অপরাধ

১/১১ (বাংলাদেশ) বনাম ৯/১১ (যুক্তরাষ্ট্র): ক্ষমতা, সন্ত্রাসবাদ ও গণতন্ত্রের সংকট বিশ্লেষণ | বিশেষ প্রতিবেদন
১/১১ (বাংলাদেশ) বনাম ৯/১১ (যুক্তরাষ্ট্র)

নিউজ ডেস্ক

November 29, 2025

শেয়ার করুন

ওয়ান-ইলেভেন (১/১১)।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একতরফা সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জারি হয় জরুরি অবস্থা। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবরণে গঠিত হয় সেনা নিয়ন্ত্রিত ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে পরবর্তীতে এটিকে ওয়ান ইলেভেন হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার।

১১ জানুয়ারী ২০০৭ এ সেনাবাহিনী সমর্থিত বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে। এইদিনটিকে ওয়ান-ইলেভেন বলে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রাজনীতিবিদদের জন্য একটি কলঙ্কিত অধ্যায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো প্রধান দু’টি দলের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়ায় দেশ যখন স্থবির হয়ে পড়ে তখন ওয়ান-ইলেভেন আসে।

রাজনীতির ওপর বীতশ্রদ্ধ সাধারণ জনগন প্রথমে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। তারা স্বস্তি পেয়েছিলেন। দেশের সেনাবাহিনী প্রথম বারের মতো সংবিধান স্থগিত করে সেনা শাসন জারি না করে দেশের সুশীল ব্যক্তিদের দিয়ে অরাজনৈতিক সরকার গঠন করে দেয়। স্বচ্ছ রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন, ওয়ান-ইলেভেন দেশের রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তা হয়নি। বরং সংস্কারের নামে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে পারষ্পরিক অনাস্থা, সন্দেহ, অবিশ্বাসের জন্ম হয়। যার রেশ এখনও কাটেনি।

ওয়ান-ইলেভেনের ফখরুদ্দিন -মইন ইউ সরকার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়েছিলো। নেতাদের বিভক্ত করার পাশাপাশি ওয়ান-ইলেভেনের সরকার দলের নেতাদের মধ্যে পারষ্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অনাস্থা তৈরি করেছিলো। সে সময় দুই দলের নেতাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ডে নির্যাতন থেকে বাঁচতে নিজ নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেন নেতারা। শুধু তাই নয়, কারাবন্দি নেতারা তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি যে সব বিষোদগার করতেন তা আবার সংবাদ মাধ্যমে চলে আসতো।

(বাংলাদেশে এক-এগারোর পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পটভূমিতে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার অবস্থান রাজনীতিতে আরও সংহত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।)

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে দলীয় সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের সরকার। তাদের ভাষায় রাজনীতি ক্লিন বা পরিষ্কার রাখার জন্যই ছিল সে চেষ্টা। এ জন্য দল দুইটির কিছু সিনিয়র নেতাদের নিয়ে সংস্কার প্রস্তাবও দেয়া হয়। তথাকথিত রাজনৈতিক সংস্কার চেষ্টা ব্যর্থ হবার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং দলের ভেতরে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার অবস্থান আরও সংহত হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর দল দুইটি কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের ভেতরে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করে। শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয় এর মাধ্যমে।

ওয়ান-ইলেভেনের সমাপ্তি ঘটে ২৮ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ক্ষমতায় যাওয়ার কারণে সংস্কারপন্থী নামে পরিচিত নেতারা আওয়ামী লীগের খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি। তবে ক্ষমতাবঞ্চিত বিএনপির মধ্যে সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে দলটির ব্যাপক ক্ষতি করেছে।এখনও খালেদা জিয়া পন্থী ও সংস্কারপন্থী বিভেদ অটুট রয়েছে। সে কারণে সরকার বিরোধী আন্দোলনসহ কোন কর্মসূচিতেই সফলতা দেখাতে পারেনি দলটি। ওয়ান-ইলেভেনের সরকার প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও অভিজ্ঞ নেতাদের দিয়ে সংস্কার প্রস্তাব দেওয়ায়। এতে করে তাদের প্রতি শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব, অবিশ্বাস ও অনাস্থা তৈরি হয়। এই সুযোগে দলের মধ্যে দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা নেতাদের পাশাপাশি দ্বিতীয় সারি ও তৃণমূলের নেতারা সামনে চলে আসে।

(২০০৬ সালের ২৯শে অক্টোবর প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।)

(প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জনাব ফখরউদ্দিন আহমেদকে শপথ বাক্য পাঠ করান।)

ওয়ান-ইলেভেন (১/১১) ঘটনা প্রবাহঃ

দিনভরই চারদিকে ছিল নানা গুজব, গুঞ্জন। সার্বিক পরিস্থিতি ছিল থমথমে। এই অবস্থায় বিকেল চারটার দিকে আওয়ামী লীগের তত্কালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও কাজী জাফর উল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল যোগ দেন কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে। কূটনীতিকদের মধ্যে বৈঠকে ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিস, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনার ডগলাস ফসকেট, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইনোওয়ে মাসাইয়েকি, ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত ড. স্টিফান ফ্রোইন ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা ডেজালিয়েন। বিকেল পৌনে পাঁচটা পর্যন্ত বৈঠক শেষে অনেকটা হতাশ হয়ে বেরিয়ে আসেন আওয়ামী লীগ নেতারা। আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সাংবাদিকদের কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান তারা। কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসা থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা সরাসরি চলে যান দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির সুধাসদনের বাসায়।আওয়ামী লীগ নেতারা বের হওয়ার আধাঘণ্টা পর বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে কানাডিয়ান হাইকমিশনারের বাসায় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া। বৈঠক শেষে তারাও মুখ খোলেননি। সোজা চলে যান গুলশানের হাওয়া ভবনে। সেখানে তারা বৈঠক করেন দলীয় চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এর আগে দুপুর পৌনে বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের সঙ্গে তার বারিধারার বাসায় বৈঠক করেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী।কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রধান দু’টি দলের বৈঠকের আগে প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দুপুর বারোটায় বৈঠক করেন আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সঙ্গে। এতে কমিটির সদস্যরা ছাড়াও সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পরপরই রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন বঙ্গভবনে তিন বাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। অন্যদিকে বিকেল সাড়ে চারটায় উপদেষ্টা পরিষদের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়। দু’-একজন ছাড়া উপদেষ্টাদের প্রায় সবাই বঙ্গভবনে গিয়ে বৈঠক বাতিলের খবরে ফিরে আসেন।বঙ্গভবনের বৈঠক শেষে বিমান বাহিনী প্রধান, নৌ বাহিনী প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‍্যাব, বিডিআরসহ সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে সেনাসদরে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ।রাত সাড়ে আটটায় বঙ্গভবনে পুনরায় ডাকা হয় উপদেষ্টাদের। কোনো বৈঠক ছাড়াই উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে উপদেষ্টাদের অবহিত করা হয়। এসময় উপদেষ্টাদের সবাইকে পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়। এরপর প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাষ্ট্রপতি। একইসঙ্গে উপদেষ্টারাও পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ডক্টর ফকরুদ্দিন আহমদকে। তিনি নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন।এসব নাটকীয় ঘটনা ও টানটান উত্তেজনা-উদ্বেগের মধ্যেই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয় ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন এবং বিপদের সম্মুখীন হওয়ায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন’। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়— বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে জরুরি অবস্থা কার্যকর হবে। একইসঙ্গে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সকল মহানগর এবং জেলা শহরে কারফিউ বলবত্ থাকার ঘোষণাও দেয়া হয়।এরপর নানা উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার মধ্যে রাত সাড়ে এগারোটায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ভাষণে তিনি বলেন, একইসঙ্গে দু’টি দায়িত্ব নেয়ার পর তাকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। এই অবস্থায় সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথকে সুগম করতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাতে সরকারের তথ্য অধিদফতর থেকে মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে রাজনৈতিক সংবাদ ও সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়। তাত্ক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় টিভি চ্যানেলের খবর ও টকশো।

সূত্রঃ -উইকিপিডিয়া

–ওয়ান ইলেভেনের অজানা কথা Dhakapress24.

১১ সেপ্টেম্বরের হামলা (যা নাইন/ইলেভেন নামেও পরিচিত) ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে যুক্তরাষ্ট্রের উপর আল কায়েদার একইসাথে চারটি সমন্বিত সন্ত্রাসী হামলা।

আক্রমনের ২,৯৯৭ জন নিহত এবং ৬,০০০ এর অধিক মানুষ আহত হয়, এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক অবকাঠামো ও সম্পদ।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সকালে ১৯ জন ছিনতাইকারী চারটি বাণিজ্যিক বিমানের (দুটি বোয়িং ৭৫৭ ও দুটি বোয়িং ৭৬৭) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিমান চারটি ম্যাসাচুসেট্‌স অঙ্গরাজ্যের বস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের নিওয়ার্কের নিওয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের লাউডেন কাউন্টি ও ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির ওয়াশিংটন ডালস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের ল্যাক্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সান ফ্রান্সিস্কোর এসএফও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিল।ছিনতাইয়ের জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রমকারী বৃহৎ বিমানগুলো বাছাই করা হয়েছিল, কারণ সেগুলো জ্বালানিতে পূর্ণ থাকে।

ওসামা বিন লাদেন এই হামলার নেপথ্যে ছিলেন বলে ধারণা করা হয় এবং শুরুতে তিনি তার জড়িত থাকার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানালেও পরে তিনি তার মিথ্যা বক্তব্যকে অমূলক বলে উল্লেখ করেন। আল জাজিরা ২০০১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে বিন লাদেনের এক বক্তব্য প্রচার করে, যেখানে তিনি বলেন, “আমি জোড় দিয়ে বলছি যে আমি এই কাজ করিনি, মনে হয় কেউ তার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে এই হামলা চালিয়েছেন।” ২০০১ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানের জালালাবাদ থেকে একটি ভিডিওটেপ উদ্ধার করেন। ভিডিওতে দেখা যায় বিন লাদেন খালেদ আল-হারবির সাথে কথা বলছেন এবং এই হামলার সম্পর্কে তার জানার বিষয়টি স্বীকার করছেন।

(৯/১১ হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন খালিদ শেখ মোহাম্মদ বা সংক্ষেপে কেএসএম।)

২০০২ সালে আল জাজিরার সাংবাদিক ইয়োরসি ফুয়োদা, এই জঙ্গি নেতা খালিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। খালিদ সে সাক্ষাৎকারে জানান, নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়ার কোথাও আমেরিকার বিমান উড়িয়ে দেওযার স্বপ্ন ছিল তার। সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ওসামা বিন লাদেনর সঙ্গে দেখা হলে খালিদ তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পান।

হামলা চালাতে আল কায়দা সৈন্য, অর্থ ও আনুষাঙ্গিক সাহায্য দেবে বলে খালিদকে জানান লাদেন। সেই সঙ্গে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে লাদেনের পছন্দ হয় নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন শহর দু’টিকে।

হামলার মাধ্যমে লাদেন ও খালিদের ইচ্ছা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে দখলদারিত্ব ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করা। সেই সঙ্গে হামলার মাধ্যমে বিশ্বে আল কায়দার সাংগঠনিক শক্তি নতুন করে প্রকাশ করারও সুযোগ পায় তারা।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ঘটনা:

মঙ্গলবার, সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিট। নিউইয়র্কের আকাশে সেদিন ঝকঝকে রোদ। ১১০ তলা উঁচু ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারের আশি তলায় আছড়ে পড়ে ছিনতাইকৃত কুড়ি হাজার গ্যালন জ্বালানী বোঝাই আমেরিকান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৬৭ বিমান। বিমানটি যেখানে টাওয়ারটিকে আঘাত করে সেখানে মুহূর্তেই বিশাল অগ্নিকুণ্ডময় গর্ত সৃষ্টি হয়। চোখের পলকে মৃত্যু হয় ওই ফ্লোরগুলোতে থাকা প্রত্যেকর।

টেলিভিশন ক্যামেরাগুলো তখন ঘটনার সরাসরি ছবি সরবরাহ করে যাচ্ছিলো। উত্তর ও দক্ষিণ – দুটি টাওয়ার থেকেই মানুষদের সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছিলো। এমন সময় প্রথম হামলার ঠিক আঠারো মিনিট বাদে অন্য একটি বোয়িং ৭৬৭ বিমান এসে হাজির হলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল বেগে সাউথ টাওয়ারের ৬০তম তলায় আঘাত করল। পুরো টাওয়ারটিকে যেন দুভাগ করে ফেললো বিমানটি। প্রথম বিমানটি অতর্কিত হামলা করায় সেটির বেশি ফুটেজ পাওয়া যায় নি, তবে দ্বিতীয় বিমানটি যখন আঘাত করে তখন অনেকেরই ক্যামেরা তাক করা ছিলো টুইন টাওয়ারের দিকে; তারা প্রথম আক্রমণের ভয়াবহতা রেকর্ড করছিলেন তখন মূলত। দ্বিতীয় আঘাতটি ছিলো আরো ভয়াবহ। রাস্তার পাশাপাশি পাশের দালানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছিলো জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ। প্রথম আক্রমণে অনেকে ভেবেছিলেন বিমানের পাইলট হয়তো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় হামলার পর আসল উদ্দেশ্য সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো। কারো বুঝতে বাকি রইলো না যে, আমেরিকা আন্ডার অ্যাটাক!

কারা করেছিলো আক্রমণ?

মার্কিন তদন্ত বলছে, আত্মঘাতী হামলাকারীরা ছিলো সৌদিসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশের নাগরিক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ছিল এই আক্রমণের পৃষ্ঠপোষক। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন পলাতক।

এত বড় একটি পরিকল্পিত হামলার পেছনে আল-কায়েদার প্রধান কারণ ছিলো তিনটি –

১। ইসরায়েলের প্রতি আমেরিকার বাড়াবাড়ি রকমের সমর্থন।

২। পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণ।

৩। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান অব্যাহত রাখা।

হামলাকারীদের কেউ কেউ হামলার এক বছর আগে থেকেই আমেরিকায় বসবাস করে আসছিলো। তারা আমেরিকাতেই বিভিন্ন বেসরকারি ফ্লাইট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক বছর যাবত বিমান উড্ডয়নের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলো বলে জানা যায়। বাকিরা হামলার মাসখানেক আগে আমেরিকায় আসে ও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করে।

ঘটনার দিন জঙ্গিদের ১৯ জনের দলটি তিন ভাগ হয়ে আমেরিকার পূর্ব উপকূলের তিনটি বিমান বন্দরের খুব সকালের ফ্লাইট ধরার জন্য রওনা দেয়। যে বিমানগুলো ক্যালিফোর্নিয়াগামী, সেগুলোকেই তারা ছিনতাইয়ের জন্য বেছে নেয়, কারণ তারা জানত, দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে যাওয়া বিমানগুলো থাকবে জ্বালানী ভরতি। নিরাপত্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে জঙ্গিরা সহজেই তাদের সঙ্গে ছুঁড়ি ও বক্স-কাটার নিয়ে বিমানে উঠতে সফল হয়। বিমান চারটি টেক অফের কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গিরা ভয় দেখিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানকে তারা পরিণত করে লক্ষ্যভেদী মিসাইলে।

পেন্টাগন আক্রমণ:

আমেরিকান প্রশাসনের নিরাপত্তা বিভাগের সদয়র দফতর হচ্ছে পেন্টাগন। এটি ওয়াশিংটন ডিসির শহরতলীতে অবস্থিত। টুইন টাওয়ারের ঘটনায় যখন সারা বিশ্বের চোখ নিউ ইয়র্কে নিবদ্ধ তখনই সবার অগোচরে পেন্টাগনের উপর ঘুরপাক খাচ্ছিলো জঙ্গি হামলার তিন নম্বর বিমান – আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৭৭। ঠিক সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটে পেন্টাগনের পশ্চিম পার্শ্বে আঘাত হানে বিমানটি। বোয়িং ৭৫৭ মডেলের বিমানটির জেট ফুয়েল মুহূর্তেই কংক্রিটের দৈত্যাকার দালানটিকে একখণ্ড নরকে পরিণত করে। পেন্টাগনের বিশাল একটি অংশ ধ্বসে পড়ে। বিমানে থাকা ৬৪ জন যাত্রী প্রাণ হারান। পেন্টাগনে মারা যান ১২৫ জন, আহতের সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একদম কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হেনে জঙ্গিরা জানান দেয়, তাদের শক্তি কতটুকু! বিশ্ব মোড়লদের সিংহাসন যেন খানিক সময়ের জন্য হলেও কেঁপে ওঠে।

পেন্টাগনে হামলার মিনিট ১৫ বাদে টুইন টাওয়ারের আতঙ্ক মারাত্মক রূপ ধারণ করে। প্রচণ্ড ধূলি ও ধোঁয়ায় আকাশ ভরে দিয়ে ধ্বসে পড়ে এর সাউথ টাওয়ার। জ্বলন্ত জেট ফুয়েলের সামনে সব প্রতিরোধই যেনো ছিলো অসহায়। সকাল সাড়ে দশটায় টুইন টাওয়ারের উত্তরের টাওয়ারটিও ধ্বসে যায়। ভবন দুইটি ধ্বসে যাওয়ার সময় তাতে থাকা ১৭ হাজার ৪০০ মানুষের মধ্যে মাত্র ২০ জনকে বের করে আনা সক্ষম হয়, যার মধ্যে ৬ জন নিজেদের অক্ষত রাখতে সমর্থ হন।

ফ্লাইট ৯৩

ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩ নামে ক্যালিফোর্নিয়াগামী অন্য একটি বিমান নিউ জার্সির নেওয়ারক লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে উড্ডয়নের ৪০ মিনিটের মাথায় ছিনতাই হয়। বিমানটি টেক অফে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হওয়ায় বিমানের যাত্রীরা ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্কের ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলো। তাই তারা যখন দেখতে পেলো তাদের বিমানটিও ছিনতাই হয়েছে, বুঝতে আর বাকি রইলো না কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থের বলি হতে যাচ্ছে তারা।

বিমানের যাত্রীরাও বসে থাকেননি। চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সবাই মিলে চার ছিনতাইকারীকে আক্রমণ করেন। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মাধ্যমে বিমানের ককপিটে হামলা চালিয়ে বিমান নিয়ন্ত্রণকারী জঙ্গিকে বিপাকে ফেলে দেন। যে বিমানটি হামলা করার কথা ছিলো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বাসভবন হোয়াইট হাউসে, সেটি গিয়ে আছড়ে পড়ল পেনসিলভানিয়ার একটি খোলা মাঠে। বিমানের ৪৪ আরোহীর সবাই প্রাণ হারালেন। কিন্তু তাতে কি! ছিনতাইয়ের পর তারা তো জানতেনই তাদের জীবন সায়াহ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। অসহায়ের মতো না মরে তারা জঙ্গিদের উদ্দেশ্যের বলি না হয়ে বীরের মতো জীবন দিলেন !

হামলার পরিকল্পনা:

নিখুঁত পরিকল্পনায় হামলার ছক কষেছিল আল কায়দা ও তার মিত্ররা। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গোপন বৈঠক করা হয়। মূল পরিকল্পনা সাজাতে বৈঠক হয় মালয়েশিয়ায়। হামলাকারীরা মার্কিন ফ্লাইটগুলোর পর্যাপ্ত খোঁজখবর নিতে থাকেন। এছাড়া জার্মানির হামবুর্গে আল কায়দার একটি সমন্বয়কারী দল ছিল। এই হামলার টাকা এসেছে দুবাই থেকে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের সংগ্রহ করা হয়েছিল সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সবকিছুর পর্যবেক্ষণে ছিলেন আফগানিস্তান থেকে আলকায়দা নেতারা। সর্বোপরি ওসামা বিন লাদেন।

জার্মানির, হার্মবুগ থেকে চারজন প্রধান জঙ্গি বৈমানিক ও পরিকল্পনাকারী ছিলো এই হামলায়। তাদের বলা হতো হামবুর্গ সেল। হামলা পরিচালনায় এরাই ছিল মূল নেতৃত্বে। হার্মবুগ সেলের প্রধান হাইজ্যাকারের নাম মোহাম্মদ আতা। তিনি ও তার হামবুর্গ গ্রুপের অন্য সদস্যরা আফগানিস্তানে আসেন ১৯৯৯ সালে।

বিন লাদেন ও তার সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ আতেফ প্রথম সাক্ষাতেই বুঝতে পারেন অপরেশন পরিচালনার জন্য আতার নেতৃত্বে পশ্চিমা জিহাদি গ্রুপটি তাদের আফগান জিহাদিদের চেয়ে বেশি চতুর ও প্রশিক্ষিত। তাই মোহাম্মদ আতাকে প্রধান করে পুরো অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পরিকল্পনামাফিক হাইজাক্যাররা হামলার আগ থেকে ছোট ছোট গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করে রেকি করে ও বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেয়। আতা যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন সময়ে হামলার বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়ে নিয়মিত তার সহযোগী ও কামান্ডারদের সাথে ইমেইলে আপডেট পাঠাত ও যোগাযোগ রাখত।

আতা সাংকেতিক ভাষায় বার্তাগুলো তার ‘গার্লফ্রেন্ড জেনি’কে উদ্দেশ্যে করে লিখত। যেমন— একটি ইমেইল বার্তায় বলা হয়, তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সেমিস্টার শুরু হবে। প্রাইভেট শিক্ষার জন্য চারটি পরীক্ষা ও ১৯টি সনদপত্র। লাগবে এখানে ‘১৯টি সনদ’ বলতে ‘১৯ জন আল কায়দা হাইজাক্যার’ ও ‘চারটি পরীক্ষা’ বলতে ‘চারটি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু’র কথা বলা হয়েছে।

২৯ অগাস্ট ২০০১ সালে আতা (atta) আরেকটি ইমেলই বার্তায় বলেন, দু’টি লাঠি, একটি ড্যাশ ও একটি কেক লাঠি ঝুলানো। অর্থ্যাৎ দুই সপ্তাহের মধ্যে হামলাটি ঘটবে। দুটি লাঠি মানে ১১। পরের অংশটিতে ৯ বুঝানো হয়েছে। এখানে ১১-৯ বা ৯-১১ দু’ভাবেই হামলার সম্ভাবনার কথা বিন লাদেন জানানো হয়েছে।

বিমান হাইজ্যাক ও আক্রমণ:

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মহ আতা ও তার সহযোগী আক্রমণকারীরা আমেরিকার চারটি অভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে। অস্ত্রের মুখে তারা বিমান ক্রু ও যাত্রীদের নিষ্ক্রিয় করে রাখে। সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে বোস্টন থেকে উড়ে আসা ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১’ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ভবনটিতে প্রথম হামলে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা ভেবেছিল, এটি ছোটখাট কম্পিউটারচালিত খেলনা বিমান। কিন্তু ১৭ মিনিট পরে বোস্টন থেকে উড়া আসা দ্বিতীয় বিমান ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫’ যখন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারটিতে হামলে পড়ে, তখন আর কারোরই সন্দেহের অবকাশ ছিল না এটি সন্ত্রসী হামলা। তখন টাওয়ার দু’টির ভেতরে আটকা পড়া কেউ কেউ দুঃসহ মৃত্যু থেকে বাঁচতে লাফ টাওয়ার থেকে লাফও দিয়েছিলেন।

এদিকে, ডালাস এয়ারপোর্ট থেকে উড়ে আসা তৃতীয় বিমান ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৭৭’ হামলে পড়ে হয় পেন্টাগণের দক্ষিণ-পশ্চিমে, সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। আর চতুর্থ বিমান ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৯৩’ নিউজার্সি থেকে উড়েছিল। ১০টা ৩ মিনিটে এটি পেনসিলভ্যানিয়ার স্নেকসভাইলে বিধ্বস্ত হয়।

মোট কত লোকের প্রাণহানি হয়?

৯/১১ হামলায় সর্বমোট ২৯৯৬ জন মানুষ প্রাণ হারান। এদের মধ্যে হামলাকারী বিমানগুলোতে থাকা ১৯ জঙ্গিও ছিলো। জঙ্গিরাও জানতো সফল হলেও তাদের কেউ আর বেঁচে ফিরবে না। নিউ ইয়র্ক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রেই কেবল ২,৭৬৩ জন মানুষ মারা যান। এদের মধ্যে ৩৪৩ জন ছিলেন দমকল বাহিনীর কর্মী ও চিকিৎসক এবং ২৩ জন নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ কর্মকর্তা ও ৩৭ জন বন্দর পুলিশের কর্মকর্তাসহ ৭১ জন পুলিশ কর্মকর্তা। টাওয়ারে আটকে পড়াদের বের করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

(ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টাওয়ার দুটির শূন্য স্থানে আলোর স্মারক স্তম্ভ)

(নিউইয়র্কে ৯/১১র মেমোরিয়াল)

সূত্রঃ ডেইলি বাংলাদেশ। উইকিপিডিয়া, বিবিসি বাংলা।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মনোহর আইচ রুটিন,

নিউজ ডেস্ক

October 15, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ক্রীড়ার ইতিহাস, ফিটনেস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
  • প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): NABBA World Bodybuilding Archives, Indian Bodybuilding Records, এবং Historic Sport Chronicles.

বাঙালির শৌর্য, বীরত্ব এবং শারীরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেই যাঁদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ এবং মনতোষ রায় অন্যতম। প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের ও ব্রিটিশ ভারতের পতাকা উড়িয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় মনোবল থাকলে উচ্চতা বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের অন্তরায় হতে পারে না।

১. বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের শরীরচর্চার রুটিন (Workout Routine)

মনোহর আইচ (১৭ মার্চ ১৯১২ – ৫ জুন ২০১৬), যিনি তার মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং অবিশ্বাস্য পেশীবহুল শরীরের জন্য বিশ্বজুড়ে “পকেট হারকিউলিস” (Pocket Hercules) নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, ১৯৫২ সালে ভারতের জন্য দ্বিতীয় মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) শিরোপা জয় করেন। ১০৪ বছর বছর বাঁচার পেছনে তার কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, স্টেরয়েড ও সাপ্লিমেন্টমুক্ত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শরীরচর্চার রুটিন এবং সাধারণ জীবনযাত্রা আজীবন অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

তার শরীরচর্চার রুটিন এবং দৈনন্দিন লাইফস্টাইলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. প্রাথমিক জীবন ও জেলখানার কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম (ক্যালিস্থেনিক্স)

  • ১২ বছর বয়সে শুরু: শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মনোহর আইচের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। নিজের শক্তি ফিরে পেতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি পুশ-আপ, স্কোয়াট, পুল-আপ, লেগ রেইজ এবং সিট-আপের মতো বডিওয়েট ব্যায়াম শুরু করেন। ওই বয়সেই তিনি প্রতি সেটে প্রায় ১০০টি করে রেপস (Reps) দিতে পারতেন。
  • কারাগারে ১২ ঘণ্টার সাধনা: ১৯৪২ সালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেওয়ার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়। কারাগারে কোনো জিমের সরঞ্জাম বা ওজন (Weights) ছিল না। সেখানে তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড এবং ক্যালিস্থেনিক্স ব্যায়াম করতেন, যা তার শরীরের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

২. পাওয়ার বডিবিল্ডিং ও জিমের রুটিন (যৌবন ও প্রতিযোগিতার সময়)

পরবর্তীতে যখন তিনি পুরোদমে ওয়েট ট্রেনিং শুরু করেন, তখন আধুনিক জটিল মেশিনের চেয়ে প্রাচীন ভারতীয় ব্যায়ামপদ্ধতি এবং ভারী ‘কম্পাউন্ড এক্সারসাইজ’-এর ওপর জোর দিতেন।

  • সকালের ওয়ার্কআউট: তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে টানা ৯০ মিনিট শরীরচর্চা করতেন।
  • প্রিয় ব্যায়ামসমূহ: তিনি পূর্ণাঙ্গ বডি ওয়ার্কআউটের অনুসারী ছিলেন। তার মূল রুটিনে থাকত ভারী স্কোয়াট (Squats), ডন-বৈঠক (Push-ups & Squats), বেঞ্চ প্রেস (Bench Press), ওভারহেড শোল্ডার প্রেস (Overhead Press), বারবেল রো (Barbell Rows), এবং বারবেল কার্ল (Barbell Curls)।
  • পাওয়ার স্টান্টের প্রস্তুতি: দাঁত দিয়ে স্টিল বাঁকানো, তরবারির ডগায় পেট ঠেকিয়ে রাখা কিংবা বুক দিয়ে লোহার রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য সব স্টান্ট প্রদর্শনের জন্য তিনি ঘাড় ও কোর মাসল মজবুত করার বিশেষ ব্যায়াম করতেন।

৩. শেষ বয়সের রক্ষণাবেক্ষণ রুটিন (Maintenance Schedule)

  • বয়স ৯০ পার হওয়ার পরও তিনি ব্যায়াম করা থামাননি। তবে শেষের দিকে হৃদযন্ত্রের মৃদু সমস্যার কারণে তিনি ভারী ওজন তোলা বন্ধ করে দেন।
  • শেষ বয়সে তিনি কেবল শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে হালকা ওজনের ডাম্বেল এবং বেশি রেপসের ৬ থেকে ৭টি ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতেন। এমনকি ১০০ বছর পার করার পরও তিনি তার জিমের ছাত্রদের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যায়াম শেখাতেন।

ডায়েট ও লাইফস্টাইল: দীর্ঘায়ুর গোপন চাবিকাঠি

মনোহর আইচ কোনো আধুনিক প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার করেননি। তার সুস্থ ১০৪ বছর বাঁচার মূল রহস্য ছিল খাঁটি বাঙালি খাবার:

  • খাদ্যাভ্যাস: সকালের নাস্তায় দুধ, চিঁড়ে এবং কফি। দুপুরে ও রাতে একদম সাধারণ ভাত, ডাল, নানা রকম তরকারি এবং টাটকা মাছের ঝোল। এছাড়া তার খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে দুধ, ফলমূল (আম, কাঁঠাল, ডাব) এবং শাকসবজি থাকত।
  • নেশামুক্তি: তিনি জীবনে কখনো মদ্যপান বা ধূমপান করেননি।
  • মানসিক প্রশান্তি: তিনি সবসময় বলতেন, “আমি কখনোই কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিই না। তরুণ বয়স থেকে উপার্জনের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি সবসময় হাসিখুশি থেকেছি।”

২. এশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স: মনতোষ রায়

মনতোষ রায় (২১ অক্টোবর ১৯১৭ – ২৯ জুন ২০০৫) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি বডিবিল্ডার বা শরীরচর্চাবিদ, যিনিএশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) খেতাব অর্জনের গৌরব লাভ করেন। ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় তিনি “গ্রুপ ৩ অ্যামেচার” (শর্ট মেন ডিভিশন) বিভাগে এই বিশ্বসেরা শিরোপা জয় করেছিলেন।

তার জীবন ও কীর্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রারম্ভিক জীবন ও সাধনা

  • জন্ম: ১৯১৭ সালের ২১শে অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী গজারিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
  • শৈশব ও সংগ্রাম: চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া মনতোষ রায় মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শরীরচর্চা শুরু করেন।
  • গুরু: তিনি বিখ্যাত বডিবিল্ডার এবং যোগগুরু বিষ্ণুচরণ ঘোষের (মহর্ষি পরমহংস যোগানন্দের ছোট ভাই) শিষ্য ছিলেন। গুরুর ছবি সামনে রেখে দ্রোণাচার্যের একলব্যের মতো নিষ্ঠা নিয়ে তিনি প্রথম দিকে ব্যায়াম সাধনা চালিয়ে যেতেন।

বডিবিল্ডিং ক্যারিয়ার ও সাফল্য

  • ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রতিযোগিতায় নেমে সফল না হলেও তিনি দমে যাননি, বরং অনুশীলনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন।
  • ১৯৪২ সালে তিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ জয় করেন।
  • মিস্টার ইউনিভার্স জয় (১৯৫১): লন্ডনের মঞ্চে তার সুগঠিত ও নান্দনিক শরীর দেখে দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষ করে তার ‘যীশু খ্রিস্ট’ পোজের (Jesus Christ posing routine) প্রদর্শনীটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতিযোগিতা শেষে তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত।

অবদান ও পরবর্তী জীবন

  • মিস্টার ইউনিভার্স জেতার পর ভারতে ফিরে তিনি ‘ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং ফেডারেশন’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
  • তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল কলেজে আইন বিভাগে শরীরচর্চা ও যোগব্যায়ামের শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তিনি শরীরচর্চার ওপর বইও লিখেছেন।
  • খালি হাতে স্টিলের রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
  • তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মলয় রায় (যিনি নিজে ৮ বারের মিস্টার ইন্ডিয়া এবং অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বডিবিল্ডার) পিতার প্রতিষ্ঠিত মাল্টিজিমটি পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, মলয় রায়কে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রে কাশীর হোটেলের সেই ব্যায়ামবীরের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল।

২০০৫ সালের ২৯শে জুন কলকাতার একটি নার্সিং হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৮ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৩. বাংলার শক্তিচর্চার আরেক রত্ন: গোবর গোহ

গোবর গোহ (জন্মনাম: যতীন চরণ গুহ; ১৩ মার্চ ১৮৯২ – ২ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলার শক্তিচর্চা ও কুস্তির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। ১৯২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলকে (Ad Santel) পরাজিত করে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে বিশ্ব পেশাদার কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ (World Light Heavyweight Championship) জয়ের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।

শরীরচর্চা ও কুস্তির ক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঐতিহ্য, অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা এবং অবদান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পারিবারিক ঐতিহ্য ও হাতেখড়ি

  • কুস্তিগীর পরিবার: গোবর গোহ জন্মসূত্রে কলকাতার এক বিখ্যাত কুস্তিগীর পরিবারে এসেছিলেন। তার ঠাকুরদাদা আম্বিকা চরণ গুহ (অম্বু বাবু) ছিলেন বাংলার কুস্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, যার আখড়ায় নামী-দামী সব কুস্তিগীর তৈরি হতেন।
  • প্রশিক্ষণ: শৈশবেই নিজের কাকা এবং তৎকালীন ভারতের অন্যতম সেরা কুস্তিগীর ক্ষেত্রচরণ গুহের কাছ থেকে তিনি কুস্তির প্রাথমিক পাঠ নেন। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত কুস্তিগীর রহমানী পালোয়ানের কাছেও তালিম নেন।

কুস্তি ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক সাফল্য

  • ইউরোপ সফর (১৯১০-১৯১৩): মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সেখানে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার সেরা কুস্তিগীরদের পরাজিত করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। ১৯১৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জর্জ হ্যাকেনস্মিডকে (George Hackenschmidt) কুস্তির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন।
  • বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা (১৯২১): ১৯২০ সালে তিনি পুনরায় ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে যান। ১৯২১ সালের ৩০ আগস্ট সান ফ্রান্সিসকোতে তৎকালীন ওয়ার্ল্ড লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলের মুখোমুখি হন গোবর গোহ। ১ ঘণ্টা ৩ মিনিট স্থায়ী এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর তিনি স্যানটেলকে পরাস্ত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের বেল্ট নিজের করে নেন।
  • শারীরিক গঠন: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং প্রায় ১২০ কেজি ওজনের গোবর গোহের সুগঠিত শরীর ও পেশীর সঞ্চালনা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

কুস্তির নিজস্ব শৈলী ও অবদান

  • ‘গোহ স্টাইল’ উদ্ভাবন: তিনি ভারতীয় কুস্তির ঐতিহ্যবাহী কৌশলগুলোর সাথে পশ্চিমা ‘ক্যাচ-অ্যাস-ক্যাচ-ক্যান’ (Catch-as-catch-can) ও গ্রেকো-রোমান শৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়ে কুস্তির একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেন, যা কুস্তি মহলে ‘গোহ স্টাইল’ নামে পরিচিত ছিল।
  • আখড়া প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি: ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতার হেদুয়ার কাছে (গোয়াবাগান এলাকায়) নিজের পারিবারিক আখড়াটি নতুন রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ ‘গোবর গুহ’স জিমনেসিয়াম’ নামে পরিচিত। তার এই আখড়া থেকেই তৈরি হয়েছিলেন ভারতের বহু নামী কুস্তিগীর এবং পরবর্তীতে অলিম্পিয়ানরা।

কুস্তির পাশাপাশি তিনি ফুটবল এবং সংগীতের দারুণ অনুরাগী ছিলেন। বাংলার যুবসমাজকে শক্তিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পেছনে এই বীর কুস্তিগীরের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি এই মহান ক্রীড়াবিদ কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা

মনোহর আইচ, মনতোষ রায় এবং গোবর গোহ—এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক সুস্থতা, অদম্য ইচ্ছা এবং সঠিক শৃঙ্খলার কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিও হার মানে। তাঁদের বর্ণাঢ্য জীবন ও প্রাকৃতিক শরীরচর্চার পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ফিটনেস প্রেমীদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ফাইবার (Fiverr

নিউজ ডেস্ক

October 15, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও ক্যারিয়ার
  • প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): Fiverr Official Terms of Service, Freelancing Market Studies, ও ডিজিটাল মার্কেটিং আর্काइভ।

ফাইবার (Fiverr) হলো আন্তর্জাতিক মানের অন্যতম জনপ্রিয় একটি সার্ভিস-ভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস। চিরাচরিত মার্কেটপ্লেসগুলোর মতো ফাইভারে প্রতি কাজের জন্য বিড করতে হয় না; বরং ফ্রিল্যান্সাররা তাদের দক্ষতাকে ‘গিগ’ (Gig) নামক প্যাকেজ আকারে সাজিয়ে রাখেন এবং ক্লায়েন্টরা সরাসরি তা কিনে নেন।

১. ফাইবার মার্কেটপ্লেসের সুবিধা ও অসুবিধা

নতুন ও অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারদের (Sellers) জন্য ফাইবার ব্যবহার করার নির্দিষ্ট কিছু ইতিবাচক ও নীতিবাচক দিক রয়েছে:

ফাইবার মার্কেটপ্লেসের সুবিধা (Pros)

  1. বিডিংয়ের ঝামেলামুক্ত ব্যবস্থা: আপওয়ার্ক বা ফ্রিল্যান্সার ডটকমের মতো কানেক্টস (Connects) খরচ করে প্রতি কাজের জন্য প্রপোজাল পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে না।
  2. নতুনদের আত্মপ্রকাশের সুযোগ: সুনির্দিষ্ট সার্ভিস ও পোর্টফোলিও থাকলে নতুন ফ্রিল্যান্সাররা দ্রুত প্রথম কাজ পাওয়ার সুযোগ পান।
  3. পেমেন্টের শতভাগ নিশ্চয়তা (Escrow System): ক্লায়েন্ট অর্ডার শুরু করার সময়ই ফাইবারে টাকা জমা করে, ফলে কাজ সঠিকভাবে জমা দিলে টাকা না পাওয়ার বা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।
  4. সার্ভিস ও রেট নির্ধারণের স্বাধীনতা: সেলার নিজেই ঠিক করেন তিনি কী কাজ করবেন, সময়সীমা কত হবে এবং কত ডলার চার্জ করবেন।

ফাইবার মার্কেটপ্লেসের অসুবিধা (Cons)

  1. উচ্চ কমিশন (২০% সার্ভিস চার্জ): সেলারদের আয়ের ওপর অফিশিয়াল ২০% সার্ভিস ফি কাটে। (যেমন: ১০০ ডলারের প্রজেক্টে সেলার পাবেন ৮০ ডলার)।
  2. বায়ার-কেন্দ্রিক নীতি (Buyer-Friendly Policy): কোনো বিরোধ বা মতপার্থক্য তৈরি হলে ফাইবার সাপোর্ট সাধারণত বায়ার বা ক্লায়েন্টের পক্ষ বেশি নিয়ে থাকে।
  3. কঠোর শর্তাবলী ও অ্যাকাউন্ট ব্যানের ঝুঁকি: টার্মস অব সার্ভিস (ToS) সামান্য ক্ষুণ্ন হলেও কোনো অগ্রিম নোটিশ ছাড়া অ্যাকাউন্ট স্থগিত বা ব্যান হতে পারে।
  4. টাকা উত্তোলনের সময়সীমা: কাজ শেষে ফান্ড ব্যালেন্সে যুক্ত হতে নতুনদের জন্য ১৪ দিন সময় লাগে।

২. ফাইভারে ক্যারিয়ার শুরু করার ধাপভিত্তিক নির্দেশনা

ফাইভারে (Fiverr) একজন সফল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার জন্য নিচে একটি সুনির্দিষ্ট এবং ধাপভিত্তিক নির্দেশনা (Step-by-Step Guide) দেওয়া হলো। এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আপনার ফ্রিল্যান্সিং যাত্রা শুরু করতে পারবেন:


ধাপ ১: একটি নির্দিষ্ট এবং ডিমান্ডিং স্কিল (Skill) নির্বাচন করুন

ফাইভারে নামার আগে আপনাকে যেকোনো একটি কাজে পুরোপুরি দক্ষ হতে হবে। আপনি যেহেতু এসইও (SEO) নিয়ে কাজ করতে চান, তাই পুরো এসইও-এর বড় বাজারের ভেতর থেকে ছোট এবং সুনির্দিষ্ট কোনো সার্ভিস (Micro-niche) বেছে নিন।

  • যেমন: শুধু “WordPress On-Page SEO”, “Shopify SEO Audit”, অথবা “Local SEO & Google My Business Optimization”। শুরুতে ছোট ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা কম থাকে, ফলে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

ধাপ ২: প্রফেশনাল সেলার অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন

Fiverr.com-এ গিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট খুলুন এবং সেটিকে ‘Seller Account’ হিসেবে সেটআপ করুন। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখুন:

  • প্রোফাইল ছবি: একটি পরিষ্কার, হাসিখুশি এবং প্রফেশনাল ক্লোজ-আপ ছবি ব্যবহার করুন।
  • ডেসক্রিপশন (Description): আপনি কে, এসইও-তে আপনার অভিজ্ঞতা কতদিনের এবং আপনার সার্ভিস কীভাবে বায়ারের ব্যবসার উন্নতি করবে—তা গুছিয়ে ইংরেজিতে লিখুন।
  • স্কিল ও টেস্ট (Skills & Tests): আপনার দক্ষতার তালিকায় SEO রিলেটেড কিওয়ার্ডগুলো যোগ করুন। ফাইভারে ফ্রিতে ‘Fiverr English Test’ দেওয়া যায়, এটি দিয়ে রাখলে প্রোফাইলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

ধাপ ৩: ইন-ডেপথ গিগ রিসার্চ (Gig Research)

গিগ (Gig) হলো আপনার সার্ভিস বা ডিজিটাল দোকান। গিগ তৈরি করার আগে ফাইভারে আপনার ক্যাটাগরির অন্যান্য সফল সেলারদের গিগগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন।

  • বায়াররা কী লিখে সার্চ করছে তা বের করতে ফাইভারে সার্চ বারের সাহায্য নিন (যেমন: “SEO keyword research”, “Technical SEO audit”)।
  • এমন কিওয়ার্ড খুঁজে বের করুন যেগুলোর সার্চ ভলিউম ভালো কিন্তু গিগ সংখ্যা তুলনামূলক কম (যেমন: ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ এর নিচে)।

ধাপ ৪: এসইও ফ্রেন্ডলি গিগ তৈরি করুন (Gig Creation)

একজন নতুন সেলার হিসেবে আপনি শুরুতে ৭টি গিগ তৈরি করতে পারবেন। গিগ তৈরির সময় এই ৪টি বিষয় নিখুঁত হওয়া চাই:

  • টাইটেল ও ইউআরএল (Title & URL): টাইটেলের শুরুতে আপনার মেইন কিওয়ার্ড রাখুন (যেমন: I will do WordPress on page SEO optimization…)। প্রথমবার গিগ সেভ করার সময় যে ইউআরএলটি তৈরি হয়, সেটি যেন কিওয়ার্ড সমৃদ্ধ হয়।
  • গিগের মূল্য ও প্যাকেজ (Pricing): আপনার সার্ভিসকে ৩টি প্যাকেজে (Basic, Standard, Premium) ভাগ করুন। নতুন অবস্থায় দাম বাজারের অন্য সেলারদের চেয়ে কিছুটা কম কিন্তু যৌক্তিক রাখুন।
  • গিগ ডেসক্রিপশন (Gig Description): ১২০০ ক্যারেক্টারের মধ্যে বায়ারের সমস্যা এবং আপনার সমাধানের উপায়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলুন। মেইন কিওয়ার্ডটি ২-৩ বার ব্যবহার করুন।
  • গিগ ইমেজ ও ভিডিও (Visuals): গিগের ব্যানার বা ছবিটি যেন হাই-কোয়ালিটি এবং তথ্যবহুল হয়। সম্ভব হলে একটি ছোট পরিচিতিমূলক ভিডিও (Intro Video) যোগ করুন, এটি অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

ধাপ ৫: পোর্টফোলিও এবং কেস স্টাডি যুক্ত করা

এসইও-র কাজে বায়াররা মুখের কথার চেয়ে প্রমাণের ওপর বেশি ভরসা করে। তাই গিগ তৈরির সময় আপনার আগের কাজের স্যাম্পল বা পোর্টফোলিও (যেমন: কিওয়ার্ড রিসার্চের এক্সেল শিট, এসইও অডিট রিপোর্ট বা গুগলে র‍্যাংক করার স্ক্রিনশট) গিগের গ্যালারিতে ইমেজ বা পিডিএফ (PDF) আকারে আপলোড করে দিন।

ধাপ ৬: অনলাইনে অ্যাক্টিভিটি এবং দ্রুত রেসপন্স

গিগ পাবলিশ করার পর প্রথম কাজ পাওয়ার জন্য আপনাকে কৌশলী হতে হবে:

  • ২৪/৭ অ্যাক্টিভ থাকার চেষ্টা: ফাইভারের মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে ফোনে সবসময় ইন্টারনেট অন রাখুন। বায়াররা সাধারণত যারা অনলাইনে থাকে, তাদের ফিল্টার করে দ্রুত মেসেজ দেয়।
  • কুইক রিপ্লাই (Quick Reply): কোনো বায়ার মেসেজ দিলে ১ থেকে ৫ মিনিটের মধ্যে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার রেসপন্স টাইম (Response Time) যত কম হবে, ফাইভার আপনার গিগকে তত বেশি প্রমোট করবে।

ধাপ ৭: প্রথম অর্ডারে ৫-স্টার রিভিউ নিশ্চিত করা

প্রথম কাজ পাওয়ার পর ক্লায়েন্টের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে বুঝে কাজ সম্পন্ন করুন। প্রয়োজনে বায়ার যা চেয়েছে, তার চেয়ে কিছুটা বেশি ভ্যালু বা বোনাস কাজ (যেমন: ফ্রি এসইও টিপস বা এক্সট্রা কিওয়ার্ড) ডেলিভারি দিন। কাজ শেষে বায়ারের কাছ থেকে একটি ৫-স্টার রিভিউ (5-Star Review) এবং ভালো ফিডব্যাক আর্ন করা আপনার ক্যারিয়ারের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।


নতুনদের জন্য সতর্কবার্তা (Fiverr Rules):

১. ফাইভার চ্যাটবক্সে বা মেসেজে কখনো “Money”, “Pay”, “WhatsApp”, “Email”, “Skype” বা যোগাযোগের বাইরের মাধ্যম নিয়ে কথা বলবেন না। এতে অ্যাকাউন্ট সাথে সাথে রেস্ট্রিক্টেড হয়ে যেতে পারে।
২. এক ডিভাইসে বা একই ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে একাধিক ফাইভার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

৩. ফাইভারে এসইও (SEO) ক্যাটাগরির ৭টি লাভজনক গিগ আইডিয়া

এসইও ইন্ডাস্ট্রি দিন দিন বড় হচ্ছে। সরাসরি “Complete SEO” সার্ভিস না দিয়ে ছোট সাব-ক্যাটাগরিতে গিগ তৈরি করলে ফাইভারে দ্রুত র‍্যাংক করা সম্ভব:

গিগের নামকাজের বিবরণ ও গুরুত্ব
১. Keyword Research & Competitor Analysisক্লায়েন্টের সাইটের জন্য হাই-সার্চ ভলিউম ও লো-কম্পিটিশন কিওয়ার্ড নির্বাচন এবং প্রতিদ্বন্দীদের বিশ্লেষণ।
২. On-Page SEO Optimizationটাইটেল, মেটা ডেসক্রিপশন, H1-H3 ট্যাগ ফিক্সিং, পার্মালিংক ও ইমেজ অল্টার টেক্সট অপ্টিমাইজ করা।
৩. Technical SEO Audit & Fixesএক্সএমএল সাইটম্যাপ, রোবটস ডট টেক্সট, ৪-০-৪ এরর, ব্রোকেন লিংক ও সাইট স্পিড অপ্টিমাইজেশন।
৪. Local SEO & GMB Profile Optimizationলোকাল ব্যবসার জন্য গুগল মাই বিজনেস (GMB) প্রোফাইল অপ্টিমাইজ করে গুগল ম্যাপে র‍্যাংক করানো।
৫. High-Quality Link Building (Off-Page)গেস্ট পোস্টিং, নিশ এডিট, প্রোফাইল ব্যাকলিংক ও ফোরাম পোস্টিং তৈরি করা।
৬. SEO Friendly Content & Intro Writingব্লগের জন্য সার্চ ইঞ্জিন ফ্রেন্ডলি কনটেন্ট এবং আকর্ষণীয় ইন্ট্রোডাকশন তৈরি।
৭. Monthly Technical & On-Page SEO Careদীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্টের জন্য সাইটের নিয়মিত টেকনিক্যাল ও কনটেন্ট দেখাশোনার প্যাকেজ।

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা

পেশাদার ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ফাইবার হলো একটি টেকসই বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্ম। সঠিক দক্ষতা, নিয়মিত প্রোফাইল অপ্টিমাইজেশন এবং বায়ারদের মানসম্মত কাজ ডেলিভারি দিতে পারলে ফাইবার থেকেই একটি সফল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

রবীন্দ্রনাথ

নিউজ ডেস্ক

October 12, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন
  • প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): ১৯৬৫ সালের যুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক দলিল, খাজা শাহাবুদ্দীনের বেতার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ঘোষণা, এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিহাস।

বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবিচ্ছেদ্য প্রেরণার নাম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) যখনই বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের “কালো মেঘ” ঘনিয়ে এসেছে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে “ইসলাম-বিরোধী” বা “ভারতীয় সংস্কৃতি” হিসেবে তকমা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির জন্য আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।

২. রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বুদ্ধিজীবীদের লড়াই

১৯৬১ সালে বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি তাদের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করে।

  • এর প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
  • ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন ও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে আন্দোলনের রূপ দেয়।
  • এই লড়াইটি কেবল গান গাওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।

৩. রাজনৈতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রচেতনা

রাজনৈতিক শোষণের কালো মেঘ যখনই পূর্ব বাংলার আকাশকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখনই রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছে।

  • ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি জনসভায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশনা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
  • জাতীয় সংগীতের রূপরেখা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটি গেয়ে বাঙালি তাদের স্বাধীন সত্তার জানান দেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পায়।

৪. অন্ধত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা

রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার ভাল দিক কি কি ?

রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্র রচনাবলী বাঙালিকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে হয়।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও তার সৃষ্টির ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাঙালির চেতনা গঠনে তার চিন্তাধারার প্রধান ভালো দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • অসাম্প্রদায়িক চেতনা: রবীন্দ্রনাথের পুরো দর্শনই ছিল মানুষের জয়গানে মুখর। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে পুঁজি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তখন তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে।
  • মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতা: তাঁর সাহিত্য ও কবিতা মানুষকে কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্ব এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উদার হতে অনুপ্রাণিত করে। এটি সমাজের গোঁড়ামি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
  • ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অহংকার: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের কারণেই বাঙালি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার সাহস এবং শক্তি পেয়েছিল।
  • প্রতিরোধের মানসিকতা: তাঁর গান ও কবিতা (যেমন: “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বা “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”) যেকোনো অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়।
  • প্রকৃতি ও স্বদেশের প্রতি নিখাদ প্রেম: তাঁর প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগের মূল অনুপ্রেরণা ছিল।

রবীন্দ্রনাথের নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো

রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাঁর প্রভাবের কোনো বস্তুগত বা নৈতিক “খারাপ দিক” ছিল না। তবে, পাকিস্তান আমলের শাসকগোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী মহল রবীন্দ্রচর্চাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল এবং রবীন্দ্রচেতনার অতি-ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সেই নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • পাকিস্তান সরকারের চোখে “ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য”: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তৎকালীন কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে একজন “অমুসলিম এবং ভারতীয় কবি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা তাদের ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে।
  • বাঙালি সংস্কৃতির বুর্জোয়া বা উচ্চবিত্ত রূপায়ণ: সমাজতাত্ত্বিক ও বামপন্থী সমালোচকদের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন মূলত জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের জমিদারি আমেজ এবং উচ্চবিত্ত (বুর্জোয়া) শ্রেণির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রচর্চাকে যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক করা হয়, তখন তা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির চেয়ে শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
  • অন্যান্য দেশীয় উপাদান উপেক্ষিত হওয়ার বিতর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাসন রাজা বা গ্রামীণ লোকগান) এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও গণমুখী চেতনা সাময়িকভাবে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল।

সংক্ষেপে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং তাঁর সৃষ্টিকে তৎকালীন পাকিস্তানি রাজনীতি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিল এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে যেভাবে শ্রেণি-স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সমালোচনাগুলো মূলত সেই চর্চাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।

পাকিস্তান আমলে খাজা শাহাবুদ্দিনের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের যুক্তিগুলো

১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন । এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের কট্টরপন্থী তল্পিবাহকদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ।

তাদের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • “পাকিস্তানের আদর্শের” পরিপন্থী: খাজা শাহাবুদ্দিনের মূল আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের গান ও সৃষ্টি “পাকিস্তানি আদর্শের” (Ideology of Pakistan) সাথে খাপ খায় না । তিনি দাবি করেছিলেন, রেডিও-টেলিভিশনে এমন কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে।
  • রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নন: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাজা শাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেউ নন” । তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একজন অমুসলিম এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত ভারত (বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি-ঘেঁষা), তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাকে গণ্য করা যায় না ।
  • “মুসলিম তমদ্দুন” বা ইসলামী সংস্কৃতির অবমাননা: সরকারের পক্ষ থেকে এবং তাদের সমর্থক কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, রবীন্দ্রসংগীতের ভাষা, সুর ও ধারণা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ঐতিহ্য বা “মুসলিম তমদ্দুনকে” অবজ্ঞা করে । তাদের মতে, রবীন্দ্রচর্চা বজায় রাখার অর্থ হলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
  • ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক প্রচার: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে । পাকিস্তানি শাসকদের যুক্তি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা আসলে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই অংশ। তারা দাবি করেছিল, রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে

বাঙালির প্রতিক্রিয়া:
খাজা শাহাবুদ্দিনের এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলোকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তৎকালীন পূর্ব বাংলার শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন এবং ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে তোলেন

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৩১শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ