অর্থনীতি

সমৃদ্ধি বনাম উন্নয়ন: ২০২৬ সালের নিরিখে বিশ্বের প্রভাবশালী ১৫টি রাষ্ট্রের ব্যবচ্ছেদ
উন্নত রাষ্ট্র

নিউজ ডেস্ক

January 11, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ঢাকা: একবিংশ শতাব্দীতে একটি রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল তার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ বা জিডিপির (GDP) অঙ্কে নির্ধারিত হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত উন্নয়ন হলো ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ বা এইচডিআই (HDI)। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি স্পষ্ট যে, সম্পদশালী অনেক দেশই নাগরিক সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছে, আবার মাঝারি আয়ের অনেক দেশ জীবনযাত্রার মানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

উন্নয়ন পরিমাপের নতুন মানদণ্ড: কেন এইচডিআই গুরুত্বপূর্ণ?

সাধারণত আমরা একটি দেশকে তার অর্থনীতির আকার দিয়ে বিচার করি। কিন্তু জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) মনে করে, তিনটি মৌলিক বিষয়ের সমন্বয়ই হলো প্রকৃত উন্নয়ন:

১. দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবন (গড় আয়ু)

২. জ্ঞান ও শিক্ষা (শিক্ষার হার ও মান)

৩. জীবনযাত্রার মান (মাথাপিছু ক্রয়ক্ষমতা)

২০২৬ সালের বৈশ্বিক ডাটা এনালাইসিস: সেরা ১৫ পরিচিত দেশ

গুগল এনালাইসিস এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর ২০২৬ সালের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও প্রভাবশালী ১৫টি দেশের তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

দেশমাথাপিছু আয় (GNI)বৈশ্বিক প্রভাব ও পরিচিতিবিশেষত্ব
১. আইসল্যান্ড$৭৫,৮০০শান্তি ও সামাজিক সাম্যটানা কয়েক বছর ধরে এইচডিআই-তে শীর্ষে।
২. লুক্সেমবুর্গ$১,২৭,৪০০করের স্বর্গ (Tax Haven)বিশ্বের সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ।
৩. সুইজারল্যান্ড$৯২,৬০০নিরপেক্ষতা ও ব্যাংকিংবৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস ও উদ্ভাবনী অর্থনীতি।
৪. কাতার$১,০৮,০০০জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতিমাথাপিছু আয়ের নিরিখে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ।
৫. নরওয়ে$১,০২,৫০০সার্বভৌম সম্পদ তহবিলপ্রাকৃতিক সম্পদের সুষম বণ্টনের আদর্শ দেশ।
৬. আয়ারল্যান্ড$৯৮,৪০০টেক জায়ান্টদের কেন্দ্রইউরোপের সিলিকন ভ্যালি হিসেবে পরিচিত।
৭. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র$৮২,০০০সামরিক ও প্রযুক্তি শক্তিএকক বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েও এইচডিআই-তে ২১তম।
৮. সিঙ্গাপুর$১,১৫,০০০লজিস্টিক ও বাণিজ্যপ্রাকৃতিক সম্পদহীন হয়েও এশিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী।
৯. ডেনমার্ক$৭২,৯০০সামাজিক সুরক্ষাবিশ্বের অন্যতম সুখী ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র।
১০. অস্ট্রেলিয়া$৬৪,৫০০খনিজ ও কৃষি প্রযুক্তিপশুপালন ও খনি শিল্পের আধুনিকায়ন।
১১. সংযুক্ত আরব আমিরাত$৮৪,২০০পর্যটন ও রিয়েল এস্টেটতেল পরবর্তী আধুনিক অর্থনীতির মডেল।
১২. জার্মানি$৬৮,১০০ইঞ্জিনিয়ারিং ও শিক্ষাইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতির ইঞ্জিন।
১৩. হংকং$৭৬,৩০০আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রএশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বিনিয়োগবান্ধব শহর।
১৪. কুয়েত$৫১,৬০০পেট্রো-ডলার অর্থনীতিবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মুদ্রার মালিক।
১৫. ব্রুনেই$৬৫,৭০০প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলসুলতানি শাসনের অধীনে করমুক্ত আধুনিক রাষ্ট্র।

বিশ্লেষণ: কেন প্রভাবশালী দেশগুলো পিছিয়ে?

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীন অর্থনৈতিকভাবে দানবীয় হলেও মানব উন্নয়ন সূচকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর (নরওয়ে, ডেনমার্ক) নিচে থাকে। এর প্রধান কারণ—সম্পদের অসম বণ্টন। নরওয়েতে একজন অতি সাধারণ নাগরিক যে মানের শিক্ষা ও চিকিৎসা পান, কাতারের গড় মাথাপিছু আয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকরা সেই মানের সেবা পায় না।

১৯০০ থেকে ২০২৬: বাংলাদেশের বিবর্তন

১৯০০ সালে ব্রিটিশ ভারতের অধীনে থাকা এই ভূখণ্ডে যখন মাথাপিছু আয় ছিল নামমাত্র, সেই অবস্থা থেকে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর থেকে সামাজিক সূচকে (বিশেষ করে গড় আয়ু ও শিশু মৃত্যুহার কমানো) বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণ বিশ্ব অর্থনীতিতে আমাদের নতুন এক মর্যাদা এনে দিচ্ছে।


সূত্র:

১. UNDP Human Development Report (Update: Jan 2026).

২. International Monetary Fund (IMF) World Economic Outlook 2026.

৩. World Bank Open Data (Economic and Social Indicators).

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

চীন দেশের ১০টি অবিশ্বাস্য

নিউজ ডেস্ক

September 21, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদনের শিরোনাম: চীন দেশের ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)

বিভাগ (Category): বিশ্ব সংস্কৃতি, সাধারণ জ্ঞান ও বৈচিত্র্য

প্রকাশের তারিখ: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO), বিশ্বসংস্কৃতি রেকর্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় দেশ চীন। ইতিহাস, ভৌগোলিক ক্ষেত্র ও জনসংখ্যা—সব দিক দিয়েই চীনের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে অনন্য। প্রাচ্যের এই বিশাল দেশে এমন বহু ঐতিহ্য ও সামাজিক চর্চা রয়েছে যা বাইরের দেশের মানুষের কাছে যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বেশ কৌতুহল উদ্দীপক।

চীন দেশ সম্পর্কে ১০টি অবাক করা ও বিস্ময়কর তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

  • এক টাইম জোন: বিশাল আয়তনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও পুরো চীনে মাত্র একটি টাইম জোন (Beijing Time) চালু রয়েছে। এর ফলে দেশের পশ্চিম প্রান্তে সকালের সূর্য উঠতে অনেক সময় সকাল ১০টা বেজে যায়।
  • বর্ণমালা ছাড়াই ভাষা: চীনা ভাষার কোনো বর্ণমালা বা অ্যালফাবেট নেই। এর বদলে হাজার হাজার পিকটোগ্রাফিক ক্যারেক্টার বা চিত্রভিত্তিক বর্ণ ব্যবহার করা হয়। স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ ক্যারেক্টার জানতে হয়।
  • গুহায় বসবাস: আধুনিক যুগেও চীনের লক্ষ লক্ষ মানুষ (প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি) ঐতিহ্যগতভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের গুহায় বা মাটির নিচে তৈরি বিশেষ ধরনের বাড়িতে বসবাস করেন।
  • বিশ্বের দীর্ঘতম রেল নেটওয়ার্ক: চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক এতটাই বিশাল যে এর রেলপথ দিয়ে পৃথিবীকে প্রায় চারবার পেঁচিয়ে ফেলা সম্ভব।
  • প্রাচীরের দৈর্ঘ্য: বিখ্যাত গ্রেট ওয়াল অব চায়না-এর মূল দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার, যা মানবসৃষ্ট প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
  • বর্ষার রঙ সাদা: পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো চীনে কালো নয়, বরং সাদা রঙকে শোক, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও দুঃখের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
  • টয়লেট পেপারের প্রচলন: ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চীনে প্রথম টয়লেট পেপারের ব্যবহার শুরু হয়, যা সে সময় শুধুমাত্র রাজপরিবারের সম্রাট ও তাদের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ছিল।
  • পাহারায় রাজহাঁস: চীনের অনেক পুলিশ স্টেশন ও খামারে কুকুরের পাশাপাশি বা বিকল্প হিসেবে পাহারাদার হিসেবে রাজহাঁস ব্যবহার করা হয়। হাঁসের দৃষ্টিশক্তি ও তীক্ষ্ণ শব্দ করার ক্ষমতা বেশ কার্যকর।
  • চপস্টিকের ব্যবহার: চীনে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ বিলিয়ন বা সাড়ে চার হাজার কোটি চপস্টিক ব্যবহার করা হয়, যার বেশিরভাগই কাঠের তৈরি।
  • প্রাচীন আবিষ্কার: বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় খেলা ফুটবল, ঘুড়ি ও কম্পাসের আদি রূপ প্রাচীন চীনেই প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছিল।

প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ সম্পর্কে আর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধুনিক অগ্রগতি নিয়ে আমাকে বিস্তারিত

চীনের প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ এবং আধুনিক যুগে এসে তাদের যে অভাবনীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটেছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম এক বিস্ময়। নিচে দুটি বিষয়ই বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রাচীন ইতিহাস ও রাজবংশ (Ancient History & Dynasties)

চীনের সভ্যতাকে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং ধারাবাহিক সভ্যতা বলা হয়। প্রায় ৫,০০০ বছর আগে হলুদ নদী (Yellow River) বা হুয়াং হো নদীর অববাহিকায় এই সভ্যতার সূচনা ঘটেছিল। চীনের ইতিহাস মূলত বিভিন্ন শক্তিশালী রাজবংশের উত্থান ও পতনের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে:

  • শিয়া ও শাং রাজবংশ (Xia & Shang Dynasty): শিয়া রাজবংশকে চীনের প্রথম কিংবদন্তি রাজবংশ ধরা হলেও, শাং রাজবংশ (১৬০০–১০৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) থেকে চীনের লিখিত ইতিহাসের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এই যুগেই প্রথম চিনা লিপির আদি রূপ আবিষ্কৃত হয়।
  • ঝৌ রাজবংশ (Zhou Dynasty): এটি চীনের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় (প্রায় ৮০০ বছর) শাসন করা রাজবংশ। এই যুগেই চীনের বিখ্যাত দুই দার্শনিক কনফুসিয়াস এবং লাও জে (তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা) তাদের দর্শন প্রচার করেন, যা চিনা সমাজকে চিরতরে বদলে দেয়।
  • কিন রাজবংশ (Qin Dynasty): মাত্র ১৫ বছর টিকলেও এই রাজবংশের রাজা কিন শি হুয়াং ২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে টুকরো টুকরো চীনকে একত্রিত করে প্রথম চিনা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম থেকেই ‘চায়না’ বা ‘চীন’ নামের উৎপত্তি। তিনি মুদ্রা, ওজন ও পরিমাপের একক এক করেন এবং বহিরাগত আক্রমণ ঠেকাতে গ্রেট ওয়াল বা চীনের প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন।
  • হান রাজবংশ (Han Dynasty): (২০৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ – ২২০ খ্রিষ্টাব্দ) একে চীনের ইতিহাসের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। এই সময়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড (Silk Road) প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া কাগজ আবিষ্কার এবং সরকারি চাকরিতে পরীক্ষা পদ্ধতির সূচনা এই বংশেরই অবদান।
  • ট্যাং ও সং রাজবংশ (Tang & Song Dynasty): ট্যাং আমলে কবিতা ও শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে এবং সং আমলে বারুদ, কম্পাস ও কাঠের ব্লকে মুদ্রণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
  • মিং ও কিং রাজবংশ (Ming & Qing Dynasty): মিং রাজবংশ (১৩৬৮–১৬৪৪) চীনের প্রাচীরের আধুনিক সংস্করণ এবং বেইজিংয়ের বিখ্যাত ‘ফরবিডেন সিটি’ তৈরি করে। আর কিং রাজবংশ (১৬ party–১৯১২) ছিল চীনের শেষ রাজবংশ, যার পতনের মধ্য দিয়ে চীনে ২,০০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ১৯১২ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

আধুনিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি

১৯৪৯ সালে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন (PRC) গঠিত হওয়ার পর দেশটি সমাজতান্ত্রিক ধারায় চলতে থাকে। তবে ১৯৭৮ সালে লিডার দং শিয়াওপিং-এর “সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ” (Reform and Opening-up) নীতির পর চীনের অর্থনীতিতে এক অলৌকিক পরিবর্তন আসে। [

অর্থনৈতিক রূপান্তর:

  • বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি: গত চার দশকে চীন প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক রেকর্ড। বর্তমানে জিডিপির (GDP) দিক থেকে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।
  • বিশ্বের কারখানা (The World’s Factory): সস্তা শ্রম, উন্নত অবকাঠামো এবং বিশাল উৎপাদন ক্ষমতার কারণে পৃথিবীর সিংহভাগ ইলেকট্রনিক্স, পোশাক ও ভারী যন্ত্রপাতি চীনেই তৈরি হয়।
  • বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে চীন বিশ্বের শতাধিক দেশের সাথে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথের এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে。

প্রযুক্তিগত আধিপত্য:

বর্তমান যুগে চীন কেবল পণ্য নকল বা সস্তা উৎপাদনের দেশ নয়, বরং তারা বৈশ্বিক প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে:

  • টেলিকমিউনিকেশন ও ৫জি (5G): অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (ASPI)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ৪৪টি জটিল ও উদীয়মান প্রযুক্তির মধ্যে ৩৭টিতেই চীন বিশ্বে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ৫জি ইন্টারনেট অবকাঠামোতে তারা একক আধিপত্য বজায় রেখেছে।
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি (AI & Digital Economy): ফেসিয়াল রিকগনিশন, এআই (AI) চালিত অ্যালগরিদম এবং বিগ ডেটা ব্যবহারে চীন অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। হুয়াওয়ে (Huawei), আলিবাবা (Alibaba) এবং টেনসেন্ট (Tencent)-এর মতো টেক জায়ান্টরা এখন সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলোকে টক্কর দিচ্ছে।
  • গ্রিন এনার্জি ও ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV): জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চীন বিশ্বের বৃহত্তম সৌর প্যানেল, উইন্ড মিল এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনকারী দেশ। বিওয়াইডি (BYD) এর মতো চিনা কোম্পানি এখন বিশ্ব বাজারে টেসলার অন্যতম বড় প্রতিযোগী।
  • মহাকাশ ও মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং: চীন নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘তিয়ানগং’ (Tiangong) তৈরি করেছে এবং চাঁদের দুর্গম দূরবর্তী অংশে (Far Side of the Moon) রোভার পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সেতু, বুলেট ট্রেন নেটওয়ার্ক এবং বিশাল সব ড্যাম (যেমন- থ্রি গর্জেস ড্যাম) তাদের মেগা-ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষমতার প্রমাণ。

বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শন বা চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প

কনফুসীয় দর্শন এবং চীনের প্রাচীর—এই দুটিই চীনের হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল স্তম্ভ। এর একটি মানুষের মন ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আর অন্যটি বাইরের শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। নিচে এই দুটির পেছনের গল্প বিস্তারিত দেওয়া হলো:

বিখ্যাত কনফুসীয় দর্শনের গল্প (The Story of Confucianism)

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে (৫৫১–৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) চীনে যখন ঝৌ রাজবংশ শাসন করছিল, তখন চিনা সমাজ মারাত্মক বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই অশান্ত সময়ে আবির্ভূত হন চিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ও শিক্ষক কনফুসিয়াস (চিনা নাম: কোং কিউ)।

দর্শনের পেছনের মূল উদ্দেশ্য:

কনফুসিয়াস কোনো নতুন ধর্ম প্রচার করেননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে। তাঁর মতে, সমাজকে যদি সুন্দর করতে হয়, তবে মানুষকে ভেতর থেকে সৎ ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

কনফুসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভগুলো:

  • রেন (Ren – মানবতা ও পরোপকার): মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, দয়া এবং সহমর্মিতা থাকতে হবে। এটিই চিনা সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
  • শাও (Xiao – সন্তানসুলভ ভক্তি): পরিবারের বড়দের, বিশেষ করে বাবা-মার প্রতি সন্তানদের পরম শ্রদ্ধা ও বাধ্য থাকা। কনফুসিয়াস মনে করতেন, পরিবারে যদি শৃঙ্খলা থাকে, তবে রাষ্ট্রেও শান্তি বজায় থাকবে。
  • লি (Li – আচার-অনুষ্ঠান ও সদাচরণ): সমাজে বা রাষ্ট্রে কার কী ভূমিকা (যেমন: শাসকের প্রতি প্রজার, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রের দায়িত্ব) তা যথাযথভাবে পালন করা এবং ভদ্রতা বজায় রাখা।
  • সৎ শাসক: কনফুসিয়াস বিশ্বাস করতেন, একজন রাজাকে অবশ্যই নৈতিকভাবে নিখুঁত হতে হবে। রাজা যদি প্রজাদের প্রতি দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ হন, তবে প্রজারাও রাজাকে শ্রদ্ধা করবে এবং রাজ্যে কোনো বিদ্রোহ হবে না।

ঐতিহাসিক মোড়: প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং এই দর্শনকে নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং কনফুসীয় বই পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী হান রাজবংশের আমলে একে চীনের রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চীনের রাজকীয় আমলাতন্ত্র ও সরকারি চাকুরির পরীক্ষা এই কনফুসীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হতো।

চীনের প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্প (The Story of the Great Wall)

অনেকেই মনে করেন চীনের প্রাচীর একবারে বা একটি নির্দিষ্ট রাজবংশের আমলে তৈরি হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুল। এটি মূলত ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজবংশের টুকরো টুকরো কাজের এক বিশাল সমষ্টি।

নির্মাণের পেছনের আসল কারণ:

চীনের উত্তর সীমান্তে ছিল মঙ্গোলিয়া ও মাঞ্চুরিয়ার বিশাল বিস্তীর্ণ তৃণভূমি (Steppes)। সেখানে বসবাস করত যাযাবর ও দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ উপজাতিরা (যেমন: শিয়ংনু, মঙ্গোল)। কৃষিপ্রধান এবং উন্নত চিনা সাম্রাজ্যগুলোতে এই যাযাবর ঘোড়সওয়াররা প্রায়ই আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ধন-সম্পদ, ফসল ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে যেত। এই যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে চিনা সীমান্ত ও প্রাচীন বাণিজ্যের মূল পথ সিল্ক রোড রক্ষা করাই ছিল প্রাচীর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য।

যেভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল:

  • টুকরো দেয়াল (৭ম খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): প্রাচীন চীনের ছোট ছোট রাজ্যগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজ নিজ সীমান্তে ছোট ছোট মাটির দেয়াল তৈরি করেছিল।
  • একত্রীকরণ (২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ): চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং পুরো চীনকে একত্রিত করার পর ভেতরের রাজ্যগুলোর দেয়াল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি উত্তরের যাযাবরদের ঠেকাতে পূর্বের তৈরি টুকরো দেয়ালগুলোকে একসাথে জুড়ে দিয়ে একটি বিশাল প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরির কাজ শুরু করেন। এটিই ছিল গ্রেট ওয়ালের প্রথম আদি রূপ।
  • আধুনিক রূপ (১৩৬৮–১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ): আজ আমরা পর্যটক হিসেবে পাথরের তৈরি যে সুন্দর ও মজবুত প্রাচীর দেখতে পাই, তা মূলত মিং রাজবংশের আমলে তৈরি। মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধরদের আক্রমণ ঠেকাতে তারা ইট ও পাথর দিয়ে ওয়াচটাওয়ারসহ এই আধুনিক প্রাচীর নির্মাণ করে।

“বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” এর ট্র্যাজেডি:

প্রাচীর নির্মাণের পেছনের গল্পটি যেমন বীরত্বের, তেমনই চরম নিষ্ঠুরতার। সম্রাট কিন শি হুয়াং এই প্রাচীর তৈরির জন্য দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক, অপরাধী এবং বন্দি সেনাদের জোরপূর্বক উত্তর সীমান্তে পাঠাতেন।

পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চল, হাড়কাঁপানো শীত, খাদ্যাভাব এবং প্রচণ্ড শারীরিক খাটাখাটুনির কারণে প্রাচীর নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। লোককথা অনুযায়ী, যেসব শ্রমিক কাজ করতে করতে মারা যেতেন, তাদের মৃতদেহ অন্য কোথাও না নিয়ে প্রাচীরের ভেতরেই মাটি চাপা দেওয়া হতো। এই চরম মানবিক ট্র্যাজেডির কারণে চীনের প্রাচীরকে অনানুষ্ঠানিকভাবে “বিশ্বের দীর্ঘতম কবরস্থান” (The World’s Longest Cemetery) বলা হয়ে থাকে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১৯৭১ থেকে ১৯৯০

নিউজ ডেস্ক

September 15, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ন

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক চালচিত্র ছিল অত্যন্ত জটিল ও তরঙ্গাকুল। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল (১৯৭২–১৯৭৫) থেকে শুরু করে ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি, ৩ ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন—প্রতিটি অধ্যায়ই বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর দাগ কেটেছে।

রাজনৈতিক গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।

১. শেখ মুজিব আমলে জিয়াউর রহমানের কৌশলগত নীরবতার কারণ

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সেনা কর্মকর্তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Army Staff) হিসেবে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় কোনো সরাসরি বিদ্রোহে জড়াননি। এর নেপথ্যে মূল কারণগুলো ছিল:

  • নেতৃত্বের বৈধতা ও আনুগত্য: শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপ্রধান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
  • জাতীয় রক্ষীবাহিনীর চাপ: শেখ মুজিব সরকার গঠিত বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ সমান্তরাল শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীর ওপর সার্বিক নজরদারি বজায় রাখত, যা যেকোনো ক্যু চক্রান্তের জন্য বড় বাধা ছিল।
  • পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ড: সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহসহ শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তারা সরকারের অনুগত থাকায় জিয়াউর রহমান সেনাসদরের পেশাদার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাহিনীর ভেতরে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন।

২. ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মেজর শরীফুল হক ডালিম, মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ ও মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর জুনিয়র অফিসাররা সেনাসদরের আদেশ অমান্য করে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে সাথে নিয়ে বঙ্গভবন থেকে দেশ চালাতে শুরু করেন।

[১৫ আগস্ট: বঙ্গভবনে ঘাতক মেজরেরা] ──► ৩ নভেম্বর: খালেদ মোশাররফের পাল্টা ক্যু ──► ৭ই নভেম্বর: সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও জিয়ার মুক্তি
  • ৩রা নভেম্বরের পাল্টা ক্যু: চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৩রা নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয় এবং মোশতাক পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘাতক মেজরেরা ব্যাংকক পালিয়ে যাওয়ার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে।
  • ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান: খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণ সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এই সুযোগে জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সিপাহীরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনেন। সকালে শেরেবাংলা নগরে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার ও নাজমুল হুদা নিহত হন।

৩. কর্নেল তাহেরের বিচার ও জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ

৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের পর কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন একটি “শ্রেণিহীন বিপ্লবী সেনাবাহিনী” গঠন করতে। তবে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেনাশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর অবস্থান নেন।

  • গোপন বিচার ও ফাঁসি: সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা দমনে জিয়া কঠোর হন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গোপনে বিচার চালিয়ে ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। (উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে)
  • বেসামরিকীকরণ ও দল গঠন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালের গণভোটে বৈধতা অর্জনের পর তিনি রাজনীতিকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে প্রথমে ‘জাগদল’ এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (BNP) গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি পূর্ণ আইনি ভিত্তি লাভ করেন।
[সামরিক শাসন ও ক্যু দমন] ──► ইনডেমনিটি ও ৫ম সংশোধনী পাস ──► জাগদল ও বিএনপি গঠন ──► ১৯৭৯ সালের বেসামরিক সরকার

৪. ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী

সামরিক সরকারের সিদ্ধান্তসমূহকে আইনি সুরক্ষা দিতে জিয়াউর রহমানের আমলে দুটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়:

  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারে আইনি বাধা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই অধ্যাদেশটি বহাল রাখা হয় এবং খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়।
  • পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীন নেওয়া সকল অধ্যাদেশ ও সিদ্ধান্তকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। একই সাথে সংবিধানে “বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম” সংযোজন, “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” এবং জাতীয়তা “বাংলাদেশি” নির্ধারণ করা হয়। (২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট ৫ম সংশোধনী বাতিল করেন)

৫. ১৯ দফা, একের পর এক ক্যু এবং জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড

ক্ষমতা সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান আত্মনির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং ‘খাল খনন’ ও ‘পল্লী বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি চালু করেন।

তবে তার সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে প্রায় ২১-২২টি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের চেষ্টা ঘটে। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ঢাকা ও বগুড়া বিমান বাহিনীর বিদ্রোহের পর সামরিক আদালতে প্রায় সহস্রাধিক সেনাসদস্য ও অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

[চট্টগ্রাম সফর] ──► ৩০ মে ১৯৮১: মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ক্যু ──► সার্কিট হাউজে জিয়া নিহত ──► এরশাদের সামরিক ক্ষমতা দখল

হত্যাকাণ্ড (৩০ মে, ১৯৮১): ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একদল সেনা কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে। বিদ্রোহটি তিন দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয় এবং জেনারেল মঞ্জুর রহস্যজনকভাবে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন।

৬. ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতন

লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল ৯০-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাধ্যমে।

  • তিন জোটের রূপরেখা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট, বিএনপির ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫-দলীয় জোট একত্রিত হয়ে স্বৈরাচার পতন ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
  • সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও আত্মত্যাগ: ডাকসু ও শীর্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ আন্দোলনে নতুন গতি আনে। ১০ই অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি এবং ২৭শে নভেম্বর ডা. শামসুল আলম খান মিলনের শাহাদাত আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।
  • সেনাবাহিনীর অনীহা ও পতন: আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দিন খান বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে ৪ঠা ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের ইতি ঘটে এবং ১৯৯১ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ভূগর্ভস্থ শহর

নিউজ ডেস্ক

September 15, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ: নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: প্রাচীন মানব সভ্যতার প্রকৌশল ও স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম এক বিস্ময় তুরস্কের মধ্য-অ্যানাটোলিয়া অঞ্চলের ক্যাাপাডোকিয়ায় অবস্থিত ‘ডেরিংকুয়ো’ (Derinkuyu) ভূগর্ভস্থ শহর। মাটির তলদেশে প্রায় ৮৫ মিটার (২৮০ ফুট) গভীরে খোদাই করে তৈরি এই ঐতিহাসিক নগরীতে একসময় প্রায় ২০,০০০ মানুষ তাদের গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ দীর্ঘকাল নিরাপদে বসবাস করতে পারত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই শহরটি প্রায় ৩,০০০ বছরের প্রাচীন এবং এটি মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও জটিলতম ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র।

আকস্মিক আবিষ্কারের ইতিহাস

১৯৬৩ সালে আধুনিক বিশ্ব প্রথম এই ভূগর্ভস্থ শহরের অস্তিত্ব জানতে পারে। ডেরিংকুয়ো এলাকার এক স্থানীয় বাসিন্দা তার বাড়ির বেসমেন্ট বা দেয়াল সংস্কারের কাজ করার সময় হঠাৎ মাটির নিচে একটি রহস্যময় কক্ষ ও গোপন দরজার সন্ধান পান।

সেই দেয়ালের পেছনের সুরঙ্গ ধরে অনুসন্ধান ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের খননকাজ চালাতেই বেরিয়ে আসে একের পর এক পাথরে খোদাই করা কক্ষ ও সুদীর্ঘ জনপদ। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে, এটি সাধারণ কোনো গুহা নয়, বরং মাটির নিচে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এক বিশাল প্রাচীন নগরী।

ইতিহাস ও নির্মাণের প্রেক্ষাপট

ইতিহাসবিদদের ধারণামতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম থেকে ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইন্দো-ইউরোপীয় ‘ফ্রিজিয়ান’ (Phrygians) জনগোষ্ঠী নরম আগ্নেয়গিরির শিলা (Tuff) কেটে এই শহরের প্রাথমিক অংশ নির্মাণ শুরু করে।

পরবর্তীকালে বাইজেন্টাইন যুগে (খ্রিষ্টীয় ৫ম থেকে ১২শ শতাব্দী) রোমান ও পারস্য আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় খ্রিষ্টান বাসিন্দারা শহরটিকে আরও বিস্তৃত ও আধুনিক করে তোলে। মূলত বহিরাগত শত্রু ও প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আত্মরক্ষার নিরাপদ দুর্গ হিসেবে এই শহরটি ব্যবহৃত হতো।

[ফ্রিজিয়ানদের প্রাথমিক নির্মাণ] ──► বাইজেন্টাইন যুগের সম্প্রসারণ ──► আক্রমণ থেকে সুরক্ষা ও বসবাস

শহরের গঠন, স্থাপত্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

মাটির নিচে ১৮টি স্তর বিশিষ্ট এই ভূগর্ভস্থ শহরটি কেবল বসবাসের জন্য নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ নগর জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ছিল:

  • বায়ু চলাচলের সুদৃশ্য নালী: শহরজুড়ে প্রায় ১৫,০০০টি ভেন্টিলেশন শ্যাফট বা সুদৃশ্য বায়ুনালী ছিল, যার মাধ্যমে মাটির গভীরতম স্তরেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে যেত।
  • বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা: বহিরাগত শত্রুদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য প্রবেশপথ ও সুড়ঙ্গের সংযোগস্থলে ভারী ও গোলাকার বিশাল পাথরের দরজা স্থাপন করা হয়েছিল, যা কেবল ভেতরের দিক থেকেই সহজে বন্ধ বা খোলা যেত, কিন্তু বাইরে থেকে খোলা অসম্ভব ছিল।
  • দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যবস্থা: শহরের ভেতরে ছিল খাদ্য ও শস্য সংরক্ষণের বিশাল গুদাম, স্থানভিত্তিক রান্নাঘর, গোয়ালঘর বা আস্তাবল, ওয়াইন ও তেলের প্রেস, ভাণ্ডার ঘর, খাবার ঘর, ধর্মীয় প্রার্থনালয় (চার্চ) এবং শিশুদের পাঠদানের জন্য একটি বিশেষ স্কুল ঘর।
  • সুপেয় পানির স্বাধীন কূপ: শত্রুরা যেন পানিতে বিষ মিশিয়ে দিতে না পারে, সেজন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা বাইরের কূপের সাথে সরাসরি যুক্ত না রেখে ভেতরের স্বাধীন ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।
[১৫,০০০ বায়ুনালী] ──► বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ──► পাথরের সুরক্ষা দরজা ──► স্বয়ংসম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ জীবন

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা

ডেরিংকুয়ো কেবল একক কোনো শহর নয়; এটি মাটির নিচে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের মাধ্যমে ক্যাাপাডোকিয়ার আরেকটি বিখ্যাত ভূগর্ভস্থ শহর ‘কাইমাকলি’ (Kaymakli)-র সাথে সরাসরি সংযুক্ত ছিল।

১৯৬৯ সালে শহরটি সাধারণ দর্শনার্থী ও পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং বর্তমানে এর প্রায় ১০% অংশ উন্মুক্ত রয়েছে। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো (UNESCO) এলাকাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রাচীনকালের প্রতিকূল পরিবেশ ও যুদ্ধবিগ্রহে টিকে থাকার অদম্য তাগিদ এবং বিস্ময়কর প্রকৌশল বিদ্যার নিদর্শন হিসেবে ডেরিংকুয়ো আজও বিশ্বজুড়ে গবেষক ও পর্যটকদের অভিভূত করে চলেছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৭ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ