অর্থনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
আন্তর্জাতিক ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি ডেস্ক: পৃথিবীর বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ এশিয়া। আয়তন, জনসংখ্যা, প্রাচীন সভ্যতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক আধিপত্য—সব দিক থেকেই এশিয়া বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র। সাধারণ জ্ঞান অনুরাগী, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের সুবিধার্থে এশিয়া মহাদেশের ৪৯টি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানীগুলোর প্রশাসনিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হলো।
এশিয়া মহাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা. Source: PeterHermesFurian / Getty Images
১. দক্ষিণ এশিয়া (South Asia)
১. বাংলাদেশ — রাজধানী: ঢাকা
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রায় চারশত বছর পূর্বে ১৬০৮ সালে মোগল সুবাদার ইসলাম খান প্রথম ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। মোগল আমল থেকে আজ অব্দি এটি তৈরি পোশাক শিল্প, বাণিজ্য এবং সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
২. ভারত — রাজধানী: নতুন দিল্লি
১৯১১ সালে ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তর করে নতুন দিল্লির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এটি ভারতের বিচারবিভাগ, শাসনবিভাগ এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। ঐতিহাসিক প্রাচীন দিল্লি এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর নতুন দিল্লি মিলে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোপলিটন এলাকা।
৩. পাকিস্তান — রাজধানী: ইসলামাবাদ
১৯৬০-এর দশকে একটি সুপরিকল্পিত শহর হিসেবে ইসলামাবাদকে পাকিস্তানের নতুন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হয়; এর পূর্বে করাচি ও রাওয়ালপিন্ডি সাময়িক রাজধানী ছিল। মারগাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই শহরটি পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক হেডকোয়ার্টার।
৪. আফগানিস্তান — রাজধানী: কাবুল
হিন্দুখুশ পর্বতমালার সংকীর্ণ উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৮০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত কাবুল দেশটির বৃহত্তম শহর। প্রাচীন রেশম পথের ওপর অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শহরটি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বে়ও আফগান রাজনীতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র।
৫. নেপাল — রাজধানী: কাঠমান্ডু
হিমালয়ের কোলে অবস্থিত কাঠমান্ডু নেপালের ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক হাব। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সমৃদ্ধ এই শহরটি কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এবং বিশ্বজুড়ে এভারেস্টগামী পর্বত আরোহীদের প্রধান প্রবেশদ্বার।
৬. ভুটান — রাজধানী: থিম্পু
হিমালয়ের পশ্চিমাঞ্চলের পর্বতে অবস্থিত থিম্পু বিশ্বের একমাত্র ট্রাফিক লাইট-বিহীন রাজধানী শহর। ঐতিহ্যবাহী ভুটানি স্থাপত্যশৈলী এবং তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতির স্পর্শে লালিত এই শহরটি ভুটানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রধান কার্যালয়।
৭. শ্রীলঙ্কা — রাজধানী: শ্রী জয়বর্ধনেপুরা কোট্টে (প্রশাসনিক) / কলম্বো (বাণিজ্যিক)
কলম্বোর একটি উপশহর কোট্টে শ্রীলঙ্কার মূল প্রশাসনিক ও আইনসভা রাজধানী, যেখানে দেশটির জাতীয় সংসদ অবস্থিত। তবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যাবলীর মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে এখনও কলম্বো শহরই কাজ করে।
৮. মালদ্বীপ — রাজধানী: মালে
ভারত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীর বা অ্যাটলে অবস্থিত মালে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ শহর। মালদ্বীপের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সাথে দেশটির আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের প্রবেশদ্বার হিসেবে মালে কাজ করে।
২. পূর্ব এশিয়া (East Asia)
৯. চীন — রাজধানী: বেইজিং
তিন হাজার বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাসের শহর বেইজিং বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। মহাপ্রাচীর (Great Wall) ও নিষিদ্ধ নগরী (Forbidden City)-র মতো ঐতিহাসিক ঐতিহ্যে ঘেরা এই শহরটি চীনের কমিউনিস্ট সরকার ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল হাব।
১০. জাপান — রাজধানী: টোকিও
টোকিও বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে অন্যতম শীর্ষ শহর। পূর্বের ছোট মাছ ধরার গ্রাম ‘এদো’ ১৮৬৮ সালে জাপানের রাজধানী হিসেবে পুনর্নামকরণ লাভ করে টোকিও নাম ধারণ করে। এটি উচ্চপ্রযুক্তি, ফ্যাশন ও আধুনিক শিল্পের আন্তর্জাতিক হাব।
১১. উত্তর কোরিয়া — রাজধানী: পিয়ংইয়ং
কোরীয় উপদ্বীপের অন্যতম প্রাচীন শহর পিয়ংইয়ং উত্তর কোরিয়ার একক রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক অবকাঠামো ও সামরিক প্রদর্শনী কেন্দ্র। তায়েদং নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।
১২. দক্ষিণ কোরিয়া — রাজধানী: সিউল
হান নদীর তীরে অবস্থিত সিউল দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক বিশ্বমানের শহর, যা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কে-পপ সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি লাভ করেছে। ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ এবং আকাশচুম্বী অট্টালিকার অপূর্ব মিশ্রণ এই সিউল।
১৩. মঙ্গোলিয়া — রাজধানী: উলানবাটোর
তুউল নদী উপত্যকায় অবস্থিত উলানবাটোর মঙ্গোলিয়ার বৃহত্তম শহর এবং বিশ্বের সবচেয়ে শীতলতম রাজধানী। যাযাবর মোঙ্গল ঐতিহ্য ও আধুনিক নগরজীবনের এক মেলবন্ধন ঘটেছে এই ঐতিহাসিক শহরে।
১৪. তাইওয়ান — রাজধানী: তাইপে
তাইওয়ানের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত তাইপে বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৈশ্বিক কেন্দ্র। ‘তাইপে ১০১’ স্কাইস্ক্র্যাপারের জন্য বিখ্যাত এই শহরটি পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাব।
৩. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (Southeast Asia)
১৫. ভিয়েতনাম — রাজধানী: হ্যানয়
রেড রিভারের তীরে অবস্থিত হ্যানয় হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সমৃদ্ধ ইতিহাসের শহর। ফরাসি স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহ্যবাহী চীনা প্রভাব এবং আধুনিক ভিয়েতনামী অর্থনীতির মেলবন্ধনে তৈরি এই শহরটি ভিয়েতনামের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান বিন্দু।
১৬. থাইল্যান্ড — রাজধানী: ব্যাংকক
স্থানীয়ভাবে ‘ক্রুং থেক’ নামে পরিচিত ব্যাংকক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য, অর্থনীতি ও পর্যটনকেন্দ্র। চাও ফ্রায়া নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি বৌদ্ধ মন্দির, আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র এবং বর্ণিল নাইটলাইফের জন্য বিখ্যাত।
১৭. মিয়ানমার — রাজধানী: নেপিডো
২০০৫ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার সুপরিকল্পিতভাবে ইয়াঙ্গুন থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে নেপিডো শহরে রাজধানী স্থানান্তর করে। সুবিশাল রাজপথ, সামরিক কমপ্লেক্স এবং প্রশাসনিক ভবনে ঘেরা এই শহরটি অত্যন্ত সুসংগঠিত।
১৮. ইন্দোনেশিয়া — রাজধানী: নুসানতারা (নতুন পরিকল্পিত) / জাকার্তা (সাবেক)
দীর্ঘদিন ধরে জাভা দ্বীপের জাকার্তা ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও ভূ-প্রাকৃতিক ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত ঘনবসতির কারণে দেশটির সরকার বোর্নিও দ্বীপে ‘নুসানতারা’ নামে একটি আধুনিক সুপরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব রাজধানী গড়ে তোলার কার্যক্রম সম্পন্ন করছে।
১৯. মালয়েশিয়া — রাজধানী: কুয়ালালামপুর (প্রশাসনিক সেন্টার: পুত্রজায়া)
পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের শহর কুয়ালালামপুর মালয়েশিয়ার রাজকীয়, বাণিজ্যিক ও আর্থিক রাজধানী। তবে শহরটির ক্রমবর্ধমান যানজট কমাতে নব্বইয়ের দশকে নিকটবর্তী পুত্রজায়াতে সরকারের প্রশাসনিক ভবন ও দপ্তরগুলো স্থানান্তরিত করা হয়।
২০. সিঙ্গাপুর — রাজধানী: সিঙ্গাপুর সিটি
দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের মূল রাজধানী এর একমাত্র প্রধান শহর সিঙ্গাপুর সিটি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর, প্রধান আর্থিক লেনদেন কেন্দ্র এবং উচ্চমানের জীবনযাত্রার সূচকের শহর হিসেবে এটি স্বীকৃত।
২১. ফিলিপাইন — রাজধানী: ম্যানিলা
ম্যানিলা উপসাগরের তীরে অবস্থিত ম্যানিলা ফিলিপাইনের রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। ফরাসি ও স্পেনীয় উপনিবেশিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই শহরটি অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক বন্দর।
২২. কম্বোডিয়া — রাজধানী: নমপেন
মেকং, বাসাক ও টনলে সাপ নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত নমপেন শহরটি ‘এশিয়ার মুক্তা’ নামে পরিচিত ছিল। খমের স্থাপত্যশৈলী ও ফরাসি উপনিবেশের সুবাতাস লেগে থাকা এই শহরটি কম্বোডিয়ার রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাণকেন্দ্র।
২৩. লাওস — রাজধানী: ভিয়েনতিয়েন
মেকং নদীর তীরে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে অবস্থিত ভিয়েনতিয়েন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে শান্ত পরিবেশের একটি রাজধানী। ফরাসি উপনিবেশের প্রভাব ও বৌদ্ধ ধর্মীয় মনুমেন্ট দিয়ে সাজানো এই শহরটি দেশটির প্রশাসন পরিচালনা করে।
২৪. ব্রুনাই — রাজধানী: বন্দর সেড়ি বেগাওয়ান
ব্রুনাই নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি খনিজ তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ সম্পদশালী রাষ্ট্র ব্রুনাইয়ের সুলতানের রাজকীয় কেন্দ্র। বর্ণিল মসজিদ ও জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ সংবলিত এই শহরটি শান্ত জীবনযাত্রার জন্য খ্যাত।
২৫. পূর্ব তিমুর — রাজধানী: দিলি
তিমুর সাগরের উপকূলে स्थित দিলি ২০০২ সালে স্বাধীন হওয়া নতুন রাষ্ট্র পূর্ব তিমুরের প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। পর্তুগিজ উপনিবেশিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সংমিশ্রণ ঘটেছে এই উপকূলীয় শহরে।
৪. পশ্চিম এশিয়া / মধ্যপ্রাচ্য (West Asia / Middle East)
২৬. সৌদি আরব — রাজধানী: রিয়াদ
আরব উপদ্বীপের মালভূমি মরুভূমিতে অবস্থিত রিয়াদ আজ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও অবকাঠামোগত শহর। সৌদি আরবের রাজনৈতিক কার্যালয়, রাজপ্রাসাদ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থিক কর্পোরেশনের মূল কেন্দ্র এই শহর।
২৭. সংযুক্ত আরব আমিরাত — রাজধানী: আবুধাবি
পারস্য উপসাগরের একটি দ্বীপে অবস্থিত আবুধাবি আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, ব্যবসা এবং জ্বালানি তেলের ব্যবসার মূল কেন্দ্র। দুবাই পর্যটনের জন্য খ্যাত হলেও আমিরাতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আবুধাবি থেকেই গৃহীত হয়।
২৮. কাতার — রাজধানী: দোহা
পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত দোহা বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক শহর। প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসায় সমৃদ্ধ কাতার আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা (যেমন ২০২২ বিশ্বকাপ) এবং চ্যানেল আল জাজিরার হেডকোয়ার্টার হিসেবে দোহাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২৯. কুয়েত — রাজধানী: কুয়েত সিটি
পারস্য উপসাগরের শীর্ষ শহর কুয়েত সিটি দেশটির খনিজ তেলনির্ভর অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রধান কার্যালয়। এখানকার কুয়েত টাওয়ার্স এবং বিশাল ব্যাংক অবকাঠামো দেশটির বাণিজ্যিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
৩০. বাহরাইন — রাজধানী: মানামা
পারস্য উপসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনের মানামা মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র। ইসলামপূর্ব আমল থেকেই কৌশলগত সমুদ্রপথের অংশ হিসেবে এটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
৩১. ওমান — রাজধানী: মাস্কাট
ওমান উপসাগর এবং পাথুরে আল হাজার পর্বতমালার মাঝে অবস্থিত মাস্কাট এক ঐতিহাসিক বন্দর নগরী। অন্যান্য আরব শহরের মতো অতিরিক্ত উঁচুদালান না বানিয়ে ঐতিহ্যবাহী আরব স্থাপত্যকলাকে ধরে রেখে শহরটিকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
৩২. ইয়েমেন — রাজধানী: সানা
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত সানা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন ধারাবাহিক জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর অন্যতম। এর অনন্য স্থাপত্যশৈলীর মাল্টি-স্টোরি কাদামাটির ভবনগুলোর জন্য শহরটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত।
৩৩. ইরান — রাজধানী: তেহরান
আলবোর্জ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত তেহরান ইরানের অর্থনৈতিক, শিল্প ও রাজনৈতিক হাব। পারস্য ঐতিহ্যের শহর এটি, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি এবং শতবর্ষী সংস্কৃতির এক অনন্য সহাবস্থান দেখা যায়।
৩৪. ইরাক — রাজধানী: বাগদাদ
টাইগ্রিস নদীর তীরে অবস্থিত বাগদাদ ইসলামিক স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)-এর সময় বিশ্বের সবচেয়ে প্রধান জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পার করে শহরটি বর্তমানে তার প্রাচীন ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
৩৫. সিরিয়া — রাজধানী: দামেস্ক
বিশ্বের প্রাচীনতম অবিচ্ছিন্ন জনবসতিপূর্ণ শহর দামেস্ক। প্রাচ্যের প্রাচীন রেশম পথ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে রয়েছে।
৩৬. লেবানন — রাজধানী: বৈরুত
ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বৈরুত দীর্ঘদিন ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’ নামে খ্যাত ছিল। ফরাসি সাংস্কৃতিক প্রভাব, ব্যাংকিং খাত এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য শহরটির বৈশ্বিক খ্যাতি রয়েছে।
৩৭. জর্ডান — রাজধানী: আম্মান
সাতটি পাহাড়ের ওপর মূল ভিত্তি গড়ে ওঠা আম্মান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। এটি জর্ডানের রাজনৈতিক হাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের একটি নিরাপদ ও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র।
৩৮. ইসরায়েল — রাজধানী: জেরুজালেম
জেরুজালেম বিশ্বের তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্ম—ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মের পবিত্রতম স্থান। তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও এটি দেশটির প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
৩৯. তুরস্ক — রাজধানী: আঙ্কারা
১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক ঐতিহ্যবাহী ইস্তাম্বুল থেকে রাজধানী সরিয়ে মধ্য এনাতোলিয়ার আঙ্কারায় রূপান্তর করেন। আঙ্কারা তুরস্কের রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক সিদ্ধান্তের প্রাণকেন্দ্র।
৪০. সাইপ্রাস — রাজধানী: নিকোশিয়া
নিকোশিয়া বিশ্বের একমাত্র বিভক্ত রাজধানী, যা গ্রিক সাইপ্রাস ও তুর্কি সাইপ্রাস—দুই অংশের মাঝে গ্রিন লাইন দিয়ে বিভক্ত। এটি ইউরেশিয়ান দ্বীপটির রাজনীতি ও শিক্ষার কেন্দ্র।
৪১. আর্মেনিয়া — রাজধানী: ইয়েরেভান
হাজার হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ইয়েরেভানকে ‘পিঙ্ক সিটি’ বলা হয়, কারণ এখানকার বেশিরভাগ ভবনের নির্মাণকাজে গোলাপী রঙের আগ্নেয়গিরির পাথর ব্যবহৃত হয়েছে। আরারাত পর্বতের ছায়াতলে এটি আর্মেনিয়ার প্রাণকেন্দ্র।
৪২. আজারবাইজান — রাজধানী: বাকু
কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে অবস্থিত বাকু ‘বাতাসের শহর’ নামে পরিচিত। তেল সমৃদ্ধ অর্থনীতি, ‘ফ্লেম টাওয়ার্স’ এবং প্রাচীন সুরক্ষিত আইচেরি শেহেরের (Inner City) জন্য এটি ককশাস অঞ্চলের প্রধান আন্তর্জাতিক কেন্দ্র।
৪৩. জর্জিয়া — রাজধানী: তিবিলিসি
কুরা (এমটকভারি) নদীর উপত্যকায় অবস্থিত তিবিলিসি ইউরোপ ও এশিয়ার মিলনস্থলে তৈরি এক প্রাচীন ঐতিহাসিক শহর। সালফার বাথ, পাথুরে দুর্গ এবং ইউরেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে এই ভূখণ্ডে।
৫. মধ্য এশিয়া (Central Asia)
৪৪. কাজাখস্তান — রাজধানী: আস্তানা
ইশিম নদীর তীরে অবস্থিত আস্তানা (যা পূর্বে নুর-সুলতান নামেও পরিচিত ছিল) আধুনিক ফিউচারিস্টিক স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বিশাল প্রান্তরে অবস্থিত এই শহরটি সেন্ট্রাল এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্র।
৪৫. উজবেকিস্তান — রাজধানী: তাসখন্দ
ভূমিকম্প ও সোভিয়েত পুনর্নির্মাণের পর তৈরি তাসখন্দ মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর। রেশম পথের সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং সুসংগঠিত মেট্রো ব্যবস্থার জন্য এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৪৬. তাজিকিস্তান — রাজধানী: দুশানবে
তাজিক ভাষার ‘দুশানবে’ শব্দের অর্থ সোমবার। প্রাচীনকালে সোমবারে বসা বড় বাজারের নাম থেকে শহরটির নামকরণ হয়। পামির পর্বতমালার কোলঘেঁষে থাকা এই শহরটি দেশটির প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র।
৪৭. কিরগিজস্তান — রাজধানী: বিশকেক
তিয়েন শান পর্বতমালার ঠিক উত্তর দিকে চুই উপত্যকায় অবস্থিত বিশকেক সোভিয়েত ধাঁচের চওড়া রাস্তা, সুবিশাল পার্ক এবং পর্বত বেষ্টিত এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর।
৪৮. তুর্কমেনিস্তান — রাজধানী: আশগাবাত
কোপেত দাগ পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত আশগাবাত সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি ভবনের ঘনত্বের জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অন্তর্ভুক্ত। প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ এই দেশের রাজধানী শহরটি অত্যাধুনিক ও সংরক্ষিত।
৬. উত্তর এশিয়া (North Asia)
৪৯. রাশিয়া — রাজধানী: মস্কো
ইউরেশীয় পরাশক্তি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ইউরো-এশিয়ান রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু। ক্রেমলিন, রেড স্কয়ার এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সমৃদ্ধ এই শহরটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে কাজ করে
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Economic Content Analyst)
বিভাগ (Category): অর্থনীতি প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ইতিহাস সংকলন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিবেদন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ট্রেডিং ইকোনমিক্স এবং প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ।
ঢাকা: প্রশ্নটা শুনতে সহজ, কিন্তু উত্তরটা লুকিয়ে আছে বিংশ শতাব্দীর কিছু সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। “সরকার তো নিজেই টাকা ছাপায়, তাহলে ইচ্ছেমতো ছাপিয়ে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলে না কেন?”—এই প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই একবার না একবার এসেছে। উত্তর জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের সেইসব অধ্যায়ে, যেখানে ঠিক এই কাজটাই করা হয়েছিল—এবং ফলাফল ছিল ভয়াবহ।
এক টুকরো রুটির জন্য ঠেলাগাড়ি ভর্তি টাকা: জার্মানির ১৯২৩

১৯২৩ সালে জার্মানির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) মানব ইতিহাসের অন্যতম এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যেখানে এক টুকরো রুটি বা সামান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে মানুষকে আক্ষরিক অর্থেই ঠেলাগাড়ি বা স্যুটকেসভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হতো [১]।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির মুদ্রা ‘মার্ক’ (Mark) তার সমস্ত মূল্য হারিয়ে কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়েছিল [১]। এই নির্মম বাস্তবতার পেছনের কারণ এবং এর কিছু অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?
- যুদ্ধের বিশাল ঋণ ও জরিমানা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর ১৯১৯ সালের ‘ভার্সাই চুক্তি’ অনুযায়ী জার্মানির ওপর মিত্রবাহিনী (বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেন) বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ বা জরিমানা চাপিয়ে দেয়।
- নির্বিচারে টাকা ছাপানো: এই বিপুল পরিমাণ জরিমানা শোধ করার মতো কোনো স্বর্ণ বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জার্মানির ছিল না। সংকট কাটাতে জার্মান সরকার কোনো উৎপাদন না বাড়িয়েই দিন-রাত দেদারসে কাগজের মুদ্রা (মার্ক) ছাপাতে শুরু করে [১]।
- মুদ্রার ধস: বাজারে কাগজের নোটের বন্যা বয়ে যাওয়ার কারণে মুদ্রার মান অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কমতে থাকে। ১৯১৪ সালে যেখানে ৪ মার্কে ১ ডলার পাওয়া যেত, ১৯২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে তা দাঁড়ায় ৪.২ ট্রিলিয়ন (৪,২০০,০০০,০০০,০০০) মার্কে ১ ডলার!
২. ১৯২৩ সালের কিছু অবিশ্বাস্য ও নির্মম বাস্তব চিত্র
- ঠেলাগাড়ির ব্যবহার: কাগজের নোটের মান এতই কমে গিয়েছিল যে, একটি পাউরুটি বা এক কেজি আলু কিনতে কোটি কোটি মার্কের প্রয়োজন হতো। পকেটে বা মানিব্যাগে সেই টাকা আস্ত না বলে মানুষ ঠেলাগাড়ি, বড় লন্ড্রি ঝুড়ি বা স্যুটকেস ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেত [১]।
- টাকা গোনার চেয়ে ওজন করা সস্তা: দোকানে কেনাকাটার সময় দোকানিরা টাকা গুনে নেওয়ার সময় পেতেন না। তারা স্কেলে মেপে কিলোগ্রাম বা পাউন্ড হিসেবে টাকা জমা নিতেন।
- কয়লার চেয়ে টাকা পোড়ানো সাশ্রয়ী: শীতকালে ঘর গরম রাখার জন্য কয়লা বা কাঠ কেনার চেয়ে কাগজের নোট পুড়িয়ে আগুন পোহানো অনেক বেশি সস্তা ছিল। গৃহিণীরা ঘরের উনুন ধরাতে বা রান্নার কাজে টাকার বান্ডিল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেন।
- বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী: নোটের কোনো মূল্য না থাকায় অনেক পরিবারে শিশুদের খেলার জন্য ঘুড়ি বানাতে বা ঘর সাজানোর ওয়ালপেপার হিসেবে কোটি কোটি মার্কের নোট দেয়াল তৈরিতে আঠা দিয়ে লাগানো হতো।
- দিনে দুইবার বেতন: মুদ্রাস্ফীতি প্রতি ঘণ্টায় বাড়ত। সকালে যে বেতনের টাকা দিয়ে একটি জুতো কেনা যেত, বিকেলে তা দিয়ে হয়তো একটি ডিমও পাওয়া যেত না। তাই শ্রমিকদের দিনে দুইবার বেতন দেওয়া হতো এবং বেতন পাওয়ার সাথে সাথে তারা কাজ ফেলে বাজারে ছুটতেন, যাতে টাকাটা কাগজের টুকরো হওয়ার আগেই কিছু কিনে ফেলা যায়।
৩. এই সংকট থেকে জার্মানির মুক্তি
১৯২৩ সালের শেষের দিকে জার্মানি তাদের পুরনো কারেন্সি ‘মার্ক’ সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। এরপর ‘রেন্টেনমার্ক’ (Rentenmark) নামে একটি নতুন মুদ্রা চালু করা হয়, যার ভিত্তি ছিল দেশের বন্ধকী জমি ও শিল্পসম্পদ। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে জার্মানির অর্থনীতি স্থিতিশীলতায় ফেরে।
যখন নোটের চেয়ে সস্তা ছিল জ্বালানি কাঠ: হাঙ্গেরি ১৯৪৬

জার্মানির ১৯২৩ সালের অর্থনৈতিক সংকট যদি রূপকথার মতো শোনায়, তবে ১৯৪৬ সালের হাঙ্গেরির ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ (Hyperinflation) ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে চরম ও ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয় জার্মানি বা জিম্বাবুয়ে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দ্রুতগতির এবং ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী হাঙ্গেরিতে
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, হাঙ্গেরির মুদ্রা ‘পেঙ্গো’ (Pengő) তার সমস্ত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল । কাগজের নোটের মান এত নিচে নেমে গিয়েছিল যে, শীতের রাতে ঘর গরম রাখতে জ্বালানি কাঠ বা কয়লা কেনার চেয়ে কাগজের নোটের বান্ডিল পোড়ানো অনেক বেশি সস্তা ও সাশ্রয়ী ছিল
নিচে এই অবিশ্বাস্য ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মূল চিত্রগুলো তুলে ধরা হলো:
১. ইতিহাসের দ্রুততম ও চরম মুদ্রাস্ফীতি
- প্রতি ১৫ ঘণ্টায় দাম দ্বিগুণ: ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে হাঙ্গেরির মাসিক মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৪১.৯ কোয়াড্রিলিয়ন শতাংশ (৪১.৯ এর পর ১৪টি শূন্য) ! এর মানে বাজারে প্রতি ১৫ ঘণ্টায় পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত
- সকালের বেতন বিকেলে পকেটমানি: একজন শ্রমিক সকালে যে বেতন পেতেন, দুপুরের মধ্যে তার ৪০% মান কমে যেত এবং রাতের খাবারের সময় নাগাদ তা স্রেফ পকেটমানিতে পরিণত হতো । মানুষ বেতন পাওয়ার সাথে সাথে বাজারে দৌড়াতেন, কারণ কয়েক ঘণ্টা দেরি করলেই সেই টাকা দিয়ে আর কিছুই কেনা সম্ভব হতো না
২. কাগজের নোটের চেয়ে জ্বালানি কাঠ দামি হওয়ার কারণ
- কাগজের চেয়ে সস্তা টাকা: হাঙ্গেরির মুদ্রা এতটাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল যে, সমপরিমাণ মূল্যের জ্বালানি কাঠ, সাধারণ কয়লা বা এমনকি সাধারণ লেখার সাদা কাগজ কিনতে যে পরিমাণ নোট দিতে হতো, তার চেয়ে সেই নোটগুলো সরাসরি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা অনেক লাভজনক ছিল
- রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার সামগ্রী: সে সময় হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের রাস্তায় সাধারণ মানুষ কোটি কোটি পেঙ্গোর নোট ফেলে দিত। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা থেকে ময়লার মতো টাকার নোটের স্তূপ ডাস্টবিনে ফেলতেন।
- নোটের সাহায্যে আগুন জ্বালানো: ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায় হাঙ্গেরির নারীরা তাঁদের উনুন ধরাতে বা সিগারেটে আগুন ধরাতে ম্যাচের কাঠির বদলে জ্বলন্ত পেঙ্গো নোটের মোড়ক ব্যবহার করছেন
৩. পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট
মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে হাঙ্গেরির কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকার অঙ্কের পেছনে একের পর এক শূন্য বসাতে থাকে তারা প্রথমে ‘মিলপেঙ্গো’ (১০ লাখ পেঙ্গো) এবং পরে ‘বিলপেঙ্গো’ (১ লাখ কোটি পেঙ্গো) চালু করে । হাঙ্গেরিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রচলিত হওয়া সর্বোচ্চ অঙ্কের নোট ছাপিয়েছিল, যার মান ছিল ১০০ কুইন্টিলিয়ন (১০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বা ১০^২০) পেঙ্গো !
৪. কেন হয়েছিল এই বিপর্যয়?
- যুদ্ধের ধ্বংসলীলা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাঙ্গেরির প্রায় ৪০% জাতীয় সম্পদ এবং ৯০% শিল্পকারখানা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়
- সোভিয়েত দখলদারিত্ব ও জরিমানা: যুদ্ধের পর হাঙ্গেরি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং তাদের ওপর বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপানো হয় । এই খরচ মেটাতে কোনো ব্যাক-আপ ছাড়াই হাঙ্গেরির সরকার দিন-রাত নির্বিচারে টাকা ছাপাতে শুরু করে, যা অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়
৫. যেভাবে এলো মুক্তি
১৯৪৬ সালের ১লা আগস্ট হাঙ্গেরি সরকার এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয় । তারা মৃতপ্রায় কারেন্সি ‘পেঙ্গো’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । এর পরিবর্তে ‘ফোরিন্ট’ (Forint) নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন মুদ্রা চালু করা হয় । ১টি নতুন ফোরিন্ট পেতে হাঙ্গেরীয়দের দিতে হয়েছিল ৪০০ অক্ট্রিলিয়ন (৪-এর পিঠে ২৯টি শূন্য) পুরনো পেঙ্গো ! এই মুদ্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে হাঙ্গেরির অর্থনীতিতে আবার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসে ।
একুশ শতকের উদাহরণ: জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলা

ইতিহাসের এই শিক্ষা যে শুধু অতীতের বিষয় নয়, তার প্রমাণ মিলেছে একুশ শতকেও। ২০০০-এর দশকে জিম্বাবুয়ের সরকার সরকারি ব্যয় মেটাতে অবিরাম টাকা ছাপাতে থাকে, যার ফলে দেশটির মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে শেষ পর্যন্ত ১০০ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নোট পর্যন্ত ছাপাতে হয়েছিল—যা বাস্তবে কার্যত মূল্যহীন ছিল। একই ধরনের সংকট দেখা গেছে ভেনেজুয়েলায়, যেখানে তেল রাজস্ব কমে যাওয়ার পর সরকার ঘাটতি পূরণে ব্যাপক হারে মুদ্রা ছাপায়, ফলে দেশের মুদ্রার মূল্য কার্যত ধসে পড়ে এবং লাখো মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়।
অর্থনীতির সহজ নিয়ম: টাকা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, টাকার মূল্য কমে

এই সব ঘটনার পেছনে কাজ করে একটি সহজ কিন্তু কঠোর অর্থনৈতিক নিয়ম। একটি দেশের অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার পরিমাণ যদি স্থির থাকে, কিন্তু টাকার সরবরাহ হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য কেনার জন্য মানুষের হাতে বেশি টাকা চলে আসে। ফলে বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেন, কারণ চাহিদা বেড়ে গেলেও উৎপাদন বাড়েনি। এই প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে থামানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে টাকার মূল্য দ্রুত কমছে, তখন তারা যত দ্রুত সম্ভব টাকা খরচ করে ফেলতে চায়—যা দামকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এভাবেই তৈরি হয় একটি ধ্বংসাত্মক চক্র।
তাহলে সরকার ঋণ নেয় কেন, টাকা ছাপায় না কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে উপরের উদাহরণগুলোর মধ্যে। সরকার যখন আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নেয়, তখন সেই অর্থ বাজারে থাকা বিদ্যমান টাকারই পুনর্বণ্টন হয়—নতুন করে টাকা ছাপানো হয় না, তাই মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে, নতুন টাকা ছাপিয়ে খরচ মেটানো মানে অর্থনীতিতে “বাস্তব উৎপাদন” ছাড়াই টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। এই কারণেই আধুনিক অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বতন্ত্র রাখার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে—যাতে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন না হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সতর্কতার পাঠ
বাংলাদেশ ব্যাংকও একই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিময় হারের চাপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে, যেখানে অর্থনীতিবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন—অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ স্বল্পমেয়াদে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে—ঠিক যেভাবে তা ঘটেছিল জার্মানি, হাঙ্গেরি, জিম্বাবুয়ে ও ভেনেজুয়েলায়।
উপসংহার
ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে—মুদ্রা ছাপানো কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, বরং এটি একটি দ্বিধারী তলোয়ার। সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা সরবরাহ অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু লাগামহীন মুদ্রা সরবরাহ একটি দেশের সমগ্র অর্থব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিতে পারে কয়েক মাসের মধ্যেই। এই কারণেই আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি দায়িত্বশীল সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও নিয়ন্ত্রিত নীতি অনুসরণ করে চলে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)
বিভাগ (Category): রাজনীতি, জাতীয়
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): উইকিপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, বিএসএস, বিবিসি বাংলা এবং সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রতিবেদন।
ঢাকা: ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে শপথ নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান—দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এই শপথগ্রহণ কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল ছিল না; বরং এটি ছিল সতেরো বছরের নির্বাসিত জীবন, শতাধিক মামলা, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের এক নাটকীয় পরিণতি। তারেক রহমানের এই উত্থানকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীরে।
শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন

শিকড়: মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়া পরিবারের রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন অধ্যায়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারের উত্থান, ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার ঐতিহাসিক পটভূমিকে নির্দেশ করে। এই শিকড় মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রোথিত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক যাত্রার মূল ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র এবং স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে, তখন সারা দেশ এক গভীর অনিশ্চয়তা ও নেতৃত্বহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। এই সংকটময় মুহূর্তে ২৬শে মার্চ এবং পরবর্তী ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক কর্মকর্তা, সাধারণ জনতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পূর্ব বাংলার সশস্ত্র প্রতিরোধের এক বৈধ নৈতিক ভিত্তি এনে দেয়। এটি ছিল রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের আত্মপ্রকাশের প্রথম ও প্রধান ঐতিহাসিক শিকড়।
২. সম্মুখসমর ও ‘জেড ফোর্স’ গঠন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ১১ নম্বর সেক্টরের প্রধান হন। জুলাই মাসে তাঁর নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। তাঁর ক্ষুরধার রণকৌশল ও বীরত্বপূর্ণ কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসংখ্য সম্মুখসমরে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধে এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।
৩. নেপথ্যের শক্তি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া
মেজর জিয়া যখন সম্মুখসমরে ব্যস্ত, তখন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুই সন্তানসহ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গৃহবন্দী ও অবরুদ্ধ হন। যুদ্ধ চলাকালে মেজর জিয়ার মনোবল ভাঙতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁর ওপর তীব্র মানসিক চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু কোনো রকম আপস না করে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে পরিবারকে আগলে রাখা এবং তথ্য গোপন রাখার অনমনীয় মনোভাবের কারণে তাঁকে অবদমিত করা সম্ভব হয়নি। এই ত্যাগ ও মানসিক দৃঢ়তা জিয়া পরিবারের সামগ্রিক রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করে।
৪. ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন ও সিপাহি-জনতার বিপ্লব
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে এক চরম অস্থিতিশীলতা ও একের পর এক পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। ৩রা নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। এর চার দিন পর, ৭ই নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে এবং সাধারণ সিপাহি ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ঐতিহাসিক ‘সিপাহি-জনতা বিপ্লব’ সংঘটিত হয়। এই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
৫. রাষ্ট্রক্ষমতায় আগমন এবং রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা
৭ই নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। অবশেষে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটান এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়া পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি স্থায়ী রূপ লাভ করে।
রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায়

রাজনীতিতে উত্থান ও বিতর্কিত অধ্যায় অংশটি জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম, বিশেষ করে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী, ঝোড়ো এবং সমালোচিত সময়কালকে নির্দেশ করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে একদিকে যেমন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে রাজনীতিতে একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়, অন্যদিকে তেমনি দুর্নীতি, সমান্তরাল শাসনকেন্দ্র পরিচালনা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর বিতর্কিত অধ্যায়েরও জন্ম হয়।
এই অধ্যায়ের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. সাংগঠনিক উত্থান ও তৃণমূল রাজনীতি বিকেন্দ্রীকরণ
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয়ের পর তারেক রহমান দলের ভেতরে নিজের অবস্থান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শুরু করেন। ২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি প্রথাগত ড্রয়িংরুম রাজনীতি ভেঙে দেশজুড়ে তৃণমূল প্রতিনিধি সম্মেলনের এক অভিনব কর্মসূচি শুরু করেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নেতাকর্মীদের সরাসরি ঢাকায় এসে শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে তিনি দলের ভেতর এক তরুণ ও অনুগত কর্মী বাহিনী গড়ে তোলেন, যা তাঁকে দলের অলিখিত প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করে।
২. ‘হাওয়া ভবন’ এবং সমান্তরাল শাসনকেন্দ্রের বিতর্ক
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি ছিল ঢাকার বনানীতে অবস্থিত তাঁর রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবন’। অভিযোগ ওঠে যে, তৎকালীন সরকারের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় হলেও, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ, বড় বড় সরকারি টেন্ডার, আমলাদের পদায়ন এবং বদলির সিদ্ধান্তগুলো এই হাওয়া ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রিত হতো। সমালোচক এবং তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি সরকারের ভেতরে এক সমান্তরাল ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার উৎস হিসেবে কাজ করেছিল, যা প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলে।
৩. ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ
এই সময়কালে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যুৎ খাত, তার ও যোগাযোগ খাতসহ বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে খাম্বা লিমিটেডের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিদ্যুতের খুঁটি বসানোর নামে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগটি সে সময় জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও সে সময় হাওয়া ভবন কেন্দ্রিক আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা তথ্য উঠে আসে, যা তাঁর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৪. ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা ও রাষ্ট্রীয় মদদের অভিযোগ
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও বিতর্কিত অধ্যায়টি ঘটে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ ওঠে যে, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের নেপথ্য আশ্রয়দাতা ছিলেন তারেক রহমান এবং হাওয়া ভবনেই এই হামলার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম সহিংসতা ও দুই দলের মধ্যকার স্থায়ী শত্রুতার দেয়াল তুলে দেয়।
৫. ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
২০০১-২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার ফলে বিচার বিভাগ, পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল আমলাতন্ত্রে দলীয়করণের যে নতুন মাত্রা যোগ হয়, তার পেছনে তারেক রহমানের প্রভাব বলয়কে দায়ী করা হয়। যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারিতা ও হাওয়া ভবনের প্রতি আনুগত্যই পদোন্নতির মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ভিন্নমত দমন ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই শাসনামলটি সাধারণ নাগরিক সমাজের কাছে একটি ভয়ের রাজত্ব হিসেবে সমালোচিত হয়, যা পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১/১১-এর জরুরি অবস্থা জারির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল।
দীর্ঘ নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায়

তারেক রহমানের নির্বাসন: রাজনীতি পরিচালনার এক ভিন্ন অধ্যায় শিরোনামটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অধ্যায়কে নির্দেশ করে। ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পর, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) পাড়ি জমান। এরপর থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে বা স্বনির্বাসিত জীবনে থেকেও দূর নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় দল পরিচালনা করে তিনি এক নতুন ধারার রাজনীতি গড়ে তোলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তথা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ নির্বাসনের দিনগুলো এবং রাজনীতি পরিচালনার ভিন্নধর্মী কৌশলগুলোর মূল দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নির্বাসনের পটভূমি ও দলের নেতৃত্ব গ্রহণ
- লন্ডনে অবস্থান (২০০৮-২০২৫): ২০০৮ সালে দেশ ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি লন্ডনে অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও সাজা দেওয়া হয়, যা বিএনপি সবসময় “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করে এসেছে।
- ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব (২০১৮): ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর, তারেক রহমান লন্ডন থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন।
২. ভার্চুয়াল যুগে দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি (Remote Politics)
- প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার: সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ভিডিও কনফারেন্স, জুম মিটিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
- দলীয় শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠন: নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেই তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, নতুন কমিটি গঠন এবং দেশব্যাপী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের দিকনির্দেশনা প্রবাস থেকেই নিখুঁতভাবে পরিচালনা করেন।
৩. আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক তৎপরতা
- কূটনৈতিক যোগাযোগ: লন্ডনে অবস্থানকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বার, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- নতুন রাজনৈতিক বার্তা: প্রবাসে থাকাকালীন সময়ে তিনি বিএনপির ভাবমূর্তি উন্নয়নে কাজ করেন এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে “রাষ্ট্র সংস্কার” ও “জনগণের অধিকারের” ওপর জোর দেন।
৪. ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
- স্বদেশ প্রত্যাবর্তন (ডিসেম্বর ২০২৫): ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বাতিল বা প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২৫শে ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
- ২০২৬-এর নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রিত্ব: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। দীর্ঘ নির্বাসন এবং বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতার পথে

তারেক রহমানের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন, দলীয় নেতৃত্বের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতা আরোহণের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস বা নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি কেবল দেশে ফিরে আসেননি, বরং অত্যন্ত সফলভাবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন এবং নিজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
তারেক রহমানের নির্বাসন থেকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রাপথকে মূলত নিচের ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. নির্বাসন থেকে ভার্চুয়াল রাজনীতি ও দলীয় পুনর্গঠন
- ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব: ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) যাওয়ার পর থেকে তিনি প্রবাসে ছিলেন। ২০১৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হলে তিনি দলের ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে মূল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন।
- দূর নিয়ন্ত্রিত বা ভার্চুয়াল রাজনীতি (Remote Politics): আট হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও তিনি প্রযুক্তির (জুম, ভিডিও কনফারেন্স) সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সাথে সরাসরি যুক্ত হন। এই দীর্ঘ সময়ে দলের ভাঙন রোধ করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা কঠোরভাবে বজায় রাখা তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসে থেকেই তিনি আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নিশ্চিত করতে তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন
২. রাজসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও দলের পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণ
- ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন (২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫): ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উচ্চ আদালত কর্তৃক বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর, ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর তারেক রহমান তাঁর পরিবারসহ বীরের বেশে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ঢাকার বিমানবন্দরসহ পুরো রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের ঢল তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে এক রাজসিক রূপ দেয়।
- চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ (৯ জানুয়ারি, ২০২৬): প্রবাসে থাকার সময় তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকলেও, মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ২০২৬ সালের ৯ই জানুয়ারি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলটির পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে।
৩. ২০২৬ সালের নির্বাচন ও অভূতপূর্ব বিজয়
- নির্বাচনী প্রচারণা ও ‘৩১ দফা রূপরেখা’: দেশে ফেরার পরপরই তারেক রহমান নির্বাচনের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন। তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য তাঁর দলের বিখ্যাত ‘৩১ দফা রূপরেখা’ এবং ‘We Have a Plan’ স্লোগানের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম (Gen-Z) ও সাধারণ মানুষের কাছে একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির বার্তা পৌঁছে দেন।
- ভূমিধস বিজয়: ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ দুটি আসন থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন (পরবর্তীতে তিনি বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দেন)। তাঁর জাদুকরী নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে।
৪. প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
- প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬): নির্বাচন জয়ের পর ২০২৬ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে চলা দুই নারী নেত্রীর (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) পালাক্রমিক শাসনের অবসান ঘটে এবং এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হয়।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও প্রধানমন্ত্রীর আসনে আরোহণ

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়, এবং পরের দিন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে ১৩তম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণেও তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদের শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নির্বাচনের ফলাফলের পাঁচ দিন পর, ১৭ ফেব্রুয়ারি, তিনি বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান, এবং তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার আরও ৩০ জন সদস্যও শপথ নেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই শপথ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের অভ্যন্তরে নয়, বরং জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জনগণের সামনে উন্মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়—যা প্রতীকীভাবে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দেয় বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সরকার

শপথ গ্রহণের পর তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা—বাংলাদেশের ২৪তম মন্ত্রিসভা—দ্রুত দপ্তর বণ্টন সম্পন্ন করে কার্যক্রম শুরু করে, যেখানে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পান। ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে কোনো পুরুষ ব্যক্তি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
বিশ্লেষণ: এক পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন
তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন, ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ কেবলই কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য “পারিবারিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা” বা বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের এক ধ্রুপদী প্রতিফলন।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক ধারাটি দুটি প্রধান পরিবারের সমান্তরাল উত্তরাধিকারের ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়েছে। তারেক রহমানের বর্তমান অবস্থানকে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার আলোকেই নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনের উত্তরাধিকার
- দলীয় ভিত্তি ও জাতীয়তাবাদ: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। তাঁর রাজনীতিতে আগমন এবং ক্ষমতা আরোহণের মূল চালিকাশক্তি ছিল তাঁর বাবার তৈরি করা “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর আদর্শ ও এর বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী।
- তৃণমূল সংযোগের অনুকরণ: শহীদ জিয়া যেভাবে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তৃণমূলের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন, তারেক রহমানও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে (বিশেষ করে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে) দেশব্যাপী “তৃণমূল সম্মেলন” এবং বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাবার সেই রাজনীতির মডেল পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।
২. খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রামের উত্তরাধিকার
- সংকটকালে দলের হাল ধরা: ঠিক যেভাবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এক চরম সংকটময় মুহূর্তে বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসে দলের ভাঙন রোধ করেছিলেন, একইভাবে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবরণের পর প্রবাসে থাকা অবস্থাতেই তারেক রহমান বিএনপির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে দলের হাল ধরেন।
- প্রতীকী নেতৃত্ব ও আবেগীয় সংযোগ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জিয়া পরিবার” সমর্থকদের কাছে এক বিশাল আবেগের নাম। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতা ও প্রয়াণের পর তারেক রহমানের মধ্যে সমর্থকেরা সেই একই আপসহীন ও অবিচল নেতৃত্বের ছায়া খুঁজে পেয়েছে, যা দলটিকে কঠিন পরিস্থিতিতেও ঐক্যবদ্ধ রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৩. ধারাবাহিকতার সমান্তরালে আধুনিকায়ন (Evolution)
পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখলেও তারেক রহমানের রাজনীতি পরিচালনার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক ও ভিন্নধর্মী:
- ভার্চুয়াল ও দূর নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি: প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর সুদূর লন্ডন থেকে আধুনিক প্রযুক্তির (জুম, স্কাইপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) সাহায্যে দল পরিচালনা করেছেন—যা পারিবারিক ধারাবাহিকতার ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা।
- তরুণ প্রজন্মের সাথে সংযোগ: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি প্রথাগত প্রতিহিংসার রাজনীতির বাইরে এসে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’ এবং নতুন ভিশনের কথা বলে নতুন প্রজন্মের (Gen-Z) আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন।
৪. দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির সাধারণ সমীকরণ
- নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও উত্তরাধিকার: নেহেরু-গান্ধী পরিবার (ভারত), ভুট্টো পরিবার (পাকিস্তান) কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের (বাংলাদেশ) মতোই তারেক রহমানের এই ক্ষমতায় আরোহণ প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের একতাবদ্ধ রাখার জন্য একটি সুপরিচিত “পারিবারিক মুখ বা প্রতীক” এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার:
তারেক রহমানের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো মূলত শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক আদর্শ, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি এবং তারেক রহমানের নিজস্ব আধুনিক কৌশলগত দূরদর্শিতার এক ত্রিমাত্রিক সমন্বয়। এটি প্রমাণ করে যে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনীতির কৌশল বদলালেও, পারিবারিক লিগ্যাসি বা ধারাবাহিকতা এখনও বাংলাদেশের ক্ষমতার পট পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মেরুদণ্ড।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant & Political Analyst)
বিভাগ (Category): রাজনীতি, ইতিহাস ও সমাজভাবনা
প্রকাশের তারিখ: ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সংক্রান্ত প্রামাণ্য দলিল, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও বাংলা ট্রিবিউনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কলাম, উইকিপিডিয়া ঐতিহাসিক তথ্যসংকলন এবং লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ।
ঢাকা: রাজনীতি যেখানে জনকল্যাণের হাতিয়ার হওয়ার কথা, সেখানে একটি জাতির ইতিহাসে বারবার দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র—ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ধরনের আনুগত্য-সংস্কৃতি, যেখানে ব্যক্তি নিজের বিবেক, যুক্তি ও মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে কোনো দল, নেতা বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শন করে। এই প্রবণতাকেই সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় “রাজনৈতিক দাসত্ববোধ”। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই প্রবণতা কখনো কমেনি, বরং সময়ে সময়ে রূপ বদলে আরও গভীরভাবে সমাজের রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে।
রাজনৈতিক দাসত্ববোধ আসলে কী?

রাজনৈতিক দাসত্ববোধ (Political Subservience or Political Servitude) বলতে এমন একটি মানসিক বা আদর্শিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে কোনো একটি জনগোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি অন্য কোনো প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠী, শক্তি বা ব্যবস্থার অন্যায্য সিদ্ধান্ত ও শোষণকে মুখ বুজে মেনে নেয় এবং নিজেদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি বা অধিকার সচেতনতা হারিয়ে ফেলে।
সহজ কথায়, এটি হলো নিজের রাজনৈতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্ব অন্যের হাতে সমর্পণ করে দিয়ে অধীনস্থ বা পরাধীন হয়ে থাকার মানসিকতা।
১৯৫০-১৯৭১ সালের পাকিস্তান আমলের প্রেক্ষাপটে এই রাজনৈতিক দাসত্ববোধ এবং তা থেকে মুক্তির বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এই ধারণাটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
রাজনৈতিক দাসত্ববোধের মূল রূপসমূহ:
- অধীনতা স্বীকার করা: শাসকগোষ্ঠী যত শোষণ বা বৈষম্যই করুক না কেন, সেটিকে ‘ভাগ্য’ বা ‘নিয়তি’ হিসেবে মেনে নেওয়া এবং প্রতিবাদ না করা।
- অধিকার সচেতনতার অভাব: নিজের যে একটি স্বাধীন সত্তা আছে, রাষ্ট্রে সমান অধিকার পাওয়ার কথা আছে—সেটি ভুলে গিয়ে শাসকের অনুগত থাকা।
- পুতুল সরকার ও দালাল রাজনীতি: জনগণের অধিকার আদায়ের চেয়ে স্বৈরাচারী বা ঔপনিবেশিক শাসকদের তোষামোদি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করা (যেমন: পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু দল বা নেতা পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষা করত)।
- সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য মেনে নেওয়া: শাসকের চাপিয়ে দেওয়া ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক শোষণকে নীরবে মেনে নেওয়া।
পাকিস্তান আমলে বাঙালির ‘দাসত্ববোধ’ থেকে ‘জাগরণ’:
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর প্রথম কয়েক বছর পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে এক ধরণের রাজনৈতিক মোহ বা দাসত্ববোধ কাজ করছিল যে, “আমরা সবাই মুসলমান, পাকিস্তান আমাদের নিজেদের দেশ”। কিন্তু খুব দ্রুতই বাঙালি বুঝতে পারে যে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও, তারা আসলে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাসত্বে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েছে।
এই দাসত্ববোধ ভাঙার পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিল:
- ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): এটি ছিল প্রথম আঘাত, যা বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দাসত্ববোধকে গুঁড়িয়ে দেয় এবং অধিকার সচেতন করে তোলে।
- বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ছয় দফা (১৯৬৬): ছয় দফার মাধ্যমে বাঙালি স্পষ্ট করে দেয় যে তারা আর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাস হয়ে থাকবে না, বরং নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ধারণ করবে।
১৯৫০-৭১: পাকিস্তান আমল—দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রথম জাগরণ

১৯৫০-৭১: পাকিস্তান আমল—দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রথম জাগরণ অধ্যায়টি মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণের অধিকার আদায় এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের এক গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়ন শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ধাপে ধাপে ঐক্যবদ্ধ হয়, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
নিচে এই সময়ের মূল ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ ও জাগরণের ধাপগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণের সূচনা
- ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি প্রথম তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তদান বাঙালির মধ্যে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে।
- যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (১৯৫৪): মুসলিম লীগকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ইশতেহারের মাধ্যমে বাঙালিরা তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো করে।
২. অধিকার আদায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
- সামরিক শাসন (১৯৫৮): আইয়ুব খানের সামরিক জান্তা বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, যার ফলে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়।
- শিক্ষা আন্দোলন (১৯৬২): শরীফ শিক্ষা কমিশনের গণবিরোধী ও বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে।
- ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬): বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির বাঁচার দাবি হিসেবে ‘ছয় দফা’ পেশ করেন। একে বাঙালির “ম্যাগনা কার্টা” বা মুক্তির সনদ বলা হয়।
৩. গণঅভ্যুত্থান থেকে স্বাধীনতা
- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮): বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হলে পুরো পূর্ব পাকিস্তান বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
- ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯): তীব্র গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান।
- ১৯৭০ সালের নির্বাচন: আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের স্পষ্ট ম্যান্ডেট।
- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ: পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানিয়ে ২৫শে মার্চ কালরাত্রে গণহত্যা শুরু করলে, ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
১৯৭২-৭৫: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ও একদলীয় শাসনের প্রলোভন

১৯৭২-৭৫: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ও একদলীয় শাসনের প্রলোভন অধ্যায়টি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জটিল, সংবেদনশীল এবং রূপান্তরকারী একটি সময়কাল। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এই সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং সবশেষে বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে একদলীয় শাসনব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটে।
নিচে এই সময়কালের মূল ঘটনাপ্রবাহ, সংকট এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও প্রাথমিক সাফল্য (১৯৭২-১৯৭৩)
- সংবিধান প্রণয়ন (১৯Nz২): স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যা ছিল এক বিশাল অর্জন।
- শরণার্থী পুনর্বাসন: ভারত থেকে ১ কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো মেরামতের কাজ শুরু হয়।
- আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: অতি দ্রুততম সময়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি লাভ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ।
২. ক্রমবর্ধমান সংকট ও অস্থিরতা (১৯৭৩-১৯৭৪)
- অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষ: বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পাটের বাজারে ধস এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ফলে দেশে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
- আইনশৃঙ্খলার অবনতি: যুদ্ধের পর সবার হাত থেকে অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিরোধের কারণে দেশজুড়ে গুপ্তহত্যা, ডাকাতি ও চোরাচালান বৃদ্ধি পায়।
- রাজনৈতিক বিরোধ: জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এবং চরমপন্থী দলগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।
৩. একদলীয় শাসন বা ‘বাকশাল’ গঠন (১৯৭৫)
- চতুর্থ সংশোধনী: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
- বাকশাল (BAKSAL) গঠন: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালের আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামে একটিমাত্র জাতীয় দল গঠন করা হয়।
- সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ: চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পত্রিকা বাদে বাকি সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়।
- শাসনের যুক্তি ও প্রলোভন: তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে—দেশকে চরম নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে এবং ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি আনতেই এই সাময়িক কঠোর ব্যবস্থা (একদলীয় শাসন) নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরে পূর্ণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস।
৪. রক্তাক্ত অবসান (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫)
একদলীয় এই শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব ছিল খুবই স্বল্প। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী কর্মকর্তার নির্মম অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসনের কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়।
১৯৭৫-৯০: সামরিক শাসন ও দলদাস আমলাতন্ত্রের বিস্তার

১৯৭৫-৯০: সামরিক শাসন ও দলদাস আমলাতন্ত্রের বিস্তার অধ্যায়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কালজয়ী ও সংঘাতময় অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসন জারি থাকে। এই সময়কালে একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, অন্যদিকে সিভিল ও সামরিক আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক রূপ দিয়ে “দলদাস আমলাতন্ত্রে” রূপান্তর করা হয়। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
নিচে এই সময়কালের মূল বৈশিষ্ট্য ও ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. সামরিক শাসনের উত্থান ও রাজনৈতিক দলের সামরিকীকরণ ( militarization)
- খন্দকার মোশতাক ও সায়েম আমল (১৯৭৫-৭৭): ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার বন্ধ করা হয় এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
- জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসন (১৯৭৭-৮১): প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থেকে রাষ্ট্রপতি হন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটালেও তা ছিল নিয়ন্ত্রিত। ক্ষমতা পোক্ত করতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ গঠন করেন। ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।
- জেনারেল এইচ এম এরশাদের শাসন (১৯৮২-৯০): ১৯৮২ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। তিনিও জিয়াউর রহমানের ফর্মুলা মেনে ‘জাতীয় পার্টি’ গঠন করেন। তার সময়কালে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
২. দলদাস আমলাতন্ত্রের বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
সামরিক শাসকদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকায় তারা টিকে থাকার জন্য সিভিল ও সামরিক আমলাতন্ত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে আমলাতন্ত্রের চরিত্র বদলে যায়:
- পেশাদারিত্বের অবসান: মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে সামরিক শাসকের প্রতি অনুগত আমলারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে থাকেন।
- রাজনীতিকরণ: সরকারি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের কর্মচারী না থেকে নির্দিষ্ট শাসকের ‘দলদাস’ বা রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হন।
- দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: আমলা ও চাটুকারদের খুশি রাখতে লাইসেন্সবাজি, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়।
৩. ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও সামরিক শাসনের পতন
জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আশির দশকজুড়ে ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে।
- ঐতিহাসিক জোট গঠন: আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় এবং বামপন্থীদের ৫-দলীয় জোট স্বৈরাচার বিরোধী রূপরেখা ঘোষণা করে।
- নূর হোসেন ও ডা. মিলনের আত্মত্যাগ: ১৯৮৭ সালে নূর হোসেন এবং ১৯৯০ সালের নভেম্বরে ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
- চূড়ান্ত পতন (১৯৯০): সর্বাত্মক হরতাল, ঘেরাও এবং সরকারি আমলাদের একাংশের অসহযোগিতার মুখে বাধ্য হয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
১৯৯১-২০০৮: গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন, তবু পরিবারতন্ত্রের ছায়া

১৯৯১-২০০৮: গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন, তবু পরিবারতন্ত্রের ছায়া অধ্যায়টি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দ্বান্দ্বিক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের পতনের পর দেশে দীর্ঘ দেড় দশক পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটে। তবে এই যুগে একদিকে যেমন নিয়মিত নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ধারার সূচনা হয়, অন্যদিকে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবারতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও চরম রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা পুরো ব্যবস্থাকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
নিচে এই সময়কালের মূল বৈশিষ্ট্য, অর্জন ও রাজনৈতিক মোড়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ (১৯৯১-১৯৯৬)
- ১২তম সংবিধান সংশোধনী (১৯৯১): ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়।
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন (১৯৯৬): বিরোধী দলগুলোর তীব্র আন্দোলনের মুখে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।
২. “পরিবারতন্ত্রের ছায়া” ও দুই নেত্রীর মেরুকরণ
এই দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে দুটি পরিবারের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, যা রাজনীতিতে “মাইনাস টু” বা দুই নেত্রীর দ্বন্দ্ব নামে পরিচিত:
- নেতৃত্বের উত্তরাধিকার: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার হিসেবে শেখ হাসিনা (আওয়ামী লীগ) এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া (বিএনপি) নিজ নিজ দলের একচ্ছত্র চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।
- দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: দলীয় প্রধানদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হতে থাকে। মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে নেত্রীদের প্রতি আনুগত্যই পদায়নের মূল মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
- অসহিষ্ণুতা ও রাজপথের রাজনীতি: এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্য দলের সংসদ বর্জন, লাগাতার হরতাল এবং রাজপথের সহিংসতা নিয়মে পরিণত হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এই রাজনৈতিক তিক্ততাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
৩. রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও ১/১১-এর রূপান্তর (২০০৬-২০০৮)
নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতার হস্তান্তর নিয়ে দুই দলের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ২০০৬ সালের শেষে দেশ চরম রাজনৈতিক সহিংসতার মুখোমুখি হয়।
- সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (যা ১/১১ নামে পরিচিত) রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সমর্থিত ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
- বিরাজনীতিকরণ ও সংস্কারের চেষ্টা: এই সরকার দুই নেত্রীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করে এবং রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করে। তবে তীব্র ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।
- গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন (২০০৮): ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং দেশে পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসে।
২০০৯-২০২৪: দীর্ঘ শাসনামল ও চাটুকার সংস্কৃতির চূড়ান্ত রূপ

২০০৯-২০২৪: দীর্ঘ শাসনামল ও চাটুকার সংস্কৃতির চূড়ান্ত রূপ অধ্যায়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও বিতর্কিত সময়কাল। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকে। এই দীর্ঘ শাসনামলে একদিকে যেমন দৃশ্যমান মেগা উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে, অন্যদিকে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে “চাটুকার সংস্কৃতি” (Sycophancy Culture) চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই দীর্ঘ শাসনামলের অবসান ঘটে।
নিচে এই সময়কালের মূল রাজনৈতিক চরিত্র, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং পতনের ঘটনাপ্রবাহ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. দীর্ঘ শাসনের ভিত্তি ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পতন
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ (২০১১): সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের রক্ষাকবচ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ বাতিল করা হয়, যা পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- ভোটহীন ও বিতর্কিত নির্বাচন: ২০১৪ সালের “১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত” হওয়ার একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের “রাতের ভোট” হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের ডামি প্রার্থীর “নিজেরা নিজেদের” নির্বাচন—এই তিনটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলা হয়।
২. চাটুকার সংস্কৃতির চূড়ান্ত রূপ ও দলদাস আমলাতন্ত্র
টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। মেধা, যোগ্যতা বা দেশপ্রেমের চেয়ে “দলীয় আনুগত্য ও চাটুকারিতা” হয়ে ওঠে পদোন্নতি ও টিকে থাকার একমাত্র মাপকাঠি:
- আমলাতন্ত্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা: সিভিল আমলাতন্ত্র ও পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। সরকারের সমালোচনা করলেই ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ তকমা দেওয়া এবং চাটুকার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে রাষ্ট্রীয় লুটপাটের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
- বিচার বিভাগ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ সত্যকে আড়াল করে কেবল সরকারের গুণগানে ব্যস্ত থাকে, যা সমাজে ‘চাটুকার সমাজ’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
- ভিন্নমত দমন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন) ব্যবহার করে সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার বানানো হয়।
৩. মেগা প্রজেক্টের আড়ালে মেগা দুর্নীতি
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্টের দৃশ্যমান উন্নয়ন হলেও এর আড়ালে চলে ইতিহাসের ভয়াবহতম আর্থিক কেলেঙ্কারি। ব্যাংকিং খাতের ধস, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
৪. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ঐতিহাসিক পতন (২০২৪)
দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে।
- জুলাই গণহত্যা: চাটুকার আমলা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভুল পরামর্শে সরকার ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, যাতে শিশুসহ সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়।
- মার্চ টু ঢাকা ও শেখ হাসিনার পলায়ন: এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলন একদফা দাবিতে (সরকারের পদত্যাগ) রূপ নেয়। চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকায় গণমানুষের ক্ষোভের গভীরতা বুঝতে ব্যর্থ হন শাসকগোষ্ঠী। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান, যার মাধ্যমে এই দীর্ঘ ও দমনমূলক শাসনামলের অবসান ঘটে।
২০২৪-পরবর্তী ও ২০২৬: রূপান্তরের পথে পুরনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তির শঙ্কা

২০২৪-পরবর্তী ও ২০২৬: রূপান্তরের পথে পুরনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তির শঙ্কা সময়কালটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্ন এবং গভীর রূপান্তরের পর্যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক নজিরবিহীন ও রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কার, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করা। তবে ২০২৪ থেকে বর্তমান ২০২৬ সাল পর্যন্ত রূপান্তরের এই যাত্রাপথে সংস্কারের আশার পাশাপাশি পুরনো ফ্যাসিবাদের কিছু প্রবণতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার পুনরাবৃত্তির শঙ্কাও সমাজ ও রাজনীতিতে গভীরভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
নিচে এই সময়কালের মূল রূপান্তরের প্রচেষ্টা এবং নতুন ও পুরনো সংকটের শঙ্কাগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা ও অর্জন
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কমিশন: নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, সিভিল আমলাতন্ত্র, সংবিধান এবং পুলিশ প্রশাসনকে দলীয়করণ থেকে মুক্ত করতে একাধিক উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
- মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা: বিগত সরকারের সময় ঘটা গুম, খুন ও জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে পুনর্গঠন করে আইনি প্রক্রিয়া সচল করা হয়।
- আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা: ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও অর্থ পাচার রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়।
২. পুরনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তির শঙ্কা
বিগত সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীর ক্ষতগুলো নিরাময় করে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, কিছু ক্ষেত্রে পুরনো ব্যবস্থার ছায়া ও প্রবণতা ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে:
- নতুন ধাঁচের দলীয়করণ ও দখলদারিত্ব: ক্ষমতাচ্যুত দলের শূন্যতা পূরণে অন্য কিছু রাজনৈতিক দল ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী স্থানীয় পর্যায়, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, ফুটপাত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পূর্বের কায়দাতেই প্রভাব বিস্তার ও দখলদারিত্বের মডেলে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
- আমলাতন্ত্রে অস্থিরতা ও নতুন চাটুকারিতার শঙ্কা: আমলাতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সরানোর প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে কেবল নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রভাবশালীদের মন জুগিয়ে চলার (নতুন চাটুকার সংস্কৃতি) প্রবণতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।
- আইনশৃঙ্খলা ও বিচারবহির্ভূত তৎপরতা: মব জাস্টিস (Mob Justice) বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর এবং ভিন্নমতের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে, যা অতীতেও ভিন্ন নামে বিদ্যমান ছিল।
- অর্থনৈতিক চাপ ও সিন্ডিকেট: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানামুখী চেষ্টা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব না হওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট রয়েই গেছে।
৩. ২০২৬: উত্তরণ বনাম অনিশ্চয়তার সন্ধিক্ষণ
বর্তমান ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজাতে (New Bangladesh) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, অন্যদিকে দ্রুত নির্বাচনের রাজনৈতিক চাপ এবং পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি সংস্কারের গতিকে মন্থর করছে। রূপান্তরের এই দীর্ঘ পথ আদতে সফল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নেবে, নাকি পুরনো দ্বান্দ্বিক ও চাটুকার রাজনীতির চক্রেই আবর্তিত হবে—তা নির্ধারণ করবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা।
কেন মানুষ রাজনৈতিক দাসত্ব বেছে নেয়: একটি মনস্তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

মানুষের স্বাধীন থাকার সহজাত প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বেচ্ছায় বা অবচেতনে রাজনৈতিক দাসত্ব, স্বৈরাচার কিংবা চাটুকার সংস্কৃতিকে বেছে নেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের আলোকে এই অদ্ভুত আচরণটিকে “স্বেচ্ছায় দাসত্ব বরণ” (Voluntary Servitude) বা রাজনৈতিক অবদমন বলা হয়।
মানুষ কেন রাজনৈতিক দাসত্ব বেছে নেয়, তার প্রধান মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. মানসিক নিরাপত্তা ও ভয়ের সংস্কৃতি (Fear and Security)
- ক্ষতির ভয় ও টিকে থাকার লড়াই: স্বৈরাচারী শাসনামলে রাষ্ট্র যখন চরম দমনমূলক হয়ে ওঠে (যেমন গুম, খুন, জেল), তখন মানুষের অবচেতন মন “লড়াই করার” (Fight) চেয়ে “মানিয়ে নেওয়া” বা “পালিয়ে বাঁচার” (Flight/Freeze) পথ খোঁজে। নিজের জীবন, পরিবার ও জীবিকা রক্ষার্থে মানুষ দাসত্ব বা চাটুকারিতাকেই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল মনে করে।
- স্বাধীনতার ভয় (Fear of Freedom): মনস্তাত্ত্বিক এরিক ফ্রোম (Erich Fromm) তাঁর ‘Escape from Freedom’ বইতে দেখিয়েছেন যে, স্বাধীনতা মানুষকে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করে তোলে, যা অনেকের কাছে মানসিক উদ্বেগের কারণ হয়। এর চেয়ে কোনো শক্তিশালী নেতার অধীনতা মেনে নিয়ে নিজের চিন্তার ভার তাঁর ওপর ছেড়ে দেওয়া অনেক সহজ মনে হয়।
২. স্টকহোম সিন্ড্রোম এবং ট্রমা বন্ডিং (Stockholm Syndrome & Trauma Bonding)
- শোষকের প্রতি ভালোবাসা: যখন কোনো জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে শাসকের চরম অত্যাচার ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে, তখন তারা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতায় ভোগে। শাসক যখন সামান্যতম অনুকম্পা বা সুযোগ-সুবিধা দেখায় (যেমন কোনো মেগা প্রজেক্ট বা উৎসব), তখন জনগণ শোষকের প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞতাবোধ ও অবচেতন টান অনুভব করতে শুরু করে।
- পাওয়ার ডিনামিক্স: ক্ষমতার এই চরম বৈষম্যের কারণে মানুষ নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে শাসকের আত্মপরিচয়কেই নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলে।
৩. চাটুকারিতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুরস্কার (Cognitive Reward System)
- সুবিধাবাদী মনস্তত্ত্ব: রাজনৈতিক দাসত্ব বা চাটুকারিতা কেবল ভয়ে নয়, অনেক সময় লোভ থেকেও আসে। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলদাস ব্যবস্থায় যারা শাসকের গুণগান গায়, তারা দ্রুত পদোন্নতি, আর্থিক সুবিধা, ব্যবসা ও সামাজিক ক্ষমতা লাভ করে। মানুষের মস্তিষ্ক যখন দেখে যে সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা চাটুকারিতায় পুরস্কৃত হওয়ার হার বেশি, তখন সে অবচেতনে দাসত্বকে একটি লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করে।
৪. লার্নড হেল্পলেসনেস বা ‘অসহায়ত্বের শিক্ষণ’ (Learned Helplessness)
- পরিবর্তন অসম্ভব এমন ধারণা: মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন মানুষ বারবার চেষ্টা করেও কোনো অত্যাচারী ব্যবস্থা বা সিন্ডিকেট থেকে মুক্তি পায় না, তখন তার মধ্যে একটি স্থায়ী মানসিক ধারণা তৈরি হয় যে—”পরিস্থিতি কখনোই বদলাবে না”। এই গভীর হতাশা থেকে মানুষ প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেয় এবং রাজনৈতিক দাসত্বকেই নিজের নিয়তি বলে মেনে নেয় (যেমনটি পাকিস্তান আমলের শুরুতে বা সাম্প্রতিক দীর্ঘ শাসনামলে দেখা গেছে)।
৫. সামাজিক প্রভাব ও কনফরমিটি (Conformity & Herd Mentality)
- স্রোতে গা ভাসানো: বিখ্যাত আস্ কনফরমিটি এক্সপেরিমেন্ট (Asch Conformity Experiments) প্রমাণ করে যে, মানুষ দলছুট হতে ভয় পায়। যখন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, বুদ্ধিজীবী ও আমলারা চাটুকারিতায় লিপ্ত হয়, তখন একজন সাধারণ মানুষ একাকী সত্য বলার সাহস হারিয়ে ফেলে। সে ভাবে, “সবাই যখন মেনে নিয়েছে, আমিও মেনে নিই।”
৬. প্রোপাগান্ডা ও কগনিটিভ ডিসোনেন্স (Propaganda & Cognitive Dissonance)
- যুক্তিহীন অন্ধত্ব: দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় প্রচার ও প্রোপাগান্ডার ফলে মানুষের মনে এক ধরণের মিথ্যা সত্যের রূপ নেয়। যখন বাস্তবচিত্র (যেমন অর্থনৈতিক সংকট বা জুলুম) তার বিশ্বাসের সাথে মেলে না, তখন মানসিক অস্বস্তি (Cognitive Dissonance) এড়াতে সে বাস্তবের চোখ বুজে শাসকের বয়ানকেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
উত্তরণের সম্ভাব্য পথ
রাজনৈতিক দাসত্ব ও চাটুকার সংস্কৃতি থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করার পথটি বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘমেয়াদি। এই উত্তরণের জন্য কাঠামোগত সংস্কার, আইনি পরিবর্তন এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের রূপান্তর একযোগে প্রয়োজন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে উত্তরণের সম্ভাব্য প্রধান পথগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতকরণ
একটি রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার প্রধান কারণ হলো এক ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হওয়া। উত্তরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী বা নির্বাহী বিভাগের একক ক্ষমতা হ্রাস করে সংসদ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি ও আর্থিক স্বাধীনতা দিতে হবে, যেন তারা কোনো রাজনৈতিক দলের তোয়াক্কা না করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
২. পেশাদার আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
আমলাতন্ত্রকে দলদাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হলে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের চর্চা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। মেধা, সততা এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সিভিল ও সামরিক প্রশাসনে মূল্যায়ন নিশ্চিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তারা যেন নিজেদের কোনো দলের কর্মী না ভেবে জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তার জন্য প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি।
৩. স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা
নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিচারক নিয়োগের জন্য একটি স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা তৈরি করতে হবে। বিচার বিভাগ যদি সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল সুরক্ষিত থাকে। একই সাথে পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কোনো দলের রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে, যেন আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়।
৪. রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা
রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে একনায়কতন্ত্র ও পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা প্রয়োজন। ভিন্নমতের চর্চাকে দলের ভেতর স্বাগত জানাতে হবে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলগুলো যেন মাঠ, ঘাট বা বাজার সিন্ডিকেট দখল করার পুরনো প্রবণতায় ফিরে না যায়, সেজন্য শক্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. মুক্ত গণমাধ্যম এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা
ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো যে সমস্ত কালো আইন ভিন্নমত দমন ও মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করে, সেগুলো স্থায়ীভাবে বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। তথ্য পাওয়ার অধিকার ও গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতি জনসমক্ষে চলে আসে, যা চাটুকারিতার সংস্কৃতি ভাঙতে বড় ভূমিকা রাখে।
৬. নাগরিক সচেতনতা ও শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্ধ লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং নাগরিক অধিকারবোধ তৈরি করতে হবে। সমাজের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের চাটুকারিতার শৃঙ্খল ভেঙে সত্য বলার সাহস দেখাতে হবে। জনগণ যদি তাদের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তবে কোনো শাসকই তাদের রাজনৈতিক দাসে পরিণত করতে পারবে না।
উপসংহার
১৯৫০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজনৈতিক দাসত্ববোধ কোনো নির্দিষ্ট শাসনামলের সমস্যা নয়—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত প্রবণতা, যা পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির হয়েছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রূপান্তরের কাল বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করেছে—এই দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্য-সংস্কৃতির বৃত্ত ভেঙে সত্যিকারের প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার। তবে ইতিহাস যা শিখিয়েছে, তা হলো—এই সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গভীরতা ও স্থায়িত্বের ওপর, নিছক ক্ষমতার পালাবদলের ওপর নয়।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



