আন্তর্জাতিক
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ধর্মের প্রকৃতি এবং এর সমাজে ভূমিকা নিয়ে কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস এর বিশ্লেষণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, ধর্ম কেবল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি, যা শোষণকারী ব্যবস্থাকে বৈধ করার জন্য এবং শোষিতদের দুঃখ আড়াল করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
মার্কসের ধর্ম সম্পর্কে বিশ্লেষণ
কার্ল মার্কস তার “Critique of Hegel’s Philosophy of Right” গ্রন্থে ধর্মকে “মানুষের আফিম” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কসের মতে, ধর্ম নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাস, হৃদয়হীন বিশ্বের অন্তর, এবং আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। এখানে ধর্ম শুধুমাত্র মানুষের দুঃখের প্রতিফলন নয়, বরং একটি ভ্রান্ত সুখ প্রদানকারী ব্যবস্থা, যা মানুষের শোষণ থেকে মুক্তির বদলে তাকে আরো শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। মার্কস মনে করেন, ধর্ম মানুষের আত্মার দাসত্বের প্রতিফলন, এবং এটি মানুষকে তার বাস্তব দুঃখের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উৎসাহিত না করে বরং তাকে শোষিত অবস্থায় রাখে।
মার্কসের মতে, ধর্মের বিলুপ্তি জনগণের প্রকৃত সুখের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, “ধর্মের বিলুপ্তি মানুষের মিথ্যা সুখের অবসান এবং প্রকৃত সুখের দিকে এক সঠিক পদক্ষেপ।”
এঙ্গেলসের ধর্ম সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস মার্কসের মতোই ধর্মকে সামাজিক শ্রেণীসংগ্রামের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তিনি বলেছিলেন, “ধর্মগুরু ও জমিদার একসাথে মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।” এর মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, ধর্ম শোষণকারী শ্রেণীর অবস্থানকে বৈধ করে এবং শোষিত শ্রেণীকে অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে।
এঙ্গেলস আরও বলেছিলেন, “ধর্ম মানুষকে এমন এক উল্টোদৃষ্টির চেতনায় রাখে, কারণ যারা সমাজের বাস্তব শক্তি, তারা ধর্মীয় অনুমোদনের আড়ালে নিজেদের অবস্থান বৈধ করে।”
এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে, এঙ্গেলস ধর্মকে দেখেছেন শোষণ ও শ্রেণীসংগ্রামের এক সামাজিক অস্ত্র হিসেবে, যা শোষিতদের বিদ্রোহকে দমন করতে ব্যবহৃত হয়।
মার্টিন লুথার: মার্কস ও এঙ্গেলসের দৃষ্টিতে
মার্টিন লুথার খ্রিস্টধর্মের সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হলেও মার্কস ও এঙ্গেলস তাকে ধর্মীয় সংস্কারকের পাশাপাশি একটি বিশেষ সামাজিক মুহূর্তের বাহক হিসেবে দেখেন। তারা উল্লেখ করেন যে লুথার, বাইবেলকে সাধারণ জনগণের হাতে পৌঁছানোর মাধ্যমে ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছেন, কিন্তু তিনি সমাজের কাঠামো পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মার্কস এবং এঙ্গেলস উভয়েই লুথারের ধর্মীয় সংস্কার-এর মধ্যে এক ধরনের দ্বৈত চরিত্র দেখতে পান। মার্কস তাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও বলেছেন, “লুথার কর্তৃত্ব ভেঙে মানুষের আত্মবিশ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তিনি সামাজিক মুক্তির পথ সুগম করতে পারেননি।”
এঙ্গেলসও তাঁর “The Peasant War in Germany” গ্রন্থে লুথারের ধর্মীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে কৃষক বিদ্রোহকে প্রত্যাখ্যান করার এবং সমাজের অভিজাতদের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
সামগ্রিক বিশ্লেষণ
মার্কস ও এঙ্গেলসের ধর্ম নিয়ে বিশ্লেষণকে সমাজের শ্রেণীসংগ্রাম এবং শোষণমূলক ব্যবস্থার সমালোচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাদের দৃষ্টিতে, ধর্ম মানুষের কষ্ট ও শোষণের প্রকৃত প্রতিফলন, কিন্তু এটি মানুষের সত্যিকার মুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা দেখিয়েছেন, ধর্ম শোষণকারী শ্রেণীর স্বার্থরক্ষায় কাজ করে এবং সাধারণ জনগণকে ভ্রান্ত সুখের স্বপ্নে ডুবিয়ে রাখে।
এছাড়া, মার্টিন লুথার এর ধর্মীয় সংস্কারকে দুই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একদিকে তিনি আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা এনেছিলেন, তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে পারেননি। লুথার একটি ধর্মীয় বিপ্লব চালালেও, তা সামাজিক বিপ্লব হয়ে উঠতে পারেনি।
Sources:
- মার্কসের “Critique of Hegel’s Philosophy of Right”
- এঙ্গেলসের “The Peasant War in Germany”
- মার্টিন লুথারের ধর্মীয় সংস্কার ও এর বিশ্লেষণ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে কোনো ঘটনাই আকস্মিক বা কাকতালীয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের গোপন নথিপত্র বা ‘এপস্টিন ফাইলস’ (Epstein Files) প্রকাশ এবং এর সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থার টাইমিং বিশ্বজুড়ে নানা তাত্ত্বিক ও কৌশলগত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক, ব্যবসায়ী ও সেলিব্রিটিদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ বা পেডোফিলিয়ার মতো সংবেদনশীল তথ্য গোপন রেখে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্ল্যাকমেইল স্ট্র্যাটেজি। এই গোপন নথির নিয়ন্ত্রণ অনেকটা ঘুড়ির নাটাইয়ের মতো, যা বিশ্বমঞ্চের বড় বড় খেলোয়াড়দের সুতো দিয়ে বেঁধে রাখে।

নিচে এপস্টিন ফাইলস, গাজা যুদ্ধ, ইরান সংঘাত এবং বিশ্ব রাজনীতির এই নেপথ্য সমীকরণটি সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করা হলো।
গাজা গণহত্যা এবং পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতার নেপথ্য কারণ

গাজায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা নির্মম সামরিক অভিযান ও গণহত্যার পরও পশ্চিমা বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অন্ধ সমর্থন ও নীরবতা সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করেছে। মানবিক মূল্যবোধ ও সভ্যতার মুখোশ খসে পড়ার পেছনে কেবল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও ব্ল্যাকমেইল কৌশলও কাজ করে থাকতে পারে।

অপরাধবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো দেশের নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের প্রমাণ (যেমন পেডোগিরি বা অন্যান্য অপরাধ) কোনো নির্দিষ্ট শক্তির হাতে থাকে, তখন তাদের পক্ষে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও অনেক বিশ্বনেতা বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
ইরান সংঘাত ও এপস্টিন ফাইলস প্রকাশের টাইমিং: সব কি পূর্বপরিকল্পিত?
বিশ্বমঞ্চে যখনই মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, ঠিক তখনই এপস্টিন ফাইলের মতো স্পর্শকাতর তথ্য জনসমক্ষে আসার পেছনে গভীর কৌশল রয়েছে বলে মনে করা হয়।

- সংঘাতের ডামাডোল ও মনোযোগের দিকবদল: অতীতেও দেখা গেছে, যখনই আমেরিকার রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রশাসন কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক চাপে পড়েছে, তখনই এপস্টিন ফাইলের আংশিক প্রকাশ বা নতুন করে কোনো সামরিক হামলা আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।
- নতুন সমীকরণের প্রস্তুতি: চলমান ইরান-ইসরায়েল সামরিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার ডামাডোলের মাঝেই যখন এই গোপন ফাইলের বড় অংশ প্রকাশিত হয়, তখন তা কেবল সাধারণ তথ্য প্রকাশ থাকে না। এটি হতে পারে বিশ্বমঞ্চের নির্দিষ্ট কিছু চরিত্রকে সতর্কবার্তা বা ‘সুতোয় টান’ দেওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত, যাতে তারা আগামী দিনের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে আপস করতে বাধ্য হয়।
অপারেশন তুফানুল আকসা: পৃথিবীর গতি ও সমীকরণ বদলের সূচনা

গাজার প্রতিরোধ যোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত ‘অপারেশন তুফানুল আকসা’ আধুনিক পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই অভিযানের পর থেকে বিশ্বরাজনীতির যে সমস্ত গোপন সমীকরণ ও সমঝোতা মুখোশের আড়ালে ঢাকা ছিল, তা একে একে উন্মুক্ত হতে শুরু করেছে।
পৃথিবী আর কখনোই ৭ অক্টোবরের আগের পুরনো স্থিতাবস্থায় ফিরে যাবে না। তবে ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সমীকরণ কখনো শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয় না। এপস্টিন ফাইলের মতো তথ্যের ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থা প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এক চরম অস্থিরতা ও নতুন মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পর্দার আড়ালে সব ধরনের নোংরা হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে।
শেষ কথা
উপসংহারে বলা যায়, এপস্টিন ফাইলস কেবল কিছু অপরাধের দলিল নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ। গাজার প্রতিরোধ লড়াই যেমন পশ্চিমা সভ্যতার দ্বিমুখী নীতি ও মুখোশকে উন্মোচিত করেছে, তেমনই এই ধরনের নথির প্রকাশ প্রমাণ করে যে বিশ্বনেতাদের নিয়ন্ত্রণ করার সুতোটি কার হাতে রয়েছে। পৃথিবী এক নতুন সমীকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার মূল্য চকাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)
১. আদালতের নথি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট (US District Court for the Southern District of New York) কর্তৃক উন্মোচনকৃত জেফরি এপস্টিন মামলার আইনি নথিপত্র (Epstein Court Documents, 2024-2026)। ২. আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম: The Guardian এবং The New York Times—এপস্টিন ফাইলের তালিকা প্রকাশ এবং বিশ্বনেতাদের সম্পৃক্ততা বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনসমূহ। ৩. গোয়েন্দা বিষয়ক বিশ্লেষণ: Gideon’s Spies: The Secret History of the Mossad — গর্ডন থমাস (গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্ল্যাকমেইল ও তথ্য সংগ্রহের কৌশল সংক্রান্ত বিশ্লেষণ)। ৪. ভূ-রাজনৈতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক: Center for Strategic and International Studies (CSIS) এবং Al Jazeera English—মধ্যপ্রাচ্য সংকট, অপারেশন তুফানুল আকসা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার মেরুকরণ বিষয়ক রাজনৈতিক পর্যালোচনা।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
১৯৪৭ সালে পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কার হারাম শরীফের ইমাম সাহেবের খুতবায় সুক্ষ্ম ইলমি ভুল ধরেছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের কানাইঘাটের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.)। হাদিসশাস্ত্র ও আরবি ব্যাকরণে তাঁর এই অসাধারণ পাণ্ডিত্য দেখে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত আলেমরা পুরোপুরি তাক লাগিয়ে যান। এমনকি তৎকালীন সৌদি আরবের বাদশাহ স্বয়ং তাঁর দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান আল্লামা বায়মপুরীর সামনে পেশ করে কোনো ভুল আছে কি না তা যাচাই করতে বলেন এবং আল্লামা বায়মপুরী (রহ.) সেই সংবিধানে অন্তত ১৪টি বিষয় সংশোধনযোগ্য বলে চিহ্নিত করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি শুধু সিলেট অঞ্চল নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের ওলামায়ে কেরামের ইলমি শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য দলিল।
নিচে এই ক্ষণজন্মা হাদিস বিশারদ, রাজনীতিক ও মহান সংস্কারকের জন্ম, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ঐতিহাসিক অবদান বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) ১৩২৭ হিজরি মোতাবেক ১৯০৭ সালের মহররম মাসে এক জুমার দিনে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়মপুর গ্রামের (বর্তমান কানাইঘাট পৌরসভার অন্তর্গত) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
- পিতা: কারী আলিম বিন কারী দানিশ মিয়া।
- মাতা: হাফেজা সুফিয়া বেগম।
তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শৈশবেই তাঁর পিতা মারা যাওয়ায় মায়ের একক তত্ত্বাবধানে তিনি লালিত-পালিত হন। মাত্র সাত বছর বয়সে মায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরীফ শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়, যার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও উর্দু ভাষাও আয়ত্ত করেন।
শিক্ষাজীবন এবং দেওবন্দের গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড

কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসা (বর্তমান দারুল উলুম কানাইঘাট) থেকে মাত্র ১০ বছর বয়সে প্রাথমিক ও পরবর্তীতে মাধ্যমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি ভারতে পাড়ি জমান।
- ভারতে প্রথম পর্ব: রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ৫ বছর এবং মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় ২ বছর পড়াশোনা করেন। এই ৭ বছরে তিনি হাদিস, তাফসির, ফেকাহ, আকাইদ ও দর্শন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি দরসে নেজামির কঠিন কিতাব ‘কাফিয়া’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইযাহুল মাতালিব রচনা করে মেধার পরিচয় দেন।
- দারুল উলূম দেওবন্দের রেকর্ড: ১৯৩৬ সালে তিনি বিশ্ববিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দেওবন্দে দেড় বছর অত্যন্ত সুখ্যাতির সঙ্গে হাদিসের ওপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি (দাওরায়ে হাদিস) গ্রহণ করেন। মেধা তালিকায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং কয়েকটি বিষয়ে মোট নম্বরের চেয়েও বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড গড়েন। তাঁর বোখারি শরিফের পরীক্ষার খাতা দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘকাল বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছিল।
কর্মজীবন ও সিলেটের ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’

দেওবন্দের শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফেরার সময় তাঁর উস্তাদ সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) বলেছিলেন—“আব ইলম সিলেট কি তরফ জা রহা হায়” (এখন জ্ঞানবত্তা সিলেটের দিকে যাচ্ছে)।
- শিক্ষকতা: প্রথমে ভারতের বদরপুর ও রামপুর আলিয়া মাদরাসায় এবং পরে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সিলেটের গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসায় শাইখুল হাদিসের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক যোগ্যতায় তৎকালীন সময়ে গাছবাড়ী মাদরাসাকে ‘দ্বিতীয় দারুল উলূম দেওবন্দ’ বলা হতো।
- দারুল উলূম কানাইঘাট: ১৯৫৩ সালে তিনি নিজ জন্মস্থান কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দারুল উলূম কানাইঘাট’। ১৯৫৪ সালে এখানে তিনিই প্রথম দাওরায়ে হাদিসের (টাইটেল) ক্লাস চালু করেন এবং আমৃত্যু এখানে হাদিসের খিদমত করেন।
- দেওবন্দের শায়খুল হাদিসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: ১৯৫৭ সালে দেওবন্দের শায়খুল হাদিস মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর দেওবন্দের শূন্য পদে যে ৩ জন বৈশ্বিক আলেমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল, আল্লামা বায়মপুরী ছিলেন তাদের অন্যতম। কিন্তু মাতৃভূমির খিদমত ছেড়ে তিনি দেওবন্দে যেতে রাজি হননি।
- শিক্ষা বোর্ড গঠন: পূর্ব সিলেটের সব মাদরাসাকে এক প্লাটফর্মে আনতে ১৯৫৩ সালে তিনি ‘পূর্ব সিলেট আযাদ দীনি আরবী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড’ গঠন করেন। বর্তমানে এই বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৭৫টি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক জীবন ও সংসদের ঐতিহাসিক ভূমিকা
রাজনীতিতে তিনি ছিলেন তাঁর উস্তাদ মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সারির নেতা।
- এমএনএ (MNA) নির্বাচিত: ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ (পার্লামেন্ট) নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘চেয়ার’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে এমএনএ (মেম্বার অব ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
- সংসদে ঐতিহাসিক অবদান:
- রাষ্ট্রের নামকরণে পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান’ লেখায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
- “কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করা যাবে না”—এই মূল নীতিটি তিনিই পাকিস্তানের সংসদে উত্থাপন করেছিলেন।
- তাঁর তীব্র দাবির মুখে আইয়ূব সরকার একটি অর্ডিন্যান্স থেকে ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
- পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তিনিই সর্বপ্রথম পার্লামেন্টে তুলে ধরেন।
অমর রচনাবলী
দ্বীনি খিদমতের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তাঁর অবদান ছিল অতুলনীয়। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:
১. ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন: রাজনীতি বিষয়ে আরবিতে লেখা একটি ঐতিহাসিক অমর গ্রন্থ (যা পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে ‘ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার’ নামে অনূদিত হয়)। ২. আল-فুরক্বান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান (তাসাউফ সংক্রান্ত কিতাব)। ৩. আল ফুরক্বান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ও আউলিয়াইশ শাইতান। ৪. সত্যের আলো (দুই খণ্ডে)। ৫. ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার। ৬. ইজহারে হক্ব এবং সেমাউল কোরআন।
আধ্যাত্মিক জীবন ও ইন্তেকালের কারামাত

তিনি হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এবং উস্তাদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক ফয়েজ হাসিল করেন। পরবর্তীতে মাওলানা ইয়াকুব বদরপুরী (রহ.)-এর কাছে বায়াত হয়ে খেলাফত লাভ করেন।
- ইন্তেকাল: ১৩৯০ হিজরীর ১০ জিলহজ মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে এই মহান অলিয়ে কামেল ইন্তেকাল করেন। কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসার সামনেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
- কবর থেকে সুগন্ধি বের হওয়ার কারামাত: দাফনের পর টানা কয়েকদিন এবং পরবর্তীতে তিন মাস পর আবারও তাঁর কবর থেকে অলৌকিক সুগন্ধি বের হতে থাকে। এমনকি ইন্তেকালের দীর্ঘ ৪০ বছর পর, ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে আবারও তাঁর কবর থেকে তীব্র সুগন্ধি বের হতে শুরু করলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং হাজার হাজার মানুষ তা দেখার জন্য ভিড় জমান।
তাঁর স্মৃতি ও অবদানের সম্মানার্থে বর্তমান কানাইঘাট উপজেলা সদরে সুরমা নদীর উপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ সেতুটির নাম “আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী সেতু“ রাখা হয়েছে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (References)
১. মূল গ্রন্থ: ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন (অনুবাদ: ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ২. জীবনী ও স্মারকগ্রন্থ: আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ, উলামা পরিষদ বাংলাদেশ। ৩. সংসদীয় রেকর্ড: পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (National Assembly of Pakistan) ১৯৬২-১৯৬৫ এর সংসদীয় কার্যবিবরণী ও প্রস্তাবনাসমূহ। ২. প্রাতিষ্ঠানিক আর্কাইভ: দারুল উলূম দেওবন্দ (ভারত) এবং দারুল উলূম কানাইঘাট (সিলেট) এর শিক্ষা সমাপনী রেকর্ড ও শতবর্ষী স্মারক। ৫. সরকারি তথ্য বাতায়ন: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কানাইঘাট উপজেলা পোর্টাল (প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব অনুচ্ছেদ)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ফিচার ডেস্ক | ১৬ মে, ২০২৬ প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: ঠান্ডা যুদ্ধের (Cold War) ইতিহাসে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের সময়কালকে বলা হয় বৈশ্বিক গোয়েন্দা তৎপরতার সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং জটিল অধ্যায়। এই ১৫ বছরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেজিবি’ (KGB) একদিকে যেমন ওয়াশিংটন থেকে কঙ্গো কিংবা কাবুল পর্যন্ত তাদের গোপন জাল বিস্তার করেছিল, অন্যদিকে তেমনি নিজেদের ঘরের ভেতরের ভাঙন ঠেকাতে লড়েছিল এক চরম অস্তিত্বের লড়াই। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টকশো এবং অবমুক্ত হওয়া (Declassified) “মিট্রোখিন আর্কাইভ” ও মার্কিন-সোভিয়েত নথিপত্র ফাঁসের জেরে কেজিবির এই অন্ধকার সময়ের নেপথ্য প্রস্তুতি ও নিখুঁত অপারেশনগুলোর চাঞ্চল্যকর তথ্য নতুন করে বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তৈরি করেছে।

১. কেজিবির অভ্যন্তরীণ কাঠামো: ‘ডিরেক্টরেট’ সমাচার

১৯৭৫ সালের পর থেকে কেজিবি তার কার্যপরিধিকে আরও সুনির্দিষ্ট, পেশাদার ও আগ্রাসী করতে কয়েকটি অতি-গোপন ডিরেক্টরেটে বিভক্ত করে কাজ শুরু করে:
- ফার্স্ট চিফ ডিরেক্টরেট (FCD): এটি ছিল কেজিবির সবচেয়ে শক্তিশালী ও এলিট শাখা, যার মূল কাজ ছিল বহির্বিশ্বে গুপ্তচরবৃত্তি (Foreign Espionage) এবং ছদ্মবেশী এজেন্ট বা ‘ইলিজাল এজেন্টস’ (Illegal Agents) নিয়োগ ও পরিচালনা করা।
- ফিফথ ডিরেক্টরেট (Fifth Directorate): ১৯৬৭ সালে গঠিত এই বিশেষ শাখার মূল দায়িত্ব ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ভিন্নমতাবলম্বী, স্বাধীনচেতা লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং ধর্মীয় প্রচারকদের ওপর কড়া নজরদারি করা এবং যেকোনো বৈপ্লবিক চিন্তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা।
- সিক্সটিন্থ ডিরেক্টরেট (16th Directorate): এটি ছিল সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বা তারবিহীন যোগাযোগে আড়ি পাতার বিশেষ ডিজিটাল উইং, যা পশ্চিমাদের রেডিও, স্যাটেলাইট ও টেলিফোন যোগাযোগ হ্যাক করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।

২. আಂದ್ರোপভ যুগ ও ‘অপারেশন রয়ান’ (RYAN)

১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কেজিবির নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাত ইউরি আಂದ್ರোপভ। তাঁর আমলেই কেজিবি সোভিয়েত বিশ্বরাজনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রধানতম হাতিয়ারে পরিণত হয়। ১৯৮১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান সোভিয়েত ইউনিয়নকে “দুষ্ট সাম্রাজ্য” (Evil Empire) হিসেবে ঘোষণা করলে দুই পরাশক্তির ঠান্ডা যুদ্ধ চরম রূপ নেয়।
এরই জবাবে ১৯৮১ সালের মে মাসে আಂದ್ರোপভ শুরু করেন ইতিহাসের বৃহত্তম শান্তিকালীন গোয়েন্দা অপারেশন—“অপারেশন রয়ান” (RYAN)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকা বা ন্যাটো জোট সোভিয়েতের ওপর কোনো আকস্মিক পারমাণবিক হামলা (Nuclear First Strike) চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা আগেভাগে আঁচ করা। কেজিবির হাজার হাজার ছদ্মবেশী এজেন্ট তখন পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে দিনরাত নজরদারি বাড়িয়েছিল।
৩. আফগান যুদ্ধ ও ‘অপারেশন স্টর্ম-৩৩৩’

১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের মূল ব্লুপ্রিন্ট ও সামরিক ছক তৈরি করেছিল কেজিবি। কেজিবির বিশেষায়িত কমান্ডো দল ‘আলফা গ্রুপ’ কাবুলের তাজবেগ প্রাসাদে অত্যন্ত গোপনীয় ‘অপারেশন স্টর্ম-৩৩৩’ (Operation Storm-333) পরিচালনা করে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই বিধ্বংসী ও ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ অপারেশনে তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট হাফিজুল্লাহ আমিনকে সপরিবারে হত্যা করে সেখানে সোভিয়েতপন্থী বাবরাক কারমালকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এই অপারেশনটি কেজিবির নিখুঁত ও নিষ্ঠুর সামরিক সক্ষমতার এক ক্লাসিক উদাহরণ।
৪. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, ‘অ্যাক্টিভ মেজার্স’ ও তৃতীয় বিশ্বে অনুপ্রবেশ

১৯৮০-এর দশকে কেজিবি সরাসরি সামরিক যুদ্ধের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা “অ্যাক্টিভ মেজার্স” (Active Measures)-কে বেশি প্রাধান্য দেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমা সমাজ ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়া ও অপপ্রচার চালানো।
- অপারেশন ইনফেকশন (Operation Infektion): কেজিবির অন্যতম সফল ডিসইনফরমেশন বা ভুয়া প্রোপাগান্ডা ছিল এটি। ১৯৮৩ সালে ভারতের একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের মাধ্যমে কেজিবি বিশ্বব্যাপী এই ভুয়া খবর ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে ‘এইডস’ (AIDS) ভাইরাস তৈরি করেছে।
- মিট্রোখিন আর্কাইভ ও ফান্ডিং: সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা ভাসিলি মিট্রোখিনের পাচার করা গোপন নথি বা “মিট্রোখিন আর্কাইভ” থেকে জানা যায়, কেজিবি কীভাবে ভারত, বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর (Third World) শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, আমলা ও নামী সাংবাদিকদের গোপনে বিপুল অর্থায়ন (Funding) করে নিজেদের পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যবহার করত।
৫. গুগল অ্যানালাইসিস: ২০২৬ সালে কেন এটি আবার আলোচনায়?
গুগল ট্রেন্ডস (Google Trends) এবং গ্লোবাল সার্চ ভলিউম অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে, মে ২০২৬-এ এসে হঠাৎ করেই কেজিবির এই ঐতিহাসিক অধ্যায়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নেটিজেনদের কৌতূহল তুঙ্গে উঠেছে। সার্চ ইঞ্জিনের শীর্ষ ৩টি ট্রেন্ডিং টপিক হলো:
KGB declassified operations 1975-1990(সম্প্রতি মার্কিন ও রুশ আর্কাইভের কিছু পুরনো গোপন নথি উন্মুক্ত হওয়া নিয়ে অনুসন্ধান)।Mitrokhin Archive Third World Funding(তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে কেজিবির গোপন প্রভাব ও অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে গবেষণা)।Vladimir Putin Dresden 1989(১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনে তরুণ কেজিবি কর্মকর্তা হিসেবে পুতিনের ভূমিকা নিয়ে কৌতূহল)।
৬. পতন ও শেষ অধ্যায় (১৯Expiry-১৯৯০)
১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ ক্রেমলিনের ক্ষমতায় এসে ‘গ্লাসনস্ত’ (উন্মুক্ততা) ও ‘পেরেস্ত্রৈকা’ (পুনর্গঠন) নীতি চালু করলে কেজিবির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরে। ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের সময় জার্মানির ড্রেসডেনে কর্তব্যরত কেজিবি এজেন্টরা (যার মধ্যে তরুণ ভ্লাদিমির পুতিনও ছিলেন) যখন মস্কোর কোনো সাহায্য বা নির্দেশনা পাননি, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে এই বিশাল গোয়েন্দা সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন।
অবশেষে ১৯৯০ সালে কেজিবির শেষ কট্টরপন্থী প্রধান ভ্লাদিমির ক্রাইউচকভ গর্বাচেভকে ক্ষমতাচ্যুত করার এক ব্যর্থ নেপথ্য অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে কেজিবিরও চিরতরে অবসান ঘটায়।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (Sources):
১. উইকিপিডিয়া (Wikipedia): KGB History and Directorship of Yuri Andropov.
২. চার্চিল আর্কাইভস সেন্টার (Churchill Archives Centre): The Papers of Vasiliy Mitrokhin and KGB Global Operations.
৩. ইউএস নিউজ (U.S. News): Declassified Documents Reveal KGB Spies in the U.S.
৪. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা (Britannica): KGB – Soviet Security, Intelligence, and Espionage.
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



