টেক

ইনকামিং কলের লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং ও স্প্যাম কল ব্লকিং গাইড (২০২৬ আপডেট)
ইনকামিং

নিউজ ডেস্ক

July 29, 2026

শেয়ার করুন

আজকের ডিজিটাল যুগে অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসা মাত্রই কলারের রিয়েল-টাইম লাইভ জিপিএস লোকেশন (Real-time Live Location) জানার ইচ্ছা অনেকেরই থাকে। বিশেষ করে নানা ধরনের আর্থিক প্রতারণা ও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি বাড়ার কারণে কলারের বর্তমান অবস্থান জানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন অনেকেই।

তবে সাইবার সিকিউরিটি ও টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সাধারণ অ্যাপ দিয়ে এটি করা কেন কারিগরি ও আইনিভাবে অসম্ভব। এই গাইডে আমরা ইনকামিং কল ট্র্যাকিংয়ের ভেতরের বাস্তবতা এবং অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে (iOS 18/19) থার্ড-পার্টি অ্যাপ ছাড়াই স্প্যাম কল প্রতিরোধ করার বিশ্বস্ত উপায়গুলো জানব।

১. ইনকামিং কলের ‘লাইভ লোকেশন’ ট্র্যাক করা কি সম্ভব?

সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি উত্তর: না, সাধারণ কোনো থার্ড-পার্টি মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের পক্ষে ইনকামিং কল চলাকালীন কলারের সঠিক বা লাইভ জিপিএস অবস্থান (Live GPS Location) দেখানো সম্ভব নয়।

কারিগরি ও আইনি বিশ্লেষণ:

  • ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও টেলিকম আইন: বিশ্বজুড়ে টেলিকম অপারেটরগুলো (যেমন: গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক বা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক) গ্রাহকের বর্তমান অবস্থান সংক্রান্ত ডেটা সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় রাখে। GDPR ও স্থানীয় ডাটা প্রাইভেসি আইনের কারণে থার্ড-পার্টি কোনো অ্যাপকে লাইভ লোকেশন ডেটা অ্যাক্সেস করার অনুমতি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • মোবাইল টাওয়ার ত্রিভুজায়ন (Cell Tower Triangulation): কোনো ব্যক্তির ফোনের বর্তমান সঠিক অবস্থান জানতে সেলুলার টাওয়ারের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের এখতিয়ার কেবল দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (যেমন: পুলিশ, সিআইডি বা গোয়েন্দা সংস্থা) এবং আদালতের অনুমোদিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

অ্যাপগুলো আসলে কী দেখায়?

গুগল প্লে-স্টোর বা অ্যাপ স্টোরে থাকা অ্যাপগুলো (যেমন: Truecaller, Hiya বা Mobile Number Locator) যা দেখায়, তা মূলত দুটি তথ্যের সমাহার:

১. ক্রাউড-সোর্সড কন্টাক্ট ডেটা: ব্যবহারকারীদের নিজেদের অ্যাড্রেস বুক বা কন্টাক্ট লিস্ট অ্যাপের সার্ভারে শেয়ার করার মাধ্যমে তৈরি হওয়া নামের ডেটাবেজ।

২. টেলিকম এরিয়া/সার্কেল ইনফরমেশন: ফোন নম্বরের কান্ট্রি কোড বা এরিয়া কোড (Area Code) বিশ্লেষণ করে সিমটি কোন নির্দিষ্ট দেশ বা প্রশাসনিক অঞ্চলের (যেমন: ঢাকা বা চট্টগ্রাম সার্কেল) অধীনে নিবন্ধিত, কেবল সেই আনুমানিক মানচিত্রটুকু প্রদর্শন করে।

২. অপরিচিত ও স্প্যাম কল সনাক্তকরণের নিরাপদ মাধ্যম

প্রতারণামূলক কল (যেমন: ফেক বিকাশ/নগদ কাস্টমার কেয়ার বা লটারির কল) সনাক্ত করতে নিচের প্ল্যাটফর্মগুলো কার্যকরী ভূমিকা রাখে:

প্ল্যাটফর্ম / পদ্ধতিকাজের ধরণ২০২৬ বিশ্লেষণ ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন
Phone by Googleঅ্যান্ড্রয়েডের অফিশিয়াল ডায়ালারকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত স্প্যাম প্রটেকশন। বিজ্ঞাপনমুক্ত ও ব্যাকগ্রাউন্ড মেমোরি সাশ্রয়ী।
Truecallerকলার আইডি ও প্রোটেকশনবিশ্বজুড়ে বিশাল ডেটাবেজ। তবে ব্যাকগ্রাউন্ডে কন্টাক্ট পারমিশন নেয় বলে ডাটা প্রাইভেসিতে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
Whoscallঅফলাইন কলার আইডিনেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট কানেকশন না থাকলেও পূর্বে সংরক্ষিত ডেটাবেজ থেকে স্প্যাম সনাক্ত করে।

⚠️ ডাটা প্রাইভেসি পরামর্শ: থার্ড-পার্টি কলার আইডি অ্যাপ ব্যবহারের সময় আপনার ব্যক্তিগত পরিচিতি তালিকা (Address Book) ক্লাউডে আপলোড হতে পারে। গোপনীয়তা ও সুরক্ষার দিক থেকে গুগলের অফিশিয়াল ফোন অ্যাপ (Phone by Google) ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ সমাধান।

৩. স্মার্টফোনে অ্যাপ ছাড়া বিল্ট-ইন স্প্যাম কল ব্লকিং নিয়ম

আপনার ফোনের অপারেটিং সিস্টেমের নিজস্ব সিকিউরিটি ফিচার ব্যবহার করে খুব সহজেই অনাকাঙ্ক্ষিত কল আটকে দেওয়া সম্ভব:

Samsung (স্যামসাং)

স্যামসাং স্মার্টফোনে বিল্ট-ইন “Hiya” স্প্যাম প্রটেকশন ইঞ্জিন যুক্ত থাকে:

  1. আপনার ফোনের Phone (ডায়ালার) অ্যাপ ওপেন করুন।
  2. ডানদিকের শীর্ষে থাকা Three Dots (তিনটি বিন্দু) আইকনে ক্লিক করে Settings-এ যান।
  3. “Caller ID and spam protection” অপশনটিতে ঢুকে সেটি ON করে দিন।
  4. অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য Block numbers সেটিংসের ভেতর থেকে “Block calls from unknown numbers” বেছে নিন।

Xiaomi / Redmi / POCO (শাওমি)

  1. ফোনের Settings-এ গিয়ে Apps অপশনটিতে প্রবেশ করুন।
  2. System app settings থেকে Call settings চয়ন করুন।
  3. “Antispam” বা “Blocklist” অপশনটি চালু (Turn On) করুন।
  4. Call blocklist সেটিংস থেকে “Block calls from strangers” সুবিধাটি অন করে দিন।

Vivo / iQOO (ভিভো)

  1. ফোনের মূল Settings অ্যাপে প্রবেশ করুন।
  2. Apps অথবা Apps & Notifications-এ স্ক্রোল করুন।
  3. System app settings থেকে Phone অথবা Call অপশনে যান।
  4. “Reject” বা “Block harassing calls” বিকল্প নির্বাচন করে স্প্যাম ট্র্যাকিং সক্রিয় করুন।

৪. iPhone 15 Pro Max-এ ফ্ল্যাগশিপ স্প্যাম ব্লকিং গাইড

iOS চালিত iPhone 15 Pro Max ডিভাইসগুলোতে তৃতীয় কোনো অ্যাপের সাহায্য ছাড়াই অটোমেটিক স্প্যাম কল ফিল্টারিং করা যায়:

                  ┌────────────────────────────────────────┐
                  │ iPhone 15 Pro Max Call Blocking Steps  │
                  └───────────────────┬────────────────────┘
                                      │
         ┌────────────────────────────┴────────────────────────────┐
         ▼                                                         ▼
১. Silence Unknown Callers                               ২. Manual Specific Blocking
• Settings ➔ Phone ➔ Silence Unknown Callers             • Phone App ➔ Recents ➔ "i" Icon
• Toggle ON (সবুজ করুন)                                   • Scroll down ➔ Block this Caller
• অচেনা কল সরাসরি সাইলেন্ট মিসড কল হিসেবে জমা হবে         • নির্দিষ্ট কলারের ক্ষেত্রে কল চিরতরে ব্লক হবে

পদ্ধতি ১: Silence Unknown Callers (সর্বোত্তম সমাধান)

এই ফিচারটি চালুর মাধ্যমে আপনার কন্টাক্ট লিস্টে সংরক্ষিত নেই এমন যেকোনো অপরিচিত বা সম্ভাব্য স্প্যাম কল সাইলেন্ট করে দেওয়া যায়। রিং বাজবে না, তবে স্ক্রিনে সাধারণ মিসড কল হিসেবে দেখতে পাবেন।

  1. আইফোনের Settings অ্যাপে যান।
  2. স্ক্রোল করে Phone অপশনে ট্যাপ করুন।
  3. Silence Unknown Callers সেটিংসের ভেতর প্রবেশ করুন।
  4. টগল আইকনটি Toggle ON (সবুজ) করে দিন।

পদ্ধতি ২: ম্যানুয়াল ব্লকিং

  1. Phone অ্যাপের Recents (কল হিস্ট্রি) তালিকায় যান।
  2. নির্দিষ্ট নম্বরটির পাশে থাকা “i” (Information) আইকনে ট্যাপ করুন।
  3. নিচে স্ক্রোল করে “Block this Caller” চাপুন এবং কনফার্ম করুন।

সাধারণ প্রশ্নাবলী (Frequently Asked Questions)

প্রশ্ন ১: গুগল প্লে-স্টোরের “Live Location Tracker” অ্যাপগুলো কীভাবে কাজ করে?

উত্তর: এগুলো মূলত ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর দাবি করে থাকে। অ্যাপগুলো কেবল সিমের কান্ট্রি কোড বা এলাকা কোডের ওপর ভিত্তি করে মানচিত্রের একটি নির্দিষ্ট শহরের নাম দেখায়, কলারের লাইভ মুভমেন্ট বা জিপিএস অবস্থান নয়।

প্রশ্ন ২: স্প্যাম কল ব্লক করলে কি জরুরি অপরিচিত কল মিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে?

উত্তর: “Silence Unknown Callers” চালু থাকলে কলটি একদম কেটে যায় না, বরং সাইলেন্ট থাকে। তাই প্রাক-পরিচিতি ছাড়া নতুন কারো জরুরি কল আসলে পরবর্তীতে মিসড কল লিস্ট দেখে ব্যাক করা সম্ভব।

প্রশ্ন ৩: কলার আইডি অ্যাপ ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ?

উত্তর: বেশ কিছু কলার আইডি অ্যাপ কন্টাক্ট লিস্ট পারমিশন নেয়। তাই ব্যাংকিং সিকিউরিটি ও ব্যক্তিগত প্রাইভেসি বজায় রাখতে অপারেটিং সিস্টেমের বিল্ট-ইন ফিচার এবং অফিশিয়াল Google/Apple সলিউশন ব্যবহার করা ভালো।

তথ্যসূত্র ও সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ডস (References)

১. Federal Communications Commission (FCC): Stop Unwanted Calls and Texts – Spam Call Protection Standards.

২. Apple Support Documentation: Detect and block spam phone calls on iPhone (iOS Guidance).

৩. Google Safety Center: Caller ID & Spam Protection features in Phone by Google.

সংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত

ইনকামিং কলের লাইভ অবস্থান দেখার প্রলোভন দিয়ে বাজারে অনেক ক্ষতিকর অ্যাপ বা মেলওয়্যার ছড়ানো হয়। প্রযুক্তির বর্তমান সিকিউরিটি কাঠামো অনুযায়ী লাইভ অবস্থান ট্র্যাক করা সম্ভব নয়। তাই থার্ড-পার্টি ভুয়া অ্যাপ এড়িয়ে চলুন এবং ফোনের নিজস্ব কলার আইডি ও ব্লকিং সেটিংস ব্যবহার করে সুরক্ষিত থাকুন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

ড. আল ইমরান নাসা

নিউজ ডেস্ক

September 16, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ভূ-রাজনীতি ও দর্শন
  • প্রকাশের তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি, বিবিসি (BBC), দ্য সেন্ট্রাল তিব্বতান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (CTA) ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আর্কাইভ।

আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (GPA-5) না পেলে কিংবা দেশের শীর্ষ কোনো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ না পেলে জীবন বুঝি সেখানেই থমকে যায়। কিন্তু এই চেনা ধারণার বাইরে গিয়ে জিপিএ-৩.৫৭ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এক বাঙালি তরুণ। তিনি আর কেউ নন, নরসিংদীর মনোহরদীর ছেলে ড. আল ইমরান (Al Emran)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তিনি নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে প্রথমে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালে জেফ বেজোসের বিখ্যাত মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এ বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

আজকের এই কন্টেন্টে আমরা জানবো কীভাবে বারবার ব্যর্থতার গ্লানি মুছে একজন সাধারণ ছাত্র থেকে তিনি আজকের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালেন।

১. শৈশবের স্বপ্ন এবং শুরুর ধাক্কা

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার রামপুর গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আল ইমরানের। বাবা ছিলেন মাদরাসার শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই জোছনা রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে ইমরান ভাবতেন, মানুষ কীভাবে চাঁদে গেল? আমিও কি কোনোদিন পারবো?

কিন্তু তার এই বড় স্বপ্নের পথে প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল সবসময় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২০০৪ সালে খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে মাত্র জিপিএ ৩.৫৭ পেয়ে এসএসসি এবং ২০০৬ সালে জিপিএ ৪.৪ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। রেজাল্ট কম থাকার কারণে দেশের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে (BUET) ভর্তি পরীক্ষাই দিতে পারেননি তিনি।

২. অনার্সে এসে নিজেকে বদলে ফেলা

বুয়েটে পরীক্ষা দিতে না পেরে ইমরান ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। তবে সেখানেও এক বছর পড়ার পর নিজের মূল ভালো লাগার জায়গা খুঁজে পেতে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই যেন খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসেন ইমরান। যে ছেলেটি স্কুল-কলেজে সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন, তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন! অনার্সে তার সিজিপিএ ছিল ৩.৬৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৯৭।

৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিরিয়ে দিল, কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখেছিল

মাস্টার্স শেষ করার পর আল ইমরানের তীব্র ইচ্ছা ছিল নিজের বিভাগেই (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার। এজন্য তিনি একাধিকবার আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নেওয়া হয়নি।

এই প্রত্যাখ্যান ইমরানকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত করেছিল। কিন্তু তিনি দমে যাননি। দেশে সুযোগ না পেয়ে তিনি চোখ ফেরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চেয়ে গবেষণার বাস্তব যোগ্যতা অনেক বেশি শক্তিশালী।

৪. পিএইচডি এবং আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি

২০১৭ সালে ইমরান পাড়ি জমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। Auburn University থেকে গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাস (University of Arkansas) থেকে স্পেস অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্স-এ সফলভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল স্যাটেলাইট ডাটা, মেশিন লার্নিং এবং ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহ (Mars) ও প্লুটোর (Pluto) পৃষ্ঠের গঠন উন্মোচন করা। তার এই অসাধারণ গবেষণাপত্রগুলো আন্তর্জাতিক মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নজরে আসে।

৫. নাসার দরজা জয় এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট

২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ড. আল ইমরান বিশ্বখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-র জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে (JPL) পোস্টডক্টরাল ফেলো (Planetary Astronomer) হিসেবে যোগ দেন। যে তরুণকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ফিরিয়ে দিয়েছিল, তিনি তখন নাসায় বসে বুধ, মঙ্গল, ইউরোপা এবং শনির উপগ্রহের পৃষ্ঠদেশ নিয়ে গবেষণা করছিলেন!

সর্বশেষ ২০২৬ সালের আপডেট:
নাসায় ৩ বছর সফলভাবে কাজ করার পর, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ড. আল ইমরান আরও একধাপ এগিয়ে যান। তিনি বর্তমানে জেফ বেজোসের বিখ্যাত মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এ Aerospace Systems Engineer III এবং Planetary Scientist হিসেবে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি চাঁদের মাটিতে স্পেস রিসোর্স বা খনিজ সম্পদের অবস্থান মূল্যায়ন করার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লুনার মিশনে (Lunar Mission) কাজ করছেন।

ড. আল ইমরানের জীবন থেকে আমাদের কী শেখার আছে?

ড. আল ইমরানের এই অদম্য লড়াইয়ের গল্পটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য কয়েকটি অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা দেয়:

  1. জিপিএ বা ভর্তি পরীক্ষা জীবনের শেষ কথা নয়: স্কুল-কলেজের রেজাল্ট খারাপ মানেই জীবন শেষ—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। চেষ্টা ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
  2. প্রত্যাখ্যানই নতুন পথের জন্ম দেয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষক হিসেবে না নেওয়ায় সেদিন হয়তো তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানই আজ তাকে নাসা ও ব্লু অরিজিনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে।
  3. দক্ষতা ও গবেষণার শক্তি: সার্টিফিকেট বা পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে স্কিল বা দক্ষতা অর্জন করা এবং একাগ্রচিত্তে নিজের লক্ষ্যে লেগে থাকাটাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।

উপসংহার

ড. আল ইমরান প্রমাণ করেছেন যে, সততা, মেধা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে নরসিংদীর একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসেও বিশ্ব কাঁপানো মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়া সম্ভব। তার এই গল্প আমাদের প্রতিটি হতাশ তরুণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা জোগায়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ভিডিও কলে বিয়ে

নিউজ ডেস্ক

September 15, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ: নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ অপরাহ্ন

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বৈশ্বিক প্রবাস জীবনের বিস্তারে দূর থেকে ভিডিও কল বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিবাহ (Online Marriage) সম্পাদনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—সরাসরি ভিডিও কলের মাধ্যমে ইজাব ও কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) করে বিয়ে সম্পন্ন করা ইসলামী শরীয়াহ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী কতটা বৈধ?

ইসলামী ফিকহ বিশারদ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি ভিডিও কলে ইজাব-কবুল করে বিয়ে করা অধিকাংশ আলেমের মতে বৈধ নয়। তবে ইসলামী শরীয়াহতে এর একটি সম্পূর্ণ সুন্নাহসম্মত ও শতভাগ বৈধ বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে, যাকে ‘ওকালতি’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ পদ্ধতি বলা হয়।

১. ভিডিও কলে সরাসরি বিয়ে বৈধ না হওয়ার কারণ (জমহুর ওলামাদের মত)

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী বিয়ে সহীহ হওয়ার জন্য ‘ইত্তিহাদুল মজলিস’ বা উভয় পক্ষ এবং সাক্ষীদের একই স্থানে বা মজলিসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। ভিডিও কলে সরাসরি বিয়ে না হওয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক ও শরঈ কারণসমূহ:

  • মজলিস ভিন্ন হওয়া: বর ও কনে দুটি ভিন্ন স্থানে থাকেন, যা একই মজলিসে উপস্থিত থাকার শর্তটি সরাসরি লঙ্ঘন করে।
  • ডিজিটাল প্রপঞ্চ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: এআই প্রসেসিং, ভয়েস চেঞ্জিং প্রযুক্তি বা ডিপফেক (Deepfake)-এর মতো প্রযুক্তির অপব্যবহার করে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঝুঁকি থেকে যায়।
  • সাক্ষীদের সশরীরে অনুপস্থিতি: বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর সামনে সরাসরি ইজাব-কবুল হতে হয়, যা স্ক্রিনের ওপার থেকে নিশ্চিত করা কঠিন।

(উল্লেখ্য, কয়েকজন আধুনিক আলেম পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে শিথিলতার কথা বললেও সিংহভাগ ফতোয়া বোর্ড এবং আলেম সতর্কতাস্বরূপ এটিকে অবৈধ বলেছেন)।

২. প্রবাসীদের বিয়ের সঠিক ও বৈধ পদ্ধতি: ওকালতি (Proxy Marriage)

কোনো পাত্র বা পাত্রী বিদেশে বা দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করলে, সরাসরি ভিডিও কলে বিয়ে না করে ‘ওয়াকিল’ বা প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করাই শরীয়াহসম্মত নিয়ম।

ধাপসমূহ:

১. উকিল নিযুক্তকরণ: দূরে থাকা পাত্র (বা পাত্রী) তার পরিচিত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে (যেমন: ভাই, বন্ধু বা আত্মীয়) ফোন বা ভিডিও কলে স্পষ্ট ভাষায় বলবেন—“আমি তোমাকে অমুক কনের সাথে আমার বিয়ের জন্য আমার ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করলাম।”

২. মজলিসে ইজাব-কবুল: নিযুক্ত উকিল বিয়ের মূল মজলিসে কাজি, কনের ওলি (অভিভাবক) এবং অন্তত দুজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর সামনে সশরীরে উপস্থিত হবেন।

৩. আকদ সম্পাদন: কনের পক্ষ থেকে বিয়ে দেওয়া হলে, প্রবাসীর নিযুক্ত উকিল সবার সামনে বলবেন—“আমি আমার মক্কেল (বরের নাম)-এর পক্ষে এই বিয়ে কবুল করলাম।”

[প্রবাসে থাকা পাত্র] ──► প্রতিনিধি (উকিল) নিয়োগ ──► বিয়ের মূল মজলিস ──► কাজি ও সাক্ষীদের সামনে ইজাব-কবুল ──► বৈধ বিয়ে

এই প্রক্রিয়ায় বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সময় দূরে থাকা পাত্র-পাত্রী চাইলে ভিডিও কলে যুক্ত থেকে পুরো অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখতে পারেন, এতে শরীয়াতে কোনো বাধা নেই।

৩. দূর থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে কাবিননামা ও আইনি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী (মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯৭৪) বিয়ের পর কাজি অফিসে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। তবে অনলাইনে সম্পূর্ণ “অনলাইন-অনলি” বা ইন্টারনেটে ডিজিটালি সই করে বিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। সশরীরে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে বালাম বইয়ে স্বাক্ষর করতে হয়।

  • পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা ওকালতনামা: প্রবাসে থাকা পাত্র বা পাত্রী সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে মনোনীত প্রতিনিধির নামে একটি লিগ্যাল “ওকালতনামা” বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করিয়ে দেশে পাঠাবেন।
  • নথিপত্র ও বয়সের প্রমাণ: বর (ন্যূনতম ২১ বছর) ও কনের (ন্যূনতম ১৮ বছর) জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)/পাসপোর্ট ও ছবি কাজি অফিসে জমা দিতে হবে।
  • রেজিস্ট্রেশন ও ডিজিটাল সার্টিফিকেট: নিযুক্ত উকিল এবং সাক্ষীরা কাজি অফিসে গিয়ে বালাম বইয়ে স্বাক্ষর করবেন। কাজি সাহেব তথ্যগুলো সিভিল রেজিস্ট্রেশন পোর্টালে (CRVS) আপলোড করার পর বর-কনে কিউআর (QR) কোড সম্বলিত ডিজিটাল কাবিননামা বা ম্যারেজ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারবেন।

৪. বিয়ের ক্ষেত্রে ওলি (কনের অভিভাবক)-এর প্রয়োজনীয়তা

ইসলামে কনের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘ওলি’ (Wali) বা অভিভাবকত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক স্তম্ভ।

  • ওলির ক্রম: কনের প্রধান ওলি হলেন তার পিতা। পিতা না থাকলে দাদা, আপন ভাই, সৎ ভাই, ও চাচা পর্যায়ক্রমে ওলি হবেন।
  • ওলি ছাড়া বিয়ের বিধান:
    • জমহুর ওলামা (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী): ওলি ছাড়া বিবাহ সম্পূর্ণ বাতিল বা অসিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ওলি (অভিভাবক) ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হয় না” (আবু দাউদ)।
    • হানাফী মাযহাব: কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিমতি নারী ওলি ছাড়া উপযুক্ত (কুফু) পাত্রের সাথে দুজন সাক্ষীর সামনে বিয়ে করলে তা সহীহ হয়ে যাবে। তবে ওলির অনুমতি ছাড়া বিয়ে করাকে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে অনুচিত মনে করা হয়।

অতএব, দূরে থেকে বিয়ে সম্পন্ন করতে চাইলে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রত্যয়িত ওকালতনামা এবং বিশ্বস্ত প্রতিনিধির মাধ্যমে কাজি ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন করাই ধর্মীয় ও আইনি উভয় দিক থেকেই নিরাপদ সমাধান।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ডিএনএ

নিউজ ডেস্ক

September 14, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Science Content Analyst) বিভাগ (Category): বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, আইন প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তথ্যসূত্র (Sources): বৈজ্ঞানিক ইতিহাস সংকলন, ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক বিজ্ঞান বিষয়ক প্রকাশনা।

ঢাকা: ১৮৬৯ সালে সুইজারল্যান্ডের এক গবেষণাগারে ব্যান্ডেজের পুঁজ থেকে এক অজানা রাসায়নিক পদার্থ আলাদা করেছিলেন রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ মিশার। তখন তিনি নিজেও জানতেন না, তাঁর হাতে যে পদার্থটি এসেছে—যাকে তিনি “নিউক্লিন” নাম দিয়েছিলেন—তা একদিন মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর একটি হয়ে উঠবে, এবং এক শতাব্দীর বেশি সময় পর তা হয়ে উঠবে আদালতে অপরাধী শনাক্তকরণ ও পিতৃত্ব নির্ধারণের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

১৮৬৯ থেকে ১৯৫৩: একটি অণুর রহস্য উদ্ঘাটন

মিশারের আবিষ্কারের পর প্রায় ৮৪ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই পদার্থের গঠন ও কার্যকারিতা নিয়ে অন্ধকারে ছিলেন। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে ১৯৫৩ সালে, যখন গবেষক জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক প্রমাণ করেন যে এই অণুটি একটি পেঁচানো সিঁড়ির মতো দ্বি-সূত্রক গঠন ধারণ করে, যা বিজ্ঞানের ভাষায় “ডাবল হেলিক্স” নামে পরিচিত। এই আবিষ্কার ছিল বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান জগতের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত—কারণ এর মাধ্যমেই প্রথমবার স্পষ্ট হয় যে কীভাবে জীবের বংশগত তথ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষিত ও স্থানান্তরিত হয়। চারটি নাইট্রোজেন বেস—অ্যাডিনিন, থাইমিন, সাইটোসিন ও গুয়ানিন—নির্দিষ্ট নিয়মে জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়ে যে জেনেটিক কোড তৈরি করে, তা-ই নির্ধারণ করে একটি জীবের সব শারীরিক বৈশিষ্ট্য।

বিজ্ঞান থেকে ফরেনসিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর

১৯৫৩ সালের আবিষ্কারের পর কয়েক দশকের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, প্রতিটি মানুষের ডিএনএ গঠন—অভিন্ন যমজ ছাড়া—সম্পূর্ণ অনন্য। এই আবিষ্কারই পরবর্তীতে ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। বিশ্বজুড়ে ডিএনএ প্রযুক্তি এখন তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়—পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব নির্ধারণ, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং বংশগত রোগের পূর্বাভাস। লালা, রক্ত, চুলের গোড়া বা এমনকি ব্যবহৃত টুথব্রাশ থেকেও সংগৃহীত নমুনা দিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রায় নিশ্চিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয়।

বাংলাদেশে ডিএনএ টেস্টের আইনি কাঠামো

বাংলাদেশে সাধারণ ডিএনএ টেস্ট ও আদালতে গ্রহণযোগ্য আইনি ডিএনএ টেস্টের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০১৪ সালে প্রণীত ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইনের মাধ্যমে এই পুরো প্রক্রিয়াকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়। এই আইনি কাঠামোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিম্নরূপ:

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, মামলায় পর্যাপ্ত আইনগত ভিত্তি না থাকলে কাউকে জোরপূর্বক ডিএনএ পরীক্ষায় বাধ্য করা যায় না—আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স ছাড়া এই পরীক্ষা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। এছাড়া নমুনা সংগ্রহ থেকে পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত নথি সংরক্ষণ করতে হয়, যাতে কোনো পক্ষ প্রমাণ পরিবর্তনের সুযোগ না পায়—ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “চেইন অব কাস্টডি”। সাধারণ বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিবেদন আদালতে সরাসরি গ্রহণযোগ্য নয়; বরং আইনি প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয় নির্দিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানে, যেমন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরি বা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে।

কোথায় কোথায় প্রয়োগ হয় আইনি ডিএনএ টেস্ট

বাংলাদেশে আদালতের মাধ্যমে ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ সাধারণত তিন ধরনের মামলায় দেখা যায়—সন্তানের বাবা-মা নির্ধারণ সংক্রান্ত পারিবারিক বিরোধ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার মামলায়, ধর্ষণ বা হত্যার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে অপরাধী শনাক্ত বা নিরপরাধ ব্যক্তিকে অভিযোগমুক্ত করার ক্ষেত্রে, এবং যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশে অভিবাসনের সময় পারিবারিক সম্পর্ক প্রমাণের প্রয়োজনে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরীক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং প্রাপ্তবয়স্কের সম্মতি বা অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে অভিভাবকের লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক।

বিজ্ঞান ও ন্যায়বিচারের মিলনবিন্দু

ডিএনএর এই যাত্রা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয়—কোনো মৌলিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কখনো কখনো তার নিজের সময়ের চেয়ে অনেক দূরের ভবিষ্যতের সমাজ ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে। ফ্রেডরিখ মিশার যখন ১৮৬৯ সালে পুঁজকোষ থেকে এক অজানা পদার্থ পৃথক করেছিলেন, তখন তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে দেড়শ বছর পর এই আবিষ্কারই বাংলাদেশের মতো দেশের আদালতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

উপসংহার

ডিএনএর বৈজ্ঞানিক ইতিহাস এবং বাংলাদেশে এর আইনি প্রয়োগ—দুটোই দেখায় কীভাবে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ হয়ে ওঠে। তবে প্রযুক্তির এই ক্ষমতা যতটা শক্তিশালী, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এর সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার—যা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো প্রতিনিয়ত পরিমার্জিত হচ্ছে, যাতে বিজ্ঞানের এই শক্তিশালী হাতিয়ার ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করে, কোনো পক্ষের অপব্যবহারের হাতিয়ারে পরিণত না হয়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ