ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ এভিয়েশন ও প্রতিরক্ষা সামরিক বিশ্লেষণ
উপস্থাপনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আকাশজয়ের গল্প মানবসভ্যতার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়গুলোর একটি। কাঠের ফ্রেমের প্রাথমিক বিমান থেকে শুরু করে আজকের হাইপারসনিক ইঞ্জিন এবং চতুর্থ/পঁচিশ প্রজন্মের আধুনিক ফাইটার জেট—এভিয়েশন প্রযুক্তির এই দ্রুত বিবর্তন বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।

নিচে বিমানের আবিষ্কার, জেট ইঞ্জিনের বৈজ্ঞানিক রূপরেখা, বিভিন্ন ইঞ্জিনের প্রকারভেদ এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (BAF) বিদ্যমান সক্ষমতা ও প্রযুক্তির একটি বিস্তারিত তথ্যকোষ তুলে ধরা হলো।
১. বিমানের আবিষ্কার ও সূচনালগ্ন

বিশ্বের প্রথম সফল মোটরচালিত ও নিয়ন্ত্রিত বিমান আবিষ্কার করেন আমেরিকান দুই ভাই—উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট (Wright Brothers)।
- ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর।
- স্থান: কিটি হক, উত্তর ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র (Kitty Hawk, North Carolina)।
- প্রথম উড্ডয়ন: তাদের নির্মিত ঐতিহাসিক বিমান ‘রাইট ফ্লাইয়ার’ (Wright Flyer) মাত্র ১২ সেকেন্ডে ১২০ ফুট পথ পাড়ি দিয়েছিল। বিমানের প্রথম পাইলট ছিলেন অরভিল রাইট।
২. জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার ও জেট এজের (Jet Age) সূচনা
প্রপেলার ইঞ্জিনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিমানের গতি দ্বিগুণ করতে আগমন ঘটে জেট ইঞ্জিনের।
- উদ্ভাবক: ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার ফ্রাঙ্ক হুইটল (Sir Frank Whittle) ১৯৩০ সালে প্রথম জেট ইঞ্জিনের পেটেন্ট করেন। অন্যদিকে, জার্মানির বিজ্ঞানী হ্যান্স ভন ওহাইন (Hans von Ohain) স্বাধীনভাবে আরেকটি সফল ডিজাইন তৈরি করেন।
- প্রথম জেট বিমান: হ্যান্স ভন ওহাইনের ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে ১৯৩৯ সালের ২৭ আগস্ট বিশ্বের প্রথম জেট চালিত বিমান ‘হেইঙ্কেল হি ১৭৮’ (Heinkel He 178) সফলভাবে আকাশে ওড়ে।
- সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োগ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৪৪) জার্মানির Messerschmitt Me 262 প্রথম ফাইটার জেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হয় যাত্রীবাহী বিমানে জেট ইঞ্জিনের ব্যবহার, যা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে বিপ্লব ঘটায়।
৩. জেট ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে?

জেট ইঞ্জিন মূলত স্যার আইজ্যাক নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র—“প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে” (Action and Reaction)—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ জেট ইঞ্জিনের ৪টি প্রধান ধাপ │
├──────────────┬──────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ধাপ │ কার্যপদ্ধতি │
├──────────────┼──────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. Intake │ সামনের পাখা দিয়ে প্রচুর বাতাস ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। │
│ ২. Compression│ কম্প্রেসর ব্লেড দিয়ে বাতাসকে তীব্র সংকুচিত করা হয়। │
│ ৩. Combustion│ সংকুচিত বাতাসে জ্বালানি মিশিয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।│
│ ৪. Exhaust │ পেছনের নজেল দিয়ে তীব্র গতিতে উত্তপ্ত গ্যাস বের হয়ে ধাক্কা তৈরি করে।│
└──────────────┴──────────────────────────────────────────────────────────┘
৪. বিভিন্ন প্রকার জেট ইঞ্জিন ও সেগুলোর ব্যবহার

গঠন ও কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে জেট ইঞ্জিনকে প্রধানত ৬টি ভাগে ভাগ করা হয়:
| ইঞ্জিনের ধরন | প্রধান বৈশিষ্ট্য | ব্যবহার |
| টার্বোজেট (Turbojet) | প্রাথমিক ও সাধারণ ক্রুড প্রযুক্তি, বেশি শব্দ ও জ্বালানি খরচ। | পুরোনো ফাইটার জেট ও রকেট। |
| টার্বোফ্যান (Turbofan) | সামনে বড় ফ্যান থাকে, বাইপাস এয়ার প্রডিউস করে। কম শব্দ ও অত্যন্ত সাশ্রয়ী। | আধুনিক কমার্শিয়াল বোয়িং/এয়ারবাস ও modern ফাইটার। |
| টার্বোপ্রপ (Turboprop) | জেট শক্তির ৯০% দিয়ে বাইরের প্রপেলার বা পাখা ঘোরানো হয়। | কম দূরত্বের আঞ্চলিক যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান। |
| টার্বোশ্যাফট (Turboshaft) | শক্তি ব্যবহার করে ইন্টারনাল শ্যাফটের সাহায্যে রোটর ব্লেড ঘোরানো হয়। | প্রধানত হেলিকপ্টার এবং কিছু যুদ্ধজাহাজ/ট্যাংক। |
| র্যামজেট (Ramjet) | কোনো চলন্ত পার্টস নেই; উচ্চগতিতে বাতাস ভেতরে এসে সংকুচিত হয়। | মিসাইল ও সুপারসনিক ড্রোন। |
| স্ক্যামজেট (Scramjet) | শব্দের চেয়ে ৫-১০ গুণ বেশি গতিতে সুপারসনিক কমবাশ্চন ঘটায়। | হাইপারসনিক মিসাইল ও আধুনিক মহাকাশযান। |
৫. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে (BAF) ব্যবহৃত বিমান ও ইঞ্জিন প্রযুক্তি

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাদের আকাশসীমা প্রতিরক্ষা, পরিবহন এবং অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করতে ৪ ধরণের আধুনিক ইঞ্জিন ব্যবহার করে থাকে:
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ফ্লিট ও ইঞ্জিন │
├──────────────────┬─────────────────────────────┬────────────────────────┤
│ ইঞ্জিনের ধরন │ বিমানের নাম │ উৎস দেশ │
├──────────────────┼─────────────────────────────┼────────────────────────┤
│ ১. টার্বোজেট │ চেংডু এফ-৭ (Chengdu F-7) │ চীন │
│ ২. টার্বোফ্যান │ মিগ-২৯ (MiG-29B/UB) │ রাশিয়া │
│ │ ইয়াক-১ ৩০ (Yak-130) │ রাশিয়া │
│ │ কে-৮ডব্লিউ (K-8W Trainer) │ চীন / পাকিস্তান │
│ ৩. টার্বোপ্রপ │ সি-১৩০জে (C-130J Hercules) │ আমেরিকা │
│ │ অ্যান্টনভ অ্যান-৩২ (An-32) │ রাশিয়া │
│ ৪. টার্বোশ্যাফট │ এমআই-১৭/১৭১ (MiG Mi-171SH) │ রাশিয়া │
│ │ বেল-২১২ (Bell 212) │ আমেরিকা │
│ │ এডব্লিউ-১৩৯ (AW139) │ ইতালি │
└──────────────────┴─────────────────────────────┴────────────────────────┘
বিশেষ সংযোজন: প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা অর্জনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নিজস্ব ইউনিটে UAV বা ড্রোন অ্যাসেম্বলি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।
৬. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও ফোর্সেস গোল (Forces Goal)
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আকাশ সুরক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো এর মাল্টিরোল ফাইটার ও ইন্টারসেপ্টর ফ্লিট:
- মিগ-২৯বিএম (MiG-29BM): এটি রাশিয়ার তৈরি চতুর্থ প্রজন্মের অত্যন্ত চটপটে একটি মাল্টিরোল ফাইটার জেট। বর্তমানে বেলারুশের আধুনিকীকরণের পর এর সার্ভিস লাইফ ও রাডার ক্যাাপাবিলিটি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- এফ-৭ বিজিআই (F-7BGI): এটি চীনে নির্মিত একটি অল-ওয়েদারInterceptor ফাইটার। এর আধুনিক এভিওনিক্স, গ্লাস ককপিট এবং গাইডেড ওয়েপন ক্যাাপাবিলিটি পয়েন্ট ডিফেন্সের জন্য বেশ উপযোগী।
- ভবিষ্যৎ আধুনিকীকরণ: বিমানবাহিনী আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের (4.5 Generation) ফাইটার জেট যুক্ত করার প্রক্রিয়া বহুদূর এগিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে চীনের Chengdu J-10CE এবং ইউরোপের Eurofighter Typhoon ক্রয়ের আলোচনা ও প্রাথমিক প্রক্রিয়া অগ্রগতির তালিকায় রয়েছে।
৭. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান মিসাইল ও মারণাস্ত্র
আকাশপথে শত্রু ধ্বংস এবং বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে BAF-এর যুদ্ধবিমানগুলোতে বেশ কিছু লেটেস্ট মিসাইল ও বোমা যুক্ত রয়েছে:
ক) আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল (Air-to-Air Missiles)
- R-77 (RVV-AE): বিয়ন্ড-ভিজুয়াল-রেঞ্জ (BVR) রাডার-গাইডেড মিসাইল, যা ৮০-১০০ কিমি দূরের শত্রুর বিমান ধ্বংস করতে পারে (মিগ-২৯বিএম)।
- R-73E: বিশ্বখ্যাত শর্ট-রেঞ্জ হিট-সিকিং (Heat-seeking) মিসাইল, যা মুখোমুখি ডগফাইটে শত্রুর ইঞ্জিনের উত্তাপ ট্র্যাক করে আঘাত হানে।
- PL-5E II / PL-9C: চীনের তৈরি আধুনিক ইনফ্রারেড গাইডেড শর্ট-রেঞ্জ মিসাইল (এফ-৭বিজিআই)।
খ) আকাশ থেকে ভূমিতে ও সমুদ্রে আক্রমণের অস্ত্র (Air-to-Surface)
- Kh-31A: রাশিয়ার তৈরি মারাত্মক দ্রুতগতির সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল। সমুদ্রসীমার প্রতিরক্ষায় এটি মিগ-২৯ এর একটি অন্যতম গেম-চেঞ্জার অস্ত্র।
- KAB-500KR: লেজার ও টিভি-গাইডেড স্মার্ট পিন-পয়েন্ট প্রিসিশন বোমা।
- LS-6 (500lb): জিপিএস এবং স্যাটেলাইট গাইডেড গ্লাইড বোমা, যা দূর থেকেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম (এফ-৭বিজিআই)।
সারসংক্ষেপ
রাইট ব্রাদার্সের মাত্র ১২ সেকেন্ডের ঐতিহাসিক যাত্রা থেকে শুরু করে আজকের সুপারসনিক ও হাইপারসনিক যুগ—এভিয়েশন সায়েন্স আধুনিক প্রতিরক্ষার মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীও তাদের আধুনিক ফ্লিট, ৪.৫ জেনারেশনের ফাইটার জেট সংযোগ এবং স্যাটেলাইট গাইডেড অস্ত্রের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আধুনিক ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূ-রাজনীতি ও দর্শন
- প্রকাশের তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি, বিবিসি (BBC), দ্য সেন্ট্রাল তিব্বতান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (CTA) ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আর্কাইভ।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (GPA-5) না পেলে কিংবা দেশের শীর্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেলে জীবন বুঝি সেখানেই থমকে যায়। কিন্তু এই চেনা ধারণার বাইরে গিয়ে জিপিএ-৩.৫৭ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এক বাঙালি তরুণ। তিনি আর কেউ নন, নরসিংদীর মনোহরদীর ছেলে ড. আল ইমরান (Al Emran)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে প্রথমে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালে জেফ বেজোসের বিখ্যাত মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এ বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

আজকের এই কন্টেন্টে আমরা জানবো কীভাবে বারবার ব্যর্থতার গ্লানি মুছে একজন সাধারণ ছাত্র থেকে তিনি আজকের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালেন।
১. শৈশবের স্বপ্ন এবং শুরুর ধাক্কা
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার রামপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আল ইমরানের। বাবা ছিলেন মাদরাসার শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই জোছনা রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইমরান ভাবতেন, মানুষ কীভাবে চাঁদে গেল? আমিও কি কোনোদিন পারবো?
কিন্তু তার এই বড় স্বপ্নের পথে প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৪ সালে খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাত্র জিপিএ ৩.৫৭ পেয়ে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে জিপিএ ৪.৪ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। রেজাল্ট কম থাকার কারণে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে (BUET) ভর্তি পরীক্ষাই দিতে পারেননি তিনি।
২. অনার্সে এসে নিজেকে বদলে ফেলা
বুয়েটে পরীক্ষা দিতে না পেরে ইমরান ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। তবে সেখানেও এক বছর পড়ার পর নিজের মূল ভালো লাগার জায়গা খুঁজে পেতে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই যেন খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসেন ইমরান। যে ছেলেটি স্কুল-কলেজে সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন, তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন! অনার্সে তার সিজিপিএ ছিল ৩.৬৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৭।
৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিরিয়ে দিল, কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখেছিল
মাস্টার্স শেষ করার পর আল ইমরানের তীব্র ইচ্ছা ছিল নিজের বিভাগেই (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার। এজন্য তিনি একাধিকবার আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হয়নি।
এই প্রত্যাখ্যান ইমরানকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত করেছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। দেশে সুযোগ না পেয়ে তিনি চোখ ফেরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চেয়ে গবেষণার বাস্তব যোগ্যতা অনেক বেশি শক্তিশালী।
৪. পিএইচডি এবং আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি
২০১৭ সালে ইমরান পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। Auburn University থেকে গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস (University of Arkansas) থেকে স্পেস অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্স-এ সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল স্যাটেলাইট ডাটা, মেশিন লার্নিং এবং ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহ (Mars) ও প্লুটোর (Pluto) পৃষ্ঠের গঠন উন্মোচন করা। তার এই অসাধারণ গবেষণাপত্রগুলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নজরে আসে।
৫. নাসার দরজা জয় এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট
২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ড. আল ইমরান বিশ্বখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-র জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে (JPL) পোস্টডক্টরাল ফেলো (Planetary Astronomer) হিসেবে যোগ দেন। যে তরুণকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ফিরিয়ে দিয়েছিল, তিনি তখন নাসায় বসে বুধ, মঙ্গল, ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহের পৃষ্ঠদেশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন!

সর্বশেষ ২০২৬ সালের আপডেট:
নাসায় ৩ বছর সফলভাবে কাজ করার পর, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ড. আল ইমরান আরও একধাপ এগিয়ে যান। তিনি বর্তমানে জেফ বেজোসের বিখ্যাত মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এ Aerospace Systems Engineer III এবং Planetary Scientist হিসেবে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি চাঁদের মাটিতে স্পেস রিসোর্স বা খনিজ সম্পদের অবস্থান মূল্যায়ন করার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লুনার মিশনে (Lunar Mission) কাজ করছেন।
ড. আল ইমরানের জীবন থেকে আমাদের কী শেখার আছে?

ড. আল ইমরানের এই অদম্য লড়াইয়ের গল্পটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য কয়েকটি অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা দেয়:
- জিপিএ বা ভর্তি পরীক্ষা জীবনের শেষ কথা নয়: স্কুল-কলেজের রেজাল্ট খারাপ মানেই জীবন শেষ—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। চেষ্টা ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
- প্রত্যাখ্যানই নতুন পথের জন্ম দেয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষক হিসেবে না নেওয়ায় সেদিন হয়তো তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানই আজ তাকে নাসা ও ব্লু অরিজিনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে।
- দক্ষতা ও গবেষণার শক্তি: সার্টিফিকেট বা পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে স্কিল বা দক্ষতা অর্জন করা এবং একাগ্রচিত্তে নিজের লক্ষ্যে লেগে থাকাটাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
উপসংহার
ড. আল ইমরান প্রমাণ করেছেন যে, সততা, মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে নরসিংদীর একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসেও বিশ্ব কাঁপানো মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়া সম্ভব। তার এই গল্প আমাদের প্রতিটি হতাশ তরুণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ: নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন
স্থান: ঢাকা
ঢাকা: তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বৈশ্বিক প্রবাস জীবনের বিস্তারে দূর থেকে ভিডিও কল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিবাহ (Online Marriage) সম্পাদনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—সরাসরি ভিডিও কলের মাধ্যমে ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) করে বিয়ে সম্পন্ন করা ইসলামী শরীয়াহ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী কতটা বৈধ?

ইসলামী ফিকহ বিশারদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি ভিডিও কলে ইজাব-কবুল করে বিয়ে করা অধিকাংশ আলেমের মতে বৈধ নয়। তবে ইসলামী শরীয়াহতে এর একটি সম্পূর্ণ সুন্নাহসম্মত ও শতভাগ বৈধ বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে, যাকে ‘ওকালতি’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ পদ্ধতি বলা হয়।
১. ভিডিও কলে সরাসরি বিয়ে বৈধ না হওয়ার কারণ (জমহুর ওলামাদের মত)
ইসলামী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী বিয়ে সহীহ হওয়ার জন্য ‘ইত্তিহাদুল মজলিস’ বা উভয় পক্ষ এবং সাক্ষীদের একই স্থানে বা মজলিসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। ভিডিও কলে সরাসরি বিয়ে না হওয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক ও শরঈ কারণসমূহ:
- মজলিস ভিন্ন হওয়া: বর ও কনে দুটি ভিন্ন স্থানে থাকেন, যা একই মজলিসে উপস্থিত থাকার শর্তটি সরাসরি লঙ্ঘন করে।
- ডিজিটাল প্রপঞ্চ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: এআই প্রসেসিং, ভয়েস চেঞ্জিং প্রযুক্তি বা ডিপফেক (Deepfake)-এর মতো প্রযুক্তির অপব্যবহার করে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঝুঁকি থেকে যায়।
- সাক্ষীদের সশরীরে অনুপস্থিতি: বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর সামনে সরাসরি ইজাব-কবুল হতে হয়, যা স্ক্রিনের ওপার থেকে নিশ্চিত করা কঠিন।
(উল্লেখ্য, কয়েকজন আধুনিক আলেম পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে শিথিলতার কথা বললেও সিংহভাগ ফতোয়া বোর্ড এবং আলেম সতর্কতাস্বরূপ এটিকে অবৈধ বলেছেন)।
২. প্রবাসীদের বিয়ের সঠিক ও বৈধ পদ্ধতি: ওকালতি (Proxy Marriage)

কোনো পাত্র বা পাত্রী বিদেশে বা দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করলে, সরাসরি ভিডিও কলে বিয়ে না করে ‘ওয়াকিল’ বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করাই শরীয়াহসম্মত নিয়ম।
ধাপসমূহ:
১. উকিল নিযুক্তকরণ: দূরে থাকা পাত্র (বা পাত্রী) তার পরিচিত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে (যেমন: ভাই, বন্ধু বা আত্মীয়) ফোন বা ভিডিও কলে স্পষ্ট ভাষায় বলবেন—“আমি তোমাকে অমুক কনের সাথে আমার বিয়ের জন্য আমার ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম।”
২. মজলিসে ইজাব-কবুল: নিযুক্ত উকিল বিয়ের মূল মজলিসে কাজি, কনের ওলি (অভিভাবক) এবং অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর সামনে সশরীরে উপস্থিত হবেন।
৩. আকদ সম্পাদন: কনের পক্ষ থেকে বিয়ে দেওয়া হলে, প্রবাসীর নিযুক্ত উকিল সবার সামনে বলবেন—“আমি আমার মক্কেল (বরের নাম)-এর পক্ষে এই বিয়ে কবুল করলাম।”
[প্রবাসে থাকা পাত্র] ──► প্রতিনিধি (উকিল) নিয়োগ ──► বিয়ের মূল মজলিস ──► কাজি ও সাক্ষীদের সামনে ইজাব-কবুল ──► বৈধ বিয়ে
এই প্রক্রিয়ায় বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সময় দূরে থাকা পাত্র-পাত্রী চাইলে ভিডিও কলে যুক্ত থেকে পুরো অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখতে পারেন, এতে শরীয়াতে কোনো বাধা নেই।
৩. দূর থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে কাবিননামা ও আইনি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী (মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯৭৪) বিয়ের পর কাজি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। তবে অনলাইনে সম্পূর্ণ “অনলাইন-অনলি” বা ইন্টারনেটে ডিজিটালি সই করে বিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। সশরীরে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে বালাম বইয়ে স্বাক্ষর করতে হয়।
- পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা ওকালতনামা: প্রবাসে থাকা পাত্র বা পাত্রী সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে মনোনীত প্রতিনিধির নামে একটি লিগ্যাল “ওকালতনামা” বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করিয়ে দেশে পাঠাবেন।
- নথিপত্র ও বয়সের প্রমাণ: বর (ন্যূনতম ২১ বছর) ও কনের (ন্যূনতম ১৮ বছর) জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)/পাসপোর্ট ও ছবি কাজি অফিসে জমা দিতে হবে।
- রেজিস্ট্রেশন ও ডিজিটাল সার্টিফিকেট: নিযুক্ত উকিল এবং সাক্ষীরা কাজি অফিসে গিয়ে বালাম বইয়ে স্বাক্ষর করবেন। কাজি সাহেব তথ্যগুলো সিভিল রেজিস্ট্রেশন পোর্টালে (CRVS) আপলোড করার পর বর-কনে কিউআর (QR) কোড সম্বলিত ডিজিটাল কাবিননামা বা ম্যারেজ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন।
৪. বিয়ের ক্ষেত্রে ওলি (কনের অভিভাবক)-এর প্রয়োজনীয়তা
ইসলামে কনের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওলি’ (Wali) বা অভিভাবকত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্তম্ভ।
- ওলির ক্রম: কনের প্রধান ওলি হলেন তার পিতা। পিতা না থাকলে দাদা, আপন ভাই, সৎ ভাই, ও চাচা পর্যায়ক্রমে ওলি হবেন।
- ওলি ছাড়া বিয়ের বিধান:
- জমহুর ওলামা (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী): ওলি ছাড়া বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল বা অসিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ওলি (অভিভাবক) ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হয় না” (আবু দাউদ)।
- হানাফী মাযহাব: কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতি নারী ওলি ছাড়া উপযুক্ত (কুফু) পাত্রের সাথে দুজন সাক্ষীর সামনে বিয়ে করলে তা সহীহ হয়ে যাবে। তবে ওলির অনুমতি ছাড়া বিয়ে করাকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অনুচিত মনে করা হয়।
অতএব, দূরে থেকে বিয়ে সম্পন্ন করতে চাইলে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রত্যয়িত ওকালতনামা এবং বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজি ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন করাই ধর্মীয় ও আইনি উভয় দিক থেকেই নিরাপদ সমাধান।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৭ অপরাহ্ন
স্থান: ঢাকা
ঢাকা: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক চালচিত্র ছিল অত্যন্ত জটিল ও তরঙ্গাকুল। শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল (১৯৭২–১৯৭৫) থেকে শুরু করে ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি, ৩ ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন—প্রতিটি অধ্যায়ই বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর দাগ কেটেছে।
রাজনৈতিক গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া এবং পরবর্তীতে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে বহু বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।
১. শেখ মুজিব আমলে জিয়াউর রহমানের কৌশলগত নীরবতার কারণ

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সেনা কর্মকর্তাদের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Army Staff) হিসেবে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় কোনো সরাসরি বিদ্রোহে জড়াননি। এর নেপথ্যে মূল কারণগুলো ছিল:
- নেতৃত্বের বৈধতা ও আনুগত্য: শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রপ্রধান। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও একটি স্বাধীন দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতো সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
- জাতীয় রক্ষীবাহিনীর চাপ: শেখ মুজিব সরকার গঠিত বিশেষ আধাসামরিক বাহিনী ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ সমান্তরাল শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনীর ওপর সার্বিক নজরদারি বজায় রাখত, যা যেকোনো ক্যু চক্রান্তের জন্য বড় বাধা ছিল।
- পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ড: সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহসহ শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তারা সরকারের অনুগত থাকায় জিয়াউর রহমান সেনাসদরের পেশাদার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাহিনীর ভেতরে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন।
২. ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মেজর শরীফুল হক ডালিম, মেজর খন্দকার আব্দুর রশীদ ও মেজর সৈয়দ ফারুক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর জুনিয়র অফিসাররা সেনাসদরের আদেশ অমান্য করে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে সাথে নিয়ে বঙ্গভবন থেকে দেশ চালাতে শুরু করেন।
[১৫ আগস্ট: বঙ্গভবনে ঘাতক মেজরেরা] ──► ৩ নভেম্বর: খালেদ মোশাররফের পাল্টা ক্যু ──► ৭ই নভেম্বর: সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও জিয়ার মুক্তি
- ৩রা নভেম্বরের পাল্টা ক্যু: চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৩রা নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয় এবং মোশতাক পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘাতক মেজরেরা ব্যাংকক পালিয়ে যাওয়ার আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে।
- ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থান: খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণ সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। এই সুযোগে জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) সামরিক শাখা ‘গণবাহিনী’ ও কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সিপাহীরা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনেন। সকালে শেরেবাংলা নগরে খালেদ মোশাররফ, এটিএম হায়দার ও নাজমুল হুদা নিহত হন।
৩. কর্নেল তাহেরের বিচার ও জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা সুসংহতকরণ

৭ই নভেম্বরের বিপ্লবের পর কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন একটি “শ্রেণিহীন বিপ্লবী সেনাবাহিনী” গঠন করতে। তবে মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান সেনাশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে কঠোর অবস্থান নেন।
- গোপন বিচার ও ফাঁসি: সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা দমনে জিয়া কঠোর হন। ১৯৭৫ সালের ২৪শে নভেম্বর কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭৬ সালের জুন মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গোপনে বিচার চালিয়ে ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। (উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে)।
- বেসামরিকীকরণ ও দল গঠন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালের গণভোটে বৈধতা অর্জনের পর তিনি রাজনীতিকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে প্রথমে ‘জাগদল’ এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (BNP) গঠন করেন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি পূর্ণ আইনি ভিত্তি লাভ করেন।
[সামরিক শাসন ও ক্যু দমন] ──► ইনডেমনিটি ও ৫ম সংশোধনী পাস ──► জাগদল ও বিএনপি গঠন ──► ১৯৭৯ সালের বেসামরিক সরকার
৪. ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী

সামরিক সরকারের সিদ্ধান্তসমূহকে আইনি সুরক্ষা দিতে জিয়াউর রহমানের আমলে দুটি অত্যন্ত বিতর্কিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়:
- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারে আইনি বাধা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এই অধ্যাদেশটি বহাল রাখা হয় এবং খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়।
- পঞ্চম সংশোধনী (১৯৭৯): ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীন নেওয়া সকল অধ্যাদেশ ও সিদ্ধান্তকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। একই সাথে সংবিধানে “বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম” সংযোজন, “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র পরিবর্তে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” এবং জাতীয়তা “বাংলাদেশি” নির্ধারণ করা হয়। (২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট ৫ম সংশোধনী বাতিল করেন)।
৫. ১৯ দফা, একের পর এক ক্যু এবং জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড
ক্ষমতা সুসংহত করার পর জিয়াউর রহমান আত্মনির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং ‘খাল খনন’ ও ‘পল্লী বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি চালু করেন।
তবে তার সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনামলে সেনাবাহিনীতে প্রায় ২১-২২টি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের চেষ্টা ঘটে। বিশেষ করে ১৯৭৭ সালের ঢাকা ও বগুড়া বিমান বাহিনীর বিদ্রোহের পর সামরিক আদালতে প্রায় সহস্রাধিক সেনাসদস্য ও অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
[চট্টগ্রাম সফর] ──► ৩০ মে ১৯৮১: মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ক্যু ──► সার্কিট হাউজে জিয়া নিহত ──► এরশাদের সামরিক ক্ষমতা দখল
হত্যাকাণ্ড (৩০ মে, ১৯৮১): ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে একদল সেনা কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে। বিদ্রোহটি তিন দিনের মধ্যে ব্যর্থ হয় এবং জেনারেল মঞ্জুর রহস্যজনকভাবে নিহত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে দেশ পরিচালনা শুরু করেন।
৬. ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতন
লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল ৯০-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনের মাধ্যমে।
- তিন জোটের রূপরেখা: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট, বিএনপির ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫-দলীয় জোট একত্রিত হয়ে স্বৈরাচার পতন ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
- সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও আত্মত্যাগ: ডাকসু ও শীর্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ আন্দোলনে নতুন গতি আনে। ১০ই অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি এবং ২৭শে নভেম্বর ডা. শামসুল আলম খান মিলনের শাহাদাত আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়।
- সেনাবাহিনীর অনীহা ও পতন: আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নিলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দিন খান বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে ৪ঠা ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯০ আনুষ্ঠানিকভাবে এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের ইতি ঘটে এবং ১৯৯১ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



