অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
মানুষের ছদ্মবেশে পৃথিবীর বুকে বিচরণ করেছে এমন কিছু দানব, যাদের নিষ্ঠুরতার কাহিনী শুনলে শিউরে ওঠে হৃদপিণ্ড। ১৯০০ সালের উত্তাল রাজনৈতিক পরিক্রমা থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান—বাংলাদেশ যখন এক নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই ২০২৬ সালের শুরুতে সাভারে এক ছদ্মবেশী সিরিয়াল কিলারের সন্ধান পাওয়া গেছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সাভারের এই ‘সম্রাট’-এর মতোই যুগে যুগে আবির্ভাব ঘটেছে কিছু ভয়ংকর ঘাতকের।
এই ‘সিরিয়াল কিলার’দের কাহিনী শুনলে শিউরে উঠতে হয়
টেড বান্ডি: বিশ শতকের অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার টেড। যুবতীদের ধর্ষণ করে তাদের দেহ থেকে মাথাটা আলাদা করে নিয়ে নিজের বাড়িতে পুরস্কারের মতো সাজিয়ে রাখতেন ইনি। ১৯৮৯ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পেড্রো আলনসো লোপেজ: পেড্রো হলেন একজন কলম্বিয়ান সিরিয়াল কিলার। দক্ষিণ আমেরিকায় তিনশোরও বেশি মহিলাকে নৃশংস ভাবে ধর্ষণ করে খুন করেছেন এই ঘাতক। বহু ছক কষার পরেই পুলিশ পাকড়াও করে এই ভয়ঙ্কর খুনীকে। ধরা পড়ার পরেই সে কবুল করে খুনের কথা। পরে তার জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে ৫৩টি মৃতদেহও খুঁজে পায় পুলিশ। ১৯৮০ সাল থেকে জেলে রয়েছে এই খুনী। ১৮ বছর ইকোয়াডোরিয়ান জেলে থাকার পর তাকে কলম্বিয়া পাঠানো হয়। আর সেখানেই ২০০২ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
হ্যারল্ড শিপম্যান: কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারদের মধ্যে ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা রয়েছে এই চিকিত্সকের নাম। আড়াইশোর বেশি মানুষকে খুন করেছেন হ্যারল্ড শিপম্যান। সমাজ ও বন্ধুমহলের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালই ছিল। মাঝেমধ্যেই তার চেম্বার এবং হাসপাতালের কাছাকাছি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যেত। ময়নাতদম্তে সব মৃতদেহেই একটা জিনিসের মিল ছিল। তা হল ডায়ামরফিন। শিপম্যান তার রোগীদেরকে রীতিমতো জবরদস্তি করে এই ডোজ দিতেন। অতঃপর তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ২০০৪ সালে জেলে থাকার সময় আত্মহত্যা করেন ফ্রেডরিক শিপম্যান।
ড্যানিয়ল ক্যামারগো বারবোসা: ৭০ থেকে ৮০-এর দশকে কলম্বিয়ার ১৫০র ও বেশি মহিলাকে নৃশংস ভাবে ধর্ষণ করে খুন করেন ড্যানিয়ল। কুইটোতে ধরা পড়বার পর তিনি নিজেই স্বীকার করেন প্রতিটা খুনের কথা। ১৯৯৪ সালে জেলে থাকা অবস্থায় এক ভিক্টিমের ভাই তাকে খুন করে।
পে়ড্রো রডরিগাস ফিলহো; ব্রাজিলিয়ান সিরিয়াল কিলার পে়ড্রো ১৯৭৩ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। ১৪ বছর বয়সে প্রথম খুন করে পেড্রো। ১৮ বছরের মধ্যেই ১০ জনকে খুন করে ফেলে সে। জেলে তার সঙ্গে থাকতো তার বাবাও। জেলেও পেড্রো খুন করা শুরু করে। জেলে ৪৭ জনকে খুন করে সে। ২০০৭ সালে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, ২০১১ সালে আবার গ্রেফতার করা হয়।
গ্যারি রিগওয়ে: আমেরিকার সিরিয়াল কিলারদের মধ্যে ইনি অন্যতম। ২০০১ সালে গ্যারিকে গ্রেফতার করা হয় ৪ জনকে খুন করার অভিযোগে। পরে পুলিশের সামনে তিনি কবুল করেন যে ৮০ থেকে ৯০ সালের মধ্যে অন্তত ৭০ জন মহিলাকে তিনি খুন করেছেন। এদের মধ্যে আবার পাঁচ জনকে গ্রিন নদীতে ভাসিয়েও এসেছিলেন। তিনি ‘দ্য গ্রিন রিভার’ বলে অধিক খ্যাত। গ্যারি রিগওয়েকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
টমি লিন সেলস: টেক্সাসের নাম করা এক ঘাতক টমি লিন। ইনিও কমপক্ষে ৭০ জনকে খুন করেছেন। সালটা ১৯৮৫ থেকে ৯৯ এর মাঝামাঝি সময়ে। ১৩ বছরের এক বাচ্চা মেয়েকে টমি ছুরি দিয়ে ১৬ বার কুপিয়ে মেরেছিলেন। ১০ বছরের একটি মেয়ের সঙ্গেও প্রায় একি কান্ড ঘটিয়েছিলেন। সেলসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আন্দ্রেই চিকাতেলো: সোভিয়েত এই সিরিয়াল কিলার ‘দ্য বুচার অব রস্টভ’ নামে অধিক খ্যাত। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ৫২ জন মহিলাকে তিনি খুন করেছিলেন। ১৯৯২ সালে চিকাতেলোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
জন ওয়েন গেসি: শিকাগোয় পর পর ৩৩টি টিনেজ ছেলেকে খুন করেছিলেন গেসি। প্রত্যেকের বাড়ি গিয়ে টাকার লোভ দেখিয়ে শেষে সকলকে খুন করতেন। নিজের বাড়িতে অন্তত ২৬ জনের লাশ পুঁতে রেখেছিলেন। কখনও নদীতে ভাসিয়ে দিতেন মৃতদেহ। ১৯৯৪ সালে গেসিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
চার্লস এনজি ও লিওলার্ড লেক: এক সঙ্গে কাজ করতেন এই দুই ঘাতক। ক্যালাভেরাসে ২৫ জনকে নির্যাতন করে খুন করেছিলেন এঁরা। তাঁদের এই কার্যকলাপ জনসমক্ষে আসে যখন লেক আত্মহত্যা করে। আর তারপর এনজিকে গ্রেফতার করা হয়। এনজি এখন সাঁ কুয়েনতিন জেলে বন্দি।
সাভারের ২০২৬ আতঙ্ক: ছদ্মবেশী ‘সম্রাট’-এর পৈশাচিকতা
বিদেশের এসব ভয়ংকর সিরিয়াল কিলারদের প্যাটার্নের সঙ্গেই মিলে যায় সাভারের সাম্প্রতিক ঘটনা। গত শনিবার (১৭ জানুয়ারি ২০২৬) সাভারের পরিত্যক্ত এক কমিউনিটি সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া ৩ মরদেহের নেপথ্যে রয়েছে ‘মশিউর রহমান সম্রাট’ (ছদ্মনাম)। দিনের বেলা পাগলের বেশে ঘুরে বেড়ানো এই খুনি ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ দোহাই দিয়ে মানুষকে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে দিত।
২০২৬-এর রাজনীতি: বিএনপির ‘শুদ্ধি অভিযান’
আইনশৃঙ্খলার এই অস্থিরতার মাঝেই রাজপথে চলছে বড় রাজনৈতিক রদবদল। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাতে তাদের ৭৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে একযোগে বহিষ্কার করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, যিনি এখন ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র লড়ছেন।
তথ্যসূত্র ও বিশ্লেষণ (Sources):
- আন্তর্জাতিক ক্রাইম রেকর্ড: টেড বান্ডি, শিপম্যান ও লোপেজ সংক্রান্ত এফবিআই (FBI) ও ইন্টারপোল ডাটাবেজ।
- সাভার পুলিশ রিপোর্ট: মশিউর সম্রাট আটক ও জবানবন্দি (জানুয়ারি ২০২৬)।
- ঐতিহাসিক নথি: মদিনা সনদ (৪৭ ধারা) ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) সংক্রান্ত গেজেট।
- বিএনপি মিডিয়া সেল: রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত ৭৬ নেতার বহিষ্কার তালিকা (২১ জানুয়ারি ২০২৬)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ও ইতিহাস ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Analyst)
সর্বশেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬
“ভদ্রলোকরা, আপনারা কি ভাবেন না যে, আমার পিঠের পিছনে আমার উপর ভর করে আপনারা অনেকক্ষণ ধরে লুকিয়ে আছেন?”
১৯৪২ সাল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হাজার হাজার পুরুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী যখন এই কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন, তখন পুরো মিলনায়তনে পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ও বজ্রকণ্ঠের এই অধিকারী আর কেউ নন, তিনি হলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও সফল নারী স্নাইপার লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো (Lyudmila Pavlichenko)। যিনি একা হাতে ৩০৯ জন নাৎসি সেনাকে খতম করেছিলেন।

আজকের বিশেষ ফিচারে আমরা পরিচিত হব এই কিংবদন্তি নারী যোদ্ধার রোমাঞ্চকর জীবন ও বীরত্বের ইতিহাসের সাথে।
লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেড আর্মির একজন কিংবদন্তি সোভিয়েত স্নাইপার, যিনি ৩০৯ জন শত্রুসেনা নিধন করে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও ভয়ঙ্কর নারী স্নাইপারের মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর অসাধারণ সাহসিকতা ও নিখুঁত নিশানার জন্য জার্মানরা তাঁকে “লেডি ডেথ” (মৃত্যুদেবী) নামে ডাকত।

প্রাথমিক জীবন ও সামরিক প্রশিক্ষণ:
১৯১৬ সালের ১২ জুলাই বর্তমান ইউক্রেনের (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ার পাশাপাশি তিনি একটি আধাসামরিক স্পোর্টস ক্লাবে শুটিংয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে, কিয়েভের প্রথম ব্যাচগুলোর একজন হিসেবে তিনি স্বেচ্ছায় পদাতিক বাহিনীতে যোগ দেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য:
দুর্দান্ত নিশানা ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শান্ত থাকার ক্ষমতার কারণে তাঁকে ২৫তম চ্যাপায়েভ রাইফেল ডিভিশনে স্নাইপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
- তিনি ওডেসা এবং সেভাস্তোপোলের যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন।
- তাঁর শিকার করা ৩০৯ জন শত্রুসেনার মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন শত্রু স্নাইপার।
- ১৯৪২ সালের জুন মাসে মর্টারের গোলার স্প্লিন্টারে গুরুতর আহত হওয়ার পর, সোভিয়েত হাই কমান্ড তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
যুদ্ধের সময় অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর (আমেরিকা ও ব্রিটেন) দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার সমর্থনে সোভিয়েত প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সফর করেন। তিনিই প্রথম সোভিয়েত নাগরিক যিনি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের আতিথ্য লাভ করেন। সেখানে নারীদের পোশাক বা মেকআপ নিয়ে প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের তিনি সাফ জবাব দিয়েছিলেন, “আমি ২৫ বছর বয়সে ৩০৯ জন ফ্যাসিস্ট দখলদারকে হত্যা করেছি। আপনারা কি মনে করেন না যে আপনারা অনেক দিন ধরে আমার পিঠের আড়ালে লুকিয়ে আছেন?”
পরবর্তী জীবন:
পরবর্তীতে তিনি স্নাইপার প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অসামান্য বীরত্বের জন্য তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ সহ ‘অর্ডার অব লেনিন’-এ ভূষিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের ১০ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে এই বীরাঙ্গনা মৃত্যুবরণ করেন।

লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকোর ব্যবহৃত রাইফেল, স্নাইপিং কৌশল, আমেরিকার বক্তব্য এবং তাকে নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র ও বইয়ের বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ব্যবহৃত রাইফেল ও স্নাইপিং কৌশল
- প্রধান রাইফেল: তিনি মূলত মসিন-নাগান্ত (Mosin-Nagant) মডেল ১৮৯১/৩০ রাইফেল ব্যবহার করতেন। এতে একটি ৩.৫ গুণ জুমের PE বা PU অপটিক্যাল সাইট (স্কোপ) লাগানো ছিল।
- অন্যান্য অস্ত্র: ক্ষেত্রবিশেষে তিনি SVT-40 সেমি-অটোমেটিক রাইফেলও ব্যবহার করেছেন।
- ছদ্মবেশ ও ধৈর্য: তিনি গাছের ডালপালা এবং প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার জন্য বিশেষ ছদ্মবেশ (Camouflage) ব্যবহার করতেন। একটি পজিশনে তিনি একটানা ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টাও নড়াচড়া না করে ওত পেতে থাকতেন।
- ডামি টেকনিক: শত্রু স্নাইপারকে বিভ্রান্ত করতে তিনি গাছের ডালে পুতুল বা ডামি কাপড় ঝুলিয়ে রাখতেন। শত্রু সেই ডামিতে গুলি করলেই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে তিনি পাল্টা নিখুঁত নিশানা করতেন।
- ভোরের আলো: তিনি সাধারণত সূর্য ওঠার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পজিশন নিতেন, যাতে ভোরের আলো শত্রুর চোখে পড়ে এবং তাদের দেখতে সুবিধা হয়।
২. আমেরিকা সফরের বিখ্যাত বক্তব্য
১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম যখন তার যুদ্ধের দক্ষতার চেয়ে তার পোশাক, মেকআপ এবং স্কার্টের দৈর্ঘ্য নিয়ে বেশি প্রশ্ন করছিল, তখন তিনি কিছু কড়া এবং ঐতিহাসিক জবাব দেন:
- শিকাগোর বিখ্যাত ভাষণ: “ভদ্রমহোদয়গণ, আমার বয়স ২৫ এবং আমি ইতিমধ্যে ৩০৯ জন ফ্যাসিবাদী দখলদারকে খতম করেছি। আপনাদের কি মনে হয় না যে আপনারা আমার পেছনে একটু বেশি সময় ধরে লুকিয়ে আছেন?” (এটি মার্কিন পুরুষদের দ্রুত যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল)।
- পোশাক নিয়ে মন্তব্য: “আমি গর্বের সাথে আমার ইউনিফর্ম পরি। এতে রক্তের দাগ রয়েছে, যা যুদ্ধের ময়দানে অর্জিত। মার্কিন নারীদের কাছে পোশাকের ফ্যাশনটাই বড়, কিন্তু আমাদের কাছে ইউনিফর্ম মানে দেশের দায়িত্ব।”
- মেকআপ প্রসঙ্গে: “কোনো স্নাইপারের নিয়ম নেই যে সে যুদ্ধক্ষেত্রে মেকআপ করবে। কে যুদ্ধক্ষেত্রে পাউডার মাখার সময় পায়?”
৩. চলচ্চিত্র ও বইয়ের তালিকা
চলচ্চিত্র:
- ব্যাটল ফর সেভাস্টোপল (Battle for Sevastopol / ইউক্রেনীয় নাম: Nezlamna): ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই জীবনীমূলক যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রটি তার জীবনের ওপর নির্মিত সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা।
- ডকুমেন্টারি: বিবিসি এবং হিস্ট্রি চ্যানেলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিষয়ক একাধিক তথ্যচিত্রে তার স্নাইপিং রেকর্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
বই:
- লেডি ডেথ (Lady Death: The Memoirs of Stalin’s Sniper): এটি লুডমিলা পাভলিচেনকোর নিজস্ব আত্মজীবনী (Memoir)। তার নিজের ভাষায় যুদ্ধের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা এই বইয়ে উঠে এসেছে।
- দ্য ডায়মন্ড আই (The Diamond Eye): কেট কুইনের লেখা একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক ফিকশন উপন্যাস, যা লুডমিলার জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত।
লুডমিলা পাভলিচেনকোর সামরিক জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং ভয়ংকর অধ্যায়গুলো কেটেছিল ওডেসা (Odessa) এবং সেভাস্টোপল (Sevastopol) অবরোধের দিনগুলোতে。 যুদ্ধক্ষেত্রের সেই রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রথম দুটি শিকার এবং ভয়ের জয় (ওডেসা)
যুদ্ধের একদম শুরুতে ওডেসার কাছাকাছি বেলিয়ায়েভকা এলাকায় লুডমিলাকে প্রথম সম্মুখ সমরে পাঠানো হয়। তখনো তার নামের পাশে কোনো ‘কনফার্মড কিল’ বা নিশ্চিত শিকারের রেকর্ড ছিল না।
- ঘটনা: লুডমিলা একটি পাহাড়ের খাঁজে পজিশন নিয়েছিলেন। কিছুটা দূরে দুজন রোমানিয়ান সৈন্য (জার্মানদের সহযোগী) অবস্থান নিচ্ছিল। প্রথমবার শত্রুকে সামনাসামনি দেখে লুডমিলা ভয়ে কাঁপছিলেন এবং গুলি করতে দ্বিধা করছিলেন।
- মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত: ঠিক তখনই তার পাশে থাকা এক তরুণ সোভিয়েত সৈন্য জার্মানদের গুলিতে মারা যান। সহযোদ্ধার এই মৃত্যু লুডমিলার ভেতরের ভয়কে নিমেষেই ক্ষোভ ও জেদে রূপান্তরিত করে। তিনি রাইফেল তাক করেন এবং পরপর দুটি নিখুঁত শটে সেই দুজন রোমানিয়ান সৈন্যকে খতম করেন। এটিই ছিল তার স্নাইপার রেকর্ডের শুরু।
২. তিন দিন ও তিন রাতের দীর্ঘতম স্নাইপার ডুয়েল (সেভাস্টোপল)
সেভাস্টোপল যুদ্ধে লুডমিলার খ্যাতি যখন তুঙ্গে, তখন জার্মানরা তাকে মারার জন্য তাদের একজন টপ-র্যাঙ্কড স্নাইপারকে পাঠায়। এটি পরিণত হয় ইতিহাসখ্যাত এক স্নাইপার দ্বৈরথে (Sniper Duel):
- ধৈর্যের পরীক্ষা: দুই স্নাইপারই একে অপরের অবস্থান আঁচ করতে পেরে ছদ্মবেশে ওত পেতে থাকেন। প্রায় তিন দিন এবং তিন রাত (প্রায় ৭২ ঘণ্টা) তারা কেউ এক চুলও নড়েননি, এমনকি ঠিকমতো ঘুমাননি বা খাননি।
- শত্রুর একটি ভুল: চতুর্থ দিনে জার্মান স্নাইপারটি ক্লান্ত হয়ে সামান্য নড়াচড়া করেন এবং একটি গাছের পাতা একটু বেশি কেঁপে ওঠে। লুডমিলা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ে সেই সুযোগটি নেন এবং ট্রিগার চাপেন। গুলিটি সরাসরি জার্মান স্নাইপারের কপালে গিয়ে লাগে। পরে তার মৃতদেহের কাছে গিয়ে লুডমিলা জানতে পারেন যে, ওই জার্মান স্নাইপারটি নিজেই আগে ৫০০-র বেশি সৈন্যকে হত্যা করেছিল।
৩. ট্রেঞ্চের ভেতর বিয়ে এবং ট্র্যাজিক ট্র্যাজেডি
ওডেসা থেকে সেভাস্টোপলে বদলি হওয়ার পর লুডমিলা আলেক্সি কিটসেঙ্কো (Alexei Kitsenko) নামে আরেকজন দক্ষ সোভিয়েত স্নাইপারের প্রেমে পড়েন এবং তারা বিয়ে করেন।
- রোমাঞ্চকর হানিমুন: এই নবদম্পতি কোনো বিলাসী হানিমুনে যাননি। তারা যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে একই বাঙ্কারে বা ট্রেঞ্চে পাশাপাশি বসে ডিউটি করতেন এবং একসঙ্গে শত্রু শিকার করতেন। লুডমিলা রসিকতা করে বলেছিলেন, “হানিমুন আমার শুটিংয়ের হাত আরও নিখুঁত করে দিয়েছে।”
- হৃদয়বিদারক পরিণতি: ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে একটি জার্মান মর্টার শেলের আঘাতে আলেক্সি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং লুডমিলার কোলেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্বামীর এই মৃত্যু লুডমিলাকে আরও নিষ্ঠুর ও প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। এরপর থেকে তিনি আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন।
৪. লাউডস্পিকারে জার্মানদের লোভ ও হুমকি
সেভাস্টোপল যুদ্ধের শেষ দিকে জার্মানরা বুঝতে পেরেছিল যে লুডমিলাকে সাধারণ যুদ্ধকৌশলে হারানো অসম্ভব। তাই তারা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করে:
- চকলেটের লোভ: জার্মানরা লাউডস্পিকার বাজিয়ে লুডমিলাকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকে, “লুডমিলা, আমাদের পক্ষে চলে এসো। আমরা তোমাকে অনেক চকলেট দেব এবং জার্মানির বড় কর্মকর্তা বানাব।”
- ভয়ংকর হুমকি: লুডমিলা এই লোভে সাড়া না দেওয়ায় জার্মানদের সুর বদলে যায়। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, “যদি তোমাকে ধরতে পারি, তবে তোমাকে ৩০৯ টুকরো করব!” (তখন তার শিকারের সংখ্যা ৩০৯ ছিল)। লুডমিলা এই হুমকি শুনে ভয় পাওয়ার বদলে আনন্দ পেয়েছিলেন, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে জার্মানরা তার নিখুঁত রেকর্ড সংখ্যাটি খুব ভালোভাবেই জানে এবং তাকে মনেপ্রাণে ভয় পায়!
৫. সাবমেরিনে নাটকীয় উদ্ধার অভিযান
১৯৪২ সালের জুনে সেভাস্টোপল যখন পুরোপুরি জার্মানদের দখলে চলে যাচ্ছিল, তখন একটি মর্টার শেলের স্প্লিন্টার লুডমিলার মুখে এসে লাগে এবং তিনি গুরুতর আহত হন। সোভিয়েত হাই কমান্ড বুঝতে পেরেছিল যে লুডমিলা কেবল একজন সৈনিক নন, তিনি পুরো দেশের প্রেরণা। তাই শহরটি পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি সোভিয়েত সাবমেরিন (ডুবোজাহাজ) পাঠিয়ে অত্যন্ত গোপনে তাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়।
এক নজরে লুডমিলা পাভলিচেনকোর প্রোফাইল

| বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| নাম | লেফটেন্যান্ট লুডমিলা পাভলিচেনকো |
| দেশ | সোভিয়েত ইউনিয়ন (ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত) |
| মোট নিশ্চিত হত্যা (Confirmed Kills) | ৩০৯ জন অক্ষশক্তির সেনা (৩৬ জন স্নাইপারসহ) |
| বিশেষ খেতাব | হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন (Hero of the Soviet Union) |
| ঐতিহাসিক উক্তি | “ভদ্রলোকরা, আপনারা কতক্ষণ আমার পিঠের পেছনে লুকিয়ে থাকবেন?” |
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
লুডমিলা পাভলিচেনকো কেবল একজন দক্ষ সামরিক যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারী স্বাধীনতা ও বীরত্বের এক অনন্য প্রতীক। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নারীরা যে কতটা দৃঢ় এবং অদম্য হতে পারে, ইতিহাসজুড়ে তাঁর এই গল্প তা চিরকাল স্মরণ করিয়ে দেবে।
নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (Sources & References)
১. বিজনেস ইনসাইডার আর্কাইভ: Meet the world’s deadliest female sniper who terrorized Hitler’s Nazi army.
২. টুডে আই ফাউন্ড আউট (সামরিক ইতিহাস): During WWII, Lyudmila Pavlichenko Sniped a Confirmed 309 Axis Soldiers.
৩. কোরা গ্লোবাল ডিসকাশন ফোরাম: Are “confirmed kills” real for military snipers, and what evidence is needed?
ইতিহাসের এমন সব রোমাঞ্চকর অধ্যায়, অজানা বীরত্বগাথা এবং আন্তর্জাতিক খবরের আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের পালস বাংলাদেশ পোর্টালে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও গোয়েন্দা বিষয়ক বিশেষ ফিচার | পালস বাংলাদেশ
বিশ্লেষক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও ভূরাজনীতির মঞ্চে যে কয়েকটি নাম শুনলে যুগপৎ আতঙ্ক ও বিস্ময় তৈরি হয়, তার শীর্ষে রয়েছে ইসরায়েলের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)। দাপ্তরিকভাবে এর নাম “ইনস্টিটিউট ফর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস”। ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে গঠিত এই সংস্থাটি কোনো সংসদ বা জবাবদিহিতার অধীনে নয়, বরং সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নিরেট গোপনীয়তায় মোড়ানো এই সংস্থার মূল দর্শন হলো— যেকোনো মূল্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা করা এবং দেশের বাইরের শত্রুদের প্রতিরোধ করা। মোসাদের লক্ষ্য, ইতিহাসের সবচেয়ে তোলপাড় করা অপারেশন, বৈশ্বিক সমীকরণ এবং তাদের এজেন্ট নিয়োগের রোমহর্ষক কৌশল নিয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মোসাদের মূল লক্ষ্য ও দাপ্তরিক উদ্দেশ্যসমূহ
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের স্বার্থ সুরক্ষায় মোসাদ প্রধানত ৬টি কৌশলগত ক্ষেত্রে কাজ করে থাকে:
- কৌশলগত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোসহ বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল-বিরোধী যেকোনো গোপন পরিকল্পনা, সামরিক প্রস্তুতি বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো।
- গোপন ও বিশেষ অভিযান (Covert Operations): শত্রু দেশের পারমাণবিক বা সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, সাইবার আক্রমণ এবং ইসরায়েলের জন্য হুমকিস্বরূপ ব্যক্তিদের নিখোঁজ বা প্রতিহত করা।
- কাউন্টার-টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ দমন: বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি নাগরিক ও ইহুদি লক্ষ্যবস্তুর ওপর সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের হামলা রুখে দেওয়া।
- অপ্রচলিত অস্ত্র ও পারমাণবিক বিস্তার রোধ: মধ্যপ্রাচ্যে শত্রু দেশগুলোর হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র পৌঁছানো রোধ করা। এর বড় উদাহরণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে শীর্ষ সামরিক বিজ্ঞানীদের টার্গেট করা।
- গোপন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন: যেসব মুসলিম বা আরব দেশের সাথে ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তাদের সাথে পর্দার আড়ালে অনানুষ্ঠানিক গোয়েন্দা ও কৌশলগত যোগাযোগ রক্ষা করা।
- ইহুদিদের সুরক্ষায় আলিয়াহ (Aliyah) অভিযান: বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বিপদে থাকা ইহুদিদের উদ্ধার করে ইসরায়েলে নিয়ে আসা (যেমন অতীতে ইথিওপিয়া বা ইয়েমেন থেকে পরিচালিত গোপন মিশনসমূহ)।
২. ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অপারেশনসমূহ

মোসাদ তাদের লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, সার্বভৌমত্ব ভঙ্গ এবং টার্গেটেড কিলিংয়ের (Targeted Killings) আশ্রয় নেওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে যেমন প্রশংসিত, ঠিক তেমনি চরম বিতর্কিত।
┌────────────────────────────────────────┐
│ মোসাদের ৪টি কাঁপানো অপারেশন │
└───────────────────┬────────────────────┘
│
┌────────────────────────┼────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌────────────────────────┐┌────────────────────────┐┌────────────────────────┐
│ অপারেশন আইখম্যান ││ অপারেশন এন্টেবে ││ অপারেশন রথ অব গড │
│ ১৯৬০: আর্জেন্টিনা থেকে ││ ১৯৭৬: উগান্ডা থেকে ১০২ ││ ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিক │
│ নাৎসি কর্মকর্তাকে অপহরণ││ জিম্মিকে নাটকীয় উদ্ধার ││ হত্যার দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশোধ│
└────────────────────────┘└────────────────────────┘└────────────────────────┘
│
▼
┌────────────────────────┐
│ অপারেশন ব্রাদার্স │
│ ১৯৮০: সুদানে ফেক রিসোর্ট │
│ খুলে ইহুদিদের পাচার │
└────────────────────────┘
- অপারেশন আইখম্যান (১৯৬০ – আর্জেন্টিনা): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লাখ লাখ ইহুদি হত্যার কারিগর নাৎসি কর্মকর্তা আডলফ আইখম্যান আর্জেন্টিনায় আত্মগোপন করেছিলেন। মোসাদ আর্জেন্টিনার অনুমতি না নিয়েই দেশটির মাটিতে অনুপ্রবেশ করে আইখম্যানকে রাস্তা থেকে অপহরণ করে। পরে তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন অবস্থায় ইসরায়েলি বিমানে তেল আবিবে নিয়ে আসা হয় এবং বিচার শেষে ফাঁসি দেওয়া হয়। এটি মোসাদের ইতিহাসে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
- অপারেশন এন্টেবে (১৯৭৬ – উগান্ডা): ফিলিস্তিনি ও জার্মান গেরিলারা একটি ফরাসি বিমান হাইজ্যাক করে উগান্ডার এন্টেবে বিমানবন্দরে নিয়ে জিম্মি করে। মোসাদ ছদ্মবেশে উগান্ডায় ঢুকে বিমানবন্দরের নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট সংগ্রহ করে এবং ইসরায়েলি কমান্ডোরা রাতে আকস্মিক অপারেশন চালিয়ে ১০২ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করে।
- অপারেশন রথ অব গড (Wrath of God – ১৯৭২): মিউনিখ অলিম্পিকে ফিলিস্তিনি ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ গোষ্ঠীর হাতে ১১ জন ইসরায়েলি অ্যাথলেট নিহত হন। এর প্রতিশোধ নিতে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের নির্দেশে মোসাদ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে খুঁজে গুপ্তহত্যা (Assassination) করে। তবে ১৯৭৩ সালে নরওয়ের লিলিহামারে ভুল তথ্যের কারণে একজন নিরীহ মরক্কোন ওয়েটারকে হত্যা করায় এই মিশনটি চরম আন্তর্জাতিক বিতর্কের মুখে পড়ে।
৩. বৈশ্বিক গোয়েন্দা সমীকরণ: সিআইএ (CIA) এবং র (RAW)

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে মোসাদ এককভাবে চললেও বিশ্বের প্রধান প্রধান গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তাদের গভীর কৌশলগত দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
🇺🇸 মোসাদ ও আমেরিকার সিআইএ (CIA):
এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গভীর গোয়েন্দা জোট। সিআইএ মোসাদকে উন্নত প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট ডাটা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়; আর সিআইএ মধ্যপ্রাচ্যে হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT)-এর জন্য মোসাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যেমন— ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাহত করতে ২০১০ সালে ‘স্টাক্সনেট’ (Stuxnet) সাইবার ভাইরাস আক্রমণ মোসাদ ও সিআইএ যৌথভাবে পরিচালনা করেছিল। তবে এত বন্ধুত্বের পরেও ১৯৮৫ সালে জোনাথন পোলার্ড নামের এক আমেরিকান অ্যানালিস্ট মোসাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অতি গোপনীয় ফাইল বিক্রি করার অপরাধে ধরা পড়লে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ফাটল ধরেছিল।
মোসাদ ও ভারতের র (RAW):
১৯৬৮ সালে ভারতের ‘র’ (Research and Analysis Wing) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের সামরিক গতিবিধি এবং কাউন্টার-টেররিজমের ওপর গোপনে তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়। ১৯৯২ সালে ভারত-ইসরায়েল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর এই সহযোগিতা প্রকাশ্য রূপ নেয়। কারগিল যুদ্ধের সময় ভারত যখন হাই-অল্টিটিউড স্যাটেলাইট ইমেজের সংকটে ভুগছিল, তখন মোসাদ ভারতকে লেজার-গাইডেড ড্রোন ও নিখুঁত ইমেজারি সরবরাহ করেছিল। মুম্বাই হামলার (২৬/১১) পর থেকে ইসলামিক চরমপন্থা ও সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদ দমনে ‘র’ এবং মোসাদ নিয়মিত রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ার করে।
৪. মোসাদের গোপন এজেন্ট নিয়োগ ও ‘মিদ্রাশ’ প্রশিক্ষণ

মোসাদের মূল শক্তির উৎস হলো তাদের নিখুঁত কর্মী নির্বাচন ও অমানুষিক কঠোর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
ক) নিয়োগ প্রক্রিয়া (Recruitment):
- অভ্যন্তরীণ পুল: মোসাদ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) বিশেষ কমান্ডো ইউনিট এবং এলিট সাইবার উইং (যেমন: Unit 8200) থেকে তরুণ-তরুণীদের বাছাই করে। তবে বর্তমানে তারা নিজস্ব ওয়েবসাইটেও কোডেড চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়।
- মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিং: চাপের মুখে নিখুঁত মিথ্যা বলার ক্ষমতা, চরম একাকীত্ব সহ্য করা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাচাই করতে কয়েক মাস ধরে মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
- কাটসা (Katsa) ও সায়ানিম (Sayanim): মোসাদের মূল ফিল্ড এজেন্টদের বলা হয় ‘কাটসা’। তবে মোসাদের একটি বড় শক্তি হলো ‘সায়ানিম’। সায়ানিম হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ ইহুদি নাগরিক (যেমন— ডাক্তার, হোটেল মালিক বা গাড়ি ব্যবসায়ী), যারা মোসাদের দাপ্তরিক কর্মী নন, কিন্তু মোসাদ কোনো দেশে অপারেশনে গেলে তারা ঘরোয়া বা লজিস্টিক সাহায্য প্রদান করে।
খ) প্রশিক্ষণ পদ্ধতি (Training):
মনোনীত প্রার্থীদের মোসাদের নিজস্ব গোপন একাডেমি ‘মিদ্রাশ’ (Midrash)’-এ পাঠানো হয়, যেখানে ২ বছরের কঠোর কোর্স করতে হয়:
- কভার স্টোরি (Legend): একজন এজেন্টকে সম্পূর্ণ নতুন একটি ভুয়ো পরিচয় দেওয়া হয়। তাকে সেই চরিত্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এমনভাবে আয়ত্ত করতে হয় যেন ঘুমের ঘোরেও সে নিজের আসল পরিচয় প্রকাশ না করে।
- অনুপ্রবেশ ও কাউন্টার-নজরদারি: শত্রু দেশে কীভাবে গোপনে ঢুকতে হবে এবং কীভাবে ডেড-ড্রপ (গোপনে তথ্য আদান-প্রদান) করতে হবে তা শেখানো হয়।
- চূড়ান্ত পরীক্ষা: প্রশিক্ষণের শেষ ধাপে এজেন্টদের সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো আন্তর্জাতিক শহরে কোনো টাকা বা আসল পরিচয়পত্র ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের টার্গেট দেওয়া হয় সেখানকার কোনো সরকারি ভবনের গোপন নথি চুরি করা বা সুরক্ষিত কারো ছবি তুলে আনা, যা তাদের চূড়ান্ত যোগ্যতা প্রমাণ করে।
নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা রিসোর্স (Sources)
১. আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউট (Global Intelligence & Strategic Archives): মোসাদের ঐতিহাসিক ডিক্লাসিফাইড অপারেশন (যেমন: অপারেশন আইখম্যান ও এন্টেবে) এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি সংক্রান্ত অফিসিয়াল নথিপত্র।
২. ফরেন পলিসি ও সাইবার সিকিউরিটি জার্নাল (Foreign Policy – Stuxnet Analysis): সিআইএ-মোসাদ যৌথ সাইবার অপারেশন এবং গ্লোবাল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন ট্র্যাকিং ডাটা।
বিশ্বের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সমসাময়িক ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
সিনিয়র এসইও ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতে সমীকরণ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। সম্প্রতি ব্রিকস (BRICS) জোটে নতুন সদস্য ও অংশীদার রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন তৈরি হয়েছে। গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগদানের জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও, নতুন অংশীদার দেশগুলোর তালিকায় ব্রিকস (BRICS) এবং পাকিস্তান: ভূরাজনৈতিক জটিলতা, আইএমএফ নির্ভরতা ও ফিনটেক সম্ভাবনার নিরেট বিশ্লেষণ

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত জোটগুলোর একটি হলো ব্রিকস (BRICS)। বৈশ্বিক জিডিপির এক বড় অংশের অংশীদার এই জোটে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম পাকিস্তান। ২০২৩ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন করলেও, জোটে দেশটির অন্তর্ভুক্তি এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেকেই এই বিষয়টিকে কেবল ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বৈরিতার চোখে দেখলেও, এর গভীরে রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) শর্ত এবং ব্রিকসের নিজস্ব দর্শনের নানাবিধ সমীকরণ। আজকের ব্লগে আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করব কেন পাকিস্তান ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটুকু।

১. ব্রিকস জোটে পাকিস্তানের সদস্যপদ না পাওয়ার প্রধান কারণসমূহ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসে পাকিস্তানের স্থান না পাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি বড় কারণ কাজ করেছে— কৌশলগত বাধা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আদর্শগত দ্বন্দ।
ক. ঐকমত্যের নিয়ম (Consensus-based Rule) ও ভারতের অবস্থান
ব্রিকসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জোটে নতুন কোনো সদস্য বা অংশীদার রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করতে হলে বর্তমান সব সদস্য দেশের সর্বসম্মত ঐকমত্য বা সম্মতির প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত জোটে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তিতে দৃঢ় আপত্তি বজায় রেখেছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সীমান্ত বৈরিতার কারণে নতুন সদস্যদের তালিকায় পাকিস্তানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি বড় কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হয়েছে।
খ. ভঙ্গুর অর্থনৈতিক সূচক
ব্রিকস মূলত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল এবং শক্তিশালী উদীয়মান অর্থনীতির (যেমন: চীন, ভারত, ব্রাজিল) একটি প্ল্যাটফর্ম। জোটে অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব অত্যন্ত জরুরি। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটের কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতি বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৬% থেকে ৪.২%-এর আশেপাশে ওঠানামা করছে, যা ব্রিকসের ‘উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি’ ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গ. আইএমএফ (IMF) নির্ভরতা ও ব্রিকসের আদর্শিক দ্বন্দ্ব
ব্রিকস জোটের অন্যতম প্রধান দূরদর্শিতা বা লক্ষ্য হলো পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার (যেমন: মার্কিন ডলারের আধিপত্য, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক) বিকল্প গড়ে তোলা এবং নিজস্ব আঞ্চলিক মুদ্রায় বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো (De-dollarization)।
কিন্তু পাকিস্তান বর্তমানে তার দেউলিয়াত্ব এড়াতে এবং রিজার্ভের বাফার বাড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আইএমএফ-এর ইএফএফ (EFF) বেলআউট কর্মসূচির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। আইএমএফের এই কঠোর কাঠামোগত শর্তসমূহ ব্রিকসের বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
┌──────────────────────────────────┐
│ সদস্যপদ না পাওয়ার প্রধান ৩ কারণ │
└────────────────┬─────────────────┘
│
┌────────────────────────────┼────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐ ┌──────────────────┐
│ ভারতের আপত্তি │ │ ভঙ্গুর অর্থনীতি │ │ IMF নির্ভরতা │
│ ঐকমত্যের নিয়মে │ │ জিডিপি প্রবৃদ্ধি │ │ ব্রিকসের বিকল্প │
│ ভেটো ক্ষমতা │ │ ৩.৬% - ৪.২% │ │ দর্শনের সাংঘর্ষিক│
└──────────────────┘ └──────────────────┘ └──────────────────┘
২. ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তান যদিও চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী সদস্যদের কাছ থেকে কূটনৈতিক সহানুভূতি পেয়ে থাকে, তবে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়ে সাধারণত নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ফলে পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া পাকিস্তানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক লড়াই।
তবে পূর্ণ সদস্যপদ না পেলেও পাকিস্তানের সামনে দুটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে:
- অংশীদার রাষ্ট্র (Partner Country) মর্যাদা: পূর্ণ সদস্য না হয়েও পাকিস্তান ব্রিকসের ‘পার্টনার কান্ট্রি’ হিসেবে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যা তাদের জোটের বাণিজ্য আলোচনা ও আঞ্চলিক সংযোগে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে।
- চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC): সিপেক-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং রাশিয়ার সাথে বাড়তে থাকা জ্বালানি ও সামরিক সম্পর্কের কারণে বেইজিং ও মস্কো ভবিষ্যতে পাকিস্তানের পক্ষে অর্থনৈতিক লবিং অব্যাহত রাখতে পারে।
৩. নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB): পাকিস্তানের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সেতু
রাজনীতি বা কূটনীতিতে পাকিস্তানের পথ কিছুটা কঠিন হলেও, দেশটির সাম্প্রতিক ডিজিটাল ও ফিনটেক (FinTech) সংস্কারগুলো ব্রিকস-এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)-এর সাথে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে এনডিবি-এর সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে এবং প্রায় ৫৮২ মিলিয়ন ডলারের ক্যাপিটাল শেয়ার ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে।
┌──────────────────────────────────────┐
│ NDB-এর সাথে পাকিস্তানের সংযোগ সেতু │
└──────────────────┬───────────────────┘
│
┌─────────────────────────┼─────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
┌───────────────────┐ ┌───────────────────┐ ┌───────────────────┐
│ ডিজিটাল অবকাঠামো │ │ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি │ │ স্থানীয় মুদ্রায় │
│ (Raast System) │ │ (Digital Banks) │ │ লেনদেন │
└───────────────────┘ └───────────────────┘ └───────────────────┘
- ডিজিটাল অবকাঠামো ও সংযোগ: এনডিবি টেকসই উন্নয়নের জন্য আইসিটি (ICT) অবকাঠামো তৈরিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়। পাকিস্তানের নিজস্ব ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম ‘রাস্ত’ (Raast) এবং নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম দেশটির পাবলিক ডিজিটাল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করেছে, যা এনডিবি-এর তহবিলের শর্ত পূরণ করে।
- আর্থিক অন্তর্ভুক্তি (Financial Inclusion): স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান (SBP) ফিনটেক ও ৫টি নতুন ডিজিটাল রিটেইল ব্যাংকিং লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছে। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার এই উদ্যোগ এনডিবি-এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
- স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন: পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সুইফট (SWIFT) বা ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এনডিবি স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করে থাকে। পাকিস্তানও তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে চীনের সাথে নিজস্ব মুদ্রায় (RMB/PKR) বাণিজ্যের উদ্যোগ নিয়েছে, যা এনডিবি-এর দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সংক্ষেপে বলা যায়, পাকিস্তান বর্তমানে মূলত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং আইএমএফ-এর শর্ত পূরণের লক্ষ্যে সংস্কার চালাচ্ছে (Survival Mode), যা ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্র হওয়ার মতো স্বনির্ভর ও প্রভাবশালী স্তরে (Growth Mode) পৌঁছাতে এখনও যথেষ্ট নয়। তবে, রাজনৈতিক সদস্যপদ পেতে বাধার সম্মুখীন হলেও, দেশটির ডিজিটাল ফিনটেক সংস্কারগুলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (NDB) টেকনিক্যাল বা অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।
- মেটা টাইটেল (Meta Title):
- মেটা ডেসক্রিপশন (Meta Description): পাকিস্তান কেন ব্রিকস (BRICS) জোটের সদস্য হতে পারল না? জানুন ভারতের অবস্থান, আইএমএফ (IMF) নির্ভরতা এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (NDB) পাকিস্তানের ফিনটেক সম্ভাবনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ।
- ফোকাস কি-ওয়ার্ডস (Keywords): BRICS and Pakistan, ব্রিকস জোট, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, NDB Pakistan, ভারত-পাকিস্তান ভূরাজনীতি, IMF bailout Pakistan.
নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক বিষয়ক রিসোর্স (Sources)
১. ব্রিকস ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রিপোর্ট (Global Financial Institutions Research): ব্রিকস জোটে নতুন অংশীদার অন্তর্ভুক্তি নীতি এবং আইএমএফের বর্ধিত তহবিল সুবিধা (EFF) সংক্রান্ত নীতিমালা।
২. স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান ও এনডিবি আর্কাইভস (SBP & NDB Digital Economy Papers): পাকিস্তানের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম ‘রাস্ত’ (Raast) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ক্যাপিটাল শেয়ার সংক্রান্ত অফিসিয়াল ডেটা।
বিশ্বরাজনীতি, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



