নির্বাচনী খবর
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
এরই মধ্যে টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (28, January,2026) তারেক রহমান কথা বলেছেন তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যু, নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ নিয়ে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
চার্লি ক্যাম্পবেল / ঢাকা
এডিটর অ্যাট লার্জ
তারেক রহমানের কণ্ঠস্বর হারিয়ে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দক্ষিণ এশীয় দেশ বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেতার জন্য এটি আদর্শ পরিস্থিতি নয়। বিষয়টিতে একধরনের ব্যঙ্গও আছে, কারণ স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের কার্যত বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তারেক রহমানের বক্তৃতা এক দশক ধরে স্থানীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল।
“আমার শরীর এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে,” বলেন রহমান, ঢাকায় তার পারিবারিক বাড়ির বাগানে বসে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। বাগানজুড়ে বুগেনভিলিয়া আর গাঁদা ফুল। ১৭ বছর নির্বাসনের পর দেশে ফেরার পর এটি তার প্রথম সাক্ষাৎকার।
“আসলে আমি কথাবার্তায় খুব ভালো নই,” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন তিনি, “কিন্তু আমাকে যদি কিছু করতে বলেন, আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।”
রহমানের জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ছিল একেবারেই ঝড়ের মতো। ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে আসেন, ঢাকার বিমানবন্দরে সারারাত অপেক্ষা করা লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থকের অভ্যর্থনায়। মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা যান তার মা—বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীতে আরও বেশি মানুষ ঢল নামে।
“আমার হৃদয়ে এটা খুব ভারী,” চোখ ছলছল করে বলেন রহমান। “কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো—আপনার যখন দায়িত্ব থাকে, তখন আপনাকে সেটা পালন করতেই হবে।”
সে দায়িত্ব হয়তো তার মায়ের পথ অনুসরণ করার মতোই বড় কিছু। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রহমানই স্পষ্টভাবে এগিয়ে, যা ১৮ মাস আগে ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ডাকা হয়। রহমান নিজেকে এমন এক সেতু হিসেবে তুলে ধরছেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি ও তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সংযোগ তৈরি করবে।
সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে বহু সংকট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত করা হয়েছে, যা শিল্প ও জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব চ্যালেঞ্জ এমন এক অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা এখনো পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তরুণদের বেকারত্ব ১৩.৫%—আর প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করায় নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে রহমানের সঙ্গে রয়েছে বিতর্কের বোঝা। তার প্রধান পরিচয় বংশগত—খালেদা জিয়া ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জিয়াউর রহমানের পুত্র হিসেবে তিনি সেই দ্বন্দ্বময় দ্বিদলীয় রাজনীতির এক প্রান্তের প্রতিনিধি, যা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে (অন্য প্রান্তে শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা)।
সমর্থকদের কাছে রহমান একজন নিপীড়িত উদ্ধারকর্তা, যিনি বিপর্যস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরেছেন। সমালোচকদের কাছে তিনি এক ‘অন্ধকার রাজপুত্র’—দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাভোগী, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া একজন ব্যক্তি, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মসূত্রে পাওয়া।
রহমান জোর দিয়ে বলেন, তিনিই বিভক্ত দেশকে সুস্থ করার উপযুক্ত মানুষ। “আমি এখানে আছি বাবা-মায়ের ছেলে বলেই নয়,” তিনি বলেন। “আমার দলের সমর্থকরাই আমাকে এখানে এনেছে।”
বাংলাদেশিরা তার কথায় বিশ্বাস রাখতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে করা জরিপে তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় ৭০% সমর্থন পায়। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী পায় ১৯%।
তবু উদ্বেগ স্পষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬—বিএনপির শেষ শাসনামলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নিহত প্রায় ১,৪০০ বিক্ষোভকারীর রক্ত হয়তো আরেক আত্মকেন্দ্রিক উত্তরাধিকারী জন্ম দেবে।
রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন, এবং অন্তর্বর্তী সরকার তার আগের দণ্ডাদেশ বাতিল করেছে। “তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি,” অভিযোগকারীদের সম্পর্কে বলেন তিনি। সত্যি বলতে, হাসিনার আওয়ামী লীগ এক অনুগত গণমাধ্যমের সহায়তায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রচার করেছিল। আবার এটাও সত্য, জুলাই বিপ্লব যে বংশগত বিশেষাধিকারবিরোধী ছিল, রহমান নিজেও সেই উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার অংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অন্যতম বড় অবদানকারী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটি আবার মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগের উৎস এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদনে এগোচ্ছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে চীন থেকে সরবরাহ শৃঙ্খল সরাতে সহায়তা করছে। তবে চীনও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়—কারণ বঙ্গোপসাগরে এর কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে সম্ভাব্য অবরোধ মোকাবিলায় কাজে আসতে পারে।
আশা করা হচ্ছে, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে, তা স্বৈরতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার পথ রোধে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—রাজনৈতিক নির্বাসনের বছরগুলোতে রহমান কি যথেষ্ট আত্মসমালোচনা ও পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যাতে সত্যিই তিনি জনগণের নেতা হতে পারেন?
“যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের খুবই বড় দায়িত্ব রয়েছে,” তিনি বলেন। “আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।”
রহমান শান্ত স্বভাবের ও অন্তর্মুখী; কথা বলার চেয়ে শুনতেই বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে তার প্রিয় সময় কাটত রিচমন্ড পার্কে হাঁটাহাঁটি করে বা ইতিহাসের বই পড়ে। তার প্রিয় চলচ্চিত্র ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’।
“আমি সম্ভবত আটবার দেখেছি!”—হেসে বলেন তিনি।
তিনি এমন একজন নীতিনির্ভর মানুষ হিসেবে ধরা দেন, যিনি যেকোনো বিষয়ে তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরতে পারেন। তিনি ১২ হাজার মাইল খাল খননের পরিকল্পনা করছেন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারের জন্য, প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগাতে চান ভূমি অবক্ষয় রোধে, এবং ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির কথা ভাবছেন বায়ুদূষণ কমাতে। বর্জ্য পোড়ানো বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, এবং বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব—সবই তার পরিকল্পনায় আছে।
“আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০% বাস্তবায়ন করতে পারি, আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে,” তিনি বলেন।
রহমানের এই টেকনোক্র্যাটিক দৃষ্টিভঙ্গি তার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি বিমান বাহিনীর একটি স্কুলে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে তার ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি; দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরে তিনি ব্যবসায় যুক্ত হন এবং নব্বইয়ের দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দ্রুতই দলের অন্যতম শক্তিশালী কৌশলবিদে পরিণত হন। কিন্তু তার এই ক্ষমতা তাকে একই সঙ্গে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত করে তোলে—সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থায় অযাচিত হস্তক্ষেপ করতেন।
অনেক বাংলাদেশির কাছে রহমান এখনো বিদ্রূপাত্মকভাবে “খাম্বা তারেক” নামে পরিচিত। কথিত আছে, একটি দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে হাজার হাজার বিদ্যুতের খুঁটি (খাম্বা) একটি সহযোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে কেনা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কখনোই বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়নি। রহমান এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ২০০৮ সালে ফাঁস হওয়া একটি মার্কিন কূটনৈতিক বার্তায় তাকে “লুটেরা শাসনব্যবস্থা ও সহিংস রাজনীতির প্রতীক” হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয় যে তিনি “প্রকাশ্য ও ঘন ঘন ঘুষ দাবি করতেন” বলে কুখ্যাত।
২০০৭–২০০৮ সালের সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রহমান ১৮ মাস কারাবন্দি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, অর্থপাচার এবং আওয়ামী লীগ বহরের ওপর গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার অভিযোগসহ মোট ৮৪টি মামলা ছিল। কারাগারে নির্যাতনের কারণে তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয়, যা আজও তাকে ভোগাচ্ছে। চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি যুক্তরাজ্যে যান।
“শীতকালে খুব ঠান্ডা হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়,” বলেন তিনি। “কিন্তু আমি এটাকে মানুষের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে যেন কেউ এমন কষ্ট না পায়, সেজন্য আমাকে সর্বোচ্চটা দিতে হবে।”
২০১৮ সালে তার অসুস্থ মা খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হলে—যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন—রহমান বিদেশ থেকেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করেন।
এই সময়ের বড় অংশজুড়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। দেশটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়; ২০০৬ সালে যেখানে জিডিপি ছিল ৭১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকার আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার শাসনের শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে গুম হন। সব প্রতিষ্ঠান রাজনীতিকরণে আক্রান্ত হয়—ফলে সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র এবং বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাধীন সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ তোলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সূচকগুলোও নেতিবাচক হতে থাকে—জীবনযাত্রার খরচ, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব দ্রুত বাড়ে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শাসকগোষ্ঠীর অনুগতদের জন্য চাকরির কোটা বাতিলের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু হাসিনার কঠোর দমননীতি রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ—কিশোর থেকে বৃদ্ধ, অধ্যাপক থেকে ভিক্ষুক—সবাই এক কাতারে।
বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকায় হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানেই তিনি এখনো অবস্থান করছেন, ঘনিষ্ঠদের নিয়ে তার উৎখাত এবং আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
“ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে,” হাসিনা টাইমকে বলেন। “বাংলাদেশে যতক্ষণ না সব বড় রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সত্যিকারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, ততক্ষণ গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।”
গণতন্ত্র ক্ষয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনার অভিযোগ রহমানের কাছে বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে যে বিপুল রক্তপাত ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি ও পাথর হাতে থাকা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সাঁজোয়া যান ব্যবহার করেছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে।
“যে-ই অপরাধ করুক না কেন, এই দেশে আইন আছে, নিয়ম আছে,” বলেন রহমান। “তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে।” নভেম্বর মাসে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়—শেখ হাসিনা যদি কখনো বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।
তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে জানান, দলীয় কর্মীদের ভোট ব্যাহত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেব না,” তিনি বলেন। “আমাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে… শেষ পর্যন্ত সম্ভবত সহিংসতা হবে।”
এই ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ভালো করবে না। সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এই প্রমাণ হিসেবে যে দেশে উগ্র ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করেছে। আওয়ামী লীগ ও প্রভাবশালী ভারতীয় মহল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য লবিং করছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০% ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। রহমান বলেন, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও সম্ভাব্য ছাড় আদায়ের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মতো বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছেন।
“ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন,” বলেন রহমান। “আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অন্যকে সাহায্যও করতে পারি। আমি নিশ্চিত, মিস্টার ট্রাম্প একজন খুবই যুক্তিসংগত মানুষ।”
জুলাই বিপ্লবের স্মারক এখনো ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। দেয়ালচিত্রে শেখ হাসিনাকে শয়তানের শিং ও লুটের বস্তা দিয়ে আঁকা হয়েছে। স্লোগানে লেখা—“বাংলাদেশি পুলিশ লজ্জা করো!” এবং “এটা জেন-জি তৈরি নতুন বাংলাদেশ।”
“জুলাইয়ের পর মানুষ চেয়েছিল ব্যবস্থা বদলাতে—বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও পুলিশ যেন স্বাধীন হয়,” বলেন ২৬ বছর বয়সী ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ, যিনি ছাত্র আন্দোলনের মধ্য থেকেই উঠে এসেছেন। রহমান সম্পর্কে তিনি এখনো চূড়ান্ত মত দেননি, তবে ইতিবাচক।
“তারেক রহমান ভালো করছেন,” তিনি বলেন। “বিএনপির মতো দল নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা যায় না, তবে এখন পর্যন্ত তিনি ভালোই করছেন।”
সংস্কারগুলোর সাফল্য নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেমন বিপ্লবী দেয়ালচিত্রগুলো রোদে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তেমনি ছাত্রদের বিজয়ের উচ্ছ্বাসও অন্তর্কলহ ও বিভাজনে ম্লান হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, আর মুহাম্মদ ইউনূসের নিজস্ব সরকারি অভিজ্ঞতা না থাকায় নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিও সীমিত ছিল। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নারীরা অন্তর্বর্তী সরকারে প্রায় উপেক্ষিত হন—ছয়টি সংস্কার কমিশনের মধ্যে মাত্র একটির নেতৃত্ব পান তারা (নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন)। তাও ইসলামপন্থীদের কুরুচিপূর্ণ বিক্ষোভের মুখে পড়ে; তারা দাবি করে, লিঙ্গসমতার সুপারিশ শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবগুলো স্থগিত হয়ে যায়।
কিছু সাফল্যও এসেছে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ পর্যালোচনা করে এবং ১,৫৬৯ জনের নিখোঁজ হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করে; এর মধ্যে ২৮৭ জনকে “নিখোঁজ ও মৃত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। (প্রায় সবাই জামায়াত বা বিএনপির সদস্য ছিলেন।) সেনাবাহিনীর চাপ সত্ত্বেও অভিযুক্তদের বেসামরিক আদালতেই বিচার হচ্ছে। রাজনৈতিক আলোচনাও খুলে গেছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অধ্যাপক মুবারশার হাসান—যিনি হাসিনার আমলে ৪৪ দিন বিচারবহির্ভূতভাবে আটক ছিলেন—স্মরণ করেন, সম্প্রতি তিনি সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার রাজনীতিকরণ নিয়ে একটি উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
“এরপর আমি শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি,” তিনি বলেন। “হাসিনার আমলে এটা কল্পনাও করা যেত না।”
তবে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে। স্বেচ্ছাচারী গণপিটুনি ও দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অনলাইন ডক্সিং উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ১২ ডিসেম্বর, যখন যুবনেতা ও নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি—ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কড়া সমালোচক—ঢাকায় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর একটি উত্তেজিত জনতা ঢাকার দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেগুলোকে তারা দিল্লিপন্থী বলে অভিযুক্ত করে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় ছাদের ওপর বহু সাংবাদিক আটকা পড়েন। সাধারণ ধারণা হলো, জুলাই অভ্যুত্থানে ভূমিকার কারণে জনগণের ক্ষোভ এখনো প্রবল থাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালনে আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে না।
“আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা,” বলেন রহমান। “মানুষ যেন রাস্তায় নিরাপদ থাকে, ব্যবসা করতে নিরাপদ বোধ করে—সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি, যা ভবিষ্যতে অপব্যবহার ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। নতুন নেতা নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশিরা একটি সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত গণভোটেও ভোট দেবেন। এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা। সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, না ভোট “খুবই হতাশাজনক” হবে।
“তাহলে দেশ এমন এক অবস্থায় পড়ে যাবে, যেখানে আবার অতীতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।”
আওয়ামী লীগকে ব্যালট থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক দ্রুত উন্নত না হলে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
“দেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন কখনোই মুক্ত বা সুষ্ঠু হতে পারে না,” বলেন হাসিনা।
রিয়াজ এতে অনুতপ্ত নন। “এই দলটি এমন ভয়াবহ কাজ করেছে, যা কার্যত মানবতাবিরোধী অপরাধ,” তিনি বলেন। “তারা এর জন্য ক্ষমাও চায়নি। বরং মানুষকে উসকানি দিচ্ছে।”
আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না—এ বিষয়ে রহমান সরাসরি মন্তব্য করতে চান না। তবে নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।
“কারণ আজ আপনি যদি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তাহলে কাল আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না—এর নিশ্চয়তা কোথায়?” তিনি বলেন। “অবশ্যই, কেউ যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাকে তার পরিণতি ভোগ করতেই হবে।”
রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশে আশাবাদ তৈরি করলেও, বিপ্লব-পরবর্তী সবচেয়ে চোখে পড়া পরিবর্তন হলো ইসলামী রাজনীতির পুনরুত্থান। বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের চেয়েও বেশি; পাশাপাশি প্রায় ১০% সংখ্যালঘু—হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সংবিধান অনুযায়ী দেশটি ধর্মনিরপেক্ষ হলেও, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসনামলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এই বৈপরীত্যই চরমপন্থীদের বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
হাসিনার বহু ত্রুটি সত্ত্বেও তিনি উগ্রবাদ দমনে কঠোর ছিলেন এবং এমনকি হিজড়া সুরক্ষা আইনও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেই জামায়াতে ইসলামী—ইসলামপন্থী দলটির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষ প্রচারণার কারণে দলটি তরুণদের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বরে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভূমিধস বিজয় অর্জন করে—যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির সূচক হিসেবে বিবেচিত। তারা আরও চারটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়েও জয়ী হয়। এনসিপিও জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে, যার প্রতিবাদে বেশিরভাগই নারী—এমন ডজনখানেক নেতা দল ছাড়েন। প্রকাশ্যে সমকামী এলজিবিটিকিউ অধিকারকর্মী মুনতাসির রহমানকে রক্ষণশীলদের চাপের মুখে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
“এটা নারী ছাত্রনেত্রী, সংখ্যালঘু এবং তরুণদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক,” বলেন ঢাকাভিত্তিক নার্স ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামী তাদের সংবিধানে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উল্লেখ করেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তারা আরও চরম বক্তব্য থেকে সরে এসে নিজেদের “ফ্যাসিবাদবিরোধী” হিসেবে পুনর্ব্র্যান্ডিং করেছে। তারা সামাজিক কল্যাণে জোর দিচ্ছে এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে। এমনকি একটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনে তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক। তবে অনেক সাধারণ বাংলাদেশি ধর্মীয় ভিত্তির কারণে তৈরি হওয়া দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তিতে আকৃষ্ট হয়েছেন।
জানুয়ারির শুরুতে জামায়াতের নেতা প্রকাশ করেন যে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন—যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। রহমান এতে বিচলিত নন।
“মানুষ শুধু এমন একটি গণতন্ত্রে ফিরতে চায়, যেখানে তারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে, নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে,” তিনি বলেন।
যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা হবে একটি বড় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি দক্ষিণ এশিয়ার এই পরাশক্তি দিয়ে বেষ্টিত। দুই দেশের মধ্যে ২,৫০০ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের ভূখণ্ডই বাংলাদেশের পণ্যের প্রধান স্থলপথ, পাশাপাশি তুলা, শস্য, জ্বালানি, শিল্প উপকরণ ও বিদ্যুতের বড় সরবরাহকারী দেশটি।
“আমাদের জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা আগে,” বলেন রহমান, “তারপর আমরা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ছেষ্টা করবো “
ভারতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগপন্থী প্রচারণা ছড়িয়ে দেওয়ায়, তরুণ বাংলাদেশিদের চোখে নয়াদিল্লি এখন প্রধান খলনায়ক।
“তারেক রহমানের মতো একজন নেতাও প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আহ্বান জানালে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নেন,” বলেন আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান।
এটি প্রজন্মগত গভীর পরিবর্তনের প্রতিফলন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল—যেখানে ভারত অর্থ, অস্ত্র ও ৩,৮০০-এর বেশি সেনার প্রাণ দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। অথচ আজকের তরুণদের চোখে জামায়াত দুর্নীতিমুক্ত আর ভারত প্রধান শত্রু।
এই অতীত-বিচ্ছিন্নতা দেখায় যে রহমান তার পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর ভর করে বেশি দূর এগোতে পারবেন না। আজকের বাংলাদেশিরা অর্ধশতাব্দী আগের বীরত্বগাথায় আগ্রহী নয়; তারা চায় এমন একজন নেতা, যিনি কথা শোনেন, সেতুবন্ধন তৈরি করেন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা ও আস্থা গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করেন। অর্থনৈতিক স্থবিরতা চলতে থাকলে, মানুষ হয়তো হাসিনার শাসনামলের রেকর্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করবে।
“বংশগত দলগুলোকে কখনোই পুরোপুরি বাতিল করা যায় না,” বলেন কুগেলম্যান। “মাত্র দুই বছর আগেও বিএনপিকে মৃত ও সমাহিত মনে করা হচ্ছিল। এমনকি শেখ হাসিনাও হয়তো শেষ হয়ে যাননি—এখন তিনি প্রাসঙ্গিক নন, কিন্তু ভবিষ্যতে ফিরেও আসতে পারেন।”
দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে রহমান সচেতন হলেও, বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি হলো বিএনপির সেই হাজারো তৃণমূল কর্মী, যারা হাসিনার আমলে নির্যাতিত হয়েছিল এবং এখন মনে করছে তারা ‘প্রাপ্য সুবিধা’ পাওয়ার অধিকারী। দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ হবে না।
তবে রহমান যে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন—তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মে মাসে তিনি নিজের ও তার মাকে ব্যঙ্গ করে আঁকা একটি কার্টুন পুনরায় পোস্ট করেন এবং লেখেন—“আমাদের এজেন্ডার সঙ্গে না মিললেও নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাকে সম্মান করা জরুরি।” খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনার আমলে তার মায়ের প্রতি আচরণের সমালোচনা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং ঐক্যের আহ্বান জানান। হাসিনার “আয়রন লেডি” ভাবমূর্তির বিপরীতে রহমান ইচ্ছাকৃতভাবে নরম ও মানবিক ইমেজ গড়ছেন। যুক্তরাজ্য থেকে তার সঙ্গে আসা আদুরে কমলা রঙের সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
লন্ডনের আগের জীবনের কোন দিকটি তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন—জিজ্ঞেস করা হলে রহমান এক মুহূর্তও দেরি করেন না।
“আমার স্বাধীনতা,” বলেন তিনি, পরিবারের বাড়ির চারপাশে ঘেরা ১০ ফুট উঁচু কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে। “এই বাড়িতে এসে এত নিরাপত্তা দেখে আমার দম বন্ধ লাগছিল।” পাড়ার দোকানে হেঁটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ লেক্সাস চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম পর্যন্ত গিয়ে মেয়ে জায়মাকে চমকে দেওয়া—এসব এখন অতীত। প্রতিদিনের ১০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ করতে তাকে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে।
তবু রহমান অভিযোগ করছেন না। তার প্রত্যাবর্তন যে হঠাৎ কোনো আবেগী সিদ্ধান্ত নয়, বরং উদ্দেশ্য ও সংকল্পে ভরপুর—মানুষের জীবনমান উন্নত করার দৃঢ় ইচ্ছা থেকেই এসেছে—তা তিনি দেখাতে চান। বক্তব্য শেষ করতে তিনি তার আরেকটি প্রিয় সিনেমার সংলাপ উদ্ধৃত করেন—এবার এয়ার ফোর্স ওয়ান নয়, স্পাইডার-ম্যান থেকে:
“বড় ক্ষমতার সঙ্গে আসে বড় দায়িত্ব,” তিনি বলেন। “আমি এতে গভীরভাবে বিশ্বাস করি।”
-টাইম
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): রাজনীতি → নির্বাচনী খবর
প্রকাশের তারিখ: ২২ অক্টোবর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি ও গেজেট, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, যুগান্তর, বাংলা ট্রিবিউন, রাইজিংবিডি, টিবিএস বাংলা, ঢাকা পোস্ট
ঢাকা: স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরেই এখন নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, তাই ভোটের সময়সূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। ভোট হবে পাঁচ স্তরে: ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন। তবে তারিখ নিয়ে এখনো পুরোপুরি স্পষ্টতা নেই।
কবে হচ্ছে ভোট?
সরকারের লক্ষ্য। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে ভোট শুরু হবে এবং ৬ জুনের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। তিনিই আবার বলেছেন, সুনির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি এবং শুরুর সময় ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন।

ইসির অবস্থান। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, বার্ষিক পরীক্ষার কারণে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোট হচ্ছে না, কমিশন জানুয়ারিতে শুরুর আশা করছে। জানুয়ারিতে ভোট হলে ৪০-৪৫ দিন আগে, অর্থাৎ নভেম্বরে তফসিল ঘোষণা হতে পারে। তবে তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত কোনো তারিখই চূড়ান্ত ধরা যায় না।
ভিন্ন সুরও আছে। টিবিএস বাংলার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আগামী বছরের শেষ নাগাদ ভোট আয়োজনের কথা উঠেছে, যাতে দলীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতির সময় মেলে। আর ইসির এক কমিশনারের মন্তব্য নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন কঠিন হবে। অর্থাৎ সূচি এখনো নমনীয়।
ধাপ ও প্রস্তুতি
দেশে মোট ইউনিয়নের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি, আর একসঙ্গে সব নির্বাচন না করে ধাপে ধাপে ভোট এবং সব স্তর শেষ করতে ১০ থেকে ১২ মাস লাগার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তায় থাকবে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়ন করা হতে পারে। সেপ্টেম্বরে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য যে সাত ধাপের খসড়া তারিখ আলোচনায় এসেছিল, পরিস্থিতি বদলানোয় সেটি আর কার্যকর নয়। জুনের মধ্যে ভোট, সময় খুঁজছে ইসি – শিক্ষাবার্তা ডট কম
ভোটার তালিকা: গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
- ৩১ অক্টোবর ২০২৬: নতুন ভোটার নিবন্ধন ও আবাসস্থল পরিবর্তনের কারণে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদনের শেষ তারিখ।
- যোগ্যতা: ৩১ অক্টোবর ২০০৮ বা তার আগে জন্ম নেওয়া এবং ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ডেটাবেইসে নিবন্ধিতরাই তালিকায় আসবেন।
- ৫ নভেম্বর: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং সারা দেশে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ।
- ২০ নভেম্বর: খসড়া তালিকায় দাবি, আপত্তি ও সংশোধনের আবেদনের শেষ দিন; নিষ্পত্তির শেষ সময় ২৩ নভেম্বর; সিদ্ধান্ত তালিকায় যুক্ত হবে ২৪ নভেম্বর।
- ২৫ নভেম্বর: হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ। চূড়ান্ত তালিকায় যাদের নাম থাকবে, তারাই স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।
প্রার্থী হতে হলে

নির্দলীয় ভোট। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে হবে এবং ২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে নতুন বিধি করা হয়েছে। এতে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের জামানত ও ব্যয়সীমা। সংশোধিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালার গেজেট ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২৫ হাজার টাকা ও সাধারণ সদস্য প্রার্থীর ৫ হাজার টাকা। মোট ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা চেয়ারম্যানের জন্য ১০ লাখ ও সাধারণ সদস্যের জন্য ২ লাখ টাকা।
প্রচলিত যোগ্যতা। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী প্রার্থীকে সাধারণত বাংলাদেশের নাগরিক, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়সী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হতে হয়। ঋণখেলাপি, দেউলিয়া কিংবা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে নির্দিষ্ট মেয়াদের সাজাপ্রাপ্তরা অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হন। সংশোধিত বিধিমালায় কিছু বদলেছে কি না, তা ইসির গেজেট থেকে মিলিয়ে নিন।
নতুন আচরণবিধির মূল দিক
- পোস্টার নিষিদ্ধ। ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন ও সীমিত সংখ্যক বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। ইউনিয়ন পরিষদে প্রতি ওয়ার্ডে একটি বিলবোর্ড।
- মাইক। দুপুর ১২টার আগে ও সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ, শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেল এবং এক ওয়ার্ডে একটির বেশি মাইক নয়।
- অনলাইন প্রচার। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারে বাধা নেই, তবে খরচ নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবে দেখাতে হবে। এআই দিয়ে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারে বিধিনিষেধ আছে। খসড়ায় প্রার্থীদের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে নিবন্ধনের কথাও ছিল; চূড়ান্ত গেজেটে তা আছে কি না, যাচাই করে নিন।
- দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রচার নিষেধ। প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
- শাস্তি। লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান। খসড়ায় ছিল, গুরুতর লঙ্ঘনে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা ইসির থাকবে।
সামনের চ্যালেঞ্জ
আর্থিক দিক থেকে পাঁচ স্তরের নির্বাচনে ইসির প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। সময়সূচি, নিরাপত্তা-প্রস্তুতি ও পরীক্ষার মৌসুম মিলিয়ে ভোটের তারিখ ঠিক করা ইসির জন্য বড় হিসাব। তফসিল ঘোষণা হলে চিত্র স্পষ্ট হবে।
উপসংহার
আপাতত নিশ্চিত তথ্য হলো ভোটার তালিকার সময়সূচি, নির্দলীয় ভোটের কাঠামো, সংশোধিত বিধিমালা ও নতুন আচরণবিধি। ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ ও ধাপ তফসিল ঘোষণার পরই জানা যাবে। প্রার্থী ও ভোটার, দুই পক্ষেরই উচিত ইসির সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তির ওপর নজর রাখা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): বৈদেশিক কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও অর্থনীতি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET), প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে (যেমন: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন) কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং প্রতারকদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET) নির্ধারিত বৈধ প্রক্রিয়া, প্রতারণা চেনার উপায় এবং সরকারি খরচের নির্দেশিকা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।

মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার বৈধ প্রক্রিয়া (Step-by-Step)
একটি নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের জন্য আপনাকে অবশ্যই নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
- পাসপোর্ট তৈরি: সর্বনিম্ন ১ বছর মেয়াদসম্পন্ন একটি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট তৈরি করুন।
- বিএমইটি (BMET) রেজিস্ট্রেশন: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে বা নিকটস্থ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে (DEMO) গিয়ে BMET রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন। এর মাধ্যমে আপনি একটি ইউনিক বায়োমেট্রিক আইডি পাবেন।
- বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন: শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির (RL) মাধ্যমে ভিসার প্রক্রিয়া করুন। বৈধ এজেন্সির তালিকা BMET-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
- ভিসা যাচাইকরণ (Visa Verification): এজেন্সি আপনাকে ভিসার কপি দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস (Embassy) বা বিএমইটি-এর মাধ্যমে ভিসার সত্যতা শতভাগ যাচাই করে নিন।
- মেডিকেল টেস্ট: সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার (যেমন: GAMCA বা GCC অনুমোদিত কেন্দ্র) থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান এবং ‘Fit’ সার্টিফিকেট নিন।
- প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন (PDO) ট্রেনিং: বিএমইটি-এর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (TTC) ৩ দিনের বাধ্যতামূলক পিডিও ট্রেনিংয়ে অংশ নিন। এখানে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়মকানুন ও ভাষা শেখানো হয়।
- স্মার্ট কার্ড বা ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স: সব প্রক্রিয়া শেষ হলে বিএমইটি থেকে বাধ্যতামূলক Emigration Clearance (স্মার্ট কার্ড) সংগ্রহ করুন। এটি ছাড়া বিমানবোর্ড করা বা ইমিগ্রেশন পার হওয়া অসম্ভব।
ভিসা প্রতারণা চেনার উপায়
দালাল বা ভুয়ো এজেন্সিগুলো সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হোন:

- অস্বাভাবিক কম সময়ে ভিসা: “১ সপ্তাহে বা ৩ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের নিশ্চিত ভিসা” — এমন লোভনীয় ও অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিলে বুঝবেন এটি প্রতারণা।
- ভিসার ক্যাটাগরি গোপন করা: ফ্রি ভিসা (Free Visa) বা সাপ্লাই ভিসা (Supply Visa)-র কথা বললে সতর্ক হোন। মনে রাখবেন, মধ্যপ্রাচ্যে আইনিভাবে ‘ফ্রি ভিসা’ বলতে কিছু নেই। সবসময় সুনির্দিষ্ট কোম্পানি এবং পদের (যেমন: ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার) ভিসা দেখে নেবেন।
- অফিশিয়াল রসিদ না দেওয়া: টাকা লেনদেনের সময় যদি এজেন্সি কোনো অফিশিয়াল প্যাডে লিখিত রসিদ (Receipt) দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে সেখানে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- চুক্তিপত্র ছাড়া টাকা দাবি: কোনো কাজের অফার লেটার (Offer Letter) বা কর্মসংস্থান চুক্তিপত্র (Employment Contract) দেখানোর আগেই বড় অঙ্কের অগ্রিম টাকা দাবি করা প্রতারণার প্রধান লক্ষণ।
- ভিসা কপিতে ভুল বা অসংগতি: ভিসার কপিতে স্পনসর বা কোম্পানির নাম, আরবী লেখার ভুল বা দূতাবাসের সিল জেনুইন কি না তা যাচাই না করে বিশ্বাস করবেন না।
সরকারি খরচ ও আর্থিক সহায়তার নির্দেশিকা
সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয় (Migration Cost) নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে দেশ ও কাজের ক্যাটাগরি ভেদে এজেন্সির সার্ভিস চার্জসহ খরচে কিছুটা তারতম্য হয়।
বাধ্যতামূলক সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ফি (আনুমানিক):
- BMET রেজিস্ট্রেশন ফি: ৩০০-৪০০ টাকা।
- PDO ট্রেনিং ফি: ৪০০-৫০০ টাকা।
- স্মার্ট কার্ড/ইমিগ্রেশন ফি: ৩,৫০০-৩,৮৫ টাকা।
- প্রবাসী কল্যাণ তহবিল ফি: ৩,৫০০ টাকা (স্মার্ট কার্ডের সাথেই অন্তর্ভুক্ত থাকে)।
- মেডিকেল ফি: দেশভেদে ৮,৫০০ থেকে ১০,৫০০ টাকা।
- ইনস্যুরেন্স (বাধ্যতামূলক প্রিমিয়াম): ১,০০০ টাকা।
আর্থিক সহায়তা ও ঋণ সুবিধা:
আপনার যদি বিদেশে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত টাকা না থাকে, তবে সরকার অনুমোদিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (PKB) থেকে খুব স্বল্প সুদে এবং সহজ শর্তে “বৈদেশিক কর্মসংস্থান ঋণ” নিতে পারেন। এর জন্য আপনার বৈধ ভিসা, স্মার্ট কার্ডের অনুমোদন এবং কাজের চুক্তিপত্র প্রদর্শন করতে হবে।
২০২৭ এ ইটালি যাবার প্রসেস কি কি তা নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল
ইতালির ২০২৬-২০২৮ সালের ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ (Decreto Flussi) বা স্পন্সর আইনের অধীনে ২০২৭ সালের কোটায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন বিদেশী কর্মী নিয়োগের অফিশিয়াল সময়সূচি ও নিয়ম ঘোষণা করা হয়েছে। এই তিন বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশিরাও ইতালিতে বৈধভাবে কাজের ভিসায় যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
বর্তমানে ২০২৭ সালের কোটার জন্য প্রাক-আবেদন বা প্রি-কম্পাইলেশন (Pre-compilation) প্রক্রিয়া শুরুর একদম দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। নিচে ইতালি যাওয়ার অফিশিয়াল সর্বশেষ নিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
২০২৭ সালের আবেদন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়সূচি (Timeline)
ইতালির স্পন্সর বা কাজের ভিসার পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইন পোর্টালে ইতালিতে অবস্থানরত মালিক বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়।
- প্রাক-আবেদন বা প্রি-কম্পাইলেশন (Pre-compilation): ২৩ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৭ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘Ali Portal’-এ মালিকরা কর্মীদের তথ্য আগে থেকে পূরণ করে ড্রাফট আকারে সাজিয়ে রাখতে পারবেন।
- ক্লিক ডে (Click Days) ২০২৭: আগে আসলে আগে পাবেন (First-come, first-served) ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফরম সাবমিট করার নির্দিষ্ট দিনগুলোকে ক্লিক ডে বলে। ২০২৭ সালের অফিশিয়াল ক্লিক ডে-সমূহ:
- ১২ জানুয়ারি ২০২৭: কৃষি বা এগ্রিকালচারাল সিজনাল (Seasonal) কাজের আবেদন।
- ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৭: পর্যটন বা ট্যুরিজম খাতের সিজনাল কাজের আবেদন।
- ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৭: অমৌসুমি বা নন-সিজনাল (Non-seasonal) দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন টেকনিক্যাল কাজের আবেদন।
- ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭: ডোমেস্টিক বা ফ্যামিলি কেয়ার (কেয়ারগিভার ও গৃহকর্মী) কাজের আবেদন।
প্রধান কাজের খাত ও ভিসা ক্যাটাগরি
২০২৭ সালের মোট কোটাকে প্রধানত তিনটি ধারায় ভাগ করা হয়েছে:
- নন-সিজনাল বা দীর্ঘমেয়াদী কাজ (৭৬,২০০টি কোটা): এর মধ্যে লজিস্টিকস, পণ্য পরিবহন (ড্রাইভিং), কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ খাত, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ১৪,০০০টি কোটা কেয়ারগিভার ও ফ্যামিলি কেয়ার খাতের জন্য সংরক্ষিত।
- সিজনাল বা মৌসুমি কাজ (৮৯,০০০টি কোটা): কৃষি এবং নির্দিষ্ট কিছু পর্যটন খাতের জন্য সাধারণত এই ভিসা সর্বোচ্চ ৯ মাসের হয়ে থাকে। পরবর্তীতে এটি দীর্ঘমেয়াদী ভিসায় রূপান্তর করার সুযোগ থাকে।
৩. বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়ার অফিশিয়াল আইনি ধাপসমূহ

- ধাপ ১ (মালিকের আবেদন): ইতালির মালিক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পোর্টালে আপলোড করে নির্দিষ্ট ক্লিক ডে-তে সফলভাবে সাবমিট করবেন। [
- ধাপ ২ (নুলা ওস্তা বা ওয়ার্ক পারমিট): তথ্য যাচাইয়ের পর ইতালির ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকে কর্মীর নামে একটি ই-ওয়ার্ক পারমিট বা ‘Nulla Osta’ (নুলা ওস্তা) ইস্যু করা হবে।
- ধাপ ৩ (ভিসা আবেদন): মালিকের পাঠানো জেনুইন নুলা ওস্তা হাতে পাওয়ার পর, বাংলাদেশে ইতালির অফিশিয়াল আউটসোর্সিং পার্টনার VFS Global Portal এর মাধ্যমে পাসপোর্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথিসহ সরাসরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করে ভিসা আবেদন জমা দিতে হবে।
- ধাপ ৪ (প্রশিক্ষণ উদ্যোগ): বাংলাদেশ সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশেই ইতালীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও কারিগরি দক্ষতার ওপর বিশেষ সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে, যা দক্ষ কর্মীদের সহজে বৈধ উপায়ে ভিসা পেতে বড় ভূমিকা রাখবে।
৪. ভিসা প্রতারণা থেকে বাঁচার বিশেষ সতর্কবার্তা
ইতালি যাওয়ার নামে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দালাল চক্রের প্রতারণা লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বহু মানুষ অবৈধ পথে লাটভিয়া বা অন্যান্য দেশের জঙ্গল ও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে করুণ মৃত্যুর শিকার হয়েছেন।
- ভুয়া কোটার গুজব: বাজারে “ইতালি মাত্র ১% বাংলাদেশি নেবে, আজই টাকা দিন” — এমন যেকোনো গুজবে কান দেবেন না। ২০২৭ কোটায় বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো বৈষম্যমূলক ১% লিমিট অফিশিয়ালি দেওয়া হয়নি।
- অগ্রিম টাকা লেনদেন বন্ধ রাখুন: কোনো দালাল বা সংস্থাকে নুলা ওস্তা (Nulla Osta) ছাড়া এবং নুলা ওস্তাটি ইতালির অফিশিয়াল পোর্টাল বা দূতাবাসের মাধ্যমে শতভাগ যাচাই না করে কোনো প্রকার অগ্রিম অর্থ বা পাসপোর্ট জমা দেবেন না।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
নিরাপদ ও সুসংগঠিত অভিবাসন দেশের অর্থনীতির ভিত্তি। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার এই সময়ে না বুঝে অবৈধ পথে বা ভুয়া ভিসায় গিয়ে বিপদে পড়ার চেয়ে বিএমইটির সরকারি নির্দেশিকা মেনে প্রশিক্ষণ নিয়ে ও বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে বিদেশে যাওয়া আবশ্যক।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): জাতীয় অর্থনীতি, আয়কর ও অর্থ বিষয়ক পরামর্শ
- প্রকাশের তারিখ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ সংক্রান্ত জাতীয় আইন ও অনলাইন পোর্টাল নোটিশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া ও নীতিমালায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। বাজেট ২০২৬-২৭ অনুযায়ী ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আইনি সময়সীমা, করমুক্ত আয়ের সীমা এবং অনলাইন ই-রিটার্ন (e-Return) দাখিলের ধাপসমূহ নিচে বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
১. রিটার্ন দাখিলের আইনি সময়সীমা ও করবর্ষ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সর্বশেষ আয়কর অধ্যাদেশ ও নির্দেশিকা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ করবর্ষের (যা ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত অর্জিত আয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত) আয়কর রিটার্ন দাখিলের আইনি সময়সীমা ও কাঠামো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
করবর্ষ ও আয়বর্ষের স্পষ্ট সংজ্ঞা
- আয়বর্ষ (Income Year): ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত। (এই ১২ মাসে আপনি যা আয় করেছেন, তার হিসাব করতে হবে)।
- করবর্ষ (Assessment Year): ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত। (এটি হলো আয়বর্ষের অর্জিত আয়ের ওপর কর নির্ধারণ ও রিটার্ন জমা দেওয়ার আইনি বছর)।
রিটার্ন দাখিলের আইনি সময়সীমা ও সময়রেখা (Timeframes)
| করদাতার ধরন | জরিমানা ছাড়া আইনি সময়সীমা | বিলম্ব ফি ও জরিমানাসহ বর্ধিত সময়সীমা |
|---|---|---|
| সাধারণ ও নিয়মিত করদাতা | ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ | ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত (জরিমানা প্রযোজ্য) |
| প্রথমবারের করদাতা (New Taxpayer) | ৩০ জুন ২০২৭ | ৩০ জুন ২০২৭ এর পর কোনো সুযোগ নেই (e-TIN সচল রাখতে হবে) |
সময়মতো রিটার্ন না দিলে আইনি জরিমানা ও আর্থিক ক্ষতি
১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে কোনো করদাতা রিটার্ন দাখিল করলে আয়কর আইন অনুযায়ী তাকে ধাপে ধাপে আর্থিক জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে:
- জানুয়ারি – মার্চ ২০২৭ (প্রাথমিক বিলম্ব):
- মূল প্রদেয় করের ওপর ২% অতিরিক্ত কর যুক্ত হবে।
- করের পরিমাণ কম হলেও নূন্যতম ৩,০০০ টাকা জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।
- এপ্রিল – জুন ২০২৭ (দীর্ঘ বিলম্ব):
- মূল প্রদেয় করের ওপর ৫% অতিরিক্ত কর ধার্য হবে।
- এক্ষেত্রে নূন্যতম ৫,০০০ টাকা বিলম্ব ফি বা জরিমানা বাধ্যতামূলক।
- সরকারি সেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা:
- সময়মতো রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSR) না থাকলে ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিট কার্ড নবায়ন, ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ক্রয় এবং গাড়ির ফিটনেস নবায়নের মতো ৪৩টি সরকারি-বেসরকারি সেবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ বা স্থগিত হয়ে যাবে।
২. বাজেট ২০২৬-২৭ অনুযায়ী করমুক্ত আয়ের সীমা (Tax-Free Income Limit)

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অনুসারে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য ক্যাটাগরিভিত্তিক করমুক্ত আয়ের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে:
| করদাতার ক্যাটাগরি | করমুক্ত আয়ের সীমা (২০২৬-২৭) |
| সাধারণ পুরুষ করদাতা | ৩,৭৫,০০০ টাকা |
| নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা | ৪,২৫,০০০ টাকা |
| তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি | ৫,২৫,০০০ টাকা |
| গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহীদ/আহত | ৫,২৫,০০০ টাকা |
| প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা-মা/অভিভাবক | প্রতি সন্তানের জন্য অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা |
মনে রাখা জরুরি: বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও যদি কারও ১২ ডিজিটের টিআইএন (TIN) থাকে এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হন, তবে তার জন্য শূন্য করের রিটার্ন (Zero Return) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৩. ই-রিটার্ন (e-Return) দাখিলের সহজ ৬টি ধাপ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে ঘরে বসেই ই-রিটার্ন দাখিল করা যায়:
[etaxnbr.gov.bd পোর্টালে প্রবেশ] ➔ [TIN ও বায়োমেট্রিক সিম দিয়ে রেজিস্ট্রেশন/লগইন] ➔ [আয়ের বিবরণী ও রেয়াত তথ্য ইনপুট] ➔ [কর হিসাব যাচাই] ➔ [অনলাইন পেমেন্ট (যদি থাকে)] ➔ [একনলেজমেন্ট স্লিপ ও সার্টিফিকেট ডাউনলোড]
- পোর্টালে প্রবেশ ও রেজিস্ট্রেশন: এনবিআরের নির্দিষ্ট ই-ট্যাক্স ওয়েবসাইটে (
etaxnbr.gov.bd) গিয়ে নিজের ১২ ডিজিটের TIN এবং নিজের নামে বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন/লগইন করুন। - ব্যক্তিগত তথ্য ও আয়ের উৎসের তথ্য নির্বাচন: বেতন, বাড়ি ভাড়া, ব্যবসা, কৃষি বা মূলধনী লাভ—আয়ের যে যে উৎস রয়েছে সেগুলো সঠিকভাবে নির্বাচন করুন।
- আয়ের বিবরণী ইনপুট: ব্যাংক বিবরণী, বেতন সনদ (Salary Certificate), ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী আয়ের অঙ্ক পোর্টালে ইনপুট দিন।
- কর রেয়াত ও বিনিয়োগের তথ্য (Tax Rebate): জীবন বীমা, সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস বা অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ থাকলে তা উল্লেখ করে কর রেয়াতের সুবিধা গ্রহণ করুন।
- ট্যাক্স হিসাব ও পেমেন্ট: সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার দেয় কর (Net Payable Tax) হিসাব করে দেখাবে। দেয় কর থাকলে তা মোবাইল ব্যাংকিং, কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
- সাবমিট ও একনলেজমেন্ট সার্টিফিকেট ডাউনলোড: সমস্ত তথ্য সঠিক থাকলে ফাইলটি ফাইনাল সাবমিট করুন এবং তাৎক্ষণিকভাবে একনলেজমেন্ট স্লিপ (Acknowledgement Slip) ও ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোড করে রাখুন।
৪. বিলম্ব ও জরিমানা সংক্রান্ত নিয়মাবলী
আইনি সময়সীমা বা ৩০ নভেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক ও আইনি মাশুল গুনতে হতে পারে:
- বিলম্ব সুদ ও পেনাল্টি: নির্দিষ্ট মেয়াদের পর রিটার্ন দাখিল করলে দেয় করের ওপর অতিরিক্ত বিলম্বে দাখিলের জরিমানা ও মাসিক হারে বিলম্ব সুদ যুক্ত হয়।
- সর্বনিম্ন কর (Minimum Tax): নির্দিষ্ট এলাকার ওপর ভিত্তি করে প্রযোজ্য সর্বনিম্ন কর (যেমন: ঢাকা/চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা) প্রদান বাধ্যতামূলক থাকে।
- সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে জটিলতা: রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (PSN/একনলেজমেন্ট স্লিপ) না থাকলে ব্যাংক লোন, ক্রেডিট কার্ড, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসহ ৪০টিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি সেবা প্রাপ্তি ব্যাহত হতে পারে।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
স্মার্ট বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় আয়কর ব্যবস্থা সহজ করতে ই-রিটার্ন সিস্টেম অত্যন্ত কার্যকর একটি উদ্যোগ। ৩০ নভেম্বর সময়সীমা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে সময়মতো তথ্য যাচাই করে নিজের ই-রিটার্ন দাখিল করা প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



