অর্থনীতি

অসম্পদ থেকে বৈশ্বিক কেন্দ্র: সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক বিস্ময়ের ইতিহাস ও কৌশল
জিরো রিসোর্স

নিউজ ডেস্ক

August 2, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

চাইনিজ, তামিল ও মালয় তিন জাতির সৌহার্দ্যপূর্ণ দেশ সিঙ্গাপুর। অতীতের বৈরিতা ত্যাগ করে তারা এক সমৃদ্ধশালি দেশ গড়ে তুলেছে।

মানসুরা আক্তার, এশিয়ার দেশ হলে উন্নত হতে পারবে না এমন তো কোন কথা নেই। এশিয়ার দেশ চীন পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র জাপান তিন নম্বরে। সাউথ কোরিয়ার অবস্থান দ্বাদশ নম্বরে। এছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ইজরায়েল, ইরান, ভারত অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইউরোপ অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসেছে অল্প কয়েক শত বছর আগে। মধ্যযুগ পর্যন্ত এশিয়ার দেশগুলোর ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী। সভ্যতা এবং সমৃদ্ধির নিরিখে এশিয়া যখন মধ্য গগনে তখন ইউরোপের বৃহত্তর অংশ দারিদ্র্, অশিক্ষা, কুশিক্ষা লর্ড, ব্যারন ও‌ জমিদার শ্রেণীর অন্যায় অত্যাচারের নিগড়ে আবদ্ধ ছিল। ভাইকিংস, ভ্যানডাল, গথ, ভিসিগথ, নর্মান বর্বর জনগোষ্ঠী ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

ইউরোপে শুধুমাত্র ভূমধ্যসাগরীয় গ্রিস এবং রোম সাম্রাজ্য প্রগতির আলোকবর্তিকা হিসেবে পৃথিবীতে অবদান রাখতে পেরেছিল। এদিকে এশিয়ায় মেসোপটেমিয়া, পারস্য, চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সিন্ধু অববাহিকার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা, উত্তর ভারতে আর্য বা বৈদিক সভ্যতা ও আনাতোলিয়া ও মঙ্গোলীয় অঞ্চল ছিল সভ্যতার সূতিকাগার। সপ্তম শতাব্দি থেকে চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ ইসলামিক সভ্যতা পৃথিবী শাসন করে। তুর্কির অটোমান সাম্রাজ্য ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ১৯১৮ সাল নাগাদ প্রায় ৭০০ বছর পুরো বলকান অঞ্চল পদানত করে রাখে।

ইউরোপ উন্নতির এবং সভ্যতার পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পায় ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জায়েদের নেতৃত্বে ইউরোপের আন্দালুসিয়া দখল করার পর ইসলামি শাসন আমলে । তাদের সংস্পর্শে শিক্ষা-দীক্ষার সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত হয়ে রেনেসাঁর সূচনা হয়। রেনেসাঁর হাত ধরেই সূচনা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন। এমনকি সক্রেটিস, অ্যারিস্টোটল এবং অন্যান্য গ্রিক মনীষীর চিন্তা ভাবনা, দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় ঘটে স্পেনের মুরদের মাধ্যমে।

ওদিকে আটলান্টিকের অপর প্রান্তে কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করে, তখন প্রাক কলাম্বিয়ান যুগে মায়া, ইনকা, আজটেক, মাচুপিচু সভ্যতা ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের চেয়ে উন্নত ছিল। অস্ত্র, বর্বরতা ও শঠতার মাধ্যমে তারা সেসব সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়।

এবার আপনার সিঙ্গাপুরের কথায় আসা যাক। এক চিলতে দ্বীপ হয়েও সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের বিস্ময়কর সাফল্যে অবাক হওয়ারই কথা।

মালয়েশিয়ার লেজে এক চিলতে দ্বীপ সিঙ্গাপুর

মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর যুগল-বন্ধন

সিঙ্গাপুর প্রায় ১০০ বছর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সিঙ্গাপুর দখল করে নিলে ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ার সাথে যোগ দেয়। নাম হয় ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া।

দুই ভূখণ্ডের মিল মহব্বত বেশি দিন টেকে নাই। প্রধান কারণ, জাতিগত বিভেদ। সিঙ্গাপুরের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল চাইনিজ , এক-তৃতীয়াংশ মালয় বংশোদ্ভূত। দুই গ্রুপের ধর্ম ও কালচার আলাদা। দুই দলের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি লেগেই থাকত। একত্রিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠল। ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করে দেয়।

মালয়েশিয়া বহিষ্কার করে দেওয়ার পর সিঙ্গাপুরের সমস্যা ছিল পাহাড় পরিমাণ। দ্বীপের দুইপাশে দুইটি বৈরী রাস্ট্র ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া কর্তৃক কোণঠাসা, নগরীর ৩০ লক্ষ লোকের মধ্যে বেশির ভাগই বেকার, দুই-তৃতীয়াংশ লোকের বাস বস্তিতে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, পানি সরবরাহ পয় প্রণালীর বালাই নেই, অবকাঠামো নড়বড়ে। তবে, সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ছিলেন দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতা। ‌ লী আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করলে কেউ সাড়া দেয়নি। নিজের ঘর নিজেরা সামলানোর দায়িত্ব ঘাড়ে নেন লী কুয়ান।

লী কুয়ান ১৯৬৯

১৯২৩ সালে লী কোয়ান এ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

বিশ্বায়ন এবং বাণিজ্য

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির মূল শক্তি ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। এক দেশের পণ্য আমদানি করে অন্য দেশে চালান করা। ধারনের ব্যবসার পোশাকি নাম entrepot—আড়তদারি বলাই ভালো। এ-ভাবে দালালি করে কতই বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়? কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার উপায় শিল্পায়ন কিন্তু সিঙ্গাপুরে এজন্য কোন ট্রাডিশন ছিল না, দক্ষ জনবলের অভাব ছিল। শিল্প পণ্য বিক্রি করবেই বা কার কাছে? দুপাশে দুটো রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রতি নাখোশ। বড্ড কঠিন অবস্থা।

উপায়ান্তর না দেখে সিঙ্গাপুর আশে পাশের দেশগুলো পাশ কাটিয়ে বৃহত্তর বিশ্ব অর্থনীতির অঙ্গনের প্রতি দৃষ্টি প্রসারিত করে। লী কুয়ান ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেন এবং বহুজাতিক কোম্পানীদের শিল্প স্থাপনের জন্য সাদরে আমন্ত্রণ জানান।

কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা

সিঙ্গাপুর নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সহনীয় ট্যাক্সের হার ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় বাতাবরণ তৈরি করে।

এজন্য অবশ্য নাগরিকদের অনেক মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। স্বৈরাচারী সরকার বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে এও ঠিক, অমলেট বানাতে হলে ডিম ভাঙতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, মারের উপর ঔষধ নেই।

লী কুয়ান ডিম ভাঙ্গা নীতি অবলম্বন করেন। কাউকে মাদক ব্যবসা কিংবা দুর্নীতির জন্য ধরা পড়লে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু শ্রমিক ইউনিয়ন একীভূত করে একটি মাত্র ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। তারা সংঘর্ষের পরিবর্তে সরকারের সাথে সহযোগিতা করে। এক একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের কোনো সুযোগ রাখা হয় নাই। সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্টে লীর রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র অধিপতি। অভিমান করে সমাজতান্ত্রিক পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাতে লীর বয়েই গেল। বরং আপদ দূর হলো। দুই-এক জন বিরোধী দলের সাংসদদের পার্লামেন্টে বসে হাই তুলে ঝিমোনো ছাড়া তেমন কোনো দায়িত্ব ছিল না।

দক্ষিণ এশিয়ার মত সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক গণতন্ত্র, ধর্মের জিগির তুলে কেউ রাজনীতি কলুষিত কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করলে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। লোয়ার কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, রিট পিটিশন নানা বাহানায় আইনের জাল থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। ২০১০ সালে লী আমেরিকার এক সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন যে, ‘আমি বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কাউকে কাউকে আটকে রাখার জন্য দুঃখিত, কিন্তু দেশের স্বার্থটাই আমার কাছে বড় কথা।

কঠোর আইনের শাসন

সিঙ্গাপুরে আইনের শাসন বড় কড়া। রাস্তায় চকলেটের মোড়ক বা সিগারেটের বাকি অংশ রাস্তায় ফেললে জরিমানা ৩০০ সিঙ্গাপুর ডলার। (সিঙ্গাপুর ডলার ১=টাকা ৬৪, ইন্ডিয়ান রুপি ৫৫)। বিচিত্র কঠোর আইনের আরো কয়েকটা শোনা যাক। সে দেশে যাওয়ার আগে তা জানা থাকলে কাজে লাগবে।

সিঙ্গাপুরে ‌ রাস্তায় গান-বাজনা বা কুরুচিপূর্ণ সংগীত চর্চা করলে জরিমানা ও তিন মাস পর্যন্ত জেলের ঘানি টানতে হতে পারে। অন্য কারো ওয়াইফাইয়ে‌ সংযোগ করে হ্যাকিং করলে তিন বছরের জেল, ১০,০০০ ডলার জরিমানা।

রাস্তায় কবুতরকে উচ্ছিষ্ট খাবার খাওয়াতে নিক্ষেপ করলে জরিমানা ৫,০০০ ডলার। পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ না করে সটকে পড়লে জরিমানা ১৫০ ডলার।

জনসমাগমস্থলে ধূমপান করলে জরিমানা অন্তত ১৫০ ডলার। চুইংগাম নিষিদ্ধ; দোকানি চুইংগাম বিক্রি করলে জরিমানা ১০,০০০ ডলার।

রাস্তায় থুতু ফেললে জরিমানা ১,০০০ ডলার‌। কেউ দেখছে না ভেবে থুথ ফেললে, কোন এক অদৃশ্যালোক থেকে পুলিশ এসে হাজির হবে।

ফাঁকা লিফট পেয়ে মূত্রাশয়ের চাপ লঘু করতে যদি ভেবে থাকেন কেউ তো আর দেখছে না, কাজটা সেরে নেই, তাহলে ধরা খেয়ে যাবেন। লিফটে পেশাবের গন্ধ শোকার যন্ত্র লাগানো আছে। ব্যস, লিফটের দরজা বন্ধ পুলিশ এসে হাজির। তারপর জেল-জরিমানা।

এজন্য বলা হয় সিঙ্গাপুর ফাইন সিটি। ফাইনের এক অর্থ সুন্দর, অন্য অর্থ জরিমানা।

সিঙ্গাপুরের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে, ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প প্রসারের জন্য অবকাঠামো উন্নত। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কোন বাঁধা আমলে আনে নি। স্থানাভাবের কারণে মালয়েশিয়া থেকে মাটি কিনে এনে সমুদ্র ভরাট করে সিঙ্গাপুরে অত্যাধুনিক চাঙ্গি এয়ারপোর্ট তৈরি করেছ।

সিঙ্গাপুর চাঙ্গি এয়ারপোর্ট। মালয়েশিয়া থেকে মাটি আমদানি করে সমুদ্র ভরাট করে তৈরি করা হয়।

চাঙ্গি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ফ্লাওয়ার গার্ডে

অর্থনৈতিক সাফল্য

কঠোর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। ১৯৬০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র মার্কিন ডলার ৩২০। এখন সে দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে অনুমিত মাথাপিছু আয় ৬২,০০০ মার্কিন ডলার। অবিশ্বাস্য অর্জন বৈকি!

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামো

শিল্প-বাণিজ্য উন্নয়নের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর মানব সম্পদ উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রচুর সংখ্যক টেকনিক্যাল স্কুল খুলেছে, বিদেশ থেকে এক্সপোর্ট এনে তথ্যপ্রযুক্তি পেট্রোকেমিক্যাল ইলেকট্রনিক এবং অন্যান্য প্রয়োজন মোতাবেক দক্ষ জনবল গড়ে তুলেছে। আমাদের দেশের মত উদ্দেশ্যহীন ভাবে বাস্তবতাবিমুক ডিসিপ্লিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয় না।

সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। ওজনের ভিত্তিতে পণ্য ওঠানামা হিসেবে পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়, শুধু মাত্র সাংহাই বন্দরের পিছনে। উপমহাদেশের অনেক পণ্য বড় বড় জাহাজে প্রথমে সিঙ্গাপুরে এনে ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়।

সিঙ্গাপুর সমুদ্র বন্দর। সিঙ্গাপুরের দুটো সমুদ্র বন্দর পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দর।

পর্যটন শিল্প উন্নয়ন করার জন্য অনেক ধরনের আকর্ষণীয় ভ্রমণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বছরে প্রায় এক কোটি ভ্রমণপিপাসু মানুষ সিঙ্গাপুরে আসে। সম্প্রতি পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বহুমুখী দুটো ক্যাসিনো উদ্বোধন করা হয়েছে।

আলো ঝলমল বিলাসবহুল হোটেল

সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং যুগোপযোগী। সুইজারল্যান্ডের অনেক আমানত এখন সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের কালো টা আন্তর্জাতিক অর্থ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে লেনদেনের জন্য সিঙ্গাপুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে আশেপাশের দেশ থেকে অজস্র মানুষ ভিড় জমায়। সে ভীড়ে যোগ দেয় বাংলাদেশের বিত্তবানরা। শোনা যায়, একবার লি কোয়ান কোন একটা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিদেশে চিকিৎসা করার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। নিজ দেশেই সে অসুখের চিকিৎসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ হন।

আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিখ্যাত মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল

দীর্ঘ ২৫ বছর কঠোর হস্তে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে লী ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন তবে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসাবে ২০০৪ সাল নাগাদ শাসনকার্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সার্বিক মূল্যায়ন

১৯৬০ সালে যেখানে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৩২০ মার্কিন ডলার, তা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। লি কুয়ান ইউ-এর কঠোর কিন্তু দূরদর্শী নীতি প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ দিয়ে একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

রেড ইন্ডিয়ান

নিউজ ডেস্ক

August 2, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীদের বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (Red Indian) নামে ডাকা হলেও আধুনিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও সামাজিক পরিমণ্ডলে শব্দটি একটি বর্ণবাদী গালি ও চরম অবমাননাকর ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে গণ্য হয়। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের পর শতাব্দীর গণহত্যা, ভূমি দখল ও সামাজিক প্রান্তিকতা পেরিয়ে আমেরিকার আদিবাসীরা (Native Americans) আজ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের একটি বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১. নামকরণের ভুল ইতিহাস ও বর্ণবাদী উৎস

‘রেড ইন্ডিয়ান’ শব্দটি কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির নাম নয়, বরং এটি ১৪৯২ সালে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের দুটি মারাত্মক ভুলের ঐতিহাসিক ফসল:

  • কলম্বাসের ভুল (ইন্ডিয়ান শব্দটির উৎপত্তি): ১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতে পৌঁছানোর বিকল্প জলপথ খুঁজতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। তিনি ভেবেছিলেন এটি ভারত (India); ফলে স্থানীয় অধিবাসীদের ‘ইন্ডিয়ান’ বলে সম্বোধন শুরু করেন। পরবর্তীতে নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি প্রমাণ করেন যে এটি ভারত নয়, এক নতুন মহাদেশ—যার নাম রাখা হয় ‘আমেরিকা’।
  • ‘রেড’ বা লাল শব্দের উৎস: আমেরিকার বোথুক (Beothuk) উপজাতির মানুষেরা শরীরে লালচে মাটির রঞ্জক (Red Ochre) ব্যবহার করত। তাদের দেখে ইউরোপীয়রা ‘লাল মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দেয়। পরবর্তীতে শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকরা নিজেদের (White) থেকে শোষিত আদিবাসীদের আলাদা করতে গায়ের তামাটে রঙের জন্য ‘রেড স্কিন’ বা ‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলা শুরু করে।

সংজ্ঞায়ন: বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই অপমানজনক শব্দটি বর্জন করে তাদের ‘নেটিভ আমেরিকান’ (Native American), ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান’ (American Indian) অথবা ‘ফার্স্ট নেশনস’ (First Nations) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

২. সংরক্ষিত এলাকা (Reservation System) ও বর্তমান জীবনযাত্রা

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ নেটিভ আমেরিকান। তাদের আধুনিক জীবনযাপন ও সমাজব্যবস্থার প্রধান রূপরেখা:

  • ট্রাইবাল সার্বভৌমত্ব: আমেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী সরকার নির্ধারিত ৩২৬টি ‘ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন’ (Indian Reservations) এলাকায় বাস করেন। তাঁদের নিজস্ব উপজাতীয় সরকার (Tribal Government), পুলিশ, আদালত ও কর ব্যবস্থা রয়েছে।
  • ক্যাসিনো অর্থনীতি ও দারিদ্র্য: ১৯৮৮ সালের আইনের পর বহু আদিবাসী গোষ্ঠী সংরক্ষিত অঞ্চলে জুয়া বা ক্যাসিনো বাণিজ্য শুরু করে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করলেও অনেক রিজার্ভেশন এলাকা এখনো চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের শিকার।
  • সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংকট: রিজার্ভেশনগুলোতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, মাদকাসক্তি এবং আদিবাসী নারীদের নিখোঁজ ও সহিংসতার হার আমেরিকার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
  • কৃষি ও মানবজাতিকে দান: আলু, ভুট্টা, চকোলেট (কোকো) এবং কোকার মতো বিশ্বখ্যাত ফসলগুলো মূলত আদিবাসী নেটিভ আমেরিকানদের হাজার বছরের কৃষিব্যবস্থার অনন্য অবদান।

৩. ঐতিহাসিক আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট (AIM)

১৯৬৮ সালে গঠিত ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট’ (AIM) আদিবাসীদের অধিকার অর্জনে ৩টি ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করে:

[১৯৬৯: আলকাটরাজ দ্বীপ দখল (১৯ মাস)] ➔ [১৯৭২: ট্রেইল অব ব্রোকেন ট্রিটিজ (২০ দফা দাবি)] ➔ [১৯৭৩: উন্ডেড নি সামরিক প্রতিরোধ (৭১ দিন)]
  • আলকাটরাজ দ্বীপ দখল (১৯৬৯-১৯৭১): সাবেক ফেডারেল কারাগার আলকাটরাজ দখল করে আদিবাসীরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়েন।
  • ট্রেইল অব ব্রোকেন ট্রিটিজ (১৯৭২): ওয়াশিংটনে ‘ভগ্ন চুক্তিসমূহের পথ’ পদযাত্রার মাধ্যমে সরকার কর্তৃক চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে ২০ দফা দাবি তোলা হয়।
  • উন্ডেড নি প্রতিরোধ (১৯৭৩): ১৮৯০ সালের গণহত্যা স্থান সাউথ ড্যাকোটার ‘উন্ডেড নি’-তে দীর্ঘ ৭১ দিন এফবিআই ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নেন আদিবাসীরা।
  • অর্জন: এই সংগ্রামের ফলেই ১৯৭৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান সেলফ-ডিটারমিনেশন অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা তাদের শিক্ষা ও স্থানীয় স্বশাসনের আইনি অধিকার ফিরিয়ে দেয়।

৪. আধুনিক মার্কিন রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা

দীর্ঘদিনের প্রান্তিকতা কাটিয়ে নেটিভ আমেরিকানরা এখন মার্কিন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক বা ‘সুইং ভোটার’:

  • ঐতিহাসিক ক্যাবিনেট পদ: ২০২১ সালে ডেব হাল্যান্ড (Deb Haaland) প্রথম নেটিভ আমেরিকান হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of the Interior) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে।
  • কংগ্রেসে শক্তিশালী উপস্থিতি: টম কোল ও শারিস ডেভিডসের মতো নেতারা মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
  • ‘সুইং স্টেটে’ প্রভাব: অ্যারিজোনা, নেভাদা, নিউ মেক্সিকো ও নর্থ ড্যাকোটার মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের রাজ্যগুলোতে আদিবাসী ভোট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও সিনেট নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখছে।

পবিত্র জমি রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদেই মূলত আদিবাসীরা আজ নিজেদের ট্রাইবাল স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্দখল করতে সক্ষম হচ্ছে।

তালেবানের

নিউজ ডেস্ক

August 1, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গত তিন দশকে যেসব রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী গভীর প্রভাব ফেলেছে, তার মধ্যে আফগানিস্তানের ‘তালেবান’ আন্দোলন অন্যতম। ১৯৯৪ সালে কান্দাহারে ক্ষুদ্র এক ছাত্র আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা গোষ্ঠীটি আজ আফগানিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের প্রথম শাসনকাল, ৯/১১ পরবর্তী মার্কিন সামরিক অভিযান, দীর্ঘ ২০ বছরের গেরিলা যুদ্ধ, দোহা চুক্তি এবং অবশেষে ২০২১ সালে পুনরায় ক্ষমতা দখল—তালেবানের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা বৈশ্বিক রাজনীতির এক জটিল অধ্যায়। বর্তমানে আফগানিস্তানের শাসনভার পরিচালনা করলেও অভ্যন্তরীণ নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে নারী অধিকার প্রশ্নে জাতিসংঘ ও মুসলিম বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

১. সূচনা ও কান্দাহারে উত্থান (১৯৯৪–১৯৯৬)

পশতু ভাষায় ‘তালেবান’ শব্দটির অর্থ “শিক্ষার্থী” বা “জ্ঞান অন্বেষণকারী” (একবচনে তালেব)।

  • প্রেক্ষাপট: ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। অরাজকতা ও গৃহযুদ্ধের পেটে চলে যাওয়া সাধারণ মানুষকে মুক্তির আশ্বাস দিয়ে তালেবানের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
  • গঠন: ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহার প্রদেশে মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে মাত্র ৫০ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।
  • কাবুল জয়: ১৯৯৬ সালে তারা রাজধানী কাবুল দখল করে আফগানিস্তানকে ‘ইসলামিক আমিরাত’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৯৮ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৯০% অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

২. প্রথম শাসনকাল ও হঠাৎ পতন (১৯৯৬–২০০১)

তালেবানের প্রথম শাসনকাল কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ছিল। দক্ষিণ এশীয় দেওবন্দি ভাবধারা ও স্থানীয় ‘পশতুনওয়ালি’ প্রথার মিশ্রণে বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয়।

[৯/১১ হামলা (২০০১)] ➔ [ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তরে অস্বীকৃতি] ➔ [মার্কিন আক্রমণ (অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম)] ➔ [তালেবানের পতন]

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। তালেবান সরকার তা প্রত্যাখ্যান করলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে।

৩. রূপান্তর, গেরিলা যুদ্ধ ও ক্ষমতার পুনর্দখল (২০০২–২০২১)

ক্ষমতা হারানোর পর তালেবান সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে নিজেদের নতুনভাবে পুনর্গঠিত করে।

  • সুদীর্ঘ আন্দোলন: দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তারা মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রচ্ছন্ন ও সরাসরি যুদ্ধ অব্যাহত রাখে।
  • নেতৃত্বের পরিবর্তন: প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পর (যা ২০১৫ সালে প্রকাশ পায়) আখতার মোহাম্মদ মনসুর নেতৃত্ব নেন। ২০১৬ সালে ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হলে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা দায়িত্বে আসেন।
  • দোহা চুক্তি (২০২০): ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পথ সুগম হয়।
  • কাবুল পতন (১৫ আগস্ট, ২০২১): ২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে আশাতীত গতিতে আফগান সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ত্যাগ করলে তালেবান দ্বিতীয়বারের মতো কাবুলের ক্ষমতা পুনর্দখল করে।

৪. নারী অধিকার ইস্যুতে জাতিসংঘের কঠোর পদক্ষেপ

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দফার তুলনায় কূটনীতিতে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে জাতিসংঘ (UN) তালেবান প্রশাসনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে:

১. ‘লিঙ্গ বর্ণবাদ’ (Gender Apartheid) স্বীকৃতি: জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ আফগান নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিধিনিষেধকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘লিঙ্গ বর্ণবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২. নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৭২১: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আফগানিস্তানের আসন তালেবান প্রতিনিধিদের দেওয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—মানবাধিকার ও নারী অধিকার পূরণ ছাড়া কোনো বৈশ্বিক স্বীকৃতি মিলবে না।

৩. ভ্রমণ ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ শীর্ষ তালেবান নেতাদের ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণের কঠোর নীতি বহাল রেখেছে।

৫. তালেবানের নীতি নিয়ে ওআইসি (OIC) ও মুসলিম বিশ্বের অবস্থান

তালেবান নিজেদের শাসনকে সম্পূর্ণ শরিয়াহ সম্মত দাবি করলেও, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC) সহ শীর্ষ মুসলিম দেশগুলো তাদের নারী নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছে:

দেশ / সংস্থাকূটনৈতিক অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া
ওআইসি (OIC)সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিষিদ্ধ করা ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী। তাঁরা আলেমদের বিশেষ প্রতিনিধি দল আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে।
সৌদি আরবইসলামের প্রসূতিভূমি হিসেবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে অবিলম্বে আফগান নারীদের শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
কাতারদোহা আলোচনার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হলেও কাতার সরকার প্রকাশ্যে তালেবানের নারী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে এবং আফগান নারীদের জন্য বিকল্প উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে।
তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়াতুরস্ক এ জাতীয় সিদ্ধান্তকে ‘অমানবিক ও ইসলাম বিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে। বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া আফগান নারীদের সহায়তায় বিশেষ শিক্ষা তহবিল গঠন করেছে।

৬. বর্তমান বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকে তালেবান প্রশাসন আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

যদিও চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তানের মতো বেশ কিছু প্রতিবেশী দেশ কাবুলে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, তবে বিশ্বের কোনো দেশই এখন পর্যন্ত এই সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ফ্রিজ থাকায় অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট মোকাবিলাই এখন কাবুলের নতুন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নোবেল

নিউজ ডেস্ক

August 1, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

১৯০১ সালে সর্বপ্রথম আলফ্রেড নোবেলের উইলের ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। মানবজাতির কল্যাণে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচটি ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রথমবার এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস ও বিজয়ীদের সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সুইডিশ বিজ্ঞানী এবং ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে তাঁর একটি উইলে এই পুরস্কারের ঘোষণা দেন। তিনি তাঁর মোট সম্পত্তির একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৯৪%) এই পুরস্কার তহবিলের জন্য রেখে যান। উদ্দেশ্য ছিল—পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শান্তিতে যারা মানবজাতির জন্য সর্বোচ্চ অবদান রাখবেন, তাঁদের পুরস্কৃত করা। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর ১৯০১ তারিখে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

১৯০১ সালের প্রথম নোবেল বিজয়ীদের তালিকা

  • পদার্থবিজ্ঞান: উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন (জার্মানি)

উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন (Wilhelm Conrad Röntgen) ছিলেন একজন প্রখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৮৯৫ সালে তাঁর যুগান্তকারী এক্স-রে (X-ray) আবিষ্কারের জন্য ১৯০১ সালে তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

তাঁর এই আবিষ্কার এবং জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. এক্স-রে (X-ray) আবিষ্কারের ঘটনা

  • সাল: ১৮৯৫ সালের ৮ নভেম্বর।
  • ঘটনা: জার্মানির ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ল্যাবরেটরিতে একটি ক্যাথোড রশ্মি টিউব (Cathode-ray tube) নিয়ে পরীক্ষা করার সময় তিনি হঠাৎ লক্ষ্য করেন, কালো কাগজে ঢাকা টিউবটির পাশে থাকা একটি ফ্লুরোসেন্ট পর্দা জ্বলজ্বল করছে।
  • নামকরণ: তিনি বুঝতে পারেন টিউব থেকে এক ধরণের অজানা অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হচ্ছে, যা কাগজ ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এই রশ্মির প্রকৃতি তখন অজানা থাকায় গণিতের অজানা রাশির প্রতীক হিসেবে তিনি এর নাম দেন ‘X-ray’ বা এক্স-রশ্মি (অনেক দেশে একে ‘রন্টজেন রশ্মি’ও বলা হয়)।

২. প্রথম মানব এক্স-রে

রন্টজেন তাঁর এই আবিষ্কারের পর প্রথম মানবদেহের এক্স-রে ছবি তোলেন। সেটি ছিল তাঁর স্ত্রী আনা বার্থা রন্টজেন-এর হাতের ছবি। ছবিতে তাঁর স্ত্রীর হাতের হাড় এবং আঙুলে পরা বিয়ের আংটিটি স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। এই ছবি দেখে তাঁর স্ত্রী অবাক হয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে ফেলেছি!”

৩. নিঃস্বার্থ বিজ্ঞানী

রন্টজেন তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কোনো প্যাটেন্ট (Patent) বা স্বত্ব নেননি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই আবিষ্কার যেন মানবজাতির কল্যাণে বিনামূল্যে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং শিল্পকারখানায় এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে তাঁর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থও তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজের জন্য দান করে দিয়েছিলেন।

  • রসায়ন: ইয়াকুবুস হেনরিকুস ভান্ট হফ (নেদারল্যান্ডস)

ইয়াকুবুস হেনরিকুস ভান্ট হফ (Jacobus Henricus van ‘t Hoff) ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত ডাচ রসায়নবিদ এবং আধুনিক ভৌত রসায়নের (Physical Chemistry) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০১ সালে তরল পদার্থের রাসায়নিক গতিবিদ্যা এবং অসমোটিক চাপ সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

তাঁর প্রধান অবদান এবং বিজ্ঞান জগতে তাঁর প্রভাবের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. নোবেল পাওয়ার মূল কারণ (রাসায়নিক গতিবিদ্যা ও অসমোটিক চাপ)

  • রাসায়নিক গতিবিদ্যা (Chemical Dynamics): ভান্ট হফ দেখান কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বা বেগ নির্ধারিত হয় এবং কীভাবে তাপমাত্রা ও চাপ এই গতিকে প্রভাবিত করে। তাঁর তৈরি করা সমীকরণগুলো বিক্রিয়ার হার বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করে।
  • অসমোটিক চাপ (Osmotic Pressure): তিনি প্রমাণ করেন যে, কোনো তরল দ্রবণে দ্রবীভূত কণাগুলো (যেমন পানিতে চিনি) ঠিক গ্যাসের কণার মতোই আচরণ করে। তিনি গ্যাসের আদর্শ সমীকরণকে (\(PV=nRT\)) দ্রবণের ক্ষেত্রেও সফলভাবে প্রয়োগ করেন, যা রসায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে।

২. স্টেরিওকেমিস্ট্রি বা ত্রিমাত্রিক রসায়নের জনক

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অনেক আগেই, ১৮৭৪ সালে তিনি রসায়নে এক বিপ্লবী তত্ত্ব দেন। তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন যে, কার্বন পরমাণুর চারটি যোজ্যতা বা বন্ড ত্রিমাত্রিক মহাকাশে একটি চতুস্তলক (Tetrahedron) আকৃতিতে বিন্যস্ত থাকে।

  • গুরুত্ব: তাঁর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই রসায়নের একটি সম্পূর্ণ নতুন শাখা ‘স্টেরিওকেমিস্ট্রি’ (Stereochemistry) গড়ে ওঠে। এটি ছাড়া আজকের আধুনিক ওষুধ বা মেডিসিন তৈরি করা অসম্ভব হতো।

৩. ভ্যান্ট হফ ফ্যাক্টর (\(i\))

রসায়নে তাঁর নামানুসারে ‘ভ্যান্ট হফ ফ্যাক্টর’ (van ‘t Hoff factor) ব্যবহার করা হয়। কোনো দ্রাবকে (যেমন পানিতে) কোনো লবণ বা যৌগ যোগ করলে তা কতটুকু ভেঙে যায় বা যুক্ত হয়, তা পরিমাপ করার জন্য এই ফ্যাক্টরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • চিকিৎসাবিজ্ঞান: এমিল ফন বেহরিং (জার্মানি)

এমিল ফন বেহরিং (Emil von Behring) ছিলেন একজন প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ব্যাকটেরিয়াবিদ। ১৯০১ সালে ডিপথেরিয়া রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সিরাম থেরাপি (Serum Therapy) আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

তৎকালীন সময়ে শিশুদের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক এক ব্যাধি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করায় তাঁকে “শিশুদের রক্ষাকর্তা” (Savior of Children) হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর প্রধান অবদান এবং জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. ডিপথেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সিরাম থেরাপি

  • পটভূমি: উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ‘ডিপথেরিয়া’ (Diphtheria) ছিল শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার শিশু শ্বাসকষ্টে মারা যেত।
  • আবিষ্কার: এমিল ফন বেহরিং এবং তাঁর সহকর্মীরা (যার মধ্যে জাপানি বিজ্ঞানী কিতাসাতো শিবাসাবুরো অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) আবিষ্কার করেন যে, ডিপথেরিয়া আক্রান্ত পশুর (যেমন ঘোড়া) রক্তে এক ধরণের প্রতিরক্ষামূলক উপাদান তৈরি হয়। তিনি এই উপাদানটির নাম দেন ‘অ্যান্টিটক্সিন’ (Antitoxin)
  • প্রয়োগ: এই অ্যান্টিটক্সিন সমৃদ্ধ সিরাম যখন আক্রান্ত কোনো শিশুর শরীরে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হতো, তখন তা ডিপথেরিয়ার মারাত্মক বিষকে নিষ্ক্রিয় করে দিত। ১৮৯২ সালে প্রথমবার বাণিজ্যিকভাবে এই সিরামের উৎপাদন শুরু হয় এবং এটি রাতারাতি ডিপথেরিয়ায় মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।

২. নোবেল পুরস্কার অর্জন (১৯০১)

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলেই ১৯০১ সালে প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেলটি তাঁর হাতে ওঠে। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, “শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সিরাম থেরাপি নিয়ে তাঁর কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে, যার মাধ্যমে রোগ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার পেয়েছে মানবজাতি।”

৩. ধনুষ্টংকার বা টিটেনাসের প্রতিষেধক

ডিপথেরিয়ার পাশাপাশি এমিল ফন বেহরিং ধনুষ্টংকার বা টিটেনাস (Tetanus) রোগের অ্যান্টিটক্সিন তৈরিতেও সফল হয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের টিটেনাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে তাঁর তৈরি এই প্রতিষেধক লাখ লাখ প্রাণ রক্ষা করেছিল।

  • সাহিত্য: সুলি প্রুদোম (ফ্রান্স)

সুলি প্রুদোম (Sully Prudhomme) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ফরাসি কবি এবং প্রাবন্ধিক। ১৯০১ সালে তাঁর কাব্যিক রচনার বিশেষ গুণ, উচ্চ আদর্শ এবং হৃদয়ের গভীর অনুভূতির অনন্য প্রকাশের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং নোবেল জয়ের পটভূমি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মূল কারণ

নোবেল কমিটি ১৯০১ সালে সুলি প্রুদোমকে পুরস্কৃত করার সময় তাঁর লেখার তিনটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছিল:

  • উচ্চ আদর্শবাদ (High Idealism): তাঁর কবিতা কেবল বিনোদনের জন্য ছিল না, বরং এতে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ এবং আদর্শের প্রতিফলন ঘটত।
  • শৈল্পিক নিখুঁততা (Artistic Perfection): তাঁর শব্দ চয়ন এবং কবিতার ছন্দ ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত ও নিখুঁত।
  • হৃদয় ও বুদ্ধির সমন্বয়: তিনি তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন গভীর মানবিক অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

২. পারনাসিয়ান আন্দোলন (Parnassian Movement)

সুলি প্রুদোম ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘পারনাসিয়ান’ সাহিত্য আন্দোলনের একজন প্রধান কবি ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল “শিল্পের জন্য শিল্প” (Art for art’s sake)। রোমান্টিক যুগের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতার বিপরীতে গিয়ে তাঁরা কবিতায় নিখুঁত গঠন, সংযম এবং ধ্রুপদী সৌন্দর্যের ওপর জোর দিতেন।

৩. বিখ্যাত কবিতা ও সৃষ্টিকর্ম

  • ‘লা ভাস’ (La Vase Brisé – ভাঙা ফুলদানি): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক কবিতা। একটি ভাঙা ফুলদানির উপমার মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয়ের ভেতরের গোপন কষ্ট এবং ভাঙনের গল্প অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • দার্শনিক কাব্য: পরবর্তী জীবনে তিনি বিজ্ঞান এবং দর্শনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তাঁর ‘লা জাস্টিস’ (La Justice – ন্যায়বিচার) এবং ‘লে হ্যুরো’ (Les Bonheurs – সুখ) কাব্যগ্রন্থে মানুষের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্ব নিয়ে গভীর দার্শনিক চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে।

৪. ঐতিহাসিক বিতর্ক

১৯০১ সালে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুলি প্রুদোমকে মনোনীত করা হলে সাহিত্য বিশ্বে একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সমসাময়িক অনেক লেখক এবং সমালোচক মনে করেছিলেন যে, রাশিয়ার বিশ্ববিখ্যাত ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় (যিনি ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ও ‘আনা কারেনিনা’ লিখেছেন) এই পুরস্কারের জন্য বেশি যোগ্য ছিলেন। এমনকি সুইডেনের ৪২ জন বিশিষ্ট লেখক সুলি প্রুদোম নোবেল পাওয়ার পর টলস্টয়ের কাছে একটি দুঃখপ্রকাশ পত্রও পাঠিয়েছিলেন। তবে প্রুদোম তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের অর্থের একটি বড় অংশ তরুণ ফরাসি কবিদের সহায়তার জন্য একটি তহবিল গঠনে দান করে উদারতার পরিচয় দেন।

  • শান্তি: জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (সুইজারল্যান্ড) এবং ফ্রেদেরিক প্যাসি (ফ্রান্স)

জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো এবং ফ্রেদেরিক প্যাসি ১৯০১ সালে যৌথভাবে ইতিহাসের প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন。 মানবজাতির কল্যাণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিকতা বজায় রাখার জন্য এই দুই ব্যক্তিত্বের অবদান ছিল অতুলনীয়।

তাঁদের ব্যক্তিগত অবদান এবং নোবেল জয়ের ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:

১. জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (Jean Henri Dunant) – সুইজারল্যান্ড

জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (যাঁকে হেনরি ডুনান্ট নামেও ডাকা হয়) ছিলেন একজন সুইস ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। তাঁকে মূলত রেড ক্রস-এর জনক বলা হয়।

  • সলফেরিনোর যুদ্ধ (১৮৫৯): ব্যবসায়িক কাজে ইতালি যাওয়ার পথে দ্যুনো ‘সলফেরিনোর যুদ্ধ’ প্রত্যক্ষ করেন। সেখানে প্রায় ৪০,০০০ সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছিল। এই ভয়াবহতা দেখে তিনি স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে আহত সৈনিকদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সেবা করার উদ্যোগ নেন।
  • রেড ক্রস প্রতিষ্ঠা (১৮৬৩): এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘এ মেমোরি অব সলফেরিনো’ নামে একটি বই লেখেন। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৮৬৩ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি’ (ICRC) প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • জেনেভা কনভেনশন (১৮৬৪): যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের অধিকার এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁর প্রচেষ্টায় প্রথম ‘জেনেভা কনভেনশন’ স্বাক্ষরিত হয়।

২. ফ্রেদেরিক প্যাসি (Frédéric Passy) – ফ্রান্স

ফ্রেদেরিক প্যাসি ছিলেন একজন ফরাসি অর্থনীতিবিদ এবং শান্তিকামী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা।

  • লিগ অব পিস প্রতিষ্ঠা: তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮৬৭ সালে ফ্রান্সে ‘লিগ অব পিস’ (Ligue internationale et permanente de la paix) প্রতিষ্ঠা করেন।
  • ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU): ১৮৮৯ সালে তিনি ব্রিটিশ শান্তিকামী র্যান্ডাল ক্রেমারের সাথে যৌথভাবে ‘ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’ (IPU) গঠন করেন। এটি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত প্রথম বড় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তর্জাতিক বিরোধগুলো যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে মেটাতে কাজ করত।

কেন তাঁরা যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছিলেন?

নোবেল কমিটি ১৯০১ সালে প্রথম শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সময় দুই ধরণের অবদানকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিল:

  1. জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো: যুদ্ধের ময়দানে মানুষের কষ্ট লাঘব এবং মানবিক নিয়ম নীতি তৈরির জন্য।
  2. ফ্রেদেরিক প্যাসি: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • অর্থনীতিতে নোবেল: ১৯০১ সালে অর্থনীতিতে কোনো নোবেল পুরস্কার ছিল না। ১৯৬৮ সালে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব সুইডেন এই বিভাগটি চালু করে এবং ১৯৬৯ সালে প্রথম অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হয়।
  • পুরস্কারের স্থান: শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়ের ওসলো থেকে এবং বাকি পুরস্কারগুলো দেওয়া হয় সুইডেনের স্টকহোম থেকে।

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩) — সাহিত্যে নোবেল

  • ইতিহাস গড়া অর্জন: তিনি কেবল প্রথম বাঙালিই নন, বরং সমগ্র এশিয়ার মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
  • মূল অবদান: তাঁর অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ (Song Offerings)-এর ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি তাঁর লেখাকে “অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাজা এবং সুন্দর কবিতা” হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
  • আরেকটি অনন্য কীর্তি: তিনি বিশ্বের একমাত্র কবি, যাঁর লেখা গান দুটি ভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়—বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ভারতের ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’।

২. অমর্ত্য সেন (১৯৯৮) — অর্থনীতিতে নোবেল

  • নতুন ধারার অর্থনীতি: তিনি প্রচলিত অর্থনীতির বাইরে গিয়ে ‘কল্যাণ অর্থনীতি’ (Welfare Economics) এবং দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
  • মূল দর্শন: তিনি দেখিয়েছিলেন যে, দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের অভাবে হয় না, বরং খাদ্য বণ্টনের অসমতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অভাবের কারণে ঘটে। তাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

৩. ড. মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬) — শান্তিতে নোবেল

  • দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে তিনি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
  • মূল অবদান: ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ম বদলে দিয়ে জামানত ছাড়াই দরিদ্র মানুষকে, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit) দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনের এক নতুন মডেল তৈরি করেন। (বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন)।

১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ