ফটোগ্রাফি

নাইলন শাড়ি আর ফাউন্টেন পেন: আজও কেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী উত্তম-সুচিত্রা জুটি?
উত্তম-সুচিত্রা

নিউজ ডেস্ক

January 30, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিনোদন ডেস্ক: ‘নাইলন শাড়ি, ফাউন্টেন পেন উত্তম কুমারের পকেটে সুচিত্রা সেন’

অজ্ঞাত কবির এই দুই লাইনের অনুকবিতাটি আজও বাঙালির নস্টালজিয়াকে উসকে দেয়। ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে, যেখানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আর সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা, সেখানেও ‘রোমান্টিক জুটি’ বললেই কেন অবধারিতভাবে এই দুটি নামই সবার আগে আসে? উত্তরটি সহজ—বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন ছিলেন ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’।

৫০ দশকের বিপ্লব ও রূপোলি পর্দার রসায়ন

বাংলার সিনেমার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৯০০ সালের শুরু থেকে থিয়েটার নির্ভর অভিনয়ের যে চল ছিল, তাকে ভেঙে ১৯৫০-এর দশকে সিনেমার রোমান্টিসিজমে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন এই জুটি। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দিয়ে যে যাত্রার শুরু, তা ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। দীর্ঘ এই তিন দশকে তারা একসাথে ৩৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

সপ্তপদীর সেই চিরন্তন দৃশ্য

সিনেমা বিশেষজ্ঞ ও দর্শকদের স্মৃতিতে আজও অমলিন ‘সপ্তপদী’র সেই বিখ্যাত দৃশ্য। সুচিত্রার মুখে বারবার উড়ে আসা চুলগুলো উত্তম কুমারের সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা এবং শেষে সুচিত্রার ঠোঁটের ফাঁকে চুলটি পুরে ফেলা—এমন নান্দনিক ও স্বাভাবিক দৃশ্য আজও বিরল। কৃষ্ণেন্দু আর রিনা ব্রাউনের সেই সংলাপ, ঘাসের ডগা দিয়ে উত্তমের ঠোঁটে সুচিত্রার আলতো ছোঁয়া—যৌবন ও প্রেমের এক অকল্পনীয় মুহূর্ত তৈরি করত পর্দা জুড়ে।

সেন্সর আর পর্দার আড়ালের বন্ধুত্ব

তৎকালীন দেশের সেন্সর বোর্ডের কঠোরতা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই জুটিকে কখনও বড় পর্দায় চুম্বনরত অবস্থায় দেখা যায়নি। তবে তাদের রসায়ন ছিল এতটাই প্রগাঢ় যে, কোনো শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ছাড়াই তারা দর্শকদের মনে উত্তেজনার ঢেউ তুলতেন। শোনা যায়, ব্যক্তিগত জীবনেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল কিংবদন্তি সমতুল্য। সুচিত্রা সেন কখনও কখনও কৌতুক করে উত্তমকে ফোন করে বলতেন, “তোকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।” তবে সেই সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার। স্বয়ং উত্তম কুমার স্বীকার করেছিলেন, “সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই উত্তম কুমার হতে পারতাম না।”

১৯০০ থেকে ২০২৬: একটি বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপট

১৯০০ সালের শুরুর দিকে যখন নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ ছিল, তখন থেকে আজ ২০২৬ সালের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত হাই-ডেফিনিশন সিনেমা পর্যন্ত—বাঙালি দর্শকদের রুচি অনেক বদলেছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ কিংবা ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতিতে যে স্বকীয়তা তৈরি হয়েছিল, তারই চূড়ান্ত ফসল ছিল এই জুটি।

আজকের ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও যখন আমরা নতুন কোনো জুটির মাদকতা খুঁজি, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে হয়। উত্তম কুমার প্রয়াত হয়েছেন ৩৮ বছরের বেশি সময় আগে, আর সুচিত্রা সেন ২০১৪ সালে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের অমর সৃষ্টিগুলো আজও ইউটিউব এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে নতুন প্রজন্মের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।

উপসংহার

উত্তম-সুচিত্রা জুটি শুধু একটি সিনেমার জুটি নয়, এটি একটি যুগের প্রতীক। তারা জানতেন কীভাবে রোমান্টিক বাতাবরণ তৈরি করতে হয়। আজও বর্ষার দুপুরে বা নির্জন সন্ধ্যায় বাঙালির ঘরে যখন বেজে ওঠে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, তখন মনে হয় সময় যেন থমকে আছে সেই সাদা-কালো যুগেই।


সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা আর্কাইভ, উত্তম কুমারের সাক্ষাৎকার (১৯৭৮), চলচ্চিত্র বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন (যুগান্তর ও বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

বিশ্লেষণ: এই নিবন্ধটি মূলত উত্তম-সুচিত্রা জুটির চিরকালীন জনপ্রিয়তার মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো অনুসন্ধান করেছে। ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাঝেও কেন এই জুটি এখনো শাশ্বত, তা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শীতে

নিউজ ডেস্ক

November 7, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৭ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: লাইফ স্টাইল (ভ্রমণ)
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন (Bangladesh Parjatan Corporation), ট্রাভেল গ্রুপস রিভিউ এবং লোকাল ব্যাকপ্যাকার্স কমিউনিটি ডাটাবেস 

শীতের মিষ্টি রোদ আর হালকা ঠান্ডা আবহাওয়া ভ্রমণের জন্য বছরের সবচেয়ে সেরা সময়। এই সময়ে অনেকেই দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমি কাটাতে কোথাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা করেন। তবে ভ্রমণ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় অঙ্কের বাজেট। কিন্তু আমাদের সুন্দর বাংলাদেশে এমন কিছু চমৎকার জায়গা রয়েছে যেখানে খুব কম খরচেই শীতের সৌন্দর্য সম্পূর্ণ উপভোগ করা সম্ভব। গুগলের ২০২৬ সালের বাজেট ট্রাভেল নির্দেশিকা এবং বর্তমান যাতায়াত খরচের ওপর ভিত্তি করে শীতে বাংলাদেশে ঘোরার মতো ৫টি সেরা ও কম খরচের জায়গা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো: 

১. শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) – চায়ের দেশে কুয়াশা মোড়ানো সকাল
শীতকালে শ্রীমঙ্গলের রূপ অনন্য হয়ে ওঠে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ চা বাগান, লেবু বাগান এবং আনারস বাগানের ওপর যখন সকালের ঘন কুয়াশা চাদর বিছিয়ে দেয়, সেই দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। 

  • মূল আকর্ষণ: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাইক্কা বিল (শীতের যাযাবর পাখি দেখার সেরা জায়গা), মাধবপুর লেক এবং নীলকণ্ঠ টি কেবিনের ৭ রঙের চা। 
  • কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা বা যেকোনো প্রান্ত থেকে লোকাল বা আন্তঃনগর ট্রেনে সরাসরি শ্রীমঙ্গল চলে যান। ট্রেনের টিকিট কাটলে যাতায়াত খরচ অনেক কমে যায়। শ্রীমঙ্গল শহরে সাধারণ কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অনেক বাজেট হোটেল বা ডরমিটরি রয়েছে যেখানে ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যে রাত্রিযাপন করা সম্ভব। বাগানের আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর জন্য লোকাল অটো রিকশা বা সিএনজি শেয়ার করে নিলে খরচ একদম নামমাত্র হবে। 

২. টাঙ্গুয়ার হাওর (সুনামগঞ্জ) – হাউসবোটে শীতের স্নিগ্ধতা


বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর সাগরের মতো রূপ নিলেও, শীতে এর জল কমতে শুরু করে এবং চারপাশ শান্ত স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। এই সময়ে সাইবেরিয়া থেকে আসা হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে পুরো হাওর। কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানির নিচে জলজ উদ্ভিদ দেখার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা মেলে এই শীতে। 

  • মূল আকর্ষণ: অতিথি পাখি, টেকেরঘাট শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি লেক), বারিক্কা টিলা এবং জাদুকাটা নদী। 
  • কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জের নন-এসি বাস ভাড়া সাধারণ সাশ্রয়ী। সুনামগঞ্জ সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে ট্রলার বা লোকাল লাইফ বোট শেয়ার করে টাঙ্গুয়ার হাওর ও নীলাদ্রি লেক ঘুরে আসা যায়। কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রুপ করে গেলে বড় হাউসবোটের বদলে মাঝারি সাইজের সাধারণ নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করলে জনপ্রতি খরচ ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে থাকা-খাওয়াসহ সম্পূর্ণ ট্যুর শেষ করা সম্ভব। 

৩. কক্সবাজার (মেরিন ড্রাইভ ও ইনানী) – সাশ্রয়ী উপায়ে সমুদ্র বিলাস
শীতকালে কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকলেও একটু বুদ্ধি খাটালে খুব কম খরচে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত উপভোগ করা সম্ভব। শীতের শান্ত সমুদ্র এবং কুয়াশাচ্ছন্ন মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা। 

  • মূল আকর্ষণ: সুগন্ধা ও লাবণী বিচ, হিমছড়ি ঝরনা, ইনানী পাথুরে সৈকত এবং পাটুয়ারটেক। 
  • কম খরচে ঘোরার উপায়: মূল সিজন হওয়ায় প্রধান বিচ সংলগ্ন হোটেলের ভাড়া বেশি থাকে। তবে সুগন্ধা বা কলাতলী মোড়ের মেইন রোড থেকে একটু ভেতরের দিকের গলির হোটেলগুলোতে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে রুম পাওয়া যায়। কলাতলী থেকে ইনানী বা হিমছড়ি যাওয়ার জন্য জিপ বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ না করে লোকাল ইজি বাইক (টমটম) বা শেয়ার্ড সিএনজি ব্যবহার করলে যাতায়াত খরচ এক-চতুর্থাংশে নেমে আসবে। এছাড়া খাওয়ার জন্য বড় রেস্টুরেন্ট পরিহার করে লোকাল ‘ভাতের হোটেল’গুলো বেছে নিলে খরচ অনেক বাঁচবে। 

৪. বিরিশিরি (নেত্রকোনা) – চীনামাটির পাহাড় ও সোমেশ্বরী নদী
শীতকালে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরির সৌন্দর্য দেখার মতো হয়। বর্ষার কাদা-মাটি পেরিয়ে শীতে সোমেশ্বরী নদীর পানি একদম শান্ত ও স্বচ্ছ কাঁচের মতো হয়ে যায়। আর চীনামাটির পাহাড়ের হ্রদের হালকা নীল ও সবুজ জল আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। 

  • মূল আকর্ষণ: সাদা ও গোলাপী চীনামাটির পাহাড়, নীল জলের হ্রদ, সোমেশ্বরী নদী এবং কালচারাল একাডেমি। 
  • কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা থেকে সরাসরি দুর্গাপুরের বাস রয়েছে। এছাড়া ট্রেনে করে জারিয়া ঝাঁঝাইল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে লোকাল সিএনজি বা অটোতে খুব সহজে ও কম খরচে বিরিশিরি পৌঁছানো যায়। বিরিশিরি বাজারে এবং জিরো পয়েন্টের আসেপাশে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে সাধারণ লজিং বা বোর্ডিং পাওয়া যায়। পাহাড় ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখার জন্য লোকাল রিকশা বা মোটর সাইকেল শেয়ারিং সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম। 

৫. সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) – পাহাড় ট্র্যাকিং ও শীতের কুয়াশা


যাঁরা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন এবং কম খরচে পাহাড়ের চূড়ায় শীতের কুয়াশা ছুঁতে চান, তাঁদের জন্য সীতাকুণ্ড সেরা চয়েস। শীতের সকালে পাহাড়ি ট্রেইলে হাঁটা এবং চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়া থেকে কুয়াশায় ঢাকা বঙ্গোপসাগর দেখার অনুভূতি অতুলনীয়। 

  • মূল আকর্ষণ: চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির, গুলিয়াখালী বিচ (সবুজ ঘাসের সৈকত), এবং মহামায়া লেক (কায়াকিং করার সুবিধা)। 
  • কম খরচে ঘোরার উপায়: ঢাকা বা অন্য শহর থেকে মেইল ট্রেন বা লোকাল বাসে সরাসরি সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে যাওয়া যায়। সীতাকুণ্ড বাজারে বেশ কিছু সস্তা ও ভালো মানের লোকাল হোটেল রয়েছে যেখানে ১,০০০ টাকার নিচে ডাবল বেডের রুম পাওয়া যায়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার জন্য কোনো গাইডের প্রয়োজন হয় না, ফলে বাড়তি কোনো খরচ নেই। মহামায়া লেক বা গুলিয়াখালী বিচে যাওয়ার জন্য লোকাল লেগুনা বা অটো ব্যবহার করলে যাতায়াত খরচ অনেক কম পড়বে। 


শীতের সিজনে যেকোনো জায়গায় যাওয়ার আগে ট্রেনের বা বাসের টিকিট অন্তত এক সপ্তাহ আগে কেটে রাখুন। গ্রুপ বা বন্ধুদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে ভ্রমণ করলে (Group Tour) থাকা, খাওয়া ও গাড়ি ভাড়ার খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। এছাড়া প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। 

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

রেমিট্যান্স

নিউজ ডেস্ক

October 23, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি ও তথ্যের বিবরণ:বিডিএস বুল্বুল আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন

স্থান: ঢাকা

। তবে কষ্টার্জিত এই অর্থ দেশে পাঠানোর আগে কোন মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এক্সচেঞ্জ রেট, পাঠানোর ফি এবং সরকারি প্রণোদনার সঠিক হিসাব মিলিয়ে টাকা পাঠানোর সেরা মাধ্যমগুলোর বিস্তারিত গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

১. সরকারি প্রণোদনার সুনির্দিষ্ট হিসাব

বৈধ উপায়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠালে প্রবাসীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে:

  • সাধারণ নগদ প্রণোদনা: বাজেট ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, বৈধ পথে আসা রেমিট্যান্সের ওপর পূর্বের ন্যায় ২.৫% সরকারি নগদ প্রণোদনা বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে আড়াই টাকা সরকার অতিরিক্ত প্রদান করে।
  • প্রবাসী কার্ডের অতিরিক্ত সুবিধা: বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ডিজিটাল প্রবাসী কার্ডের আওতায় থাকা কর্মীরা রেমিট্যান্স প্রেরণে ৩% পর্যন্ত নগদ প্রণোদনা উপভোগ করতে পারছেন।
  • ভ্যাট সংক্রান্ত বিভ্রান্তি: প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর ৭.৫% বা ১৫% ভ্যাট কাটার তথ্যটি সম্পূর্ণ একটি গুজব এবং ভিত্তিহীন। প্রবাসীদের কাছ থেকে দেশে টাকা আসার পর কোনো বাড়তি কর কেটে নেওয়া হয় না।

২. টাকা পাঠানোর ৩টি প্রধান মাধ্যম: ফি ও সুবিধা

বাংলাদেশে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর মাধ্যমগুলোকে প্রধানত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়:

ক. ডিজিটাল মানি ট্রান্সফার অ্যাপস (Wise, Taptap Send, Remitly ইত্যাদি)

সহজ ইন্টারফেস ও দ্রুত লেনদেনের কারণে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রবাসীদের কাছে এগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • ফি ও খরচ: সাধারণত ১% থেকে ১.৫% পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ কাটে। তবে নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক অ্যাপে বড় অঙ্কের লেনদেনে কোনো ফি নেওয়া হয় না বা ফি অত্যন্ত নগণ্য থাকে।
  • এক্সচেঞ্জ রেট: এই অ্যাপগুলো মিড-মার্কেট রেটের খুব কাছাকাছি এক্সচেঞ্জ রেট প্রদান করে, যা প্রবাসীদের জন্য বেশ লাভজনক।
  • টাকা পৌঁছানোর সময়: ইনস্ট্যান্ট বা সর্বোচ্চ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ওয়ালেটে টাকা চলে যায়।

খ. মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস (bKash, Nagad)

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা পরিবারের কাছে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অর্গানাইজেশন (MTO) ও বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউজের পার্টনারশিপের মাধ্যমে সরাসরি প্রবাসী অ্যাপ থেকে দেশে এমএফএস ওয়ালেটে টাকা পাঠানো যায়।

  • ফি ও খরচ: কাতার, ইতালি, ওমান ও যুক্তরাজ্যের মতো কিছু দেশ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক কারণে পাঠানোর খরচ গড়ে ১.২০% থেকে ১.৪৫% পর্যন্ত উন্নীত হলেও সৌদি আরব, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানোর খরচ তুলনামূলক কম।
  • সুবিধা: সরাসরি মোবাইল নম্বরে টাকা চলে আসায় ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা থাকে না। এছাড়া মূল টাকার সাথে সরকারি ২.৫% প্রণোদনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ হয়ে যায়।
  • ক্যাশ আউট সুবিধা: রেমিট্যান্সের টাকা তোলার ক্ষেত্রে পার্টনার ব্যাংকগুলোর এটিএম (ATM) বুথ থেকে প্রতি হাজারে মাত্র ৭ টাকা খরচে ক্যাশ আউট করার বিশেষ সুযোগ পাওয়া যায়।

গ. প্রথাগত ব্যাংকিং চ্যানেল (অনলাইন রেমিট্যান্স অ্যাকাউন্ট ও সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার)

বড় অঙ্কের অর্থ কিংবা স্থায়ী সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে ব্যাংকিং চ্যানেল সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম। বর্তমানে এনআরবি (NRB) অ্যাকাউন্ট বা বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশ থেকেই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।

  • ফি ও খরচ: সরাসরি ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফারে একটি নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট ফি (যেমন: ১০ থেকে ২০ ডলার/ইউরো/রিয়াল) কাটা হতে পারে। তবে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর বিশেষ অফারে অনেক সময় জিরো ফি সুবিধা পাওয়া যায়।
  • এক্সচেঞ্জ রেট: বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঘোষিত অফিশিয়াল রেট অনুযায়ী হিসাব করা হয়।
  • টাকা পৌঁছানোর সময়: সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে টাকা পাঠালে তাৎক্ষণিক ক্রেডিট হয়, তবে অন্য ব্যাংকের ক্ষেত্রে BEFTN বা ক্লিয়ারিং সিস্টেমের কারণে ১ থেকে ২ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে।

৩. সেরা মাধ্যম নির্বাচনের তুলনামূলক ছক

ফিচারের ধরণডিজিটাল অ্যাপস (Wise / Taptap)মোবাইল ব্যাংকিং (bKash / Nagad)প্রথাগত কমার্শিয়াল ব্যাংক
অর্থ স্থানান্তরের সময়দ্রুত (কয়েক মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা)তাৎক্ষণিক (২৪/৭ ইনস্ট্যান্ট)১ থেকে ২ কার্যদিবস (অন্য ব্যাংক হলে)
এক্সচেঞ্জ রেট সুবিধাচমৎকার ও প্রতিযোগিতামূলকভালো (মার্কেট রেট অনুযায়ী)ব্যাংক ও দিনভেদে কিছুটা কম-বেশি হয়
লুকানো চার্জ বা ফিঅত্যন্ত কমকম থেকে মাঝারিবড় অঙ্কে সাশ্রয়ী, ছোট অঙ্কে ফ্ল্যাট ফি
কাদের জন্য উপযুক্তযারা স্মার্টফোন ব্যবহার করে সেরা এক্সচেঞ্জ রেট চান।গ্রামে থাকা পরিবারের জরুরি খরচের জন্য ছোট অঙ্কের অর্থ পাঠাতে।জায়গা-জমি কেনা, ফিক্সড ডিপোজিট বা বড় অঙ্কের পারিবারিক সঞ্চয়ের জন্য।

প্রবাসী রেমিট্যান্স প্রেরকদের জন্য ৩টি গুরুত্বপূর্ণ টিপস:

  1. এক্সেঞ্জ রেট ও ফি-র সমন্বয় দেখুন: অনেক সময় কোনো মাধ্যম ফি জিরো দেখালেও এক্সচেঞ্জ রেট কিছুটা কমিয়ে দেয়। তাই টাকা পাঠানোর সময় ফাইনাল পে-আউট অ্যামাউন্ট (সব ফি কাটার পর দেশে প্রাপক মোট কত টাকা পাবেন) তুলনা করে নিন।
  2. ছুটির দিন হিসাব করুন: ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্রবার ও শনিবার) এবং আপনার অবস্থানরত দেশের ছুটির দিনটি হিসাব করে টাকা পাঠান, যেন জরুরি সময়ে অর্থ আটকে না থাকে।
  3. এনআরবি বন্ড ও সঞ্চয়পত্র: আপনি যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে বড় অঙ্কের টাকা পাঠান, তবে সেই অর্থ দিয়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড বা ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন, যা সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বেশি মুনাফা নিশ্চিত করে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মনোহর আইচ রুটিন,

নিউজ ডেস্ক

October 15, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ক্রীড়ার ইতিহাস, ফিটনেস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
  • প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): NABBA World Bodybuilding Archives, Indian Bodybuilding Records, এবং Historic Sport Chronicles.

বাঙালির শৌর্য, বীরত্ব এবং শারীরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেই যাঁদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ এবং মনতোষ রায় অন্যতম। প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের ও ব্রিটিশ ভারতের পতাকা উড়িয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় মনোবল থাকলে উচ্চতা বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের অন্তরায় হতে পারে না।

১. বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের শরীরচর্চার রুটিন (Workout Routine)

মনোহর আইচ (১৭ মার্চ ১৯১২ – ৫ জুন ২০১৬), যিনি তার মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং অবিশ্বাস্য পেশীবহুল শরীরের জন্য বিশ্বজুড়ে “পকেট হারকিউলিস” (Pocket Hercules) নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, ১৯৫২ সালে ভারতের জন্য দ্বিতীয় মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) শিরোপা জয় করেন। ১০৪ বছর বছর বাঁচার পেছনে তার কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, স্টেরয়েড ও সাপ্লিমেন্টমুক্ত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শরীরচর্চার রুটিন এবং সাধারণ জীবনযাত্রা আজীবন অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

তার শরীরচর্চার রুটিন এবং দৈনন্দিন লাইফস্টাইলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. প্রাথমিক জীবন ও জেলখানার কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম (ক্যালিস্থেনিক্স)

  • ১২ বছর বয়সে শুরু: শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মনোহর আইচের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। নিজের শক্তি ফিরে পেতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি পুশ-আপ, স্কোয়াট, পুল-আপ, লেগ রেইজ এবং সিট-আপের মতো বডিওয়েট ব্যায়াম শুরু করেন। ওই বয়সেই তিনি প্রতি সেটে প্রায় ১০০টি করে রেপস (Reps) দিতে পারতেন。
  • কারাগারে ১২ ঘণ্টার সাধনা: ১৯৪২ সালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেওয়ার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়। কারাগারে কোনো জিমের সরঞ্জাম বা ওজন (Weights) ছিল না। সেখানে তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড এবং ক্যালিস্থেনিক্স ব্যায়াম করতেন, যা তার শরীরের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

২. পাওয়ার বডিবিল্ডিং ও জিমের রুটিন (যৌবন ও প্রতিযোগিতার সময়)

পরবর্তীতে যখন তিনি পুরোদমে ওয়েট ট্রেনিং শুরু করেন, তখন আধুনিক জটিল মেশিনের চেয়ে প্রাচীন ভারতীয় ব্যায়ামপদ্ধতি এবং ভারী ‘কম্পাউন্ড এক্সারসাইজ’-এর ওপর জোর দিতেন।

  • সকালের ওয়ার্কআউট: তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে টানা ৯০ মিনিট শরীরচর্চা করতেন।
  • প্রিয় ব্যায়ামসমূহ: তিনি পূর্ণাঙ্গ বডি ওয়ার্কআউটের অনুসারী ছিলেন। তার মূল রুটিনে থাকত ভারী স্কোয়াট (Squats), ডন-বৈঠক (Push-ups & Squats), বেঞ্চ প্রেস (Bench Press), ওভারহেড শোল্ডার প্রেস (Overhead Press), বারবেল রো (Barbell Rows), এবং বারবেল কার্ল (Barbell Curls)।
  • পাওয়ার স্টান্টের প্রস্তুতি: দাঁত দিয়ে স্টিল বাঁকানো, তরবারির ডগায় পেট ঠেকিয়ে রাখা কিংবা বুক দিয়ে লোহার রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য সব স্টান্ট প্রদর্শনের জন্য তিনি ঘাড় ও কোর মাসল মজবুত করার বিশেষ ব্যায়াম করতেন।

৩. শেষ বয়সের রক্ষণাবেক্ষণ রুটিন (Maintenance Schedule)

  • বয়স ৯০ পার হওয়ার পরও তিনি ব্যায়াম করা থামাননি। তবে শেষের দিকে হৃদযন্ত্রের মৃদু সমস্যার কারণে তিনি ভারী ওজন তোলা বন্ধ করে দেন।
  • শেষ বয়সে তিনি কেবল শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে হালকা ওজনের ডাম্বেল এবং বেশি রেপসের ৬ থেকে ৭টি ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতেন। এমনকি ১০০ বছর পার করার পরও তিনি তার জিমের ছাত্রদের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যায়াম শেখাতেন।

ডায়েট ও লাইফস্টাইল: দীর্ঘায়ুর গোপন চাবিকাঠি

মনোহর আইচ কোনো আধুনিক প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার করেননি। তার সুস্থ ১০৪ বছর বাঁচার মূল রহস্য ছিল খাঁটি বাঙালি খাবার:

  • খাদ্যাভ্যাস: সকালের নাস্তায় দুধ, চিঁড়ে এবং কফি। দুপুরে ও রাতে একদম সাধারণ ভাত, ডাল, নানা রকম তরকারি এবং টাটকা মাছের ঝোল। এছাড়া তার খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে দুধ, ফলমূল (আম, কাঁঠাল, ডাব) এবং শাকসবজি থাকত।
  • নেশামুক্তি: তিনি জীবনে কখনো মদ্যপান বা ধূমপান করেননি।
  • মানসিক প্রশান্তি: তিনি সবসময় বলতেন, “আমি কখনোই কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিই না। তরুণ বয়স থেকে উপার্জনের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি সবসময় হাসিখুশি থেকেছি।”

২. এশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স: মনতোষ রায়

মনতোষ রায় (২১ অক্টোবর ১৯১৭ – ২৯ জুন ২০০৫) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি বডিবিল্ডার বা শরীরচর্চাবিদ, যিনিএশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) খেতাব অর্জনের গৌরব লাভ করেন। ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় তিনি “গ্রুপ ৩ অ্যামেচার” (শর্ট মেন ডিভিশন) বিভাগে এই বিশ্বসেরা শিরোপা জয় করেছিলেন।

তার জীবন ও কীর্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রারম্ভিক জীবন ও সাধনা

  • জন্ম: ১৯১৭ সালের ২১শে অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী গজারিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
  • শৈশব ও সংগ্রাম: চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া মনতোষ রায় মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শরীরচর্চা শুরু করেন।
  • গুরু: তিনি বিখ্যাত বডিবিল্ডার এবং যোগগুরু বিষ্ণুচরণ ঘোষের (মহর্ষি পরমহংস যোগানন্দের ছোট ভাই) শিষ্য ছিলেন। গুরুর ছবি সামনে রেখে দ্রোণাচার্যের একলব্যের মতো নিষ্ঠা নিয়ে তিনি প্রথম দিকে ব্যায়াম সাধনা চালিয়ে যেতেন।

বডিবিল্ডিং ক্যারিয়ার ও সাফল্য

  • ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রতিযোগিতায় নেমে সফল না হলেও তিনি দমে যাননি, বরং অনুশীলনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন।
  • ১৯৪২ সালে তিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ জয় করেন।
  • মিস্টার ইউনিভার্স জয় (১৯৫১): লন্ডনের মঞ্চে তার সুগঠিত ও নান্দনিক শরীর দেখে দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষ করে তার ‘যীশু খ্রিস্ট’ পোজের (Jesus Christ posing routine) প্রদর্শনীটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতিযোগিতা শেষে তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত।

অবদান ও পরবর্তী জীবন

  • মিস্টার ইউনিভার্স জেতার পর ভারতে ফিরে তিনি ‘ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং ফেডারেশন’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
  • তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল কলেজে আইন বিভাগে শরীরচর্চা ও যোগব্যায়ামের শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তিনি শরীরচর্চার ওপর বইও লিখেছেন।
  • খালি হাতে স্টিলের রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
  • তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মলয় রায় (যিনি নিজে ৮ বারের মিস্টার ইন্ডিয়া এবং অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বডিবিল্ডার) পিতার প্রতিষ্ঠিত মাল্টিজিমটি পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, মলয় রায়কে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রে কাশীর হোটেলের সেই ব্যায়ামবীরের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল।

২০০৫ সালের ২৯শে জুন কলকাতার একটি নার্সিং হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৮ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

৩. বাংলার শক্তিচর্চার আরেক রত্ন: গোবর গোহ

গোবর গোহ (জন্মনাম: যতীন চরণ গুহ; ১৩ মার্চ ১৮৯২ – ২ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলার শক্তিচর্চা ও কুস্তির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। ১৯২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলকে (Ad Santel) পরাজিত করে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে বিশ্ব পেশাদার কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ (World Light Heavyweight Championship) জয়ের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।

শরীরচর্চা ও কুস্তির ক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঐতিহ্য, অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা এবং অবদান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

পারিবারিক ঐতিহ্য ও হাতেখড়ি

  • কুস্তিগীর পরিবার: গোবর গোহ জন্মসূত্রে কলকাতার এক বিখ্যাত কুস্তিগীর পরিবারে এসেছিলেন। তার ঠাকুরদাদা আম্বিকা চরণ গুহ (অম্বু বাবু) ছিলেন বাংলার কুস্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, যার আখড়ায় নামী-দামী সব কুস্তিগীর তৈরি হতেন।
  • প্রশিক্ষণ: শৈশবেই নিজের কাকা এবং তৎকালীন ভারতের অন্যতম সেরা কুস্তিগীর ক্ষেত্রচরণ গুহের কাছ থেকে তিনি কুস্তির প্রাথমিক পাঠ নেন। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত কুস্তিগীর রহমানী পালোয়ানের কাছেও তালিম নেন।

কুস্তি ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক সাফল্য

  • ইউরোপ সফর (১৯১০-১৯১৩): মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সেখানে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার সেরা কুস্তিগীরদের পরাজিত করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। ১৯১৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জর্জ হ্যাকেনস্মিডকে (George Hackenschmidt) কুস্তির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন।
  • বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা (১৯২১): ১৯২০ সালে তিনি পুনরায় ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে যান। ১৯২১ সালের ৩০ আগস্ট সান ফ্রান্সিসকোতে তৎকালীন ওয়ার্ল্ড লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলের মুখোমুখি হন গোবর গোহ। ১ ঘণ্টা ৩ মিনিট স্থায়ী এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর তিনি স্যানটেলকে পরাস্ত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের বেল্ট নিজের করে নেন।
  • শারীরিক গঠন: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং প্রায় ১২০ কেজি ওজনের গোবর গোহের সুগঠিত শরীর ও পেশীর সঞ্চালনা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

কুস্তির নিজস্ব শৈলী ও অবদান

  • ‘গোহ স্টাইল’ উদ্ভাবন: তিনি ভারতীয় কুস্তির ঐতিহ্যবাহী কৌশলগুলোর সাথে পশ্চিমা ‘ক্যাচ-অ্যাস-ক্যাচ-ক্যান’ (Catch-as-catch-can) ও গ্রেকো-রোমান শৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়ে কুস্তির একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেন, যা কুস্তি মহলে ‘গোহ স্টাইল’ নামে পরিচিত ছিল।
  • আখড়া প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি: ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতার হেদুয়ার কাছে (গোয়াবাগান এলাকায়) নিজের পারিবারিক আখড়াটি নতুন রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ ‘গোবর গুহ’স জিমনেসিয়াম’ নামে পরিচিত। তার এই আখড়া থেকেই তৈরি হয়েছিলেন ভারতের বহু নামী কুস্তিগীর এবং পরবর্তীতে অলিম্পিয়ানরা।

কুস্তির পাশাপাশি তিনি ফুটবল এবং সংগীতের দারুণ অনুরাগী ছিলেন। বাংলার যুবসমাজকে শক্তিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পেছনে এই বীর কুস্তিগীরের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি এই মহান ক্রীড়াবিদ কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সংক্ষেপিত পর্যালোচনা

মনোহর আইচ, মনতোষ রায় এবং গোবর গোহ—এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক সুস্থতা, অদম্য ইচ্ছা এবং সঠিক শৃঙ্খলার কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিও হার মানে। তাঁদের বর্ণাঢ্য জীবন ও প্রাকৃতিক শরীরচর্চার পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ফিটনেস প্রেমীদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৩শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ