অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
রাজনৈতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
প্রকাশিত: 7 জুন ২০২৬
ফাঁসির আদেশ বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর বিচারকদের কলমের নিব ভেঙে ফেলার পেছনে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ও প্রতীকী প্রথা। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এই প্রথার পেছনে মূলত চারটি গভীর মানসিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে:
১. দণ্ডটি যেন আর পরিবর্তন করা না যায় (প্রতীকী অর্থ)

একটি আইনি রায় বা আদেশ যখন বিচারক একবার লিখে স্বাক্ষর করে দেন, তখন আইনগতভাবে বিচারক নিজেই সেই রায় আর সংশোধন বা বাতিল করতে পারেন না। কলমের নিবটি ভেঙে ফেলার অর্থ হলো—যে রায় একবার দেওয়া হয়ে গেছে, তা চিরতরে চূড়ান্ত এবং ওই কলম দিয়ে সেই রায় আর কোনোভাবেই বদলানো সম্ভব নয়।
২. অনুশোচনা ও মানসিক দায়মুক্তি
ইসলামী আইন বা সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, জীবন দেওয়ার মালিক একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। একজন মানুষ হয়ে অন্য একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং মানসিক চাপেরই কাজ। বিচারকরা এই নিব ভেঙে মূলত বোঝাতে চান যে, তারা আইনের শাসন বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে এই আদেশ দিয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে চাননি। এটি এক ধরণের মানসিক দায়মুক্তির প্রতীক।
৩. কলমটিকে ‘অপবিত্রতা’ থেকে রক্ষা করা
যে কলমটি একজনের জীবন কেড়ে নেওয়ার বা ফাঁসির আদেশের মতো একটি চরম নির্মম কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যেন পরবর্তীতে অন্য কোনো সাধারণ বা শুভ কাজে ব্যবহৃত না হয়, সেই ধারণা থেকে নিবটি নষ্ট করে দেওয়া হয়।
৪. ‘অপরাধের’ প্রতীকী সমাপ্তি
যেহেতু ফাঁসির আদেশ পাওয়া ব্যক্তিটি সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো অপরাধ করেছে, তাই বিচারক নিবটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এই বার্তা দেন যে—অপরাধীর অপরাধের অধ্যায়ের সাথে সাথে এই কলমের আয়ুও এখানেই শেষ হলো।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং কিছু ঐতিহাসিক দিক নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া
ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ (CrPC)-এর নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো আসামির ফাঁসির রায় এক দিনের সিদ্ধান্তেই কার্যকর হয় না। এটি একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সতর্ক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়
- ডেথ রেফারেন্স (Death Reference): জেলা ও দায়রা জজ আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে আইন অনুযায়ী তা সরাসরি কার্যকর করা যায় না ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, নিম্ন আদালতের এই রায় অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট বিভাগে) পাঠাতে হয়, যাকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়
- আপিল বিভাগ ও রিভিউ: হাইকোর্ট বিভাগ যদি নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় বহাল রাখে, তবে আসামির সুযোগ থাকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার [lawyersnjurists.com, researchgate.net]। আপিল বিভাগেও রায় বহাল থাকলে আসামি শেষ আইনি লড়াই হিসেবে ‘রিভিউ’ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারেন।
- রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা: সব আইনি প্রক্রিয়া (আপিল ও রিভিউ) খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আসামির শেষ আশ্রয় থাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘মার্সি পিটিশন’ বা প্রাণভিক্ষার আবেদন করা [old.seu.edu.bd]。 রাষ্ট্রপতি এই আবেদন নাকচ করে দিলে রায় কার্যকরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় [ntvbd.com]।
- কারাগারের শেষ ধাপ: রাষ্ট্রপতির চিঠি কারাগারে পৌঁছানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আসামির পরিবারকে শেষবার দেখা করার সুযোগ দেয় [ntvbd.com]। রায় কার্যকরের আগে আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তওবা বা শেষ প্রার্থনা করানো হয় [ntvbd.com]। আইনের নিয়ম অনুযায়ী (CrPC Section 368), আসামিকে “ঘাড়ের সাহায্যে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত” (Hanged by the neck until he be dead) ফাঁসি দেওয়া হয় [en.wikipedia.org]।
২. উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থার কিছু ঐতিহাসিক রায় ও মাইলফলক

ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলের বিচার ব্যবস্থায় কিছু ঐতিহাসিক মামলা সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে:
- ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি (১৯০৮): ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিহারের মুজাফফরপুরে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রফুল্ল চাকীর সাথে মিলে তিনি বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন। অল্পের জন্য কিংসফোর্ড বেঁচে গেলেও দুই ব্রিটিশ নারী নিহত হন। মাত্র ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন বয়সে ফাঁসির মঞ্চে হাসিমুখে আত্মদান করেন তিনি।

মুজাফফরপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও ফাঁসি
- ঘটনা: ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল বিহারের মুজাফফরপুরে রাতের অন্ধকারে ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়িতে বোমা ছোড়া হয়। কিন্তু সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড না থাকায় মিসেস কেনেডি ও তাঁর কন্যা নিহত হন।
- গ্রেপ্তার: ঘটনার পর প্রফুল্ল চাকী গ্রেপ্তারের আগে আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরাম গ্রেপ্তার হন। বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। [
- ফাঁসি: ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ভোর ৪টায় মুজাফফরপুর জেলে ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। [
- সাহসিকতা: মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে তিনি নির্ভীকভাবে বলেছিলেন, “আমি ভালো বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।”
- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সহকারী এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৭৫ সালে জারি করা ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশের কারণে সুদীর্ঘ সময় এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ ছিল।

আইনি প্রতিবন্ধকতা ও বিচারের পথ উন্মুক্তকরণ
- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ খুনিদের আইনি সুরক্ষা দিতে এই অধ্যাদেশ জারি করেন।
- অধ্যাদেশ বাতিল: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বিচারের পথ উন্মুক্ত করে。
- অভিযোগপত্র: ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পুলিশের সিআইডি (CID) ২০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রথম চার্জশিট দাখিল করে।
বিচার প্রক্রিয়ার সময়রেখা ও রায়
- নিম্ন আদালতের রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেন।
- হাইকোর্টের রায়: ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের খালাস দেন।
- আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়: ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে চূড়ান্তভাবে ১২ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে
সাজা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা
মামলায় চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, ১ জন বিদেশে পলাতক অবস্থায় মারা গেছেন এবং বাকি ৫ জন এখনও বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছেন।
| সাজা ও বর্তমান স্থিতি | আসামিদের নাম | বিবরণ ও কার্যকরের সময় |
|---|---|---|
| ফাঁসি কার্যকর (প্রথম পর্যায়) | ১. সৈয়দ ফারুক রহমান ২. সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান ৩. বজলুল হুদা ৪. এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ৫. মহিউদ্দিন আহমেদ | ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে একযোগে এই ৫ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
| ফাঁসি কার্যকর (দ্বিতীয় পর্যায়) | ৬. আবদুল মাজেদ | দীর্ঘকাল ভারতে পালিয়ে থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন এবং ১২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। |
| পলাতক অবস্থায় মৃত্যু | ७. আবদুল আজিজ পাশা | ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে পলাতক থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মারা যান। |
| এখনও পলাতক আসামি | ৮. খন্দকার আবদুর রশিদ ৯. শরিফুল হক ডালিম ১০. এ এম রাশেদ চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র) ১১. এস এইচ বি এম নূর চৌধুরী (কানাডা) ১২. মোসলেম উদ্দিন | ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি থাকা সত্ত্বেও এই ৫ খুনিকে এখনো দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। |
এই বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।
- মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল):
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ আদালত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের আমলে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে এই আদালত পরিচালিত হয়ে আসছে।

ট্রাইব্যুনাল গঠনের ইতিহাস ও বিবর্তন
- ১১৯৩ সালের আইন: ১৯৭৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য মূল আইনটি পাস করা হয়।
- ২০১০ সালের পুনর্গঠন: মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়।
- ২০২৪ সালের রূপান্তর: ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। [
আইনি সংস্কার ও সাম্প্রতিক সংশোধনীসমূহ
বিচারের পরিধি বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে ট্রাইব্যুনাল আইনে ধারাবাহিক কিছু ঐতিহাসিক সংশোধন আনা হয়েছে:
- রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধকরণ: ২০২৫ সালের মে মাসে আইনে বড় সংশোধনী এনে ব্যক্তি ছাড়াও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করে তাদের নিবন্ধন বাতিল বা নিষেধাজ্ঞা জারির ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়।
- জনপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা: ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে জারি করা তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (Formal Charge) দাখিল হলে তিনি আর জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং সরকারি পদে বসতে পারবেন না।
- গুমের (Enforced Disappearance) বিচার: ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস করে গুমের ঘটনাকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এক্তিয়ারভুক্ত করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়ার মাইলফলক রায়সমূহ
১. ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের মোট ৫৭টি মামলার রায় দেয়। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ৬ জন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়:
- জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী এবং মীর কাসেম আলী।
- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
২. ২০২৪ সালের জুলাই গণহত্যার বিচার
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ট্রাইব্যুনালে জুলাই বিপ্লবের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেয়।
ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারিক কাঠামো
| পদের নাম | বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব |
|---|---|
| চীফ প্রসিকিউটর | অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম |
| তদন্ত সংস্থা | আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা |
| বিচারিক বেঞ্চ | ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২ (সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত) |
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইতিহাস, রাজনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের এমন চমৎকার ও তথ্যবহুল বিশ্লেষণ নিয়মিত পড়তে ভিজিট করুন পালস বাংলাদেশ | Pulse Bangladesh।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৬ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইসলাম ও জীবন
তথ্যসূত্র: আল-কোরআনের তাফসির (তাফসির ইবনে কাসির), সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত নবী-রাসূলদের জীবনী গ্রন্থ।
বর্তমান ২০২৬ সালের আধুনিক ও তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ যুগে মানুষ বাহ্যিক ও বস্তুগত দিক থেকে অনেক উন্নত হলেও, মানসিক প্রশান্তি, নৈতিকতা ও জীবনবোধের দিক থেকে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতি-ব্যবহার, পারস্পরিক দূরত্বের এই যুগে সঠিক জীবনদর্শনের অভাব স্পষ্ট। মানবজাতির হেদায়েত ও সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে যে নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন, তাদের জীবন কেবল ইতিহাসের কিছু গল্প নয়; বরং তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত ও কালজয়ী গাইডলাইন। এই বিশেষ সিরিজের ১ম পর্বে আমরা আলোচনা করব নবী-রাসূলদের অনন্য জীবন থেকে আজকের দিনে আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো ৩টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
১. হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: চরম বিপদেও মানসিক শক্তি ও ধৈর্য (Patience)
আজকের যুগে সামান্য আর্থিক ক্ষতি, চাকরি হারানো কিংবা পারিবারিক বা শারীরিক অসুস্থতায় মানুষ দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে, এমনকি অনেকে আত্মহননের পথও বেছে নেয়। এই মানসিক সংকটে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আদর্শ হলেন হযরত আইয়ুব (আ.)।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন রোগ, সন্তানদের মৃত্যু এবং সমস্ত ধন-সম্পদ হারানোর মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু এমন চরম সংকটেও তিনি আল্লাহর প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ করেননি, বরং চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আধুনিক জীবনে বিষণ্ণতা (Depression) বা যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ইতিবাচক থাকা এবং বিশ্বাস রাখা যে—কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। বিপদে অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই হলো সফলতার মূল চাবি।
২. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: নৈতিক স্খলন ও প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করা (Self-Control)
বর্তমান ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের উন্মুক্ততার কারণে তরুণ প্রজন্মের সামনে পর্নোগ্রাফি, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক স্খলনের নানামুখী প্রলোভন প্রতিনিয়ত আসছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতা ধরে রাখা আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হযরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অপরূপ সুন্দর এবং যুবক। মিশরের আজিজের স্ত্রী যখন ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ করে উনাকে পাপের দিকে আহ্বান করেছিল, তখন তিনি সমস্ত প্রলোভন ও ক্ষমতার দাপটকে তুচ্ছ করে বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি।” পাপের চেয়ে তিনি কারাগারের বন্দিজীবনকে বেছে নিয়েছিলেন।

- আজকের দিনের শিক্ষা: চারপাশে যত বড় বা সহজ প্রলোভনই থাকুক না কেন, আল্লাহর ভয়কে অন্তরে জাগ্রত রেখে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-Control) বজায় রাখা। ক্যারিয়ার বা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে সাময়িক আনন্দের চেয়ে চিরস্থায়ী নৈতিকতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া।
৩. হযরত নূহ (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা: সামাজিক সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা (Perseverance)
আজকের দিনে তরুণ বা উদ্যোক্তারা যখন নতুন বা ভালো কোনো কাজ করতে যায়, তখন সমাজের মানুষের সমালোচনা, ট্রল বা উপহাসের শিকার হয়ে অনেকেই মাঝপথে কাজ ছেড়ে দেয়। মানুষের কথা বা সামাজিক চাপের মুখে নিজের সৎ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত নূহ (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির বুকে বিশাল নৌকা তৈরি করছিলেন, তখন সমকালীন সমাজের মানুষ উনাকে দেখে চরম উপহাস করত, পাগল বলত। কিন্তু তিনি মানুষের কোনো উপহাস বা ট্রলের দিকে কান না দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই নৌকাই বিশ্বাসীদের রক্ষা করেছিল।
- আজকের দিনের শিক্ষা: আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার কাজটি সৎ, সঠিক এবং মানবকল্যাণকর, তবে সমাজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ কী বলল বা কী ট্রল করল—তাতে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকা। দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমই শেষ পর্যন্ত সত্যকে জয়ী করে।
নবী-রাসূলদের এই চমৎকার ঐতিহাসিক শিক্ষাগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক জীবনে চর্চা করা উচিত। তবেই আমরা এই আধুনিক ও জটিল পৃথিবীতে একটি শান্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: অর্থনীতি
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank FX Reference), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL Currency Tracker), জাগোনিউজ২৪ মুদ্রা বাজার প্রতিবেদন এবং ওয়াইজ (Wise) রিয়েল-টাইম এক্সচেঞ্জ ডেটা।
বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় (Remittance) পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার, ইউরো ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের বর্তমান রেট জানা অত্যন্ত জরুরি। ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ অফিসিয়াল ডেটা এবং খোলা বাজারের লেনদেন হারের ওপর ভিত্তি করে আজকের বিস্তারিত রেট নিচে তুলে ধরা হলো।
১. একনজরে আজকের প্রধান প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার
আন্তর্জাতিক ইন্টারব্যাংক মার্কেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আজকের প্রধান তিনটি মুদ্রার গড় ক্রয় (Buying Rate) ও বিক্রয় মূল্য (Selling Rate) নিচে দেওয়া হলো:
- মার্কিন ডলার (USD): বাংলাদেশ ব্যাংকের আজকের অফিসিয়াল এফএক্স রেফারেন্স রেট অনুযায়ী প্রতি ডলারের মূল্য ১২৪.৩৫ টাকা থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যাংকভেদে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি ১২৩.৩০ টাকা (ক্রয়) এবং ১২৪.৮০ টাকা (বিক্রয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
- ইউরো (EUR): ইউরোপীয় একক মুদ্রা ইউরোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আজ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশি টাকায় আজ ১ ইউরোর গড় বাজার মূল্য বা মিড-মার্কেট রেট প্রায় ১৪০.১১ টাকা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এটি সর্বোচ্চ ১৪১.৭৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হচ্ছে।
- মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR): মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য আজ রিঙ্গিতের রেট বেশ স্থিতিশীল। ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর লাইভ কারেন্সি চার্ট অনুযায়ী ১ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত সমান ৩০.৬৩ টাকা (মিড-মার্কেট রেট)। বিভিন্ন রেমিট্যান্স হাউজ ও ব্যাংকে এটি ৩০.২৫ টাকা (ক্রয়) এবং ৩০.৬৬ টাকা (বিক্রয়) সীমার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।

২. বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR) রেটের তুলনা
প্রবাসীদের সুবিধার্থে নিচে একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো। মালয়েশিয়া থেকে ১০০০ রিঙ্গিত বাংলাদেশে পাঠালে আজ কোন মাধ্যমে চার্জ ছাড়া আনুমানিক কত টাকা পাওয়া যাবে তা দেখে নিন:
- Wise (অনলাইন ট্রান্সফার): বিনিময় হার ৩০.৫৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৫৪০ টাকা।
- Agrani Remittance House: বিনিময় হার ৩০.৪৫ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৫০ টাকা।
- Al-Rajhi Bank: বিনিময় হার ৩০.৪৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৪Tokens বা টাকা।
- Western Union (ক্যাশ পিকআপ): বিনিময় হার ৩০.৩৯ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৩৯০ টাকা।
৩. আন্তর্জাতিক কার্ড পেমেন্ট ও ই-কমার্স রেট
আপনি যদি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড (যেমন- EBL, City Bank, বা অন্যান্য ডুয়াল কারেন্সি কার্ড) ব্যবহার করে ই-কমার্স পারচেজ কিংবা ফেসবুক/গুগল বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করতে চান, তবে আপনার জন্য রেট কিছুটা ভিন্ন হবে। আজ বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড এনডোর্সমেন্ট রেট প্রতি ডলারের জন্য ১২৪.৯৫ টাকা থেকে ১২৫.২০ টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে (ভ্যাট ও ব্যাংক প্রসেসিং ফি আলাদা প্রযোজ্য)।
- রেট পরিবর্তনশীল: কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট বা মুদ্রার মান প্রতি সেকেন্ডে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টাকা কিংবা রেমিট্যান্স পাঠানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আপনার নিকটস্থ ব্যাংক শাখা বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জারের লাইভ স্ক্রিন থেকে রেটটি কনফার্ম করে নিন।
- হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম বর্জন করুন: যেকোনো ধরনের অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠানো আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা সরকার অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সরকার ঘোষিত ২.৫% নগদ প্রণোদনা সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে এবং আপনার কষ্টার্জিত অর্থ শতভাগ নিরাপদ থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



