খাতের জায়গা নেবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও রোবোটিক্স। দেশের তরুণরা ঘরে বসেই বিশ্বের যেকোনো কোম্পানিতে কাজ করে সরাসরি ক্রিপ্টো বা ডিজিটাল কারেন্সিতে রেমিট্যান্স আনবে। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত ডাটা শেয়ার করার বিনিময়ে মানুষ অর্থ উপার্জন (Data Monetization) করবে।

৩. হাই-টেক জীবনযাত্রা, হলোগ্রাফিক শিক্ষা ও চিকিৎসা

মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় আসবে আমূল পরিবর্তন:

  • রোবোটিক ও প্রিভেন্টিভ চিকিৎসা: মানুষের ত্বকের নিচে ন্যানো-সেন্সর থাকবে, যা রোগ হওয়ার আগেই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের পূর্বাভাস দেবে। ঢাকার ল্যাবে বসেই সার্জনরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোবোটিক হাত নিয়ন্ত্রণ করে জটিল সার্জারি সম্পন্ন করবেন।
  • মেটাভার্স ও হলোগ্রাফিক ক্লাসরুম: প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের ধারণা বদলে যাবে। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই ভিআর (VR) এবং হলোগ্রাম প্রযুক্তির মাধ্যমে মেটাভার্স ক্লাসরুমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সেরা শিক্ষকদের ক্লাসে সশরীরে উপস্থিত থাকার মতো বাস্তবসম্মত শিক্ষা লাভ করবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য থাকবে নিজস্ব এআই পার্সোনাল টিউটর।

৪. স্মার্ট আর্কিটেকচার ও আবাসন শিল্প (টাইলস ও ফ্লোরিংয়ের ভবিষ্যৎ)

ভূমির সংকট দূর করতে ২০৪৬ সালের বাংলাদেশ বহুতল ও সুউচ্চ সব ভার্টিক্যাল মেগাসিটি বা গ্রিন বিল্ডিংয়ে ছেয়ে যাবে, যেখানে এক একটি ভবনেই থাকবে বাজার, পার্ক ও অফিস। এই আবাসন বিপ্লবে টাইলস ও ফ্লোরিংয়ের ক্ষেত্রে যুক্ত হবে অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি:

  • মেটাভার্স শোরুম: কাস্টমাররা টাইলস কিনতে সশরীরে শোরুমে না এসে ঘরে বসেই ভিআর (VR) গগলস পরে আপনার ডিজিটাল শোরুম ঘুরে ডিজাইন পছন্দ করবেন এবং অটো-পেমেন্টের পর রোবোটিক ডেলিভারিতে পণ্য বাড়ি পৌঁছে যাবে।
  • স্মার্ট ইন্টারেক্টিভ ও সোলার ফ্লোরিং: সাধারণ টাইলসের জায়গা নেবে স্মার্ট ফ্লোরিং। দেয়ালের রঙ বা ফ্লোরের টাইলস ডিজাইন মুড অনুযায়ী এক ক্লিকেই বদলে ফেলা যাবে। এই মেঝেগুলো ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে, সোলার প্যানেলের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং মেঝেতে কোনো ময়লা পড়লে সেলফ-ক্লিনিং (Self-cleaning) সেন্সরের মাধ্যমে নিজেই তা পরিষ্কার করে নেবে।
  • ৫. পরিবেশ, সবুজ জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতা

৫. পরিবেশ, সবুজ জ্বালানি ও জলবায়ু সহনশীলতা

  • গ্রিন এনার্জি: দেশের মোট বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি আসবে সৌরশক্তি, বায়ুবিদ্যুৎ এবং পরমাণু শক্তি (রূপপুর ও দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র) থেকে।
  • ভাসমান শহর: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ও উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠবে জলবায়ু-সহনশীল ভাসমান বাড়িঘর ও আধুনিক ভাসমান শহর। সেই সাথে কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাবে লবণাক্ততা-সহনশীল আধুনিক হাইব্রিড কৃষি প্রযুক্তি।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

২০৪৬ সালের বাংলাদেশ হবে এক জাদুকরী ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র। আজ আমরা যে প্রযুক্তিগুলোকে সায়েন্স ফিকশন বা কাল্পনিক মনে করছি, ২০ বছর পর তা-ই হবে এদেশের মানুষের অতি সাধারণ জীবনযাত্রার অংশ। এই আসন্ন ডিজিটাল ও স্মার্ট বিপ্লবের সাথে নিজেদের ব্যবসাকে খাপ খাইয়ে নিতে দূরদর্শী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের সমসাময়িক অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ মেগাপ্রজেক্ট, স্মার্ট এআই প্রযুক্তি এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইনের যেকোনো নিখুঁত ও সহজ বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

নিউজ ডেস্ক

June 24, 2026

শেয়ার করুন

ইতিহাস ও রাজনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞ প্যানেল: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর পরিবারের ইতিহাস কেবল একটি বংশের বিবরণ নয়, বরং এটি ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, আইন, এবং বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একদিকে যেমন এই পরিবারের একটি অংশ পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে জড়িয়ে পড়েছিল, অন্যদিকে এই পরিবারেরই আদর্শিক উত্তরাধিকার ও অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

১. পারিবারিক পটভূমি ও সম্ভ্রান্ত ঐতিহ্য

সোহরাওয়ার্দী পরিবার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রাচীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার হিসেবে পরিচিত, যাঁরা শিক্ষা ও আইন অঙ্গনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন:

  • পিতা: স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ এবং কলকাতা হাইকোর্টের অত্যন্ত সম্মানিত বিচারপতি।
  • মাতা: খুজাস্তা আখতার বানু ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক এবং উর্দু সাহিত্যিক।

২. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গতিশীল রাজনৈতিক জীবন

আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে এই মহান নেতার রাজনৈতিক জীবনকে ৫টি প্রধান অধ্যায়ে ভাগ করা যায়:

❶ রাজনৈতিক সূচনা ও শ্রমিক আন্দোলন (১৯২০-এর দশক)

যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে ১৯২০ সালে দেশে ফিরে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। শুরুতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের (সি. আর. দাস) ‘স্বরাজ পার্টি’-তে যোগ দেন এবং ১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। কলকাতায় মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় তিনি প্রায় ৩৬টি ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গড়ে তুলে গণমানুষের নেতায় পরিণত হন।

❷ অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি ও মুখ্যমন্ত্রিত্ব (১৯৩৭-১৯৪৭)

তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে নিরঙ্কুশ জয় এনে দিয়ে তিনি অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) হন। এ সময় তিনি শরৎচন্দ্র বসুর সাথে মিলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ভিত্তিতে একটি ‘স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা’ রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সফল হয়নি।

❸ পাকিস্তান আমল ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯৪৭-১৯৫৬)

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের একনায়কতান্ত্রিক ও বাঙালি-বিরোধী নীতির প্রতিবাদে তিনি সোচ্চার হন। এর জেরে ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক এবং তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মিলে পাকিস্তানের প্রথম প্রধান বিরোধী দল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ) গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে শেরে বাংলা ও ভাসানীর সাথে জোট বেঁধে মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

❹ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সংবিধান প্রণয়ন (১৯৫৬-১৯৫৭)

১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পাকিস্তানের ৫ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর অন্যতম প্রধান সাফল্য ছিল পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী সংবিধান প্রণয়নে নেতৃত্ব দেওয়া, যার মাধ্যমে গভর্নর-জেনারেল পদের অবসান ঘটে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার ওপর জোর দেন। তবে সামরিক জান্তা ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের চাপে ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

❺ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও শেষ জীবন (১৯৫৮-১৯৬৩)

১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করলে সোহরাওয়ার্দী গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন শুরু করেন। আইয়ুব সরকার তাঁর ওপর ‘এবডো’ (EBDO) আইন প্রয়োগ করে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করে এবং ১৯৬২ সালে তাঁকে কারাগারে পাঠায়। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আইয়ুব বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (NDF) গঠন করেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতে একটি হোটেল কক্ষে এই মহান নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৩. বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঐতিহাসিক অবদান

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বলা হয় “গণতন্ত্রের মানসপুত্র”। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অধীনেই রাজনীতি ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের দীক্ষা পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে নিজের রাজনৈতিক গুরু ও মেন্টর মানতেন।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর এক ভাষণে প্রথম স্বাধীন দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’ রাখার যে প্রস্তাব করেন, তা মূলত সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও স্বপ্নেরই একটি সুদূরপ্রসারী রূপ ছিল। তাঁর হাত ধরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বীজ বপন হয়েছিল, তা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশে রূপ নেয়। যার কারণে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ-এর নামকরণ করা হয়েছে।

৪. পরিবার ও বাংলাদেশ-پاکستان বিতর্ক: থেকে যাওয়ার আসল কারণ

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মূল পরিবার (তাঁর একমাত্র কন্যা ও বংশধরেরা) বাংলাদেশে না এসে পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার পেছনে ৪টি সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল:

  1. নাগরিকত্ব ও আবাসন: ১৯৪৯ সালে সোহরাওয়ার্দী নিজে স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে চলে আসেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে তাঁর পরিবার স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের করাচি এবং লাহোরকে কেন্দ্র করে তাদের স্থায়ী জীবন গড়ে তোলে।
  2. বৈবাহিক সূত্র: সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র কন্যা বেগম আখতার সুলায়মান ব্রিটিশ আমলেই ভারতের বিখ্যাত আইনি ব্যক্তিত্ব স্যার शाह সুলায়মানের ছেলে শাহ আহমদ সুলায়মানকে বিয়ে করেন। দেশভাগের পর এই সুলায়মান পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে স্থায়ী হয়।
  3. ১৯৭১ সালের আদর্শিক ভিন্নতা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সময় বেগম আখতার সুলায়মান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর বাবা অখণ্ড পাকিস্তানের ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন। এই রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তাকে সমর্থন দেন এবং আওয়ামী লীগের একাংশকে নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক মোর্চা গঠনের চেষ্টা করেন।
  4. পাকিস্তানের উচ্চপদ লাভ: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই বংশধরেরা পাকিস্তানেই থেকে যান। বেগম আখতার সুলায়মানের কন্যা এবং সোহরাওয়ার্দীর নাতনি শাহিদা জামিল পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত আইনজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী (Federal Minister for Law) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ব্যতিক্রম: রশিদ সোহরাওয়ার্দী (Robert Ashby)

সোহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয় স্ত্রী (রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ভেরা আলেকজান্দ্রোভনা)-র গর্ভজাত একমাত্র ছেলে রশিদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের এই রাজনৈতিক আদর্শ গ্রহণ করেননি। তিনি যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন এবং একজন মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে জীবন কাটান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি পরিবারের বাকি সদস্যদের বিপক্ষে গিয়ে লন্ডনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো জনমত গঠন করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে এসে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারেও অংশ নেন। ২০১৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রক্তের উত্তরাধিকার বা পারিবারিক লিনিয়েজ বৈবাহিক ও রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তানে স্থায়ী হলেও, তাঁর রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রকৃত উত্তরাধিকার এদেশের মেহনতি মানুষ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ। রাজনৈতিক গুরু হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে তিনি যে স্বাধিকারের স্বপ্ন বপন করেছিলেন, তা আজ একটি স্বাধীন মানচিত্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের জীবনী এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।

নিউজ ডেস্ক

June 20, 2026

শেয়ার করুন

ইতিহাসের পাতা থেকে | বিশেষ ফিচার

ডেস্ক রিপোর্ট, পালস বাংলাদেশ

সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬

ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে বাঙালি এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবদান চিরকাল বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে একজন অকুতোভয় নারীর বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ—সবখানেই জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব ইতিহাস।

হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক নারী স্নাইপার

“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”

১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে এই বজ্রকণ্ঠের ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

ক) নার্স নয়, স্নাইপার হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ২,০০০ নারীকে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাদের মধ্যে লুডমিলা ছিলেন সবচেয়ে সেরা। শুরুর দিকে সেনাবাহিনীতে তাঁকে নার্স হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং একটি কঠিন অডিশন বা ট্রায়ালের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের নিখুঁত নিশানাভেদের দক্ষতা প্রমাণ করেন।

খ) মাত্র এক বছরে ৩০৯টি “কনফার্মд কিল”

স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর ওডেসায় লড়াইকালীন প্রথম ৭৫ দিনের মধ্যেই লুডমিলা ১৮৭ জন শত্রুকে পরাস্ত করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নিশ্চিত হত্যার (Confirmed Kills) সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯ জনে, যার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন খোদ জার্মানদের তুখোড় স্নাইপার!

সামরিক পরিভাষায় “কনফার্মড কিল” কী?

যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার কাউকে গুলি করলেই সেটি রেকর্ডে যোগ হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড তখনই “কনফার্মড” বা নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা কোনো সামরিক অফিসার সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রমাণ দেন। ফলে, সাক্ষী ছাড়া লুডমিলা আসলে আরও কত নাৎসি সেনা খতম করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩০৯ এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।

গ) হিটলারের বাহিনীর ভয় এবং চকোলেটের লোভনীয় প্রস্তাব

লুডমিলার নিখুঁত নিশানার কারণে জার্মান নাৎসি বাহিনীর কাছে তিনি এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। জার্মানরা তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান রেডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে বিলাসবহুল ঘর-সংসার, উচ্চপদস্থ সামরিক পদ এবং প্রচুর পরিমাণে চকোলেটের অফার দিতে শুরু করে।

এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাব যখন লুডমিলা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ক্ষিপ্ত জার্মানরা রেডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তাকে বন্দি করতে পারলে “৩০৯ টুকরো” করা হবে। এই হুমকি শুনে লুডমিলা পরে হেসে বলেছিলেন, “বাহ! এমনকি ওরাও তাহলে আমার নিখুঁত স্কোরটা ভালোভাবে জানত!”

ঘ) হোয়াইট হাউসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক

যুদ্ধের একপর্যায়ে আহত হওয়ার পর লুডমিলাকে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠানো হয়। তিনি ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও ফার্স্ট লেডি এলিয়েনর রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক অবদান

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণ তৈরি হয়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি, সাহসী কূটনীতিবিদ এবং অকুতোভয় সাংবাদিকদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী।

১. ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী: সর্বাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বহুমুখী। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন:

  • আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৌড়ঝাঁপ: ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার পর, ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করান। মে মাসে বেলগ্রেডের বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর বাণীতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানালে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
  • ম্যারাথন বিশ্ব সফর: ২৪ অক্টোবর থেকে তিনি ১৯ দিনের এক ম্যারাথন বিশ্ব সফরে বের হন এবং ব্রাসেলস, ভিয়েনা, ব্রিটেন, আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে ১২৫ মিনিটের বৈঠক), ফ্রান্স ও জার্মানিতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
  • সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য তিনি আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
  • জে এফ আর জ্যাকব (লে. জেনারেল): একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ জোগান দেওয়া এবং যৌথ সংস্কৃতির নকশা তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পেছনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিল।

২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া): আন্তর্জাতিক ভেটো ও ভূরাজনৈতিক ঢাল

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল:

  • জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভেটো: বাংলাদেশের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জাতিসংঘের security council বা নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই প্রস্তাবে পরপর ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান করে মার্কিন-চীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। রাশিয়া এই ভেটো না দিলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন বিলম্বিত বা নেতিবাচক খাতে মোড় নিতে পারত।
  • মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর প্রতিহত: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সক্রিয় নৌ-উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই থমকে যেতে হয়েছিল।
  • পুনর্গঠনে রুশ অবদান: যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।

৩. আমেরিকা: সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন নাগরিকদের অকৃত্রিম সমর্থন

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রিহার্ড নিক্সনের রিপাবলিকান সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ জনগণ, সিনেটর, কবি ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন:

  • সিনেটর এডওয়ার্ড ‘টেড’ কেনেডি: মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো স্বচক্ষে পরিদর্শন করে মার্কিন সিনেটে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে এক ঐতিহাসিক রিপোর্ট জমা দেন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিবরণ ছিল।
  • কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে ভারতের সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর এবং বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এই চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা খাঁ, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটনদের সুরের মূর্ছনায় unarmed বাঙালিদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় এবং জর্জ হ্যারিসনের বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বকে নাড়া দেয়।
  • অ্যালেন গিন্সবার্গ: এই মার্কিন কবি বাংলাদেশের শরণার্থীদের হাহাকার নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যা পড়ে বিশ্বজুড়ে অজস্র মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল।

৪. যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কলমযোদ্ধারা

লন্ডন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবদান ছিল অনন্য:

  • অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পাকিস্তানি সাংবাদিক একাত্তরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশ থেকে পালিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৩ জুন তা প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম পাকিস্তানের আসল বর্বরতার কথা জানতে পারে।
  • সায়মন ড্রিং: ডেইলি টেলিগ্রাফের এই তরুণ সাংবাদিক ২৫ মার্চের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থেকে ঢাকার বুকে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন। ব্যাংকক থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
  • সিডনি শ্যানберг: নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিকও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড সশরীরে দেখেন এবং যুদ্ধজুড়ে তাঁর পাঠানো অসংখ্য শরণার্থী-ভিত্তিক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বীরত্ব এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মহান বন্ধুদের অকৃত্রিম সহায়তাই আজ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।

আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমসাময়িক কূটনীতি এবং জাতীয় খবরের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।

১৩ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ