অপরাধ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
তারিখ: ৮ আগস্ট ২০২৫
সূত্র: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ মতামত
“আমাকে চোর বলে অপমান করো না—এই লাইনে বড় বড় লোক কাজ করে।”
একটি সাধারণ সংলাপ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অঘোষিত অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক নৈতিকতার এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি।
সম্প্রতি ঢাকার এক আলোচিত অনলাইন ব্যবসায়ী এই কথা বলেন, যখন তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এই লাইনটি এখন শুধু তার নয়—দেশের নানা প্রান্তে যারা আইনের ধূসর অঞ্চলে কাজ করছেন, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের একধরনের ‘স্লোগান’ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত আমলা থেকে শুরু করে জনপ্রিয় শিল্পী পর্যন্ত—অনেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন এমন খাতে, যেগুলো আইনের চোখে হয়তো বৈধ নয়, কিন্তু সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক’। এই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে প্রভাব, অর্থ ও নীরব সমঝোতার মাধ্যমে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহানা ইসলাম বলেন,
“এখনকার সমাজে চুরির সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। যা আগে অপরাধ ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রে তা ‘বুদ্ধি’ বা ‘স্মার্টনেস’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।”
অর্থনীতিবিদ ড. এম মাহমুদুল হক মনে করেন,
“বৈধ পথে ব্যবসা করা যত কঠিন হচ্ছে, ততই বিকল্প বা অবৈধ পথে যাওয়া স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এটা এখন নৈতিক সাপোর্ট পাচ্ছে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মানসিকতা শুধু ব্যক্তির নয়—এটা পুরো সিস্টেমের প্রতিফলন। যখন সংসদের টেবিলে বসা, সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় থাকা, অথবা সরকারি অনুষ্ঠানে মঞ্চের প্রথম সারিতে দাঁড়ানো মানুষই এই ‘লাইনে’ যুক্ত থাকে, তখন ‘চোর’ শব্দটি শুধু গালিই নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক লড়াইয়ের অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের বক্তব্যের নিচে মন্তব্যের স্রোত—কেউ লিখছেন, “সিস্টেমের ভেতরে থেকে সিস্টেম চালানোই বুদ্ধিমত্তা।” আবার কেউ বলছেন, “এটাই অনৈতিকতাকে বৈধ করার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।”
বাংলাদেশের এই বাস্তবতা বলছে—এখন আর চুরির জন্য মুখ লুকাতে হয় না, বরং যুক্তি তুলে ধরে তা ‘গর্বের’ সঙ্গে বলা যায়।
সূত্র:
- ড. ফারহানা ইসলাম, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- ড. এম মাহমুদুল হক, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ, সিপিডি
- প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
- আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা: ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের চরম অর্থনৈতিক অস্থিরতার মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সাবেক কর্মকর্তা আহসান এইচ মনসুর। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে জনমনে যে তীব্র আশা জাগr হয়েছিল, তা দেড় বছর পর এক গভীর হতাশায় রূপ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল লক্ষ্যগুলোতে গভর্নর প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে সমালোচকরা মত প্রকাশ করছেন।

মূল্যস্ফীতি ও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাব
গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যে কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেন। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০% করার পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি।
- ব্যবসায়ীদের মত: ব্যবসায়ী নেতারা বারবার সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ সুদহার রাখায় উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
- ফলাফল: মূল্যস্ফীতি হ্রাসের পরিবর্তে উৎপাদন কমে যাওয়ায় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
পাচারকৃত টাকা ফেরত: প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর শুরুতে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেছিলেন, বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনা হবে। কিন্তু এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো টাকা ফেরত আসেনি। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন যে, এই প্রক্রিয়ার জন্য চার-পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে।
- জনমনে হতাশা: সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনমনে চরম হতাশা ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
খেলাপি ঋণ ও শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অ্যাকশন
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় ফলাফল বা আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
- বিনিয়োগকারীদের আস্থা: প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে—যেখানে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বিরাজ করছে।
সিপিবির পর্যবেক্ষণ ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
- টাকা ছাপানোর অভিযোগ: তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়েছে, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। তাঁর মতে, অর্থনীতির সামষ্টিক স্থিতিশীলতা এখন চরম ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সমালোচকদের মতে, সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নেওয়া নীতিগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়া, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং খেলাপি ঋণ কমার পরিবর্তে বেড়ে যাওয়া—অর্থনীতির বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থারই চিত্র তুলে ধরে।
তথ্যসূত্র: সিপিডি-র সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ (১ মার্চ ২০২৬), ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন এবং অর্থনৈতিক সমীক্ষা আর্কাইভ।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
গবেষণা ও বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত আইয়ুব খানের শাসনকাল এক বিতর্কিত অধ্যায়। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ইস্কান্দার মির্জাকে অপসারিত করে জেনারেল আইয়ুব খান যখন পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজের সামরিক শাসনের ‘বৈধতা’ অর্জন করা। এই বৈধতা লাভের নেশায় ১৯৫৯ সালে তিনি প্রবর্তন করেন এক অভিনব ব্যবস্থা, যার নাম দেওয়া হয় ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy)।
কেন এই মৌলিক গণতন্ত্রের প্রবর্তন?

আইয়ুব খান জানতেন যে, জনগণের সরাসরি ভোটে (Universal Suffrage) তিনি কখনোই জয়ী হতে পারবেন না। তাই তিনি গণতন্ত্রের এক ‘খোলস’ তৈরি করেন যার মূল কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. বৈধতার সংকট নিরসন: বন্দুকের নলে ক্ষমতা নিলেও আন্তর্জাতিক বিশ্ব ও দেশের মানুষের কাছে নিজেকে ‘নির্বাচিত’ হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। সরাসরি নির্বাচনের ঝুঁকি এড়াতে তিনি ৮০,০০০ প্রতিনিধি (পূর্ব পাকিস্তানে ৪০,০০০ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ৪০,০০০) নিয়ে একটি নির্বাচকমণ্ডলী বা ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ তৈরি করেন।
২. জনপ্রিয় নেতাদের পথরুদ্ধ করা: তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো এবং বর্ষীয়ান নেতাদের প্রভাব নস্যাৎ করাই ছিল তার লক্ষ্য। মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন এবং জনগণের সরাসরি ভোটাধিকার কেড়ে নেন।
৩. অনুগত ‘ভোট ব্যাংক’ তৈরি: আইয়ুব খান গ্রামাঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার ও মাতব্বরদের নিয়ে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এই ৮০,০০০ মেম্বার বা ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’দের উন্নয়নের নামে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো, যার বিনিময়ে তারা আইয়ুব খানের ক্ষমতাকে সমর্থন জোগাত।
৪. আমলাতান্ত্রিক খবরদারি: আপনি সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, এই ব্যবস্থার আড়ালে আমলারাই শাসনকার্য চালাতেন। প্রতিটি স্তরের কাউন্সিলগুলোর প্রধান ছিলেন ডিভিসি (DVC), ডিসি (DC) বা এসডিও (SDO)-র মতো সরকারি কর্মকর্তারা। ফলে সাধারণ মানুষের হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না।
মৌলিক গণতন্ত্রের কাঠামো ও স্তরসমূহ
আইয়ুব খানের এই ব্যবস্থা ছিল চার স্তরবিশিষ্ট:
- ইউনিয়ন কাউন্সিল/কমিটি: গ্রাম ও শহর পর্যায়ে প্রাথমিক স্তর।
- থানা বা তহসিল কাউন্সিল: দ্বিতীয় স্তর, যেখানে সরকারি কর্মকর্তারা সভাপতিত্ব করতেন।
- জেলা কাউন্সিল: তৃতীয় স্তর, যার প্রধান ছিলেন জেলা প্রশাসক।
- বিভাগীয় কাউন্সিল: চতুর্থ স্তর, যার প্রধান ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার।
ঐতিহাসিক পরিণতি
১৯৬০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এই ৮০,০০০ মৌলিক গণতন্ত্রীর পরোক্ষ ভোটে আইয়ুব খান নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে এটি গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্র চলায় পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই এই ছদ্মবেশী ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থার পতন ঘটে।
গুগল অ্যানালাইসিস ও ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র (Sources):
এই বিশ্লেষণটি তৈরি করতে নিম্নলিখিত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও ডিজিটাল আর্কাইভের সহায়তা নেওয়া হয়েছে:
১. বাংলাপিডিয়া (Banglapedia): আইয়ুব খান ও মৌলিক গণতন্ত্রের বিবর্তন সংক্রান্ত ভুক্তি। ২. পাকিস্তান রিভোলিউশন আর্কাইভ: ১৯৫৮-এর সামরিক অভ্যুত্থান এবং ইস্কান্দার মির্জার ভূমিকা। ৩. দ্য হিস্ট্রি অফ পাকিস্তান (আইটিএইচএপি): মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ, ১৯৫৯-এর মূল ধারা। ৪. মুনতাসীর মামুন ও জয়ন্ত কুমার রায়: ‘বাংলাদেশের সিভিল সমাজ’ এবং ‘পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস’ বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ। ৫. ববি হাজ্জাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ: সামরিক শাসনামলে পরোক্ষ নির্বাচনের প্রভাব।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
তারিখ: ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ‘সেরা’ বা ‘সবচেয়ে খারাপ’ শাসক নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। রাজনীতির ময়দানে কার জনপ্রিয়তা কতোটা, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—কার শাসনামলে রাষ্ট্র কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী ২০২৬ সালের এই নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমরা যখন অতীতের দিকে তাকাই, তখন কয়েকজন শাসকের নাম বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
গুগল অ্যানালাইসিস এবং ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আজ এই বিতর্কের একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করবো।
১. খন্দকার মোশতাক আহমদ (১৯৭৫): বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং ঘৃণিত নামের তালিকায় শীর্ষে থাকেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।
- কেন তিনি তালিকায়: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করা ছিল তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক।
- রাজনৈতিক সংকেত: তাঁকে অধিকাংশ বিশ্লেষক একজন ‘ষড়যন্ত্রকারী’ ও ‘বিদেশি শক্তির এজেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। গণতন্ত্রের পথে তাঁর ৮৩ দিনের শাসনকাল ছিল এক কালো অধ্যায়।
২. শেখ হাসিনা (২০০৯–২০২৪): উন্নয়নের আড়ালে কর্তৃত্ববাদ

সাম্প্রতিক সময়ের গুগল ট্রেন্ড এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকালকে ‘ফ্যাসিবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
- কেন সমালোচনা: ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলি, আয়নাঘরের মতো গোপন বন্দিশালা, এবং ভোট কারচুপির মাধ্যমে গণতন্ত্র ধ্বংস করার অভিযোগ তাঁর ওপর রয়েছে।
- বিশ্লেষণ: ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তাঁকে অনেকেই ‘সবচেয়ে খারাপ’ শাসকদের তালিকায় রাখেন।
৩. এইচ এম এরশাদ (১৯৮২–১৯৯০): স্বৈরাচারের তকমা

একজন সামরিক শাসক হিসেবে ৯ বছর ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ।
- কেন সমালোচনা: রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল এবং সামরিক আইন দিয়ে নাগরিক অধিকার খর্ব করার জন্য তাঁকে ‘স্বৈরাচার’ উপাধি দেওয়া হয়।
- অন্য দিক: যদিও তাঁর আমলে উপজেলা পদ্ধতি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু গণতন্ত্র হত্যা করার দায়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
৪. জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া: আদর্শিক সংঘাত ও বিতর্ক

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার শাসনকাল নিয়েও তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
- সমালোচনা: জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে সামরিক ক্যু-পাল্টা ক্যু-এর সময় শত শত সামরিক অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া এবং রাজনীতিতে সামরিকীকরণের অভিযোগ রয়েছে।
- ২০০১-০৬ মেয়াদ: খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক দুর্নীতি এবং ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা তাঁকে সমালোচনার মুখে ফেলে।
শাসকদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ (একনজরে)
| শাসকের নাম | শাসনের ধরন | প্রধান কলঙ্ক/বিতর্ক | উল্লেখযোগ্য সমালোচনা |
| খন্দকার মোশতাক | ষড়যন্ত্রমূলক/অবৈদ | বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধ করা। | বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত রূপ। |
| শেখ হাসিনা | কর্তৃত্ববাদী | আয়নাঘর, ভোট ডাকাতি ও জুলাই গণহত্যা। | আধুনিক বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ। |
| এইচ এম এরশাদ | সামরিক স্বৈরতন্ত্র | সংবিধান স্থগিত ও গণতন্ত্র দমন। | রাজপথের লড়াইয়ে পতন। |
| জিয়াউর রহমান | সামরিক/গণতান্ত্রিক | ইনডেমনিটি বহাল ও সামরিক ফাঁসি। | ইনডেমনিটির মাধ্যমে খুনিদের রক্ষা। |
১৯০০ থেকে ২০২৬: ইতিহাসের শিক্ষা
বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯০০ সালের ব্রিটিশ আমল থেকে আজ ২০২৬ সাল পর্যন্ত দেখা গেছে—জনবিচ্ছিন্ন কোনো শাসকই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি। ১৯০০ সালের সেই শাসক-প্রজা মানসিকতা নিয়ে যারা দেশ চালিয়েছেন, ইতিহাস তাঁদেরকে ক্ষমা করেনি। ২০২৪ সালের বিপ্লব পরবর্তী ২০২৬ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার যখন ‘সংস্কার ও বিচারের’ কথা বলছে, তখন অতীতের এই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার: ‘সবচেয়ে খারাপ’ শাসক কে—তা নির্ভর করে আপনি কাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আপনি কি ভোটের অধিকারকে? নাকি জীবনের নিরাপত্তাকে? তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে বন্দুকের নলে বা কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছেন এবং মানুষের রক্ত ঝরিয়েছেন, ইতিহাস তাঁদের কাউকেই ভালো শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
সূত্র: ১. Quora & Wikipedia Analysis on Bangladesh Politics (2021-2024).
২. Human Rights Watch (HRW) and Amnesty International Reports (2024-2025).
৩. ১৯০০-২০২৬: বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের বিশেষ নথিপত্র।
৪. দৈনিক বাংলা ও নিউজ২৪ অনলাইন প্রতিবেদন (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



