অপরাধ

আওয়ামী লীগে ‘রাজাকার’—অভিযোগের তালিকা, প্রমাণের অবস্থা ও বাস্তবতা (ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট)
রাজাকার

নিউজ ডেস্ক

September 2, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক

বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রশ্নটা সোজা: আওয়ামী লীগে কি ‘রাজাকার’ আছে? থাকলে কারা?—বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সময় এক তালিকা প্রকাশ করে এমনই দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু রাজনীতি, ইতিহাস আর নথির ভাষা এক জায়গায় এনে দেখলে—এখানে অভিযোগ আছে, পাল্টা-অভিযোগ আছে, আর আছে বহু অস্পষ্টতা। চলুন, তথ্যভিত্তিকভাবে গোছাই।

১) অভিযোগের উৎস—কি বলা হয়েছিল

চ্যানেল আই অনলাইন–এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে (ডিসেম্বর ২০১৮) রিজভী দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তাঁদের পরিবারের মধ্যে ‘রাজাকার/আল-বদর/আল-শামস’–সংযোগ ছিল—এমন ২০-এর বেশি নাম তাঁর তালিকায় রয়েছে। নামগুলোর সঙ্গে বই, নিবন্ধ বা স্থানীয় তালিকার রেফারেন্সও টানা হয়—যেমন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কাজী জাফর উল্লাহ, এইচ.এন. আশিকুর রহমান, মহিউদ্দিন খান আলমগীর—এভাবে আরও অনেকে। অভিযোগগুলোর কিছু অংশ পরিবার-পরিজনের ভূমিকাকে টেনে আনে, কিছুতে বলা হয় ‘তালিকায় নাম আছে’, বা ‘পাকিস্তান সরকারের অধীনে দায়িত্বে ছিলেন’—ইত্যাদি। চ্যানেল আই অনলাইন

২) অভিযোগ ≠ দোষী সাব্যস্ত—আইনি ও ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ

এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি:

  • রাজাকার ছিল কি না—এটা আইনিভাবে প্রমাণনির্ভর। কোনো বই, বক্তৃতা বা রাজনৈতিক বক্তব্য প্রমাণের বিকল্প নয়।
  • ২০০৮ সালে ডা. এম.এ. হাসানের নেতৃত্বে War Crimes Facts Finding Committee যে বেসরকারি তালিকা প্রকাশ করে, সেটি ছিল অভিযোগনির্ভর প্রাথমিক তালিকা—সরকারি বা ট্রাইব্যুনালের রায় নয়। সংগঠনটি প্রকাশের পর হুমকি-ধমকিও পেয়েছে—মানে তালিকাটি নিজেরাই “alleged” শব্দটি ব্যবহার করে। Amnesty InternationalVOA বাংলা
  • ২০১৯ সালে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত রাজাকার তালিকায় বহু ভুল ধরা পড়ে—মুক্তিযোদ্ধা-কর্মী বা আওয়ামী লীগারদেরই কারও কারও নাম ঢুকে যায়; পরে সরকার ভুল স্বীকার করে সংশোধনের কথা বলে। এর মানে যে কোনো তালিকা, প্রাথমিক পর্যায়ে, ভুল-ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে—ক্রস-ভেরিফিকেশন ছাড়া “তালিকা” নিজে চূড়ান্ত সত্য নয়। Dhaka Tribunedaily-sun

৩) যাদের নাম ঘোরে—তথ্যকে কীভাবে পড়বেন

আপনার দেওয়া দীর্ঘ তালিকায় কয়েক ধরনের যুক্তি দেখা যায়—

  1. পারিবারিক সংযোগ: অমুকের ভাই/পিতা অমুক সংগঠনে ছিলেন—এতে ব্যক্তি নিজে ‘রাজাকার’ প্রমাণ হয় না।
  2. তৎকালীন সরকারি চাকরি: ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে কোনো বাঙালি কর্মকর্তা চাকরিতে ছিলেন—স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘সহযোগী’ বলা যায় না; কারও বিরুদ্ধে অপরাধে সক্রিয় অংশগ্রহণের সাক্ষ্য-নথি লাগবে।
  3. স্থানীয়/অপ্রাতিষ্ঠানিক তালিকা: স্থানীয় ইউনিট কমান্ড/প্রকাশনা—এসব গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, কিন্তু আদালতে পরীক্ষিত না হলে চূড়ান্ত নয়

অর্থাৎ, যে নামই আসুক—দুটি প্রশ্নে ফিল্টার করবেন:

  • (ক) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের রায় আছে কি?
  • (খ) স্বীকৃত গবেষণা/সরকারি নথিতে ক্রস-রেফারেন্স আছে কি?

এই মানদণ্ডে তালিকার অনেক দাবি রাজনৈতিক বক্তব্যের পর্যায়েই পড়ে থাকে; বিচারিক সত্যে উন্নীত হয় না।

৪) কেন বারবার এমন তালিকা আসে

বাংলাদেশে ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধ ইস্যু গভীর ন্যায়বোধের প্রশ্ন; একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্ত্র। নির্বাচন, আন্দোলন, দলীয় মেরুকরণ—সব ক্ষেত্রেই এ ইস্যুতে পুরনো নাম টেনে আনা হয়। ২০১৯-এর সরকারি “রাজাকার তালিকা” কেলেঙ্কারি দেখিয়েছে—পদ্ধতিগত কড়াকড়ি ছাড়া তালিকা বিপজ্জনকভাবে ভুল হতে পারেDhaka Tribune

৫) তাহলে উত্তর কী?

  • হ্যাঁ—আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের আশপাশে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ পটভূমির ব্যক্তি/পরিবারের অভিযোগ ইতিহাসে আছে—এটা রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিভিন্ন বেসরকারি নথিতে বারবার এসেছে। চ্যানেল আই অনলাইন
  • কিন্তু ‘কারা রাজাকার’—এ প্রশ্নের নির্ভুল তালিকা বলতে হলে আদালতের রায় বা যাচাই-করা সরকারি নথি চাই। আংশিক, ত্রুটিপূর্ণ বা কোট-আর্টিকেলনির্ভর তালিকা দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে “দোষী” বলা যায় না—এটা ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত। ২০১৯-এর ঘটনায় সরকার নিজেও তা বুঝেছে। Dhaka Tribune

৬) পাঠকের জন্য চেকলিস্ট (ফ্যাক্টচেক-ফ্রেমওয়ার্ক)

  • নামটি কি ট্রাইব্যুনালের রায়ে এসেছে?
  • না হলে, একাধিক স্বীকৃত উৎসে কি একই তথ্য আছে (প্রকাশনার বছর/লেখক/নোটসমেত)?
  • অভিযোগ কি ব্যক্তির নিজের ভূমিকা নিয়ে, নাকি কেবল আত্মীয়তার সূত্র?
  • কোনো সরকারি সংশোধনী/ভুল-স্বীকার আছে কি—যেমন ২০১৯-এ হয়েছিল? Dhaka Tribune

সূত্র

  1. চ্যানেল আই অনলাইন—“আওয়ামী লীগে থাকা ‘রাজাকারে’র তালিকা দিলেন রিজভী” (বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যভিত্তিক প্রতিবেদন)। চ্যানেল আই অনলাইন
  2. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল—War Crimes Facts Finding Committee-র (ডা. এম.এ. হাসান) তালিকা প্রকাশ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া; তালিকাটি অভিযোগনির্ভর ও বিতর্কিত ছিল—এই প্রমাণ। Amnesty International
  3. ঢাকা ট্রিবিউন—২০১৯ সালের সরকারি “রাজাকার তালিকা”তে ভুল শনাক্ত ও সংশোধনের প্রসঙ্গ; তালিকা-ভিত্তিক দাবির সীমাবদ্ধতা বোঝাতে। Dhaka Tribune

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মেজর হাফিজ

নিউজ ডেস্ক

March 15, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একজন মানুষ কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব, যিনি একাধারে রণাঙ্গনের শ্রেষ্ঠ বীর, বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি এবং একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ঠিক তেমনই এক জীবন্ত রূপকথা।

তারেক রহমানের এই একটি মনোনয়ন বাংলাদেশের রাজনীতির সব সমীকরণ বদলে দিয়েছে। কেন মেজর হাফিজকে বলা হয় ‘অলরাউন্ডার অফ দ্য সেঞ্চুরি’? চলুন জেনে নিই তাঁর জীবনের ৫টি রোমাঞ্চকর তথ্য।

১. বঞ্চিত এক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’?

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, মেজর হাফিজ ছিলেন যশোর সেনানিবাসের সেই অকুতোভয় বাঙালি অফিসার, যিনি প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়েছিলেন। তাঁর রণকৌশল আর সাহসিকতা দেখে সহযোদ্ধারা তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। শুধুমাত্র রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে তিনি সর্বোচ্চ খেতাব পাননি, কিন্তু সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হয়েই আছেন।

২. পাকিস্তান দলের একমাত্র বাঙালি অধিনায়ক ও ‘দ্রুততম মানব’

আপনি কি জানেন, ফুটবল মাঠেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা?

  • তিনি পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইতিহাসের একমাত্র বাঙালি।
  • ষাটের দশকে ট্র্যাকে তিনি ছিলেন দেশের ‘দ্রুততম মানব’ (Fastest Man)।
  • অ্যাথলেটিক্স, হকি আর ফুটবল—তিন জায়গাতেই তাঁর সমান শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, যা বিশ্বের খুব কম মানুষেরই আছে।

৩. যখন তিনি ম্যারাডোনার ‘বিচারক’ হলেন!

সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো বিশ্ব ফুটবলে তাঁর প্রভাব। ১৯৯৪ সালে যখন ফুটবল জাদুকর দিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়ান, তখন ফিফা যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত বোর্ড গঠন করেছিল, তার অন্যতম সদস্য ছিলেন এই মেজর হাফিজ। ফিফাতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী।

৪. ৭ বারের এমপি ও বর্তমান স্পিকার

রাজনীতির মাঠেও তিনি ক্লীন ইমেজের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে রাজনীতিতে এসে ভোলার লালমোহন-তজুমদ্দিন আসন থেকে টানা ৭ বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁকে স্পিকারের আসনে বসানো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক বড় প্রাপ্তি।

৫. আগামী দিনের রাষ্ট্রপতি?

সামরিক ডিসিপ্লিন, ফুটবল মাঠের গতি আর রাজনীতির প্রজ্ঞা—এই তিনের সংমিশ্রণ মেজর হাফিজকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম আসার সম্ভাবনা প্রবল।


গুগল এনালাইসিস ও নির্ভরযোগ্য সূত্র (Sources):

  • বিএফএফ ও ফিফা আর্কাইভ: ম্যারাডোনা ডোপ টেস্ট ইনভেস্টিগেশন বোর্ড (১৯৯৪) মেম্বার লিস্ট।
  • মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়: বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্তদের অফিশিয়াল গেজেট।
  • সংসদ সচিবালয়: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনয়ন ও নির্বাচনী ইতিহাস।
  • বিডিএস বুলবুল আহমেদ পলিটিক্যাল অ্যানালিটিকস ২০২৬: বর্তমান সরকারের সংস্কার ও সংসদীয় নেতৃত্ব বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

শেখ হাসিনার ‘বিজেপি

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

রাজনীতির মাঠে ‘স্মৃতিশক্তি’ বড় বিচিত্র এক বিষয়। প্রয়োজন ফুরোলে বা সমীকরণ বদলে গেলে নেতারা কত দ্রুত অতীতকে মুছে ফেলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার একদা করা বিজেপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার তুলনা। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি অতীতে এই দুই দলকেই একই রাজনৈতিক চরিত্রের বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই বিজেপি আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক অনিবার্য শক্তিকেন্দ্র।

১. ‘স্মৃতিশক্তি যখন রাজনীতির দাস’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্য শুধু বর্তমানের জন্য হয় না, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিজেপিকে একই পাল্লায় মাপার সেই মন্তব্যটি মূলত বাবরি মসজিদ ইস্যু এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ছিল। কিন্তু বর্তমানে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের যে ‘ফ্যাভিকল’ বন্ধন, তাতে এই পুরনো মন্তব্য যেন এক অমীমাংসিত অস্বস্তি। নরেন্দ্র মোদীর ‘অজ্ঞতা’ আসলে কোনো বিস্মৃতি নয়, বরং এটি কূটনীতির এক বিশেষ কৌশল—যেখানে অস্বস্তিকর অতীতকে উপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

২. আদভানি কানেকশন: এক রহস্যময় অতীত

প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, জামায়াত নেতাদের ভারত সফর এবং লালকৃষ্ণ আদভানির সাথে তাদের সংযোগ একদা বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, যে দলটি ভারতের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপির সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছিল, সেই দলটিই কেন পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবল ভারতবিরোধী মেরুকরণের প্রধান শক্তি হয়ে উঠল? এই প্যারাডক্সটিই আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় রহস্য।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ট্রল সংস্কৃতির প্রভাব

ডিজিটাল যুগে কিছুই হারিয়ে যায় না। নেটিজেনরা আজ পুরনো নিউজ ক্লিপিং খুঁড়ে বের করছেন, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। বিজেপির মতো শক্তিশালী দলের সাথে জামায়াতের তুলনাকে এখন ট্রলাররা ‘পলিটিক্যাল স্যাটায়ার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ এখন রাজনীতির এই ‘ইউ-টার্ন’গুলোকে বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পর্যবেক্ষণ করে।

৪. সুবিধাবাদ নাকি পরিস্থিতির দাবি?

রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এই প্রবাদের বাস্তব রূপ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। শেখ হাসিনার সেই সময়কার ‘লিবারেল’ ইমেজ বনাম বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা—এই দুটি সত্তার সংঘাতই আসলে আমাদের বর্তমান কূটনীতির সারমর্ম। মোদীজির ‘বিস্মৃতি’ আসলে সেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের খাতিরে অতীতকে ঝেড়ে ফেলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যপূরণই প্রধান কাজ।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

রাজনৈতিক স্মৃতির এই সংকট কেবল শেখ হাসিনা বা নরেন্দ্র মোদীর নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরন্তন রূপ। ইতিহাস যখন রাজনীতির দাস হয়ে যায়, তখন সত্যের চেয়ে সুবিধার পাল্লাই ভারি থাকে। আজকের এই ট্রল বা বিতর্ক হয়তো কিছুদিন পর চাপা পড়ে যাবে, কিন্তু এটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা মিত্র বাড়াতে নেতারা কত সহজে নিজের পুরনো অবস্থান বদলে ফেলতে পারেন। আর সাধারণ মানুষ? তারা কেবলই দর্শক, যারা এই ‘ইতিহাসের বিস্মৃতি’ দেখে মুচকি হাসে!


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও সমসাময়িক খবরের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সূত্র: ১. তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রতিবেদন। ২. দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার পালাবদল বিষয়ক বিশ্লেষণ।

ইরান-ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক

March 13, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ইরান ও ইসরায়েলের সম্পর্কের সমীকরণটি আধুনিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম জটিল ও রহস্যময় অধ্যায়। ১৯৫০-এর দশকে যে ইরান ছিল ইসরায়েলের কৌশলগত মিত্র, আজ সেই ইরান ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দুই শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই বৈরিতার মূল কারণ কি কেবল ধর্মীয় আদর্শ, নাকি এর পেছনে রয়েছে টিকে থাকার গভীর রাজনৈতিক প্রকৌশল?

১. ঐতিহাসিক বাঁকবদল: মিত্র থেকে শত্রু

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইরান ছিল ইসরায়েলের অন্যতম মিত্র। তৎকালীন শাহের শাসনামলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোর জন্য তারা গোপন সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখত। এমনকি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও ইসরায়েল থেকে গোপনে অস্ত্র কেনার ইতিহাস রয়েছে ইরানের। তবে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পর এই সম্পর্কের খোলনলচে বদলে যায়। তেহরানে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসকে প্যালেস্টাইনের দূতাবাসে রূপান্তর করার মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট করে দেয় তাদের নতুন রাজনৈতিক এজেন্ডা।

২. দ্বন্দ্বে আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কোনো সাধারণ সীমান্ত না থাকা সত্ত্বেও কেন এই চরম শত্রুতা?

  • পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা: ইসরায়েলের মূল ভয় হলো ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা নিয়মিত ইরানি বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাদের টার্গেট করছে।
  • অস্তিত্বের সংকট: ইরান ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ এবং আমেরিকাকে ‘গ্রেট শয়তান’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এই বয়ানটি ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে অভ্যন্তরীণভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ‘অ্যান্টি-জায়নিস্ট’ আবেগ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

৩. ছায়াযুদ্ধ (Proxy War): টিকে থাকার কৌশল

সরাসরি যুদ্ধের সামর্থ্য বা আকাঙ্ক্ষা—দুইয়ের অভাবেই ইরান ও ইসরায়েল সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে ‘ছায়াযুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরানের প্রক্সি: লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে ইসরায়েলের সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের কৌশল।
  • ইসরায়েলের মোসাদ: মোসাদের নিখুঁত গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। জেনারেল ও বিজ্ঞানীদের হত্যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

৪. মৌলবাদ ও ক্ষমতার টিকে থাকা

রাজনীতিবিদদের জন্য ‘কাল্পনিক শত্রু’ তৈরি করা একটি চিরাচরিত কৌশল। যেমনটা বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী দলগুলো করে থাকে, ইরানও তেমনি ইসরায়েল বিরোধিতাকে পুঁজি করে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপকে আড়াল করছে। অন্যদিকে, উগ্রপন্থী ইহুদিদের জন্য ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ বা নিরাপত্তার ইস্যুটি তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

বিডিএস বুলবুল আহমেদ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ:

ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব কেবল দুটি রাষ্ট্রের যুদ্ধ নয়, এটি ক্ষমতার টিকে থাকার লড়াই। ইরান জানে সরাসরি যুদ্ধ করলে তারা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের উন্নত প্রযুক্তি ও মার্কিন সমর্থিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে টিকতে পারবে না। একইভাবে ইসরায়েলও জানে, ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। ফলে এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ই যেন উভয় রাষ্ট্রের জন্য ‘কমফোর্ট জোন’। যতদিন পর্যন্ত এই শত্রুতা তাদের নিজ নিজ দেশে জনমত গঠন ও ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবে, ততদিন সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে এই উত্তেজনাকর শীতল যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।


বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের গভীর বিশ্লেষণ পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।


সূত্র: ১. ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রেকর্ডসমূহ। ২. আধুনিক ভূ-রাজনীতি ও প্রক্সি যুদ্ধের কৌশল বিষয়ক গবেষণাপত্র। ৩. ইরান-কনট্রা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ