ইতিহাস

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.): মক্কার ইমামের ভুল ধরা ও সৌদি সংবিধান সংশোধনের আসল ইতিহাস
আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী

নিউজ ডেস্ক

May 17, 2026

শেয়ার করুন

১৯৪৭ সালে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কার হারাম শরীফের ইমাম সাহেবের খুতবায় সুক্ষ্ম ইলমি ভুল ধরেছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের কানাইঘাটের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)। হাদিসশাস্ত্র ও আরবি ব্যাকরণে তাঁর এই অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত আলেমরা পুরোপুরি তাক লাগিয়ে যান। এমনকি তৎকালীন সৌদি আরবের বাদশাহ স্বয়ং তাঁর দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান আল্লামা বায়মপুরীর সামনে পেশ করে কোনো ভুল আছে কি না তা যাচাই করতে বলেন এবং আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) সেই সংবিধানে অন্তত ১৪টি বিষয় সংশোধনযোগ্য বলে চিহ্নিত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য দলিল।

নিচে এই ক্ষণজন্মা হাদিস বিশারদ, রাজনীতিক ও মহান সংস্কারকের জন্ম, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ঐতিহাসিক অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) ১৩২৭ হিজরি মোতাবেক ১৯০৭ সালের মহররম মাসে এক জুমার দিনে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়মপুর গ্রামের (বর্তমান কানাইঘাট পৌরসভার অন্তর্গত) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

  • পিতা: কারী আলিম বিন কারী দানিশ মিয়া।
  • মাতা: হাফেজা সুফিয়া বেগম।

তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শৈশবেই তাঁর পিতা মারা যাওয়ায় মায়ের একক তত্ত্বাবধানে তিনি লালিত-পালিত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়, যার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষাও আয়ত্ত করেন।

শিক্ষাজীবন এবং দেওবন্দের গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড

কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসা (বর্তমান দারুল উলুম কানাইঘাট) থেকে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রাথমিক ও পরবর্তীতে মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি ভারতে পাড়ি জমান।

  • ভারতে প্রথম পর্ব: রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ৫ বছর এবং মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় ২ বছর পড়াশোনা করেন। এই ৭ বছরে তিনি হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আকাইদ ও দর্শন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি দরসে নেজামির কঠিন কিতাব ‘কাফিয়া’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইযাহুল মাতালিব রচনা করে মেধার পরিচয় দেন।
  • দারুল উলূম দেওবন্দের রেকর্ড: ১৯৩৬ সালে তিনি বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দেওবন্দে দেড় বছর অত্যন্ত সুখ্যাতির সঙ্গে হাদিসের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি (দাওরায়ে হাদিস) গ্রহণ করেন। মেধা তালিকায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং কয়েকটি বিষয়ে মোট নম্বরের চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড গড়েন। তাঁর বোখারি শরিফের পরীক্ষার খাতা দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছিল।

কর্মজীবন ও সিলেটের ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’

দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফেরার সময় তাঁর উস্তাদ সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) বলেছিলেন—“আব ইলম সিলেট কি তরফ জা রহা হায়” (এখন জ্ঞানবত্তা সিলেটের দিকে যাচ্ছে)।

  • শিক্ষকতা: প্রথমে ভারতের বদরপুর ও রামপুর আলিয়া মাদরাসায় এবং পরে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সিলেটের গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসায় শাইখুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক যোগ্যতায় তৎকালীন সময়ে গাছবাড়ী মাদরাসাকে ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’ বলা হতো।
  • দারুল উলূম কানাইঘাট: ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জন্মস্থান কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দারুল উলূম কানাইঘাট’। ১৯৫৪ সালে এখানে তিনিই প্রথম দাওরায়ে হাদিসের (টাইটেল) ক্লাস চালু করেন এবং আমৃত্যু এখানে হাদিসের খিদমত করেন।
  • দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ১৯৫৭ সালে দেওবন্দের শায়খুল হাদিস মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর দেওবন্দের শূন্য পদে যে ৩ জন বৈশ্বিক আলেমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, আল্লামা বায়মপুরী ছিলেন তাদের অন্যতম। কিন্তু মাতৃভূমির খিদমত ছেড়ে তিনি দেওবন্দে যেতে রাজি হননি।
  • শিক্ষা বোর্ড গঠন: পূর্ব সিলেটের সব মাদরাসাকে এক প্লাটফর্মে আনতে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পূর্ব সিলেট আযাদ দীনি আরবী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ গঠন করেন। বর্তমানে এই বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৭৫টি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক জীবন ও সংসদের ঐতিহাসিক ভূমিকা

রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তাঁর উস্তাদ মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সারির নেতা।

  • এমএনএ (MNA) নির্বাচিত: ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ (পার্লামেন্ট) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘চেয়ার’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
  • সংসদে ঐতিহাসিক অবদান:
    • রাষ্ট্রের নামকরণে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান’ লেখায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
    • “কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করা যাবে না”—এই মূল নীতিটি তিনিই পাকিস্তানের সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।
    • তাঁর তীব্র দাবির মুখে আইয়ূব সরকার একটি অর্ডিন্যান্স থেকে ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
    • পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তিনিই সর্বপ্রথম পার্লামেন্টে তুলে ধরেন।

অমর রচনাবলী

দ্বীনি খিদমতের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

১. ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন: রাজনীতি বিষয়ে আরবিতে লেখা একটি ঐতিহাসিক অমর গ্রন্থ (যা পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ‘ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার’ নামে অনূদিত হয়)। ২. আল-فুরক্বান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান (তাসাউফ সংক্রান্ত কিতাব)। ৩. আল ফুরক্বান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ও আউলিয়াইশ শাইতান। ৪. সত্যের আলো (দুই খণ্ডে)। ৫. ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার। ৬. ইজহারে হক্ব এবং সেমাউল কোরআন

আধ্যাত্মিক জীবন ও ইন্তেকালের কারামাত

তিনি হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এবং উস্তাদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেন। পরবর্তীতে মাওলানা ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.)-এর কাছে বায়াত হয়ে খেলাফত লাভ করেন।

  • ইন্তেকাল: ১৩৯০ হিজরীর ১০ জিলহজ মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে এই মহান অলিয়ে কামেল ইন্তেকাল করেন। কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসার সামনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
  • কবর থেকে সুগন্ধি বের হওয়ার কারামাত: দাফনের পর টানা কয়েকদিন এবং পরবর্তীতে তিন মাস পর আবারও তাঁর কবর থেকে অলৌকিক সুগন্ধি বের হতে থাকে। এমনকি ইন্তেকালের দীর্ঘ ৪০ বছর পর, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে আবারও তাঁর কবর থেকে তীব্র সুগন্ধি বের হতে শুরু করলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং হাজার হাজার মানুষ তা দেখার জন্য ভিড় জমান।

তাঁর স্মৃতি ও অবদানের সম্মানার্থে বর্তমান কানাইঘাট উপজেলা সদরে সুরমা নদীর উপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির নাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী সেতু রাখা হয়েছে।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)

১. মূল গ্রন্থ: ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন (অনুবাদ: ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ২. জীবনী ও স্মারকগ্রন্থ: আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ, উলামা পরিষদ বাংলাদেশ। ৩. সংসদীয় রেকর্ড: পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (National Assembly of Pakistan) ১৯৬২-১৯৬৫ এর সংসদীয় কার্যবিবরণী ও প্রস্তাবনাসমূহ। ২. প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ: দারুল উলূম দেওবন্দ (ভারত) এবং দারুল উলূম কানাইঘাট (সিলেট) এর শিক্ষা সমাপনী রেকর্ড ও শতবর্ষী স্মারক। ৫. সরকারি তথ্য বাতায়ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কানাইঘাট উপজেলা পোর্টাল (প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব অনুচ্ছেদ)।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নিউজ ডেস্ক

May 16, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ফিচার ডেস্ক | ১৬ মে, ২০২৬ প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ঢাকা: ঠান্ডা যুদ্ধের (Cold War) ইতিহাসে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের সময়কালকে বলা হয় বৈশ্বিক গোয়েন্দা তৎপরতার সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং জটিল অধ্যায়। এই ১৫ বছরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’ (KGB) একদিকে যেমন ওয়াশিংটন থেকে কঙ্গো কিংবা কাবুল পর্যন্ত তাদের গোপন জাল বিস্তার করেছিল, অন্যদিকে তেমনি নিজেদের ঘরের ভেতরের ভাঙন ঠেকাতে লড়েছিল এক চরম অস্তিত্বের লড়াই। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টকশো এবং অবমুক্ত হওয়া (Declassified) “মিট্রোখিন আর্কাইভ” ও মার্কিন-সোভিয়েত নথিপত্র ফাঁসের জেরে কেজিবির এই অন্ধকার সময়ের নেপথ্য প্রস্তুতি ও নিখুঁত অপারেশনগুলোর চাঞ্চল্যকর তথ্য নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তৈরি করেছে।

১. কেজিবির অভ্যন্তরীণ কাঠামো: ‘ডিরেক্টরেট’ সমাচার

১৯৭৫ সালের পর থেকে কেজিবি তার কার্যপরিধিকে আরও সুনির্দিষ্ট, পেশাদার ও আগ্রাসী করতে কয়েকটি অতি-গোপন ডিরেক্টরেটে বিভক্ত করে কাজ শুরু করে:

  • ফার্স্ট চিফ ডিরেক্টরেট (FCD): এটি ছিল কেজিবির সবচেয়ে শক্তিশালী ও এলিট শাখা, যার মূল কাজ ছিল বহির্বিশ্বে গুপ্তচরবৃত্তি (Foreign Espionage) এবং ছদ্মবেশী এজেন্ট বা ‘ইলিজাল এজেন্টস’ (Illegal Agents) নিয়োগ ও পরিচালনা করা।
  • ফিফথ ডিরেক্টরেট (Fifth Directorate): ১৯৬৭ সালে গঠিত এই বিশেষ শাখার মূল দায়িত্ব ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ভিন্নমতাবলম্বী, স্বাধীনচেতা লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং ধর্মীয় প্রচারকদের ওপর কড়া নজরদারি করা এবং যেকোনো বৈপ্লবিক চিন্তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা।
  • সিক্সটিন্থ ডিরেক্টরেট (16th Directorate): এটি ছিল সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা তারবিহীন যোগাযোগে আড়ি পাতার বিশেষ ডিজিটাল উইং, যা পশ্চিমাদের রেডিও, স্যাটেলাইট ও টেলিফোন যোগাযোগ হ্যাক করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।

২. আಂದ್ರোপভ যুগ ও ‘অপারেশন রয়ান’ (RYAN)

১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কেজিবির নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাত ইউরি আಂದ್ರোপভ। তাঁর আমলেই কেজিবি সোভিয়েত বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধানতম হাতিয়ারে পরিণত হয়। ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান সোভিয়েত ইউনিয়নকে “দুষ্ট সাম্রাজ্য” (Evil Empire) হিসেবে ঘোষণা করলে দুই পরাশক্তির ঠান্ডা যুদ্ধ চরম রূপ নেয়।

এরই জবাবে ১৯৮১ সালের মে মাসে আಂದ್ರোপভ শুরু করেন ইতিহাসের বৃহত্তম শান্তিকালীন গোয়েন্দা অপারেশন—“অপারেশন রয়ান” (RYAN)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকা বা ন্যাটো জোট সোভিয়েতের ওপর কোনো আকস্মিক পারমাণবিক হামলা (Nuclear First Strike) চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা আগেভাগে আঁচ করা। কেজিবির হাজার হাজার ছদ্মবেশী এজেন্ট তখন পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে দিনরাত নজরদারি বাড়িয়েছিল।

৩. আফগান যুদ্ধ ও ‘অপারেশন স্টর্ম-৩৩৩’

১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের মূল ব্লুপ্রিন্ট ও সামরিক ছক তৈরি করেছিল কেজিবি। কেজিবির বিশেষায়িত কমান্ডো দল ‘আলফা গ্রুপ’ কাবুলের তাজবেগ প্রাসাদে অত্যন্ত গোপনীয় ‘অপারেশন স্টর্ম-৩৩৩’ (Operation Storm-333) পরিচালনা করে।

মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই বিধ্বংসী ও ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ অপারেশনে তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিনকে সপরিবারে হত্যা করে সেখানে সোভিয়েতপন্থী বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এই অপারেশনটি কেজিবির নিখুঁত ও নিষ্ঠুর সামরিক সক্ষমতার এক ক্লাসিক উদাহরণ।

৪. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, ‘অ্যাক্টিভ মেজার্স’ ও তৃতীয় বিশ্বে অনুপ্রবেশ

১৯৮০-এর দশকে কেজিবি সরাসরি সামরিক যুদ্ধের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা “অ্যাক্টিভ মেজার্স” (Active Measures)-কে বেশি প্রাধান্য দেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়া ও অপপ্রচার চালানো।

  • অপারেশন ইনফেকশন (Operation Infektion): কেজিবির অন্যতম সফল ডিসইনফরমেশন বা ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছিল এটি। ১৯৮৩ সালে ভারতের একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের মাধ্যমে কেজিবি বিশ্বব্যাপী এই ভুয়া খবর ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে ‘এইডস’ (AIDS) ভাইরাস তৈরি করেছে।
  • মিট্রোখিন আর্কাইভ ও ফান্ডিং: সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভাসিলি মিট্রোখিনের পাচার করা গোপন নথি বা “মিট্রোখিন আর্কাইভ” থেকে জানা যায়, কেজিবি কীভাবে ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর (Third World) শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, আমলা ও নামী সাংবাদিকদের গোপনে বিপুল অর্থায়ন (Funding) করে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যবহার করত।

৫. গুগল অ্যানালাইসিস: ২০২৬ সালে কেন এটি আবার আলোচনায়?

গুগল ট্রেন্ডস (Google Trends) এবং গ্লোবাল সার্চ ভলিউম অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে, মে ২০২৬-এ এসে হঠাৎ করেই কেজিবির এই ঐতিহাসিক অধ্যায়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নেটিজেনদের কৌতূহল তুঙ্গে উঠেছে। সার্চ ইঞ্জিনের শীর্ষ ৩টি ট্রেন্ডিং টপিক হলো:

  1. KGB declassified operations 1975-1990 (সম্প্রতি মার্কিন ও রুশ আর্কাইভের কিছু পুরনো গোপন নথি উন্মুক্ত হওয়া নিয়ে অনুসন্ধান)।
  2. Mitrokhin Archive Third World Funding (তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে কেজিবির গোপন প্রভাব ও অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে গবেষণা)।
  3. Vladimir Putin Dresden 1989 (১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনে তরুণ কেজিবি কর্মকর্তা হিসেবে পুতিনের ভূমিকা নিয়ে কৌতূহল)।

৬. পতন ও শেষ অধ্যায় (১৯Expiry-১৯৯০)

১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ ক্রেমলিনের ক্ষমতায় এসে ‘গ্লাসনস্ত’ (উন্মুক্ততা) ও ‘পেরেস্ত্রৈকা’ (পুনর্গঠন) নীতি চালু করলে কেজিবির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় জার্মানির ড্রেসডেনে কর্তব্যরত কেজিবি এজেন্টরা (যার মধ্যে তরুণ ভ্লাদিমির পুতিনও ছিলেন) যখন মস্কোর কোনো সাহায্য বা নির্দেশনা পাননি, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে এই বিশাল গোয়েন্দা সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন।

অবশেষে ১৯৯০ সালে কেজিবির শেষ কট্টরপন্থী প্রধান ভ্লাদিমির ক্রাইউচকভ গর্বাচেভকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক ব্যর্থ নেপথ্য অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে কেজিবিরও চিরতরে অবসান ঘটায়।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Sources):

১. উইকিপিডিয়া (Wikipedia): KGB History and Directorship of Yuri Andropov.

২. চার্চিল আর্কাইভস সেন্টার (Churchill Archives Centre): The Papers of Vasiliy Mitrokhin and KGB Global Operations.

৩. ইউএস নিউজ (U.S. News): Declassified Documents Reveal KGB Spies in the U.S.

৪. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Britannica): KGB – Soviet Security, Intelligence, and Espionage.

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ফাতেমা জিন্নাহ

নিউজ ডেস্ক

May 16, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ উপযোগি ইতিহাস কলাম | ১৬ মে, ২০২৬ প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

চট্টগ্রাম/ঢাকা: বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের এক দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়। তেমনই একটি ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় ঘোরানো অধ্যায় ছিল ১৯৬৪ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের (তৎকালীন চিটাগাং) পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সম্মিলিত বিরোধী দল (COP)-এর প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে এক অবিস্মরণীয় নির্বাচনী জনসভা। আর এই ঐতিহাসিক গণজোয়ারের নেপথ্যের মূল কারিগর, দূরদর্শী সংগঠক ও চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন তরুণ ও তেজস্বী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।

১. আইয়ুবের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বনাম ‘মাদার-ই-মিল্লাত’

১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল আইয়ুব খান নিজের গদি টিকিয়ে রাখতে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ বা মৌলিক গণতন্ত্র নামের এক ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করেন। এই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে ১৯৬৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পাকিস্তানের সমস্ত বিরোধী দল একজোট হয়ে ‘কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি’ (সিওপি) গঠন করে। তারা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রার্থী করেন কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন এবং আপসহীন নেত্রী ফাতেমা জিন্নাহকে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন করা ছিল মূলত আইয়ুবের সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটানো এবং বাঙালির আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আদায়ের কৌশলের একটি বড় অংশ। আর এই প্রচারণাকে সফল করতে ফাতেমা জিন্নাহর প্রধান সহযাত্রী ও অভিভাবক হিসেবে পুরো পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়ান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।

২. চট্টগ্রামের পল্টন ময়দান: জনসমুদ্র ও শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠ

১৯৬৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ফাতেমা জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফরকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক জোয়ারের সাক্ষী হয়। ফাতেমা জিন্নাহ যখন ট্রেনে করে চট্টগ্রামে পৌঁছান, তখন স্টেশনে লাখো মানুষের ঢল নামে।

  • যৌথ নেতৃত্বের অটুট বন্ধন: শেখ মুজিবুর রহমান নিজে সার্বক্ষণিকভাবে ফাতেমা জিন্নাহর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের স্থানীয় সিংহহৃদয় নেতা এম এ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী এবং এম এ হান্নানকে সাথে নিয়ে এই সফরের সার্বিক আয়োজন, জনসভার মাঠের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন।
  • মঞ্চের মূল চালিকাশক্তি: পল্টন ময়দানের সেই বিশাল জনসভায় প্রধান আকর্ষণ ফাতেমা জিন্নাহ হলেও, উপস্থিত জনতাকে উদ্বেলিত করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ বজ্রকণ্ঠে আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচার এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। তিনি ফাতেমা জিন্নাহকে “মাদার-ই-মিল্লাত” (জাতির মা) হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিটি বাঙালিকে স্বৈরাচারের প্রতীক ‘ফুলের’ বিরুদ্ধে বিরোধী দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘লণ্ঠন’ মার্কায় ভোট দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।

৩. আইয়ুবপন্থী মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা ও বাঙালির প্রতিরোধ

ফাতেমা জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের এই অভূতপূর্ব যৌথ জনপ্রিয়তা দেখে আইয়ুব খানের অনুগত কনভেনশন মুসলিম লীগ এবং সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, তৎকালীন সরকারি তোষামোদকারী গণমাধ্যমগুলো (যেমন দৈনিক পাকিস্তান ও বিভিন্ন পাক্ষিক সাময়িকী) এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চরম নোংরা ও নেতিবাচক প্রচারণায় মেতে ওঠে।

আইয়ুবপন্থী গণমাধ্যম ও সরকারি চামচামিরা ফাতেমা জিন্নাহকে “ভারতের দালাল” এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর “অন্ধ অনুসারী ও সহচর” হিসেবে ব্যঙ্গচিত্র (কার্টুন) ও কলামের মাধ্যমে অপপ্রচার করত। বিরোধী দলকে হেয় প্রতিপন্ন করতে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ ও কুৎসিত শব্দচয়ন ব্যবহার করত। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা, ভয়ভীতি এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে চট্টগ্রামের আপামর জনতা নিজেদের বুকে দিয়ে ফাতেমা জিন্নাহ ও শেখ মুজিবের কাফেলাকে পাহারা দিয়ে জনসভাস্থলে নিয়ে গিয়েছিল, যা আইয়ুবের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

৪. ৬-দফার ভিত্তিভূমি: এই নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

১৯৬৪ সালের এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ও নির্বাচনী সফরটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছিল:

  • এটি বাঙালি জাতিকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাজপথে বুক চিতিয়ে নামার সাহস ও সুযোগ করে দেয়।
  • এই সফল সফরের পরই শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে একক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজের অবস্থানকে আকাশচুম্বী করে তোলেন।
  • ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৬৪ সালের এই মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং গণসংযোগের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ খ্যাত ৬-দফা আন্দোলন ঘোষণা করেছিলেন।

তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক আর্কাইভ (Sources):

১. জাতীয় আর্কাইভ ও ইতিহাস গ্রন্থাবলি: ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি’ এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ডায়েরি (১৯৬৪-৬৫)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: ১৯৬৪ সালের কনভেনশন মুসলিম লীগ বনাম সিওপি (COP) নির্বাচনী ইশতেহার ও ফলাফল বিবরণী। ৩. চট্টগ্রাম স্থানীয় ইতিহাস উইং: মরহুম এম এ আজিজ ও জহুর আহমদ চৌধুরীর রাজনৈতিক স্মৃতিচারণমূলক সংকলন।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ট্রাম্পের বেতন

নিউজ ডেস্ক

May 15, 2026

শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির প্রেসিডেন্টের মাসিক বেতন যেখানে ৩৩,৩৩৩ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪০ লাখ টাকা), সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের একজন উপদেষ্টার বেতন কি ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা হতে পারে? গত ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বিগত সরকারের বিভিন্ন দাপ্তরিক নথি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গোপন তথ্য ফাঁসের পর দেশজুড়ে এই প্রশ্ন এখন তুঙ্গে।

সজীব ওয়াজেদ জয়—বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা প্রায় ১০ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও টকশোতে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই ১১৬ মাসে তিনি দেশ থেকে বেতন বাবদ নিয়েছেন প্রায় ১৮৫ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা।

১. ট্রাম্প বনাম জয়: বেতনের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মার্কিন সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাসিক বেতন প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে, ২০১৪ সালে সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী নিউইয়র্কের এক ঘরোয়া সভায় প্রথম ফাঁস করেছিলেন যে, সজীব ওয়াজেদ জয় মাসিক ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা বেতন নেন। যদিও পরবর্তীতে সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাঁকে ‘অবৈতনিক’ বা ‘অবেতনভুক্ত’ দেখানো হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টে উঠে আসছে যে, ‘উপদেষ্টা’ পদের আড়ালে পরামর্শক ফি ও বিভিন্ন আইসিটি প্রকল্পের কমিশন বাবদ এই বিশাল অংকের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

২. ১১ লক্ষ কোটি টাকার লুটপাট: শ্বেতপত্র কমিটির চাঞ্চল্যকর তথ্য

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’ (White Paper Committee) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিগত ১৬ বছরে দেশ থেকে প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা (প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার) পাচার হয়েছে।

  • বিশ্লেষণ: এই পাচারকৃত অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় বাজেটের মতো অন্তত ২ থেকে ৩টি বাজেট অনায়াসেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল।
  • জিএফআই (GFI) রিপোর্ট: গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্যমতে, প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে, যার সিংহভাগই হয়েছে আইসিটি এবং মেগা প্রজেক্টের আড়ালে।

৩. টকশো ও বিশেষজ্ঞ মত

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে সাবেক এক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, “সজীব ওয়াজেদ জয়ের আইসিটি উপদেষ্টা পদটি ছিল মূলত একটি ‘উইন্ডো’, যার মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশনের নামে শত শত কোটি টাকা বিদেশে সরানো হয়েছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সুবিধা ভোগ করা এই ‘পলিটিক্যাল ডাইনাস্টি’র অবসানই ছিল ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

৪. জনগণের বিবেক ও আগামীর বাংলাদেশ

গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নামে যে লুটপাট হয়েছে, তার খতিয়ান এখন মানুষের মুখে মুখে। ১ কোটি ৬০ লক্ষ টাকার বেতন আর ১১ লক্ষ কোটি টাকার পাচার—এই দুটি পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন সাধারণ মানুষ এই দুঃশাসনের অবসান চেয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “যদি আপনার বিবেকে কুলাঙ্গারদের প্রতি বিন্দুমাত্র ঘৃণা থেকে থাকে, তবে এই লুটপাটের রাজত্ব আর কখনোই ফিরে আসা উচিত নয়।”

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ