আন্তর্জাতিক

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ: নীরব ইসলামাবাদ, দিল্লি ও ঢাকার টানাপোড়েন – নেপথ্যের জটিল সমীকরণ
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড

নিউজ ডেস্ক

November 22, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ

১. সূচনালগ্ন: মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘিরে আঞ্চলিক রাজনীতি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ নিয়ে অবশেষে মুখ খুলল পাকিস্তান। এই সংবেদনশীল বিচারিক রায়কে ইসলামাবাদ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে আখ্যা দিয়ে কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখল। এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন রায় কার্যকর করার জন্য তাঁকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণের দাবি ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক চাপান-উতোর চলছে। এই ঘটনাপ্রবাহ ১৯৫০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায়, যেখানে একজন সাবেক সরকারপ্রধান মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ দণ্ড পেলেন।

২. পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক অবস্থান: কৌশলগত দূরত্ব

শুক্রবার (২১ নভেম্বর ২০২৫) সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।

  • উক্তি ও তারিখ: তাহির আন্দরাবি (২১ নভেম্বর ২০২৫) বলেন, “এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।” (সূত্র: দ্য ডন)
  • বিশ্লেষণ: এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, পাকিস্তান এই জটিল পরিস্থিতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাইছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেকোনো হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার এই নীতি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়।

৩. রায় ও প্রত্যর্পণ সংকট: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মোড়

গত সোমবার (১৭ নভেম্বর ২০২৫) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধে পলাতক শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। অভিযোগ ছিল, গত বছর (২০২৪) ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে হওয়া জুলাই আন্দোলন দমনে তিনি প্রাণঘাতী হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তারিখসমূহ:

  • রায়ের তারিখ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ (সোমবার)।
  • অপরাধ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন, যার মধ্যে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর নির্দেশ অন্যতম।
  • পলায়ন: ১৫ মাস আগে ছাত্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন।

প্রত্যর্পণ বিতর্ক (Relink: হাসিনাকে ফেরাতে ভারতকে কি বাধ্য করা যাবে):

রায়ের পরপরই বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফেরত চেয়ে ভারতের প্রতি আহ্বান জানায়।

  • বাংলাদেশের দাবি: বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিকে চিঠি দিয়ে জানায় যে, দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের বাধ্যবাধকতা। তাঁকে ফেরত না পাঠানো হলে তা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অবমাননা এবং অবন্ধুসুলভ আচরণ হিসেবে গণ্য হবে। (সূত্র: ১৭ নভেম্বর ২০২৫)
  • ভারতের প্রতিক্রিয়া: ভারত এই রায়টিকে ‘নজরে এসেছে’ (Noted) বলে মন্তব্য করে। দিল্লি এখনো হাসিনাকে ফেরত দিতে রাজি হয়নি। তারা কেবল বাংলাদেশের জনগণের ‘শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার’ পক্ষে গঠনমূলকভাবে কাজ করার বার্তা দিয়েছে। (সূত্র: ১৭ নভেম্বর ২০২৫)
  • রাজনৈতিক চাপান-উতোর (Relink: ভারত এখনো হাসিনাকে আশ্রয় দিলে তা হবে ‘শত্রুভাবাপন্ন কাজ’): জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া ‘শত্রুভাবাপন্ন কাজ’ হবে। (সূত্র: ১৭ নভেম্বর ২০২৫)

৪. দেশের অভ্যন্তরে প্রতিক্রিয়ার চিত্র: প্রত্যাশিত রায় ও জনতার উল্লাস

শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বক্তা/সংস্থামন্তব্যের মূল বিষয়বস্তুতারিখ ও প্রসঙ্গ
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসক্ষমতাচ্যুতদের দণ্ডাদেশ প্রমাণ করেছে যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়১৭ নভেম্বর ২০২৫
শহীদ ওয়াসিমের মা জোসনা বেগমছেলেকে হারানোর পর শান্তি পাচ্ছি।১৮ নভেম্বর ২০২৫
বিএনপিরায়টি শুধু হাসিনার অপরাধের বিচার নয়, স্বৈরশাসনের কবর১৭ নভেম্বর ২০২৫
চিফ প্রসিকিউটর তাজুলরায়টি অতীতের প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা।১৭ নভেম্বর ২০২৫
ডাকসু এজিএসরায় ঘোষণার পর কাদের মোল্লার সেই চিঠি শেয়ার করেন, যা ‘অবিচার থেকে বিচার’কে ইঙ্গিত করে।১৭ নভেম্বর ২০২৫
এনসিপিএক মাসের মধ্যে ফাঁসি কার্যকরের দাবি এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি।১৮ নভেম্বর ২০২৫
গণসংহতি আন্দোলনরায়টিকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ।১৭ নভেম্বর ২০২৫

ঐতিহাসিক নজির (Relink: ভবিষ্যতে কেউ হাসিনা হয়ে উঠার চেষ্টা করবেন না): বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যেন হাসিনা হয়ে উঠার চেষ্টা না করেন এবং তাঁর পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এই রায়টি ভবিষ্যতের শাসকদের জন্য একটি নজির স্থাপন করেছে বলে বিশিষ্টজনরা মনে করেন। (সূত্র: ১৭ নভেম্বর ২০২৫)

৫. উপসংহার: একবিংশ শতাব্দীর পথে বাংলাদেশের রাজনীতি

১৯৫০ সাল থেকে ২০২৫ সালের এই দীর্ঘ পথচলায় বাংলাদেশ বারবার স্বৈরাচারের পতন ও গণতন্ত্রের উত্থান দেখেছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশের এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিচারিক রায়গুলোর মধ্যে অন্যতম। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মন্তব্য ও অবস্থান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই রায় এবং প্রত্যর্পণ বিতর্ক দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

মুসলিম উম্মাহর সংকট

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং শান্তির ধর্ম। একজন মুসলিম হিসেবে আমরা আমাদের পরিচয় নিয়ে গর্বিত। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জিত ও ব্যর্থ মনে হয়। ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হলো।

১. ইসলামের অপব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বর্তমানে ইসলামকে যার যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ‘একাধিক বিবাহ’ নিয়ে যেভাবে অপব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত বিব্রতকর। ইসলামে চার বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর পেছনে যে কঠিন শর্ত ও ইনসাফের (ন্যায়বিচার) বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে অমুসলিম বিশ্ব ও নওমুসলিমদের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, মুসলিম পুরুষ মানেই কেবল একাধিক বিয়ে।

২. আত্মপক্ষ সমর্থনের দায়ভার ও ‘ইসলামোফোবিয়া’

বিশ্বের কোথাও কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার দায়ভার ১.৬ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর এসে পড়ে। অনলাইনে বা অফলাইনে একজন মুসলিমকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘জঙ্গি’ নয়। হিজাব পরিধান করা যে একজন নারীর স্বাধীন ইচ্ছা হতে পারে—এই সহজ সত্যটুকুও আমরা বিশ্বকে বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছি। নিজেদের সঠিক অবস্থান তুলে ধরতে না পারা আমাদের এক বড় ব্যর্থতা।

৩. অনৈক্য ও পরশ্রীকাতরতা

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ প্রকট। রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বড় মানবিক সংকটে যখন কোনো শক্তিশালী মুসলিম দেশ নয়, বরং গাম্বিয়ার মতো একটি ছোট দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করে, তখন আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা অন্যের ভুল খুঁজতে যতটা পটু, নিজেদের সংশোধনে ততটাই উদাসীন।

৪. ভূ-রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা

মুসলিম বিশ্বের তথাকথিত ‘মোড়ল’ রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা অনেক সময় সাধারণ মুসলমানদের ব্যথিত করে। ইয়েমেনের মানবিক বিপর্যয়, ফিলিস্তিন ইস্যুতে রহস্যজনক নীরবতা কিংবা বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ওপর চলা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হওয়া—আমাদের লজ্জিত করে। ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা মুসলিম উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনছে।

৫. দেশপ্রেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনীহা

‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’—এই শিক্ষা ভুলে গিয়ে অনেক মুসলিম দেশ আজ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এছাড়া সোনালী অতীতে বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও দর্শনে মুসলিম মনীষীদের যে কালজয়ী অবদান ছিল, তা আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের আবিষ্কার ও অবদান সম্পর্কে নিজেরাই জানি না, ফলে পশ্চিমাদের চোখে আমরা আজ একটি ‘পিছিয়ে পড়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছি।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ইসলামের সৌন্দর্য তখনই বিকশিত হবে যখন আমাদের কথায় ও কাজে মিল থাকবে। আমরা যদি অন্যের দোষ না খুঁজে নিজেদের চরিত্র ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারি, তবেই আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাওয়া সম্ভব। কেবল ধর্মের গান গেয়ে নয়, বরং ইসলামের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।


এক নজরে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বড় চ্যালেঞ্জসমূহ:

চ্যালেঞ্জবর্তমান অবস্থা
সামাজিকইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার অভাব।
রাজনৈতিকমুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য ও স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি।
সাংস্কৃতিকমিডিয়ার মাধ্যমে ছড়ানো ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় ব্যর্থতা।
শিক্ষাগতআধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমাদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা।

তথ্যসূত্র (Source):

  • আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ: ন্যায়বিচার ও ইনসাফ সংক্রান্ত বিধান।
  • আল জাজিরা ও রয়টার্স: ইয়েমেন ও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিবেদন।
  • বিডিনিউজ২৪: মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সরলা দেবী চৌধুরাণী

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: BDS Bulbul Ahmed

বিভাগ: ইতিহাস ও নারী জাগরণ

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে যখন বাঙালি নারীদের পরিচয় কেবল অন্তঃপুরের আড়ালে সীমাবদ্ধ ছিল, তখন এক নির্ভীক নারী নিজের মেধা, সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র ইতিহাস। তিনি সরলা দেবী চৌধুরাণী—যিনি একাধারে সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ এবং ভারতের প্রথম দিককার নারী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

১. জন্ম ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রভাব

সরলা দেবীর জন্ম ১৮৭২ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা জানকীনাথ ঘোষাল ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং মাতা স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অগ্রজ প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সম্পর্কে কবিগুরু ছিলেন সরলা দেবীর ছোট মামা। ঠাকুরবাড়ির মুক্ত সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আবহে বড় হওয়া সরলা দেবীর জীবনে ‘রবি মামা’র প্রভাব ছিল অপরিসীম।

২. শিক্ষার আলোকবর্তিকা ও ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’

অদম্য মেধাবী সরলা দেবী ১৮৮৬ সালে এন্ট্রান্স পাস করে বেথুন কলেজে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ. পাস করেন। সেই সময় মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তিনি লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘পদ্মাবতী স্বর্ণপদক’। সে আমলের নারীদের জন্য এটি ছিল এক অভাবনীয় মাইলফলক।

৩. স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই ও ‘লক্ষ্মী ভাণ্ডার’

তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের নারীরা জীবিকা অর্জনের কথা চিন্তা না করলেও সরলা দেবী ছিলেন ব্যতিক্রম। পরিবারের অমত সত্ত্বেও তিনি মহীশূরের মহারাণী গার্লস কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্বদেশী পণ্য প্রসারের লক্ষ্যে ১৯০৪ সালে তিনি বৌবাজারে স্থাপন করেন ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’। এটি কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং স্বদেশী আন্দোলনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভ ছিল।

৪. বন্দেমাতরমের সুরকার ও বিপ্লবী চেতনা

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গান ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম স্তবকের সুর দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। এটি তাঁর দেশপ্রেমের এক অনন্য স্বাক্ষর। এছাড়াও যুবকদের আত্মরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ ও ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ পালনের সূচনা করেন। তরবারি চালনা ও লাঠি খেলার প্রচলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালি যুবকদের মধ্যে বীরত্ব জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন।

৫. ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল ও নারী আন্দোলন

১৯১০ সালে এলাহাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এটিই ছিল ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় নারী সংগঠন। দিল্লি, কানপুর, ইলাহাবাদসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর শাখা ছড়িয়ে ছিল, যার মাধ্যমে নারীদের হাতের কাজ ও শিক্ষা বিস্তারের কাজ চলত।

৬. মহাত্মা গান্ধী ও ব্যক্তিগত জীবন

১৯০৫ সালে তিনি বিপ্লবী ও সাংবাদিক রামভুজ দত্ত চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং পাঞ্জাবে চলে যান। সেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সাথে ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষভাগে তিনি বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর কাছে দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক পথে চলে যান।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সরলা দেবী কেবল ঠাকুরবাড়ির একজন নক্ষত্র ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন নারীবাদ ও স্বনির্ভরতার মূর্ত প্রতীক। তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ আজও গবেষকদের কাছে সেই সময়ের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।


এক নজরে সরলা দেবী চৌধুরাণী:

বিষয়তথ্য
জন্ম৯ সেপ্টেম্বর ১৮৭২।
প্রধান পরিচয়সাহিত্যিক, সুরকার ও সমাজ সংস্কারক।
সুরারোপিত গানবন্দেমাতরম (প্রথম স্তবক)।
সংগঠনলক্ষ্মী ভাণ্ডার, ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল।
বিখ্যাত বইজীবনের ঝরাপাতা (আত্মজীবনী), নববর্ষের স্বপ্ন।
মৃত্যু১৮ আগস্ট ১৯৪৫।

তথ্যসূত্র (Source):

  • উইকিপিডিয়া: সরলা দেবী চৌধুরাণী – জীবনী।
  • বাংলাপিডিয়া: চৌধুরানী, সরলাদেবী – জাতীয় জ্ঞানকোষ।
  • অনুশীলন: সরলা দেবী ও ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর

নিউজ ডেস্ক

April 16, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: [BDS Bulbul Ahmed]

বিভাগ: অপরাধ ও রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিতর্কিত নাম লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করা এই ব্যক্তি ক্ষমতার পালাবদলে বারবার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে টিকে ছিলেন। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেরিয়ে আসছে তার অন্ধকার জগতের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল রক্ষীবাহিনীর সদস্য হিসেবে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও ২০০৭ সালের ‘এক-এগারো’র সময় তিনি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। তৎকালীন টাস্ক ফোর্সের প্রধান হিসেবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন এবং ‘ট্রুথ কমিশন’-এর নামে কোটি কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনেকের কাছে তিনি ‘ইন্ডিয়ান পাপেট’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

২. আওয়ামী লীগের ‘ছায়া’ ও রাজনৈতিক সুবিধা

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তিনি ছিলেন সবচাইতে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের একজন। এর পুরস্কারস্বরূপ:

  • কূটনৈতিক পদ: নিয়ম বহির্ভূতভাবে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • সংসদ সদস্য: জাতীয় পার্টির মনোনয়নে ফেনী-৩ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যা মূলত আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতারই অংশ ছিল।

৩. ২৪ হাজার কোটি টাকার সিন্ডিকেট ও মানবপাচার

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় অভিযোগ হলো মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির নামে গড়ে তোলা বিশাল সিন্ডিকেট। দরিদ্র শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এছাড়া ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলাও চলছে।

৪. জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যার অভিযোগ ও গ্রেপ্তার

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ফেনীতে নিজাম হাজারীর সাথে যোগসাজশে ১১ জন নিরীহ শিক্ষার্থীকে হত্যার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় বর্তমানে তার নামে তিনটি হত্যা মামলা বিচারাধীন।

দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর ২৩ মার্চ ২০২৬ গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আদালত তাকে দুই দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে লক্ষ্য করে ডিম ও নোংরা পানি নিক্ষেপ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: ক্ষমতার দাপটে যারা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে এবং রক্তের হোলি খেলায় মেতে ওঠে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের করুণ পরিণতি অনিবার্য। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর এই পতন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।


মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে বর্তমান মামলাসমূহ:

মামলার ধরণসংখ্যা/বিবরণ
হত্যা মামলাজুলাই আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩টি।
মানি লন্ডারিং১০০ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।
মানবপাচারমালয়েশিয়া সিন্ডিকেট ও ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ।
অন্যান্যদুর্নীতি ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা (মোট ১১টি)।

তথ্যসূত্র (Source):

  • প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার: মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও রিমান্ড সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
  • বিডিনিউজ২৪: এক-এগারোর ভূমিকা ও ট্রুথ কমিশন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
  • ফেনী জেলা প্রতিনিধি: জুলাই হত্যাকাণ্ডে দায়েরকৃত মামলার বিবরণী।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৩রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ