বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ সালাহউদ্দিন: যাঁকে পাকিস্তানি সেনারা ছুড়ে দিয়েছিল বাঘের খাঁচায়
বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ সালাহউদ্দিন

নিউজ ডেস্ক

October 16, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: ইতিহাস ডেস্ক

মুক্তিযুদ্ধের সেই বীর

ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ থানার কোষারানিগঞ্জ গ্রামের সন্তান সালাহউদ্দিন ছিলেন তখন দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজের এক তরুণ ছাত্র। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি স্বাধীনতার স্বপ্নে বুক বেঁধে ভারতের মলয় যুব শিবিরে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। পরবর্তীতে পানিঘাট প্রশিক্ষণ শিবিরে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন এবং দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য একের পর এক অভিযানে অংশ নেন।

বিশ্বাসঘাতকতার ফাঁদ

১০ নভেম্বর, জাবরহাট হাইডআউটে অবস্থানকালে খবর পেলেন—পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। দেশপ্রেমিক সালাহউদ্দিন রাতেই বাড়ির পথে রওনা দেন। সাত মাস পর বাড়িতে ফিরে দেখেন, বাবা-মা স্বাভাবিক। তখনই বুঝলেন—রাজাকারদের ছড়ানো একটি ফাঁদে পা দিয়েছেন।

রাত নামতেই রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। সালাহউদ্দিন বন্দি হন।

এক মায়ের প্রার্থনা, এক সেনার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

ছেলের প্রাণভিক্ষা চেয়ে মা হাতে তুলে দেন পবিত্র কোরআন শরিফ। চোখে জল নিয়ে বলেন,

“আমার ছেলেকে মারবে না, শুধু এই কথা বলে যাও।”

পাকসেনা ক্যাপ্টেন কোরআন ছুঁয়ে বলে,

“নেহি মারুঙ্গা উনকো।”

কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। সালাহউদ্দিনকে ঠাকুরগাঁও সদর সেনা ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া হয়।


নির্যাতনের পর্ব

বুটের লাথি, চাবুকের আঘাত, ঘুষি, চড়—একটার পর একটা। হাত-পায়ের আঙুলে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়, রক্তে ভিজে যায় মাটির প্রতিটি ইঞ্চি।
তবুও তিনি নীরব। সহযোদ্ধাদের নাম মুখে আনেননি।

অবশেষে ঘোষণা দেওয়া হলো—“আজ বিকেলে সেনা ছাউনিতে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান।”

বাঘের খাঁচায় বীরের মৃত্যু

ছাউনিতে রাখা হয়েছিল দুইটি চিতাবাঘ ও দুটি শাবক। বিকেলে পেছনে হাত বাঁধা সালাহউদ্দিনকে দাঁড় করানো হয় খাঁচার সামনে।

“হিংস্র পশু মেজর মাহমুদ হাসান বেগ” বলল—

“তোমার সামনে দুটি পথ, হয় মুক্তিবাহিনীর তথ্য দাও, নতুবা বাঘের খাদ্য হও।”

সালাহউদ্দিনের চোখে ভয় নয়—দৃঢ় সংকল্প জ্বলজ্বল করছিল। তাঁর নীরবতা ছিল স্বাধীনতার প্রতিজ্ঞা।

এরপরই তাঁকে ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলা হয়।
দুই চিতা ঝাঁপিয়ে পড়ে, থাবায় ও দাঁতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে তাঁর দেহ। কিন্তু সেই দৃশ্যও ভীত করে তোলেনি তাঁর মনোবল—মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মুক্তিযুদ্ধের গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি।

বীরের অমর স্মৃতি

ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি আজও সাক্ষী, সেই তরুণ যিনি নিজের প্রাণ বিলিয়ে স্বাধীনতার গৌরব অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন।
তাঁর ত্যাগ আজও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়—

বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলা হয় শরীর, কিন্তু বীরত্ব বন্দি করা যায়নি কখনও।

সূত্র

  1. বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র (Facebook Archive Collection)
  2. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ – “ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনি”
  3. ইতিহাসের খোঁজে গিরিধর সিরিজ

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ব্রেইন অ্যানিউরিজম

নিউজ ডেস্ক

June 21, 2026

শেয়ার করুন

বিজ্ঞান ও রহস্য ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

ফ্যাক্ট-চেক ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬

পৃথিবীটা যতটা সুন্দর এবং স্বাভাবিক মনে হয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ততটাই অদ্ভুত, ভীতিকর এবং নির্মম কিছু বাস্তব সত্য। মনোবিজ্ঞান, অপরাধ জগৎ কিংবা জীববিজ্ঞানের এমন কিছু ডার্ক ফ্যাক্টস বা অন্ধকার তথ্য রয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে স্তব্ধ করে দেয়।

নিচে বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত চরম ভীতিকর ১০টি সত্য তথ্য তুলে ধরা হলো:

১. সময়ের নির্মম হিসাব (টিক-টক থিওরি)

আপনি যদি এই মুহূর্তে ২০ বছর বয়সী একজন সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল তরুণও হয়ে থাকেন, তবে গড় আয়ু অনুযায়ী আপনার মৃত্যুর আগে আর মাত্র ২,৮৬০ সপ্তাহ সময় বাকি আছে। সহজ কথায়, আপনার জীবনে আর মাত্র ২,৮৬০টি রবিবার উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। সময়টা আপাতদৃষ্টিতে দীর্ঘ মনে হলেও হিসাবের খাতায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত।

২. জন্মদিনের নির্মম পরিসংখ্যান

আপনার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন অর্থাৎ আপনার জন্মদিনে যখন আপনার পরিবার উৎসব করছে, ঠিক সেই একই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর বুকে প্রায় ১ লক্ষ ৫৩ হাজার মানুষ মারা গেছে বা মৃত্যুবরণ করছে।

৩. নেদারল্যান্ডস এবং মাকড়সার কাল্পনিক গ্রাস

একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর সমস্ত মাকড়সাকে যদি কোনোভাবে একসাথে ধরে এনে নেদারল্যান্ডসে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে তাদের সম্মিলিত খাদ্যের চাহিদার তুলনায় দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা এতটাই কম যে, তারা মাত্র ৩ দিনে পুরো দেশের মানুষকে খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারবে।

৪. ব্রেইন অ্যানিউরিজম: মাথার ভেতরের জীবন্ত টাইম-বোমা

মেডিকেল সায়েন্সের একটি ভয়ঙ্কর তথ্য হলো—বর্তমানে আমাদের প্রতি ১৫ জন মানুষের মধ্যে ১ জন মানুষ ব্রেইন অ্যানিউরিজম (Brain Aneurysm) নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন। এটি মূলত মস্তিষ্কের রক্তনালীর একটি দুর্বল ফোলা অংশ, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে গিয়ে পক্ষাঘাত বা তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটাতে পারে। এটি কেবল এখনো ফেটে যায়নি বলেই মানুষটি সুস্থ আছেন।

৫. মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানো ‘আন্দিজের দানব’

ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর কলম্বিয়ান সিরিয়াল কিলার পেড্রো অ্যালোনসো লোপেজ, যে কিনা ইকুয়েডর, পেরু এবং কলম্বিয়ার ৩০০-র বেশি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। ধরা পড়ার পর তাকে মাত্র ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরে মানসিক হাসপাতালে রাখা হয়। ১৯৯৮ সালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে “সুস্থ” ঘোষণা করে এবং সে আর কখনো হত্যা করবে না—এই মর্মে একটি লিখিত স্বীকারোক্তি নিয়ে ছেড়ে দেয়। ১৯৯৮ সালের পর থেকে আজ অবধি কেউ জানে না এই কুখ্যাত খুনি পৃথিবীর কোথায় আছে বা কী বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

৬. নাভির ভেতরের অজানা এক জগত (Microbiome)

২০১২ সালে এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মানুষের নাভিতে ১,৪৫৮টি নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান। মানুষের নাভির এই বাস্তুসংস্থান বা ইকোসিস্টেম আঙুলের ছাপের (Fingerprint) মতোই একে অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজন ভলান্টিয়ারের নাভিতে এমন এক বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান মেলে যা কেবল জাপানের মাটিতে পাওয়া যায়, অথচ সেই ব্যক্তি জীবনে কোনোদিন জাপানেই যাননি!

৭. কটার্ড সিনড্রোম: জীবন্ত লাশের মানসিক ব্যাধি

মনোবিজ্ঞানের অন্যতম ভীতিকর একটি রোগ হলো কটার্ড সিনড্রোম (Cotard’s Syndrome)। এই বিরল মানসিক ডিল্যুশনে আক্রান্ত রোগী নিজেকে সম্পূর্ণ মৃত বা একটি ‘জীবন্ত লাশ’ ভাবতে শুরু করে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তাদের শরীরের ভেতরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পচে গেছে কিংবা শরীর থেকে সমস্ত রক্ত গায়েব হয়ে গেছে।

৮. ভিক্টোরিয়ান পোস্ট-মর্টেম ফটোগ্রাফির রহস্য

১৯ শতকের ভিক্টোরিয়ান যুগের কোনো গ্রুপ ছবি বা পারিবারিক ছবির দিকে লক্ষ্য করলে যদি দেখেন কোনো একজন ব্যক্তিকে অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি স্থির, পরিষ্কার ও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, তবে খুব সম্ভবত সেই ছবিটি তোলার সময় মানুষটি মৃত ছিলেন! পুরনো দিনের ক্যামেরায় একটি ছবি তুলতে অনেক দীর্ঘ সময় লেন্সের সামনে একদম স্থির হয়ে বসে থাকতে হতো। জীবিত মানুষরা সামান্য নড়াচড়া করায় তাদের ছবি কিছুটা ঝাপসা আসতো, কিন্তু মৃত ব্যক্তিরা পুরোপুরি নিথর থাকায় তাদের ছবি আসতো একদম নিখুঁত ও উজ্জ্বল।

৯. অক্টোপাসের অবিশ্বাস্য ফ্লেক্সিবিলিটি

একটি মাঝারি আকারের অক্টোপাসের শরীর হাড়হীন এবং এতটাই নমনীয় বা ফ্লেক্সিবিল যে, এটি চাইলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মুখের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে কোনো রকম বাধা ছাড়াই নাড়িভুঁড়ির মধ্য দিয়ে গিয়ে পায়ুপথ দিয়ে অনায়াসে বের হয়ে আসতে সক্ষম।

১০. কোটি বছরের অখণ্ড রেখা ভাঙার দায়

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর প্রথম প্রাণের সৃষ্টি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ বংশবিস্তার করতে ব্যর্থ হননি। অর্থাৎ লক্ষ-কোটি বছর ধরে একটি অবিচ্ছিন্ন রক্তের ধারা আপনার মাধ্যমে টিকে আছে। কিন্তু আপনি যদি কোনোদিন সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আপনি আপনার পেছনের সেই লক্ষ-কোটি বছরের অখণ্ড ধারাবাহিক চেইন বা রেখাটিকে চিরতরে ভেঙে দেবেন।

একটু সংশোধন ও সচেতনতা (Fact-Check)

  • গড়পড়তা মানুষের সাফল্য ও যুক্তরাজ্যের পরিসংখ্যান: মানুষ যতটা চিন্তা করে তার চেয়ে কম সফল হবে—এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা, যা কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক স্ট্র্যাটেজি দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব। এছাড়া যুক্তরাজ্যের ৬০% মানুষ নিজেদের ভালোবাসাহীন মনে করে—এটি একটি সাময়িক সামাজিক সমীক্ষার ফলাফল মাত্র, কোনো ধ্রুব সত্য নয়।
  • সিল ও পেঙ্গুইনের আচরণ: বন্যপ্রাণী বিজ্ঞানে সিল কর্তৃক পেঙ্গুইনদের ওপর এক ধরণের জোরপূর্বক আক্রমণ বা যৌন নিপীড়নের মতো অস্বাভাবিক আচরণ (Interspecies Sexual Behavior) করার ঘটনা অ্যান্টার্কটিকায় গবেষকদের ক্যামেরায় প্রমাণিত হয়েছে, যা জীবজগতের অন্যতম একটি অন্ধকার দিক।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

প্রকৃতি এবং মানুষের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত আমাদের এমন সব অমীমাংসিত এবং ভীতিকর তথ্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এই রহস্যময় পৃথিবীর যেকোনো রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সত্য সবার আগে জানতে চোখ রাখুন আমাদের পোর্টালে।

বিজ্ঞান, রোমাঞ্চকর ইতিহাস, অপরাধ জগত এবং সমসাময়িক বিশ্বের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ

আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই ১০টি চরম ভীতিকর তথ্যের মধ্যে কোনটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি স্তব্ধ করেছে বা আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান।

বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

June 21, 2026

শেয়ার করুন

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

ফ্যাক্ট-চেক ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬

আমাদের চিরচেনা এই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আমরা অনেকেই পুরোপুরি জানি না। রাজনীতি, কূটনীতি, ফ্যাশন কিংবা প্রকৃতির অপার বিস্ময়—সবখানেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। নিচে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের সম্পর্কে এমন কিছু অসাধারণ তথ্য তুলে ধরা হলো, যার কিছু হয়তো আপনার জানা, আর কিছু তথ্য আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:

১. সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসেছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। চীন ও ভারতের পরই বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈশ্বিক রফতানিতেও অবদান রাখছে।

২. বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল এবং জাপানের চিরকৃতজ্ঞতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে (টোকিও ট্রায়াল) একমাত্র বাঙালি তথা এশীয় বিচারপতি ছিলেন রাধাবিনোদ পাল। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একপাক্ষিকভা‌বে কেবল জাপানিদের যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাঁর এই অকুতোভয় ও সুবিচারের রায়ের কারণে জাপান এক বিরাট ক্ষতিপূরণের বোঝা ও গ্লানি থেকে মুক্তি পায়। এই ঐতিহাসিক উপকারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জাপান চিরকাল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে।

৩. বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর: বঙ্গোপসাগর

আমাদের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম উপসাগর। এর বিস্তৃতি এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৪. আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন: বিবি রাসেল

জর্জিও আরমানি বা পিয়েরে কারডিনের মতো বিশ্ববিখ্যাত ডিজাইনারদের পাশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। ইউরোপের র‍্যাম্প মডেলিং কাঁপানোর পর তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এবং খাদি কাপড়কে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

৫. দৈনিক পত্রিকার বিশাল সমাহার

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ২,৮০০-এরও বেশি, যা দেশের মানুষের তথ্যের প্রতি আগ্রহ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এক অনন্য নজির।

৬. নদীর দেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদী। ছোট-বড়, শাখা ও উপনদী মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭,০০০টি নদী রয়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে সত্যি বিরল।

একটু সংশোধন: মালয়েশিয়ার রাজনীতি ও বাঙালি সংযোগের সঠিক ইতিহাস

ইন্টারনেটে মালয়েশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়ে কিছু ভুল তথ্য বা ‘মিথ’ প্রচলিত আছে, যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সংশোধন করে নেওয়া উচিত:

  • ডা. মাহাথির মোহাম্মদ: মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নের রূপকার মাহাথির বিন মোহাম্মদের দাদা (পিতার দিক থেকে) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলিম (কেরালা থেকে আগত), যিনি একজন মালয় নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাই তিনি মূলত মালয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত, বাংলাদেশি নন।
  • খায়ের জামালউদ্দিন চৌধুরী: মালয়েশিয়ার সাবেক যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খায়ের জামালউদ্দিনের জন্ম কুয়েতে হলেও তাঁর পৈতৃক পরিবার মালয়েশিয়ারই নাগরিক। তাঁর নামের শেষে ‘চৌধুরী’ পদবিটি যুক্ত থাকার কারণে ইন্টারনেটে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি বাংলাদেশি, যা আসলে সঠিক নয়।
  • চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হলেও, এটি একমাত্র “প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর” নয়। পৃথিবীর আরও অনেক বিখ্যাত বন্দর (যেমন- সিডনি হারবার বা নিউইয়র্ক হারবার) প্রাকৃতিক বন্দর হিসেবে স্বীকৃত। তবে এটি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

বাঙালিদের মেধা, সততা এবং এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমসাময়িক ইতিহাস এবং ক্যারিয়ারের সব গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।

আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই তথ্যগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক বা নতুন মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!

নিউজ ডেস্ক

June 20, 2026

শেয়ার করুন

ইতিহাসের পাতা থেকে | বিশেষ ফিচার

ডেস্ক রিপোর্ট, পালস বাংলাদেশ

সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬

ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে বাঙালি এবং বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক অবদান চিরকাল বিশ্বমঞ্চে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে একজন অকুতোভয় নারীর বজ্রকণ্ঠ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ—সবখানেই জড়িয়ে আছে রোমাঞ্চকর সব ইতিহাস।

হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে কাঁপিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক নারী স্নাইপার

“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”

১৯৪২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে এই বজ্রকণ্ঠের ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

ক) নার্স নয়, স্নাইপার হওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় ২,০০০ নারীকে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল, যাদের মধ্যে লুডমিলা ছিলেন সবচেয়ে সেরা। শুরুর দিকে সেনাবাহিনীতে তাঁকে নার্স হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং একটি কঠিন অডিশন বা ট্রায়ালের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের নিখুঁত নিশানাভেদের দক্ষতা প্রমাণ করেন।

খ) মাত্র এক বছরে ৩০৯টি “কনফার্মд কিল”

স্নাইপার হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর ওডেসায় লড়াইকালীন প্রথম ৭৫ দিনের মধ্যেই লুডমিলা ১৮৭ জন শত্রুকে পরাস্ত করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে তাঁর নিশ্চিত হত্যার (Confirmed Kills) সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৯ জনে, যার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন খোদ জার্মানদের তুখোড় স্নাইপার!

সামরিক পরিভাষায় “কনফার্মড কিল” কী?

যুদ্ধক্ষেত্রে একজন স্নাইপার কাউকে গুলি করলেই সেটি রেকর্ডে যোগ হয় না। একটি হত্যাকাণ্ড তখনই “কনফার্মড” বা নিশ্চিত হিসেবে গণ্য করা হয়, যখন কোনো স্বাধীন তৃতীয় পক্ষ বা কোনো সামরিক অফিসার সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রমাণ দেন। ফলে, সাক্ষী ছাড়া লুডমিলা আসলে আরও কত নাৎসি সেনা খতম করেছিলেন, তার প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩০৯ এর চেয়েও অনেক বেশি ছিল।

গ) হিটলারের বাহিনীর ভয় এবং চকোলেটের লোভনীয় প্রস্তাব

লুডমিলার নিখুঁত নিশানার কারণে জার্মান নাৎসি বাহিনীর কাছে তিনি এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। জার্মানরা তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওয়ান-টু-ওয়ান রেডিও ব্রডকাস্টের মাধ্যমে বিলাসবহুল ঘর-সংসার, উচ্চপদস্থ সামরিক পদ এবং প্রচুর পরিমাণে চকোলেটের অফার দিতে শুরু করে।

এই সমস্ত লোভনীয় প্রস্তাব যখন লুডমিলা একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন, তখন ক্ষিপ্ত জার্মানরা রেডিওতে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তাকে বন্দি করতে পারলে “৩০৯ টুকরো” করা হবে। এই হুমকি শুনে লুডমিলা পরে হেসে বলেছিলেন, “বাহ! এমনকি ওরাও তাহলে আমার নিখুঁত স্কোরটা ভালোভাবে জানত!”

ঘ) হোয়াইট হাউসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক

যুদ্ধের একপর্যায়ে আহত হওয়ার পর লুডমিলাকে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাঠানো হয়। তিনি ইতিহাসে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পান এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ও ফার্স্ট লেডি এলিয়েনর রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক অবদান

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণ তৈরি হয়। একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি, সাহসী কূটনীতিবিদ এবং অকুতোভয় সাংবাদিকদের অবদান ছিল আকাশচুম্বী।

১. ভারত এবং ইন্দিরা গান্ধী: সর্বাত্মক কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও বহুমুখী। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করেন:

  • আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৌড়ঝাঁপ: ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার পর, ২৭ মার্চ ভারতের লোকসভায় তিনি এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে ভাষণ দেন এবং ৩১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করান। মে মাসে বেলগ্রেডের বিশ্বশান্তি কংগ্রেসে ইন্দিরা গান্ধীর বাণীতে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানালে ৮০টি দেশের প্রতিনিধিরা তা সাদরে গ্রহণ করেন।
  • ম্যারাথন বিশ্ব সফর: ২৪ অক্টোবর থেকে তিনি ১৯ দিনের এক ম্যারাথন বিশ্ব সফরে বের হন এবং ব্রাসেলস, ভিয়েনা, ব্রিটেন, আমেরিকা (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাথে ১২৫ মিনিটের বৈঠক), ফ্রান্স ও জার্মানিতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
  • সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা: ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য তিনি আশ্রয় ও খাদ্য নিশ্চিত করেন। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর লোকসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
  • জে এফ আর জ্যাকব (লে. জেনারেল): একাত্তরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তিনি সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদ জোগান দেওয়া এবং যৌথ সংস্কৃতির নকশা তৈরিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৬ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের পেছনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিল।

২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া): আন্তর্জাতিক ভেটো ও ভূরাজনৈতিক ঢাল

তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ঢাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল:

  • জাতিসংঘে ঐতিহাসিক ভেটো: বাংলাদেশের বিজয় যখন সুনিশ্চিত, তখন পাকিস্তানের মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও চীন জাতিসংঘের security council বা নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই প্রস্তাবে পরপর ‘ভেটো’ (Veto) প্রদান করে মার্কিন-চীন চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। রাশিয়া এই ভেটো না দিলে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন বিলম্বিত বা নেতিবাচক খাতে মোড় নিতে পারত।
  • মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর প্রতিহত: বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার সক্রিয় নৌ-উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই থমকে যেতে হয়েছিল।
  • পুনর্গঠনে রুশ অবদান: যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাইন ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেন।

৩. আমেরিকা: সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও মার্কিন নাগরিকদের অকৃত্রিম সমর্থন

১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রিহার্ড নিক্সনের রিপাবলিকান সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও, আমেরিকার সাধারণ জনগণ, সিনেটর, কবি ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন:

  • সিনেটর এডওয়ার্ড ‘টেড’ কেনেডি: মার্কিন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো স্বচক্ষে পরিদর্শন করে মার্কিন সিনেটে ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’ শিরোনামে এক ঐতিহাসিক রিপোর্ট জমা দেন, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার বিবরণ ছিল।
  • কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে ভারতের সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর এবং বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এই চ্যারিটি কনসার্টের আয়োজন করেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, আল্লারাখা খাঁ, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটনদের সুরের মূর্ছনায় unarmed বাঙালিদের ওপর চালানো পৈশাচিকতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয় এবং জর্জ হ্যারিসনের বিখ্যাত ‘বাংলাদেশ’ গানটি বিশ্বকে নাড়া দেয়।
  • অ্যালেন গিন্সবার্গ: এই মার্কিন কবি বাংলাদেশের শরণার্থীদের হাহাকার নিয়ে লিখেছিলেন বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। যা পড়ে বিশ্বজুড়ে অজস্র মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়েছিল।

৪. যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কলমযোদ্ধারা

লন্ডন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখানে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের অবদান ছিল অনন্য:

  • অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পাকিস্তানি সাংবাদিক একাত্তরের এপ্রিলে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার চাক্ষুষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং দেশ থেকে পালিয়ে লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকায় ১৩ জুন তা প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ বইটির মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম পাকিস্তানের আসল বর্বরতার কথা জানতে পারে।
  • সায়মন ড্রিং: ডেইলি টেলিগ্রাফের এই তরুণ সাংবাদিক ২৫ মার্চের পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থেকে ঢাকার বুকে চালানো ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ছবি ও বিবরণ সংগ্রহ করেন। ব্যাংকক থেকে তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
  • সিডনি শ্যানберг: নিউইয়র্ক টাইমসের এই সাংবাদিকও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ড সশরীরে দেখেন এবং যুদ্ধজুড়ে তাঁর পাঠানো অসংখ্য শরণার্থী-ভিত্তিক প্রতিবেদন পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

ইতিহাসের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, বীরত্ব এবং সত্যের পক্ষে লড়াইয়ের কোনো ভৌগোলিক সীমানা থাকে না। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মহান বন্ধুদের অকৃত্রিম সহায়তাই আজ আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।

আন্তর্জাতিক ইতিহাস, সমসাময়িক কূটনীতি এবং জাতীয় খবরের নিখুঁত ও নিরপেক্ষ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।

১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ