আন্তর্জাতিক

অসুর’ যখন ট্রাম্প: বাংলার দুর্গাপুজোয় শিল্প, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি
ডোনাল্ড ট্রাম্প

নিউজ ডেস্ক

October 18, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

অসুরের মুখে ট্রাম্প: এক শিল্প-রাজনীতির সংলাপ

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার এক দুর্গাপুজোর মণ্ডপে এবারের প্রতিমা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতীক।
দেবী দুর্গার ত্রিশূলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসুরটি এবার কোনো পৌরাণিক মহিষ নয়—বরং সোনালি চুল, মোটা গলা, দৃঢ় চেহারা নিয়ে মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদলে তৈরি

মণ্ডপ কমিটির সদস্য সঞ্জয় বসাক বলেন,

“আগে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। সেই কারণেই তাঁকে অসুর হিসেবে দেখানো হয়েছে—এ যেন প্রতিরোধের শিল্প।”

এই প্রতিমা যেন আধুনিক সময়ে এক শিল্প-রাজনৈতিক রূপক। শুভ ও অশুভের প্রতীকী সংঘাতে ট্রাম্পের মুখে অসুরের রূপ শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং একটি নীতির প্রতিচ্ছবি—“আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া।

দুর্গোৎসব: প্রতিবাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য

বাংলার দুর্গাপুজো বহুদিন ধরেই শুধুমাত্র ধর্মীয় নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক সংলাপেরও ক্ষেত্র।
নাইন-ইলেভেনের পর একাধিক মণ্ডপে ওসামা বিন লাদেনকে অসুর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল।
২০২০ সালে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাতের পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-কে অসুর রূপে দেখানো হয়।

সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক শুভঙ্কর সরকার বলেন,

“এই ধারাটি আসলে সময়ের শিল্প। বাঙালি মণ্ডপের মাধ্যমে তার মত প্রকাশ করে—এই শিল্প প্রতিবাদেরই ভাষা।”

বন্ধুত্ব থেকে সংঘাত: ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের পরিবর্তন

মাত্র কয়েক বছর আগেই ট্রাম্প ও মোদীর বন্ধুত্ব আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম ছিল।
২০১৯-এর হিউস্টনের “Howdy Modi” এবং ২০২০-এর আহমেদাবাদের “Namaste Trump” অনুষ্ঠানে দুই নেতা হাত ধরাধরি করে জনতার সামনে দাঁড়ান।

কিন্তু সময় বদলায়।

  • ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর ৫০ % আমদানি শুল্ক আরোপ করে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে।
  • ভারতকে “dead economy” আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন ট্রাম্প।
  • পরে H-1B ভিসার ফি ১ লক্ষ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হয়—যা ভারতীয় দক্ষ কর্মীদের কাছে সরাসরি আঘাত বলে মনে করা হয়।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল কড়া: নয়াদিল্লি এই সিদ্ধান্তকে “অন্যায় ও দ্বিমুখী নীতি” বলে মন্তব্য করে।
এই রাজনৈতিক দূরত্বই মুর্শিদাবাদের সেই মণ্ডপে শিল্পরূপে পুনর্জন্ম নেয়—দেবীর ত্রিশূলে বিদ্ধ এক নতুন অসুর: ট্রাম্প।

গোপন নির্মাণ ও জনতার উন্মাদনা

প্রায় তিন মাস ধরে গোপনে প্রতিমা তৈরির কাজ চলেছে। শেষ সাত দিনে ট্রাম্পের মুখের আদল চূড়ান্ত করা হয়।
প্রতিমা উন্মোচনের পর স্থানীয় ও অনলাইন দুনিয়ায় হৈচৈ পড়ে যায়। হাজারো মানুষ ভিড় জমায় মণ্ডপে।

আয়োজক সঞ্জয় বসাক বলেন,

“এটা কেবল শিল্প নয়, সাধারণ মানুষের মনের প্রতিফলন। অনেকে হয়তো মনে মনে এই ছবিটাই দেখতে চেয়েছিলেন।”

প্রতিবাদের শিল্প: বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য

বাংলার শিল্প-সংস্কৃতি বরাবরই প্রতিবাদের ভাষা বহন করেছে।
ঔপনিবেশিক যুগে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’রবীন্দ্রনাথের লেখনী রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
স্বাধীনতার পর বামপন্থী সাংস্কৃতিক রাজনীতি সেই প্রতিবাদী শিল্পকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলে।

দুর্গাপুজো সেই ঐতিহ্যেরই ধারক—যেখানে শিল্প ও সমাজ একত্রে কথা বলে।
দেবী দুর্গা আজ শুধু ধর্মীয় প্রতীক নন, বরং প্রতিরোধ ও শক্তির রূপক।
তাঁর ত্রিশূল আজও সময়ের অন্যায়, শোষণ ও কূটনীতির বিরুদ্ধে শিল্পের প্রতিবাদ।

বিশ্লেষণ: যখন মণ্ডপ হয়ে ওঠে কূটনৈতিক বার্তা

এই প্রতিমা দেখিয়েছে,

  1. ধর্মীয় শিল্প এখন বিশ্ব রাজনীতির ভাষ্যকার
  2. কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও লোকসংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়।
  3. শিল্প যখন প্রতিবাদে রূপ নেয়, তখন সেটি সীমানা ছাড়িয়ে জনতার মনস্তত্ত্ব প্রকাশ করে।

কলকাতার সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক তূর্ণীর মুখোপাধ্যায় বলেন,

“এই প্রতিমা আমাদের শেখায়—দেবী দুর্গা কেবল পৌরাণিক নন, তিনি সময়ের প্রতীক। ট্রাম্প-অসুর আসলে আজকের বৈশ্বিক শক্তির প্রতীক, যাকে বাঙালি শিল্পের মাধ্যমে প্রশ্ন করছে।”

উপসংহার

এক মাটির প্রতিমায় ধরা পড়েছে রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জনমানসের প্রতিবাদ।
শিল্প যখন প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়, তখন তা কেবল ধর্মীয় অনুভূতি নয়, বরং সময়ের দলিল হয়ে ওঠে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অসুররূপ’ সেই দলিলেরই শিল্পিত প্রতিচ্ছবি—যেখানে বাংলার দুর্গা পুজো হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক-রাজনৈতিক ক্যানভাস।


সূত্র

  1. BBC Bengali, “দুর্গাপূজায় ট্রাম্পকে মহিষাসুর রূপে উপস্থাপন”, ১৮ অক্টোবর ২০২৫।
  2. The Hindu, “When Durga meets Trump: Bengal Pujo turns global satire”, ১৭ অক্টোবর ২০২৫।
  3. Times of India, “Trump as demon sparks debate at Bengal Puja”, ১৬ অক্টোবর ২০২৫।
  4. Al Jazeera English, “Art meets politics in India’s Durga Puja pandals”, ২০২৫।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা

নিউজ ডেস্ক

July 7, 2026

শেয়ার করুন

খেলাধুলা, ইতিহাস ও মানবতা ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬

ফুটবল ম্যাচ বা শৈল্পিক ফুটবলের আড়ালে ল্যাটিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার চকমকে সংস্কৃতির নিচে চাপা পড়ে আছে এক বুক কাঁপানো, রক্তক্ষয়ী এবং চরম অমানবিক ইতিহাস। ক্ষমতার জৌলুস ও সাম্রাজ্যবাদী লোভের বশে এই দেশ দুটির মাটিতে ইসলামের আলো এবং আদি মুসলিমদের অস্তিত্ব যেভাবে জোরপূর্বক, নির্মম দমনপীড়ন ও গণহত্যার মাধ্যমে মুছে দেওয়া হয়েছিল, তা বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে এক বড় কলঙ্ক।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমে (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের বৈশ্বিক ডেটা ও আন্তর্জাতিক কন্টেন্ট অ্যানালাইসিসের অভিজ্ঞতায় এই অন্ধকার ট্র্যাজিক ইতিহাসটি এবং এর বিপরীতে ইউরোপীয় ফুটবলে বর্তমান মুসলিম তারকাদের মানবিক ও প্রভাবশালী অবস্থান নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বিস্তারিত ‘রিলিজ-রেডি’ মেগা কন্টেন্ট আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

১. ব্রাজিলের নির্মম ইতিহাস: দাসপ্রথা, ‘মালে বিদ্রোহ’ ও বর্বর দমনপীড়ন

ব্রাজিলে ইসলামের ইতিহাস মূলত আফ্রিকান মুসলিম দাসদের রক্ত, অশ্রু এবং তাদের ওপর চলা পর্তুগিজদের মধ্যযুগীয় বর্বরতার ইতিহাস।

আটলান্টিক দাস বাণিজ্য (Atlantic Slave Trade) ও মালে (Malê) নিধন

১৫২৬ সালে পর্তুগিজরা ব্রাজিলে তাদের আখের খামার ও খনি খাটানোর জন্য আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো থেকে স্বাধীন মানুষকে লোহার চেইনে বেঁধে পশুর মতো জাহাজে করে নিয়ে আসে। এককভাবে শুধু ব্রাজিলেই নিয়ে আসা হয় ৩০ লক্ষের বেশি আফ্রিকান। এদের একটি বিশাল অংশ ছিলেন সুশিক্ষিত, সংস্কৃতিবান এবং হাফেজে কুর’আন মুসলিম, যাদের স্থানীয়ভাবে বলা হতো ‘মালে’ (Malê)

নিরক্ষর শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান মালিকরা এই শিক্ষিত মুসলিমদের সহ্য করতে পারত না। তাদের নামাজ পড়া, আরবি নাম রাখা বা আরবিতে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। নামাজ পড়তে গিয়ে ধরা পড়লে জুটত চাবুকের নির্মম আঘাত, অঙ্গহানি ও জঘন্য শাস্তি। মিশনারিরা বলপ্রয়োগ করে ও নির্যাতন চালিয়ে তাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করত।

১৮৩৫ সালের ঐতিহাসিক ‘মালে বিদ্রোহ’ (The Malê Revolt) ও গণহত্যা

কঠোর শাসন ও অমানবিক নির্যাতনের দেয়াল ভেঙে ১৮৩৫ সালের রমজান মাসের এক রাতে (২৫ জানুয়ারি) ব্রাজিলের বাহিয়া (Bahia) প্রদেশের সালভাদর শহরে মুসলিম দাসরা দাসপ্রথা ও ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক বিশাল সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেন।

তারা মাথায় টুপি ও গায়ে পবিত্র সাদা ইসলামিক পোশাক পরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রাজিলিয়ান ও পর্তুগিজ বাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারেননি। অত্যন্ত নির্মম ও পৈশাচিক উপায়ে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়। শত শত মুসলিমকে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসি দেওয়া হয়, হাজার হাজার দাসকে আমৃত্যু কারাদণ্ড বা চাবুকের আঘাতে পঙ্গু করা হয়। এরপর ব্রাজিলে ইসলাম বা আরবির সমস্ত চিহ্ন ও বইপত্র পুড়িয়ে এক প্রজন্মেরই পুরো ইসলাম ধর্মকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

ঝড় ও পথ হারানো জাহাজ: ১৮৬০ সালের সেই বিস্ময়কর ঘটনা

এই নির্মম নিধনের ২৫ বছর পর, ১৮৬০ সালে বাগদাদের প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ও ইমাম আব্দুর রহমান আফেন্দীর জাহাজ এক ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে দিক হারিয়ে রিও ডি জেনিরো বন্দরে আশ্রয় নেয়। সেখানে কিছু স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এসে তাঁকে স্পষ্ট আরবি উচ্চারণে সালাম দেয়—‘আসসালামু আলাইকুম’

ইমাম তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারলেন তারা সবাই মুসলিম হলেও ব্রাজিলের পূর্ববর্তী শাসকদের তীব্র অত্যাচার ও দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা নামাজ-রোজা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। তারা নামাজের সময় হলে নাচের মতো গোল হয়ে হাততালি দিত। এই করুণ দৃশ্য দেখে ইমাম আব্দুর রহমান আফেন্দী স্বদেশে ফিরে না গিয়ে দীর্ঘ ৬ বছর ব্রাজিলে থেকে তাদের পুনরায় ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা দেন। স্বদেশে ফিরে তিনি তাঁর এই ঐতিহাসিক সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিখ্যাত বই লেখেন—‘ব্রাজিলের সফরনামা’

২. আর্জেন্টিনার ইতিহাস: পরিচয় গোপন, স্প্যানিশ ইনকুইজিশন ও বাধ্যতামূলক ধর্মান্তকরণ

আর্জেন্টিনায় ইসলামের অস্তিত্ব মুছে ফেলার পদ্ধতিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে, কিন্তু তার রূপ ছিল সমান করুণ ও জঘন্য।

  • মরিস্কোদের ওপর অত্যাচার: স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের পর খ্রিস্টান শাসকরা মুসলিমদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ (Spanish Inquisition) শুরু করে। তখন অনেক মুসলিম প্রাণ বাঁচাতে বাহ্যিকভাবে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও গোপনে ইসলাম পালন করতেন, যাদের ‘মরিস্কো’ বলা হতো। এই মরিস্কোদের একটি বড় অংশ স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের সাথে দাস বা নাবিক হিসেবে আর্জেন্টিনায় আসেন।
  • ধর্মীয় পরিচয় চিরতরে বিলুপ্তি: আর্জেন্টিনার কড়া ক্যাথলিক আইনের কারণে এই মরিস্কো মুসলিমরা কখনো প্রকাশ্য কোনো ইসলামিক চর্চা করতে পারেননি। বংশপরম্পরায় নিজেদের আসল পরিচয় গোপন রাখতে রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় চাপের মুখে এক সময় তাদের পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের আসল ধর্মীয় পরিচয় সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে খ্রিস্টান সমাজে বিলীন হতে বাধ্য হয়।
  • সিরীয়-লেবানিজ অভিবাসীদের নাম পরিবর্তন: ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে সিরিয়া ও লেবানন থেকে বহু মুসলিম আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। কিন্তু আর্জেন্টিনার তৎকালীন বর্ণবাদী সংবিধানে নিয়ম ছিল—শুধুমাত্র ইউরোপীয় ও খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ফলে টিকে থাকার লড়াইয়ে এবং সামাজিক চরম বৈষম্য থেকে বাঁচতে এই মুসলিমদের অনেকেই নিজেদের নাম পরিবর্তন করে খ্রিস্টান নাম রাখতে বাধ্য হন।

এক নজরে দুই দেশের কালো ইতিহাসের তুলনা:

দেশ ও প্রেক্ষাপটপ্রধান মুসলিম গোষ্ঠীট্র্যাজেডি ও দমনপীড়নের মূল কারণবর্তমান অবস্থা (২০১০-২০২৬)
ব্রাজিল (পর্তুগিজ উপনিবেশ)আফ্রিকান ‘মালে’ (Malê) দাস সম্প্রদায়।১৮৩৫ সালের বিদ্রোহের পর নির্মম গণহত্যা, ফাঁসি এবং ইসলামিক সংস্কৃতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ।সরকারিভাবে ৩৫ হাজার, বেসরকারিভাবে প্রায় ৪-৫ লক্ষ মুসলিম (আরব অভিবাসীদের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত)।
আর্জেন্টিনা (স্প্যানিশ উপনিবেশ)স্প্যানিশ মরিস্কো এবং সিরীয়-লেবানিজ অভিবাসী।কঠোর ক্যাথলিক আইন এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাধ্যতামূলক পরিচয় ও নাম পরিবর্তন।ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম ইসলামিক সেন্টার এখন আর্জেন্টিনায় অবস্থিত।

আজ ল্যাটিন আমেরিকার এই দুই দেশে যে মুসলিম জনসংখ্যা দেখা যায়, তা মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা নতুন অভিবাসীদের হাত ধরে তৈরি হয়েছে। প্রাচীন আফ্রিকান ও স্প্যানিশ মুসলিমদের সেই রক্তঝরা ইতিহাস সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বৈরাচারী শাসকদের চক্রান্তে মাটির নিচেই চাপা পড়ে ছিল।

৩. বিপরীত চিত্র: ফ্রান্স ও জার্মানি জাতীয় দলে মুসলিম খেলোয়াড়দের রাজত্ব (২০২৬)

ল্যাটিন আমেরিকার সেই অন্ধকার ইতিহাসের বিপরীতে, ইউরোপের বর্তমান ফুটবল কাঠামোতে মুসলিম ফুটবলাররা মাঠের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে খেলছেন। ২০২৬ সালের চলমান আন্তর্জাতিক ফুটবল ও সাম্প্রতিক স্কোয়াডগুলোর তথ্য অনুযায়ী:

ফ্রান্স জাতীয় দল:

  • উসমান দেম্বেলে (Ousmane Dembélé) – ফরোয়ার্ড: প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (PSG) এই ফরোয়ার্ড বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক উইঙ্গার এবং একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলিম, যিনি নিয়মিত রোজা রাখেন।
  • এনগোলো কান্তে (N’Golo Kanté) – মিডফিল্ডার: মাঠে তাঁর ক্লান্তিহীন খেলা এবং মাঠের বাইরে অতুলনীয় বিনয় ও ধর্মভীতির জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
  • ইব্রাহিমা কোনাতে ও উইলিয়াম সালিবা: লিভারপুল ও আর্সেনালের হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এই দুই তারকা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ফ্রান্সের রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ।
  • দায়োত উপামেকানো, মানু কোনে ও ইউসুফ ফোফানা: এরা প্রত্যেকেই ফরাসি ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের অপরিহার্য মুসলিম তারকা।

জার্মানি জাতীয় দল:

  • আন্টোনিও রুডিগার (Antonio Rüdiger) – ডিফেন্ডার: রিয়াল মাদ্রিদের এই খেলোয়াড়কে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ও আগ্রাসী সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মনে করা হয়, যিনি মাঠে ও মাঠের বাইরে নিয়মিত ইসলামিক রীতিনীতি মেনে চলেন।
  • জামাল মুসিয়ালা (Jamal Musiala) – মিডফিল্ডার: বায়ার্ন মিউনিখের এই তরুণ মহাতারকা জার্মানির আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি।
  • লেরয় সানে, নাদিয়েম আমিরি ও মালিক থিয়াও: জার্মান আক্রমণে গতি ও রক্ষণে শক্তি জোগাতে এই মুসলিম ফুটবলাররা নিয়মিত অবদান রাখছেন।

৪. বিশ্বমঞ্চের মানবহিতৈষী ফুটবলার: যারা মুসলিমদের কল্যাণে কাজ করেন

মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এমন বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ফুটবলার রয়েছেন যারা মুসলিমদের কল্যাণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য নিয়মিত অবদান রাখছেন:

  • সাদিও মানে (Sadio Mané) — সেনেগাল: তিনি তাঁর নিজ গ্রাম বামবালিতে (Bambali) প্রায় ৫ লাখ পাউন্ড খরচ করে একটি আধুনিক হাসপাতাল এবং আড়াই লাখ পাউন্ড খরচ করে একটি মাধ্যমিক স্কুল তৈরি করে দিয়েছেন। এই অতুলনীয় সমাজসেবার জন্য ফুটবল বিশ্বে তাঁকে প্রথম ‘সক্রেটিস অ্যাওয়ার্ড’ (Socrates Award) দেওয়া হয়।
  • মোহাম্মদ সালাহ (Mohamed Salah) — মিসর: তিনি তাঁর নিজ গ্রাম নাগরিগে বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট, মেয়েদের স্কুল এবং আল-আজহারের একটি ধর্মীয় ইনস্টিটিউট তৈরি করেছেন। এছাড়াও মিসরের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে একদফায় ৩ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন।
  • হাকিম জিয়াশ (Hakim Ziyech) — মরক্কো: ২০১৫ সাল থেকে মরক্কো জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য কোনো পারিশ্রমিক বা বোনাসের টাকা তিনি নিজের জন্য নেননি। ২০২২ বিশ্বকাপের প্রাপ্ত বোনাসের ২ লাখ ৭৮ হাজার ডলারের পুরো টাকাটাই তিনি মরক্কোর দরিদ্র পরিবার এবং ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের কল্যাণে দান করে দিয়েছিলেন।
  • মেসুত ওজিল (Mesut Özil) — জার্মানি: ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর প্রাপ্ত বোনাসের পুরো অর্থ দিয়ে তিনি ব্রাজিলের ২৩ জন অসুস্থ মুসলিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জটিল অপারেশনের খরচ বহন করেছিলেন এবং চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বমঞ্চে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র” (References)

১. ব্রাজিলে ইসলামের ইতিহাস ও ‘মালে বিদ্রোহ’ (১৮৩৫) সংক্রান্ত সূত্র:

  • বই: ‘Reis, João José. (1993). “Slave Rebellion in Brazil: The Muslim Uprising of 1835 in Bahia” – এটি ব্রাজিলের বাহিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোয়াও জোসে রেইস কর্তৃক লিখিত একটি অত্যন্ত বিখ্যাত ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে ১৮৩৫ সালের আফ্রিকান মুসলিম দাসদের বিদ্রোহের প্রতি মুহূর্তের বিবরণ রয়েছে।
  • ভ্রমণকাহিনী: ‘Al-Baghdadi, Abd al-Rahman bin Abdullah. (1865). “Tasliyat al-Gharib bil-Nazar fi al-Ajib” (ব্রাজিলের সফরনামা)’ – বাগদাদের ইমাম আব্দুর রহমান আফেন্দী নিজেই তাঁর এই বইয়ে ১৮৬০ সালে ব্রাজিলে ঝড়ো জাহাজে পৌঁছানো এবং সেখানকার মুসলিমদের দুরবস্থার কথা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

২. আর্জেন্টিনা ও ‘মরিস্কো’ (Morisco) মুসলিমদের ইতিহাস সংক্রান্ত সূত্র:

  • গবেষণা ও ইতিহাস গ্রন্থ: ‘Klich, Ignacio. (1995). “Arabs and Jews in Latin America: A Bibliographical Guide” – ল্যাটিন আমেরিকায় বিশেষ করে আর্জেন্টিনায় স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের কারণে ছদ্মবেশী মরিস্কো মুসলিম এবং পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আসা সিরীয়-লেবানিজদের কড়া ক্যাথলিক আইনের মুখে বাধ্যতামূলক নাম ও পরিচয় পরিবর্তনের ওপর এই গবেষণাপত্রটি রচিত।

৩. ইউরোপীয় ফুটবল (ফ্রান্স ও জার্মানি) এবং মুসলিম খেলোয়াড়দের স্কোয়াড (২০২৬):

  • ক্রীড়া সংবাদ মাধ্যম: ‘FIFA.com’ (Official Website) এবং ‘Transfermarkt’ (International Football Database) – ২০২৬ সালের চলমান আন্তর্জাতিক ফুটবল সূচি এবং ফ্রান্স ও জার্মানির সাম্প্রতিকতম আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোর অফিশিয়াল স্কোয়াড (যেমন—উসমান দেম্বেলে, আন্টোনিও রুডিগার, উইলিয়াম সালিবা, জামাল মুসিয়ালাদের নিয়মিত ক্লাবস্তর ও জাতীয় দলের পরিসংখ্যান)।

৪. খেলোয়াড়দের দাতব্য চিকিৎসা ও সমাজসেবা সংক্রান্ত সূত্র:

  • পুরস্কার ও প্রতিবেদন: ‘France Football – Socrates Award (The Humanitarian Footballer Concept)’ – সাদিও মানের বামবালি গ্রামে হাসপাতাল ও স্কুল নির্মাণ এবং প্রথম ‘সক্রেটিস অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার অফিশিয়াল ঘোষণা।
  • মিডিয়া কভারেজ: ‘BBC Sport’, ‘The Guardian’, এবং ‘Al Jazeera English’ – বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন, যেখানে মেসুত ওজিলের উইঘুর মুসলিমদের সমর্থন ও ব্রাজিলে শিশুদের অপারেশন, মোহাম্মদ সালাহর নাগরিগ গ্রামে আল-আজহার ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং হাকিম জিয়াশের ২০২২ বিশ্বকাপের পুরো বোনাস মরক্কোর ক্যানসার রোগীদের দান করার খবর বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

ইতিহাস, ঐতিহ্য, বিশ্ব ফুটবল, তারকা খেলোয়াড়দের প্রোফাইল এবং সমসামयिक বিশ্বের যেকোনো নিখুঁত ও ১০০% সত্যতা-যাচাইকৃত কন্টেন্ট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ অথবা ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও সংক্রান্ত যেকোনো কনসালটেশনের জন্য সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।

পূর্ব ইউরোপ তুরস্ককে শত্রু মনে করে কেন

নিউজ ডেস্ক

July 6, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করার সুবাদে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে থাকা তুরস্কের প্রতিটি কূটনৈতিক চাল আমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর সাথে তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবলই সাধারণ প্রতিবেশীর মতো। কিন্তু আপনি যদি ইতিহাস এবং বর্তমানের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রন্টলাইনগুলো নিয়ে একটু গভীর পড়াশোনা ও আরঅ্যান্ডডি (R&D) করেন, তবেই বুঝতে পারবেন পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রধান দেশগুলো কেন আজ পর্যন্ত মুসলিম প্রধান তুরস্ককে তাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় শত্রু বা আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার দীর্ঘ ৬ বছরের ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও ক্যারিয়ারে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গ্লোবাল প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করেছি। সেই কাজের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক ইতিহাসের ওপর আমার করা সুদীর্ঘ স্টাডি ও টেবিলের ডাটাবেজ থেকে আজ আমি আপনাদের সামনে একদম অ্যাকাডেমিক ও ভূরাজনৈতিক সূত্রসহ অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব—পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর তুরস্ককে চিরশত্রু ভাবার পেছনের মূল ঐতিহাসিক কারণ এবং বর্তমানের জ্বলন্ত সংকটসমূহ।

১. অটোমান সাম্রাজ্যের ‘রক্তের ঋণ’ এবং বলকান অঞ্চলের ঐতিহাসিক ক্ষত

তুরস্ক বা তুর্কি জনগোষ্ঠী হলো বিশ্বের ইতিহাসের একসময়কার অন্যতম পরাশক্তি জাতি। ১২৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই অটোমান (তুর্কি) সাম্রাজ্য প্রায় ৬০০ বছর ধরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিশাল অংশ শাসন করেছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চল (Balkan Region) ১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তুর্কিদের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল।

  • দেবশিরমে (Devshirme) বা রক্ত কর ব্যবস্থা: আমি যখন বলকান অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে স্টাডি করছিলাম, তখন এই প্রথাটি আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। অটোমান শাসনামলে পূর্ব ইউরোপের (যেমন: সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রিস) খ্রিস্টান পরিবারগুলো থেকে জোরপূর্বক তাদের ছোট ছোট ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। পরে তাদের ইসলামে দীক্ষিত করে এবং কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সুলতানের অনুগত ‘জ্যানিসারি’ (Janissary) নামক বিশেষ এলিট বাহিনী তৈরি করা হতো। এই প্রথাটি বলকান অঞ্চলের মানুষের মনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তুর্কিদের প্রতি এক গভীর ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
  • রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম: বর্তমান পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো (গ্রিস, সার্বিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া) কিন্তু সহজে স্বাধীন হয়নি। ১৮২১ সালের গ্রীক স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা ১৮৭৬ সালের বুলগেরিয়ান এপ্রিল বিদ্রোহের মতো প্রতিটি ঘটনা ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। অটোমানদের সেই দমনপীড়নের ইতিহাস বলকান জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি। আমাদের উপমহাদেশে যেমন ব্রিটিশ বা পাকিস্তানিদের প্রতি একটা ঐতিহাসিক ক্ষোভ কাজ করে, ঠিক তেমনি পূর্ব ইউরোপের মানুষের মজ্জায় মজ্জায় তুর্কিদের বিরুদ্ধে এই ‘ঐতিহাসিক ট্রমা’ কাজ করে।

অ্যাকাডেমিক সূত্র ও রেফারেন্স:

  • ইনালসিক, হালিল (Halil Inalcik) রচিত ‘The Ottoman Empire: The Classical Age 1300–1600’
  • গ্লেনী, মিশা (Misha Glenny) রচিত ‘The Balkans: Nationalism, War, and the Great Powers, 1804-1999’

২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মেরুকরণ ও বলকান লিগের সংঘাত

দীর্ঘকাল শৃঙ্খলিত থাকার পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো যখন এক এক করে স্বাধীন হতে শুরু করল, তখন তাদের স্বাধীনতাকে স্থায়ী করতে এবং তুর্কিদের ইউরোপ থেকে সম্পূর্ণ তাড়িয়ে দিতে ১৯১২ সালে গঠিত হয় ‘বলকান লিগ’ (গ্রিস, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া ও মন্টিনিগ্রো)।

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যোগদান: বলকান যুদ্ধের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তীব্রভাবে চাচ্ছিল অটোমান সাম্রাজ্য যেন এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকে বা অন্তত জার্মানির পক্ষে যোগ না দেয়। কিন্তু তুরস্ক সব অনুরোধ উপেক্ষা করে ‘সেন্ট্রাল পাওয়ার্স’ বা জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের পক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
  • আঞ্চলিক যুদ্ধ ও নতুন ক্ষোভ: এর ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে পূর্ব ইউরোপের প্রায় প্রতিটি ফ্রন্টে তুর্কি বাহিনীদের সাথে স্থানীয় স্বাধীনতাকামীদের পুনরায় ভয়াবহ যুদ্ধ লেগে যায়। এই ঘটনাটি বলকান অঞ্চলের দেশগুলোর পুরনো ক্ষতে নতুন করে নুন ছিটিয়ে দেয় এবং তাদের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যে, তুরস্ক সবসময় ইউরোপের স্থিতিশীলতার জন্য একটি স্থায়ী হুমকি।

অ্যাকাডেমিক সূত্র ও রেফারেন্স:

  • ফিনকেল, ক্যারোলাইন (Caroline Finkel) রচিত ‘Osman’s Dream: The History of the Ottoman Empire’
  • উডহাউস, সি. এম. (C.M. Woodhouse) রচিত ‘Modern Greece: A Short History’

৩. বাইজেন্টাইন পতন, ১৯২২-এর যুদ্ধ এবং জাতিগত নিধনযজ্ঞের ইতিহাস

এই শত্রুতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় আরও অনেক গভীরে পোঁতা। ইউরোপীয় খ্রিস্টান রোমান সভ্যতা একসময় দুইভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল—যার একটি ছিল পশ্চিম ইউরোপকে ঘিরে, অন্যটি পূর্ব ইউরোপের দিকে। পূর্ব ইউরোপের অর্থোডক্স রোমান সাম্রাজ্যকে আমরা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (Byzantine Empire) হিসেবে জানি, যার রাজধানী ছিল খ্রিস্টানদের অত্যন্ত পবিত্র শহর কন্সটান্টিনোপল (Constantinople)।

১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহর (Sultan Mehmed II) নেতৃত্বে অটোমান তুর্কিরা কন্সটান্টিনোপল জয় করে এর নাম দেয় ইস্তাম্বুল। এর ফলে ১০০০ বছরেরও পুরনো খ্রিস্টান অর্থোডক্স সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং তাদের পবিত্র ‘হাজিয়া সোফিয়া’ চার্চকে মসজিদে রূপান্তর করা হয় (যা ২০২০ সালে বর্তমান এরদোয়ান সরকার পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করেছে এবং এটি পূর্ব ইউরোপে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে)।

  • গ্রিস-তুরস্ক যুদ্ধ (১৯১৯-১৯২২): প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমানদের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তির উস্কানিতে গ্রীকরা তাদের ঐতিহাসিক কন্সটান্টিনোপল ও এশিয়া মাইনরের পুরনো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করতে নয়া তুরস্ক আক্রমণ করে। কিন্তু তুর্কি জাতীয়তাবাদী নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুর্কিরা ১৯২১ সালে ‘সাকারিয়ার যুদ্ধ’ এবং ১৯২২ সালে ‘দুমলুপিনার যুদ্ধে’ গ্রীকদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। এই যুদ্ধে জয়ী হয়ে তুর্কি সেনারা তৎকালীন স্মির্না (বর্তমান ইজমির) শহর আগুনে পুড়িয়ে দেয় এবং বহু গ্রীক অধিবাসীকে হত্যা করে।
  • আর্মেনীয় ও গ্রীক নিধনযজ্ঞ (Genocide): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে অটোমান ও তুর্কি বাহিনীর হাতে প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনীয় এবং লাখ লাখ পন্টিক গ্রীক ও অ্যাসিরীয় খ্রিস্টান নিহত হয় বলে আন্তর্জাতিকভাবে দাবি করা হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো একে ‘বিংশ শতাব্দীর প্রথম গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক নৃশংসতার দায়ে আজও আন্তর্জাতিক ফোরামে চাপ প্রয়োগ করে।

অ্যাকাডেমিক সূত্র ও রেফারেন্স:

  • মোসকাফ, কোস্টাস (Kostas Moskof) এর ঐতিহাসিক দলিলসমূহ ও স্মির্নার আগুন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আর্কাইভ।
  • হিলমার কাইজার (Hilmar Kaiser) ও তানের আকচাম (Taner Akçam) রচিত ‘A Shameful Act: The Armenian Genocide and the Question of Turkish Responsibility’

৪. সাইপ্রাস সংকট, এনার্জি যুদ্ধ এবং বর্তমান এজিয়ান সাগরের উত্তেজনা

আমার বর্তমান ভূরাজনৈতিক অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, ইতিহাস যদি অতীত ক্ষত হয়, তবে সাইপ্রাস সংকট এবং এজিয়ান সাগরের সার্বভৌমত্ব হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত এবং বিপজ্জনক কারণ, যার জন্য পূর্ব ইউরোপ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) তুরস্কের ওপর তীব্র ক্ষিপ্ত।

        [ সাইপ্রাস ভূরাজনৈতিক সংকট চিত্র - ১৯৭৪ ]
       ___________________________________________
      |                                           |
      |   [ উত্তর সাইপ্রাস ] -> তুর্কি নিয়ন্ত্রণ   |
      |   =====================================   |
      |   [ দক্ষিণ সাইপ্রাস ] -> গ্রীক নিয়ন্ত্রণ  |
      |___________________________________________|
  • ১৯৭৪ সালের সামরিক হস্তক্ষেপ: সাইপ্রাস হলো তুরস্কের উপকূলের খুব কাছে অবস্থিত একটি ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ রাষ্ট্র, যেখানে গ্রীক ও তুর্কি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করত। ১৯৭৪ সালে গ্রিসের তৎকালীন সামরিক জান্তার মদদে সাইপ্রাসে একটি অভ্যুত্থান ঘটে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সাইপ্রাসকে গ্রিসের সাথে যুক্ত করা (যাকে ইতিহাসে “ইনোসিস” আন্দোলন বলা হয়)। নিজের দোরগোড়ায় গ্রিসের এমন চাল দেখে তুরস্ক আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে সাইপ্রাসে সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালায় এবং দ্বীপের উত্তর অংশ (প্রায় ৩৬% এলাকা) দখল করে নেয়। আজ পর্যন্ত সেই অংশটি “উত্তর সাইপ্রাস তুর্কি প্রজাতন্ত্র” (TRNC) নামে পরিচিত, যা বিশ্বমঞ্চে একমাত্র তুরস্ক ছাড়া আর কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি।
  • এজিয়ান সাগর ও সমুদ্রসীমা বিবাদ (EEZ): বর্তমান সময়ে এই বিবাদ আরও চরম আকার ধারণ করেছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বিশাল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর। গ্রিস দাবি করে যে তাদের দ্বীপগুলোর কারণে এজিয়ান সাগরের সিংহভাগ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Exclusive Economic Zone) তাদের। অন্যদিকে তুরস্কের দাবি, গ্রিসের এই অবস্থান তুরস্ককে তাদের নিজস্ব উপকূলেই অবরুদ্ধ করে ফেলছে। তুরস্ক প্রায়ই গ্রীক দ্বীপপুঞ্জের কাছে যুদ্ধজাহাজ এবং ড্রিলিং জাহাজ পাঠায়, যাকে গ্রিস, সাইপ্রাস এবং পুরো পূর্ব ইউরোপীয় ব্লক ‘দস্যুতা’ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেয়।

অ্যাকাডেমিক ও নিউজ সূত্র:

  • বিবিসি নিউজ (BBC Archive) এবং রয়টার্স ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট: ‘Cyprus-Turkey Maritime and Gas Dispute in Eastern Mediterranean’
  • জোসেফ এস. জোসেফ (Joseph S. Joseph) রচিত ‘Cyprus: Ethnic Conflict and International Politics’

আমার চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ও এসইও অ্যানালাইসিস

আমি যখন এই সম্পূর্ণ ডেটাগুলো এক সুতোয় গাঁথি, তখন একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়—পূর্ব ইউরোপ ও তুরস্কের মধ্যকার এই শত্রুতা কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক বুলি নয়। এর পেছনে রয়েছে ৬০০ বছরের ধর্মীয় সংঘাত, অটোমান সাম্রাজ্যের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের ট্রমা, গ্রীক-আর্মেনিয়ান গণহত্যার স্মৃতি এবং বর্তমানে ভূমধ্যসাগরের গ্যাস ও জলসীমা দখলের আধুনিক অর্থনৈতিক যুদ্ধ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ‘নব্য-অটোমানবাদ’ (Neo-Ottomanism) নীতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মনে এই ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, তুরস্ক হয়তো আবারও তাদের পুরনো সাম্রাজ্যবাদী রূপে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি, মহাদেশীয় যুদ্ধ ও ইতিহাস এবং সমসামयिक বিশ্বের যেকোনো নিখুঁত ও ১০০% সত্যতা-যাচাইকৃত কন্টেন্ট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ অথবা ডিজিটাল মার্কেটিং ও এসইও সংক্রান্ত যেকোনো কনসালটেশনের জন্য সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন আমার নিজস্ব সাইট bdsbulbulahmed.com-এ।

পৃথিবীতে মোট দেশের সংখ্যা কত

নিউজ ডেস্ক

July 5, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ও ভৌগোলিক তথ্য ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

কন্টেন্ট লেখক ও প্রধান সম্পাদক: বিডিএস বুল্বুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬

“পৃথিবীতে মোট কতটি দেশ আছে?”—বাইরে থেকে দেখতে এই প্রশ্নটি খুব সহজ মনে হলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতির কারণে এর উত্তরটি বেশ জটিল।

আমি বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant), আমার এই অফিশিয়াল পোর্টালে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। একজন আন্তর্জাতিক ঘটনার পর্যবেক্ষক এবং কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে আজ আমি আপনাদের সামনে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন দেশের সংখ্যা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এর তারতম্য এবং আমাদের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস একদম সহজ ও প্রাতিষ্ঠানিক ফরমেটে তুলে ধরব।

১. জাতিসংঘ (UN) ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দেশের সংখ্যা

সহজ কথায়, বিশ্বজুড়ে দেশের সংখ্যা নির্ভর করে আপনি কোন সংস্থার স্বীকৃতি বা কোন তালিকার ওপর ভিত্তি করে গণনা করছেন তার ওপর।

  • স্বাধীন দেশের সংখ্যা (১৯৫টি): জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি অনুযায়ী এই ১৯৫টি দেশকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হয়।
    • জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র (১৯৩টি): বিশ্বের ১৯৩টি দেশ সরাসরি জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
    • পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র (২টি): ২টি দেশ জাতিসংঘের সদস্য না হলেও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সম্পূর্ণ স্বীকৃত—ভ্যাটিকান সিটি এবং ফিলিস্তিন
  • ভিন্ন ভিন্ন তালিকায় মোট দেশের সংখ্যা (১৯৭ থেকে ২৪৯টি):
    • ১৯৭টি দেশ: জাতিসংঘের ১৯৫টি দেশের সাথে আংশিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত তাইওয়ান এবং কসোভো-কে যুক্ত করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯৭।
    • ২০hexটি দেশ: আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (IOC) নিজস্ব মানদণ্ডে বিশ্বের ২০৬টি দেশকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
    • ২১১টি দেশ: ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা (FIFA)-র তালিকায় মোট সদস্য দেশের সংখ্যা ২১১টি (যেমন: ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, বরং যুক্তরাজ্যের অংশ হলেও ফিফায় আলাদা দেশ হিসেবে খেলে)।
    • ২৪৯টি দেশ: আন্তর্জাতিক মান সংস্থা ISO Standard অনুযায়ী বাণিজ্যিক ও ডেটা ব্যবহারের সুবিধার জন্য মোট ২৪৯টি ভৌগোলিক অঞ্চলের জন্য আলাদা কান্ট্রি কোড (Country Code) বরাদ্দ রাখা হয়েছে (যেখানে গ্রিনল্যান্ড বা হংকংয়ের মতো অধীনস্থ অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত)। [১, ২]

২. বিশ্বের মহাদেশভিত্তিক স্বাধীন দেশের তালিকা

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে কোনো স্থায়ী মানব বসতি বা স্বাধীন দেশ না থাকায়, জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্বের মোট ১৯৫টি স্বাধীন দেশকে বাকি ৬টি প্রধান মহাদেশে ভাগ করা হয়েছে:

  • আফ্রিকা (৫৪টি দেশ): এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেশসমৃদ্ধ মহাদেশ। প্রধান দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া ও মরক্কো।
  • এশিয়া (৪৮টি দেশ): আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম মহাদেশ। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, জাপান, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া এই মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। (নোট: রাশিয়া ও তুরস্কের কিছু অংশ এশিয়ায় থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তাদের ইউরোপের দেশ হিসেবে ধরা হয়)
  • ইউরোপ (৪৪টি দেশ): যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, সুইজারল্যান্ড ও বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দেশ ভ্যাটিকান সিটি এই মহাদেশে অবস্থিত।
  • উত্তর আমেরিকা (২৩টি দেশ): যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো ছাড়াও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো (যেমন: কিউবা, জ্যামাইকা) এই মহাদেশের অংশ।
  • ওশেনিয়া/অস্ট্রেলিয়া (১৪টি দেশ): অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ছাড়াও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র যেমন ফিজি ও সামোয়া এই মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত।
  • দক্ষিণ আমেরিকা (১২টি দেশ): ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, চিলি ও পেরুসহ মোট ১২টি স্বাধীন দেশ এই মহাদেশে রয়েছে।

৩. দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের স্বাধীনতার ইতিহাস (সংক্ষিপ্ত রূপরেখা)

বিশ্বের ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার ইতিহাস রয়েছে আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়, যা মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

ক) ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা (১৯৪৭)

প্রায় ২০০ বছর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ রাজের শাসনের পর, তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের মুখে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভর করে পাকিস্তান (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

খ) বাংলাদেশের গৌরবময় স্বাধীনতা (১৯৭১)

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দ্বারা চরম অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের শিকার হয়। [১] ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালি বেসামরিক মানুষের ওপর ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা শুরু করলে, ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম এবং ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে।

গ) শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের স্বাধীনতা

  • শ্রীলঙ্কা (১৯৪৮): ভারতের স্বাধীনতার ঠিক পর পরই, ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে।
  • মালদ্বীপ (১৯৬৫): দীর্ঘদিন ব্রিটিশদের সুরক্ষিত অঞ্চলে (Protectorate) পরিণত থাকার পর, ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সাধারণ জ্ঞান ও রাজনৈতিক মানদণ্ডে পৃথিবীতে স্বাধীন দেশের সংখ্যা ১৯৫টি। তবে অলিম্পিক, ফিফা বা বাণিজ্যিক ডেটার (ISO) হিসাব ধরলে এই সংখ্যা ২০৬ থেকে ২৪৯ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণেই এই সংখ্যার তারতম্য ঘটে থাকে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের স্বাধীন হওয়ার পেছনে রয়েছে একেকটি দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প, যা আমাদের এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আজও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

আন্তর্জাতিক সাধারণ জ্ঞান, ভূরাজনীতি, বিশ্ব মানচিত্রের ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিশ্বের যেকোনো নিখুঁত ও ১০০% সত্যতা-যাচাইকৃত কন্টেন্ট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ অথবা সরাসরি কনসালটেশনের জন্য আমার অফিশিয়াল সাইট bdsbulbulahmed.com-এ ভিজিট করতে পারেন।

২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ