নির্বাচনী খবর
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
এরই মধ্যে টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (28, January,2026) তারেক রহমান কথা বলেছেন তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
চার্লি ক্যাম্পবেল / ঢাকা
এডিটর অ্যাট লার্জ
তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেতার জন্য এটি আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টিতে একধরনের ব্যঙ্গও আছে, কারণ স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের কার্যত বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তৃতা এক দশক ধরে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল।
“আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে,” বলেন রহমান, ঢাকায় তার পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বাগানজুড়ে বুগেনভিলিয়া আর গাঁদা ফুল। ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরার পর এটি তার প্রথম সাক্ষাৎকার।
“আসলে আমি কথাবার্তায় খুব ভালো নই,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন তিনি, “কিন্তু আমাকে যদি কিছু করতে বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”
রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল একেবারেই ঝড়ের মতো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে আসেন, ঢাকার বিমানবন্দরে সারারাত অপেক্ষা করা লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থকের অভ্যর্থনায়। মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান তার মা—বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে আরও বেশি মানুষ ঢল নামে।
“আমার হৃদয়ে এটা খুব ভারী,” চোখ ছলছল করে বলেন রহমান। “কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো—আপনার যখন দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে সেটা পালন করতেই হবে।”
সে দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথ অনুসরণ করার মতোই বড় কিছু। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রহমানই স্পষ্টভাবে এগিয়ে, যা ১৮ মাস আগে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ডাকা হয়। রহমান নিজেকে এমন এক সেতু হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি করবে।
সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে বহু সংকট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যা শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ এমন এক অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা এখনো পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তরুণদের বেকারত্ব ১৩.৫%—আর প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করায় নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে রহমানের সঙ্গে রয়েছে বিতর্কের বোঝা। তার প্রধান পরিচয় বংশগত—খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র হিসেবে তিনি সেই দ্বন্দ্বময় দ্বিদলীয় রাজনীতির এক প্রান্তের প্রতিনিধি, যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে (অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা)।
সমর্থকদের কাছে রহমান একজন নিপীড়িত উদ্ধারকর্তা, যিনি বিপর্যস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরেছেন। সমালোচকদের কাছে তিনি এক ‘অন্ধকার রাজপুত্র’—দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাভোগী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া একজন ব্যক্তি, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে পাওয়া।
রহমান জোর দিয়ে বলেন, তিনিই বিভক্ত দেশকে সুস্থ করার উপযুক্ত মানুষ। “আমি এখানে আছি বাবা-মায়ের ছেলে বলেই নয়,” তিনি বলেন। “আমার দলের সমর্থকরাই আমাকে এখানে এনেছে।”
বাংলাদেশিরা তার কথায় বিশ্বাস রাখতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জরিপে তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ৭০% সমর্থন পায়। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী পায় ১৯%।
তবু উদ্বেগ স্পষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬—বিএনপির শেষ শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নিহত প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর রক্ত হয়তো আরেক আত্মকেন্দ্রিক উত্তরাধিকারী জন্ম দেবে।
রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন, এবং অন্তর্বর্তী সরকার তার আগের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছে। “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি,” অভিযোগকারীদের সম্পর্কে বলেন তিনি। সত্যি বলতে, হাসিনার আওয়ামী লীগ এক অনুগত গণমাধ্যমের সহায়তায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রচার করেছিল। আবার এটাও সত্য, জুলাই বিপ্লব যে বংশগত বিশেষাধিকারবিরোধী ছিল, রহমান নিজেও সেই উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অন্যতম বড় অবদানকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি আবার মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের উৎস এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে এগোচ্ছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল সরাতে সহায়তা করছে। তবে চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়—কারণ বঙ্গোপসাগরে এর কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলায় কাজে আসতে পারে।
আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে, তা স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার পথ রোধে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—রাজনৈতিক নির্বাসনের বছরগুলোতে রহমান কি যথেষ্ট আত্মসমালোচনা ও পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যাতে সত্যিই তিনি জনগণের নেতা হতে পারেন?
“যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”
রহমান শান্ত স্বভাবের ও অন্তর্মুখী; কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে বা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’।
“আমি সম্ভবত আটবার দেখেছি!”—হেসে বলেন তিনি।
তিনি এমন একজন নীতিনির্ভর মানুষ হিসেবে ধরা দেন, যিনি যেকোনো বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের পরিকল্পনা করছেন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের জন্য, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান ভূমি অবক্ষয় রোধে, এবং ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির কথা ভাবছেন বায়ুদূষণ কমাতে। বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—সবই তার পরিকল্পনায় আছে।
“আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০% বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” তিনি বলেন।
রহমানের এই টেকনোক্র্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি তার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি বিমান বাহিনীর একটি স্কুলে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি; দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলবিদে পরিণত হন। কিন্তু তার এই ক্ষমতা তাকে একই সঙ্গে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত করে তোলে—সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতেন।
অনেক বাংলাদেশির কাছে রহমান এখনো বিদ্রূপাত্মকভাবে “খাম্বা তারেক” নামে পরিচিত। কথিত আছে, একটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) একটি সহযোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে কেনা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কখনোই বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়নি। রহমান এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে “লুটেরা শাসনব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয় যে তিনি “প্রকাশ্য ও ঘন ঘন ঘুষ দাবি করতেন” বলে কুখ্যাত।
২০০৭–২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রহমান ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং আওয়ামী লীগ বহরের ওপর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার অভিযোগসহ মোট ৮৪টি মামলা ছিল। কারাগারে নির্যাতনের কারণে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান।
“শীতকালে খুব ঠান্ডা হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়,” বলেন তিনি। “কিন্তু আমি এটাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন কষ্ট না পায়, সেজন্য আমাকে সর্বোচ্চটা দিতে হবে।”
২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হলে—যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন—রহমান বিদেশ থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন।
এই সময়ের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। দেশটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়; ২০০৬ সালে যেখানে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার শাসনের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। সব প্রতিষ্ঠান রাজনীতিকরণে আক্রান্ত হয়—ফলে সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তোলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হতে থাকে—জীবনযাত্রার খরচ, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব দ্রুত বাড়ে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শাসকগোষ্ঠীর অনুগতদের জন্য চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু হাসিনার কঠোর দমননীতি রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ—কিশোর থেকে বৃদ্ধ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক—সবাই এক কাতারে।
বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকায় হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি এখনো অবস্থান করছেন, ঘনিষ্ঠদের নিয়ে তার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
“ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে,” হাসিনা টাইমকে বলেন। “বাংলাদেশে যতক্ষণ না সব বড় রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।”
গণতন্ত্র ক্ষয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ রহমানের কাছে বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে যে বিপুল রক্তপাত ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি ও পাথর হাতে থাকা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান ব্যবহার করেছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে।
“যে-ই অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে,” বলেন রহমান। “তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” নভেম্বর মাসে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়—শেখ হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।
তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে জানান, দলীয় কর্মীদের ভোট ব্যাহত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেব না,” তিনি বলেন। “আমাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে… শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সহিংসতা হবে।”
এই ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ভালো করবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এই প্রমাণ হিসেবে যে দেশে উগ্র ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে। আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালী ভারতীয় মহল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য লবিং করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০% ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। রহমান বলেন, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্ভাব্য ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।
“ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
জুলাই বিপ্লবের স্মারক এখনো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। দেয়ালচিত্রে শেখ হাসিনাকে শয়তানের শিং ও লুটের বস্তা দিয়ে আঁকা হয়েছে। স্লোগানে লেখা—“বাংলাদেশি পুলিশ লজ্জা করো!” এবং “এটা জেন-জি তৈরি নতুন বাংলাদেশ।”
“জুলাইয়ের পর মানুষ চেয়েছিল ব্যবস্থা বদলাতে—বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও পুলিশ যেন স্বাধীন হয়,” বলেন ২৬ বছর বয়সী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন। রহমান সম্পর্কে তিনি এখনো চূড়ান্ত মত দেননি, তবে ইতিবাচক।
“তারেক রহমান ভালো করছেন,” তিনি বলেন। “বিএনপির মতো দল নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা যায় না, তবে এখন পর্যন্ত তিনি ভালোই করছেন।”
সংস্কারগুলোর সাফল্য নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন বিপ্লবী দেয়ালচিত্রগুলো রোদে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ছাত্রদের বিজয়ের উচ্ছ্বাসও অন্তর্কলহ ও বিভাজনে ম্লান হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, আর মুহাম্মদ ইউনূসের নিজস্ব সরকারি অভিজ্ঞতা না থাকায় নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও সীমিত ছিল। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নারীরা অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় উপেক্ষিত হন—ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির নেতৃত্ব পান তারা (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন)। তাও ইসলামপন্থীদের কুরুচিপূর্ণ বিক্ষোভের মুখে পড়ে; তারা দাবি করে, লিঙ্গসমতার সুপারিশ শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো স্থগিত হয়ে যায়।
কিছু সাফল্যও এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পর্যালোচনা করে এবং ১,৫৬৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে; এর মধ্যে ২৮৭ জনকে “নিখোঁজ ও মৃত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (প্রায় সবাই জামায়াত বা বিএনপির সদস্য ছিলেন।) সেনাবাহিনীর চাপ সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতেই বিচার হচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনাও খুলে গেছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক মুবারশার হাসান—যিনি হাসিনার আমলে ৪৪ দিন বিচারবহির্ভূতভাবে আটক ছিলেন—স্মরণ করেন, সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনীতিকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
“এরপর আমি শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি,” তিনি বলেন। “হাসিনার আমলে এটা কল্পনাও করা যেত না।”
তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। স্বেচ্ছাচারী গণপিটুনি ও দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনলাইন ডক্সিং উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১২ ডিসেম্বর, যখন যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি—ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কড়া সমালোচক—ঢাকায় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর একটি উত্তেজিত জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেগুলোকে তারা দিল্লিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ছাদের ওপর বহু সাংবাদিক আটকা পড়েন। সাধারণ ধারণা হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকার কারণে জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রবল থাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালনে আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে না।
“আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা,” বলেন রহমান। “মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে নিরাপদ বোধ করে—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা ভবিষ্যতে অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা একটি সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটেও ভোট দেবেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা। সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, না ভোট “খুবই হতাশাজনক” হবে।
“তাহলে দেশ এমন এক অবস্থায় পড়ে যাবে, যেখানে আবার অতীতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”
আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক দ্রুত উন্নত না হলে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
“দেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন কখনোই মুক্ত বা সুষ্ঠু হতে পারে না,” বলেন হাসিনা।
রিয়াজ এতে অনুতপ্ত নন। “এই দলটি এমন ভয়াবহ কাজ করেছে, যা কার্যত মানবতাবিরোধী অপরাধ,” তিনি বলেন। “তারা এর জন্য ক্ষমাও চায়নি। বরং মানুষকে উসকানি দিচ্ছে।”
আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না—এ বিষয়ে রহমান সরাসরি মন্তব্য করতে চান না। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।
“কারণ আজ আপনি যদি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তাহলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?” তিনি বলেন। “অবশ্যই, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।”
রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদ তৈরি করলেও, বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে চোখে পড়া পরিবর্তন হলো ইসলামী রাজনীতির পুনরুত্থান। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়েও বেশি; পাশাপাশি প্রায় ১০% সংখ্যালঘু—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এই বৈপরীত্যই চরমপন্থীদের বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
হাসিনার বহু ত্রুটি সত্ত্বেও তিনি উগ্রবাদ দমনে কঠোর ছিলেন এবং এমনকি হিজড়া সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই জামায়াতে ইসলামী—ইসলামপন্থী দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ প্রচারণার কারণে দলটি তরুণদের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভূমিধস বিজয় অর্জন করে—যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সূচক হিসেবে বিবেচিত। তারা আরও চারটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েও জয়ী হয়। এনসিপিও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে বেশিরভাগই নারী—এমন ডজনখানেক নেতা দল ছাড়েন। প্রকাশ্যে সমকামী এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
“এটা নারী ছাত্রনেত্রী, সংখ্যালঘু এবং তরুণদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক,” বলেন ঢাকাভিত্তিক নার্স ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামী তাদের সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা আরও চরম বক্তব্য থেকে সরে এসে নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” হিসেবে পুনর্ব্র্যান্ডিং করেছে। তারা সামাজিক কল্যাণে জোর দিচ্ছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে। এমনকি একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক। তবে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি ধর্মীয় ভিত্তির কারণে তৈরি হওয়া দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছেন।
জানুয়ারির শুরুতে জামায়াতের নেতা প্রকাশ করেন যে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন—যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। রহমান এতে বিচলিত নন।
“মানুষ শুধু এমন একটি গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে,” তিনি বলেন।
যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা হবে একটি বড় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ার এই পরাশক্তি দিয়ে বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের ভূখণ্ডই বাংলাদেশের পণ্যের প্রধান স্থলপথ, পাশাপাশি তুলা, শস্য, জ্বালানি, শিল্প উপকরণ ও বিদ্যুতের বড় সরবরাহকারী দেশটি।
“আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা আগে,” বলেন রহমান, “তারপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ছেষ্টা করবো “
ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ায়, তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান খলনায়ক।
“তারেক রহমানের মতো একজন নেতাও প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আহ্বান জানালে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নেন,” বলেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।
এটি প্রজন্মগত গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র ও ৩,৮০০-এর বেশি সেনার প্রাণ দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। অথচ আজকের তরুণদের চোখে জামায়াত দুর্নীতিমুক্ত আর ভারত প্রধান শত্রু।
এই অতীত-বিচ্ছিন্নতা দেখায় যে রহমান তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিরা অর্ধশতাব্দী আগের বীরত্বগাথায় আগ্রহী নয়; তারা চায় এমন একজন নেতা, যিনি কথা শোনেন, সেতুবন্ধন তৈরি করেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও আস্থা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলতে থাকলে, মানুষ হয়তো হাসিনার শাসনামলের রেকর্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
“বংশগত দলগুলোকে কখনোই পুরোপুরি বাতিল করা যায় না,” বলেন কুগেলম্যান। “মাত্র দুই বছর আগেও বিএনপিকে মৃত ও সমাহিত মনে করা হচ্ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও হয়তো শেষ হয়ে যাননি—এখন তিনি প্রাসঙ্গিক নন, কিন্তু ভবিষ্যতে ফিরেও আসতে পারেন।”
দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে রহমান সচেতন হলেও, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হলো বিএনপির সেই হাজারো তৃণমূল কর্মী, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছিল এবং এখন মনে করছে তারা ‘প্রাপ্য সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী। দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
তবে রহমান যে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন—তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মে মাসে তিনি নিজের ও তার মাকে ব্যঙ্গ করে আঁকা একটি কার্টুন পুনরায় পোস্ট করেন এবং লেখেন—“আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে না মিললেও নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে সম্মান করা জরুরি।” খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনার আমলে তার মায়ের প্রতি আচরণের সমালোচনা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ঐক্যের আহ্বান জানান। হাসিনার “আয়রন লেডি” ভাবমূর্তির বিপরীতে রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নরম ও মানবিক ইমেজ গড়ছেন। যুক্তরাজ্য থেকে তার সঙ্গে আসা আদুরে কমলা রঙের সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
লন্ডনের আগের জীবনের কোন দিকটি তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন—জিজ্ঞেস করা হলে রহমান এক মুহূর্তও দেরি করেন না।
“আমার স্বাধীনতা,” বলেন তিনি, পরিবারের বাড়ির চারপাশে ঘেরা ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে। “এই বাড়িতে এসে এত নিরাপত্তা দেখে আমার দম বন্ধ লাগছিল।” পাড়ার দোকানে হেঁটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ লেক্সাস চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম পর্যন্ত গিয়ে মেয়ে জায়মাকে চমকে দেওয়া—এসব এখন অতীত। প্রতিদিনের ১০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ করতে তাকে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
তবু রহমান অভিযোগ করছেন না। তার প্রত্যাবর্তন যে হঠাৎ কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং উদ্দেশ্য ও সংকল্পে ভরপুর—মানুষের জীবনমান উন্নত করার দৃঢ় ইচ্ছা থেকেই এসেছে—তা তিনি দেখাতে চান। বক্তব্য শেষ করতে তিনি তার আরেকটি প্রিয় সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করেন—এবার এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়, স্পাইডার-ম্যান থেকে:
“বড় ক্ষমতার সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব,” তিনি বলেন। “আমি এতে গভীরভাবে বিশ্বাস করি।”
-টাইম
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্য | পালস বাংলাদেশ
কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ১২ জুলাই, ২০২৬
যোগাযোগ এবং বাণিজ্যের সুবিধার্থে সমগ্র বিশ্বে একটি একক বা সার্বজনীন মুদ্রা (Single World Currency) চালুর ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালও, ব্যবহারিক অর্থনীতিতে এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ। একটি একক মুদ্রা বৈশ্বিক লেনদেনকে সহজ করার সম্ভাবনা তৈরি করলেও, বাস্তব অর্থনীতিতে এটি বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

নিচে বিশ্বজুড়ে একক মুদ্রা চালুর সুবিধা, অসুবিধা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান ডলার-ভিত্তিক ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে একটি নিরেট অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১. একক বিশ্ব মুদ্রার প্রধান সুবিধাসমূহ (The Pros)
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি সার্বজনীন কারেন্সি চালু হলে প্রধানত ৩টি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে:
- লেনদেনের খরচ হ্রাস (Zero Conversion Fees): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ অপচয় হয় মুদ্রা বিনিময় ফি (Currency Conversion Fee) বা ফোরেক্স চার্জে। একক বৈশ্বিক মুদ্রা থাকলে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের এই ট্রানজেকশন কস্ট পুরোপুরি বেঁচে যাবে।
- বিনিময় হারের ঝুঁকি বিলুপ্তি (No Exchange Rate Risk): বিভিন্ন দেশের মুদ্রার মান প্রতিনিয়ত ওঠানামা করায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে এক ধরনের ঝুঁকি থাকে। একক মুদ্রা থাকলে এই অনিশ্চয়তা থাকবে না, ফলে ছোট-বড় সব দেশই নির্ভয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন বাড়াতে পারবে।
- মূল্যের স্বচ্ছতা (Price Transparency): সারা বিশ্বে একই মুদ্রা থাকলে ভোক্তারা সহজেই বিভিন্ন দেশের পণ্যের দামের তুলনা করতে পারবেন। এতে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া ব্যবসা বা মনোপলি করার সুযোগ হ্রাস পাবে।
২. একক মুদ্রার অর্থনৈতিক অসুবিধাসমূহ (The Cons)

অর্থনীতিবিদদের মতে, সারা বিশ্বে একই মুদ্রা চালু করলে মূলত ৪টি বড় ধরনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে:
ক. স্বাধীন আর্থিক নীতি ও স্বায়ত্তশাসন হারানোর ঝুঁকি
প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। কোনো দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, তখন সেই দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে বা বাজারে নতুন টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে (QE) অর্থনীতি সচল করার চেষ্টা করে। কিন্তু একক বিশ্ব মুদ্রা থাকলে, কোনো দেশের নিজস্ব সরকার চাইলেই এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। মুদ্রানীতির সমস্ত নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে একটি সর্বজনীন ‘বিশ্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক’-এর হাতে।
খ. ‘সবার জন্য এক নীতি’ (One Size Fits All) এবং অসম প্রতিযোগিতা
বিশ্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন কোনো সুদের হার বা মুদ্রানীতি নির্ধারণ করবে, তা হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোর জন্য উপকারী হবে, কিন্তু বাংলাদেশ বা আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশের জন্য তা ধ্বংসাত্মক প্রমাণ হতে পারে। একই মুদ্রা ব্যবহার করায় দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
গ. স্থানীয় সংকট বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া (Contagion Effect)
বর্তমানে কোনো একটি দেশে অর্থনৈতিক সংকট হলে (যেমন শ্রীলঙ্কা বা ভেনিজুয়েলায় হয়েছিল) তার প্রভাব মূলত সেই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে একই মুদ্রা থাকলে, কোনো একটি বড় অর্থনীতির দেশের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল পুরো বিশ্বকে দিতে হবে এবং একটি আঞ্চলিক সংকট মুহূর্তের মধ্যে বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেবে, যা ব্যাপক হারে গণ-বেকারত্ব তৈরি করবে।
ঘ. মুদ্রার অবমূল্যায়নের (Devaluation) সুযোগ না থাকা
কোনো দেশ যখন বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ে বা রপ্তানি বাড়াতে চায়, তখন তারা নিজস্ব মুদ্রার মান কিছুটা কমিয়ে দেয় (Devaluation)। এতে তাদের উৎপাদিত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা হয় এবং রপ্তানি বাড়ে। একক মুদ্রা থাকলে কোনো দেশ এই সুপরিচিত অর্থনৈতিক কৌশলটি ব্যবহার করতে পারবে না।
৩. ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইউরো’ (Euro) মুদ্রার বাস্তব অভিজ্ঞতা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) ২০টি দেশ বর্তমানে একক মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ ব্যবহার করে, যা ইউরোজোন (Eurozone) নামে পরিচিত। ১৯৯৯ সালে এটি চালু হওয়ার পর এর বাস্তব ফলাফল নিচে টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| ইউরোজোনের সাফল্য (Success) | ইউরোজোনের ব্যর্থতা (Failure) |
| সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মুদ্রা রূপান্তরের কোনো বাড়তি খরচ লাগে না। | সদস্য দেশগুলো তাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি নির্ধারণের ক্ষমতা হারিয়েছে। |
| ইউরোজোনের ভেতরে মূল্য স্থিতিশীল থাকে এবং পর্যটকদের বারবার টাকা পরিবর্তন করতে হয় না। | ২০১০ সালের গ্রিস সংকট: জার্মানির মতো শক্তিশালী অর্থনীতি এবং গ্রিসের মতো দুর্বল অর্থনীতি—সবার জন্য ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) একই নীতি নির্ধারণ করায় গ্রিস নিজের মতো করে বেলআউট বা সংকট সামাল দিতে পারেনি এবং মারাত্মক দেউলিয়া অবস্থার মুখে পড়েছিল। |
৪. আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য (The Dollar Hegemony)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালের ‘ব্রেটন উডস চুক্তি’-র মাধ্যমে মার্কিন ডলার বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা বা রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি ডলারের ৩টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে:
- বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা (Universal Medium): যেকোনো দুটি দেশ (যেমন- বাংলাদেশ ও ব্রাজিল) নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করার সময় সাধারণত নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার না করে প্রথমে সেটিকে ডলারে রূপান্তর করে এবং সেই ডলার দিয়ে পণ্য কেনাবেচা করে।
- পেট্রোদলারে তেল বাণিজ্য (Petrodollar System): ১৯৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ওপেকের (OPEC) সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তি হয় যে, বিশ্বের সমস্ত খনিজ তেল শুধু মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হবে। তেল কেনার জন্য বিশ্বের প্রতিটি দেশকে বাধ্য হয়ে ডলারের বড় রিজার্ভ রাখতে হয়।
- সুইফট (SWIFT) নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ: আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হলো ‘সুইফট’ নেটওয়ার্ক। এই ব্যবস্থার ওপর আমেরিকার পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকায় তারা চাইলে যেকোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাদের আন্তর্জাতিক ডলারের বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে (যেমনটা রাশিয়ার ক্ষেত্রে করা হয়েছে)।
৫. ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
সমগ্র বিশ্বে একটিমাত্র কাগজের মুদ্রা ব্যবহারের ধারণাটি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে বেশ কিছু যুগোপযোগী বিকল্প ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে:
- বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থা (Multipolar Currency System): বিশ্ব কোনো একটি নির্দিষ্ট মুদ্রার ওপর এককভাবে নির্ভর না করে কয়েকটি শক্তিশালী মুদ্রার (যেমন: ডলার, ইউরো, রেনমিনবি বা ইউয়ান, পাউন্ড, ইয়েন) একটি মিশ্রণ ব্যবহার করবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতি একক কোনো দেশের সংকটের কারণে ধসে পড়বে না।
- CBDC ও আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক: ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (যেমন: ই-টাকা, ই-রুপি) তৈরিতে জোর দিচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক সমন্বিত ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই মুদ্রাগুলো কোনো মধ্যস্থতাকারী (যেমন ডলার) ছাড়াই সরাসরি একে অপরের সাথে সেকেন্ডের মধ্যে বিনিময় করা যাবে।
- এসডিআর (Special Drawing Rights): এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) কর্তৃক তৈরিকৃত একটি কৃত্রিম আন্তর্জাতিক রিজার্ভ সম্পদ। এটি বিশ্বের ৫টি প্রধান মুদ্রার গড় মানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। একে বিশ্ব বাণিজ্যের মূল মাধ্যম হিসেবে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব রয়েছে।
- ব্রিকস (BRICS) পেমেন্ট সিস্টেম ও ডি-ডলারাইজেশন: উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে একটি নতুন ব্লক-ভিত্তিক সাধারণ পেমেন্ট সিস্টেম বা নিজস্ব ডিজিটাল ট্র্যাকিং কারেন্সি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে (De-dollarization) সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
পরিশেষ (Conclusion)
তাত্ত্বিকভাবে সমগ্র বিশ্বে একই মুদ্রা থাকাটা যোগাযোগ এবং বাণিজ্যের জন্য দারুণ শোনালেও, পৃথিবীর সব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং শাসনব্যবস্থা যতক্ষণ না পর্যন্ত একই সমান্তরালে আসছে, ততক্ষণ একক বৈশ্বিক মুদ্রা হিতের চেয়ে বিপরীতই বেশি করবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একক বিশ্ব মুদ্রার চেয়ে বহুমুখী ও ডিজিটাল কারেন্সি ব্যবস্থার উন্নয়নই বেশি কার্যকর সমাধান।
বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি, আধুনিক অর্থব্যবস্থা ও বাণিজ্যের এমন সব গভীর, নির্মোহ ও তথ্যবহুল এসইও ফ্রেন্ডলি বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার নিজস্ব কোনো প্ল্যাটফর্মের এসইও অপ্টিমাইজেশন ও প্রফেশনাল কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজির জন্য সরাসরি কনসালটেশন নিতে ভিজিট করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক নিবন্ধ | পালস বাংলাদেশ
কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬
২০২৪ সালের জুলাই মাসটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি সাধারণ ক্যালেন্ডারের পাতা মাত্র নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের এক অভূতপূর্ব রূপান্তরের রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, কাঠামোগত রাষ্ট্রীয় দমননীতি, সীমাহীন দুর্নীতি, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং তীব্র সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ গণমানুষের মনের গভীরে জমাট বেঁধেছিল, তারই এক স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল এই জুলাইয়ে।

আজ ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে, সেই চব্বিশের জুলাই বিপ্লব বা ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে আমাদের পেছনে ফিরে তাকানো এবং একটি নির্মোহ মূল্যায়ন করা জরুরি। বিপ্লবের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং জবাবদিহিমূলক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করা। তবে দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, বিপ্লবের সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর রূঢ় বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ফারাক বা ব্যবধান তৈরি হয়েছে। যে স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি তরুণেরা বুকের রক্ত দিয়ে লিখেছিল, তার কতটুকু আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে আর কতটুকুই বা এখনও কাগুজে প্রতিশ্রুতির গোলকধাঁধায় বন্দি, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
১. প্রেক্ষাপট ও গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক মোড়

২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ:
- শিক্ষাঙ্গনের অবক্ষয়: শিক্ষা খাতে নজিরবিহীন দুর্নীতি, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, এবং জাতীয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা তরুণ সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।
- সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট: সরকারি চাকরিতে মেধার অবমূল্যায়ন করে ঢালাও দলীয়করণ, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, তীব্র বিদ্যুৎ সংকট এবং ভিন্নমতের ওপর রাষ্ট্রের চণ্ডনীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
যখন এই ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়ল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান একযোগে গর্জে ওঠে। আন্দোলনটি শুধু বিভাগীয় শহরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যন্ত।
২. আন্দোলনের অনন্য চরিত্র: দলমুক্ত নাগরিক জাগরণ

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য ছিল এর সম্পূর্ণ দলমুক্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র। প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক দলের ছায়া বা প্রভাব এখানে স্থান পায়নি। এটি হয়ে উঠেছিল সাধারণ শিক্ষার্থী ও আমজনতার নিজস্ব मंच।
জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে এই আন্দোলন এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের রূপ নেয়। তরুণেরা শুধু স্লোগান দেয়নি; রাজপথ জুড়ে পোস্টার, গান, দেয়ালচিত্র (গ্রাফিতি), কবিতা ও পথনাটকের মাধ্যমে স্বৈরাচারের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের এই নৈতিক লড়াইয়ের পক্ষে দলমত নির্বিশেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পী এবং লেখক সমাজ।
যদিও এই বৃহৎ গণজোয়ারকে দমাতে তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র নির্মম পুলিশি দমন নীতি ও নির্বিচারে গুলি বর্ষণের পথ বেছে নেয়, যার ফলে অজস্র ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ নাগরিক শাহাদাত বরণ করেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন; তবুও বুলেটের সামনে তরুণেরা বুক পেতে দিয়ে লড়াই থামায়নি। এই অদম্য সাহস জুলাই আন্দোলনকে ১৯৬৯ বা ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের চেয়েও এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
৩. জুলাইয়ের মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর ‘প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা’
যে মূল প্রতিপাদ্য ও স্বপ্নগুলোকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, দুই বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতায় তার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রাষ্ট্র সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি
- প্রত্যাশা: বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনসহ রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল কাঠামোগত সংস্কার করা হবে, যাতে কোনো দল আর স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
- বাস্তবতা: অন্তর্বর্তী সরকার হয়ে বর্তমানে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর তেমন গুণগত পরিবর্তন হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পুরনো স্বৈরাচারী কাঠামো বহাল রেখেই কেবল ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে এবং সংস্কারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা এজেন্ডাগুলো অনেকটাই থমকে গেছে। কাগুজে সংস্কারের বড় বড় ঘোষণাগুলোর বেশিরভাগই এখনও নীতিমালার ভেতর সীমাবদ্ধ।
২. জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি
- প্রত্যাশা: জুলাই-আগস্টের গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এবং মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
- বাস্তবতা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তিনি এখনও ভারতে অবস্থান করছেন এবং সম্প্রতি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দেওয়ায় পুরো বিচার প্রক্রিয়া এবং সরকারের কূটনৈতিক কার্যকারিতা বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
৩. আইনশৃঙ্খলা ও মব জাস্টিস বন্ধ করা
- প্রত্যাশা: ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা মব ভায়োলেন্স চিরতরে বন্ধ হবে।
- বাস্তবতা: মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক অঙ্গন ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণপিটুনি (মব জাস্টিস), দলীয় কোন্দল এবং সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা এখনও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
৪. বৈষম্যহীন সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তি
- প্রত্যাশা: মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত করা।
- বাস্তবতা: বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বাজারে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস কমেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া দাম এবং নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ আবারও উঠছে। মেধার কথা বলা হলেও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলমান।
৫. political সহনশীলতা ও বাকস্বাধীনতা
- প্রত্যাশা: ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হওয়া।
- বাস্তবতা: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা ভয়হীন কথা বলার পরিবেশ আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও রাজনৈতিক সহনশীলতা পুরোপুরি আসেনি। সংসদে ও সংসদের বাইরে দলগুলোর একে অপরের চরিত্র হনন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পুরনো সংস্কৃতি এখনও দৃশ্যমান।
৪. এক নজরে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার তুলনামূলক ছক
| ক্যাটাগরি | ২০২৪ জুলাইয়ের প্রত্যাশা | ২০২৬ সালের বর্তমান বাস্তবতা |
| রাষ্ট্রীয় কাঠামো | আমূল কাঠামোগত সংস্কার ও স্বৈরাচারমুক্ত জবাবদিহিতা | পুরনো কাঠামো বহাল, ক্ষমতার হাতবদল ও আংশিক সংস্কার |
| নিয়োগ ও অর্থনীতি | ১০০% মেধাভিত্তিক সমাজ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ | বাজারে চড়া দাম, মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের অভিযোগ |
| আইনের শাসন | মব জাস্টিস বন্ধ ও দ্রুত গণহত্যার বিচার | গণপিটুনি ও বিচ্ছিন্ন হামলা চলমান, মূল আসামির প্রত্যর্পণ ঝুলে আছে |
| শিক্ষাঙ্গন | লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস | প্রশাসনিক রদবদল হলেও কাঠামোগত রূপান্তর পুরোপুরি হয়নি |
৫. দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক তাৎপর্য
বাস্তবিক অর্জনের দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য এখনও অধরা বা অনিশ্চিত থাকলেও, জুলাই আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্জনকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই:
- নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা: এই আন্দোলন দেশের সমগ্র ছাত্র ও তরুণ সমাজকে নতুন করে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সচেতন করে তুলেছে, যা আগামী দিনে যেকোনো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বড় দেয়াল হিসেবে কাজ করবে।
- নাগরিক সমাজের শক্তি: একটি সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ ব্যানারেও যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাঁপিয়ে দেওয়া যায় এবং সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা যায়—নাগরিক সমাজের এই অভূতপূর্ব শক্তি দেশবাসী প্রথমবার প্রত্যক্ষ করেছে।
পরিশেষ: পথচলা এখনও চলমান
২০২৪ সালের চব্বিশের জুলাই আন্দোলন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন ও অবিনশ্বর অধ্যায়। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে নতুন এক ভোরের প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল। তবে জুলাইয়ের যে মূল প্রতিশ্রুতি মানুষকে ঘরের খেয়ে রাজপথে নিয়ে এসেছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে এখনও অনেক দূর যেতে হবে।
জুলাইয়ের চেতনা কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি এর প্রকৃত বাস্তবায়ন না করা করা হয়, তবে জনগণের এই হতাশা ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংকটের জন্ম দিতে পারে। এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয় তখনই পরিপূর্ণতা পাবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে শুধু ব্যক্তি বা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং প্রকৃত গণতন্ত্র, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং ন্যায়ের শাসন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে। সেই লক্ষ্য অর্জনের লড়াই আজ দুই বছর পরেও রাজপথে এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে চলমান।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমাজ পরিবর্তনের এমন সব নির্মোহ, গভীর ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার নিজস্ব কোনো কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি বা প্রফেশনাল এসইও কনসালটেশনের জন্য ভিজিট করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজ ও ক্রীড়া ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুল্বুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)
সর্বশেষ আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬
বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন আমাদের দেশের সূর্যসন্তানেরা। ব্যক্তিগত প্রতিভা থেকে শুরু করে দলগত দেশপ্রেম—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিরা নিজেদের নাম খোদাই করেছেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের (Guinness World Records) পাতায়।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ও ডেটা অ্যানালাইসিসের অভিজ্ঞতায় গিনেস বুকে বাংলাদেশের অফিশিয়াল রেকর্ডের পরিসংখ্যান, শীর্ষ রেকর্ডধারী ব্যক্তি এবং আপনি নিজে কীভাবে গিনেস রেকর্ডের জন্য আবেদন করবেন, তার একটি সম্পূর্ণ ‘রিলিজ-রেডি’ মেগা কন্টেন্ট নিয়ে হাজির হয়েছি।
পর্ব ১: এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশী গিনেস রেকর্ড করেছেন?

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট দেশের মোট রেকর্ডধারীর একক বা অফিশিয়াল সংখ্যা সরাসরি প্রকাশ করে না। তবে বিভিন্ন সময়ে গিনেসের অফিশিয়াল ডেটাবেজ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত একক প্রচেষ্টা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা দলগত জাতীয় আয়োজন মিলিয়ে বাংলাদেশী ব্যক্তি ও উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০টিরও বেশি রেকর্ড গিনেস বুকে স্থান পেয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে অনেকে একাধিকবার রেকর্ড করায় ব্যক্তির সংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশে মোট রেকর্ডের সংখ্যাটিই বেশি গৌরবময়।
পর্ব ২: গিনেস বুকে বাংলাদেশের সেরা কিছু রেকর্ড ও রেকর্ডধারী

বাংলাদেশের ঝুলিতে থাকা কিছু ঐতিহাসিক দলগত এবং বিষ্ময়কর ব্যক্তিগত রেকর্ডের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দলগত ও জাতীয় গৌরবের বিশ্বরেকর্ডসমূহ
- লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত (২০১৪): ২৬ মার্চ ২০১৪, স্বাধীনতা দিবসে ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২,৫৪,৬৮১ জন মানুষ একসাথে গেয়েছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’। এটি গিনেস বুকে বিশাল এক দলগত রেকর্ড হিসেবে স্থান পায়।
- বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকা (২০১৩): ১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, বিজয় দিবসে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭,১১৭ জন মানুষের অংশগ্রহণে তৈরি হয় বিশ্বের বৃহত্তম মানব জাতীয় পতাকা (Largest Human National Flag)।
- লংগেস্ট সিঙ্গেল লাইন অব বাইসাইকেল মুভিং (২০১৭): ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, বিজয় দিবসে ‘বিডি সাইকেলিস্ট’ সংগঠনের উদ্যোগে ৩০০ ফিট রাস্তায় ১,১৮৬ জন সাইক্লিস্ট একক লাইনে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বসনিয়ার রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েন।
- ৪৮ ঘণ্টার দীর্ঘতম সাইক্লিং রিলে (২০২১): ‘TeamBDC’-এর ৪ জন বাংলাদেশী সাইক্লিস্ট—দ্রাবির আলম, তানভীর আহমেদ, মোহাম্মদ আলাউদ্দীন এবং রকিবুল ইসলাম—৪৮ ঘণ্টায় ১,৬৭০.৩৩৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই টিম রেকর্ডটি অর্জন করেন।
- রিকশার নগরী ঢাকা (২০১৫): গিনেস বুক ২০১৫ সালের প্রকাশনায় ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রিকশা চলাচলকারী শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যেখানে যাতায়াতের মোট ৪০ শতাংশই রিকশাকেন্দ্রিক।
২. ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বজয়ী কয়েকজন বাংলাদেশী
- জোবেরা রহমান লিনু (প্রথম বাংলাদেশী): ২০০২ সালের ২৪ মে গিনেস বুক তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় ১৯৭৭ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রেকর্ড ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে তিনি প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে গিনেস বুকে নাম লেখান।
- কনক কর্মকার (বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী): কনক কর্মকার ভিন্ন ভিন্ন অনন্য ক্যাটাগরিতে এ পর্যন্ত ২৩ বার বিশ্বরেকর্ড করেছেন! তাঁর উল্লেখযোগ্য রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে—কপালে ২৫ মিনিট গিটার ব্যালেন্স করা, থুতনিতে গিটার ব্যালেন্স করা এবং কপালে ১,১৫০টি প্লাস্টিক গ্লাস রাখা।
- আব্দুল হালিম (ফুটবলে হ্যাটট্রিক রেকর্ড): মাগুরা ও বগুড়ার এই কৃতি সন্তান মাথায় ফুটবল ব্যালেন্স করে একাধিক রেকর্ড গড়েছেন। মাথায় বল নিয়ে সবচেয়ে দীর্ঘ দূরত্ব (১৫.২ কিলোমিটার) হাঁটা এবং মাথায় বল নিয়ে দ্রুততম সময়ে রোলার স্কেটিং জুতা পরে ১০০ মিটার অতিক্রম করার মতো হ্যাটট্রিক রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
- মাহমুদুল হাসান ফয়সাল: মাগুরার এই তরুণ এক মিনিটে হাতে বাস্কেটবল এবং ফুটবল ঘোরানোসহ বল কন্ট্রোলিংয়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে একাধিক বিশ্বরেকর্ড করেছেন।
- কয়েন টাওয়ারের রেকর্ড (নিপা ও আয়মান): বরিশালের নুসরাত জাহান নিপা এক মিনিটে সবচেয়ে বেশি কয়েন দিয়ে টাওয়ার তৈরির রেকর্ড করেছিলেন, যা পরবর্তীতে চট্টগ্রামের ১৬ বছর বয়সী কিশোর আয়মান মোহাম্মদ (১ মিনিটে ৭৫টি কয়েন স্তুপ করে) ভেঙে নিজের নামে করে নেন।
পর্ব ৩: আপনি কীভাবে গিনেস রেকর্ডের জন্য আবেদন করবেন? (ধাপ-বাই-ধাপ গাইড)
আপনার মধ্যে যদি এমন কোনো অনন্য প্রতিভা বা আইডিয়া থাকে যা বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিতে পারে, তবে আপনিও সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গিনেস বুকে আবেদন করতে পারেন। নিচে এর ৬টি মূল ধাপ দেওয়া হলো:
১. রেকর্ড ক্যাটাগরি নির্বাচন
- বিদ্যমান রেকর্ড (Existing Record): গিনেসের ওয়েবসাইটে আগে থেকেই আছে এমন কোনো রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন।
- নতুন রেকর্ড (New Record): সম্পূর্ণ নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে আবেদন করতে পারেন। তবে আইডিয়াটি অবশ্যই পরিমাপযোগ্য (Measurable), প্রমাণযোগ্য (Verifiable) এবং বৈশ্বিক মানের হতে হবে।
২. অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট তৈরি
- প্রথমে গিনেসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট guinnessworldrecords.com-এ যান।
- সেখানে আপনার নাম ও ইমেইল দিয়ে একটি ফ্রি অ্যাকাউন্ট (Sign Up) তৈরি করুন।
৩. আবেদন জমা দেওয়া (Application Submission)
- লগ-ইন করার পর “Apply for a record” বাটনে ক্লিক করুন।
- নির্দিষ্ট ফর্মটি নিখুঁতভাবে পূরণ করুন।
- আবেদনের খরচ: সাধারণ বা স্ট্যান্ডার্ড অ্যাপ্লিকেশনের জন্য গিনেস কর্তৃপক্ষ কোনো ফি নেয় না (এটি সম্পূর্ণ ফ্রি)। তবে সাধারণ আবেদনের ক্ষেত্রে গাইডলাইন পেতে সাধারণত ১২ সপ্তাহ (প্রায় ৩ মাস) সময় লাগে।
- প্রায়োরিটি অ্যাপ্লিকেশন (Priority Application): আপনি যদি দ্রুত রেসপন্স চান, তবে নির্দিষ্ট ফি (৫০০ থেকে ৮০০ ইউএস ডলারের কাছাকাছি) দিয়ে প্রায়োরিটি আবেদন করতে পারেন, যেখানে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে সাড়া পাওয়া যায়।
৪. অফিশিয়াল গাইডলাইন বা নিয়মাবলী সংগ্রহ
- আপনার আবেদনটি গিনেস টিম গ্রহণ করলে তারা আপনাকে একটি বিস্তারিত ইমেইল ও গাইডলাইন (Rules & Guidelines) পাঠাবে। সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে রেকর্ড করার সময় কী কী নিয়ম মানতে হবে এবং কী কী প্রমাণ জমা দিতে হবে।
৫. রেকর্ড প্রদর্শন ও প্রমাণ সংগ্রহ (Evidence Gathering)
গাইডলাইন পাওয়ার পর আপনাকে আপনার রেকর্ডটি করে দেখাতে হবে এবং নিচের প্রমাণগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ডিজিটাল ফরম্যাটে রেকর্ড করতে হবে:
- ভিডিও ও ছবি: পুরো রেকর্ডের স্পষ্ট এবং কোনো প্রকার কাটছাঁট ছাড়া (Uncut) ভিডিও এবং হাই-কোয়ালিটি ছবি।
- টাইমশীট বা লগবুক: রেকর্ড সম্পন্ন করার সঠিক সময়ের নিখুঁত হিসাব।
- স্বাধীন সাক্ষী (Independent Witnesses): সমাজে সম্মানিত বা পেশাদার দুইজন ব্যক্তি (যেমন- সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, ডাক্তার বা শিক্ষক) যারা আপনার রেকর্ডের সময় উপস্থিত থেকে সত্যতা নিশ্চিত করে লিখিত স্টেটমেন্ট দেবেন।
৬. চূড়ান্ত অনুমোদন ও সার্টিফিকেট অর্জন
- সংগৃহীত সব ভিডিও, ছবি এবং কাগজপত্রের ডিজিটাল কপি আপনার গিনেস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওয়েবসাইটে আপলোড করুন।
- গিনেস টিম এই প্রমাণগুলো যাচাই-বাছাই করতে আবার ১২ সপ্তাহ সময় নেবে। সবকিছু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সফল প্রমাণিত হলে তারা আপনাকে অফিশিয়াল বিজয়ী ঘোষণা করবে এবং ডাকযোগে একটি মর্যাদাপূর্ণ অফিশিয়াল গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড সার্টিফিকেট পাঠাবে।
বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের এমন সব রোমাঞ্চকর রেকর্ড, বিজ্ঞান ও সমসাময়িক তথ্যের নিয়মিত আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ। আপনার ব্যবসার জন্য প্রফেশনাল এসইও কনসালটেশন বা ডিজিটাল কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন আমার সাথে bdsbulbulahmed.com সাইটে।



