ইতিহাস

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বুয়েট ক্যাম্পাস: ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি ও অমীমাংসিত ক্ষতিপূরণ প্রশ্ন
বুয়েট

নিউজ ডেস্ক

May 5, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেবল তার অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের জন্যই নয়, বরং তার ভৌগোলিক অবস্থানের পেছনে থাকা সুদীর্ঘ ইতিহাসের জন্যও আলোচিত। বুয়েট ক্যাম্পাসের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির সাথে যুক্ত, যা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আইনি ও সাংস্কৃতিক আলোচনা বিদ্যমান。

ঐতিহাসিক পটভূমি: বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি

শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা。 আদি যুগে এই মন্দিরের সীমানা এবং দেবোত্তর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশাল。 ব্রিটিশ আমল এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পর্যন্ত মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও ধর্মীয় কাজের জন্য মাইলের পর মাইল বিস্তৃত খোলা জমি, বাগান এবং পুকুর উৎসর্গ করা হয়েছিল。

বুয়েট ক্যাম্পাসের সম্প্রসারণ ও জমি অধিগ্রহণ

১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জনস্বার্থে এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে。 এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসের বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম দিকের এলাকা এবং তৎসংলগ্ন আবাসিক হলগুলোর জমি একসময় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মালিকানাধীন ছিল。

ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিতর্ক

জমির ক্ষতিপূরণ বা বাজারমূল্য পরিশোধের বিষয়টি আজও একটি অমীমাংসিত ঐতিহাসিক অধ্যায়。

  • সরকারি নথিপত্র: তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ আইন (Land Acquisition Act)-এর অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জমিটি নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ করা হয়。
  • অস্পষ্টতা: ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন সময়ে মন্দিরের সেবায়েতরা সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছিলেন কি না বা সেই মূল্যটি তৎকালীন বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে。
  • ধর্মীয় আইনি অবস্থান: হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তর করা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী এবং এই জমিগুলো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বা নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়েছিল。

বর্তমান বাস্তবতা ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া

ঢাকেশ্বরী মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে。 ১. জমি পুনরুদ্ধার: ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দফায় দফায় প্রায় ১.৫ বিঘা জমি সরকার মন্দির কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে。 ২. অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো: বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাওয়া মূল ক্যাম্পাস এলাকার জমিগুলো আর ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ সেখানে এখন স্থায়ী অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো বিদ্যমান。 ৩. বিকল্প সুবিধা: সরকার বিভিন্ন সময়ে মন্দিরের উন্নয়নে অনুদান এবং বিকল্প সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে。


তথ্যসূত্র: ১. ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ঢাকেশ্বরী মন্দির সংরক্ষণ রিপোর্ট ২. ভূমি অধিগ্রহণ আইন ও দেবোত্তর সম্পত্তি বিষয়ক নথিপত্র ৩. বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ঐতিহাসিক স্মারকলিপি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

নবাব সলিমুল্লাহ

নিউজ ডেস্ক

August 26, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)

সম্পাদনা ও গবেষণা: ইতিহাস ও গবেষণা বিভাগ

প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬

প্রকাশের সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট (বিএসটি)

মূল বিষয়শ্রেণী (Category): ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাজনীতি / বাংলাদেশ

অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, শিক্ষা বিস্তার ও অধিকার আদায়ে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী, তিনি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের নিজ বাসভবনে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ অসুস্থতা নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।

কীভাবে মারা গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ? (মৃত্যু ও রহস্য)

সরকারি ও চিকিৎসাগত রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বা স্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিষ প্রয়োগের শক্ত সন্দেহ ঘনীভূত হয়:

নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত বলা হলেও, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার আকস্মিকতার কারণে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বা গভীর ষড়যন্ত্রের জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।

মৃত্যুর ঘটনা ও প্রধান রহস্যসমূহ

  • আকস্মিক অসুস্থতা ও গুঞ্জন: মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত নবাব সুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর দিন রাতে হঠাৎ তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুতই তাঁর মৃত্যু হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এবং পরবর্তী সময়ে বহু গবেষকের লেখায় দাবি করা হয়, ব্রিটিশদের কোনো গোপন নীলনকশার অংশ হিসেবে অথবা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দ্বারা তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
  • রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নবাব সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাথে নবাবের চরম বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং বড় ধরনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
  • মরদেহ নিয়ে চরম গোপনীয়তা: ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খাজা শামসুল হকের ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কোনো সদস্য বা স্বজনদের স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর মুখমণ্ডল দেখতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর নিরাপত্তা ও জানাজা: কলকাতা থেকে বিশেষ স্টিমারে করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সাধারণ মানুষকে মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ঢাকার বেগমবাজারে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে (উর্দু রোড) দাফন করা হয়।
  • সশস্ত্র পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য এবং ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন। ধারণা করা হয়, ময়নাতদন্তের জন্য কেউ যেন লাশ চুরি বা উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

যদিও ব্রিটিশ সরকার বা তৎকালীন তদন্তে এই মৃত্যুকে হৃদরোগ বা স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণে আজও নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন

পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রদেশ, যা ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন প্রদেশটি আত্মপ্রকাশ করে।

নিচে এই প্রদেশ গঠনের পটভূমি, কাঠামো এবং এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. প্রদেশ গঠনের পটভূমি ও কারণ

  • প্রশাসনিক বিশালতা: অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) ছিল আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
  • পূর্ববঙ্গের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: তৎকালীন সমস্ত সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক। ফলে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
  • নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা: ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেখান যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রদেশ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়।

২. প্রদেশ গঠন ও ভৌগোলিক কাঠামো (১৯০৫)

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের চূড়ান্ত আদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠন করা হয়।

  • ভৌগোলিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ, ত্রিপুরা এবং সমগ্র আসাম অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়।
  • রাজধানী ও জনসংখ্যা: নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী করা হয় আসামের শিলংকে। প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ ছিলেন হিন্দু। ফলে এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত হয়।
  • প্রথম গভর্নর: স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) এই নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।

৩. নতুন প্রদেশের প্রভাব ও উন্নয়ন

প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পর মাত্র ৬ বছরে পূর্ববঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:

  • ঢাকার আধুনিকায়ন: দীর্ঘকাল পর ঢাকা পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এখানে কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন, সেক্রেটারিয়েট (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ অংশ) এবং গভর্নমেন্ট হাউস নির্মিত হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
  • শিক্ষার প্রসার: পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
  • অর্থনৈতিক জোয়ার: চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয় এবং ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে পাট ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৪. প্রদেশের বিলুপ্তি বা বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)

মুসলিমরা এই প্রদেশ গঠনে খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়, আইনজীবী এবং জাতীয় কংগ্রেস এটিকে ‘বঙ্গমাতা’র অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর উপলক্ষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।

নবাব সলিমুল্লাহর জোরালো দাবিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়।

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা

অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল。 এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, যার হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়。

নিচে এই ঐতিহাসিক দলটির প্রতিষ্ঠা, পটভূমি এবং গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি

  • বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগে。 কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং কলকাতার হিন্দু সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মুসলিম নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজস্ব একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল প্রয়োজন。
  • শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন。 তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও চাকরিতে কোটার দাবি জানান, যা ইতিবাচক সাড়া পায়。

২. ঐতিহাসিক সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠা

  • এডুকেশনাল কনফারেন্স: ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকার শাহবাগে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়。
  • রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব: কনফারেন্সের শেষ দিন, ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন。
  • সমর্থন ও অনুমোদন: এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী。 উপস্থিত প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে。

৩. প্রথম নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর

  • প্রথম সভাপতি (অস্থায়ী): ঢাকার এই ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মূলক
  • প্রথম স্থায়ী সভাপতি: ১৯০৮ সালে করাচি অধিবেশনে স্যার আগা খানকে দলের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
  • প্রধান কার্যালয়: দলটির প্রথম সদর দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে।

৪. মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

দলটি মূলত তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল:

  • ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা。
  • ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা。
  • মুসলিম লীগের মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা。

নবাব সলিমুল্লাহর দূরদর্শিতা এবং ঢাকার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগই পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে。

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মূলত ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতৃবৃন্দের জোরালো ও আপসহীন দাবির মুখেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির পটভূমি ও ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১. দাবির মূল পটভূমি (বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১)

  • মুসলিমদের হতাশা: ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠনের পর ঢাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার হিন্দু নেতা ও কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে।
  • অধিকার হরণ: বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং পূর্ববঙ্গ পুনরায় কলকাতার অধীনে চলে যায়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করে।

২. লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি (১৯১২)

  • নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শান্ত করতে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।
  • দাবি উত্থাপন: ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
  • ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিনিধি দলটি বড়লাটের কাছে জোরালো দাবি জানান যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অবিলম্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

৩. ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ও নাথান কমিটি

  • বড়লাটের ঘোষণা: মুসলিম নেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও যৌক্তিক দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়।
  • কলকাতার হিন্দু মহলের বিরোধিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কলকাতার একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতা (যাঁদের মধ্যে ড. রাসবিহারী ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্যতম)। তাঁদের যুক্তি ছিল, ঢাকার মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার মান কমে যাবে এবং এটি হবে “টাকা অপচয়”।
  • নাথান কমিটি গঠন: সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা ও খসড়া তৈরি করে।

নবাব সলিমুল্লাহর অটল দাবি এবং ৬০০ একর জমি দানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।

আকস্মিক প্রয়াণ

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক প্রয়াণ (মৃত্যু) ছিল তৎকালীন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় ধাক্কা এবং একটি গভীর রহস্য। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মৃত্যুর আকস্মিকতা ও সন্দেহ

নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ডিনারের পর তিনি হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। কোনো পূর্ব অসুস্থতা ছাড়া একজন শীর্ষ নেতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বাংলায় খাবারে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

২. রাজনৈতিক বিরোধ ও কারণ

১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার পর থেকে নবাব সলিমুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ রাজের চরম দূরত্ব তৈরি হয়।

  • তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
  • তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ছক আঁকছিলেন।
  • ধারণা করা হয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ শাসক বা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

৩. নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও পাহারা

নবাবের প্রয়াণের পর ব্রিটিশ সরকারের কিছু রহস্যজনক আচরণ এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়:

  • মরদেহ স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা: তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে স্বজনদের লাশ স্পর্শ করতে বা মুখ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
  • কঠোর প্রহরায় ঢাকা আনা: ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিশেষ স্টিমারে করে পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
  • কবর পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন। অনেকের মতে, মৃত্যুর আসল কারণ আড়াল করতে কেউ যেন লাশ তুলে পুনরায় পরীক্ষা (Post-mortem) করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।

নবাব সলিমুল্লাহর এই আকস্মিক প্রয়াণ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জাগরণকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এটি আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার আধুনিকায়নে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এই পরিবারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশাল ত্যাগ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগরও ছিলেন এই নবাবরা।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব পরিবারের অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপসহীন দাবি এবং তাঁর পরিবারের বিশাল ত্যাগের ওপর।

  • রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণের দাবি: ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিবাদে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান।
  • বিশাল জমি দান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ঢাকার রমনা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রায় ৬০০ একর নিষ্কর জমি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দান করেন। এই বিশাল জমির ওপরই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবস্থিত।
  • অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত ‘নাথান কমিটি’ (Nathan Committee)-র অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালুর আগেই ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়, তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে।
  • স্মৃতি ও স্বীকৃতি: নবাব সলিমুল্লাহর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (SM Hall)

২. ঢাকার আধুনিকায়ন ও সমাজকল্যাণে নবাব পরিবারের অবদান

শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে নবাব পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি পাওয়ার পর এই পরিবার ঢাকার চেহারা বদলে দেয়।

  • বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্টেশন (নবাব আব্দুল গণি): ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল এবং কলেরা-টাইফয়েডের মতো মহামারি লেগেই থাকত। নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজস্ব অর্থায়নে ‘ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস’ বা পানির ফিল্টার স্টেশন স্থাপন করেন, যা ঢাকাবাসীকে প্রথম বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ করে দেয়।
  • প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (নবাব খাজা আহসানুল্লাহ): ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর অর্থায়নেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজপথে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে।
  • চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন: ঢাকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নবাব পরিবার বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছিল। তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উন্নয়নে এই পরিবার নিয়মিত অর্থ ও জমি দান করত।
  • যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিকাশ: ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নবাবদের ভূমিকা ছিল প্রধান। এছাড়া আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে নাটক, থিয়েটার, কাওয়ালি এবং সাহিত্য চর্চার এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
  • আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাসস্থান এবং পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের আধুনিক তথ্য

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইন ই-টিকিট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৩ সালে সংস্কারের পর এর গ্যালারিগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার এই ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদটি পরিদর্শনের জন্য ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট ও আধুনিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

১. অনলাইন ই-টিকিট কাটার নিয়ম ও মূল্য

আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের জন্য এখন আর কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। দর্শনার্থীদের মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়।

  • অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: টিকিট কাটার জন্য আহসান মঞ্জিল ই-টিকিট পোর্টাল (ahsanmanzilticket.gov.bd) ভিজিট করতে হবে।
  • টিকিটের মূল্য তালিকা:
    • দেশী প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী: ৪০ টাকা (অনলাইন চার্জসহ প্রায় ৪২ টাকা)
    • শিশু (১২ বছরের কম): ২০ টাকা
    • সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৩০০ টাকা
    • অন্যান্য বিদেশী পর্যটক: ৫০০ টাকা
    • (বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।)

২. বর্তমান সময়সূচি (২০২৬)

সপ্তাহের একেক দিন আহসান মঞ্জিলের পরিদর্শনের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে:

  • শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকাল ০৪:৩০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় বিকাল ৪:০০ টা)।
  • শুক্রবার: বিকাল ০৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ০৭:০০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬:০০ টা)।
  • সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রধান সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও এটি বন্ধ থাকে।

৩. আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভেতরের পরিবেশ

  • ডিজিটাল গ্যালারি: আহসান মঞ্জিলের মোট ২৩টি গ্যালারিকে আধুনিক আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। এখানে নবাব আমলের রাজকীয় আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম, নাচঘর, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক দুর্লভ আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে।
  • নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: প্রাসাদের মূল ভবনের ভেতরে সব ধরনের ক্যামেরা, ট্রাইপড এবং ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষেধ (মহিলাদের ছোট পার্স বাদে)। কাউন্টারের পাশে লকার রুমে এগুলো জমা রাখতে হয়। ভবনের ভেতরে ছবি বা সেলফি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে বাইরের বিশাল সবুজ বাগান ও সিঁড়িতে ছবি তোলা যায়।
  • সহজ যাতায়াত: পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের খুব কাছেই এর অবস্থান। যানজট এড়াতে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আহসান মঞ্জিল পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ।

বাংলার শিক্ষা, রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তন ও অধিকার আদায়ে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই মহান নেতার মৃত্যু ইতিহাসের পাতায় আজও এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

পুরো পৃথিবী শাসনকারী দুই মুসলিম বাদশা

নিউজ ডেস্ক

August 25, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: বিশেষ গাইড / ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ | ইসলামিক রিসার্চ ও এসইও এডিটর

ইসলামিক ইতিহাস, তাফসির ও বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে—পৃথিবীর ইতিহাসে শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র চারজন শাসক সমগ্র বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য ও শাসন ক্ষমতা লাভ করতে পেরেছিলেন। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, এই চারজন বিশ্বশাসকের মধ্যে দুইজন ছিলেন মুমিন (মুসলিম) এবং দুইজন ছিলেন কাফির

যে দুই বিশ্বখ্যাত মুমিন ও মুসলিম বাদশা পুরো পৃথিবী শাসন করেছিলেন, তাঁরা হলেন—

১. হজরত সুলাইমান (আ.)

২. বাদশাহ জুলকারনাইন

(অন্যদিকে কাফির দুই শাসক ছিলেন নমরুদ এবং বাবেল বা ব্যবিলনের রাজা বখতে নেছার/নেবুচাদনেজার)।

নিচে এই দুই মহান মুমিন সম্রাটের শাসনব্যবস্থা ও পবিত্র কুরআনের রেফারেন্সসহ ইন-ডেপথ রূপরেখা তুলে ধরা হলো।

১. সমগ্র বিশ্ব শাসনকারী চার সম্রাটের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

                                [ বিশ্ব শাসনকারী চার সম্রাট ]
                                             │
        ┌────────────────────────────────────┴────────────────────────────────────┐
        ▼                                                                         ▼
 [ ১. মুমিন/মুসলিম শাসক ]                                                 [ ২. কাফির/অমুসলিম শাসক ]
  • হজরত সুলাইমান (আ.)                                                     • নমরুদ (ইব্রাহিম আ.-এর সাময়িক প্রতিপক্ষ)
  • বাদশাহ জুলকারনাইন                                                      • বখতে নেছার (নেবুচাদনেজার)

২. কুরআনের আলোকে দুই মুসলিম বাদশার শাসন ও ক্ষমতা

বাদশার নামশাসনামলের বিশেষ ক্ষমতাকুরআনের প্রধান রেফারেন্স
হজরত সুলাইমান (আ.)মানুষ, জিন, বাতাস এবং পশুপাখির ওপর অলৌকিক কর্তৃত্ব ও একচ্ছত্র শাসনসূরা আন-নামল (আয়াত ১৬, ১৮) & সূরা সাবা (আয়াত ১২)
বাদশাহ জুলকারনাইনপ্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার, ন্যায়বিচার ও ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিরোধে তামা-লোহার প্রাচীর নির্মাণসূরা আল-কাহফ (আয়াত ৮৩-৯৮)

৩. দুই মহান মুমিন শাসকের শাসন ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ

                           [ দুই মুমিন শাসকের ক্ষমতার উৎস ]
                                             │
       ┌─────────────────────────┬───────────┴───────────┬─────────────────────────┐
       ▼                         ▼                       ▼                         ▼
 [ পশুপাখির ভাষা ]         [ বাতাসের গতি ]         [ জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ]     [ বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ]
  • সুলাইমান (আ.) কে          • এক মাসের পথ এক         • জ্বিন প্রজাতি তাঁর         • জুলকারনাইনের প্রাচ্য ও
    পাখির ভাষা শেখানো হয়।       দিনে অতিক্রম করতেন।       হুকুম মেনে কাজ করত।        প্রতীচ্যে ন্যায় শাসন।

১. হজরত সুলাইমান (আ.)

আল্লাহ তাআলা তাঁকে কেবল মানুষের ওপরই নয়, বরং সমগ্র জগত—যেমন জিন জাতি, বাতাস এবং সমস্ত পশুপাখির ওপর অলৌকিক ক্ষমতা দান করেছিলেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

“সুলাইমান ছিল দাঊদের উত্তরাধিকারী এবং সে বলেছিল, ‘হে লোক সকল! আমাকে পাখির বুলি শেখানো হয়েছে এবং আমাকে সর্বপ্রকার বস্তু প্রদান করা হয়েছে। এ অবশ্যই সুস্পষ্ট অনুগ্রহ।'”(সূরা আন-নামল: ১৬)

২. বাদশাহ জুলকারনাইন

জুলকারনাইন ছিলেন একজন একত্ববাদী, ন্যায়পরায়ণ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মহান বাদশা। আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত শাসন করার উপায়-উপকরণ ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বভ্রমণকালে উৎপীড়িত জাতিকে রক্ষার জন্য ইয়াজুজ ও মাজুজের হামলা থেকে বাঁচতে লোহা ও গলিত তামার তৈরি এক সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেন।

“আমি তাকে পৃথিবীতে আধিপত্য দান করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দিয়েছিলাম।”(সূরা আল-কাহফ: ৮৪)

৪. শেষ বিচারে ইসলামিক শিক্ষা

১. ক্ষমতার আসল মালিক আল্লাহ: এই দুই মহীয়ান শাসকের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার মালিক হলেও তাঁরা কখনো অহংকারী হননি, বরং আল্লাহর শোকরগুযারি করেছেন।

২. ন্যায়বিচারের আদর্শ: রাষ্ট্র পরিচালনায় জুলকারনাইন ও সুলাইমান (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতা বিশ্বের সর্বকালের শাসকদের জন্য এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

প্রতিবেদন পর্যালোচনার শেষ কথা: পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক প্রভাবশালী শাসক আসলেও সমগ্র বিশ্বকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনকারী প্রধান দুই মুসলিম ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত সুলাইমান (আ.) ও বাদশাহ জুলকারনাইন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন

নিউজ ডেস্ক

August 24, 2026

শেয়ার করুন

বিভাগ: বিশেষ প্রতিবেদন / জাতীয় ও নির্বাচন ডেস্কে প্রকাশিত

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ | সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডাটা অ্যানালিস্ট

২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সফল সমাপ্তির পর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) এখন দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মৌসুম কেটে যাওয়ার পর আগামী অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে।

এই কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আওতায় ময়মনসিংহ জেলার ভারত সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলার স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে।

১. আগে কেন ইউপি নির্বাচন, পরে উপজেলা নির্বাচন? (আইনি বাধ্যবাধকতা)

স্থানীয় সরকার আইনের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর কারণে সারা দেশের মতো ধোবাউড়া উপজেলাতেও আগে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শেষ করা আইনত বাধ্যতামূলক।

                                [ নির্বাচনের আইনি ক্রমধারা ]
                                             │
        ┌────────────────────────────────────┴────────────────────────────────────┐
        ▼                                                                         ▼
 [ ১. ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ]                                     [ ২. উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ]
  • নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে পরিষদে যোগ দেবেন।                        • নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানরা পদাধিকারবলে 
  • ধোবাউড়ার ৭টি ইউনিয়নের ভোট প্রথম ধাপে সম্ভাব্য।                            উপজেলা পরিষদের সদস্য হবেন।

২. ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার নির্বাচনী রূপরেখা

ধোবাউড়া উপজেলা মূলত ৭টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত। ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন কার্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে ভোটার তালিকা অপটিমাইজেশন এবং ভোটকেন্দ্র চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে।

নির্বাচনের বিভাগআওতাভুক্ত অঞ্চল / পদ সংখ্যাআইনি কাঠামো ও ২০২৬ সালের নতুন পরিবর্তনের বিবরণ
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি)৭টি ইউনিয়ন (ধোবাউড়া, বাঘবেড়, দক্ষিণ মাইজপাড়া, গামারীতলা, গোয়াতলা, ঘোষগাঁও, পোড়াকান্দুলিয়া)• দলীয় প্রতীক ছাড়া উন্মুক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন।
• অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রথম ধাপেই ভোটগ্রহণের সম্ভাবনা বেশি।
উপজেলা পরিষদ১ জন চেয়ারম্যান, ১ জন ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১ জন মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান• ৭টি ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়সূচিতে উপজেলা পরিষদ ভোট হবে।
• প্রশাসন ইউএনও-এর তত্ত্বাবধানে নির্বাচনমুখী প্রস্তুতি সাজাচ্ছে।

৩. নতুন আচরণবিধি ২০২৬ ও সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা পরিকল্পনা

                           [ ধোবাউড়া নির্বাচনের ৪টি মূল স্তম্ভ ]
                                             │
       ┌───────────────────────┬─────────────┴──────────────┬───────────────────────┐
       ▼                       ▼                            ▼                       ▼
 [ ১. দলীয় প্রতীক মুক্ত ]     [ ২. সীমান্ত নিরাপত্তা ]     [ ৩. স্পর্শকাতর কেন্দ্র ] [ ৪. নিরপেক্ষ ইসি নীতি ]
  • মার্কা মুক্ত স্বতন্ত্র      • বিজিবি ও পুলিশের বিশেষ      • পাহাড় ঘেষা কেন্দ্রগুলোতে     • কোনো রকম অনিয়ম সহ্য 
    প্রতিযোগিতার সুযোগ।        টহল ও পর্যবেক্ষণ।             বাড়তি আনসার মোতায়েন।       না করার জিরো টলারেন্স।

প্রধান পরিবর্তন ও নিরাপত্তা পদক্ষেপ:

১. দলীয় প্রতীক মুক্ত নির্বাচন: ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০২৬’-এর অধীনে এবার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দলীয় প্রতীক থাকছে না। এর ফলে সাধারণ ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা অবাধে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।

২. সীমান্তবর্তী বিশেষ ব্যবস্থা: ধোবাউড়া এলাকাটি পাহাড়ের পাদদেশে ও ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় ইসি এবং ময়মনসিংহ পুলিশ প্রশাসন সহিংসতা এড়াতে ও বহিরাগত প্রভাব রোধ করতে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

৪. ডেক্স অ্যানালিসিস: শেষ বিচারে ধোবাউড়াবাসীর জন্য বার্তা

১. সময়সূচির নিশ্চিতকরণ: দুর্গাপূজা এবং পাবলিক পরীক্ষার রুটিন সমন্বয় করে নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের শুরুতেই চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করবে।

২. গণতান্ত্রিক সুযোগ: স্থানীয় পর্যায়ের জবাবদিহিতা বাড়াতে এবং দুর্নীতি রোধে উন্মুক্ত মার্কাভিত্তিক ভোটের ব্যবস্থা তৃণমূলের রাজনীতিতে নতুন ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনার শেষ কথা: জাতীয় নির্বাচনের ন্যায় স্বচ্ছতা ধরে রেখে ২০২৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ধোবাউড়া উপজেলার জনগণ তাদের যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করার পূর্ণ সুযোগ পাবেন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ