ইতিহাস

শূন্য (০) আবিষ্কারের নেপথ্যে: আর্যভট্ট থেকে ব্রহ্মগুপ্ত—কার কৃতিত্ব কতটুকু?
শূন্য কে আবিষ্কার করেন

নিউজ ডেস্ক

April 20, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ কন্টেন্ট:BDS Bulbul Ahmed

তারিখ: ২১ এপ্রিল ২০২৬

গণিত শাস্ত্রের ইতিহাসে ‘শূন্য’ (Zero) আবিষ্কার মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। কিন্তু এই শূন্য আসলে কে আবিষ্কার করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরটি কিছুটা জটিল, কারণ এটি নির্ভর করছে আপনি শূন্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছেন—একটি ধারণা হিসেবে, নাকি একটি সংখ্যা বা প্রতীক হিসেবে।

১. ধারণার বিবর্তন: ব্যাবিলনীয় ও মায়া সভ্যতা

শূন্যের ধারণা বা ‘স্থানধারক’ (Placeholder) হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। আর্যভট্টের প্রায় ৭০০ বছর আগেই ব্যাবিলনীয়রা গণনায় শূন্যস্থানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। আবার আর্যভট্টের ১০০ বছর আগে মায়া সভ্যতার মানুষেরাও তাদের ক্যালেন্ডারে শূন্যের ধারণা ব্যবহার করত। তবে এগুলো আধুনিক গণিতের মতো পূর্ণাঙ্গ সংখ্যার মর্যাদা পায়নি।

২. আর্যভট্ট: শূন্যের গাণিতিক ভিত্তি

ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্টকে প্রায়শই শূন্যের আবিষ্কর্তা বলা হয়। তিনি তাঁর গাণিতিক কাজগুলোতে শূন্যের ধারণাটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন। যদিও তিনি নির্দিষ্ট কোনো ‘প্রতীক’ (যেমন আজকের ০) উল্লেখ করেননি, কিন্তু দশমিক স্থানিক মান পদ্ধতিতে শূন্যের ব্যবহার তাঁর মাধ্যমেই সুসংহত হয়।

৩. ব্রহ্মগুপ্ত: সংখ্যার মর্যাদা প্রদান

শূন্যকে কেবল একটি প্রতীক বা ‘নাই’ হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে মর্যাদা দেন ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’-এ (৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি শূন্য দিয়ে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের নিয়মাবলী প্রথম বর্ণনা করেন। তাঁর হাতেই শূন্য পূর্ণাঙ্গ গাণিতিক সত্তা লাভ করে।

৪. আল খোয়ারিজমি: আধুনিক প্রতীক ও বিশ্বায়ন

ব্রহ্মগুপ্তের প্রায় ৪৫০ বছর পর পারস্যের প্রখ্যাত গণিতবিদ আল খোয়ারিজমি শূন্যের এই ভারতীয় ধারণাকে আরব বিশ্বে ছড়িয়ে দেন। বর্তমানে আমরা যে বৃত্তাকার “0” প্রতীকটি ব্যবহার করি এবং ইংরেজি ‘Zero’ বা ‘Cipher’ শব্দের উৎপত্তিও মূলত তাঁর মাধ্যমেই আলজেব্রার হাত ধরে আধুনিক রূপ পায়।


এক নজরে শূন্যের ইতিহাস:

সময়কালব্যক্তি/সভ্যতাঅবদান
৭০০ খ্রিষ্টপূর্বব্যাবিলনীয় সভ্যতাস্থানধারক হিসেবে শূন্যের প্রাথমিক ব্যবহার।
৩য়-৪র্থ শতাব্দীমায়া সভ্যতাক্যালেন্ডার ও গণনায় শূন্যের ধারণা।
৫ম শতাব্দীআর্যভট্টদশমিক পদ্ধতিতে শূন্যের গাণিতিক প্রয়োগ।
৭ম শতাব্দীব্রহ্মগুপ্তশূন্যকে সংখ্যার মর্যাদা ও গাণিতিক নিয়ম প্রদান।
৯ম শতাব্দীআল খোয়ারিজমিআধুনিক প্রতীক “0” ও বীজগণিতে শূন্যের বিস্তার।

বিডিএস পর্যবেক্ষণ (Editorial Insight):

শূন্য কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দর্শনের একটি অংশ। শূন্যের আবিষ্কার ছাড়া আধুনিক বাইনারি সিস্টেম (০ এবং ১) কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। অর্থাৎ, আজকের কম্পিউটার ও ডিজিটাল বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপিত হয়েছিল এই শূন্যের হাত ধরেই।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

স্বপ্ন বিক্রির আড়ালে কোচিং বাণিজ্য

নিউজ ডেস্ক

May 6, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা এখন সেবার বদলে মুনাফা অর্জনের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে ক্লিনিক ও হাসপাতালের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারগুলো এখন ব্যবসার অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমকে কেন্দ্র করে এই কোচিং সেন্টারগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণার চিত্র দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

১. মেধাবী শিক্ষার্থী ‘ক্রয়’ ও বিজ্ঞাপনী মিথ্যাচার

কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তারা নিজেদের সাফল্য প্রমাণ করতে শীর্ষ মেধাবীদের ‘ক্রয়’ করে থাকে।

  • মিথ্যা সুনাম: ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হওয়া শিক্ষার্থীদের মোটা অংকের টাকা দিয়ে নিজেদের কোচিংয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিতে বাধ্য করা হয়।
  • একাধিক দাবি: অনেক সময় দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীকে একাধিক কোচিং সেন্টার তাদের ব্যানারে ব্যবহার করছে, যা সাধারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে চরম প্রতারণা।

২. কৃতিত্বের ভাগীদার, কিন্তু ব্যর্থতার দায়হীনতা

কোচিংগুলোর মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাদের দাবি:

  • কোনো শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করলে কোচিং সেন্টারগুলো তার সব কৃতিত্ব নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
  • কিন্তু যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী চান্স পায় না, তখন তার কোনো দায়ভার বা ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করতে তারা আগ্রহী থাকে না।

৩. ‘টাকা হাতানো’র বহুমুখী ফাঁদ

ভর্তি হওয়ার সময় বড় অংকের ফি নেওয়ার পরও কোচিংগুলোর অর্থলিপ্সা থামে না।

  • বই ও মডেল টেস্ট বাণিজ্য: নিয়মিত ভর্তির বাইরেও নতুন নতুন বই, তথাকথিত ‘মডেল কোশ্চেন’ এবং স্পেশাল টেস্টের নামে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
  • মিথ্যা অনুপ্রেরণা: কোচিংয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এমন এক মায়াজাল দেখান যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেই চাকরি নিশ্চিত—যা বাস্তবতার চেয়ে অনেক ভিন্ন।

৪. সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট খবর

এই অস্থির সময়ের মধ্যেই দেশের রাজনীতি ও অন্যান্য খাতেও বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে:

  • রাজনৈতিক বিবর্তন: এনসিপিতে (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সম্প্রতি ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান সহ বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন।
  • হজ আপডেট: এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮,৫০০ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে হজ পালনের অনুমতি পেয়েছেন।
  • সাংস্কৃতিক ও ক্যারিয়ার: অভিনেত্রী ও মডেল নীলা ইসরাফিল ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছেন, যিনি এর আগে প্রায় ৫০টি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন।

৫. বিশ্লেষণ: মুক্তি কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, কোচিং বাণিজ্যের এই জঘন্য মানসিকতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান কমাতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাণিজ্যিকীকরণের হাত থেকে রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।


তথ্যসূত্র ও এনালাইসিস: ১. বাংলাদেশ হজ অফিস ও পরিচালক মো. লোকমান হোসেনের প্রেস ব্রিফিং – মে ২০২৬ ২. জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রাজনৈতিক যোগদানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ৩. নীলা ইসরাফিলের নির্বাচনী ঘোষণা ও ক্যারিয়ার প্রোফাইল ৪. বিডিএস নিউজ সোশ্যাল ও এডুকেশন ডেস্ক অ্যানালাইসিস

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com WhatsApp: +8801829349380

বুয়েট

নিউজ ডেস্ক

May 5, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা: বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেবল তার অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের জন্যই নয়, বরং তার ভৌগোলিক অবস্থানের পেছনে থাকা সুদীর্ঘ ইতিহাসের জন্যও আলোচিত। বুয়েট ক্যাম্পাসের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির সাথে যুক্ত, যা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আইনি ও সাংস্কৃতিক আলোচনা বিদ্যমান。

ঐতিহাসিক পটভূমি: বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি

শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা。 আদি যুগে এই মন্দিরের সীমানা এবং দেবোত্তর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশাল。 ব্রিটিশ আমল এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পর্যন্ত মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও ধর্মীয় কাজের জন্য মাইলের পর মাইল বিস্তৃত খোলা জমি, বাগান এবং পুকুর উৎসর্গ করা হয়েছিল。

বুয়েট ক্যাম্পাসের সম্প্রসারণ ও জমি অধিগ্রহণ

১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জনস্বার্থে এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে。 এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসের বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম দিকের এলাকা এবং তৎসংলগ্ন আবাসিক হলগুলোর জমি একসময় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মালিকানাধীন ছিল。

ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিতর্ক

জমির ক্ষতিপূরণ বা বাজারমূল্য পরিশোধের বিষয়টি আজও একটি অমীমাংসিত ঐতিহাসিক অধ্যায়。

  • সরকারি নথিপত্র: তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ আইন (Land Acquisition Act)-এর অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জমিটি নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ করা হয়。
  • অস্পষ্টতা: ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন সময়ে মন্দিরের সেবায়েতরা সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছিলেন কি না বা সেই মূল্যটি তৎকালীন বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে。
  • ধর্মীয় আইনি অবস্থান: হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তর করা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী এবং এই জমিগুলো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বা নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়েছিল。

বর্তমান বাস্তবতা ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া

ঢাকেশ্বরী মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে。 ১. জমি পুনরুদ্ধার: ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দফায় দফায় প্রায় ১.৫ বিঘা জমি সরকার মন্দির কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে。 ২. অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো: বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাওয়া মূল ক্যাম্পাস এলাকার জমিগুলো আর ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ সেখানে এখন স্থায়ী অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো বিদ্যমান。 ৩. বিকল্প সুবিধা: সরকার বিভিন্ন সময়ে মন্দিরের উন্নয়নে অনুদান এবং বিকল্প সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে。


তথ্যসূত্র: ১. ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ঢাকেশ্বরী মন্দির সংরক্ষণ রিপোর্ট ২. ভূমি অধিগ্রহণ আইন ও দেবোত্তর সম্পত্তি বিষয়ক নথিপত্র ৩. বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ঐতিহাসিক স্মারকলিপি

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

বাংলাদেশের অবকাঠামো কি পাকিস্তান আমলেরই দান?

নিউজ ডেস্ক

May 4, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ অনুসন্ধানী ডেস্ক

ঢাকা: দীর্ঘ ৫৪ বছরের স্বাধীন পথচলায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুদ্ধিজীবী মহল, বিভিন্ন টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে— বাংলাদেশের প্রকৃত অবকাঠামোগত ভিত্তি কি পাকিস্তান আমলেই স্থাপিত হয়েছিল? ব্রিটিশদের ২০০ বছরের অবজ্ঞা এবং পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের উন্নয়নের পরিসংখ্যান বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন উঠে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সেই আলোচনার সূত্র ধরে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।

১. ব্রিটিশ আমলের অবজ্ঞা ও কলকাতার ‘দাদা-বাবু’ সংস্কৃতি

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭—এই ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলাকে কেবল কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। কলকাতার প্রভাবশালী ‘দাদা-বাবু’ বা এলিট শ্রেণি কখনোই চায়নি ঢাকা বা পূর্ব বাংলা উন্নত হোক।

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করতে ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
    • ইতিহাস ও বিরোধিতা: এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের যুক্তি ছিল, পূর্ব বাংলার কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। কলকাতার তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি পর্যন্ত এর বিপক্ষে ছিলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ আমলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়।

২. পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর: উচ্চশিক্ষার মহাবিপ্লব

ইতিহাস আমাদের শেখায় পাকিস্তান ২৪ বছর শোষণ করেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও প্রকৌশল খাতের মেরুদণ্ড এই ২৪ বছরেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইতিহাস:

পাকিস্তান আমলে মোট ৫টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়:

  1. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩): উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রাণের দাবি মেটাতে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী ছিলেন এর প্রথম উপাচার্য।
  2. চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬): প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর কার্যক্রম শুরু করে।
  3. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০): দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  4. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮): মূলত ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়, যা আজ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
  5. বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১): ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা:

বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি প্রধান সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার ৪টিই (৮০%) পাকিস্তান আমলের অবদান।

  • বুয়েট (BUET – ১৯৬২): ১৮৭৬ সালের সার্ভে স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
  • রুয়েট (১৯৬৪), চুয়েট (১৯৬৮), কুয়েট (১৯৬৯): এই আঞ্চলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলো পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে নির্মিত হয়। পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১টি নতুন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)।

৩. চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন

ব্রিটিশদের ২০০ বছরে মাত্র ১টি মেডিকেল (ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ১৯৪৬) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিপরীতে পাকিস্তান আমলে ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়।

নাম ও ইতিহাস:

  1. চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭): বন্দর নগরীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল কাম কলেজ।
  2. রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮): উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র।
  3. ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।
  4. সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): তৎকালে সিলেট মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত ছিল।
  5. স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩): মিডফোর্ড হাসপাতালের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে।
  6. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক IPGMR – ১৯৬৬): স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণার জন্য এটি পাকিস্তান আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
  7. শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮): দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আস্থার প্রতীক।
  8. রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০): পাকিস্তান আমলের শেষ বড় উপহার।

৪. বিশেষায়িত ও কারিগরি শিক্ষা

পাকিস্তান আমলে কারিগরি শিক্ষায় যে জোয়ার এসেছিল, তা স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে অনেকটা ম্লান।

  • পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট: পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে ১৭টি পলিটেকনিক করেছিল। বাংলাদেশ ৫০ বছরে করেছে ৩২টি।
  • ক্যাডেট কলেজ: ফৌজদারহাট (১৯৫৮), মির্জাপুর (১৯৬৩), ঝিনাইদহ (১৯৬৩) এবং রাজশাহী (১৯৬৫)—এই ৪টি ঐতিহাসিক ক্যাডেট কলেজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়।
  • বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (১৯৬২): নৌ-অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বুটেক্স – ১৯৫০): এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

৫. শিল্পায়ন ও ভারী অবকাঠামো

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলো পাকিস্তান আমলের পরিকল্পনার ফসল।

  • শিল্পনগরী: তেজগাঁও, হাজারীবাগ এবং খালিশপুর শিল্প এলাকা পাকিস্তান আমলে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।
  • আদমজী জুট মিল (১৯৫১): নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল।
  • চন্দ্রঘোনা পেপার মিল (১৯৫৩): এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল।
  • ইস্টার্ন রিফাইনারি (১৯৬৮): দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার যা আজও সচল।
  • জাতীয় স্থাপনা: সংসদ ভবন, সচিবালয়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (বর্তমান শাহজালাল) এবং বাইতুল মোকাররম মসজিদ—প্রতিটিই পাকিস্তান আমলের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা।

৬. পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

১৯৭১-এর যুদ্ধের পর পাকিস্তান ‘ঘাস খেয়ে হলেও’ পারমাণবিক বোমা তৈরির শপথ নিয়েছিল। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।

  • পারমাণবিক অস্ত্র: ১৭০টি ওয়ারহেড এবং শাহীন-৩ (২৭৫০ কিমি পাল্লার) মিসাইল নিয়ে পাকিস্তান এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
  • বিমান বাহিনী: জেএফ-১৭ থান্ডার এবং জে-১০সি নিয়ে তারা বিশ্বের সপ্তম শক্তিশালী বাহিনী। সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত।
  • কূটনীতি: বর্তমানে পাকিস্তান ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিগ প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিপরীতে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে যতটা মাতামাতি করেছে, অবকাঠামোগত স্বনির্ভরতা ও আধুনিকায়নে কি ততটা এগোতে পেরেছে? আজ সংসদে আধুনিকতা বড় নাকি চেতনা বড়—তা নিয়ে শত শত অধিবেশন পার হয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার ও পর্যালোচনা

ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শোষণ এবং ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের বৈষম্যের গল্প যেমন সত্য, তেমনি এই অঞ্চলের আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন যে পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল—তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে যেখানে মাত্র ১২% শিক্ষিত ছিল, পাকিস্তান আমলে তা দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত, আমরা কি কেবল আগের আমলের করা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রকৃত আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে পারছি?

তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: ১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ঐতিহাসিক ডাটা। ২. ড. এম.এ. রহিম, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৭১)। ৩. আল-জাজিরা ও এনডিটিভি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা রিপোর্ট ২০২৬। ৪. বিগত ২৬-২৮ এপ্রিল ২০২৬-এর টেলিভিশন টকশো ‘ইতিহাসের সত্য’।

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ