বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
শাহরুখ খানকে বলিউডের “বাদশা” বা “কিং খান” বলা হয় তাঁর অসাধারণ অভিনয়জীবন, বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা এবং চলচ্চিত্র শিল্পের ওপর তাঁর বিশাল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে।

১. বিশ্বব্যাপী আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা
- গ্লোবাল আইকন: কেবল ভারত বা এশিয়ায় নয়; মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাতেও তাঁর বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রয়েছে।
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: খ্যাতনামা মার্কিন মিডিয়া লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস তাঁকে “বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুভি স্টার” হিসেবে অভিহিত করেছিল।
২. বক্স অফিস রেকর্ড ও ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
- আইকনিক রোমান্টিক রাজত্ব: ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, কুছ কুছ হোতা হ্যায় এবং কাভি খুশি কাভি গাম-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে তিনি একক অধিপত্য বিস্তার করেন।
- ঐতিহাসিক ব্যাক-টু-ব্যাক হিটস: চার বছরের বিরতি কাটিয়ে ২০২৩ সালে তিনি পরপর দুটি ১,০০০ কোটি টাকারও বেশি আয়ের ব্লকবাস্টার (পাঠান ও জওয়ান) উপহার দিয়ে নিজের বক্স অফিস শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করেন।
৩. চলচ্চিত্রের বাইরে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য
- রেড চিলিস এন্টারটেইনমেন্ট: তিনি ভারতের অন্যতম শীর্ষ ও সফল ভিএফএক্স (VFX) স্টুডিও এবং প্রোডাকশন হাউসের মালিক।
- আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি: আন্তর্জাতিক ক্রিকেট লিগ আইপিএলের অন্যতম সফল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR)-এর অন্যতম স্বত্বাধিকারী।
৪. শূন্য থেকে শীর্ষের গল্প
বলিউডে কোনো পারিবারিক পরিচিতি বা ‘গডফাদার’ ছাড়া, দিল্লির এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসে কেবল নিজের মেধা ও পরিশ্রমে ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে পৌঁছানোর গল্পটি কোটি মানুষের কাছে এক পরম অনুপ্রেরণা।
২০২৬ সালের মেগা প্রজেক্ট: ‘কিং’ (King)
শাহরুখ খানের সবচেয়ে বড় ও বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘কিং’ (King) নিয়ে বিনোদন অঙ্গনে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
মূল তথ্যসমূহ:
- মুক্তির তারিখ: ২০২৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর (ক্রিসমাস উৎসব)।
- পরিচালনা ও প্রযোজনা: পরিচালনা করছেন বিখ্যাত অ্যাকশন ডিরেক্টর সিদ্ধার্থ আনন্দ। প্রযোজনায় রয়েছে রেড চিলিস এন্টারটেইনমেন্ট ও মারফ্লিক্স পিকচার্স।
- কাস্টিং চমক: বড় পর্দায় এই প্রথম শাহরুখ খানের সাথে দেখা যাবে তাঁর মেয়ে সুহানা খান-কে। এছাড়া প্রধান খলনায়কের ভূমিকায় রয়েছেন অভিষেক বচ্চন এবং বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছেন দীপিকা পাড়ুকোন।
- চরিত্র ও লুক: হলিউড ক্লাসিক ‘লিয়ন: দ্য প্রফেশনাল’-এর আদলে তৈরি এই অ্যাকশন-থ্রিলারে শাহরুখকে এক ঝানু আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন বা অ্যাসাসিনের চরিত্রে দেখা যাবে, যেখানে তাঁর লুকে থাকবে হালকা পাকা চুল-দাড়ির স্টাইলিশ সংমিশ্রণ।
বাজেট, মিউজিক ডিল ও সম্ভাব্য পারিশ্রমিক
১. বাজেট (₹৩৫০ কোটি – ₹৪৫০ কোটি)
- স্কেল ও ভিএফএক্স: আন্তর্জাতিক ডিস্ট্রিবিউটর ও ট্রেড অ্যানালিস্টদের মতে, ৬টি বিশাল অ্যাকশন সিকোয়েন্স ও হাই-এন্ড ভিএফএক্স-এর কারণে সিনেমাটির আনুমানিক বাজেট ₹৩৫০ কোটি থেকে ₹৪৫০ কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে।
- পরিচালকের বক্তব্য: ৪৫০ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে কিছু মিডিয়ায় গুঞ্জন ছড়ালে পরিচালক সিদ্ধার্থ আনন্দ বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উড়িয়ে দেন; তবে এটি যে শাহরুখের ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যয়বহুল আন্তর্জাতিক মানের প্রজেক্ট তা নিশ্চিত।
২. রেকর্ড মিউজিক ডিল (₹৫০ কোটি)
- অডিও বা মিউজিক রাইটস বিক্রির জন্য জি মিউজিক (Zee Music)-এর সাথে রেকর্ড ₹৫০ কোটি টাকার চুক্তি আলোচনার শীর্ষে রয়েছে।
- সিনেমাটির গান কম্পোজ করছেন শচীন-জিগার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর (BGM)-এর দায়িত্বে আছেন রকস্টার মিউজিক ডিরেক্টর অনিরুদ্ধ রবিচন্দের।
৩. তারকাদের আনুমানিক পারিশ্রমিক (এক নজরে)
| তারকার নাম | চলচ্চিত্রে ভূমিকা | আনুমানিক পারিশ্রমিক (রুপি) |
| শাহরুখ খান | প্রধান লিড (ডন/মেন্টর) | ₹১৫০ কোটি – ₹২৫০ কোটি (প্রফিট শেয়ারিং) |
| দীপিকা পাড়ুকোন | বিশেষ চরিত্র | ₹১৫ কোটি – ₹২০ কোটি |
| অভিষেক বচ্চন | প্রধান খলনায়ক (Villain) | ₹১০ কোটি |
| অনিল কাপুর | গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র | ₹৮ কোটি |
| সুহানা খান | সমান্তরাল লিড/শিষ্য | ₹১ কোটি |
| অন্যান্য (জ্যাকি শ্রফ, আরশাদ ওয়ার্সি) | সহকারী চরিত্র | ₹২ কোটি – ₹৫ কোটি |
(দ্রষ্টব্য: পারিশ্রমিক সংক্রান্ত তথ্যগুলো ভারতীয় ট্রেড অ্যানালিস্টদের সূত্রে প্রাপ্ত, যা প্রযোজনা সংস্থা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাজার সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়ে থাকে)।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
১৯০১ সালে সর্বপ্রথম আলফ্রেড নোবেলের উইলের ওপর ভিত্তি করে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। মানবজাতির কল্যাণে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাঁচটি ভিন্ন ক্ষেত্রে প্রথমবার এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস ও বিজয়ীদের সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
নোবেল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
সুইডিশ বিজ্ঞানী এবং ডিনামাইটের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে তাঁর একটি উইলে এই পুরস্কারের ঘোষণা দেন। তিনি তাঁর মোট সম্পত্তির একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৯৪%) এই পুরস্কার তহবিলের জন্য রেখে যান। উদ্দেশ্য ছিল—পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শান্তিতে যারা মানবজাতির জন্য সর্বোচ্চ অবদান রাখবেন, তাঁদের পুরস্কৃত করা। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর ১৯০১ তারিখে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
১৯০১ সালের প্রথম নোবেল বিজয়ীদের তালিকা
- পদার্থবিজ্ঞান: উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন (জার্মানি)

উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন (Wilhelm Conrad Röntgen) ছিলেন একজন প্রখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী। ১৮৯৫ সালে তাঁর যুগান্তকারী এক্স-রে (X-ray) আবিষ্কারের জন্য ১৯০১ সালে তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
তাঁর এই আবিষ্কার এবং জীবন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. এক্স-রে (X-ray) আবিষ্কারের ঘটনা
- সাল: ১৮৯৫ সালের ৮ নভেম্বর।
- ঘটনা: জার্মানির ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ল্যাবরেটরিতে একটি ক্যাথোড রশ্মি টিউব (Cathode-ray tube) নিয়ে পরীক্ষা করার সময় তিনি হঠাৎ লক্ষ্য করেন, কালো কাগজে ঢাকা টিউবটির পাশে থাকা একটি ফ্লুরোসেন্ট পর্দা জ্বলজ্বল করছে।
- নামকরণ: তিনি বুঝতে পারেন টিউব থেকে এক ধরণের অজানা অদৃশ্য রশ্মি নির্গত হচ্ছে, যা কাগজ ভেদ করে চলে যাচ্ছে। এই রশ্মির প্রকৃতি তখন অজানা থাকায় গণিতের অজানা রাশির প্রতীক হিসেবে তিনি এর নাম দেন ‘X-ray’ বা এক্স-রশ্মি (অনেক দেশে একে ‘রন্টজেন রশ্মি’ও বলা হয়)।
২. প্রথম মানব এক্স-রে
রন্টজেন তাঁর এই আবিষ্কারের পর প্রথম মানবদেহের এক্স-রে ছবি তোলেন। সেটি ছিল তাঁর স্ত্রী আনা বার্থা রন্টজেন-এর হাতের ছবি। ছবিতে তাঁর স্ত্রীর হাতের হাড় এবং আঙুলে পরা বিয়ের আংটিটি স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। এই ছবি দেখে তাঁর স্ত্রী অবাক হয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে ফেলেছি!”
৩. নিঃস্বার্থ বিজ্ঞানী
রন্টজেন তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কোনো প্যাটেন্ট (Patent) বা স্বত্ব নেননি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর এই আবিষ্কার যেন মানবজাতির কল্যাণে বিনামূল্যে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং শিল্পকারখানায় এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে তাঁর এই নিঃস্বার্থ সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি নোবেল পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থও তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার কাজের জন্য দান করে দিয়েছিলেন।
- রসায়ন: ইয়াকুবুস হেনরিকুস ভান্ট হফ (নেদারল্যান্ডস)

ইয়াকুবুস হেনরিকুস ভান্ট হফ (Jacobus Henricus van ‘t Hoff) ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত ডাচ রসায়নবিদ এবং আধুনিক ভৌত রসায়নের (Physical Chemistry) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০১ সালে তরল পদার্থের রাসায়নিক গতিবিদ্যা এবং অসমোটিক চাপ সংক্রান্ত যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
তাঁর প্রধান অবদান এবং বিজ্ঞান জগতে তাঁর প্রভাবের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. নোবেল পাওয়ার মূল কারণ (রাসায়নিক গতিবিদ্যা ও অসমোটিক চাপ)
- রাসায়নিক গতিবিদ্যা (Chemical Dynamics): ভান্ট হফ দেখান কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বা বেগ নির্ধারিত হয় এবং কীভাবে তাপমাত্রা ও চাপ এই গতিকে প্রভাবিত করে। তাঁর তৈরি করা সমীকরণগুলো বিক্রিয়ার হার বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করে।
- অসমোটিক চাপ (Osmotic Pressure): তিনি প্রমাণ করেন যে, কোনো তরল দ্রবণে দ্রবীভূত কণাগুলো (যেমন পানিতে চিনি) ঠিক গ্যাসের কণার মতোই আচরণ করে। তিনি গ্যাসের আদর্শ সমীকরণকে (\(PV=nRT\)) দ্রবণের ক্ষেত্রেও সফলভাবে প্রয়োগ করেন, যা রসায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে।
২. স্টেরিওকেমিস্ট্রি বা ত্রিমাত্রিক রসায়নের জনক
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অনেক আগেই, ১৮৭৪ সালে তিনি রসায়নে এক বিপ্লবী তত্ত্ব দেন। তিনি প্রথম প্রস্তাব করেন যে, কার্বন পরমাণুর চারটি যোজ্যতা বা বন্ড ত্রিমাত্রিক মহাকাশে একটি চতুস্তলক (Tetrahedron) আকৃতিতে বিন্যস্ত থাকে।
- গুরুত্ব: তাঁর এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই রসায়নের একটি সম্পূর্ণ নতুন শাখা ‘স্টেরিওকেমিস্ট্রি’ (Stereochemistry) গড়ে ওঠে। এটি ছাড়া আজকের আধুনিক ওষুধ বা মেডিসিন তৈরি করা অসম্ভব হতো।
৩. ভ্যান্ট হফ ফ্যাক্টর (\(i\))
রসায়নে তাঁর নামানুসারে ‘ভ্যান্ট হফ ফ্যাক্টর’ (van ‘t Hoff factor) ব্যবহার করা হয়। কোনো দ্রাবকে (যেমন পানিতে) কোনো লবণ বা যৌগ যোগ করলে তা কতটুকু ভেঙে যায় বা যুক্ত হয়, তা পরিমাপ করার জন্য এই ফ্যাক্টরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- চিকিৎসাবিজ্ঞান: এমিল ফন বেহরিং (জার্মানি)

এমিল ফন বেহরিং (Emil von Behring) ছিলেন একজন প্রখ্যাত জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ব্যাকটেরিয়াবিদ। ১৯০১ সালে ডিপথেরিয়া রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সিরাম থেরাপি (Serum Therapy) আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
তৎকালীন সময়ে শিশুদের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক এক ব্যাধি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করায় তাঁকে “শিশুদের রক্ষাকর্তা” (Savior of Children) হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর প্রধান অবদান এবং জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. ডিপথেরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সিরাম থেরাপি
- পটভূমি: উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ‘ডিপথেরিয়া’ (Diphtheria) ছিল শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার শিশু শ্বাসকষ্টে মারা যেত।
- আবিষ্কার: এমিল ফন বেহরিং এবং তাঁর সহকর্মীরা (যার মধ্যে জাপানি বিজ্ঞানী কিতাসাতো শিবাসাবুরো অন্তর্ভুক্ত ছিলেন) আবিষ্কার করেন যে, ডিপথেরিয়া আক্রান্ত পশুর (যেমন ঘোড়া) রক্তে এক ধরণের প্রতিরক্ষামূলক উপাদান তৈরি হয়। তিনি এই উপাদানটির নাম দেন ‘অ্যান্টিটক্সিন’ (Antitoxin)।
- প্রয়োগ: এই অ্যান্টিটক্সিন সমৃদ্ধ সিরাম যখন আক্রান্ত কোনো শিশুর শরীরে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হতো, তখন তা ডিপথেরিয়ার মারাত্মক বিষকে নিষ্ক্রিয় করে দিত। ১৮৯২ সালে প্রথমবার বাণিজ্যিকভাবে এই সিরামের উৎপাদন শুরু হয় এবং এটি রাতারাতি ডিপথেরিয়ায় মৃত্যুর হার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনে।
২. নোবেল পুরস্কার অর্জন (১৯০১)
এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলেই ১৯০১ সালে প্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেলটি তাঁর হাতে ওঠে। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, “শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সিরাম থেরাপি নিয়ে তাঁর কাজ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে, যার মাধ্যমে রোগ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার পেয়েছে মানবজাতি।”
৩. ধনুষ্টংকার বা টিটেনাসের প্রতিষেধক
ডিপথেরিয়ার পাশাপাশি এমিল ফন বেহরিং ধনুষ্টংকার বা টিটেনাস (Tetanus) রোগের অ্যান্টিটক্সিন তৈরিতেও সফল হয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের টিটেনাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে তাঁর তৈরি এই প্রতিষেধক লাখ লাখ প্রাণ রক্ষা করেছিল।
- সাহিত্য: সুলি প্রুদোম (ফ্রান্স)

সুলি প্রুদোম (Sully Prudhomme) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ফরাসি কবি এবং প্রাবন্ধিক। ১৯০১ সালে তাঁর কাব্যিক রচনার বিশেষ গুণ, উচ্চ আদর্শ এবং হৃদয়ের গভীর অনুভূতির অনন্য প্রকাশের জন্য তাঁকে ইতিহাসের সর্বপ্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং নোবেল জয়ের পটভূমি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার মূল কারণ
নোবেল কমিটি ১৯০১ সালে সুলি প্রুদোমকে পুরস্কৃত করার সময় তাঁর লেখার তিনটি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছিল:
- উচ্চ আদর্শবাদ (High Idealism): তাঁর কবিতা কেবল বিনোদনের জন্য ছিল না, বরং এতে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ এবং আদর্শের প্রতিফলন ঘটত।
- শৈল্পিক নিখুঁততা (Artistic Perfection): তাঁর শব্দ চয়ন এবং কবিতার ছন্দ ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত ও নিখুঁত।
- হৃদয় ও বুদ্ধির সমন্বয়: তিনি তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন গভীর মানবিক অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন, অন্যদিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
২. পারনাসিয়ান আন্দোলন (Parnassian Movement)
সুলি প্রুদোম ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘পারনাসিয়ান’ সাহিত্য আন্দোলনের একজন প্রধান কবি ছিলেন। এই আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল “শিল্পের জন্য শিল্প” (Art for art’s sake)। রোমান্টিক যুগের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতার বিপরীতে গিয়ে তাঁরা কবিতায় নিখুঁত গঠন, সংযম এবং ধ্রুপদী সৌন্দর্যের ওপর জোর দিতেন।
৩. বিখ্যাত কবিতা ও সৃষ্টিকর্ম
- ‘লা ভাস’ (La Vase Brisé – ভাঙা ফুলদানি): এটি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক কবিতা। একটি ভাঙা ফুলদানির উপমার মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয়ের ভেতরের গোপন কষ্ট এবং ভাঙনের গল্প অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
- দার্শনিক কাব্য: পরবর্তী জীবনে তিনি বিজ্ঞান এবং দর্শনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তাঁর ‘লা জাস্টিস’ (La Justice – ন্যায়বিচার) এবং ‘লে হ্যুরো’ (Les Bonheurs – সুখ) কাব্যগ্রন্থে মানুষের অস্তিত্ব ও মহাবিশ্ব নিয়ে গভীর দার্শনিক চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে।
৪. ঐতিহাসিক বিতর্ক
১৯০১ সালে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য সুলি প্রুদোমকে মনোনীত করা হলে সাহিত্য বিশ্বে একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সমসাময়িক অনেক লেখক এবং সমালোচক মনে করেছিলেন যে, রাশিয়ার বিশ্ববিখ্যাত ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় (যিনি ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ও ‘আনা কারেনিনা’ লিখেছেন) এই পুরস্কারের জন্য বেশি যোগ্য ছিলেন। এমনকি সুইডেনের ৪২ জন বিশিষ্ট লেখক সুলি প্রুদোম নোবেল পাওয়ার পর টলস্টয়ের কাছে একটি দুঃখপ্রকাশ পত্রও পাঠিয়েছিলেন। তবে প্রুদোম তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের অর্থের একটি বড় অংশ তরুণ ফরাসি কবিদের সহায়তার জন্য একটি তহবিল গঠনে দান করে উদারতার পরিচয় দেন।
- শান্তি: জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (সুইজারল্যান্ড) এবং ফ্রেদেরিক প্যাসি (ফ্রান্স)
জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো এবং ফ্রেদেরিক প্যাসি ১৯০১ সালে যৌথভাবে ইতিহাসের প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন。 মানবজাতির কল্যাণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিকতা বজায় রাখার জন্য এই দুই ব্যক্তিত্বের অবদান ছিল অতুলনীয়।
তাঁদের ব্যক্তিগত অবদান এবং নোবেল জয়ের ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:
১. জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (Jean Henri Dunant) – সুইজারল্যান্ড
জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো (যাঁকে হেনরি ডুনান্ট নামেও ডাকা হয়) ছিলেন একজন সুইস ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। তাঁকে মূলত রেড ক্রস-এর জনক বলা হয়।
- সলফেরিনোর যুদ্ধ (১৮৫৯): ব্যবসায়িক কাজে ইতালি যাওয়ার পথে দ্যুনো ‘সলফেরিনোর যুদ্ধ’ প্রত্যক্ষ করেন। সেখানে প্রায় ৪০,০০০ সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছিল। এই ভয়াবহতা দেখে তিনি স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে আহত সৈনিকদের জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সেবা করার উদ্যোগ নেন।
- রেড ক্রস প্রতিষ্ঠা (১৮৬৩): এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ‘এ মেমোরি অব সলফেরিনো’ নামে একটি বই লেখেন। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৮৬৩ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি’ (ICRC) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- জেনেভা কনভেনশন (১৮৬৪): যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের অধিকার এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁর প্রচেষ্টায় প্রথম ‘জেনেভা কনভেনশন’ স্বাক্ষরিত হয়।
২. ফ্রেদেরিক প্যাসি (Frédéric Passy) – ফ্রান্স
ফ্রেদেরিক প্যাসি ছিলেন একজন ফরাসি অর্থনীতিবিদ এবং শান্তিকামী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা।
- লিগ অব পিস প্রতিষ্ঠা: তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮৬৭ সালে ফ্রান্সে ‘লিগ অব পিস’ (Ligue internationale et permanente de la paix) প্রতিষ্ঠা করেন।
- ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU): ১৮৮৯ সালে তিনি ব্রিটিশ শান্তিকামী র্যান্ডাল ক্রেমারের সাথে যৌথভাবে ‘ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’ (IPU) গঠন করেন। এটি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত প্রথম বড় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যা আন্তর্জাতিক বিরোধগুলো যুদ্ধের বদলে আলোচনার মাধ্যমে মেটাতে কাজ করত।
কেন তাঁরা যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছিলেন?
নোবেল কমিটি ১৯০১ সালে প্রথম শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সময় দুই ধরণের অবদানকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিল:
- জ্যাঁ অঁরি দ্যুনো: যুদ্ধের ময়দানে মানুষের কষ্ট লাঘব এবং মানবিক নিয়ম নীতি তৈরির জন্য।
- ফ্রেদেরিক প্যাসি: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- অর্থনীতিতে নোবেল: ১৯০১ সালে অর্থনীতিতে কোনো নোবেল পুরস্কার ছিল না। ১৯৬৮ সালে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব সুইডেন এই বিভাগটি চালু করে এবং ১৯৬৯ সালে প্রথম অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হয়।
- পুরস্কারের স্থান: শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় নরওয়ের ওসলো থেকে এবং বাকি পুরস্কারগুলো দেওয়া হয় সুইডেনের স্টকহোম থেকে।
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩) — সাহিত্যে নোবেল
- ইতিহাস গড়া অর্জন: তিনি কেবল প্রথম বাঙালিই নন, বরং সমগ্র এশিয়ার মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
- মূল অবদান: তাঁর অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’ (Song Offerings)-এর ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি তাঁর লেখাকে “অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাজা এবং সুন্দর কবিতা” হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
- আরেকটি অনন্য কীর্তি: তিনি বিশ্বের একমাত্র কবি, যাঁর লেখা গান দুটি ভিন্ন দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়—বাংলাদেশের ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ভারতের ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’।
২. অমর্ত্য সেন (১৯৯৮) — অর্থনীতিতে নোবেল
- নতুন ধারার অর্থনীতি: তিনি প্রচলিত অর্থনীতির বাইরে গিয়ে ‘কল্যাণ অর্থনীতি’ (Welfare Economics) এবং দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
- মূল দর্শন: তিনি দেখিয়েছিলেন যে, দুর্ভিক্ষ কেবল খাদ্যের অভাবে হয় না, বরং খাদ্য বণ্টনের অসমতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অভাবের কারণে ঘটে। তাঁর কাজ বিশ্বজুড়ে মানব উন্নয়ন সূচক (HDI) তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
৩. ড. মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬) — শান্তিতে নোবেল
- দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে তিনি এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
- মূল অবদান: ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ম বদলে দিয়ে জামানত ছাড়াই দরিদ্র মানুষকে, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit) দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনের এক নতুন মডেল তৈরি করেন। (বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন)।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, এডলফ হিটলার ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বার্লিনে তার ভূগর্ভস্থ বাংকারে (Führerbunker) সায়ানাইড বিষ পান করে এবং মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও কারণ নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও কয়েক দশক ধরে এটি বিশ্বজুড়ে অন্যতম বড় একটি ঐতিহাসিক রহস্য বা ‘মিথ’ হিসেবে ডালপালা মেলেছিল।
নিচে হিটলারের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা, এটি রহস্যাবৃত হওয়ার কারণ, শেষ দিনগুলোর নাটকীয় ঘটনা এবং নুরেমবার্গ ট্রায়ালস বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. হিটলারের মৃত্যু আসলে কবে ও কীভাবে হয়েছিল?

১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় যখন সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি বার্লিনে হিটলারের বাংকারের মাত্র কয়েকশ মিটারের মধ্যে চলে আসে, তখন হিটলার শত্রুর হাতে বন্দি হওয়া এড়াতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
- তারিখ ও সময়: ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল, দুপুর ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে।
- পদ্ধতি: মৃত্যুর আগের দিন দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন হিটলার। ৩০ এপ্রিল দুপুরে তাঁরা বাংকারের একটি গোপন কক্ষে যান। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটলার একই সাথে একটি সায়ানাইড ক্যাপসুল মুখে নিয়ে কামড়ে ভেঙে বিষপান করেন এবং নিজের পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি করেন। ইভা ব্রাউন কেবল সায়ানাইড বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।
- মরদেহ ধ্বংস: শত্রুপক্ষ যেন তাঁর মৃতদেহ নিয়ে কোনো তামাশা বা অপমান করতে না পারে, সেজন্য হিটলারের পূর্ব নির্দেশ ছিল দেহ পুড়িয়ে ফেলার। আত্মহত্যার পর তাঁর দেহরক্ষী ও সহচরেরা দুটি মরদেহ কম্বলে জড়িয়ে বাংকারের বাইরে রাইখ চ্যান্সেলারি বাগানে নিয়ে আসেন এবং প্রচুর পেট্রল ঢেলে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ফেলেন।
২. হিটলারের মৃত্যু কেন এত রহস্যাবৃত হয়েছিল?
ইতিহাসবিদদের মতে, মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের চালবাজি এবং তৎকালীন কিছু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে হিটলারের মৃত্যুকে ঘিরে কয়েক দশক ধরে রহস্য ও নানা মনগড়া গল্প (Conspiracy Theories) তৈরি হয়েছিল:
ক) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা (Soviet Disinformation)
হিটলারের বাংকার এলাকাটি সোভিয়েত বাহিনী দখল করেছিল এবং তারাই প্রথম হিটলারের পোড়া দেহাবশেষ উদ্ধার করে। কিন্তু সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্টালিন ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্ববাসীর কাছে তথ্য গোপন করেন। সোভিয়েতরা প্রথম দিকে প্রচার করতে শুরু করে যে হিটলার মরেননি, তিনি আর্জেন্টিনা, স্পেন বা কোনো গোপন দ্বীপে পালিয়ে গেছেন। মিত্রবাহিনীর (যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন) মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার রাজনৈতিক চাল হিসেবে স্টালিন এই মিথ্যা ছড়িয়েছিলেন।
খ) জনসমক্ষে মৃতদেহের অনুপস্থিতি
যেহেতু হিটলারের অনুসারীরা তাঁর দেহ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল, তাই সাধারণ মানুষ বা পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর মৃতদেহের কোনো ছবি বা সরাসরি প্রমাণ দেখতে পায়নি। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ছড়াতে থাকে যে হিটলার প্লাস্টিক সার্জারি করে সাবমেরিনে চড়ে দক্ষিণ আমেরিকায় পালিয়ে গেছেন।
গ) নাৎসি প্রোপাগান্ডা
১৯৪৫ সালের ১ মে জার্মান রেডিও থেকে যখন হিটলারের মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয়, তখন বলা হয়েছিল যে “হিটলার বলশেভিকদের (সোভিয়েত) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে বীরের মতো মারা গেছেন”। এই মিথ্যা প্রচারণার ফলে সাধারণ মানুষের মনে তাঁর আত্মহত্যার আসল পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
৩. আধুনিক বিজ্ঞানের প্রমাণ: রহস্যের অবসান
হিটলারের বেঁচে থাকার সমস্ত জল্পনা-কল্পনা আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞান পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে:
- দাঁতের পরীক্ষা (Dental Records): সোভিয়েত বাহিনী হিটলারের পোড়া মরদেহের চোয়াল ও দাঁতের কিছু অংশ গোপনে মস্কোর সামরিক আর্কাইভে সংরক্ষণ করেছিল। ২০১৮ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী ড. ফিলিপ শার্লিয়ার (Philippe Charlier)-এর নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল সেই দাঁত পরীক্ষা করার সুযোগ পায়। পরীক্ষা শেষে প্রমাণিত হয়, এই দাঁতগুলো হুবহু হিটলারের ডেন্টাল এক্স-রে এবং মেডিকেল রেকর্ডের সাথে মিলে যায়।
- ভেজিটেরিয়ান প্রমাণ: হিটলারের দাঁতে কোনো মাংসের আঁশ পাওয়া যায়নি, যা প্রমাণ করে এই দেহটি হিটলারেরই ছিল; কারণ তিনি কঠোর নিরামিষভোজী (Vegetarian) ছিলেন।
- মাথার খুলি: সংরক্ষিত মাথার খুলির টুকরোটিতে বুলেটের স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা মাথায় গুলি করার তথ্যকে নিশ্চিত করে।
বিজ্ঞানীরা এবং আধুনিক ইতিহাসবিদেরা তাই একবাক্যে নিশ্চিত করেছেন যে, ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল বার্লিনের বাংকারেই হিটলারের জীবনের অবসান ঘটেছিল এবং তাঁর পালিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো কেবলই কল্পনা।
৪. হিটলারের শেষ দিনগুলোর ৫টি চাঞ্চল্যকর ঘটনা

হিটলারের শেষ দিনগুলোতে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তির সময় এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল, যা যেকোনো থ্রিলার গল্পকেও হার মানায়:
১. মাত্র ৪০ ঘণ্টার বৈবাহিক জীবন ও ইভা ব্রাউনের ট্র্যাজেডি
হিটলার তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা ইভা ব্রাউনকে কখনো জনসমক্ষে স্বীকৃতি দেননি, যাতে জার্মান নারীদের কাছে তাঁর আকর্ষণ কমে না যায়। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে, ২৮-২৯ এপ্রিলের মধ্যরাতে (আত্মহত্যার মাত্র ৪০ ঘণ্টা আগে) বাংকারের ভেতরেই তাঁরা একটি সংক্ষিপ্ত আইনি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বিয়ের পর ইভা ব্রাউন তাঁর নামের শেষে ‘হিটলার’ লেখার সুযোগ পান, যা তাঁর দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল। এর ঠিক পরদিনই তাঁরা একসাথে আত্মহত্যা করেন।
২. ‘ব্লন্ডি’ নামক পোষা কুকুরের ওপর বিষের পরীক্ষা
হিটলার তাঁর ‘ব্লন্ডি’ (Blondi) নামের জার্মান শেফার্ড কুকুরটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। কিন্তু আত্মহত্যার ঠিক আগে, ২৯ এপ্রিল, হিটলারের মনে সন্দেহ জাগে যে এসএস (SS) বাহিনীর প্রধান হিমলারের দেওয়া সায়ানাইড ক্যাপসুলগুলো আসলেই কাজ করবে কি না। ক্যাপসুলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য হিটলার তাঁর চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রথমে কুকুরটিকে বিষ খাওয়ান। কুকুরটি তৎক্ষণাৎ মারা যায়, যা হিটলারকে নিশ্চিত করে যে বিষটি আসল ছিল।
৩. গোয়েবলস দম্পতির নৃশংস সিদ্ধান্ত
হিটলারের অন্ধ ভক্ত এবং নাৎসি প্রচার মন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস এবং তাঁর স্ত্রী মাগদা গোয়েবলস সিদ্ধান্ত নেন যে হিটলার ও নাৎসি জার্মানি ছাড়া তারা বাঁচবেন না। হিটলারের আত্মহত্যার পরদিন, অর্থাৎ ১ মে ১৯৪৫, মাগদা গোয়েবলস তাঁর নিজের ৬টি ঘুমন্ত সন্তানকে (যাদের বয়স ছিল ৪ থেকে ১২ বছরের মধ্যে) সায়ানাইড বিষ খাইয়ে হত্যা করেন। এরপর জোসেফ এবং মাগদা বাংকারের বাইরে গিয়ে নিজেরাও আত্মহত্যা করেন।
৪. ‘অপারেশন পেপারক্লিপ’ (Operation Paperclip)
জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এক গোপন প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জার্মানিতে রকেট বিজ্ঞান এবং সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ‘Operation Paperclip’-এর অধীনে জার্মানির প্রায় ১,৬০০ জন শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং টেকনিশিয়ানকে (যাদের অনেকেই সরাসরি নাৎসি পার্টির সদস্য ছিলেন) গোপনে আমেরিকায় নিয়ে যায়। এই বিজ্ঞানীদের অন্যতম ছিলেন ভার্নার ভন ব্রাউন (Wernher von Braun), যিনি পরবর্তীতে নাসার (NASA) অ্যাপোলো চাঁদে যাওয়ার রকেট (Saturn V) তৈরি করেছিলেন।
৫. নুরেমবার্গ ট্রায়ালস (Nuremberg Trials)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর, ১৯৪৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জার্মানির নুরেমবার্গ শহরে আন্তর্জাতিক সামরিক আদালত বসে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং বিশ্বশান্তি ভঙ্গের দায়ে বিচার করা হয়। এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আইনি সমাপ্তি ঘটে।
৫. ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ ট্রায়ালের রায়
নুরেমবার্গ ট্রায়াল ছিল আধুনিক ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালত। ১৯৪৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এবং ১ অক্টোবর এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
মূল অপরাধের ৪টি ধারা (Charges)
১. ১ নম্বর ধারা: বিশ্বশান্তি নষ্ট করার জন্য গোপন ষড়যন্ত্র (Conspiracy)
২. ২ নম্বর ধারা: আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করা এবং শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ (Crimes against Peace)
৩. ৩ নম্বর ধারা: যুদ্ধাপরাধ বা যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন (War Crimes)
৪. ৪ নম্বর ধারা: মানবতাবিরোধী অপরাধ, যেমন গণকবর ও হলোকাস্ট (Crimes against Humanity)
শীর্ষ নাৎসি নেতাদের রায় (Individual Sentences)
অভিযুক্ত ২৪ জন শীর্ষ নাৎসি নেতার মধ্যে ১ জন (রবার্ট লে) বিচারের আগেই আত্মহত্যা করেন এবং ১ জন (গুস্তাভ ক্রুপ) শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিচারের মুখোমুখি হতে পারেননি। বাকি ২২ জনের রায় ছিল নিম্নরূপ:
- মৃত্যুদণ্ড (Death by Hanging) — ১২ জন:
- হারম্যান গোয়রিং (Hermann Göring): হিটলারের পর নাৎসি জার্মানির সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নেতা এবং বিমানবাহিনীর (Luftwaffe) প্রধান। (তবে ফাঁসির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি সেল-এর ভেতর সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন)।
- জোয়াকিম ভন রিবেনট্রপ (Joachim von Ribbentrop): হিটলারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী।
- উইলহেল্ম কাইটেল (Wilhelm Keitel): জার্মান সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ ফিল্ড মার্শাল।
- মার্টিন বোরম্যান (Martin Bormann): হিটলারের ব্যক্তিগত সচিব (তাঁকে অনুপস্থিতে বা In Absentia বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল)।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (Life Imprisonment) — ৩ জন:
- রুডলফ হেস (Rudolf Hess): হিটলারের সাবেক ডেপুটি বা উপ-প্রধান।
- ওয়াল্টার ফাঙ্ক (Walther Funk): নাৎসি জার্মানির অর্থনীতি মন্ত্রী।
- এরিক রেডার (Erich Raeder): জার্মান নৌবাহিনীর গ্র্যান্ড এডমিরাল।
- বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড (Term Imprisonment) — ৪ জন:
- আলবার্ট স্পিয়ার (Albert Speer): হিটলারের প্রধান স্থপতি ও যুদ্ধকালীন অস্ত্র উৎপাদন মন্ত্রী (২০ বছরের কারাদণ্ড)।
- বাল্ডুর ভন শিরাখ (Baldur von Schirach): হিটলার ইউথ (Hitler Youth) সংগঠনের প্রধান (২০ বছরের কারাদণ্ড)।
- কনস্ট্যান্টিন ভন নিউরথ (Konstantin von Neurath): সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী (১৫ বছরের কারাদণ্ড)।
- কার্ল ডোনিতজ (Karl Dönitz): হিটলারের মৃত্যুর পর জার্মানির সংক্ষিপ্ত মেয়াদের প্রেসিডেন্ট এবং নৌবাহিনীর প্রধান (১০ বছরের কারাদণ্ড)।
- খালাস (Acquittal) — ৩ জন:
- অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ না থাকায় আদালত ৩ জনকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেয়: হিয়ালমার শ্যাখট (সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান), ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন (সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর) এবং হ্যান্স ফ্রিটশে (নাৎসি প্রোপাগান্ডা মন্ত্রণালয়ের রেডিও বিভাগের প্রধান)।
নাৎসি সংগঠনগুলোর ওপর রায় ও বাস্তবায়ন
ব্যক্তিগত বিচারের পাশাপাশি নাৎসিদের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক দল ও বাহিনীকে অপরাধী সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আদালতের রায়ে এসএস (SS), গেস্টাপো (Gestapo) এবং নাৎসি লিডারশিপ কোর-কে “অপরাধী সংগঠন” (Criminal Organizations) হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নাৎসি নেতাদের ১৯৪৬ সালের ১৬ অক্টোবর নুরেমবার্গ কারাগারের ভেতরেই ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসি কার্যকর করার পর তাঁদের লাশ গোপন স্থানে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় এবং সেই ছাই একটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁদের কবর পরবর্তীতে নব্য-নাৎসিদের জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত হতে না পারে।
এই ট্রায়ালের পর আন্তর্জাতিক আইনি ইতিহাসে “নুরেমবার্গ প্রিন্সিপালস” গড়ে ওঠে, যা স্পষ্ট করে দেয়—“উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আদেশ পালন করছিলাম”—এই অজুহাত দেখিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যা থেকে পার পাওয়া যাবে না।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ এভিয়েশন ও প্রতিরক্ষা সামরিক বিশ্লেষণ
উপস্থাপনায়: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আকাশজয়ের গল্প মানবসভ্যতার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়গুলোর একটি। কাঠের ফ্রেমের প্রাথমিক বিমান থেকে শুরু করে আজকের হাইপারসনিক ইঞ্জিন এবং চতুর্থ/পঁচিশ প্রজন্মের আধুনিক ফাইটার জেট—এভিয়েশন প্রযুক্তির এই দ্রুত বিবর্তন বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।

নিচে বিমানের আবিষ্কার, জেট ইঞ্জিনের বৈজ্ঞানিক রূপরেখা, বিভিন্ন ইঞ্জিনের প্রকারভেদ এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (BAF) বিদ্যমান সক্ষমতা ও প্রযুক্তির একটি বিস্তারিত তথ্যকোষ তুলে ধরা হলো।
১. বিমানের আবিষ্কার ও সূচনালগ্ন

বিশ্বের প্রথম সফল মোটরচালিত ও নিয়ন্ত্রিত বিমান আবিষ্কার করেন আমেরিকান দুই ভাই—উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট (Wright Brothers)।
- ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর।
- স্থান: কিটি হক, উত্তর ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র (Kitty Hawk, North Carolina)।
- প্রথম উড্ডয়ন: তাদের নির্মিত ঐতিহাসিক বিমান ‘রাইট ফ্লাইয়ার’ (Wright Flyer) মাত্র ১২ সেকেন্ডে ১২০ ফুট পথ পাড়ি দিয়েছিল। বিমানের প্রথম পাইলট ছিলেন অরভিল রাইট।
২. জেট ইঞ্জিনের আবিষ্কার ও জেট এজের (Jet Age) সূচনা
প্রপেলার ইঞ্জিনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিমানের গতি দ্বিগুণ করতে আগমন ঘটে জেট ইঞ্জিনের।
- উদ্ভাবক: ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার ফ্রাঙ্ক হুইটল (Sir Frank Whittle) ১৯৩০ সালে প্রথম জেট ইঞ্জিনের পেটেন্ট করেন। অন্যদিকে, জার্মানির বিজ্ঞানী হ্যান্স ভন ওহাইন (Hans von Ohain) স্বাধীনভাবে আরেকটি সফল ডিজাইন তৈরি করেন।
- প্রথম জেট বিমান: হ্যান্স ভন ওহাইনের ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে ১৯৩৯ সালের ২৭ আগস্ট বিশ্বের প্রথম জেট চালিত বিমান ‘হেইঙ্কেল হি ১৭৮’ (Heinkel He 178) সফলভাবে আকাশে ওড়ে।
- সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রয়োগ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৪৪) জার্মানির Messerschmitt Me 262 প্রথম ফাইটার জেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হয় যাত্রীবাহী বিমানে জেট ইঞ্জিনের ব্যবহার, যা বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে বিপ্লব ঘটায়।
৩. জেট ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে?

জেট ইঞ্জিন মূলত স্যার আইজ্যাক নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র—“প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে” (Action and Reaction)—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ জেট ইঞ্জিনের ৪টি প্রধান ধাপ │
├──────────────┬──────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ধাপ │ কার্যপদ্ধতি │
├──────────────┼──────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. Intake │ সামনের পাখা দিয়ে প্রচুর বাতাস ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। │
│ ২. Compression│ কম্প্রেসর ব্লেড দিয়ে বাতাসকে তীব্র সংকুচিত করা হয়। │
│ ৩. Combustion│ সংকুচিত বাতাসে জ্বালানি মিশিয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।│
│ ৪. Exhaust │ পেছনের নজেল দিয়ে তীব্র গতিতে উত্তপ্ত গ্যাস বের হয়ে ধাক্কা তৈরি করে।│
└──────────────┴──────────────────────────────────────────────────────────┘
৪. বিভিন্ন প্রকার জেট ইঞ্জিন ও সেগুলোর ব্যবহার

গঠন ও কাজের ধরনের ওপর ভিত্তি করে জেট ইঞ্জিনকে প্রধানত ৬টি ভাগে ভাগ করা হয়:
| ইঞ্জিনের ধরন | প্রধান বৈশিষ্ট্য | ব্যবহার |
| টার্বোজেট (Turbojet) | প্রাথমিক ও সাধারণ ক্রুড প্রযুক্তি, বেশি শব্দ ও জ্বালানি খরচ। | পুরোনো ফাইটার জেট ও রকেট। |
| টার্বোফ্যান (Turbofan) | সামনে বড় ফ্যান থাকে, বাইপাস এয়ার প্রডিউস করে। কম শব্দ ও অত্যন্ত সাশ্রয়ী। | আধুনিক কমার্শিয়াল বোয়িং/এয়ারবাস ও modern ফাইটার। |
| টার্বোপ্রপ (Turboprop) | জেট শক্তির ৯০% দিয়ে বাইরের প্রপেলার বা পাখা ঘোরানো হয়। | কম দূরত্বের আঞ্চলিক যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান। |
| টার্বোশ্যাফট (Turboshaft) | শক্তি ব্যবহার করে ইন্টারনাল শ্যাফটের সাহায্যে রোটর ব্লেড ঘোরানো হয়। | প্রধানত হেলিকপ্টার এবং কিছু যুদ্ধজাহাজ/ট্যাংক। |
| র্যামজেট (Ramjet) | কোনো চলন্ত পার্টস নেই; উচ্চগতিতে বাতাস ভেতরে এসে সংকুচিত হয়। | মিসাইল ও সুপারসনিক ড্রোন। |
| স্ক্যামজেট (Scramjet) | শব্দের চেয়ে ৫-১০ গুণ বেশি গতিতে সুপারসনিক কমবাশ্চন ঘটায়। | হাইপারসনিক মিসাইল ও আধুনিক মহাকাশযান। |
৫. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে (BAF) ব্যবহৃত বিমান ও ইঞ্জিন প্রযুক্তি

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাদের আকাশসীমা প্রতিরক্ষা, পরিবহন এবং অনুসন্ধান মিশন পরিচালনা করতে ৪ ধরণের আধুনিক ইঞ্জিন ব্যবহার করে থাকে:
┌─────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ফ্লিট ও ইঞ্জিন │
├──────────────────┬─────────────────────────────┬────────────────────────┤
│ ইঞ্জিনের ধরন │ বিমানের নাম │ উৎস দেশ │
├──────────────────┼─────────────────────────────┼────────────────────────┤
│ ১. টার্বোজেট │ চেংডু এফ-৭ (Chengdu F-7) │ চীন │
│ ২. টার্বোফ্যান │ মিগ-২৯ (MiG-29B/UB) │ রাশিয়া │
│ │ ইয়াক-১ ৩০ (Yak-130) │ রাশিয়া │
│ │ কে-৮ডব্লিউ (K-8W Trainer) │ চীন / পাকিস্তান │
│ ৩. টার্বোপ্রপ │ সি-১৩০জে (C-130J Hercules) │ আমেরিকা │
│ │ অ্যান্টনভ অ্যান-৩২ (An-32) │ রাশিয়া │
│ ৪. টার্বোশ্যাফট │ এমআই-১৭/১৭১ (MiG Mi-171SH) │ রাশিয়া │
│ │ বেল-২১২ (Bell 212) │ আমেরিকা │
│ │ এডব্লিউ-১৩৯ (AW139) │ ইতালি │
└──────────────────┴─────────────────────────────┴────────────────────────┘
বিশেষ সংযোজন: প্রযুক্তিগত স্বাবলম্বিতা অর্জনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নিজস্ব ইউনিটে UAV বা ড্রোন অ্যাসেম্বলি এবং ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে।
৬. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও ফোর্সেস গোল (Forces Goal)
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আকাশ সুরক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো এর মাল্টিরোল ফাইটার ও ইন্টারসেপ্টর ফ্লিট:
- মিগ-২৯বিএম (MiG-29BM): এটি রাশিয়ার তৈরি চতুর্থ প্রজন্মের অত্যন্ত চটপটে একটি মাল্টিরোল ফাইটার জেট। বর্তমানে বেলারুশের আধুনিকীকরণের পর এর সার্ভিস লাইফ ও রাডার ক্যাাপাবিলিটি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- এফ-৭ বিজিআই (F-7BGI): এটি চীনে নির্মিত একটি অল-ওয়েদারInterceptor ফাইটার। এর আধুনিক এভিওনিক্স, গ্লাস ককপিট এবং গাইডেড ওয়েপন ক্যাাপাবিলিটি পয়েন্ট ডিফেন্সের জন্য বেশ উপযোগী।
- ভবিষ্যৎ আধুনিকীকরণ: বিমানবাহিনী আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের (4.5 Generation) ফাইটার জেট যুক্ত করার প্রক্রিয়া বহুদূর এগিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে চীনের Chengdu J-10CE এবং ইউরোপের Eurofighter Typhoon ক্রয়ের আলোচনা ও প্রাথমিক প্রক্রিয়া অগ্রগতির তালিকায় রয়েছে।
৭. বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান মিসাইল ও মারণাস্ত্র
আকাশপথে শত্রু ধ্বংস এবং বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে BAF-এর যুদ্ধবিমানগুলোতে বেশ কিছু লেটেস্ট মিসাইল ও বোমা যুক্ত রয়েছে:
ক) আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মিসাইল (Air-to-Air Missiles)
- R-77 (RVV-AE): বিয়ন্ড-ভিজুয়াল-রেঞ্জ (BVR) রাডার-গাইডেড মিসাইল, যা ৮০-১০০ কিমি দূরের শত্রুর বিমান ধ্বংস করতে পারে (মিগ-২৯বিএম)।
- R-73E: বিশ্বখ্যাত শর্ট-রেঞ্জ হিট-সিকিং (Heat-seeking) মিসাইল, যা মুখোমুখি ডগফাইটে শত্রুর ইঞ্জিনের উত্তাপ ট্র্যাক করে আঘাত হানে।
- PL-5E II / PL-9C: চীনের তৈরি আধুনিক ইনফ্রারেড গাইডেড শর্ট-রেঞ্জ মিসাইল (এফ-৭বিজিআই)।
খ) আকাশ থেকে ভূমিতে ও সমুদ্রে আক্রমণের অস্ত্র (Air-to-Surface)
- Kh-31A: রাশিয়ার তৈরি মারাত্মক দ্রুতগতির সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইল। সমুদ্রসীমার প্রতিরক্ষায় এটি মিগ-২৯ এর একটি অন্যতম গেম-চেঞ্জার অস্ত্র।
- KAB-500KR: লেজার ও টিভি-গাইডেড স্মার্ট পিন-পয়েন্ট প্রিসিশন বোমা।
- LS-6 (500lb): জিপিএস এবং স্যাটেলাইট গাইডেড গ্লাইড বোমা, যা দূর থেকেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে সক্ষম (এফ-৭বিজিআই)।
সারসংক্ষেপ
রাইট ব্রাদার্সের মাত্র ১২ সেকেন্ডের ঐতিহাসিক যাত্রা থেকে শুরু করে আজকের সুপারসনিক ও হাইপারসনিক যুগ—এভিয়েশন সায়েন্স আধুনিক প্রতিরক্ষার মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীও তাদের আধুনিক ফ্লিট, ৪.৫ জেনারেশনের ফাইটার জেট সংযোগ এবং স্যাটেলাইট গাইডেড অস্ত্রের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আধুনিক ও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।



