টিপস অ্যান্ড ট্রিক্স
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সাইবার সিকিউরিটি ও টেকনোলজি ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০২৬
আমরা প্রতিদিন গুগল, ফেসবুক, উইকিপিডিয়া বা ইউটিউবের মতো যেসব ওয়েবসাইট সহজে ব্যবহার করি, তা আসলে বিশাল ইন্টারনেট জগতের মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ অংশ। একে বলা হয় সারফেস ওয়েব (Surface Web)। পানির নিচে লুকিয়ে থাকা বাকি বিশাল অংশটিই হলো ডিপ ওয়েব (Deep Web) এবং এর একটি অত্যন্ত গোপন ও বিশেষায়িত অংশ হলো ডার্ক ওয়েব (Dark Web)। সাধারণ ব্রাউজার বা সার্চ ইঞ্জিন দিয়ে এই অদৃশ্য দুনিয়ায় প্রবেশ করা অসম্ভব।
১২ জুন ২০২৬ সালের এই বিশেষ প্রতিবেদনে, ডার্ক ওয়েব কীভাবে কাজ করে, এর অপরাধ ও ইতিবাচক দিক এবং কীভাবে আপনার ডিজিটাল ডিভাইস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে হ্যাকারদের হাত থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখবেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ ও পেশাদার গাইডলাইন তুলে ধরা হলো।
১. মহাসাগরের তিন স্তর: ইন্টারনেট আসলে কত বড়?

সহজ ভাষায় বোঝার জন্য পুরো ইন্টারনেট নেটওয়ার্ককে একটি মহাসাগরের সাথে তুলনা করে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
▲ [ সারফেস ওয়েব ] -> ৪-৫% (Google, Facebook, YouTube - সবার জন্য উন্মুক্ত)
▲▲▲▲ ------------------------------------------------------------------
▲▲▲▲▲▲ [ ডিপ ওয়েব ] -> ৯০-৯৫% (জিমেইল, অনলাইন ব্যাংকিং, ডাটাবেজ - পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত)
▲▲▲▲▲▲▲▲ ------------------------------------------------------------------
▲▲▲▲▲▲▲▲▲ [ ডার্ক ওয়েব ] -> ক্ষুদ্র অংশ (.onion সাইট, সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড অপরাধ ও গোপন জগৎ)
- সারফেস ওয়েব (Surface Web): আমাদের প্রতিদিনের চেনা ইন্টারনেট। এর ডোমেইন নেমগুলো মানুষের পড়ার যোগ্য বা রিডেবল হয় (যেমন:
[https://bdsbulbulahmed.com](https://bdsbulbulahmed.com))। - ডিপ ওয়েব (Deep Web): এটি ইন্টারনেটের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ অংশ। এই সাইটগুলো পাসওয়ার্ড বা বিশেষ সুরক্ষায় ঢাকা থাকে। যেমন—আপনার ব্যক্তিগত জিমেইল ইনবক্স, অনলাইন ব্যাংকিং প্রোফাইল, ড্রপবক্স বা প্রাতিষ্ঠানিক ডাটাবেজ। এগুলো কোনো অবৈধ বিষয় নয়, বরং নিরাপত্তার স্বার্থেই সাধারণের আড়ালে রাখা হয়।
- ডার্ক ওয়েব (Dark Web): এটি ডিপ ওয়েবেরই একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং বিশেষায়িত অংশ। এখানকার ওয়েবসাইটগুলোর আইডেন্টিটি এবং আইপি অ্যাড্রেস সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড (লুকানো) থাকে। এই সাইটগুলোর ইউআরএল বা লিংক সাধারণ ডটকম (
.com) বা ডটঅর্গ (.org) হয় না; এগুলো হয় এলোমেলো অক্ষরের.onionএক্সটেনশনের।
২. ডার্ক ওয়েব কীভাবে কাজ করে?

- বিশেষ ব্রাউজার (Tor/I2P): ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে সাধারণ ক্রোম বা ফায়ারফক্স ব্রাউজার কাজ করে না। এর জন্য TOR (The Onion Router) বা I2P এর মতো বিশেষ ব্রাউজার প্রয়োজন হয়।
- লেয়ারড সিকিউরিটি বা পেঁয়াজের খোসা: টর নেটওয়ার্কে তথ্যের আদান-প্রদান পেঁয়াজের খোসার মতো অনেকগুলো স্তর বা লেয়ারে এনক্রিপ্ট করা থাকে। এটি ব্যবহারকারীর আসল পরিচয় এবং অবস্থান (IP Address) সম্পূর্ণ গোপন রাখে।
- ডিজিটাল ও বেনামী মুদ্রা: এখানে কোনো দেশের সরকারি কাগজের মুদ্রা বা সাধারণ ক্রেডিট কার্ড চলে না। কেনাবেচার জন্য সম্পূর্ণ ট্র্যাকিং অযোগ্য ক্রিপ্টোকারেন্সি—বিশেষ করে বিটকয়েন (Bitcoin) এবং সর্বোচ্চ গোপনীয়তার জন্য মনোরো (Monero) ব্যবহার করা হয়।
৩. ডার্ক ওয়েবের অন্ধকার দিক: প্রধান সাইবার ক্রাইম সমূহ

ডার্ক ওয়েব তার পরিচয় গোপন রাখার শতভাগ নিশ্চয়তা দেওয়ার কারণে এটি বৈশ্বিক সাইবার অপরাধীদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে:
- চোরাই ডেটা কেনাবেচা (Data Laundering): হ্যাকাররা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ডেটাবেজ হ্যাক করে কোটি কোটি মানুষের ক্রেডিট কার্ড নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসওয়ার্ড এবং মেডিকেল রেকর্ড এখানে এনে বিক্রি করে।
- অবৈধ ড্রাগ ও অস্ত্রের ব্ল্যাক মার্কেট: একসময়ের কুখ্যাত ‘সিল্ক রোড’ (যা বর্তমানে বন্ধ) এর মতো শত শত ব্ল্যাক মার্কেটপ্লেস এখানে সক্রিয়, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ মাদক, কাস্টমাইজড আগ্নেয়াস্ত্র এবং জাল পাসপোর্ট দেদারসে বিক্রি হয়।
- ম্যালওয়্যার ও র্যানসমওয়্যার বিক্রি: পেশাদার সাইবার অপরাধীরা ক্ষতিকারক ভাইরাস বা র্যানসমওয়্যার তৈরি করে অন্য সাধারণ অপরাধীদের কাছে চুক্তি বা লাইসেন্স আকারে (Ransomware-as-a-Service) ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে।
- হ্যাকার ভাড়া (Hacking-for-Hire): নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, ওয়েবসাইট বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ডাউন বা হ্যাক করার জন্য পেশাদার হ্যাকারদের ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া করা যায়।
- মানি লন্ডারিং: ট্র্যাকিং অযোগ্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকা বিভিন্ন হাত বদল করে বৈধ করার কাজ এখানে সহজে করা হয়।
৪. ডার্ক ওয়েবের ইতিবাচক দিক (সদ্ব্যবহার)

সব ডার্ক ওয়েব ব্যবহারকারী অপরাধী নন। অনেকে নিজের নিরাপত্তা ও বাকস্বাধীনতার জন্য এটি ব্যবহার করেন:
- হুইসেলব্লোয়ার বা তথ্যফাঁসকারী: যারা সরকারের বড় কোনো দুর্নীতি বা গোপন অপরাধ বিশ্বের সামনে ফাঁস করতে চান, তারা নিজেদের জীবন রক্ষার্থে পরিচয় লুকাতে এটি ব্যবহার করেন (যেমন—উইকিলিকস)।
- সাংবাদিক ও এক্টিভিস্ট: স্বৈরাচারী বা কঠোর সেন্সরশিপ যুক্ত দেশে মুক্ত সাংবাদিকতা এবং নিরাপদ যোগাযোগের জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
- কর্পোরেট ট্র্যাকিং এড়ানো: সাধারণ মানুষ যারা করপোরেট ট্র্যাকিং বা নজরদারি এড়াতে চান, তারা এটি ব্যবহার করেন। এমনকি বিবিসি (BBC), ফেসবুক (Facebook) এবং সিআইএ (CIA)-র মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব অফিশিয়াল ডার্ক ওয়েব সংস্করণ (
.onionসাইট) রয়েছে।
৫. সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি
কৌতূহলের বশেও ডার্ক ওয়েবের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করা বা এর সাথে যুক্ত হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ:
- ডিভাইস হ্যাক হওয়ার আশঙ্কা: ডার্ক ওয়েবের বেশিরভাগ লিংকেই ক্ষতিকারক ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার লুকানো থাকে। সাধারণ একটি ক্লিকেই আপনার কম্পিউটার বা ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হ্যাকারদের হাতে চলে যেতে পারে।
- পরিচয় চুরি (Identity Theft): কোনোভাবে ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলোতে নিজের আসল নাম, ইমেইল বা ফোন নম্বর ব্যবহার করলে, হ্যাকাররা তা ব্যবহার করে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সোশ্যাল মিডিয়া আইডি মুহূর্তেই হ্যাক করতে পারে।
- আইনি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি: বিশ্বজুড়ে এফবিআই (FBI), ইন্টারপোল বা বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলোতে ফাঁদ (Honeypot) পেতে রাখে। অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নিষিদ্ধ সাইটে প্রবেশ করলে আপনি আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।
- আর্থিক প্রতারণা: ডার্ক ওয়েবের ৯৯% বাণিজ্য বা অফারই ভুয়া। কোনো সেবা বা পণ্য কেনার জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠালে তা ফেরত পাওয়ার কোনো গ্যারান্টি থাকে না।
৬. ডার্ক ওয়েবে আপনার তথ্য লিক হয়েছে কি? ফ্রিতে চেক করার উপায়

আপনার ইমেইল বা পাসওয়ার্ড হ্যাকারদের হাতে ডার্ক ওয়েবে চলে গেছে কিনা তা সম্পূর্ণ ফ্রিতে এবং নিরাপদে পরীক্ষা করার জন্য নিচের বিশ্বস্ত টুলগুলো ব্যবহার করতে পারেন:
- Have I Been Pwned (HIBP): এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিরাপদ ওয়েবসাইট (
haveibeenpwned.com)। এখানে আপনার ইমেইল বা ফোন নম্বর লিখে সার্চ করলেই দেখতে পাবেন কোনো ডেটা ব্রিচে (Data Breach) আপনার তথ্য লিক হয়েছে কিনা। এর “Passwords” ট্যাবে গিয়ে আপনার পাসওয়ার্ডটি ডার্ক ওয়েবে উন্মুক্ত আছে কিনা তাও চেক করতে পারবেন। - Google Dark Web Report / Google One: আপনার যদি জিমেইল অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে গুগলের ‘Security Checkup’ সেকশনে গিয়ে ডার্ক ওয়েব রিপোর্ট (Dark Web Report) রান করতে পারেন। এটি আপনার ইমেইল, নাম, জন্মতারিখ বা ফোন নম্বর ডার্ক ওয়েবে আছে কিনা তা স্ক্যান করে জানিয়ে দেয়।
- Firefox Monitor: মজিলা ফায়ারফক্সের এই সার্ভিসটি (
monitor.firefox.com) আপনার ইমেইল ডার্ক ওয়েবে লিক হলে আপনাকে সতর্কবার্তা পাঠায় এবং কোন কোন সাইট থেকে তথ্য লিক হয়েছে তার তালিকা দেখায়। - পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের ইন-বিল্ট স্ক্যানার: Bitwarden, 1Password বা Google Chrome-এর পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে “Check Passwords” অপশন থাকে, যা আপনার সেভ করা পাসওয়ার্ডগুলোর মধ্যে কোনটি ডার্ক ওয়েবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে তা তাৎক্ষণিক জানিয়ে দেয়।
৭. ডিভাইস ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার স্ট্র্যাটেজি
ডার্ক ওয়েবের হ্যাকার বা সাইবার অপরাধীদের হাত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে এই নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলুন:
ডিজিটাল ডিভাইস সুরক্ষায়:
- টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA): আপনার ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ সব অ্যাকাউন্টে ২-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (যেমন: Google Authenticator বা Microsoft Authenticator অ্যাপ) চালু করুন। শুধু পাসওয়ার্ড জানলেও হ্যাকার আপনার ফোনে আসা কোড ছাড়া লগইন করতে পারবে না।
- ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার: প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা এবং জটিল (যেমন: বর্ণ, সংখ্যা ও প্রতীকের মিশ্রণ) পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। একটি সাইটের পাসওয়ার্ড লিক হলে যেন হ্যাকার আপনার অন্য সাইট হ্যাক করতে না পারে।
- সফটওয়্যার ও ওএস আপডেট: আপনার ফোন, কম্পিউটার এবং ব্যবহৃত অ্যাপগুলো সবসময় লেটেস্ট ভার্সনে আপডেট রাখুন। সিকিউরিটি আপডেটগুলো হ্যাকারদের সিস্টেমে ঢোকার পথ (Security Loopholes) বন্ধ করে দেয়।
- অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা: ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে আসা লূর্তি জেতা বা আকর্ষণীয় অফারের কোনো সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করবেন না। এগুলো ম্যালওয়্যার ছড়ানোর ফিশিং (Phishing) ফাঁদ।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক সুরক্ষায়:
- আলাদা ইমেইল ব্যবহার: আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট) এবং ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের জন্য কখনোই একই ইমেইল ব্যবহার করবেন না। আর্থিক লেনদেনের ইমেইল সম্পূর্ণ আলাদা ও গোপন রাখুন।
- ওটিপি (OTP) ও পিন (PIN) গোপন রাখা: ব্যাংক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সেজে কেউ ফোন করলেও কখনোই আপনার ওটিপি বা পিন কোড কাউকে বলবেন না। কোনো ব্যাংক বা বিকাশ/নগদ কর্তৃপক্ষ কখনো পিন বা ওটিপি জানতে চায় না।
- নিয়মিত স্টেটমেন্ট চেক ও অ্যালার্ট: ব্যাংকের ট্রানজেকশন অ্যালার্ট (SMS/Email) চালু রাখুন। প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে আপনার অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স ও স্টেটমেন্ট চেক করুন, যাতে কোনো অননুমোদিত লেনদেন হলে সাথে সাথে ব্যাংকে রিপোর্ট করতে পারেন।
- ভার্চুয়াল বা লিমিটেড ক্রেডিট/ডেবিট কার্ড: অনলাইন শপিং বা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটে কেনাকাটার জন্য মূল কার্ড ব্যবহার না করে ‘ভার্চুয়াল কার্ড’ ব্যবহার করুন এবং সেটির খরচের সীমা (Limit) সবসময় কমিয়ে রাখুন।
পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত মূল্যায়ন
ডার্ক ওয়েব প্রযুক্তির এক অনন্য কিন্তু মারাত্মক বিপজ্জনক সৃষ্টি। ইন্টারনেটের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এটি তৈরি হলেও বর্তমানে তা ডার্কনেট অপরাধীদের আখড়া। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হিসেবে কৌতূহলবশত এখানে প্রবেশ করার চেয়ে সারফেস ওয়েবে নিজের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সুরক্ষিত রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সচেতনতাই সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আপনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ ও তথ্যের সূত্রসমূহ (Sources)
১. গ্লোবাল সাইবার থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (২০২৬): ডার্কনেট মার্কেটপ্লেস ট্র্যাকিং ও ডেটা ব্রিচ অ্যানালিসিস।
২. হ্যাব আই বিন পনড (HIBP) ও গুগল সিকিউরিটি ল্যাবস: ডাটাবেজ সিকিউরিটি এবং আইডেন্টিটি থেফট প্রোটেকশন গাইড।
প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং ইন্টারনেটের এমন সব অজানা ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
২০২০ সালের তালিকার পর থেকে গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতি এবং ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বৈদ্যুতিক যানবাহন, টেকনোলজি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতের অভাবনীয় বৃদ্ধির কারণে তালিকায় বড় পরিবর্তন ঘটেছে।
ফোর্বস (Forbes)-এর হালনাগাদ তথ্যানুসারে বর্তমানে বিশ্বের ১০ জন শীর্ষ ধনী ব্যক্তির তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনকুবেরের সংক্ষিপ্ত তালিকা
| র্যাঙ্ক | নাম | দেশ | মোট সম্পদ (USD) | আয়ের মূল উৎস (কোম্পানি) |
| ১ | ইলোন মাস্ক (Elon Musk) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$৮৩৯ বিলিয়ন | টেপলা (Tesla), স্পেসএক্স (SpaceX), X |
| ২ | ল্যারি পেজ (Larry Page) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$২৫৭ বিলিয়ন | গুগল / আলফাবেট (Google / Alphabet) |
| ৩ | সের্গেই ব্রিন (Sergey Brin) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$২৩৭ বিলিয়ন | গুগল / আলফাবেট (Google / Alphabet) |
| ৪ | জেফ বেজোস (Jeff Bezos) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$২২৪ বিলিয়ন | আমাজন (Amazon) |
| ৫ | মার্ক জাকারবার্গ (Mark Zuckerberg) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$২২২ বিলিয়ন | মেটা / ফেসবুক (Meta / Facebook) |
| ৬ | ল্যারি এলিসন (Larry Ellison) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$১৯০ বিলিয়ন | ওরাকল (Oracle) |
| ৭ | বার্নার্ড আরনল্ট ও পরিবার (Bernard Arnault) | ফ্রান্স | ~$১৭১ বিলিয়ন | এলভিএমএইচ (LVMH – লুই ভিটন, ডিওর) |
| ৮ | জেনসেন হুয়াং (Jensen Huang) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$১৫৪ বিলিয়ন | এনভিডিয়া (Nvidia) |
| ৯ | ওয়ারেন বাফেট (Warren Buffett) | যুক্তরাষ্ট্র | ~$১৪৯ বিলিয়ন | বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে (Berkshire Hathaway) |
| ১০ | আমেনসিও ওর্তেগা (Amancio Ortega) | স্পেন | ~$১৪৮ বিলিয়ন | ইন্ডিটেক্স গ্রুপ (Inditex / Zara) |
শীর্ষ ধনকুবেরদের বিস্তারিত পরিচয়
১. ইলোন মাস্ক (Elon Musk)

- মোট সম্পদ: প্রায় ৮৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: টেপলা (Tesla), স্পেসএক্স (SpaceX), X (সাবেক টুইটার), নিউরালিংক।
- বিবরণ: প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং মহাকাশ গবেষণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর শীর্ষ ধনী ব্যক্তি।
২. ল্যারি পেজ (Larry Page)

- মোট সম্পদ: প্রায় ২৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: গুগল / আলফাবেট (Google / Alphabet)
- বিবরণ: সার্চ ইঞ্জিন জায়ান্ট গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বিশ্ব প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
৩. সের্গেই ব্রিন (Sergey Brin)

- মোট সম্পদ: প্রায় ২৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: গুগল / আলফাবেট (Google / Alphabet)
- বিবরণ: ল্যারি পেজের সাথে গুগল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তার সম্পদ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
৪. জেফ বেজোস (Jeff Bezos)

- মোট সম্পদ: প্রায় ২২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: আমাজন (Amazon), ব্লু অরিজিন (Blue Origin), দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
- বিবরণ: ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২০ সালের তুলনায় তার সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
৫. মার্ক জাকারবার্গ (Mark Zuckerberg)

- মোট সম্পদ: প্রায় ২২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: মেটা (Meta Platforms – Facebook, Instagram, WhatsApp)
- বিবরণ: মেটাভার্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (AI) বড় ধরনের বিনিয়োগের ফলে গত কয়েক বছরে তার মোট সম্পদ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬. ল্যারি এলিসন (Larry Ellison)

- মোট সম্পদ: প্রায় ১৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: ওরাকল কর্পোরেশন (Oracle)
- বিবরণ: সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ টেকনোলজি জায়ান্ট ওরাকলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা বাড়ায় তার ক্লাউড ব্যবসার শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়েছে।
৭. বার্নার্ড আরনল্ট ও পরিবার (Bernard Arnault & Family)

- মোট সম্পদ: প্রায় ১৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: এলভিএমএইচ (LVMH – Luxury Goods)
- বিবরণ: ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। তার অধীনে লুই ভিটন, সেফোরা, ক্রিশ্চিয়ান ডিওর সহ বিশ্বখ্যাত ৭৫টিরও বেশি লাক্সারি ব্র্যান্ড রয়েছে।
৮. জেনসেন হুয়াং (Jensen Huang)

- মোট সম্পদ: প্রায় ১৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: এনভিডিয়া (Nvidia)
- বিবরণ: এআই (Generative AI) বিপ্লবের প্রধান কারিগর হিসেবে এনভিডিয়ার চিপ তৈরির কারণে গত কয়েক বছরে তার সম্পদ ও বিশ্ব তালিকার স্থান নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৯. ওয়ারেন বাফেট (Warren Buffett)

- মোট সম্পদ: প্রায় ১৪৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে (Berkshire Hathaway)
- বিবরণ: বিশ্বের সবচেয়ে সফল ও দীর্ঘমেয়াদী শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারী, যাকে “ওমাহার জাদুকর” বলা হয়।
১০. আমেনসিও ওর্তেগা (Amancio Ortega)

- মোট সম্পদ: প্রায় ১৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
- প্রধান ব্যবসা: ইন্ডিটেক্স (Inditex – জারা ব্র্যান্ডের মালিক)
- বিবরণ: ফ্যাশন ও খুচরা বিক্রয় খাতের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা।
২০২০ থেকে বর্তমান তালিকার প্রধান পরিবর্তনসমূহ
- টেকনোলজি ও AI খাতের আধিপত্য: তালিকার প্রথম ৮ জনের মধ্যেই সিংহভাগ প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা।
- ইলোন মাস্কের রেকর্ড বৃদ্ধি: ২০২০ সালে তালিকায় শীর্ষে না থাকলেও পরবর্তীতে টেপলা ও স্পেসএক্সের মূল্যস্ফীতির কারণে তিনি তালিকার শীর্ষে চলে এসেছেন।
- জেনসেন হুয়াং-এর উত্থান: এনভিডিয়ার (Nvidia) সেমিকন্ডাক্টর ও এআই চিপের বিপুল চাহিদার কারণে জেনসেন হুয়াং নতুন করে শীর্ষ ১০ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।
(নোট: পুঁজিবাজার ও শেয়ারের দামের ওঠানামার কারণে ধনকুবেরদের এই সম্পদ প্রতিদিন পরিবর্তন হতে পারে।)
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
কোনো বস্তুকে যখন খাড়া বা সোজা ওপরের দিকে ছুঁড়ে মারা হয়, তখন তা একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় ওঠার পর মুহূর্তের জন্য থমকে যায় এবং পুনরায় নিচে নামতে শুরু করে। এই দিক পরিবর্তনের ঠিক আগের মুহূর্তে বস্তুটির উল্লম্ব বেগ হয়ে যায় শূন্য ($0$)।

গতিবিদ্যা (Kinematics), নিউটনের গতির সূত্র এবং শক্তি সংরক্ষণশীলতা—এই তিন উপায়ে বিষয়টির পিছনের পদার্থবিজ্ঞান সহজে অনুধাবন করা যায়।
১. অভিকর্ষজ ত্বরণ ও গতিপথের পরিবর্তন

পৃথিবী তার কেন্দ্রমুখী আকর্ষণের মাধ্যমে সব বস্তুকে নিচের দিকে টানে, যা অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g \approx 9.8 \text{ m/s}^2$) হিসেবে কাজ করে।
[ ঊর্ধ্বমুখী বেগ (v > 0) ] ──► মন্দন (-g) ──► [ সর্বোচ্চ বিন্দু (v = 0) ] ──► ত্বরণ (+g) ──► [ নিম্নমুখী বেগ (v < 0) ]
- ঋণাত্মক ত্বরণ (মন্দন): বস্তুটি যখন ওপরের দিকে ওঠে, তখন গতির দিক থাকে ওপরের দিকে, কিন্তু অভিকর্ষীয় ত্বরণের দিক থাকে নিচের দিকে। এই বিপরীতমুখী ত্বরণের কারণে প্রতি সেকেন্ডে বস্তুটির বেগ $9.8 \text{ m/s}$ হারে কমতে থাকে।
- দিক পরিবর্তন বিন্দু: বেগের মান কমতে কমতে এক পর্যায়ে শূন্যে পৌঁছায়। ওপরের দিকে যাওয়া (ধনাত্মক বেগ) থেকে নিচে নামার (ঋণাত্মক বেগ) সন্ধিক্ষণে বেগ অবশ্যই $0$ এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।
২. গতিবিদ্যার সমীকরণ ও গাণিতিক প্রমাণ
গতিবিদ্যার তৃতীয় সমীকরণটি লক্ষ্য করি:
$$v^2 = u^2 – 2gh$$
যেখানে:
- $u$ = প্রাথমিক নিক্ষেপণ বেগ (Initial Velocity)
- $v$ = শেষ বেগ (Final Velocity)
- $g$ = অভিকর্ষজ ত্বরণ ($9.8 \text{ m/s}^2$)
- $h$ = সর্বোচ্চ উচ্চতা (Maximum Height)
বস্তুটি যখন সর্বোচ্চ উচ্চতায় $h_{max} = \frac{u^2}{2g}$ পৌঁছায়, তখন সমীকরণে $h$-এর মান বসিয়ে পাই:
$$v^2 = u^2 – 2g \left( \frac{u^2}{2g} \right)$$
$$v^2 = u^2 – u^2 = 0$$
$$\therefore v = 0$$
৩. সোজা নিক্ষিপ্ত বস্তু বনাম প্রাসের গতি (Projectile Motion)
সোজা ওপরের দিকে মারা বস্তু এবং কোণ করে মারা প্রাসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উচ্চতার বেগের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
ক) সোজা ওপরের দিকে নিক্ষিপ্ত বস্তু (1D Motion)
- উল্লম্ব বেগ ($v_y$): সর্বোচ্চ বিন্দুতে $0$ হয়।
- অনুভূমিক বেগ ($v_x$): অনুভূমিক কোনো উপাদান না থাকায় $0$ হয়।
- মোট বেগ ($v$): সম্পূর্ণ শূন্য ($v = 0$)।
খ) কোণ করে নিক্ষিপ্ত বস্তু বা প্রাস (2D Projectile Motion)
- উল্লম্ব বেগ ($v_y$): অভিকর্ষজ বলের কারণে কমতে কমতে সর্বোচ্চ উচ্চতায় $0$ হয়।
- অনুভূমিক বেগ ($v_x$): বাতাসে বাধা না থাকলে অনুভূমিক দিকে কোনো বল কাজ করে না। তাই অনুভূমিক বেগ $v_x = u \cos\theta$ অপরিবর্তিত থাকে।
- মোট বেগ ($v$): সর্বোচ্চ বিন্দুতে মোট বেগ কিন্তু শূন্য নয়, বরং তা অনুভূমিক বেগের সমান হয় ($v = u \cos\theta$)।
৪. শক্তি সংরক্ষণশীলতা নীতি (Conservation of Energy)

শক্তির রূপান্তর বিবেচনা করলেও এই নীতিটি সুস্পষ্ট হয়:
- ভূমি থেকে নিক্ষেপের মুহূর্তে: বস্তুর মোট যান্ত্রিক শক্তি থাকে সম্পূর্ণ গতিশক্তি ($E_k = \frac{1}{2}mv^2$) এবং বিভবশক্তি থাকে শূন্য ($E_p = 0$)।
- উপরে ওঠার সময়: উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে গতিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে এবং তা বিভবশক্তিতে ($E_p = mgh$) রূপান্তরিত হয়।
- সর্বোচ্চ উচ্চতায়: সমস্ত গতিশক্তি সম্পূর্ণরূপে বিভবশক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায় ($E_k \to 0$)। গতিশক্তি শূন্য হওয়ার অর্থই হলো সেই মুহূর্তে বেগ $v = 0$।
সোজা নিক্ষেপ ও প্রাসের গতিবিদ্যার তুলনা

| বৈশিষ্ট্য | সোজা ওপরের দিকে নিক্ষেপ | কোণ করে নিক্ষেপ (প্রাস) |
| সর্বোচ্চ বিন্দুতে উল্লম্ব বেগ ($v_y$) | $0$ | $0$ |
| সর্বোচ্চ বিন্দুতে অনুভূমিক বেগ ($v_x$) | $0$ | $u \cos\theta$ (ধ্রুবক) |
| সর্বোচ্চ বিন্দুতে মোট বেগ ($v$) | $0$ | $u \cos\theta$ |
| সর্বোচ্চ বিন্দুতে ত্বরণ ($a$) | $g$ (নিচের দিকে) | $g$ (নিচের দিকে) |
সংক্ষেপে
সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বস্তুটির ওপরের দিকে ওঠা থেমে যায়। গতিপথের দিক পরিবর্তনের ঠিক এই মুহূর্তে বস্তুটির উল্লম্ব বেগ শূন্য হয়, যদিও অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$) তখনও নিচের দিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্রিয়াশীল থাকে।
টিপস অ্যান্ড ট্রিক্স
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেওয়ালে বা সিলিংয়ে ঝুলে থাকা টিকটিকির লেজ খসে পড়া কিংবা কেটে যাওয়া লেজের লাফালাফি করা কেবল একটি অবাক করা দৃশ্যই নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। আবার অন্যদিকে, ঘরে টিকটিকির উপদ্রব বাড়লে তা আমাদের স্বাস্থ্য ও খাবারের সুরক্ষার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা টিকটিকির লেজ খসে পড়ার আসল রহস্য, প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর থেকে টিকটিকি তাড়ানোর পদ্ধতি এবং টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
১. টিকটিকির লেজ খসে পড়ার বৈজ্ঞানিক কারণ (Autotomy)

বিজ্ঞানের ভাষায় টিকটিকির আত্মরক্ষার্থের জন্য নিজ থেকে অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করার এই প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে ‘অটোটমি’ (Autotomy) বা ‘স্ব-অঙ্গচ্ছেদ’ বলা হয়।
[ শিকারি প্রাণীর আক্রমণ (বিড়াল/পাখি) ]
│
▼
[ লেজের কশেরুকার ফাটল অংশে (Fracture Plane) চাপ ]
│
▼
[ পেশির দ্রুত স্বয়ংক্রিয় সংকোচন (রক্তপাতহীন বিচ্ছেদ) ]
│
▼
[ বিচ্ছিন্ন লেজের স্বয়ংক্রিয় স্পন্দন ও শিকারি বিভ্রান্ত ]
│
▼
[ নিরাপদ পলায়ন ও কিছুদিন পর তরুণাস্থির (Cartilage) লেজ গজানো ]
প্রধান কারণসমূহ:
- শিকারির দৃষ্টি সরানো: বিড়াল, পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী টিকটিকির লেজ ধরে ফেললে, জীবন বাঁচাতে টিকটিকি লেজটি খসিয়ে দেয়।
- বিচ্ছিন্ন লেজের স্পন্দন: স্নায়ুতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ (Spinal Cord Motor Centers)-এর কারণে লেজটি খসে পড়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে লাফালাফি করতে থাকে। ফলে শিকারি প্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে সেই লেজের দিকে নজর দেয় এবং টিকটিকিটি চট করে পালিয়ে যায়।
- বিশেষ কশেরুকা ও রক্তপাত না হওয়া: টিকটিকির লেজের মেরুদণ্ডে নির্দিষ্ট কিছু ‘ফ্র্যাকচার প্লেন’ (Fracture Planes) বা ফাটল থাকে, যা খুব হালকা সংযোগযুক্ত। লেজ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই ধমনী ও পেশিগুলো বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রক্তপাত হয় না।
- পুনরায় লেজ গজানো: লেজ খসে পড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন লেজ গাজায়, তবে এটি হাড় দিয়ে তৈরি না হয়ে প্রধানত তরুণাস্থি (Cartilage) দিয়ে গঠিত হয়।
২. ঘর থেকে প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি তাড়ানোর উপায়

টিকটিকি অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং কোনো কোনো উপাদানের তীব্র বা ঝাঁঝালো গন্ধ সহ্য করতে পারে না। কেমিক্যাল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি দূর করার সেরা পদ্ধতিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ক) তীব্র গন্ধের ব্যবহার
- ডিমের খোসা: ডিমের গন্ধকে টিকটিকি ভয় পায়। ঘরের কোণে বা ভেন্টিলেটরে ডিমের ফাঁকা খোসা রেখে দিলে সে অঞ্চল এড়িয়ে চলে।
- রসুন ও পেঁয়াজের রস: রসুনের কোয়া কোণায় ঝুলিয়ে রাখা কিংবা পেঁয়াজের রস পানিতে মিশিয়ে দেওয়ালে স্প্রে করলে এর তীব্র গন্ধে টিকটিকি পালিয়ে যায়।
- গোলমরিচের স্প্রে: পানিতে গোলমরিচ বা লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে স্প্রে বোতলে নিয়ে দেওয়াল ও আসবাবপত্রের পেছনে ছিটান।
- ন্যাপথলিন বল: আলমারির নিচে, ড্রয়ার বা কোণে ন্যাপথলিন রেখে দিলে টিকটিকির আগমন কমে যায়।
খ) পরিবেশগত পরিবর্তন
- বরফ ঠান্ডা পানি: টিকটিকি শীতল রক্তের প্রাণী। এর গায়ে হঠাৎ বরফ ঠান্ডা পানি স্প্রে করলে তা সাময়িকভাবে অবশ হয়ে পড়ে, যা সহজে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হয়।
- পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রণ: ঘরে লাইটের আলো কমানো এবং ছোট পোকা নিয়ন্ত্রণ করলে খাবারের অভাবে টিকটিকি নিজে থেকেই চলে যায়।
- তাপমাত্রা কমানো: এসি থাকলে ঘরের তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াসের নিচে রাখলে টিকটিকি টিকতে পারে না।
৩. টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয়

টিকটিকি বিষাক্ত প্রাণী নয় এবং সাধারণত কামড়ায় না। তবে এদের লালা, মলমূত্র ও ত্বকে সালমোনেলা (Salmonella) নামক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানবদেহে প্রবেশ করলে তীব্র পেটব্যথা ও ফুড পয়েন্টনিং হতে পারে।
[ টিকটিকির স্পর্শ বা কামড় ]
│
├───► ১. অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ও হালকা গরম পানিতে ধোয়া (৫-১০ মিনিট)
│
├───► ২. অ্যান্টিসেপটিক মলম (Dettol/Savlon/Neomycin) ব্যবহার
│
└───► ৩. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টিটেনাস (Toxoid) ইনজেকশন নেওয়া
ক) টিকটিকি কামড়ালে পদক্ষেপ:
- ক্ষতস্থান ধোয়া: গরম পানি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান দিয়ে ক্ষতস্থানটি অন্তত ৫-১০ মিনিট ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
- অ্যান্টিসেপটিক দেওয়া: ধোয়ার পর স্থানটি শুকিয়ে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা লিকুইড দিন এবং পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
- টিটেনাস শট: ক্ষত গভীর হলে এবং গত ৫ বছরে টিটেনাস নেওয়া না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিটেনাস শট নিন।
খ) খাবারে টিকটিকি পড়লে বা মুখ দিলে:
- খাবার ফেলে দিন: কোনো খাবারে টিকটিকি মুখ দিলে বা মরে পড়ে থাকলে সেটি কখনোই খাওয়া যাবে না, খাবারটি পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে।
- বাসনপত্র পরিচ্ছন্ন করা: সংশ্লিষ্ট পাত্রটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
- অসাবধানতাবশত খেয়ে ফেললে: তীব্র পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া বা জ্বর শুরু হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
উপসংহার
টিকটিকির লেজ খসে পড়া প্রকৃতিতে বিবর্তিত একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক আত্মরক্ষা কৌশল। বাসা-বাড়িতে একে মারার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় অনুসরণ করা যেমন নিরাপদ, তেমনি খাবারের ক্ষেত্রে টিকটিকির ব্যাকটেরিয়া থেকে সতর্ক থাকাও অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র (References)
- Journal of Herpetology: Mechanisms and Physiology of Tail Autotomy in Reptiles.
- Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Reptiles and Salmonella Risk Guidelines.
- Biological Sciences Study Reports: Natural Repellents and Environmental Control for Domestic Geckos.
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



