ইতিহাস

তারেক রহমান: জিয়া পরিবার থেকে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী—তিন দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কাহিনি
জিয়া পরিবার

নিউজ ডেস্ক

September 9, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)

বিভাগ (Category): রাজনীতি, জাতীয়

প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

তথ্যসূত্র (Sources): উইকিপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, বিএসএস, বিবিসি বাংলা এবং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।

ঢাকা: ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথ নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান—দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এই শপথগ্রহণ কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল ছিল না; বরং এটি ছিল সতেরো বছরের নির্বাসিত জীবন, শতাধিক মামলা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের এক নাটকীয় পরিণতি। তারেক রহমানের এই উত্থানকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে।

শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন

শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন অধ্যায়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারের উত্থান, ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার ঐতিহাসিক পটভূমিকে নির্দেশ করে। এই শিকড় মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রোথিত হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক যাত্রার মূল ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এবং স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে, তখন সারা দেশ এক গভীর অনিশ্চয়তা ও নেতৃত্বহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। এই সংকটময় মুহূর্তে ২৬শে মার্চ এবং পরবর্তী ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক কর্মকর্তা, সাধারণ জনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পূর্ব বাংলার সশস্ত্র প্রতিরোধের এক বৈধ নৈতিক ভিত্তি এনে দেয়। এটি ছিল রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আত্মপ্রকাশের প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক শিকড়।

২. সম্মুখসমর ও ‘জেড ফোর্স’ গঠন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টরের প্রধান হন। জুলাই মাসে তাঁর নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। তাঁর ক্ষুরধার রণকৌশল ও বীরত্বপূর্ণ কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সম্মুখসমরে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।

৩. নেপথ্যের শক্তি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া
মেজর জিয়া যখন সম্মুখসমরে ব্যস্ত, তখন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গৃহবন্দী ও অবরুদ্ধ হন। যুদ্ধ চলাকালে মেজর জিয়ার মনোবল ভাঙতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁর ওপর তীব্র মানসিক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু কোনো রকম আপস না করে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পরিবারকে আগলে রাখা এবং তথ্য গোপন রাখার অনমনীয় মনোভাবের কারণে তাঁকে অবদমিত করা সম্ভব হয়নি। এই ত্যাগ ও মানসিক দৃঢ়তা জিয়া পরিবারের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।

৪. ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও সিপাহি-জনতার বিপ্লব
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে এক চরম অস্থিতিশীলতা ও একের পর এক পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। ৩রা নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এর চার দিন পর, ৭ই নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে এবং সাধারণ সিপাহি ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক ‘সিপাহি-জনতা বিপ্লব’ সংঘটিত হয়। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

৫. রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন এবং রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা
৭ই নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়া পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি স্থায়ী রূপ লাভ করে।

রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায়

রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায় অংশটি জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম, বিশেষ করে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী, ঝোড়ো এবং সমালোচিত সময়কালকে নির্দেশ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একদিকে যেমন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়, অন্যদিকে তেমনি দুর্নীতি, সমান্তরাল শাসনকেন্দ্র পরিচালনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর বিতর্কিত অধ্যায়েরও জন্ম হয়।

এই অধ্যায়ের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।

১. সাংগঠনিক উত্থান ও তৃণমূল রাজনীতি বিকেন্দ্রীকরণ
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পর তারেক রহমান দলের ভেতরে নিজের অবস্থান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করেন। ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি প্রথাগত ড্রয়িংরুম রাজনীতি ভেঙে দেশজুড়ে তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলনের এক অভিনব কর্মসূচি শুরু করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নেতাকর্মীদের সরাসরি ঢাকায় এসে শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে তিনি দলের ভেতর এক তরুণ ও অনুগত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলেন, যা তাঁকে দলের অলিখিত প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করে।

২. ‘হাওয়া ভবন’ এবং সমান্তরাল শাসনকেন্দ্রের বিতর্ক
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি ছিল ঢাকার বনানীতে অবস্থিত তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবন’। অভিযোগ ওঠে যে, তৎকালীন সরকারের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় হলেও, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ, বড় বড় সরকারি টেন্ডার, আমলাদের পদায়ন এবং বদলির সিদ্ধান্তগুলো এই হাওয়া ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো। সমালোচক এবং তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি সরকারের ভেতরে এক সমান্তরাল ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল, যা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলে।

৩. ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ
এই সময়কালে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যুৎ খাত, তার ও যোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে খাম্বা লিমিটেডের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিদ্যুতের খুঁটি বসানোর নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগটি সে সময় জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও সে সময় হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা তথ্য উঠে আসে, যা তাঁর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৪. ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও রাষ্ট্রীয় মদদের অভিযোগ
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও বিতর্কিত অধ্যায়টি ঘটে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ ওঠে যে, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের নেপথ্য আশ্রয়দাতা ছিলেন তারেক রহমান এবং হাওয়া ভবনেই এই হামলার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম সহিংসতা ও দুই দলের মধ্যকার স্থায়ী শত্রুতার দেয়াল তুলে দেয়।

৫. ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার ফলে বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল আমলাতন্ত্রে দলীয়করণের যে নতুন মাত্রা যোগ হয়, তার পেছনে তারেক রহমানের প্রভাব বলয়কে দায়ী করা হয়। যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারিতা ও হাওয়া ভবনের প্রতি আনুগত্যই পদোন্নতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ভিন্নমত দমন ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই শাসনামলটি সাধারণ নাগরিক সমাজের কাছে একটি ভয়ের রাজত্ব হিসেবে সমালোচিত হয়, যা পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১/১১-এর জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।


দীর্ঘ নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায়

তারেক রহমানের নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায় শিরোনামটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অধ্যায়কে নির্দেশ করে। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পর, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) পাড়ি জমান। এরপর থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে বা স্বনির্বাসিত জীবনে থেকেও দূর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় দল পরিচালনা করে তিনি এক নতুন ধারার রাজনীতি গড়ে তোলেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ নির্বাসনের দিনগুলো এবং রাজনীতি পরিচালনার ভিন্নধর্মী কৌশলগুলোর মূল দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

১. নির্বাসনের পটভূমি ও দলের নেতৃত্ব গ্রহণ

  • লন্ডনে অবস্থান (২০০৮-২০২৫): ২০০৮ সালে দেশ ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও সাজা দেওয়া হয়, যা বিএনপি সবসময় “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করে এসেছে।
  • ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব (২০১৮): ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর, তারেক রহমান লন্ডন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

২. ভার্চুয়াল যুগে দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি (Remote Politics)

  • প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ভিডিও কনফারেন্স, জুম মিটিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
  • দলীয় শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠন: নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেই তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, নতুন কমিটি গঠন এবং দেশব্যাপী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের দিকনির্দেশনা প্রবাস থেকেই নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেন।

৩. আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক তৎপরতা

  • কূটনৈতিক যোগাযোগ: লন্ডনে অবস্থানকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
  • নতুন রাজনৈতিক বার্তা: প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে তিনি বিএনপির ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজ করেন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে “রাষ্ট্র সংস্কার” ও “জনগণের অধিকারের” ওপর জোর দেন।

৪. ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ

  • স্বদেশ প্রত্যাবর্তন (ডিসেম্বর ২০২৫): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২৫শে ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
  • ২০২৬-এর নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রিত্ব: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। দীর্ঘ নির্বাসন এবং বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতার পথে

তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতা আরোহণের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস বা নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি কেবল দেশে ফিরে আসেননি, বরং অত্যন্ত সফলভাবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন

তারেক রহমানের নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রাপথকে মূলত নিচের ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

১. নির্বাসন থেকে ভার্চুয়াল রাজনীতি ও দলীয় পুনর্গঠন

  • ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব: ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) যাওয়ার পর থেকে তিনি প্রবাসে ছিলেন। ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হলে তিনি দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
  • দূর নিয়ন্ত্রিত বা ভার্চুয়াল রাজনীতি (Remote Politics): আট হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও তিনি প্রযুক্তির (জুম, ভিডিও কনফারেন্স) সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি যুক্ত হন। এই দীর্ঘ সময়ে দলের ভাঙন রোধ করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখা তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসে থেকেই তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত করতে তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন

২. রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও দলের পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণ

  • ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন (২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫): ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উচ্চ আদালত কর্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর, ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর তারেক রহমান তাঁর পরিবারসহ বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ঢাকার বিমানবন্দরসহ পুরো রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের ঢল তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে এক রাজসিক রূপ দেয়।
  • চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ (৯ জানুয়ারি, ২০২৬): প্রবাসে থাকার সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকলেও, মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলটির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে।

৩. ২০২৬ সালের নির্বাচন ও অভূতপূর্ব বিজয়

  • নির্বাচনী প্রচারণা ও ‘৩১ দফা রূপরেখা’: দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমান নির্বাচনের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন। তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য তাঁর দলের বিখ্যাত ‘৩১ দফা রূপরেখা’ এবং ‘We Have a Plan’ স্লোগানের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম (Gen-Z) ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বার্তা পৌঁছে দেন।
  • ভূমিধস বিজয়: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ দুটি আসন থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন (পরবর্তীতে তিনি বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেন)। তাঁর জাদুকরী নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।

৪. প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ

  • প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬): নির্বাচন জয়ের পর ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলা দুই নারী নেত্রীর (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) পালাক্রমিক শাসনের অবসান ঘটে এবং এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়।

২০২৬ সালের নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রীর আসনে আরোহণ

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়, এবং পরের দিন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণেও তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদের শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলের পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি, তিনি বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান, এবং তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার আরও ৩০ জন সদস্যও শপথ নেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের অভ্যন্তরে নয়, বরং জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়—যা প্রতীকীভাবে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দেয় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সরকার

শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা—বাংলাদেশের ২৪তম মন্ত্রিসভা—দ্রুত দপ্তর বণ্টন সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পান। ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে কোনো পুরুষ ব্যক্তি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।

বিশ্লেষণ: এক পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন

তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন, ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ কেবলই কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য “পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা” বা বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের এক ধ্রুপদী প্রতিফলন।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারাটি দুটি প্রধান পরিবারের সমান্তরাল উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়েছে। তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থানকে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার আলোকেই নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনের উত্তরাধিকার

  • দলীয় ভিত্তি ও জাতীয়তাবাদ: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। তাঁর রাজনীতিতে আগমন এবং ক্ষমতা আরোহণের মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁর বাবার তৈরি করা “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর আদর্শ ও এর বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী।
  • তৃণমূল সংযোগের অনুকরণ: শহীদ জিয়া যেভাবে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তৃণমূলের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন, তারেক রহমানও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে (বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে) দেশব্যাপী “তৃণমূল সম্মেলন” এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাবার সেই রাজনীতির মডেল পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

২. খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের উত্তরাধিকার

  • সংকটকালে দলের হাল ধরা: ঠিক যেভাবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এক চরম সংকটময় মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসে দলের ভাঙন রোধ করেছিলেন, একইভাবে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবরণের পর প্রবাসে থাকা অবস্থাতেই তারেক রহমান বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দলের হাল ধরেন।
  • প্রতীকী নেতৃত্ব ও আবেগীয় সংযোগ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জিয়া পরিবার” সমর্থকদের কাছে এক বিশাল আবেগের নাম। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতা ও প্রয়াণের পর তারেক রহমানের মধ্যে সমর্থকেরা সেই একই আপসহীন ও অবিচল নেতৃত্বের ছায়া খুঁজে পেয়েছে, যা দলটিকে কঠিন পরিস্থিতিতেও ঐক্যবদ্ধ রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

৩. ধারাবাহিকতার সমান্তরালে আধুনিকায়ন (Evolution)

পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেও তারেক রহমানের রাজনীতি পরিচালনার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক ও ভিন্নধর্মী:

  • ভার্চুয়াল ও দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি: প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর সুদূর লন্ডন থেকে আধুনিক প্রযুক্তির (জুম, স্কাইপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) সাহায্যে দল পরিচালনা করেছেন—যা পারিবারিক ধারাবাহিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা।
  • তরুণ প্রজন্মের সাথে সংযোগ: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি প্রথাগত প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’ এবং নতুন ভিশনের কথা বলে নতুন প্রজন্মের (Gen-Z) আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।

৪. দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির সাধারণ সমীকরণ

  • নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও উত্তরাধিকার: নেহেরু-গান্ধী পরিবার (ভারত), ভুট্টো পরিবার (পাকিস্তান) কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের (বাংলাদেশ) মতোই তারেক রহমানের এই ক্ষমতায় আরোহণ প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের একতাবদ্ধ রাখার জন্য একটি সুপরিচিত “পারিবারিক মুখ বা প্রতীক” এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

উপসংহার:
তারেক রহমানের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো মূলত শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি এবং তারেক রহমানের নিজস্ব আধুনিক কৌশলগত দূরদর্শিতার এক ত্রিমাত্রিক সমন্বয়। এটি প্রমাণ করে যে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনীতির কৌশল বদলালেও, পারিবারিক লিগ্যাসি বা ধারাবাহিকতা এখনও বাংলাদেশের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিনিধি : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক, অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশের সময় ও তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,

স্থান: ঢাকা

ঢাকা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাত ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ (১৯৩৯-১৯৪৫)-এর ফলাফলে যে সামরিক শক্তিটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, তা হলো অবিভক্ত ভারতের সামরিক বাহিনী। বিশ্বজুড়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উপস্থিতি থাকলেও, যুদ্ধের ময়দানে মিত্রবাহিনীর অন্যতম মূল শক্তি ছিল ভারতীয় তরুণরা। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়ে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির যুদ্ধ হলেও ভারতীয় সেনাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছে।

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী

১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, তখন অবিভক্ত ভারতীয় সাঁজোয়া বহরে সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২৫ লাক্ষে (২.৫ মিলিয়ন)।

এই বিশাল সামরিক সমাবেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এতে কোনো বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ (Conscription) ছিল না। সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই বাহিনীটি ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ‘অল-ভলান্টিয়ার আর্মি’ বা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী হিসেবে বিশ্ব রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

[১৯৩৯: ২ লাখ সৈন্য] ──► স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ ──► [১৯৪৫: ২৫ লাখ সৈন্য (সর্ববৃহৎ ভলান্টিয়ার বাহিনী)]

তিন মহাদেশের রণক্ষেত্র ও বীরত্বের চিহ্ন

ভারতীয় সৈন্যরা কেবল এশিয়ার মাটিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ—এই তিন মহাদেশের বিভিন্ন দুর্গম ও প্রতিকূল যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন।

  • আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য অভিযান: উত্তর আফ্রিকায় জার্মানি ও ইতালির যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে ভারতীয় সৈন্যরা কৌশলগত সাফল্য এনে দেন।
  • ইতালি অভিযান ও মন্টি ক্যাসিনো: ইউরোপের ইতালি অভিযানে মিত্রবাহিনীর জয়ে ভারতীয়দের ভূমিকা ছিল অসামান্য। বিশেষ করে রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অফ মন্টি ক্যাসিনো’ মুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের পরাক্রম বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
  • বার্মা ও ইম্ফল-কোহিমার যুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিত্রবাহিনীর অবস্থান টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সৈন্যরা বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিযানে অংশ নেন। ১৯৪৪ সালে ভারতের ইম্ফল ও কোহিমার যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে তারা জাপানি বাহিনীর ভারত আক্রমণের চূড়ান্ত আগ্রাসন রুখে দেন।

যুদ্ধের ময়দানে অসাধারণ সাহসিকতা ও বীরত্ব প্রদর্শনের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারতীয় সৈন্যদের ৩১টি ‘ভিক্টোরিয়া ক্রস’ (ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সম্মাননা) প্রদান করা হয়, যা সমগ্র মিত্রবাহিনীর অর্জিত মোট ভিক্টোরিয়া ক্রসের প্রায় ১৫ শতাংশ।

ক্ষয়ক্ষতি ও বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে গিয়ে ভারতীয় বাহিনীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় ৮৭,০০০ থেকে ৮৯,০০০ ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন। এছাড়া হাজার হাজার সেনা গুরুতর আহত হন এবং একটি বিশাল অংশ শত্রু শিবিরে বন্দী হিসেবে আটক থাকেন।

সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল তৎকালীন বাংলায়। যুদ্ধের রশদ ও খাদ্যসামগ্রী যুদ্ধক্ষেত্রে জোগাতে গিয়ে তৈরি হয় ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষ। প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও যুদ্ধের বলি হয়ে বাংলায় প্রায় ৩০ লাখ সাধারণ বেসামরিক নাগরিক অনাহারে প্রাণ হারান।

[দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ] ──► রসদ ও খাদ্য স্থানান্তর ──► ১৯৪৩-এর বাংলা দুর্ভিক্ষ ──► ৩০ লাখ বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু

দ্বিমুখী ধারা: ব্রিটিশ রাজ বনাম আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান দুটি ভিন্ন ও ঐতিহাসিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

১. ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনী: একটি বিশাল অংশ ব্রিটিশ পতাকাতলে থেকে মিত্রবাহিনীর হয়ে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।

২. আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): অন্যদিকে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় জাপানিদের হাতে বন্দী হওয়া হাজার হাজার ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আহবানে সাড়া দিয়ে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এ যোগ দেন। তারা অক্ষশক্তির সমর্থন নিয়ে ব্রিটিশদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরাসরি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

স্বাধীনতার সূচনা ও ইতিহাসের মূল্যায়ন

যুদ্ধের সমাপ্তি এবং ভারতীয় সেনাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভকে ত্বরান্বিত করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ ফিল্ড মার্শাল ক্লদ অচিনলেক স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতীয় সৈন্যদের অসামান্য অবদান ছাড়া ব্রিটেন দুটি বিশ্বযুদ্ধের কোনোটিতেই জয়লাভ করতে পারত না।

স্বাধীনতার পর বহু বছর ধরে এই ইতিহাসকে কিছুটা আড়ালে রাখা হয়েছিল—কেননা রাজনৈতিকভাবে এটিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি রক্ষার যুদ্ধ হিসেবে দেখা হতো। তবে আধুনিক সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব রাজনীতি পুনর্গঠনে এবং স্বাধীন উপমহাদেশের ভিত্তি তৈরিতে ২৫ লাখ ভারতীয় সেনার এই মহাকাব্যিক বীরত্ব ও আত্মত্যাগ ছিল অন্যতম প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ব্লু স্টার

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): আন্তর্জাতিক, ইতিহাস
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): Encyclopaedia Britannica, BBC আর্কাইভ প্রতিবেদন, ভারতীয় সরকারি নথি ও সংসদীয় বিবৃতি, শিখ ঐতিহাসিক সংকলন (SikhiWiki), সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।

অপারেশন ব্লু স্টার ছিল ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সামরিক অভিযান, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত শিখ ধর্মের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির (হরমন্দির সাহিব) কমপ্লেক্সে পরিচালিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও গভীর প্রভাব ফেলা ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই অভিযান শুধু পাঞ্জাবের রাজনীতিই নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সমীকরণকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করেছে।

পটভূমি: ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষ

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া অসন্তোষের পটভূমি মূলত ভারতের স্বাধীনতার পর পাঞ্জাবের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের সময় শিখ সম্প্রদায় ভারতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে খুব দ্রুতই তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হতে শুরু করে।

এই অসন্তোষের মূল কারণ এবং ঘটনাক্রম নিচে দেওয়া হলো:

  • পাঞ্জাবি সুবা আন্দোলন: স্বাধীনতার পর ভারত সরকার ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে। শিখদের মূল দাবি ছিল পাঞ্জাবি ভাষী অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘পাঞ্জাবি সুবা’ বা একটি পৃথক রাজ্য গঠন করা। তবে তৎকালীন নেহেরু সরকার শুরুতে এই দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা শিখদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৬৬ সালে পাঞ্জাবকে ভেঙে পাঞ্জাবিভাষী পাঞ্জাব এবং হিন্দিভাষী হরিয়ানা রাজ্য গঠন করা হয়।
  • চণ্ডীগড় এবং জলবণ্টন নিয়ে বিরোধ: ১৯৬৬ সালের বিভাজনের সময় পাঞ্জাবের ঐতিহাসিক শহর চণ্ডীগড়কে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় রাজ্যের যৌথ রাজধানী এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হয়। শিখদের দাবি ছিল চণ্ডীগড়কে পুরোপুরি পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্ত করা। এর পাশাপাশি পাঞ্জাবের নদীগুলোর পানির একটি বড় অংশ অন্য রাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
  • আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব (১৯৭৩): ১৯৭৩ সালে শিখদের প্রধান রাজনৈতিক দল শিরোমণি আকালি দল ‘আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাব’ উত্থাপন করে। এই প্রস্তাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করে পাঞ্জাবকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাজ্যের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং শিখ ধর্মের বিশেষ স্বীকৃতি। তবে তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এটিকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করে প্রত্যাখ্যান করে।
  • ধর্মীয় ও সামাজিক রূপান্তর: ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে পাঞ্জাবে ‘সবুজ বিপ্লব’ বা কৃষিক্ষেত্রে বিশাল উন্নতি হয়। এর ফলে অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটলেও যুবসমাজের মধ্যে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব এবং শিখ ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মতো ধর্মীয় প্রচারকরা শিখদের ঐতিহ্যগত ও গোঁড়া ধর্মীয় রীতিনীতিতে ফিরে আসার আহ্বান জানান, যা গ্রামীণ ও অসন্তুষ্ট শিখ যুবকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অসন্তোষই পরবর্তীতে আশির দশকে খালিস্তান আন্দোলন এবং অপারেশন ব্লু স্টারের মতো চরম সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়।

জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান

জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থান ছিল আধুনিক ভারতের ইতিহাসে অন্যতম একটি জটিল ও প্রভাববিস্তারকারী অধ্যায়। একজন সাধারণ গ্রামীণ ধর্মীয় প্রচারক থেকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তিনি শিখ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন [১.২.২, ১.২.৫]।

তাঁর এই নাটকীয় উত্থানের মূল ধাপ ও কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • দমদমি টাকশালের প্রধান পদ লাভ: ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া ভিন্দ্রানওয়ালে শুরুতে পাঞ্জাবের একটি ঐতিহ্যবাহী শিখ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দমদমি টাকশাল’-এ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন । ১৯৭৭ সালে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান করতার সিং খলসার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভিন্দ্রানওয়ালেকে দমদমি টাকশালের পরবর্তী প্রধান বা ‘সন্ত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় । এখান থেকেই তাঁর জনসাধারণের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয় ।
  • ধর্মীয় সংস্কার ও জনপ্রিয়তা: টাকশালের প্রধান হয়ে তিনি পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে ঘুরে কট্টর শিখ ধর্মের প্রচার শুরু করেন। তিনি শিখ যুবসমাজকে মাদক, তামাক ও মদ্যপান ত্যাগ করার আহ্বান জানান এবং শিখ ধর্মের মৌলিক রীতিনীতি (যেমন চুল ও দাড়ি না কাটা) কঠোরভাবে মেনে চলতে বলেন । আধুনিকায়নের ফলে দিকভ্রান্ত গ্রামীণ যুবসমাজ এবং প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে তাঁর এই আহ্বান ব্যাপক সাড়া ফেলে।
  • ১৯৭৮ সালের অমৃতসর সংঘর্ষ: ১৯৭৮ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখী দিবসে অমৃতসরে ভিন্দ্রানওয়ালের অনুসারীদের সাথে ‘নিরঙ্কারী’ নামক একটি শিখ উপদলের বড় ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে ভিন্দ্রানওয়ালের পক্ষের বেশ কয়েকজন শিখ মারা যান । এই ঘটনার পর ভিন্দ্রানওয়ালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে এবং শিখদের সুরক্ষায় আরও উগ্র ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন, যা তাঁকে শিখ উগ্রপন্থীদের প্রধান নেতায় পরিণত করে।
  • কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমর্থন ও ব্যবহার: ভিন্দ্রানওয়ালের উত্থানের পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের একাংশের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল । পাঞ্জাবের আঞ্চলিক শিখ দল ‘শিরোমণি আকালি দল’-এর রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার জন্য ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী এবং কংগ্রেস নেতা জ্ঞানী জৈল সিং প্রথম দিকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেসের এই কৌশল পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ভিন্দ্রানওয়ালে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ লাইনের বাইরে চলে যান
  • লালা জগত নারায়ণের হত্যাকাণ্ড ও গ্রেফতারের নাটক: ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের উগ্রপন্থা বিরোধী প্রভাবশালী সংবাদপত্র সম্পাদক লালা জগত নারায়ণ নিহত হন । এই হত্যাকাণ্ডে ভিন্দ্রানওয়ালের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হলে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের জন্য কঠোর শর্ত দেন । পরবর্তীতে প্রমাণের অভাবে তিনি যখন জেল থেকে মুক্তি পান, তখন শিখদের একটি বড় অংশের কাছে তিনি এমন এক ‘নায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন যিনি সরাসরি ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়েছেন ।
  • চরমপন্থা ও স্বর্ণমন্দির দখল: ১৯৮২ সালের পর থেকে ভিন্দ্রানওয়ালে আকালি দলের সাথে যুক্ত হয়ে পাঞ্জাবের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ‘ধরম যুদ্ধ মোর্চা’ আন্দোলন শুরু করেন । গ্রেফতার এড়াতে এবং নিজের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে শিখদের পবিত্রতম স্থান স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান নেন এবং পরবর্তীতে আকাল তখত ভবনটি দখল করে সেটিকে দুর্গে পরিণত করেন ।

স্বর্ণমন্দিরের ভেতর থেকে তাঁর সমান্তরাল শাসন এবং সশস্ত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই ১৯৮৪ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ পরিচালনা করতে বাধ্য হয়, যেখানে তিনি নিহত হন ।

অভিযানের বিবরণ (১ জুন – ৮ জুন, ১৯৮৪)

১৯৮৪ সালের ১ থেকে ৮ জুন তারিখের মধ্যে প্রধান ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন ভিন্ন দিনকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দিনগুলোতে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির অবরুদ্ধ থেকে শুরু করা পুরো চত্বর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করা হয় :

১ জুন ১৯৮৪: প্রাথমিক গোলাবর্ষণ ও অবরোধ

  • দুপুরের দিকে স্বর্ণমন্দির চত্বরের বাইরে অবস্থান নেওয়া আধাসামরিক বাহিনী এবং ভেতর থেকে শিখ চরমপন্থীদের মধ্যে প্রথম বড় ধরণের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়
  • এই প্রাথমিক গোলাবর্ষণে স্বর্ণমন্দিরের মূল ভবন ও লঙ্গরখানার দেয়ালে বেশ কিছু গুলির আঘাত লাগে [১.২.৩]। এই সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন [

২ জুন ১৯৮৪: রাজ্য অবরুদ্ধ ও কার্ফিউ

  • ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় এবং পুরো রাজ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় ।
  • রাজ্যজুড়ে কড়া কার্ফিউ জারি করা হয় এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় । সব বিদেশী সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমকে পাঞ্জাব থেকে বের করে দেওয়া হয় ।

৩ জুন ১৯৮৪: তীর্থযাত্রীদের অবরুদ্ধ হওয়া

  • এই দিনটি ছিল শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবস । এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কারণে হাজার হাজার সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী আগে থেকেই স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থান করছিলেন ।
  • কার্ফিউর কারণে প্রায় ১০ হাজার তীর্থযাত্রী মন্দিরের ভেতরে আটকা পড়েন । সামরিক বাহিনী পুরো স্বর্ণমন্দিরের প্রবেশ ও নিকাশ পথগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে ।

৪ জুন ১৯৮৪: বড় ধরণের আক্রমণ শুরু

  • সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্বর্ণমন্দিরের উগ্রপন্থীদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র ও মর্টার দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করা হয়।
  • মন্দিরের বাইরের প্রাচীর এবং রামগড়িয়া বুঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি ওয়াচ টাওয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যাতে ভেতরে থাকা উগ্রপন্থীদের নজরদারি বন্ধ করা যায়। ভেতর থেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও শিখ চরমপন্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে।

৫ জুন ১৯৮৪: মূল চত্বরে প্রবেশ ও তীব্র প্রতিরোধ

  • রাত ১০টার দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো এবং পদাতিক বাহিনী মূল মন্দির চত্বরের ভেতরে (পরিক্রমা এলাকায়) প্রবেশের চেষ্টা করে।
  • মেজর জেনারেল কে এস ব্রার এবং জেনারেল সুন্দরজীর নেতৃত্বে সেনারা ভেতরে ঢুকলে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের সামরিক উপদেষ্টা সাবেক মেজর জেনারেল সাবেগ সিংয়ের সুপরিকল্পিত হালকা ও মাঝারি মেশিনগানের প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তীব্র প্রতিরক্ষার কারণে সেনাবাহিনীর প্রথম দিকের কমান্ডো অপারেশন ব্যর্থ হয় এবং বহু সেনা সদস্য হতাহত হন।

৬ জুন ১৯৮৪: ট্যাংকের ব্যবহার ও আকাল তখত ধ্বংস

  • প্রথম সারির পদাতিক বাহিনী চরমপন্থীদের বাঙ্কার ও সুরক্ষিত অবস্থানগুলো ভাঙতে ব্যর্থ হলে, ৬ জুন ভোরের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে মূল চত্বরের ভেতরে ভারী বিজয়ন্ত ট্যাংক প্রবেশ করানো হয় ।
  • ট্যাংকের ১০৫ মিলিমিটার কামানের শক্তিশালী গোলাবর্ষণে শিখদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক আসন ‘আকাল তখত’ ভবনটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় । এই দিনই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে, সাবেগ সিং এবং আমরিক সিংয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় ।

৭ জুন ১৯৮৪: তল্লাশি ও ছোটখাটো প্রতিরোধ দমন

  • স্বর্ণমন্দিরের মূল প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার পর সেনাবাহিনী পুরো কমপ্লেক্সের প্রতিটি ঘর, বেজমেন্ট এবং সুড়ঙ্গে তল্লাশি অভিযান শুরু করে।
  • আকাল তখতের আশেপাশের বিভিন্ন গোপন বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা বাকি চরমপন্থীদের সাথে সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ চলতে থাকে এবং অনেকেই আত্মসমর্পণ করতে শুরু করে।

৮ জুন ১৯৮৪: সম্পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

  • ৮ জুনের মধ্যে স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরের সব ধরণের প্রতিরোধ পুরোপুরি দমন করা হয় এবং পুরো চত্বরটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে
  • তবে এই অভিযানের সময় বা এর পরপরই স্বর্ণমন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘শিখ রেফারেন্স লাইব্রেরি’ আগুনে পুড়ে যায়, যার ফলে বহু প্রাচীন ও অমূল্য শিখ পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায় ।

এই ৮ দিনের তীব্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে স্বর্ণমন্দিরের মূল সামরিক অপারেশনটি সমাপ্ত হয়, যা পরবর্তীতে পাঞ্জাবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

অপারেশন ব্লু স্টারে কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন, সেই হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভারত সরকার এবং শিখ সংগঠন ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে শুরু থেকেই তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য রয়েছে । ঘটনার সময় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় কোনো নিরপেক্ষ পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

হতাহতের সংখ্যা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রধান দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভারত সরকারের অফিশিয়াল হিসাব (শ্বেতপত্র):

  • ১৯৮৪ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্র বা অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির চত্বরের ভেতরে সব মিলিয়ে ৪৯৩ জন চরমপন্থী ও বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিলেন ।
  • এই অভিযানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৪ জন অফিসারসহ মোট ৮৩ জন সেনা সদস্য নিহত এবং ২৪৯ জন আহত হন বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয় ।

শিখ সংগঠন ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর দাবি:

  • শিখ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠন এই সরকারি তথ্যকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে । তাদের দাবি অনুযায়ী, অভিযানে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, যার একটি বড় অংশই ছিল সাধারণ শিখ তীর্থযাত্রী ।
  • যেহেতু ৫ জুন শিখদের পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জুন দেবের শহীদ দিবসের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল, তাই আগে থেকেই মন্দিরের ভেতরে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ আটকা পড়েছিলেন । আক্রমণের সময় তারা ক্রসফায়ারে পড়ে প্রাণ হারান ।

মানবাধিকার সংস্থা ও সাংবাদিকদের অনুমান:

  • বিভিন্ন স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্স এবং এর আশেপাশের এলাকায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ এর কাছাকাছি ছিল । কোনো কোনো নিরপেক্ষ মানবাধিকার ফোরামের মতে, মোট নিহতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল ।
  • প্রখ্যাত সাংবাদিকদের একাংশের মতে, ঘটনার পর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তড়িঘড়ি করে শত শত মরদেহ ট্রাকে করে নিয়ে গণকবর বা একসঙ্গে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল (সিক্রেট মাস ক্রিমেশন), যার কারণে প্রকৃত সংখ্যাটি কখনো অফিশিয়ালি সামনে আসেনি ।

এমনকি পরবর্তীতে পাঞ্জাবের তৎকালীন গভর্নর বি ডি পান্ডে সহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরকারের দেওয়া ৭০০ বা ৮০০ জনের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান যে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা অন্তত ১,২০০ বা তার বেশি ছিল । এই তথ্যের বিশাল ব্যবধানের কারণেই অপারেশন ব্লু স্টারকে কেন্দ্র করে হতাহতের সংখ্যাটি আজও একটি বড় বিতর্কের বিষয়

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ও পরবর্তী সহিংসতা

অপারেশন ব্লু স্টার শিখ সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্ম দেয়, যা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। এর মাত্র চার মাস পর, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁরই দুই শিখ দেহরক্ষী কর্তৃক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই ভারতজুড়ে, বিশেষত দিল্লিতে, ভয়াবহ শিখবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়, যাতে বহু নিরীহ শিখ নাগরিক প্রাণ হারান — যা ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।

চার দশক পরের প্রাসঙ্গিকতা

২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও অপারেশন ব্লু স্টার দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ হয়ে আছে। প্রতি বছর জুন মাসে এর বার্ষিকীতে অমৃতসরে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়, আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখ প্রবাসী সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে এই ঘটনার স্মৃতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ভারত সরকারের দৃষ্টিতে এটি জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে — এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই ঘটনাটিকে আজও একটি জটিল ও বিতর্কিত ঐতিহাসিক অধ্যায়ে পরিণত করে রেখেছে।

উপসংহার

১৯৫০-এর দশকের পাঞ্জাবি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন কীভাবে ১৯৮৪ সালে একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থানে সামরিক অভিযানে রূপ নিল, আর তার পরিণতিতে কীভাবে একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিহত হলেন এবং ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হলো — অপারেশন ব্লু স্টার তারই একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা আজও ধর্ম, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ট্যাংক দুর্ঘটনা

নিউজ ডেস্ক

September 10, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): জাতীয়
প্রকাশের তারিখ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর), দ্য ডেইলি অবজারভার, ইত্তেফাক, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউজবাংলা২৪

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি নিয়মিত ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন চলাকালে একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর দুইজন সৈনিক নিহত হয়েছেন এবং একজন কর্মকর্তা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ঘটনাটির মূল বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

  • নিহত সেনাসদস্যদের পরিচয়: দুর্ঘটনায় নিহত দুই সৈনিক হলেন নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার আবু বকর সিদ্দিক ওরফে পিয়াস এবং রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার তাসনিম রিফাত। তাদের নিজ নিজ এলাকায় পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
  • আহত কর্মকর্তার চিকিৎসা: দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সেনা কর্মকর্তাকে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) স্থানান্তর করা হয়েছে।
  • তদন্ত কার্যক্রম: ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় ঠিক কী কারণে এই আকস্মিক বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।
  • ট্যাংকের মডেল: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমের রিপোর্টে ট্যাংকটিকে চীন থেকে আনা টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বলে দাবি করা হলেও সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো মডেলের কথা নিশ্চিত করা হয়নি।

ঘটনার বিবরণ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জের ট্যাংক দুর্ঘটনার তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

আইএসপিআর-এর সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো:

  • তদন্তের বর্তমান অবস্থা: সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় এই দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো চলমান রয়েছে। ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় ঠিক কী ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি বা আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে বের করার চেষ্টা চলছে।
  • অফিশিয়াল অবস্থান: সাধারণত সেনাবাহিনীর এই ধরণের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এবং সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে কিছুটা সময় লাগে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আইএসপিআর বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কোনো প্রাথমিক অনুমান বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
  • ট্যাংকের বিষয়: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংকের গোলার বিস্ফোরণ নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা তৈরি হলেও, সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটি এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিলমোহর বা মন্তব্য দেয়নি।

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বিস্তারিত

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক হলো মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত টি-৫৪এ ট্যাংকের একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত নকশার সংস্করণ। ১৯৫০-এর দশকে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অংশ হিসেবে এই প্রযুক্তিগত সহযোগিতা শুরু হয়েছিল । ১৯৫৯ সালে এই মডেলটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার ফলে এর নামকরণ করা হয় টাইপ ৫৯ ।

এই মডেলের প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:

  • উৎস ও উৎপাদন: এটি চীনের প্রথম নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত মাঝারি সারির প্রধান যুদ্ধ ট্যাংক (মেইন ব্যাটল ট্যাংক) । চীনের ইনার মঙ্গোলিয়ার বাওতু-তে অবস্থিত ফ্যাক্টরি ৬১৭ (যা বর্তমানে নরিনকো নামে পরিচিত) এই ট্যাংকটি তৈরি শুরু করে । ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি এই মডেলের ট্যাংক উৎপাদিত হয়েছিল ।
  • মূল নকশা ও অস্ত্রশস্ত্র: প্রাথমিক সংস্করণে এই ট্যাংকের ওজন ছিল প্রায় ৩৬ টন । এতে ১০০ মিলিমিটারের একটি রাইফেলড মেইন গান বা প্রধান কামান ব্যবহার করা হতো । পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্করণে এটি আধুনিকায়ন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ১০৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে শক্তিশালী কামান যুক্ত করা হয়
  • বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্যবহার: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে প্রথম চীন থেকে টাইপ ৫৯ ট্যাংক সংগ্রহ করে । পরবর্তীতে পুরোনো এই মডেলগুলোকে অবসরে না পাঠিয়ে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে বড় ধরণের আধুনিকায়ন করা হয় । এই আধুনিকায়নের পর ট্যাংকগুলোর নতুন নামকরণ করা হয় টাইপ ৫৯জি ‘দুর্জয়’ । এই আপগ্রেডেড সংস্করণে চীনা প্রযুক্তির সহায়তায় ১২৫ মিলিমিটারের স্মুথবোর গান এবং আধুনিক ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে
  • আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি: কয়েক দশক ধরে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির সাঁজোয়া বহরের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করা এই legacy মডেলটি বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি করা হয়েছে । বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, ইরান, সুদান এবং উত্তর ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই ট্যাংক বা এর বিভিন্ন আধুনিক সংস্করণ ব্যবহার করে আসছে ।

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক বিস্তারিত আর কেন এটি দিয়ে একটা এক্সিডেন্ট হল বা হতে পারে বলে মনে হয়?

চীনের তৈরি টাইপ ৫৯ মডেলের ট্যাংক এবং কেন এই ধরণের সামরিক যানে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তার বিস্তারিত কারণ নিচে দেওয়া হলো।

টাইপ ৫৯ ট্যাংকের বিস্তারিত কারিগরি বিবরণ:

  • সোভিয়েত নকশার রূপান্তর: ১৯৫০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের টি-৫৪এ ট্যাংকের নকশা অনুসরণ করে চীন এই ট্যাংকটি তৈরি করে । ১৯৫৯ সাল থেকে চীনা সেনাবাহিনীতে এটি যুক্ত হওয়ার পর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে সাশ্রয়ী ও টেকসই একটি যুদ্ধযান হিসেবে পরিচিতি পায় ।
  • মূল কাঠামো ও অস্ত্র: সাধারণ সংস্করণে এই ট্যাংকের ওজন প্রায় ৩৬ টন এবং এতে ১০০ মিলিমিটারের একটি রাইফেলড মেইন গান বা কামান থাকে । তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিশ্বের অনেক দেশই সময়ের সাথে সাথে এর কামান পরিবর্তন করে ১০৫ মিলিমিটার বা ১২৫ মিলিমিটারের শক্তিশালী কামান এবং আধুনিক ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম যুক্ত করেছে ।
  • বর্ম বা আর্মার সুরক্ষা: এর মূল বর্মটি স্টিলের তৈরি, যা আধুনিক ট্যাংকগুলোর মতো কম্পোজিট বা রিয়্যাক্টিভ আর্মার দিয়ে তৈরি নয় । ফলে ট্যাংকের ভেতরে কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে তার ধাক্কা ভেতরের ক্রুদের ওপর খুব মারাত্মকভাবে পড়ে।

এই ট্যাংকে কেন দুর্ঘটনা ঘটল বা ঘটতে পারে বলে মনে হয়:

হাটহাজারীর সাম্প্রতিক ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কারিগরি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তবে সামরিক সাঁজোয়া যান এবং বিশেষ করে টাইপ ৫৯ মডেলের মতো ট্যাংকের ক্ষেত্রে ফায়ারিংয়ের সময় যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে তার সম্ভাব্য কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • কামানের নলে অকাল বিস্ফোরণ (বোর প্রিম্যাচিউর ডিটonation): ফায়ারিংয়ের সময় গোলাটি যখন ট্যাংকের কামানের নল বা ব্যারেল দিয়ে বের হতে যায়, তখন নলের ভেতরেই সেটি আকস্মিকভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে । নলের ভেতরে কোনো ময়লা, আগের ফায়ারিংয়ের অবশিষ্টাংশ কিংবা ত্রুটি থাকলে এমনটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • মেকানিক্যাল ফ্যাটিগ বা ধাতব ক্লান্তি: টাইপ ৫৯ একটি পুরোনো প্রযুক্তির ট্যাংক । দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর কামানের ব্রিচ ব্লক (যে অংশটি গোলা লোড করার পর পেছনের অংশ লক করে দেয়) বা ব্যারেলের ভেতরের ধাতব অংশ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে । ফায়ারিংয়ের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে না পেরে যদি লকিং সিস্টেম ফেইল করে, তবে ভেতরের তীব্র গ্যাস ও আগুন ট্যাংকের ভেতরেই ছড়িয়ে পড়ে।
  • গোলাবারুদের গুণগত মান বা ফিউজের ত্রুটি: অনেক সময় গোলার পেছনের অংশে থাকা প্রাইমার বা ফিউজে ত্রুটি থাকলে লোড করার সময় বা ফায়ারিংয়ের মুহূর্তে অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। গোলার সেলটি যদি নির্ধারিত সময়ের আগে সক্রিয় হয়ে যায়, তবে তা ট্যাংকের ভেতরে থাকা ক্রুদের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে।
  • ওভারপ্রেশার বা ব্যাকফায়ার: কামানের গোলা ছোঁড়ার পর যে বিশাল পরিমাণ গ্যাস তৈরি হয়, তা যদি ব্যারেল দিয়ে সঠিকভাবে সামনে বের হতে না পারে, তবে তা উল্টো ভেতরের দিকে ব্যাকফায়ার করে । এতে ট্যাংকের ছোট কামরার ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে অক্সিজেন শেষ হয়ে যায় এবং তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে।

সেনাবাহিনীর তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই কেবল জানা যাবে যে যান্ত্রিক ত্রুটি, গোলাবারুদের সমস্যা নাকি অন্য কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে হাটহাজারীতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল [

প্রেক্ষাপট

ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলন সামরিক বাহিনীর নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে যুদ্ধাস্ত্র পরিচালনার দক্ষতা যাচাই ও উন্নয়ন করা হয়। তবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে কাজ করার কারণে এ ধরনের প্রশিক্ষণে ঝুঁকিও থেকে যায়, যা বিশ্বের যেকোনো পেশাদার সামরিক বাহিনীর জন্যই একটি বাস্তবতা। এই দুর্ঘটনা সেই ঝুঁকিরই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

উপসংহার

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৭শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ