অপরাধ

মৃণাল সেন: আপোষহীন রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকারের শতবর্ষে শ্রদ্ধা
মৃণাল সেন

নিউজ ডেস্ক

September 28, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিদ্রোহী চলচ্চিত্রকারের আবির্ভাব

ভারতীয় সিনেমায় যখন রঙিন গান, নাচ আর বাণিজ্যিক ঢঙে ভরপুর, ঠিক তখনই আবির্ভূত হলেন এক ভিন্নধারার নির্মাতা—মৃণাল সেন
১৯২৩ সালের ১৪ মে, ফরিদপুরে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি চলচ্চিত্রকার সারা জীবন ছিলেন সমাজ-বাস্তবতাকে পর্দায় ধরার এক অক্লান্ত যোদ্ধা।

তিনি বিশ্বাস করতেন—
👉 “সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, এটি প্রতিবাদের ভাষা, পরিবর্তনের হাতিয়ার।”

ভারতের প্রথম নিষিদ্ধ চলচ্চিত্র

১৯৫৯ সালে সেন নির্মাণ করেন তার প্রথম রাজনৈতিক কাহিনিচিত্র “নীল আকাশের নিচে”

  • ভারত-চীন সম্পর্কের প্রতিফলন থাকায় ছবিটি ভারতের সেন্সর বোর্ড প্রথমবারের মতো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
  • এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়, চলচ্চিত্র জগতে এক বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর জন্ম নিয়েছে।

কালজয়ী চলচ্চিত্রের তালিকা

মৃণাল সেন একের পর এক সৃষ্টি করেছেন সমাজ-রাজনীতি স্পর্শ করা কালজয়ী চলচ্চিত্র।

  • ভুবন সোম (1969) → ভারতীয় নিউ ওয়েভ সিনেমার সূচনা।
  • কলকাতা ’৭১ (1972) → দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের প্রতিচ্ছবি।
  • ইন্টারভিউ (1971), পদাতিক (1973), কোরাস (1974) → শহুরে যুব সমাজ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপরেখা।
  • মৃগয়া (1976) → আদিবাসী জীবনের সংগ্রাম; মিঠুন চক্রবর্তী পান জাতীয় পুরস্কার।
  • একদিন প্রতিদিন (1979) → মধ্যবিত্ত নারীর দৈনন্দিন সংকট।
  • আকালের সন্ধানে (1980) → দুর্ভিক্ষ ও বাঙালির বেদনার ইতিহাস।
  • খারিজ (1982) → কানে স্পেশাল জুরি পুরস্কারপ্রাপ্ত, শিশুশ্রমের নির্মমতা।

এসব সিনেমা প্রমাণ করেছে—সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি সমাজের আয়না।

আপোষহীন বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি

  • মৃণাল সেন আজীবন বামপন্থী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন।
  • রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা ছিলেন নির্ভীক।
  • তিনি কোনোদিন চাটুকারিতা বা ক্ষমতার কাছে আপোষ করেননি।

মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছা

২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, কলকাতার কেওড়াতলা মহাশ্মশানে আগুনের মধ্য দিয়ে শেষযাত্রা সম্পন্ন হয় এই মহীরূহের।
কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন—

  • “আমার মরদেহে কোনো ফুল দেওয়া হবে না।”
  • “গান স্যালুট দেওয়া হবে না।”

কারণ, বাহ্যিক আড়ম্বরকে তিনি ঘৃণা করতেন। আগুনই ছিল তাঁর প্রিয় প্রতীক।

শতবর্ষে প্রশ্ন

২০২৩ সালে মৃণাল সেনের জন্মশতবর্ষ পালিত হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—
👉 আজকের ভারত-বাংলাদেশে কি আর কোনো পরিচালক আছেন, যিনি এমন সাহসী রাজনৈতিক সিনেমা নির্মাণের ঝুঁকি নেন?
👉 আজকের চলচ্চিত্র কি সমাজ পরিবর্তনের দায় নেয়, নাকি কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যের পেছনে দৌড়ায়?

সূত্র

১. The Hindu – Mrinal Sen: The Rebel Filmmaker
২. BBC বাংলা – মৃণাল সেনের শতবর্ষে শ্রদ্ধা
৩. Indian Express – Cinema Beyond Entertainment: Mrinal Sen’s Legacy

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

তোফায়েল আহমেদ

নিউজ ডেস্ক

June 2, 2026

শেয়ার করুন

তোফায়েল আহমেদ (২২ অক্টোবর ১৯৪৩ – ১ জুন ২০২৪) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার এই নেতা ডাকসুর ভিপি ও সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ব্যাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান ভোলা দ্বীপের) দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন

পারিবারিক পরিচিতি

  • পিতা: তাঁর পিতা মৌলভী আজহার আলী ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব।
  • মাতা: তাঁর মাতা ফাতেমা বেগম (মতান্তরে ফাতেমা খানম)।
  • শৈশব: গ্রামীণ ও সাধারণ পরিবেশে তাঁর শৈশবকাল কেটেছে।

শিক্ষাজীবন

  • মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক): তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে ম্যাট্রিক (এসএসসি) পাস করেন।
  • উচ্চ মাধ্যমিক (আইএসসি): মাধ্যমিক শেষে তিনি বরিশালে চলে যান এবং ১৯৬২ সালে বিখ্যাত ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন।
  • স্নাতক (বিএসসি): একই কলেজ (বিএম কলেজ) থেকে তিনি ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
  • স্নাতকোত্তর (এমএসসি): এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান (Soil Science) বিভাগ থেকে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রাথমিক নেতৃত্ব ও গুণাবলী

  • স্কুল জীবন: ছাত্র হিসেবে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং স্কুল জীবনেই ক্লাস ক্যাপ্টেন ও স্কুল ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেন।
  • প্রথম রাজনৈতিক পাঠ: ১৯৫৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভোলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগমন ঘটে, যা তাঁর মনে রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়।
  • কলেজ রাজনীতি: বিএম কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি সরাসরি ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬২ সালে কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং অশ্বিনী কুমার হল হোস্টেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক জীবন

তোফায়েল আহমেদ ( ছাত্ররাজনীতি ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ( ১৯৬০-এর দশক)

  • ডাকসুর ভিপি: ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আইয়ুববিরোধী ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব দেন।
  • বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান: ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হলে, ২৩ রেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে তোফায়েল আহমেদ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী (১৯৭১)

  • মুক্তিসংগ্রামের রূপকার: তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
  • মুজিব বাহিনী (BLF): মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত ‘মুজিব বাহিনী’র (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট) চার প্রধান অধিনায়কের একজন ছিলেন তিনি, যার অধীনে প্রায় ২০,০০০ মুক্তিসেনা প্রশিক্ষিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।

জাতীয় রাজনীতি ও সংসদীয় জীবন (১৯৭০-২০২৪)

  • সর্বকনিষ্ঠ সদস্য (১৯৭০): মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন। [
  • ৯ বার সংসদ সদস্য: স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ১৯৭৩ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মেয়াদে (সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও) মোট ৯ বার সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। মূলত ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে তিনি বারবার নির্বাচিত হয়েছেন।
  • রাজনৈতিক উপদেষ্টা: ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) হিসেবে নিযুক্ত হন।

মন্ত্রিত্ব ও দলীয় শীর্ষ পদ

  • বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০১৮ মেয়াদে তিনি পুনরায় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলান।
  • দলীয় পদ: তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর (প্রেসিডিয়াম) প্রভাবশালী সদস্য এবং পরবর্তীতে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘উপদেষ্টা পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তোফায়েল আহমেদের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী দীর্ঘ সংসদীয় জীবন—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা এবং সংসদীয় জীবনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা

  • কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন: ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে গঠিত ‘স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা ছিলেন তিনি। দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
  • মুজিব বাহিনী (BLF) গঠন: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে গিয়ে তিনি চার প্রধানের একজন হিসেবে ‘মুজিব বাহিনী’ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট) গঠন করেন। এই বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক বিভক্তিতে তিনি ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের (বৃহত্তর খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, যশোর ও ফরিদপুর) প্রধান অধিনায়ক।
  • মুক্তিসেনা তৈরি ও যুদ্ধ পরিচালনা: ভারতের দেরাদুনে প্রায় ২০,০০০ বাছাইকৃত ছাত্র ও যুবকদের উচ্চতর গেরিলা ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া তিনি সরাসরি তদারকি করেন। এই বিশেষ বাহিনী মূল যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বহু সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
  • আন্তর্জাতিক জনমত গঠন: যুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বৈশ্বিক জনমত গঠনে ও তহবিল সংগ্রহে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সংসদীয় জীবনের সুনির্দিষ্ট মেয়াদসমূহ

তিনি মোট ৮ বার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এর পূর্বে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন:

১. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন (পাকিস্তান আমল): মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন ভোলা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের কনিষ্ঠতম সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন।
২. প্রথম জাতীয় সংসদ (১৯৭৩–১৯৭৫): স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি তৎকালীন বাকেরগঞ্জ-১ (ভোলা) আসন থেকে সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন। এই মেয়াদেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৩. তৃতীয় জাতীয় সংসদ (১৯৮৬–১৯৮৮): এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি পুনরায় ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
৪. পঞ্চম জাতীয় সংসদ (১৯৯১–১৯৯৫): ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক অবাধ নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন এবং সংসদে বিরোধী দলীয় প্রধান হুইপ ও দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
৫. সপ্তম জাতীয় সংসদ (১৯৯৬–২০০১): ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং সফলভাবে এই মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
৬. নবম জাতীয় সংসদ (২০০৮–২০১৩): ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় ভোলা-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
৭. দশম জাতীয় সংসদ (২০১৪–২০১৮): এই মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে তিনি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।
৮. একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৮–২০২৪): ২০১৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-১ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন।
৯. দ্বাদশ জাতীয় সংসদ (২০২৪): ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। (পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়)।

তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে তাঁর সাফল্য এবং তাঁর রাজনৈতিক কারাবাসের ইতিহাস নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী হিসেবে সাফল্যসমূহ

তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের দুটি ভিন্ন মেয়াদে দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন:

  • রপ্তানি খাতের প্রবৃদ্ধি (২০১৪-২০১৮): বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক শিল্পে (RMG) ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেন।
  • রপ্তানি বহুমুখীকরণ: শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে তিনি চামড়া, ওষুধ, পাটজাত পণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতকে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি তালিকায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেন।
  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ও কূটনীতি: প্রতি বছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (DITF) সফলভাবে আয়োজন এবং বিদেশে বাংলাদেশের পণ্যের একক প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে দেশের ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করেন।
  • শিল্প নীতি প্রণয়ন (১৯৯৬-২০০১): শিল্প মন্ত্রী থাকাকালীন দেশের বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে এবং সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণে তিনি আধুনিক শিল্প নীতি প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন।

২. রাজনৈতিক কারাবাস ও নির্যাতনের ইতিহাস

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর হওয়ার কারণে পাকিস্তানি আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক শাসনামলে তোফায়েল আহমেদকে দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে:

  • ১৯৭১-এর পূর্ববর্তী সময়: ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে পাকিস্তানি শাসনামলে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।
  • বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর (১৯৭৫): ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক জান্তা তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। এরপর দীর্ঘ প্রায় ৩৩ মাস তিনি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন।
  • এরশাদ বিরোধী আন্দোলন (১৯৮০-এর দশক): আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় প্রায় প্রতি বছরই তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল।
  • ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন (২০০৭): ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তোফায়েল আহমেদকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় তিনি কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন।

সব মিলিয়ে তিনি তাঁর জীবনে প্রায় ৭ বছরেরও বেশি সময় রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও মৃত্যু

তোফায়েল আহমেদ ২০২৬ সালের ১ জুন (সোমবার) বিকেল ৩:৩০ মিনিটে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন. মৃত্যুকালে প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর.

মৃত্যুর কারণ ও শেষ দিনগুলো

  • শারীরিক অসুস্থতা: তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতা, প্যারালাইসিস (পক্ষাঘাত) এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন.
  • লাইফ সাপোর্ট: শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তী মাসগুলোতে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন.
  • চিকিৎসকদের বিবৃতি: হাসপাতালের পক্ষ থেকে ডা. রায়হান রব্বানী ও তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. মো. তৌহিদুজ্জামান তুহিনের যৌথ স্বাক্ষরে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়.

পরিবার ও শোক প্রকাশ

  • পরিবার: মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র কন্যা ড. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী (আইভী আহমেদ) এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী ও রাজনৈতিক অনুসারী রেখে গেছেন.
  • শোকের ছায়া: তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর নির্বাচনী এলাকা ভোলাসহ দেশজুড়ে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে এবং তাঁর নিজ গ্রাম কোড়ালিয়ায় শোকের মাতম শুরু হয়.

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু-পরবর্তী জানাজা, দাফন প্রক্রিয়া এবং তাঁর স্মরণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়া নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া

  • প্রথম জানাজা (ঢাকা): মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঢাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। ঢাকার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ বা নির্ধারিত প্রাঙ্গণে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের একাংশ রাজনৈতিক স্লোগান দিলে সেখান থেকে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।
  • দ্বিতীয় জানাজা ও দাফন (ভোলা): ঢাকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তাঁর মরদেহ তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা এবং জন্মস্থান ভোলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ভোলার সরকারি হাই স্কুল মাঠ এবং তাঁর নিজ গ্রাম কোড়ালিয়ায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অনুসারী অংশ নেন।
  • পারিবারিক কবরস্থান: জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার) ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে পিতা-মাতার কবরের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

দেশী-বিদেশী রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও শোকবার্তা

  • দলীয় শোক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে (যার ক্রিয়াকলাপ বর্তমানে সাময়িকভাবে স্থগিত বা নিষিদ্ধ রয়েছে) প্রবীণ এই নেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে দলের একটি যুগের অবসান এবং অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
  • জাতীয় নেতাদের সমবেদনা: দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁরা বিশেষ করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেন।
  • আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ঢাকাস্থ বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম এই সংবিধান প্রণেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রীর মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।

প্রধান অনলাইন উৎস ও প্রতিবেদন

  • উইকিপিডিয়া (বাংলা)
  • Wikipedia (English)
  • প্রথম আলো
  • বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর
  • দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star
  • বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

June 2, 2026

শেয়ার করুন

এ ধরণের কয়েকটি প্রশ্ন পেয়েছি। ‌ সে সব উত্তর থেকে একটা কিছুটা কাটছাঁট করে পেস্ট করে দেয়া হলো।

মিশরীয় সভ্যতা

সময়কাল ৩১৫০-৩০ খ্রিস্টপূর্ব

নীল নদের তীরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা উন্নত কালচার, পরাক্রমশালী ফারাও, পিরামিড, স্ফিংস, মমি, হিয়েরোগ্লাইফিক লিপি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছে।

নীল নদে জনপদের উন্মেষ ঘটে ব্রোঞ্জ যুগে। বিভিন্ন যুগ পেরিয়ে খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০ সালে প্রথম ফারাও মিশরকে একীভূত করে নয়া মিশরীয় সভ্যতার সূচনা করেন।

মিশরীয় রাজাদের উপাধি ছিল ফারাও। ফারাও রামেসিস এতটাই দাপুটে ছিলেন যে তার আমলে সমসাময়িক অন্য একটি সভ্যতা নুবিয়ান তার সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। ফারাও সচরাচর ফেরাউন নামে পরিচিত।

ফারাও রামেসিসের মমি

ইহুদি খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে ফেরাউন রামেসিস-২ এর সাথে ইহুদিদের পয়গম্বর মুসা (আ:) বিবাদ-বিসংবাদের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এ জন্য সাধারণ মানুষ ফেরাউন নামটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে থাকে।

রাজা রামেসিস-২ প্রতিকৃতি

মিশরের রাজারা দাবি করতেন তারা সূর্য দেবতা আমনের বংশধর। সূর্য দেবতার বংশধর হিসাবে মিশরীয় রাজারা মনে করতেন তারা অমর অজেয়। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে মৃত্যুর পর মমি করে তাঁদের ধন-রত্ন, পাইক বরকন্দাজসহ সমাধিস্থ করা হত। সমাধির উপরে নির্মাণ হতো হতো বিশাল আকৃতির সব পিরামিড। পিরামিডের বিস্ময়কর নির্মাণশৈলীর রহস্য এখনো কেউ উদঘাটন করতে পারেনি।

প্রধান দেবতা আমন ছাড়াও মিশরীয়দের অন্য একজন শক্তিশালী দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। তাঁর দায়িত্ব ছিল ন্যাচারাল রিসোর্স, কৃষি কর্ম ও নীল নদ।

ফারাও চতুর্থ আমেনহোটেপ বহু দেবতার বদলে এক দেবতা অর্থাৎ সূর্যদেবতার পূজা করার প্রচলন করেন। তিনি সূর্য দেবতার নাম বদলে ‘আতেন’ রাখেন এবং তার সাথে মিলিয়ে নিজের নাম দেন ‘আখেনাতেন’। সে হিসাবে তাঁকে একেশ্বরবাদী বলা যায় বৈকি।

রানী ক্লিওপেট্রা

মূর্তি নির্মাণে সে যুগে মিশরীয়দের জুড়ি ছিল না। রানী নেফারতিতির চুনাপাথরের মূর্তি দেখলে এখনো তাকে জীবন্ত মনে হয়। মিশরীয় সভ্যতার শেষ পর্বে টলেমি রাজবংশের রানী ক্লিওপেট্রোর সৌন্দর্য যুগে যুগে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছে।

রানী নেফারতিতি

তাদের নির্মিত সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত সুউচ্চ স্তম্ভ (obelisk) বিস্ময় উদ্রেক করে। মিশর বিজয়ের পর রোমানরা অন্তত আটটি স্তম্ভ রোমে নিয়ে যায়। রোম ভ্রমণের সময় এ ধরণে কয়েকটি স্তম্ভ দেখার সুযোগ হয়েছিল।

রোম শহরে পুনঃস্থাপিত মিশরীয় স্তম্ভ (obelisk)

লেখাপড়ার দুনিয়ায় প্রাচীন যুগে মিশরীয়রা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। তাদের চিত্রলিপির নাম ‘হায়ারোগ্লিফিক’, তা লেখার জন্য ব্যবহার করত নীল নদীর তীরে গজিয়ে ওঠা নলখাগড়া দিয়ে তৈরি প্যাপিরাস কাগজ।

হায়ারোগ্লিফিক লিপি

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত শাস্ত্রেও মিশরীয়রা তাদের অবিস্মরনীয় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পিরামিডের মতো নিখুঁত ত্রিকোণ স্থাপনা তাদের উন্নত জ্যামিতিক জ্ঞানের পরিচয় বহন করে প্রাচীন যুগ থেকে আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

মিশরের পিরামিড

মেসোপটেমিয়া সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৫০০

অবস্থান: আধুনিক ইরাক সিরিয়া এবং তুরস্ক

দজলা ফোরাত যা ইউরোপিয়ানদের কাছে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদী নামে পরিচিত, তার মধ্যবর্তী আধুনিক ইরাক এবং প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অনেকগুলো সভ্যতার জন্ম ভূমি। এক কথায় বলা যায় সভ্যতার প্রাচীনতম সূতিকাগার।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সঠিক সূচনা কাল অতীতের গর্ভে লুকিয়ে আছে তবে তার আগে অন্য কোন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজ বলতে যা বোঝায় এখানেই তার উন্মেষ ঘটে, প্রথম সভ্য মানুষের কলকাকলিতে মুখরিত হয়।

মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সময়কাল বিবেচনা করা হয়। পরিপূর্ণ সভ্যতা বিকাশের আগে‌ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ সাল অর্থাৎ আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে কৃষি ও কৃষি কাজে খাদ্যের জন্য পোষ মানিয়ে পশু পালনের চিন্তা মানুষের মাথায় আসে।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আগে মানুষ শিল্পকলা জানত না তা নয়‌, তবে তা ছিল‌ লোকজ কালচারের অঙ্গ হিসেবে। মেসোপটেমিয়ায় প্রথম বারের মতো লোকজ কালচারকে সভ্যতার আবরণে মুড়ে পরিশীলিত করে ধাপে ধাপে প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়া হয়।

মেসোপটেমিয়ায় সর্বপ্রথম যে সভ্যতার সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে, এখন থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে। তাদের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে নয়া লিখন পদ্ধতির ‘কিউনিফর্ম’ (Cuneiform), লেখা হতো কাদামাটির নরম শ্লেটে।

কিউনিফর্ম লিপি

সুমেরীয়দেরও দেবতার অভাব ছিল না। মিশরীয়দের মত তাদেরও প্রধান দেবতা ছিল সূর্য দেবতা। নাম ‘শামাশ’।

সুমেরীয় সভ্যতা; প্রাচীন ব্যাবিলন

সুমেরীয় সভ্যতা

মেসোপটেমিয় অঞ্চলের পরবর্তী বিখ্যাত সভ্যতার পত্তন হয় ২০৫০ খ্রিস্টপূর্বে। অ্যামোরাইট নামে সিরিয়ার মরুভূমি থেকে আসা একদল মানুষ এ সভ্যতা গড়ে তোলে। প্রাচীন পৃথিবীতে হাম্মুরাবি ছিলেন এ সভ্যতার প্রাণ পুরুষ। তাঁকে প্রাচীন পৃথিবীতে প্রথম আইন প্রণেতা হিসাবে গণ্য করা হয়। ‌ ভাষা ছিল কিউনিফর্ম। ব্যাবিলনের রয়েছে ‘গিলগামেশের মহাকাব্য’।

রাজা হামুরাবির প্রস্তর মূর্তি

আসিরিয় সভ্যতা

মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে টাইগ্রিস নদীর তীর ঘেঁষে ‘আশুর’ শহর ঘিরে গড়ে ওঠে আসিরিয় সভ্যতা। তাদের সভ্যতাল শুরুতে বিকাশ ঘটে কৃষিকাজ কেন্দ্র করে। শক্তি সঞ্চয় হলে সব যুগেই অন্য জনপদের দিকে নজর পড়ে। আসিরিয়রাও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে এ কালের উপনিবেশবাদীদের মত লুটপাট করে নিজেদের জনপদ সম্পদশালী করে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়।

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অস্ত্রশস্ত্র সেনাবাহিনী দরকার হয়। সে যুগে তারা তখনকার দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলা। কামান বন্দুক আণবিক বোমা বানানোর টেকনোলজি তাদের জানা ছিল না। তাই লোহার অস্ত্রপাতি তৈরি করে এখনকার ভাষায় গোলন্দাজ বাহিনী বা armoured corps গঠন করে। এখনকার ট্যাংকের প্রাচীন ভার্সনও তারা তৈরি করে, নাম যুদ্ধ রথ।

আসিরিয়রা যে লেখাপড়া পিছিয়ে ছিল না তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। শেষ সম্রাট ‘আশুরবানিপাল’ কর্তৃক নির্মিত কিউনিফর্ম পদ্ধতিতে লেখা ২২০০টি কাদামাটির শ্লেট সম্বলিত লাইব্রেরি পাওয়া গেছে।

সব সভ্যতার পতন হয়। আসিরিয় সভ্যতা টিকে ছিল ৩০০ বছর, পতন হয় ৬১২ খ্রিস্টপূর্বে।

আসিরিয় সভ্যতা; ক্যালডীয় সভ্যতা

ব্যাবিলন শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ক্যালডীয় সভ্যতা। একে নতুন ব্যাবিলনীয় সভ্যতাও বলা হয়। এ সভ্যতার স্বর্ণযুগে ক্ষমতার দেদীপ্যমান ছিলেন নেবুচাদনেজার। খ্রিস্টান, ইহুদি এবং মুসলমানদের ধর্ম পুস্তকে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তার সাম্রারাজ্যের অন্তর্গত জেরুজালেমে ইহুদিদের চিরাচরিত বেয়াড়াপনা এবং বিদ্রোহ করার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের বাসভূমি জেরুজালেম ধ্বংস করে সবাইকে বন্দী করে ব্যাবিলনে নিয়ে আসেন। ইতিহাসে এর নাম Babylonian Captivity অর্থাৎ ব্যাবিলনে বন্দিদশা।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান

প্রাচীন সপ্তাশ্চার্য ভিতর একটা নাম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান। এর নির্মাতা ছিলেন নেবুচাদনেজার। এমন একটা উদ্যান গড়ার জন্য তার রানীর শখ মেটাতে তিনি শহরের চারি দিকের দেয়ালের উপরে এ উদ্যানটি নির্মাণ করেন।

সম্রাট নেবুচাদনেজার।

শুধু ঝুলন্ত উদ্যান নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাদের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছে। দিনপঞ্জি রচনায় তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ক্যালডীয়রা সপ্তাহকে সাত দিনে এবং দিনকে ১২ জোড় ঘণ্টায় ভাগ করে। তারা আকাশে ১২টি নক্ষত্রপুঞ্জ‌ চিহ্নিত করে ১২টি রাশি চক্রের সৃষ্টি করেন। সে ধারণা সম্বল করে রাশিচক্র নিয়ে ব্যবসা করে এখনো অনেকে আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে চলেছে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও তাতে বিশ্বাস করার লোকেরও অভাব নাই।

পূর্বসূরীদের মতো ক্যালডীয়দেরও দেবতার অভাব ছিল না। প্রধান দেবতা ছিল ‘মারডক’।

মেসোপটিয়া সভ্যতার সব থেকে বড় অবদান চাকা আবিষ্কার। এ জন্য এখনো একটা কথা চালু আছে, You don’t have to reinvent the wheel. কারণ, মেসোপোটেমিয়ারা ছয় হাজার বছর আগে তা আবিষ্কার করেছে।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে পারস্যের পদানত হয়ে বেবিলন সভ্যতার পতন হয়।

সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০-১৯০০

অবস্থান: সিন্ধু নদীর অববাহিকায়

আধুনিক উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান এবং উত্তর ভারত।

সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা প্রাচীন পৃথিবীর সব চেয়ে তিনটি পুরনো সভ্যতার একটি। সে তিনটার মধ্যে সাড়ে বারো লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সিন্ধু সভ্যতা ছিল সর্ববৃহৎ। ‌পরবর্তীতে এ অঞ্চলে আরো অনেকগুলো সভ্যতা গড়ে ওঠে। আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে এক নতুন সভ্যতা সাথে করে এনে যুগ যুগ ধরে উপমহাদেশে জনজীবনে যুগান্তকারী প্রভাব রেখেছে। আর্য সভ্যতাও এ অঞ্চলের গান্ধারা এলাকা থেকে শুরু হয়।

সিন্ধু নদীর অববাহিকায় সভ্যতা মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা সভ্যতা নামে অভিহিত করা হয়।

সিন্ধু অববাহিকা সভ্যতার‌ স্বর্ণ যুগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত। সিন্ধু সভ্যতার রাজধানী নতুন এবং পরিশীলিত টেকনোলজি এবং উন্নত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এ অঞ্চলের সর্বপ্রথম শহর।

খনন করে যে সব দ্রব্যাদি খুঁজে পাওয়া গেছে তাতে প্রমাণ হয় তারা দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব এবং সময় পরিমাপের জন্য কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিল। চিত্র শিল্প, মৃৎশিল্প এবং আসবাবপত্র তৈরিতেও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিল।

মহেঞ্জোদারো ‌

কোন এক রহস্যজনক কারণে এদুটো সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও সিন্ধু সভ্যতায় নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত যে আধুনিক নগর গড়ে উঠেছিল তা এ যুগের অনেক নগরীকেও হার মানায়।

ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের সড়ক ছিল, পানি সরবরাহের জন্য কূপসহ নানা ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ড্রেন , স্নানাগার , রাস্তায় ড্রেন ও সড়ক বাতি, নগরীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। মহেঞ্জোদারোর মেয়র সাহেবের নাম জানা যায় নাই তবে আধুনিক যুগের স্ট্যান্ডার্ডেও চার-পাঁচ হাজার বছর আগে তিনি যে এ যুগের অনেকের চেয়ে দক্ষ প্রশাসক ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই।

পারস্য সভ্যতা

সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৩৩১

অবস্থান: পশ্চিমে মিশর, উত্তরে তুরস্ক, মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধু নদ

এক সময় সভ্যতার ধারক পারস্য সাম্রাজ্য ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য।মাত্র দুই শত বছরে ২০ লক্ষ বর্গ মাইল ভূখণ্ডে পারস্য সাম্রাজ্য দক্ষিন মিশর থেকে, গ্রিসের একাংশ, পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের একাংশ পর্যন্ত বিস্তার করেন। বিজ্ঞ সম্রাট এবং সামরিক শক্তি ছিল তাদের সাফল্যের মূলমন্ত্র।

সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ার পূর্বে পারস্যে কয়েক জন নেতা কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন খন্ডে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। কিন্তু সাইরাস, যাকে পরে সাইরাস দি গ্রেট নামে অভিহিত করা হয়, পারস্যকে একীভূত করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।‌ শুরুতেই তিনি ব্যবিলন দখল করেন। তিনি এত দ্রুত গতিতে সাম্রাজ্যঃ সম্প্রসারণ করে চলেছিলেন যে ৫৩৩ খ্রিষ্টপূর্বে সুদূর ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযান পরিচালনা করেন।

সাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিরাও দ্বিগুন উৎসাহে সাম্রাজ্য সম্প্রসারনের জন্য দিকে দিকে অভিযান চালান। সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছে তারা সমগ্র মধ্য এশিয়া এবং মিশর সাম্রাজ্যের আওতাভুক্ত করে ফেলে।

তাদের বিজয় রথ থেমে যায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে। মেসিডোনিয়ার কিংবদন্তির সমর নায়ক আলেকজান্ডার দি গ্রেট তাদের পদানত করে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান।

পারস্যের সম্রাট সাইরাস-২ দি গ্রেট: আচেমিও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

পারস্য রাজারা আধুনিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ডাক ব্যবস্থা প্রচলন করেছিল।

পারস্য রাজাদের শাসন ব্যবস্থা অবকাঠামো নির্মাণের টেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে পরবর্তী অনেক সাম্রাজ্য এমনকি মোগল সাম্রাজ্যও অনুকরণ করেছিল। দিল্লির পাঠান সম্রাট শেরশাহ পারসিক সম্রাটদের রীতিনীতি অবলম্বন করে রাজ্য পরিচালনা করেন। পারস্য রাজাদের অনুকরনে তিনি তৈরি করেন গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড, প্রচলন করেন ঘোড়ার ডাকের ব্যবস্থা।

বিখ্যাত পারস্য সম্রাট দারিয়ুসকে Darius the Great নামে অভিহিত করা হয়। তার সম্রাজ্য ইউরোপের দানিয়ুব নদীর তীর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার পাঞ্জাব নাগাদ বিস্তৃত ছিল।

আনাতোলিয়া সভ্যতা

প্রাচীনকাল থেকেই তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলটি ছিল সভ্যতার সূতিকাগার–নানা জাতির মিলন কেন্দ্র। এলাকাটিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুগে যুগে‌ বিভিন্ন শক্তির মধ্যে বেজে উঠেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি।

আনাতোলিয়ায় সভ্যতার বিকাশ ঘটতে থাকে নয়া নিওলিথিক যুগে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিওলিথিক যুগ শুরু হয় প্রায বার হাজার বছর আগে। নয়া প্রস্তর যুগে মানুষ শিকার ছেড়ে পশুপালন ও চাষবাসের দিকে মনোযোগ দেয়। ৫০-৬০ পরিবার-পরিজনের সদস্যদের নিয়ে এক একটা ইউনিটে বাস করত।

নয়া প্রস্তর যুগের শেষ দিকে আনাতোলিয়া অঞ্চলের শাসন কেন্দ্র কাটালহয়ুকের লোক সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। বর্তমান প্রেক্ষিতে সংখ্যাটি এমন কিছু বড় নয়, তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে তা’ ছিল পৃথিবীর সব চেয়ে জনবহুল শহর।

আনাতোলিয়া–হিট্টাইট সভ্যতা

আনাতোলিয়া সভ্যতা ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় চার হাজার বছর আগে কৃষ্ণ সাগরের ওপার থেকে প্রাচীন যুগের অন্যতম সভ্য হিট্টাইট জাতি আনাতোলিয়া হাজির হয়। তারা নিজস্ব কালচারের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কালচারের মেলবন্ধন এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে উন্নত এক সভ্যতা গড়ে তোলে।

হিট্টাইটরা লোহা উৎপাদন এবং তা থেকে আসবাবপত্র ও অস্ত্রপাতি তৈরিতে দক্ষ ছিল। তাদের তৈরি তীরের ফলা, কুঠার, বর্শাসহ নানা ধরনের দ্রব্যাদির সন্ধান পাওয়া গেছে।

হিট্টাইটরা আনাতোলিয়া এসে থেমে যায়নি। সিরিয়া পর্যন্ত তাদের প্রভাববলয় বিস্তার করলে মুখোমুখি হয় সে যুগের অন্যতম বড় শক্তি মিশরের সাথে। তখন দ্বিতীয় রামেসিস ছিলেন মিশরের ফারাও যাকে আমরা জানি ফেরাউন নামে।

খ্রিস্টপূর্ব ১২৮৬ সালে হিট্টাইট ও মিশরীয়রা শক্তি পরীক্ষায় লেগে গেল। সে যুদ্ধের রণকৌশল ও অন্যান্য ঘটনার বিবরণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। দুই বছর যুদ্ধের পরও জয় পরাজয়ের মীমাংসা না হাওয়ায় তারা শান্তি চুক্তি করে। এটা ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত শান্তি চুক্তি।

আনাতোলিয়ায– ফিজিয়ান সভ্যতা

কোন শক্তি চিরকাল স্থায়ী হয় না। ইউরোপের উন্নত ফিজিয়ান জাতি হিট্টাইটদের পরাভূত করে আনাতোলিয়ায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র রাজ্য গঠন করে। কিংবদন্তির মাইডাস যার হাতের ছোয়ায় সব কিছুই স্বর্ণে পরিণত হয়ে যেত, তিনি ছিলেন এই ফিজিয়ান রাজবংশে একজন রাজা।

রাজা মাইডাসের কোন একটা কর্মে মুগ্ধ হয়ে সুরা বা মদের দেবতা তার একটা ইচ্ছা পূরণে সম্মত হন। রাজা চাইলেন, আমি যাতে হাত দিব তাই যেন স্বর্ণের পরিনিত হয়। দেবতা বললেন, ব্যাটা তোমার কপালে দুঃখ আছে, তুমি অন্য কিছু চাও। মাইডাস গোঁ ধরলেন, না, আমার সোনাই চাই। তথাস্তু, ইচ্ছা পূরণ করে দেবতা অলিম্পিক পর্বতে তাঁর বাসস্থানে ফিরে গেলেন।

রাজা মাইডস

দেবতার সাথে দীর্ঘ সময় বাহাস করে তাঁর ক্ষুধা পেয়ে গিয়েছিল। খেতে বসে এক টুকরা মাংসে হাত নিলে তা সঙ্গে সঙ্গে সোনায় পরিণত হয়। যাতেই হাত লাগে সোনা হয়ে যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাইডাসের বোধোদয় হলো, এ ইচ্ছেটা না করাই ভালো ছিল। তাঁর করুণ অবস্থা দেখে মাইডাসের অতি আদরের কন্যা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলো। ব্যস, সাথে সাথে সোনার মূর্তিতে পরিণত হয়ে গেল‌ (উপরের ছবিতে দেখুন)। রাজা নদীর কাছে গিয়ে কান্না শুরু করে দিলেন। নদীর বালি স্বর্ণ কণায় পরিণত হয়ে গেল। তাঁর চোখের জলে ইচ্ছেটা ধুয়ে মুছে আবার স্বাভাবিক মানুষে পরিণত হলেন।

ফিজিয়ান রাজ্যকে ঘিরে আরো অনেক কিংবদন্তি আছে। তার একটি গর্ডিয়ান নট। বাংলায় বলা যায় গর্ডিয়ান গিট্টু। বড্ড জটিল গিট্টু। ফিজিয়ান রাজা রাজ্যের প্রবেশ দ্বারে একটা বিমে এ গিট লাগিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যিনি তা খুলতে পারবেন তিনি ভবিষ্যতে এশিয়া শাসন করবেন। কিংবদন্তি আছে, মহাবীর আলেকজান্ডার সে গর্ডিয়ান নট তরবারির একটা আঘাতে দ্বিখন্ডিত করে এশিয়ায় প্রবেশ করেন।

আনাতোলিয়া –লিডিয়া সভ্যতা

রাজা আসে রাজা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে আনাতোলিয়ার পশ্চিমে লিডিয়ায় এক উন্নত সভ্যতার উদ্ভব ঘটে। লিডিয়ার রাজা ক্রয়েসাস সে যুগের অন্যতম সুন্দর রাজধানী গড়ে তোলেন। এর পর পারস্য সাম্রাজ্যের শক্তিশালী সম্রাট সাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৬ সালে রাজ্যটি দখল করেন।

ক্ষমতার পালাবদলের নিয়মে আলেকজান্ডার পার্শিয়ানদের হটিয়ে আনাতোলিয়া কেড়ে নেন। এর পর দৃশ্যপটে উদয় হয় রোমানদের।

আলেকজান্ডার দি গ্রেট

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার বিনা যুদ্ধে আনাতোলিয়া দখল করে যে উক্তি করেছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে—veni vidi vici, আসলাম দেখলাম জয় করলাম।

প্রাচীন চীন সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০-১০৪৬

অবস্থান: ইয়েলো নদী এবং ইয়াংসি অঞ্চল

চীন সভ্যতা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রধান বহুমুখী সভ্যতা। চীন দেশে যে সমস্ত বংশ প্রথম থেকে শেষ নাগাদ রাজত্ব করেছে তা হিসাবে আনলে চীন সভ্যতার ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিশাল।

চীন সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় ইয়েলো নদীর অঞ্চলে। খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালের কাছাকাছি সময় কিংবদন্তির সম্রাট তার শাসন শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে অনেক বংশ চিন ভূখণ্ডে শাসন করেন।

খ্রিস্টপূর্ব ২০৭০ সালে Xia dynasty সর্বপ্রথম সমগ্র চীন ভূখন্ড শাসন করতেন। ‌ তারপর এক এক বংশ বিভিন্ন সময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। পরিশেষে ১৯১২ সালে Xinhai বিদ্রোহের ফলে Qing dynasty পতন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তত দিনে চীন সভ্যতা দুনিয়াকে অনেক কিছু প্রয়োজনীয় আবিষ্কার এবং পণ্য উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে বারুদ কাগজ মুদ্রণ শিল্প, কম্পাস, কামান এবং অন্যান্য অনেক ব্যবহারিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান ও চিন্তাধারা।

চীনারা বিশ্বাস করতো তাদের সমৃদ্ধির পেছনে ড্রাগনের ভূমিকা রয়েছে। চীনের বিভিন্ন শাসনামলের মধ্যে রয়েছে হুয়াংতি রাজা, শাং রাজা, চৌ রাজাদের শাসন। চৈনিক সভ্যতার প্রত্যেকের কিছু কিছু আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। চীনের প্রাচীন দার্শনিক ছিলেন লাও জু। তার চিন্তাকে নাম দেয়া হয় তাওবাদ। চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন কনফুসিয়াস। কনফুসিয়াসের প্রধান অনুসারী মেনসিয়াসও বিখ্যাত।

চীনাদের মধ্যে পূর্বপুরুষ পূজার রীতি চালু ছিল। চীনা বিশ্বাস মতে, পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রভাব পড়ে বংশধরদের উপর। তাই পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তির জন্য তারা খাবার উৎসর্গ করতেন।

শুনতে অবাক লাগতে পারে, বিশ্বকোষ প্রণয়নের সূত্রপাত ঘটে সতের’শ বছর আগে সভ্যতার অন্যতম সূতিকাগার চীন দেশে। তৃতীয় শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ‌ চীনের পন্ডিত বর্গ ও আমলারা মিলে ৬০০ চাইনিজ স্টাইলে বিশ্বকোষ প্রণয়ন করেন। তার প্রায় দু’শটি এখনো টিকে আছে এবং প্রায় ২০ টি ঐতিহাসিকরা ব্যবহার করে থাকেন।

পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজবংশের নির্দেশে চীনারা বিশ্বকোষ প্রণয়ন করতে থাকে। কিং (Qing) রাজবংশের সময় প্রণীত বিশ্বকোষে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তুলনায় তিন চার গুণ বেশি তথ্য সন্নিবেশ করা রয়েছে। চীনের বিশ্বকোষ শুধু তথ্য ভান্ডার নয় বরং অভিধানও বট

গ্রিক সভ্যতা

সময় কাল; খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০–৪৭৯

অবস্থান: ইটালি, সিসিলি, উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিমে সুদূর ফ্রান্স পর্যন্ত

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা সবচেয়ে পুরনো না হলেও দুনিয়ার বুকে অন্যতম যুগান্তকারী সভ্যতা।

গ্রীক সভ্যতার স্থায়ীকাল এত দীর্ঘ যে ঐতিহাসিকরা তা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছে: সনাতন ক্লাসিকাল এবং হেলেনিক যুগ। এত দীর্ঘ সময় যে সমস্ত গ্রিক পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন তাঁরা দুনিয়ায় চিন্তাধারার ক্ষেত্রে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাদের কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‌

পৃথিবীর মানুষকে তারা যে সব উপহার দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অলিম্পিকস এবং গণতন্ত্র ও সিনেট সম্পর্কে ধারনা। জ্যামিতি, জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যার ভিত্তি রচনা করেছেন। পিথাগরাস, আর্কিমিডিস সক্রেটিস ইউক্লিড প্লেটো অ্যারিস্টোটল আলেকজান্ডার দি গ্রেট, তাদের আবিষ্কার, থিওরি, মতবাদ এবং শৌর্যবীর্য পরবর্তী সভ্যতাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।

গ্রীক সভ্যতার আমলে এথেন্সে তৈরি হয়েছিল আধুনিক গণতন্ত্রের কাঠামো। সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল তার নাগরিকদের। গ্রিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসক পেরিক্লিস এথেন্সের ক্ষমতায় বসেন ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই যুগকে এথেন্সের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কিন্তু এক সময় স্পার্টার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পেলোপনেসীয় ও এথেন্সের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ডেলিয়ান লীগের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায় এবং এথেন্সের পতন হয়। এরপর এথেন্স স্পার্টার অধীনে চলে যায়।

ভৌগলিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন।‌ নগর রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ হতো না তা নয়। তবে বহিঃশত্রুর আক্রমণ করলে তারা যৌথভাবে তা মোকাবেলা করতে। বারবার পারস্য সাম্রাজ্যের আক্রমণ ঠেকাতে তারা যূথবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। ‌ একবার ম্যারাথন অঞ্চলে শক্তির মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধে গ্রীকরা জয়লাভ করলে একজন গ্রিক সেনা ৪৩ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে দ্রুত এথেন্সে সংবাদ বয়ে আনে, কিন্তু পরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার স্মরণে এখনো অলিম্পিক গেমসের ম্যারাথন দৌড়ের একটা আইটেম রাখা হয়েছে।

দর্শন ইতিহাস জ্যোতির্বিজ্ঞান চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে গ্রিক সভ্যতা মূল্যবান অবদান রেখেছে। ‌মানুষ ও পৃথিবীর উৎস সম্পর্কে ‘সফিস্ট’ (Sophist) নামের এক শ্রেণীর যুক্তিবাদী দার্শনিকের উদ্ভব হয়। বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস এই সফিস্টদের দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিলেন।

দার্শনিক সক্রেটিস

বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের চিন্তা-ধারা ও দর্শন যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু গ্রিসের রাজন্যবর্গ যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে তাকে ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বে হেমলক বিষ খাইয়ে হত্যা করে। তার ছাত্র দার্শনিক প্লেটো ‘রিপাবলিক’ বইটিতে আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করেন, কিন্তু কোথাও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি সক্রেটিসের দর্শন সম্পর্কে ‘ডায়ালগস অব সক্রেটিস’ নামের আরেকটি গ্রন্থ লিখে রেখেছেন। নাট্যকার এসকাইলাস লেখেন ‘প্রমিথিউস বাউণ্ড’ এবং ‘আগামেমনন’ নামের দুটি নাটক। একশোটিরও বেশি নাটক লেখেন সফোক্লিস। হেরোডেটাসকে বলা হয় ইতিহাসের জনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন ‘হিপোক্রেটাস’। সূর্যের আলোর প্রতিফলন আমাদের পৃথিবীতে আসে অথচ তিনিই প্রথম উপস্থাপন করেন। এরিস্টটল, পিথাগোরাস এবং টলেমির মতো এক ঝাঁক রত্ন গ্রিক সভ্যতাকে মহিমান্বিত করেছিলেন।

হেলেনিস্টিক সভ্যতা

গ্রিসের উত্তরে মেসিডন অঞ্চলে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা যা হেলেনিস্টিক সভ্যতা নামে পরিচিত। রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ৩৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ভূখণ্ডের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। পারস্যের বিরুদ্ধে গ্রিক শক্তিগুলোকে একত্র করে তিনি হেলেনিক লিগ তৈরি করেন। গুপ্তঘাতকের হাতে ফিলিপ মারা যাওয়ার পর তার ছেলে বীর আলেকজান্ডার পারস্য দখল করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ৩২৩ খ্রিস্টাপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে মারা যান আলেকজান্ডার। ইতিহাসে তিনি ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’ নামে পরিচিত। তার মৃত্যুর পর সেনাপতিরা নিজেদের মধ্যে বিশাল সাম্রাজ্য ভাগ করে নেন। হেলেনিস্টিক সভ্যতায়ও প্রচুর জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা হতো।

রোমান সভ্যতা

সময় কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৪৬৫ খ্রিস্টাব্দ

রোমান সাম্রাজ্য খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগে দৃশ্যপটে উদয় হয়। রোম নগরীর স্থাপনের ব্যাপারে একটা বহুল প্রচলিত কিংবদন্তি রয়েছে। ল্যাটিনদের রাজা রোমিউলাস রোম নগরীর পত্তন করেন।

ক্ষমতার মধ্য গগনে রোম সাম্রাজ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোসহ বিশাল ভূখণ্ড বিস্তার লাভ করেছিল।

প্রাচীন রোমে রাজারা শাসন করতেন কিন্তু তাদের মাত্র ৭ জন ক্ষমতায় থাকতে পারেন। জনগণ তাদের নিজেদের শহর শাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। পরে একটা কাউন্সিল গঠন করে যার নাম সিনেট। রোমের শাসনভার সিনেটের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবে প্রতিষ্ঠা হয় রোমান রিপাবলিক। রোমের বিখ্যাত শাসনকর্তাদের মধ্যে জুলিয়াস সিজার, ট্রাজন অগাস্টাস উল্লেখযোগ্য নাম।

প্রাচীন পৃথিবীতে রোমান সাম্রাজ্য পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কাঠামো মুদ্রা প্রচলন আইন প্রণয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। এখনো বিভিন্ন দেশের রোমান আইনের আদলে অন্যান্য আইন তৈরি করা হয়েছে।

আইনের শাসন তৈরি করলেও রোমানদের দাস ব্যবস্থা নিষ্ঠুরতার একটা বড় উদাহরন হিসেবে রয়ে গেছে। তারা মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নেহায়েৎ আমোদ-প্রমোদের জন্য তারা গ্লাডিয়েটরদের মধ্যে অস্ত্র যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে লাগিয়ে দিয়ে সম্রাট সহ দর্শকদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন। শয্যাশায়ী পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিহত করার জন্য সম্রাটের সিগন্যাল পেলেই তার বুকে বসিয়ে দিত তরবারি।

১১০ খ্রিস্টপূর্বৈ পর থেকে রোম জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী অন্তর্দ্বন্দ্বে। বিখ্যাত জুলিয়াস সিজারকে তার এক ঘনিষ্ঠজন বুকে ছুরি বসিয়ে হত্যা করে। ঘনিষ্ঠজনের বিশ্বাসঘাতকতায় অবাক হয়ে জুলিয়াস সিজার যে উক্তি করেছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে–ব্রুটাস তুমিও !!

জুলিয়াস সিজার

সিজারের মৃত্যুর পর রোমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এসময় উত্থান ঘটে অক্টাভিয়ান সিজার, মার্ক অ্যান্টনি ও লেপিডাসের। পরবর্তীতে অক্টাভিয়ান সিজার লেপিডাসকে পরাজিত করেন

মায়া সভ্যতা

সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ

অবস্থান: বর্তমান মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, এল সালভেদর, বেলিজ

প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকায় বিশাল এলাকা জুড়ে প্রাচীন পৃথিবীর ‌‌অবিশ্বাস্য রকমের সমৃদ্ধ মায়া সভ্যতা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। পুরাতত্ত্ববিদেরা হিসেব করে বলেছেন সভ্যতার যখন রমরমা অবস্থা তখন জনসংখ্যা পৌঁছে যায় এক কোটিতে।

সেন্ট্রাল আমেরিকায় মায়া সভ্যতার অবস্থান

মায়াদের প্রাচীন শহর ইউকাতান থেকে বাঙ্গালীদের অতি পরিচিত মায়া শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। ইউকাতান ছিল মায়া সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী খ্রিষ্টপূর্ব (২০০০-২৫০ খ্রিষ্টাব্দ)। এ সভ্যতা টিকেছিল প্রায় ২৫০০ বছর। প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে বর্তমান ইংল্যান্ডের দ্বিগুণ জায়গা জুড়ে মায়া

মায়া সভ্যতার সুদীর্ঘ সাড়ে চার হাজার বছর স্থায়ী কালকে তিনটি যুগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। (১) প্রি-ক্লাসিক যুগ (২) ক্লাসিক যুগ, ও (৩) পোস্ট ক্লাসিক যুগ।

বয়স বিবেচনায় মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু অববাহিকা এবং মিসরের সভ্যতার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও মায়ারা সভ্যতার পথে যাতায়াত শুরু করার প্রায় এক হাজার বছর পরে চীন সে পথে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে, পরাক্রমশালী পারস্য ও রোমানদের সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেতে আরও দুই হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।‌ শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো বহু যুগ। যখন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার বাইরে ইউরোপের জনপদ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়ারা ‌ তখন সভ্যতার প্রদীপ জ্বালিয়ে চারিদিকে উদ্ভাসিত করে ফেলেছিল।

যখন গুটিকয়েক প্রাচীন সভ্যতার বাইরে মানুষ জানত না কীভাবে আবাস গড়তে হয়, সে সময়ে মায়ানরা গড়ে তুলেছিল উঁচু উঁচু স্থাপনা, সমৃদ্ধ করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগত, উদ্ভাবন করেছিল এমন অনেক কিছু, যা ঐ সময়ের তো বটেই, এ মানুষকেও বিস্ময়ে অভিভূত করে।

দুনিয়ার রীতি–সাম্রাজ্য ও সভ্যতা ধীর লয়ে শুরু হয়, এক সময় সমৃদ্ধির মধ্য গগনে পৌঁছে যায়, তারপর শুরু হয় পতন।

মায়া উন্নতির মধ্যগগনে পৌঁছে সভ্যতার দীপ্তি ক্ষীণ হতে হতে এক সময় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। পুরাতত্ত্ববিদেরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে মায়াদের রেখে যাওয়া স্থাপনা, পুঁথি পত্র ও অন্যান্য আলামত বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধির কথা শুনিয়ে দুনিয়ার মানুষকে চমকে দেন।

পোশাক-আশাক

তখনকার লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পশুর চামড়া ও পশম দিয়ে তৈরি কাপড়চোপড় পরতো।‌ গ্রীষ্মকালে পুরুষেরা উদোম গায়ে থাকলেও শীতকালে নারী পুরুষ নির্বিশেষে কম্বল দিয়ে তৈরি পোশাক পরতো। মেয়েদের মত ছেলেরা লম্বা চুল রাখতো। বিবাহিত মেয়েরা শরীরে উল্কি লাগিয়ে ‌ নো ভ্যাকান্সি‌ নোটিশ টানিয়ে দিত। ভুট্টা দিয়ে তৈরি খাদ্য ‌ তাদের প্রধানত প্রোটিনের যোগান দিত।

জ্যোতির্বিদ্যা‌

তাদের চিন্তা ভাবনা শুধু মাটির দুনিয়ায় আবদ্ধ ছিল না আকাশের গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে ও তাদের গতিবিধি সম্পর্কে নানা তথ্য রেখে গেছে। মঙ্গল ও বৃহস্পতি তাদের গবেষণার বাইরে ছিল না।

মায়াদের তৈরি জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত জটিল চিত্র

মায়া ক্যালেন্ডার

মায়ানরা সময় গণনার ক্ষেত্রে অদ্ভুত বিচক্ষণতার পরিচয় রেখে গেছে। তাদের হিসাব মতে এক বছর সমান ৩৬৫.২৪২০ দিন। বহু শতাব্দী পরে অনেক হিসাব-নিকাশ, যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আধুনিক যুগে বের করেছে এক বছরের সমান ৩৬৫.২৪২৫‌। প্রকৃত সময়ের এত কাছাকাছি কি করে তারা পৌঁছেছিল তা ভাবলে অবাক লাগে।

বিশটা প্রতীক এবং দশটি সংখ্যা বিশিষ্ট মায়াদের তৈরি ক্যালেন্ডার

চান্দ্রমাস চন্দ্র ও চান্দ্র বছরের ব্যাপ্তিও তারা নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করেছিল। অথচ বেশি দিনের কথা নয় ষষ্ঠদশ শতাব্দীতেও সূর্যের চারপাশে পৃথিবী চক্কর দেয় বলে যে মতবাদ প্রকাশ করার জন্য গ্যালিলিওকে ভ্যাটিকানের ধর্ম পণ্ডিতেরা ফাঁসিতে চড়ানোর মতলব করেছিল।

লিখন পদ্ধতি

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকেই মায়ানরা ভিন্ন স্টাইলে হায়ারোগ্লিফিক পদ্ধতিতে ছবি এঁকে ক্যালেন্ডার তৈরি করত। সমস্ত আমেরিকান সভ্যতার তুলনায় মায়ারা লেখার জন্য সবচেয়ে উন্নত রূপ আবিষ্কার করেছিল, যা গ্লাইফস নামে পরিচিত। গ্লাইফস হচ্ছে ছবি বা চিহ্নের মাধ্যমে কোনো বর্ণ বা সাউন্ডকে বর্ণনা করা।

লেখার জন্য মায়ানরা প্রায় ৭০০টিরও অধিক গ্লাইফস ব্যবহার করত। আশ্চর্যজনকভাবে মায়ানদের ব্যবহৃত গ্লাইফসের প্রায় ৮০ শতাংশ বর্তমান সময়ে এসেও পাঠোদ্ধার করা গেছে। মায়ারা তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। তাই তারা তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বিবরণ পিলার, দেয়াল এবং পাথরে লিখে রাখত। শুধু তা-ই নয়, তারা বইও লিখত। বইয়ের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই থাকত ঈশ্বর, প্রাত্যহিক জীবনযাপন এবং রাজাদের নানা কথা।

লেখার জন্য গ্লাইফাস

ওষুধ

রোগ ব্যাধির কারণ এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তা উপশমের উপায় বের করেছিল। কেটে ছিঁড়ে গেলে সেলাই করা শিখেছিল, হাড় ভেঙে গেলে প্লাস্টার, দাঁতের ফাঁকে ফিলিং করার টেকনিক রপ্ত করেছিল। দেড় হাজারেরও বেশি গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরি করতো।

ধর্ম ও বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি

শিল্পকর্ম

মায়াদের শিল্পকলা ছিল যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। কাঠের শিল্পকর্ম, কাচের শিল্প, মৃণ্ময় পাত্র, পাথরের শিল্পকর্ম, দেয়াল লিখন আজও মানুষের মনে বিস্ময় উদ্রেক করে।

কি সুন্দর শিল্পকলা

প্রাচীন যুগে এত সুন্দর শিল্প ভাবতেই অবাক লাগে

মুখোশ

মায়ানরা বিশ্বাস করত পাতাল থেকে দৈত্য এসে তাদেরকে মেরে ফেলতে পারে। এসব দৈত্যদের ভয় দেখাতে মায়ানরা বিভিন্ন মুখোশ পরত। তাদের মুখোশগুলো ছিলো মূলত দৈত্যদের ভয়ের প্রতীক। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাতাল থেকে নয় আটলান্টিকের ওপার থেকে স্প্যানিশ দর্সুরা এসে তাদের শেষ চিহ্নটুকু ধূলায় মিশিয়ে দেয়।

ভয়ঙ্কর মুখোশ

পিরামিড

অন্যান্য সমসাময়িক সভ্যতার তুলনায় মায়ারা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক উন্নত ছিল। মায়া এবং আজটেকরা অনেকগুলো পিরামিড তৈরি করেছিল যার কয়েকটি মিশরীয় পিরামিডের চেয়ে বড়।

মায়াদের তৈরি বিশালাকৃতির পিরামিড

মায়া সভ্যতা কি করে হঠাৎ পতন শুরু হলো এবং তারা কোথায় বা হারিয়ে গেল ইতিহাসের এক রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। তাদের বংশধররা এখনো সেন্ট্রাল আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ইনকা সভ্যতা

সময় ১৪৩৭-১৫৩২

বর্তমান পেরু ইকুয়েডর এবং চিলি অঞ্চলে ইনকা সভ্যতা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বে সবচেয়ে বড় সভ্যতা। বর্তমান পেরুতে ছিল তাদের প্রধান শাসনকেন্দ্র এবং দুর্গ।

ইনকারা অত্যন্ত উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলে। মিশরের ন্যায় ‌ মৃতদেহ মমি করার কলা কৌশল আয়ত্ত্ব করেছিল। মিশরীয়দের মত এদের প্রধান দেবতাও ছিল সূর্য দেবতা। তাদের দেবতার নামটা কিছু ভিন্ন: ইন্তি। তারা রাজাকে মনে করতেন সাপা ইনকা অর্থাৎ সূর্যের পুত্র।

ইনকাদের সূর্য দেবতা

ইনকা রাজ্যের প্রথম সম্রাট Pachacuti একটা গ্রামকে সমৃদ্ধশালী নগরে পরিণত করেন। তিনি ট্রাডিশন অনুযায়ী পূর্বপুরুষের পূজা করতেন। তার মৃত্যুর পর শাসনভার পুত্রকে দেওয়া হতো কিন্তু সম্পত্তি আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতো। ফলে তাদের মধ্যে রেষারেষি কম হতো, রাজার উপর শ্রদ্ধাবোধ থাকতো। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মিশরীয়দের মত রাজাকে মমি বানিয়ে রাখত।

তাদের নির্মাণশৈলী ছিল অত্যন্ত উচ্চ স্তরের। তাদের স্থাপিত মাচুপিচু এবং রাজধানী শহর Cusco এখনো বিষ্ময় উদ্রেক করে।

ইনকাদের তৈরি মাচুপিচু শহর

মিশরীয়দের মত ইন করাও প্রেমের তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল।

ইনকাদের তৈরি পিরামিড

আজটেক সভ্যতা

সময় কাল ১৩৪৫-১৫২১

কলম্বাস হানা দেওয়ার আগে মধ্য আমেরিকার বিখ্যাত মায়া সভ্যতার পতন হলে প্রায় ১০০ বছর পরে দৃশ্যপটে আসে আজটেক সভ্যতা। যে সময় আজটেক সভ্যতার উদ্ভব হয় তখন দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা সভ্যতা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বর্তমান মেক্সিকোর তিনটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তিনটা নগরে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল। ১৩২৫ সালের কাছাকাছি তারা ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে একটা শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলে।

তাদের সামরিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল Tenochtitlan শহরে। সেখান থেকে তারা নতুন অঞ্চল দখল করতে থাকে। তবে, রাজা অধিকৃত অঞ্চলের শাসনভার ক্ষমতা গ্রহণ করতেন না। স্থানীয়দের উপর শাসনভার ছেড়ে দিতেন। বিনিময়ে তাদের মোটা অংকের কর প্রদান করতে হত।

ষোড়শ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে ত্রি-শক্তি সম্মিলিত আজটেক সভ্যতা যখন উন্নতির মধ্যগগনে তখন কুখ্যাত হারনান কর্টৈজ স্পেন থেকে তার লুটেরা বাহিনী নিয়ে হাজির হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধ আজটেকরা পরাজিত হলে সে সভ্যতার উপর যবনিকা নেমে আসে।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নবাবজাদি পরিবানু

নিউজ ডেস্ক

May 31, 2026

শেয়ার করুন

পুরান ঢাকার নবাব পরিবারের ইতিহাস মানেই শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজকল্যাণে নারীদের এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। আর এই মহীয়সী নারীদের তালিকায় অন্যতম একটি নাম হলো নবাবজাদি পরিবানু। ঢাকার বিখ্যাত ‘পরিবাক’ এলাকাটির নামকরণ এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

নবাবজাদি পরিবানু ১৮৮৪ সালের ১ জুলাই পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন।

  • পিতা: ঢাকার বিখ্যাত নবাব খাজা আহসান উল্লাহ।
  • মাতা: কামরুন্নেসা বেগম।

তিনি কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে না গেলেও, तत्कालीन পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী গৃহশিক্ষক ও গৃহপরিচারিকার নিকট থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আরবি, ফারসি এবং ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করেন।

২. দৃঢ় মনোবল ও জমিদারির কাজকর্ম

পরিবানু কেবল গৃহকোণে আবদ্ধ বিদুষী নারীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।

  • ঘোড়সওয়ারি: তৎকালীন সময়ে একজন মুসলিম সম্ভ্রান্ত নারী হয়েও তিনি চমৎকারভাবে ঘোড়ায় চড়া শিখেছিলেন।
  • উত্তরাধিকারী হওয়ার পরিকল্পনা: তাঁর মেধা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে পিতা নবাব আহসান উল্লাহ তাঁকে জমিদারির নানাবিধ কাজকর্ম শেখান। এমনকি এক পর্যায়ে পরিবানুকে তাঁর জমিদারির মূল উত্তরাধিকারী করার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নবাব বাহাদুরের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি।

৩. ‘পরিবাক’ নামকরণের নেপথ্য ইতিহাস

১৯০০ সালে নবাব পরিবারের খাজা ভোলা মিয়ার পুত্র খাজা বদরুদ্দিনের সাথে পরিবানুর বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং বিয়ের পর তিনি ঢাকার দিলখুশায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নেয় আজকের ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা ‘পরিবাক’।

  • شاہবাগ বাগানবাড়ির নিয়ন্ত্রণ: ১৯১৯ সালে পরিবানু ৬০ বিঘা জমিসহ ঢাকার শাহবাগ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশ তৎকালীন নবাব হাবিবুল্লাহর কাছ থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
  • নারীদের জন্য উন্মুক্ত উদ্যান: বাগানটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর, তিনি ঢাকার সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বিনোদন ও বেড়ানোর জন্য প্রতি শনিবার সেটি উন্মুক্ত রাখার বিশেষ ব্যবস্থা করেন।
  • পরিবাক নামের উৎপত্তি: পরিবানুর নাম এবং তাঁর এই সুন্দর বাগানবাড়ির ঐতিহ্য থেকেই পরবর্তীকালে পুরো এলাকাটি জনমুখে ‘পরিবাক’ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

৪. নারী শিক্ষায় অবদান: কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল

ঢাকায় নারী শিক্ষার প্রসারে নবাবজাদি পরিবানুর অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯২৪ সালে ঢাকার নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ‘কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্কুলটির প্রতিষ্ঠা এবং এর সার্বিক উন্নয়নে নবাবজাদি পরিবানু এবং তাঁর অপর বোনেরা মিলে তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন, যা নারী শিক্ষার ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।

৫. এক নজরে নবাবজাদি পরিবানুর জীবন ও কর্ম ম্যাট্রিক্স

ঢাকার নবাব পরিবারের অন্যতম বিদুষী ও দূরদর্শী নারী নবাবজাদি পরিবানু-র জীবন ও সমাজসেবামূলক কাজের বিবরণ নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো :

পরিমাপক (Criteria) নবাবজাদি পরিবানুর জীবন ও কর্মের বিবরণ
জন্ম ও বংশ পরিচয়১ জুলাই ১৮৮৪ সালে পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিলে জন্ম । পিতা: নবাব খাজা আহসান উল্লাহ এবং মাতা: কামরুন্নেসা বেগম
ব্যতিক্রমী শিক্ষা ও দক্ষতাগৃহশিক্ষকের কাছে আরবি, ফারসি ও ইংরেজি শেখেন । অনন্য দক্ষতার কারণে ঘোড়সওয়ারী এবং জমিদারির কাজও শিখেছিলেন
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন১৯০০ সালে নবাব পরিবারের খাজা ভোলা মিয়ার পুত্র খাজা বদরুদ্দিনের সাথে বিয়ে হয় । তিনি দিলকুশায় বসবাস করতেন
‘পরিববাগ’ এলাকার রূপকার১৯১৯ সালে শাহবাগ বাগানবাড়ির ৬০ বিঘা জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন । সম্ভ্রান্ত নারীদের বিনোদনের জন্য প্রতি শনিবার বাগানটি উন্মুক্ত রাখতেন, যা থেকে এলাকাটি পরবর্তীতে পরিপাগ নামে পরিচিত হয়
শিক্ষা বিস্তারে অবদান১৯২৪ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে নারীদের শিক্ষার জন্য নিজের মায়ের নামে কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন । এই স্কুলের উন্নয়নে তিনি ও তাঁর বোনেরা মিলে তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করেন
মৃত্যু১৯৫৮ সালে এই বিদুষী নারী মৃত্যুবরণ করেন

ম্যাট্রিক্সের মূল সারসংক্ষেপ

নবাবজাদি পরিবানু ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত এবং সেকালের একজন প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব । তাঁর প্রতিষ্ঠিত কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলটি ১৯৪৭ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয় এবং এটি আজও পুরান ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নারী শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে

৬. জীবনাবসান ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

এই মহীয়সী ও বিদুষী নারী ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ঢাকার বেগমবাজারের নবাব পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। ঢাকার ইতিহাস ও নারীর ক্ষমতায়নের এই নীরব রূপকারের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ

একজন ইতিহাস ও কন্টেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে আমি মনে করি, ঢাকার স্থানীয় ইতিহাস (Local History) নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের জন্য নবাবজাদি পরিবানুর মতো চরিত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের পেছনে যে কত রোমাঞ্চকর এবং গৌরবময় ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তার এক অনন্য প্রমাণ হলো ‘পরিবাক’। ১৯২৪ সালে তাঁর ও তাঁর বোনেদের দেওয়া লক্ষাধিক টাকার অনুদানই আজকের কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলের ভিত্তি, যা তৎকালীন মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছিল। এই ধরণের ঐতিহাসিক কন্টেন্টগুলো ইন্টারনেটে সঠিক তথ্যসহ ডিজিটাল আর্কাইভ হিসেবে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

অনুমোদিত লেখক: BDS Bulbul Ahmed

ইতিহাস ও কন্টেন্ট অ্যানালিস্ট

আমার কাজের পোর্টফোলিও ও ডিজিটাল গ্রোথ স্ট্র্যাটেজি দেখতে ভিজিট করুন: bdsbulbulahmed.com

১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ