অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন | পালস বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৩ সালের ৫ মে একটি ভয়াবহ ও রক্তঝরা মাইলফলক। ওই দিন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আয়োজিত ‘ঢাকা অবরোধ’ ও পরবর্তী মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ লীগ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বলপ্রয়োগ করে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও দায়ীদের বিচার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একধরনের নীরবতা ও তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটার পর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির মুখে শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) আইনি বিচার প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা লাভ করে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি ও নীতি-নির্ধারকের বিরুদ্ধে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (Formal Charge) দাখিল ও আমলে নেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি, ৫ মে মধ্যরাতের যৌথ অভিযান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের তালিকা এবং আইনগত পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সম্প্রতি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত নির্মম গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিয়েছেন।
মামলার প্রধান ধারা ও আইনি কাঠামো
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ (সি) ধারা (Crimes against Humanity and Genocide) অনুযায়ী তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে এই চার্জ গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫ মে মধ্যরাতে unarmed বা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর আধুনিক রাষ্ট্রীয় অস্ত্র, প্রাণঘাতী গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে যে অপারেশন চালানো হয়েছে, তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।
[১৩ দফা দাবি ও শাপলা চত্বরে অবস্থান (৫ মে ২০১৩)]
↓
['অপারেশন সিকিউর শাপলা' ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ (৫-৬ মে মধ্যরাত)]
↓
[এক দশকের তথ্য গোপনীয়তা ও আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন]
↓
[ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনস্তদন্ত]
↓
[শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা]
হাইপ্রোফাইল অভিযুক্তদের তালিকা (৪১ জন)
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা ফরমাল চার্জে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক-পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে:
১. প্রধান আসামি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব:
- শেখ হাসিনা: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল নির্দেশদাতা আসামি।
- মহীউদ্দীন খান আলমগীর: তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
- শামসুল হক টুকু: তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
- হাসানুল হক ইনু: তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী।
- ডা. দীপু মনি: তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেত্রী।
- আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: তৎকালীন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা।
২. শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা:
- জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ: তৎকালীন বিজিবি প্রধান ও সাবেক সেনাপ্রধান।
- বেনজীর আহমেদ: তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) কমিশনার ও সাবেক আইজিপি।
- হাসান মাহমুদ খন্দকার: তৎকালীন আইজিপি।
- এ কে এম শহীদুল হক: তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি ও সাবেক আইজিপি।
- মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান: তৎকালীন এনটিএমসি (NTMC) প্রধান ও র্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
৩. সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব:
- শাহরিয়ার কবির: সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
- ইমরান এইচ সরকার: মুখপাত্র, গণজাগরণ মঞ্চ।
- মোজাম্মেল বাবু: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একাত্তর টিভি।
- ফারজানা রুপা: সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, একাত্তর টিভি।
বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
বর্তমানে ৪১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন (যাঁদের মধ্যে দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপা অন্যতম)।
ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ মামলার অন্য সকল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে কারাগারে থাকা আসামিদের পরবর্তী নির্দিষ্ট ধার্য তারিখে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৩. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি

২০১৩ সালের প্রথমভাগে শাহবাগ কেন্দ্রিক ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন এবং কতিপয় ব্লগারের ইসলামবিদ্বেষী লেখার প্রতিক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজেত ইসলাম বাংলাদেশ’ চট্টগ্রাম থেকে তাদের আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রামভিত্তিক শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি সরকারের কাছে তাদের ১৩ দফা দাবি পেশ করে এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচির ডাক দেয়।
┌────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি │
├────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন। │
│ ২. ইসলাম অবমাননা ও মহানবী (সা.)-এর শানে কটুুক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ড। │
│ ৩. শাহবাগ কেন্দ্রিক নাস্তিক্যবাদী ব্লগারদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তি। │
│ ৪. নারী নীতি ও শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল। │
│ ৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা। │
│ ৬. কাদিয়ানীদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা। │
│ ৭. সামাজিক অনাচার, নগ্নতা, ও ফ্রি-মিক্সিং বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। │
│ ৮. খ্রিষ্টান মিশনারি ও এনজিওগুলোর বিতর্কিত ধর্মান্তরকরণ বন্ধ। │
│ ৯. মসজিদ-মাদ্রাসার ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও চাপ সৃষ্টি বন্ধ। │
│ ১০. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত বিতর্ক নিরসন ও আলেম মুক্তি। │
│ ১১. আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। │
│ ১২. পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশি এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারি নিয়ন্ত্রণ। │
│ ১৩. গণমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার বন্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রচার। │
└────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘
১৩ দফা দাবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. সংবিধানের মূলনীতি: সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার আইনি বাধ্যবাধকতা।
২. ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন: মহানবী (সা.) এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা অবমাননা করার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’-র বিধান রেখে কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করা।
৩. ব্লগারদের গ্রেফতার: মহানবী (সা.)-এর চরিত্র হরণকারী এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকারী ব্লগারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করা।
৪. শিক্ষানীতি ও নারী নীতি সংশোধন: তৎকালীন সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি এবং শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারাগুলো বাতিল করা।
৫. ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা: সর্বস্তরের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. কাদিয়ানী ইস্যু: আহমেদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে সরকারি ও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করা।
৭. সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতি: সমাজ থেকে নগ্নতা, অনাচার, মেলামেশা ও পশ্চিমা ‘লাইফস্টাইল’ প্রচার বন্ধ করা।
৮. মিশনারি ও এনজিও নিয়ন্ত্রণ: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে খ্রিষ্টান মিশনারি ও বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা।
৯. আলেমদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার: বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত আলেম-ওলামাদের মুক্তি প্রদান এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা বাতিল করা।
তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সমাজ এই ১৩ দফার কঠোর সমালোচনা করে এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই দাবির সপক্ষে শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোগ দেন।
৪. ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’: ৫ মে মধ্যরাতের অভিযান ও যৌথ বাহিনীর ভূমিকা

২০১৩ সালের ৫ মে সকাল থেকেই ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখ লাখ হেফাজত কর্মী মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, বিজয়নগর ও বায়তুল মোকাররম এলাকা পূর্ণ করে ফেলে। সমাবেশ শেষে রাত ঘনিয়ে এলে তৎকালীন সরকার তাদের শাপলা চত্বর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আয়োজকরা সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
অভিযানে ব্যবহৃত বাহিনী ও কমান্ড স্ট্রাকচার
রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয় ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ বা ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’।
- বাংলাদেশ পুলিশ (DMP): তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের সাঁজোয়া ও পদাতিক ইউনিট।
- র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের সরাসরি কমান্ডে থাকা স্ট্রাইকিং ফোর্স।
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB): তৎকালীন প্রধান আজিজ আহমেদের অধীনে সাঁজোয়া যান ও বিজিবি ব্যাটালিয়ন।
অভিযানের কৌশল ও বর্বরতা
অপারেশনের কৌশল হিসেবে পুরো মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঘোর অন্ধকার তৈরি করা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, গ্যাস গান, লেজার গান এবং স্বয়ংক্রিয় আধুনিক মারণাস্ত্র থেকে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে চতুর্দিক থেকে বেষ্টনী তৈরি করা হয়।
ঘোর অন্ধকারে ঘুমন্ত ও ক্লান্ত সমাবেশকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো এই যৌথ অভিযান তৎকালীন সময়ে এক চরম বিভীষিকার জন্ম দেয়।
৫. নিহতের তথ্য ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন)
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভিযানের পরপরই দাবি করেছিল যে শাপলা চত্বরের অভিযানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি এবং পুলিশ কেবল সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক নিরপেক্ষ তদন্তে এই তথ্যের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।
[শাপলা চত্বর গণহত্যা ও বিস্তৃত সহিংসতা]
│
┌──────────────────────────────┬────────────────┴──────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ঢাকার শাপলা চত্বর] [সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ] [চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা]
- তারিখ: ৫ মে মধ্যরাত - তারিখ: ৬ মে সকাল-দুপুর - তারিখ: ৫-৬ মে
- নিহত: ৩২ জন - নিহত: ২০ জন - নিহত: ৬ জন (চট্টগ্রাম ৫, কুমিল্লা ১)
এলাকাভিত্তিক নিহতের সংখ্যা (মোট নিশ্চিত: ৫৮ জন, আনুমানিক: ৬১ জন)
| স্থান/এলাকা | নিহতের সংখ্যা | অভিযানের বিবরণ ও সময় |
| ঢাকা (শাপলা চত্বর, মতিঝিল) | ৩২ জন | ৫ মে মধ্যরাতের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ অভিযানের সময় সরাসরি গুলিতে নিহত। |
| সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) | ২০ জন | ৬ মে সকালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভে গুলি। |
| চট্টগ্রাম | ০৫ জন | ৫ ও ৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দমনে গুলিবর্ষণ। |
| কুমিল্লা | ০১ জন | মহাসড়ক অবরোধকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত। |
| মোট শনাক্তকৃত | ৫৮ জন | তদন্ত সংস্থা কর্তৃক প্রতিটি নিহতের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচযপত্র যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে। |
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: তদন্ত সংস্থার সার্বিক প্রতিবেদনে অভিযান সংক্রান্ত সংঘাত ও পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জন নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে।)
৬. আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
শাপলা চত্বরের এই ঘটনা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই রাজনীতিতে গভীর দাগ কাটে নাই, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা:
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW): ঘটনার পরপরই ‘উই ড্রাইভ দেম আউট লাইক ডগস’ (We Drive Them Out Like Dogs) শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দাবি করে।
- এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে unarmed বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর মারণাস্ত্র ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানায়।
- অধিকার (Odhikar): অধিকার নামক বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা ৬১ জন নিহতের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছিল, যার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে গ্রেপ্তার করে ও সাজা দেয়।
২. বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
- ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর রূপান্তর: শাপলা চত্বরের ঘটনার পর দেশের দক্ষিণপন্থি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করে।
- তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন: ৫ মে-র পর থেকে দেশে বিরোধী রাজনৈতিক মত, আলেম-ওলামা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অভূতপূর্ব পর্যায়ে বৃদ্ধি পায়। একই রাতে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
৭. উপসংহার ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ
২০১৩ সালের ৫ মে-র শাপলা চত্বর ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সমাবেশের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক চরম দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের দায়ীদের অভিযুক্ত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল এই হত্যাকাণ্ডে জীবন উৎসর্গকারী ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ এক দশক পর কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনালের এই আইনি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও যেকোনো ধরনের ‘গণহত্যা’ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক নজির হিসেবে কাজ করবে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সংস্কৃতি ও ইতিহাস ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
একসময় গ্রামবাংলা কিংবা শহর—সবত্রই মেঠো পথে ধূলো উড়িয়ে চলে যেত এক কাঠের তৈরি চারকোনা বন্ধ বা ছাদখোলা আভিজাত্যের সিন্দুক। ভেতরের যাত্রী আরাম করে বসতেন, আর বাইরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাইলের পর মাইল সেই ভারী বোঝা কাঁধে বয়ে নিয়ে চলতেন একদল মানুষ। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যবাহী বাহনটির নাম ‘পালকি’।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মোটরগাড়ি, ট্রেন কিংবা আধুনিক যানবাহনের দাপটে পালকি আজ ইতিহাস। তবে কেবল একটি বাহন হিসেবেই নয়, সামন্তবাদী সমাজের আভিজাত্যের প্রতীক, রাজপরিবারের ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ হিসেবে পালকির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
১. পালকির উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

পালকির ইতিহাস ঠিক কত হাজার বছরের পুরনো, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও প্রাচীন সভ্যতায় এর অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।
- প্রাচীন সভ্যতায় উপস্থিতি: মিসরীয় এবং মায়া সভ্যতার চিত্রলিপিতে পালকি সদৃশ বাহনের ছবি পাওয়া যায়। আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে রচিত মহর্ষি বাল্মীকি-র ‘রামায়ণ’-এ দেব-দেবী ও রাজপরিবারের পরিবহনে পালকির ব্যবহারের বহু উল্লেখ রয়েছে।
- ধারণার উৎস: ঐতিহাসিকদের মতে, আদিম যুগের মানুষ যখন শিকার করা বড় পশু লাঠির মাঝামাঝি ঝুলিয়ে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসত, মূলত সেই পদ্ধতি থেকেই পরবর্তীতে মানুষ বহনের বাহন বা ‘পালকি’র ধারণার জন্ম হয়।
- মোগল ও ঔপনিবেশিক আমল: মোগল আমলে রাজপরিবারের নারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ পালকির ব্যবহার ব্যাপক রূপ নেয়। জানা যায়, সম্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা অবস্থায় পালকিতে করে গুজরাটের মরুপ্রান্তরে ভ্রমণকালেই জন্ম দিয়েছিলেন সম্রাট আকবরের। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে এবং জমিদারি প্রথায় ধনকুবের ও রাজ-রাজড়াদের মূল বাহন হয়ে ওঠে এই পালকি।
২. গঠন ও বেহারাদের কঠোর জীবনসংগ্রাম

পালকি মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি সিন্দুক বা চেয়ারের আকৃতির একটি হস্তচালিত বাহন।
- গঠনশৈলী: উপমহাদেশের পালকিগুলো সাধারণত চারকোনা হতো, যার দুপাশে দরজা ও কাপড়ের পর্দা থাকত। কিছু পালকি আবার সিংহাসনের মতো ছাদখোলা হতো। সামনে ও পেছনে থাকা দীর্ঘ কাঠ বা হাতল ধরে কাঁধে তুলে নেওয়া হতো এটি।
- বেহারা বা কাহার: যাঁরা পালকি বহন করতেন, তাঁদের বলা হতো ‘বেহারা’ বা ‘কাহার’। পালকির আকৃতি ও ওজনের ওপর নির্ভর করে দুই, চার, ছয়, আট এমনকি ষোলো জন বেহারার প্রয়োজন হতো।
- শ্রমসংগীত ও ‘হুনহুনা’ ছন্দ: মাইলের পর মাইল ভারী বোঝা বইতে গিয়ে ক্লান্তি দূর করা এবং নিজেদের হাঁটার তাল ঠিক রাখার জন্য বেহারারা মুখে মুখে গান বা বিশেষ সুর ভাঁজতেন—যেমন: “হুন হুঁ না, হুন হুঁ না” কিংবা সামনে গর্ত থাকলে বলতেন “সামাল হেঁকে, চলল বেঁকে”। এই গীতিময় শব্দগুলোই মূলত পালকির শ্রমসংগীত হিসেবে পরিচিত ছিল।
৩. বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে পালকির মর্যাদা
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্যানভাসে পালকি ও বেহারাদের জীবনকাহিনি অমর হয়ে রয়েছে।
- ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত: তাঁর বিখ্যাত ‘পালকির গান’ কবিতায় গ্রামবাংলার তপ্ত রোদে বেহারাদের যাত্রার অনবদ্য ছবি এঁকেছেন:“পালকি চলে! পালকি চলে!/ গগন তলে আগুন জ্বলে!/ স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে/ যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা…” পরবর্তীতে কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরসম্রাট সলিল চৌধুরীর সুরে গান হিসেবে এটিকে অমর করে তোলেন।
- রবীন্দ্রনাথ ও তারাশঙ্কর: বিশ্বকবির ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় যেমন পালকির কথা আছে, তেমনি জমিদার থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে প্রজা পরিদর্শনের জন্য ষোলো বেহারার পালকি ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে শোষিত ও দরিদ্র কাহার সমাজের করুণ বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন।
৪. গণসংগীতে পালকি: ভূপেন হাজারিকার ‘দোলা হে দোলা’

পালকিকে কেবল নস্টালজিয়ার বাহন হিসেবে না দেখে, শোষিত শ্রমজীবী মানুষের আড়ালে থাকা ক্ষোভ ও শ্রেণীসংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কালজয়ী সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা।
আমেরিকায় মানবাধিকার কর্মী পল রবসনের সান্নিধ্যে এসে বিশ্ব সাম্যবাদের যে শিক্ষা হাজারিকা পেয়েছিলেন, তারই ফসল তাঁর প্রখ্যাত গান ‘দোলা হে দোলা’ (বাংলা রূপান্তর: শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)। গানে তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন—
- পালকির ভেতরে যে বসে থাকে, সে হীরে-সোনায় ঝলমল করে।
- আর যে তাকে কাঁধে নিয়ে চলে, তার পরনে শতছিন্ন কাপড়, পিঠে ক্ষতের চিহ্ন।
গানটির শেষভাগে তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে গেয়ে ওঠেন— বেহারারা যদি একদিন এক হয়ে কাঁধ সরিয়ে নেয়, তবে রাজা-মহারাজাদের ওই দম্ভের প্রাসাদ ও দোলা এক নিমেষেই ধূলোয় মিশে যাবে।
সমাপনী
রাজত্ব গেছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে; প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে এসেছে বাস, ট্রেন ও বিলাসবহুল গাড়ি। ইতিহাসের নিয়মে পালকি আজ রাজপথ ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছে রবীন্দ্রকুঠি, জাতীয় জাদুঘর কিংবা সিনেমার ফ্রেমে। তবে মেঠো পথের ধূলোয় বেহারাদের পায়ের ছাপ আর “হুনহুনা” সুরটি আজও বাঙালি সংস্কৃতির স্মৃতিপটে এক চিরন্তন স্মারক হয়ে রয়ে গেছে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
চাইনিজ, তামিল ও মালয় তিন জাতির সৌহার্দ্যপূর্ণ দেশ সিঙ্গাপুর। অতীতের বৈরিতা ত্যাগ করে তারা এক সমৃদ্ধশালি দেশ গড়ে তুলেছে।
মানসুরা আক্তার, এশিয়ার দেশ হলে উন্নত হতে পারবে না এমন তো কোন কথা নেই। এশিয়ার দেশ চীন পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র জাপান তিন নম্বরে। সাউথ কোরিয়ার অবস্থান দ্বাদশ নম্বরে। এছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ইজরায়েল, ইরান, ভারত অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইউরোপ অন্ধকার থেকে আলোর পথে এসেছে অল্প কয়েক শত বছর আগে। মধ্যযুগ পর্যন্ত এশিয়ার দেশগুলোর ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী। সভ্যতা এবং সমৃদ্ধির নিরিখে এশিয়া যখন মধ্য গগনে তখন ইউরোপের বৃহত্তর অংশ দারিদ্র্, অশিক্ষা, কুশিক্ষা লর্ড, ব্যারন ও জমিদার শ্রেণীর অন্যায় অত্যাচারের নিগড়ে আবদ্ধ ছিল। ভাইকিংস, ভ্যানডাল, গথ, ভিসিগথ, নর্মান বর্বর জনগোষ্ঠী ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
ইউরোপে শুধুমাত্র ভূমধ্যসাগরীয় গ্রিস এবং রোম সাম্রাজ্য প্রগতির আলোকবর্তিকা হিসেবে পৃথিবীতে অবদান রাখতে পেরেছিল। এদিকে এশিয়ায় মেসোপটেমিয়া, পারস্য, চীন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সিন্ধু অববাহিকার মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা, উত্তর ভারতে আর্য বা বৈদিক সভ্যতা ও আনাতোলিয়া ও মঙ্গোলীয় অঞ্চল ছিল সভ্যতার সূতিকাগার। সপ্তম শতাব্দি থেকে চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ ইসলামিক সভ্যতা পৃথিবী শাসন করে। তুর্কির অটোমান সাম্রাজ্য ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ১৯১৮ সাল নাগাদ প্রায় ৭০০ বছর পুরো বলকান অঞ্চল পদানত করে রাখে।
ইউরোপ উন্নতির এবং সভ্যতার পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পায় ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন জায়েদের নেতৃত্বে ইউরোপের আন্দালুসিয়া দখল করার পর ইসলামি শাসন আমলে । তাদের সংস্পর্শে শিক্ষা-দীক্ষার সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত হয়ে রেনেসাঁর সূচনা হয়। রেনেসাঁর হাত ধরেই সূচনা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভলিউশন। এমনকি সক্রেটিস, অ্যারিস্টোটল এবং অন্যান্য গ্রিক মনীষীর চিন্তা ভাবনা, দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় ঘটে স্পেনের মুরদের মাধ্যমে।
ওদিকে আটলান্টিকের অপর প্রান্তে কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করে, তখন প্রাক কলাম্বিয়ান যুগে মায়া, ইনকা, আজটেক, মাচুপিচু সভ্যতা ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের চেয়ে উন্নত ছিল। অস্ত্র, বর্বরতা ও শঠতার মাধ্যমে তারা সেসব সভ্যতা ধ্বংস করে দেয়।
এবার আপনার সিঙ্গাপুরের কথায় আসা যাক। এক চিলতে দ্বীপ হয়েও সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের বিস্ময়কর সাফল্যে অবাক হওয়ারই কথা।
মালয়েশিয়ার লেজে এক চিলতে দ্বীপ সিঙ্গাপুর
মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর যুগল-বন্ধন
সিঙ্গাপুর প্রায় ১০০ বছর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সিঙ্গাপুর দখল করে নিলে ব্রিটিশদের কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুর ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে মালয়েশিয়ার সাথে যোগ দেয়। নাম হয় ফেডারেশন অব মালয়েশিয়া।
দুই ভূখণ্ডের মিল মহব্বত বেশি দিন টেকে নাই। প্রধান কারণ, জাতিগত বিভেদ। সিঙ্গাপুরের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল চাইনিজ , এক-তৃতীয়াংশ মালয় বংশোদ্ভূত। দুই গ্রুপের ধর্ম ও কালচার আলাদা। দুই দলের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি লেগেই থাকত। একত্রিত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠল। ত্যাক্ত বিরক্ত হয়ে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ফেডারেশন থেকে বহিষ্কার করে দেয়।
মালয়েশিয়া বহিষ্কার করে দেওয়ার পর সিঙ্গাপুরের সমস্যা ছিল পাহাড় পরিমাণ। দ্বীপের দুইপাশে দুইটি বৈরী রাস্ট্র ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া কর্তৃক কোণঠাসা, নগরীর ৩০ লক্ষ লোকের মধ্যে বেশির ভাগই বেকার, দুই-তৃতীয়াংশ লোকের বাস বস্তিতে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব, পানি সরবরাহ পয় প্রণালীর বালাই নেই, অবকাঠামো নড়বড়ে। তবে, সুখের বিষয় প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ছিলেন দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতা। লী আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করলে কেউ সাড়া দেয়নি। নিজের ঘর নিজেরা সামলানোর দায়িত্ব ঘাড়ে নেন লী কুয়ান।
লী কুয়ান ১৯৬৯
১৯২৩ সালে লী কোয়ান এ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
বিশ্বায়ন এবং বাণিজ্য
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতির মূল শক্তি ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। এক দেশের পণ্য আমদানি করে অন্য দেশে চালান করা। ধারনের ব্যবসার পোশাকি নাম entrepot—আড়তদারি বলাই ভালো। এ-ভাবে দালালি করে কতই বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়? কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার উপায় শিল্পায়ন কিন্তু সিঙ্গাপুরে এজন্য কোন ট্রাডিশন ছিল না, দক্ষ জনবলের অভাব ছিল। শিল্প পণ্য বিক্রি করবেই বা কার কাছে? দুপাশে দুটো রাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের প্রতি নাখোশ। বড্ড কঠিন অবস্থা।
উপায়ান্তর না দেখে সিঙ্গাপুর আশে পাশের দেশগুলো পাশ কাটিয়ে বৃহত্তর বিশ্ব অর্থনীতির অঙ্গনের প্রতি দৃষ্টি প্রসারিত করে। লী কুয়ান ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করেন এবং বহুজাতিক কোম্পানীদের শিল্প স্থাপনের জন্য সাদরে আমন্ত্রণ জানান।
কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা
সিঙ্গাপুর নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত এবং সহনীয় ট্যাক্সের হার ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় বাতাবরণ তৈরি করে।
এজন্য অবশ্য নাগরিকদের অনেক মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়। স্বৈরাচারী সরকার বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে এও ঠিক, অমলেট বানাতে হলে ডিম ভাঙতে হয়। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, মারের উপর ঔষধ নেই।
লী কুয়ান ডিম ভাঙ্গা নীতি অবলম্বন করেন। কাউকে মাদক ব্যবসা কিংবা দুর্নীতির জন্য ধরা পড়লে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বহু শ্রমিক ইউনিয়ন একীভূত করে একটি মাত্র ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। তারা সংঘর্ষের পরিবর্তে সরকারের সাথে সহযোগিতা করে। এক একটা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার জন্য ট্রেড ইউনিয়নের কোনো সুযোগ রাখা হয় নাই। সিঙ্গাপুরের পার্লামেন্টে লীর রাজনৈতিক দলের একচ্ছত্র অধিপতি। অভিমান করে সমাজতান্ত্রিক পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তাতে লীর বয়েই গেল। বরং আপদ দূর হলো। দুই-এক জন বিরোধী দলের সাংসদদের পার্লামেন্টে বসে হাই তুলে ঝিমোনো ছাড়া তেমন কোনো দায়িত্ব ছিল না।
দক্ষিণ এশিয়ার মত সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক গণতন্ত্র, ধর্মের জিগির তুলে কেউ রাজনীতি কলুষিত কিংবা অর্থনৈতিক পরিবেশ নষ্ট করলে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। লোয়ার কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ, রিট পিটিশন নানা বাহানায় আইনের জাল থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। ২০১০ সালে লী আমেরিকার এক সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন যে, ‘আমি বিনা বিচারে দীর্ঘদিন কাউকে কাউকে আটকে রাখার জন্য দুঃখিত, কিন্তু দেশের স্বার্থটাই আমার কাছে বড় কথা।
কঠোর আইনের শাসন
সিঙ্গাপুরে আইনের শাসন বড় কড়া। রাস্তায় চকলেটের মোড়ক বা সিগারেটের বাকি অংশ রাস্তায় ফেললে জরিমানা ৩০০ সিঙ্গাপুর ডলার। (সিঙ্গাপুর ডলার ১=টাকা ৬৪, ইন্ডিয়ান রুপি ৫৫)। বিচিত্র কঠোর আইনের আরো কয়েকটা শোনা যাক। সে দেশে যাওয়ার আগে তা জানা থাকলে কাজে লাগবে।
সিঙ্গাপুরে রাস্তায় গান-বাজনা বা কুরুচিপূর্ণ সংগীত চর্চা করলে জরিমানা ও তিন মাস পর্যন্ত জেলের ঘানি টানতে হতে পারে। অন্য কারো ওয়াইফাইয়ে সংযোগ করে হ্যাকিং করলে তিন বছরের জেল, ১০,০০০ ডলার জরিমানা।
রাস্তায় কবুতরকে উচ্ছিষ্ট খাবার খাওয়াতে নিক্ষেপ করলে জরিমানা ৫,০০০ ডলার। পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ না করে সটকে পড়লে জরিমানা ১৫০ ডলার।
জনসমাগমস্থলে ধূমপান করলে জরিমানা অন্তত ১৫০ ডলার। চুইংগাম নিষিদ্ধ; দোকানি চুইংগাম বিক্রি করলে জরিমানা ১০,০০০ ডলার।
রাস্তায় থুতু ফেললে জরিমানা ১,০০০ ডলার। কেউ দেখছে না ভেবে থুথ ফেললে, কোন এক অদৃশ্যালোক থেকে পুলিশ এসে হাজির হবে।
ফাঁকা লিফট পেয়ে মূত্রাশয়ের চাপ লঘু করতে যদি ভেবে থাকেন কেউ তো আর দেখছে না, কাজটা সেরে নেই, তাহলে ধরা খেয়ে যাবেন। লিফটে পেশাবের গন্ধ শোকার যন্ত্র লাগানো আছে। ব্যস, লিফটের দরজা বন্ধ পুলিশ এসে হাজির। তারপর জেল-জরিমানা।
এজন্য বলা হয় সিঙ্গাপুর ফাইন সিটি। ফাইনের এক অর্থ সুন্দর, অন্য অর্থ জরিমানা।
সিঙ্গাপুরের অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে, ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প প্রসারের জন্য অবকাঠামো উন্নত। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কোন বাঁধা আমলে আনে নি। স্থানাভাবের কারণে মালয়েশিয়া থেকে মাটি কিনে এনে সমুদ্র ভরাট করে সিঙ্গাপুরে অত্যাধুনিক চাঙ্গি এয়ারপোর্ট তৈরি করেছ।
সিঙ্গাপুর চাঙ্গি এয়ারপোর্ট। মালয়েশিয়া থেকে মাটি আমদানি করে সমুদ্র ভরাট করে তৈরি করা হয়।
চাঙ্গি এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ফ্লাওয়ার গার্ডেন
অর্থনৈতিক সাফল্য
কঠোর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। ১৯৬০ সালে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র মার্কিন ডলার ৩২০। এখন সে দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরে অনুমিত মাথাপিছু আয় ৬২,০০০ মার্কিন ডলার। অবিশ্বাস্য অর্জন বৈকি!
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামো
শিল্প-বাণিজ্য উন্নয়নের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর মানব সম্পদ উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রচুর সংখ্যক টেকনিক্যাল স্কুল খুলেছে, বিদেশ থেকে এক্সপোর্ট এনে তথ্যপ্রযুক্তি পেট্রোকেমিক্যাল ইলেকট্রনিক এবং অন্যান্য প্রয়োজন মোতাবেক দক্ষ জনবল গড়ে তুলেছে। আমাদের দেশের মত উদ্দেশ্যহীন ভাবে বাস্তবতাবিমুক ডিসিপ্লিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয় না।
সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। ওজনের ভিত্তিতে পণ্য ওঠানামা হিসেবে পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়, শুধু মাত্র সাংহাই বন্দরের পিছনে। উপমহাদেশের অনেক পণ্য বড় বড় জাহাজে প্রথমে সিঙ্গাপুরে এনে ছোট লাইটার জাহাজের মাধ্যমে যার যার দেশে পাঠিয়ে দেয়।
সিঙ্গাপুর সমুদ্র বন্দর। সিঙ্গাপুরের দুটো সমুদ্র বন্দর পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দর।
পর্যটন শিল্প উন্নয়ন করার জন্য অনেক ধরনের আকর্ষণীয় ভ্রমণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বছরে প্রায় এক কোটি ভ্রমণপিপাসু মানুষ সিঙ্গাপুরে আসে। সম্প্রতি পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বহুমুখী দুটো ক্যাসিনো উদ্বোধন করা হয়েছে।
আলো ঝলমল বিলাসবহুল হোটেল
সিঙ্গাপুরের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত এবং যুগোপযোগী। সুইজারল্যান্ডের অনেক আমানত এখন সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের কালো টা আন্তর্জাতিক অর্থ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটে লেনদেনের জন্য সিঙ্গাপুর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে আশেপাশের দেশ থেকে অজস্র মানুষ ভিড় জমায়। সে ভীড়ে যোগ দেয় বাংলাদেশের বিত্তবানরা। শোনা যায়, একবার লি কোয়ান কোন একটা রোগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিদেশে চিকিৎসা করার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। নিজ দেশেই সে অসুখের চিকিৎসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ হন।
আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিখ্যাত মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল
দীর্ঘ ২৫ বছর কঠোর হস্তে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে লী ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন তবে ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসাবে ২০০৪ সাল নাগাদ শাসনকার্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সার্বিক মূল্যায়ন
১৯৬০ সালে যেখানে সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৩২০ মার্কিন ডলার, তা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। লি কুয়ান ইউ-এর কঠোর কিন্তু দূরদর্শী নীতি প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ দিয়ে একটি দেশকে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসীদের বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (Red Indian) নামে ডাকা হলেও আধুনিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও সামাজিক পরিমণ্ডলে শব্দটি একটি বর্ণবাদী গালি ও চরম অবমাননাকর ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে গণ্য হয়। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের পর শতাব্দীর গণহত্যা, ভূমি দখল ও সামাজিক প্রান্তিকতা পেরিয়ে আমেরিকার আদিবাসীরা (Native Americans) আজ কেবল টিকে থাকার লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের একটি বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১. নামকরণের ভুল ইতিহাস ও বর্ণবাদী উৎস

‘রেড ইন্ডিয়ান’ শব্দটি কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির নাম নয়, বরং এটি ১৪৯২ সালে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের দুটি মারাত্মক ভুলের ঐতিহাসিক ফসল:
- কলম্বাসের ভুল (ইন্ডিয়ান শব্দটির উৎপত্তি): ১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতে পৌঁছানোর বিকল্প জলপথ খুঁজতে গিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। তিনি ভেবেছিলেন এটি ভারত (India); ফলে স্থানীয় অধিবাসীদের ‘ইন্ডিয়ান’ বলে সম্বোধন শুরু করেন। পরবর্তীতে নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি প্রমাণ করেন যে এটি ভারত নয়, এক নতুন মহাদেশ—যার নাম রাখা হয় ‘আমেরিকা’।
- ‘রেড’ বা লাল শব্দের উৎস: আমেরিকার বোথুক (Beothuk) উপজাতির মানুষেরা শরীরে লালচে মাটির রঞ্জক (Red Ochre) ব্যবহার করত। তাদের দেখে ইউরোপীয়রা ‘লাল মানুষ’ হিসেবে আখ্যা দেয়। পরবর্তীতে শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকরা নিজেদের (White) থেকে শোষিত আদিবাসীদের আলাদা করতে গায়ের তামাটে রঙের জন্য ‘রেড স্কিন’ বা ‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলা শুরু করে।
সংজ্ঞায়ন: বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই অপমানজনক শব্দটি বর্জন করে তাদের ‘নেটিভ আমেরিকান’ (Native American), ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান’ (American Indian) অথবা ‘ফার্স্ট নেশনস’ (First Nations) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২. সংরক্ষিত এলাকা (Reservation System) ও বর্তমান জীবনযাত্রা

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ নেটিভ আমেরিকান। তাদের আধুনিক জীবনযাপন ও সমাজব্যবস্থার প্রধান রূপরেখা:
- ট্রাইবাল সার্বভৌমত্ব: আমেরিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আদিবাসী সরকার নির্ধারিত ৩২৬টি ‘ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন’ (Indian Reservations) এলাকায় বাস করেন। তাঁদের নিজস্ব উপজাতীয় সরকার (Tribal Government), পুলিশ, আদালত ও কর ব্যবস্থা রয়েছে।
- ক্যাসিনো অর্থনীতি ও দারিদ্র্য: ১৯৮৮ সালের আইনের পর বহু আদিবাসী গোষ্ঠী সংরক্ষিত অঞ্চলে জুয়া বা ক্যাসিনো বাণিজ্য শুরু করে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করলেও অনেক রিজার্ভেশন এলাকা এখনো চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের শিকার।
- সামাজিক ও স্বাস্থ্য সংকট: রিজার্ভেশনগুলোতে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, মাদকাসক্তি এবং আদিবাসী নারীদের নিখোঁজ ও সহিংসতার হার আমেরিকার গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
- কৃষি ও মানবজাতিকে দান: আলু, ভুট্টা, চকোলেট (কোকো) এবং কোকার মতো বিশ্বখ্যাত ফসলগুলো মূলত আদিবাসী নেটিভ আমেরিকানদের হাজার বছরের কৃষিব্যবস্থার অনন্য অবদান।
৩. ঐতিহাসিক আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট (AIM)

১৯৬৮ সালে গঠিত ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান মুভমেন্ট’ (AIM) আদিবাসীদের অধিকার অর্জনে ৩টি ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করে:
[১৯৬৯: আলকাটরাজ দ্বীপ দখল (১৯ মাস)] ➔ [১৯৭২: ট্রেইল অব ব্রোকেন ট্রিটিজ (২০ দফা দাবি)] ➔ [১৯৭৩: উন্ডেড নি সামরিক প্রতিরোধ (৭১ দিন)]
- আলকাটরাজ দ্বীপ দখল (১৯৬৯-১৯৭১): সাবেক ফেডারেল কারাগার আলকাটরাজ দখল করে আদিবাসীরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়েন।
- ট্রেইল অব ব্রোকেন ট্রিটিজ (১৯৭২): ওয়াশিংটনে ‘ভগ্ন চুক্তিসমূহের পথ’ পদযাত্রার মাধ্যমে সরকার কর্তৃক চুক্তিভঙ্গের বিরুদ্ধে ২০ দফা দাবি তোলা হয়।
- উন্ডেড নি প্রতিরোধ (১৯৭৩): ১৮৯০ সালের গণহত্যা স্থান সাউথ ড্যাকোটার ‘উন্ডেড নি’-তে দীর্ঘ ৭১ দিন এফবিআই ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নেন আদিবাসীরা।
- অর্জন: এই সংগ্রামের ফলেই ১৯৭৫ সালে ‘ইন্ডিয়ান সেলফ-ডিটারমিনেশন অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা তাদের শিক্ষা ও স্থানীয় স্বশাসনের আইনি অধিকার ফিরিয়ে দেয়।
৪. আধুনিক মার্কিন রাজনীতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা
দীর্ঘদিনের প্রান্তিকতা কাটিয়ে নেটিভ আমেরিকানরা এখন মার্কিন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক বা ‘সুইং ভোটার’:
- ঐতিহাসিক ক্যাবিনেট পদ: ২০২১ সালে ডেব হাল্যান্ড (Deb Haaland) প্রথম নেটিভ আমেরিকান হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of the Interior) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তাদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে।
- কংগ্রেসে শক্তিশালী উপস্থিতি: টম কোল ও শারিস ডেভিডসের মতো নেতারা মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
- ‘সুইং স্টেটে’ প্রভাব: অ্যারিজোনা, নেভাদা, নিউ মেক্সিকো ও নর্থ ড্যাকোটার মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের রাজ্যগুলোতে আদিবাসী ভোট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও সিনেট নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখছে।
পবিত্র জমি রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক চুক্তি বাস্তবায়নের তাগিদেই মূলত আদিবাসীরা আজ নিজেদের ট্রাইবাল স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্দখল করতে সক্ষম হচ্ছে।



