জাতীয়
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নাম একদিকে যেমন জাতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিতর্কের কারণে তাকে ‘খুনি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে তাকে এইভাবে অভিহিত করা হয়। তবে, এই অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? এবং কেন তাকে খুনি হিসেবে অভিহিত করা হয়, তা কি যথাযথ? আসুন এই বিতর্কিত বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি।
১. শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
প্রথম বিতর্কের মূল বিষয় হলো শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা। আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকরা বারবার জিয়াকে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন। তবে, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
বিতর্ক ১: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়ার প্রতিক্রিয়া
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে, ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়েত জামিল জিয়ার বাসায় যান। সেখানেই জিয়া বলেন, “President is dead, so what? Vice-President is there. You should uphold the constitution.” এর পরিপ্রেক্ষিতে, অনেকেই মনে করেন যে জিয়ার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি হত্যাকাণ্ডে তার সহানুভূতির ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদিও এতে তার সরাসরি জড়িত থাকার কোন প্রমাণ নেই ।
বিতর্ক ২: মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের সাক্ষাৎকার
১৯৭৬ সালের আগস্টে মেজর ফারুক ও মেজর রশীদ লন্ডনে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এই সাক্ষাৎকারে মেজর রশীদ বলেন, “আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল জেনারেল জিয়া। তবে, তিনি আমাদের পরিকল্পনায় জড়াতে রাজি হননি।” মেজর ফারুকের কথায়, তিনি জিয়াকে বলেছিলেন, “যদি আপনি সমর্থন দেন, আমরা দেশ পরিবর্তন করতে পারব।” তবে, জিয়া সরাসরি ওই পরিবর্তনের সাথে নিজেকে জড়াতে চাননি ।
২. মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাবলী এবং সেনা অভ্যুত্থান
জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। তার মধ্যে, ১৯৭৭ সালে অভ্যুত্থানকারীদের শাস্তি দেওয়ার পর অনেক সেনা অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে, সেনা অভ্যুত্থানের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ছিল সামরিক আইন এবং এটি কোন ধরণের শাসকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ছিল, যা আইনগতভাবে যথাযথ ছিল ।
৩. কর্নেল তাহেরকে বিনা অপরাধে ফাঁসি দেওয়া
কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর পেছনে যে রাজনৈতিক কারণে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার পর ঘটে যাওয়া সামরিক অভ্যুত্থান। অনেকেই দাবি করেন, কর্নেল তাহের ছিল জিয়ার শাসনের প্রতি বিরোধী এবং তাকে হত্যা করার মাধ্যমে জিয়া তার শাসন আরও শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন ।
৪. ‘খুনি জিয়া’ বিষয়ক আওয়ামী লীগের দাবি
আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থকরা দাবী করেন, জিয়াউর রহমান শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে, এই দাবীর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়া সরাসরি জড়িত না থাকলেও তার কিছু বক্তব্য এবং পরিস্থিতি তাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে। তবে, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক বেশি আলোচিত হয়েছে ।
৫. জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সেনাবাহিনী
জিয়া যখন সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান সংগঠিত করেছিলেন, তখন তিনি তার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে, এ সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে অনেক সেনা অফিসারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যেটি এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ছিল ।
উপসংহার
জিয়াউর রহমানকে ‘খুনি’ বলা রাজনৈতিকভাবে এক ধরনের প্রতিহিংসা হতে পারে, তবে তার শাসনামল এবং তার সাথে যুক্ত ঘটনাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডে সরাসরি তার জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই, তবে তার কিছু বক্তব্য এবং রাজনৈতিক পদক্ষেপ তাকে সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।
রেফারেন্স:
- “Bangladesh: A Legacy of Blood” – Anthony Mascarenhas
- “The Army Act 1952” – Bangladesh Government Publications
- “Bangladesh Dandabidhi” – Bangladesh Penal Code
- “The Bangladesh Liberation War: A Global Perspective” – Mizanur Rahman Khan
- “The Politics of Power: Zia’s Regime” – Shafayet Jamal
- “Military Rule and Its Consequences” – Bangladesh National Archives
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
ঢাকা, ১০ এপ্রিল ২০২৬: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টেবিলে বাংলাদেশ এখন এক কুশলী খেলোয়াড়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া সেই কালজয়ী দর্শন—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’—নীতিকে পুঁজি করে ২০২৬ সালের জটিল বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ রাষ্ট্র আসলে কে?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বাংলাদেশ সেই মানুষটির মতো, যে গ্রুপের সবার সাথেই সুসম্পর্ক রাখে। কারণ সে জানে, জীবনে কে কখন কাজে লাগবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।
১. ভারত: নাড়ির টানে বাঁধা পুরোনো বন্ধু

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সেই পুরোনো দিনের। ১৯৭১ সালের কঠিন সময়ে ভারতের অবদান এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি করেছে। সীমান্ত ইস্যু বা পানি বণ্টন নিয়ে মাঝেমধ্যে মনোমালিন্য হলেও, দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কটি সবসময়ই একটি ‘স্পেশাল’ মর্যাদা পায়। ২০২৬-এর নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এই ঐতিহাসিক টান অটুট রয়েছে।

২. চীন: উন্নয়নের ‘ক্যাশ-রিচ’ পার্টনার

যখনই বড় কোনো অবকাঠামো, ব্রিজ বা টানেলের কথা আসে, তখনই বাংলাদেশের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চীনের মুখ। এই বন্ধুটি বেশ হেল্পফুল এবং বড় বড় প্রজেক্টে অর্থায়নে কার্পণ্য করে না। বাংলাদেশ জানে, দেশের উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের কোনো বিকল্প নেই।
৩. জাপান: নিঃস্বার্থ ও নীরব কর্মবীর

জাপান হচ্ছে সেই বন্ধু, যে খুব বেশি কথা বলে না কিন্তু একদম কাজের মানুষ। মেট্রো রেল থেকে শুরু করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর—বাংলাদেশের রূপান্তরের পেছনে জাপানের অবদান অত্যন্ত স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন। কোনো ভূ-রাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই জাপান সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে।
৪. যুক্তরাষ্ট্র: নিয়মের কড়াকড়ি ও বড় বাজার

যুক্তরাষ্ট্র সেই বন্ধু, যে সবসময় পাশে থাকার আশ্বাস দেয় কিন্তু সাথে একগাদা ‘রুল বুক’ বা নিয়ম ধরিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ওয়াশিংটন সবসময়ই একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ (BDS Analysis):
২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে নেই। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার মাঝে বাংলাদেশ যেভাবে সবার সাথে ব্যালেন্স করছে, তা অসাধারণ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি, চীন-জাপান থেকে বিনিয়োগ এবং পশ্চিমা দেশগুলো থেকে রপ্তানি সুবিধা—সবগুলোকেই বাংলাদেশ সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। সোজা কথায়, বাংলাদেশ এখন ‘স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি’র এক সফল উদাহরণ।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা (Sources):
- পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বাংলাদেশ): বৈদেশিক নীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেস রিলিজ।
- ডয়েচে ভেলে ও রয়টার্স: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি বিষয়ক প্রতিবেদন (এপ্রিল ২০২৬)।
- মহাসাগরীয় ও কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্র: ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান।
- বিডিএস ডিজিটাল এজেন্সি জিওপলিটিক্যাল ডাটা ব্যাংক।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট )
আজ ১২ মার্চ ২০২৬। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা রাজনীতিবিদের চলে যাওয়ার দিন। যিনি কেবল একজন মন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন এক বিশাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মশিউর রহমান যাদু মিয়া—যাঁর নাম শুনলে ভেসে ওঠে এক আপসহীন নেতার ছবি, যিনি রাজপথ থেকে সংসদ পর্যন্ত সর্বত্র ছিলেন সমান তেজস্বী।

১. ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় মঞ্চে উত্থান
১৯২৪ সালে নীলফামারীর ডিমলায় জন্মগ্রহণ করা এই নেতা ছাত্রজীবনেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৬-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ—সবখানেই যাদু মিয়ার উপস্থিতি ছিল অনন্য। তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পরবর্তীকালে মওলানা ভাসানীর হাত ধরে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২. মজলুম জননেতার সুযোগ্য উত্তরসূরি
মওলানা ভাসানীর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন যাদু মিয়া। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা থাকাকালীন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকা এবং ইয়াহিয়া খানকে ‘গাদ্দার’ বলার দুঃসাহস তাঁকে গণমানুষের নায়কে পরিণত করেছিল।
৩. ফারাক্কা লং মার্চ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তি
১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের মূল সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল যাদু মিয়ার কাঁধে। ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের হাল ধরেন। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনুরোধে তিনি দেশ গড়ার কাজে যুক্ত হন।
৪. বিএনপি গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় ‘সিনিয়র মন্ত্রী’
যাদু মিয়া ছিলেন আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম স্থপতি। ন্যাপের কার্যক্রম স্থগিত করে প্রগতিশীল, দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫. এক ঐতিহাসিক প্রস্থান
১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর চিকিৎসায় ভারত ও পাকিস্তান থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আনা হলেও নিয়তির অমোঘ লিখন পাল্টানো যায়নি। তাঁর মৃত্যুতে তৎকালীন সময়ে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: যাদু মিয়া ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি কেবল দল গঠন করেননি, দিয়েছেন এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দর্শন। আজকের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটেও তাঁর সেই ‘দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তি’র ঐক্যের ডাক সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি ছিলেন উত্তরের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ, যাঁর নামানুসারে আজও টিকে আছে ‘যাদুর চর’।
মশিউর রহমান যাদু মিয়া: এক নজরে (১৯২৪-১৯৭৯)
| পর্যায় | রাজনৈতিক ভূমিকা ও অবদান |
| জন্ম | ৯ জুলাই ১৯২৪, ডিমলা, নীলফামারী। |
| আন্দোলন | তেভাগা আন্দোলন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন। |
| উপাধি | ‘যাদু মিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত। |
| সাফল্য | পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলের উপ-নেতা (১৯৬২)। |
| অবদান | ফারাক্কা লং মার্চের সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান (১৯৭৬)। |
| রাষ্ট্রীয় পদ | সিনিয়র মন্ত্রী (প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায়), জিয়াউর রহমান সরকার। |
| জীবনাবসান | ১২ মার্চ ১৯৭৯, ঢাকা। |
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
গবেষণা ও বিশ্লেষণ: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট)
ঢাকা, ৭ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে ‘বীর উত্তম’ খেতাবপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের কেবল একজন সমরনায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক দার্শনিক। তাঁর জীবন এবং ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাইয়ের সেই বিতর্কিত ফাঁসি—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল ক্ষত। আজ আমরা বিশ্লেষণ করব কেন তাহেরকে ‘বাংলার চে গুয়েভারা’ বলা হয় এবং কেন তাঁর বিচারকে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ‘ঠাণ্ডা মাথার খুন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
১. সম্মুখ সমর থেকে ১১ নম্বর সেক্টরের রূপকার

১৯৬১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তাহের ছিলেন একজন গেরিলা যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ। ১৯৭১ সালে যখন দেশ আক্রান্ত, তখন নিজের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি ভারত সীমান্তে পাড়ি দেন। ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে এক দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী। ২রা নভেম্বর কামালপুরের সম্মুখ সমরে নিজের বাম পা হারানো তাহের প্রমাণ করেছিলেন—সেক্টর কমান্ডাররা কেবল ওয়াকিটকিতে নির্দেশ দেন না, তাঁরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন।
২. ৭ই নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লব ও ১২ দফা দাবি

১৯৭৫ সালের অস্থির সময়ে ৩রা নভেম্বর যখন জিয়াউর রহমান বন্দি হন, তখন তাহেরের নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ৭ই নভেম্বর এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটায়। এই বিপ্লবের মূল ভিত্তি ছিল ১২ দফা দাবি, যার মধ্যে ছিল:
- শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী: অফিসার ও জোয়ানদের মধ্যকার ঔপনিবেশিক ভেদাভেদ দূর করা।
- ব্যাটম্যান প্রথা বিলোপ: ব্যক্তিগত কাজে সৈনিকদের দাসের মতো ব্যবহার বন্ধ করা।
- গণবাহিনী গঠন: সেনাবাহিনীকে শোষিত মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর।
- দুর্নীতি দমন: পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা এবং রাজবন্দিদের মুক্তি।
৩. জিয়াউর রহমান বনাম কর্নেল তাহের: এক ট্র্যাজিক বিশ্বাসঘাতকতা

জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তাহের আশা করেছিলেন ১২ দফা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। জিয়াউর রহমান সংহতি প্রকাশের বদলে দমানোর নীতি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তাহেরকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় এবং এক গোপন সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়।
৪. প্রহসনের বিচার ও উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায় (সূত্র বিশ্লেষণ)
২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে কর্নেল তাহেরের গোপন বিচারকে ‘অবৈধ ও অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে।
- সূত্র ১ (High Court Verdict, 2011): রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেছে যে, তাহেরের ফাঁসি ছিল একটি ‘ঠাণ্ডা মাথার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ (Cold-blooded murder)।
- সূত্র ২ (Lawrence Lifschultz): প্রখ্যাত সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর ‘Bangladesh: The Unfinished Revolution’ বইয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন কীভাবে এই বিচারের কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।
৫. শেষ মুহূর্তের বীরত্ব: এক অমর মহাকাব্য
ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাহেরের আচরণ ছিল কিংবদন্তীতুল্য। তিনি তওবা পড়তে অস্বীকার করে বলেছিলেন, “আমি কোনো পাপ করিনি, আমি কেন তওবা পড়ব?” হাসিমুখে ফজলি আম খেয়ে এবং নিজের জুতা-প্যান্ট গুছিয়ে তিনি নিজেই ফাঁসির দড়ি তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর শেষ কথা ছিল— “বিদায় দেশবাসী। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।”
বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যখন জাতীয় ঐক্য খুঁজি, তখন কর্নেল তাহেরের সেই ‘শ্রেণিহীন সমাজ’ ও ‘জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র’-এর স্বপ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব হলেও তাঁর আদর্শকে স্তব্ধ করা যায়নি। ইতিহাসের আদালতে আজ কর্নেল তাহের একজন বিজয়ী বীর।
তথ্যসূত্র (References for Verification):
- সুপ্রিম কোর্টের রায় (২০১১): রিট পিটিশন নং-৬৭৮৭/২০১০ (কর্নেল তাহেরের বিচার অবৈধ ঘোষণা)।
- Lawrence Lifschultz: Bangladesh: The Unfinished Revolution (Oxford University Press).
- Anwar Hossain: Sun up, Sun down: My days with Colonel Taher.
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ: ১১ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধের ঘটনাবলি ও বীর উত্তম খেতাবপত্র।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



