ইতিহাস

বিলুপ্তির ইতিহাসে রাজকীয় বাহন ‘পালকি’: আভিজাত্যের প্রতীক থেকে সামন্তবাদী শোষণের দলিল
পালকি

নিউজ ডেস্ক

August 3, 2026

শেয়ার করুন

সংস্কৃতি ও ইতিহাস ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

একসময় গ্রামবাংলা কিংবা শহর—সবত্রই মেঠো পথে ধূলো উড়িয়ে চলে যেত এক কাঠের তৈরি চারকোনা বন্ধ বা ছাদখোলা আভিজাত্যের সিন্দুক। ভেতরের যাত্রী আরাম করে বসতেন, আর বাইরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাইলের পর মাইল সেই ভারী বোঝা কাঁধে বয়ে নিয়ে চলতেন একদল মানুষ। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যবাহী বাহনটির নাম ‘পালকি’

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মোটরগাড়ি, ট্রেন কিংবা আধুনিক যানবাহনের দাপটে পালকি আজ ইতিহাস। তবে কেবল একটি বাহন হিসেবেই নয়, সামন্তবাদী সমাজের আভিজাত্যের প্রতীক, রাজপরিবারের ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ হিসেবে পালকির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

১. পালকির উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

পালকির ইতিহাস ঠিক কত হাজার বছরের পুরনো, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও প্রাচীন সভ্যতায় এর অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

  • প্রাচীন সভ্যতায় উপস্থিতি: মিসরীয় এবং মায়া সভ্যতার চিত্রলিপিতে পালকি সদৃশ বাহনের ছবি পাওয়া যায়। আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে রচিত মহর্ষি বাল্মীকি-র ‘রামায়ণ’-এ দেব-দেবী ও রাজপরিবারের পরিবহনে পালকির ব্যবহারের বহু উল্লেখ রয়েছে।
  • ধারণার উৎস: ঐতিহাসিকদের মতে, আদিম যুগের মানুষ যখন শিকার করা বড় পশু লাঠির মাঝামাঝি ঝুলিয়ে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসত, মূলত সেই পদ্ধতি থেকেই পরবর্তীতে মানুষ বহনের বাহন বা ‘পালকি’র ধারণার জন্ম হয়।
  • মোগল ও ঔপনিবেশিক আমল: মোগল আমলে রাজপরিবারের নারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ পালকির ব্যবহার ব্যাপক রূপ নেয়। জানা যায়, সম্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা অবস্থায় পালকিতে করে গুজরাটের মরুপ্রান্তরে ভ্রমণকালেই জন্ম দিয়েছিলেন সম্রাট আকবরের। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে এবং জমিদারি প্রথায় ধনকুবের ও রাজ-রাজড়াদের মূল বাহন হয়ে ওঠে এই পালকি।

২. গঠন ও বেহারাদের কঠোর জীবনসংগ্রাম

পালকি মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি সিন্দুক বা চেয়ারের আকৃতির একটি হস্তচালিত বাহন।

  • গঠনশৈলী: উপমহাদেশের পালকিগুলো সাধারণত চারকোনা হতো, যার দুপাশে দরজা ও কাপড়ের পর্দা থাকত। কিছু পালকি আবার সিংহাসনের মতো ছাদখোলা হতো। সামনে ও পেছনে থাকা দীর্ঘ কাঠ বা হাতল ধরে কাঁধে তুলে নেওয়া হতো এটি।
  • বেহারা বা কাহার: যাঁরা পালকি বহন করতেন, তাঁদের বলা হতো ‘বেহারা’ বা ‘কাহার’। পালকির আকৃতি ও ওজনের ওপর নির্ভর করে দুই, চার, ছয়, আট এমনকি ষোলো জন বেহারার প্রয়োজন হতো।
  • শ্রমসংগীত ও ‘হুনহুনা’ ছন্দ: মাইলের পর মাইল ভারী বোঝা বইতে গিয়ে ক্লান্তি দূর করা এবং নিজেদের হাঁটার তাল ঠিক রাখার জন্য বেহারারা মুখে মুখে গান বা বিশেষ সুর ভাঁজতেন—যেমন: “হুন হুঁ না, হুন হুঁ না” কিংবা সামনে গর্ত থাকলে বলতেন “সামাল হেঁকে, চলল বেঁকে”। এই গীতিময় শব্দগুলোই মূলত পালকির শ্রমসংগীত হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে পালকির মর্যাদা

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্যানভাসে পালকি ও বেহারাদের জীবনকাহিনি অমর হয়ে রয়েছে।

  • ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত: তাঁর বিখ্যাত ‘পালকির গান’ কবিতায় গ্রামবাংলার তপ্ত রোদে বেহারাদের যাত্রার অনবদ্য ছবি এঁকেছেন:“পালকি চলে! পালকি চলে!/ গগন তলে আগুন জ্বলে!/ স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে/ যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা…” পরবর্তীতে কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরসম্রাট সলিল চৌধুরীর সুরে গান হিসেবে এটিকে অমর করে তোলেন।
  • রবীন্দ্রনাথ ও তারাশঙ্কর: বিশ্বকবির ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় যেমন পালকির কথা আছে, তেমনি জমিদার থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে প্রজা পরিদর্শনের জন্য ষোলো বেহারার পালকি ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে শোষিত ও দরিদ্র কাহার সমাজের করুণ বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন।

৪. গণসংগীতে পালকি: ভূপেন হাজারিকার ‘দোলা হে দোলা’

পালকিকে কেবল নস্টালজিয়ার বাহন হিসেবে না দেখে, শোষিত শ্রমজীবী মানুষের আড়ালে থাকা ক্ষোভ ও শ্রেণীসংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কালজয়ী সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা

আমেরিকায় মানবাধিকার কর্মী পল রবসনের সান্নিধ্যে এসে বিশ্ব সাম্যবাদের যে শিক্ষা হাজারিকা পেয়েছিলেন, তারই ফসল তাঁর প্রখ্যাত গান ‘দোলা হে দোলা’ (বাংলা রূপান্তর: শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)। গানে তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন—

  • পালকির ভেতরে যে বসে থাকে, সে হীরে-সোনায় ঝলমল করে।
  • আর যে তাকে কাঁধে নিয়ে চলে, তার পরনে শতছিন্ন কাপড়, পিঠে ক্ষতের চিহ্ন।

গানটির শেষভাগে তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে গেয়ে ওঠেন— বেহারারা যদি একদিন এক হয়ে কাঁধ সরিয়ে নেয়, তবে রাজা-মহারাজাদের ওই দম্ভের প্রাসাদ ও দোলা এক নিমেষেই ধূলোয় মিশে যাবে।

সমাপনী

রাজত্ব গেছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে; প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে এসেছে বাস, ট্রেন ও বিলাসবহুল গাড়ি। ইতিহাসের নিয়মে পালকি আজ রাজপথ ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছে রবীন্দ্রকুঠি, জাতীয় জাদুঘর কিংবা সিনেমার ফ্রেমে। তবে মেঠো পথের ধূলোয় বেহারাদের পায়ের ছাপ আর “হুনহুনা” সুরটি আজও বাঙালি সংস্কৃতির স্মৃতিপটে এক চিরন্তন স্মারক হয়ে রয়ে গেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বাঙালি বিজ্ঞানী

নিউজ ডেস্ক

August 13, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ | প্রতিবেদক: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ

বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মানচিত্রে বাঙালি বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বখ্যাত নামগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশে এমন কিছু উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন, যাদের প্রাকৃতিক দূরদর্শিতা ও ল্যাবরেটরির আবিষ্কার বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বিজ্ঞান চর্চাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এমন ৫ জন কৃতী ব্যক্তিত্বের বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক: কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালী (১৯২২ – ২০১৭)

পূর্বে অনেকের ধারণায় “ড. হরিপদ সরকার” নামে বিভ্রান্তি থাকলেও, অতি ফলনশীল ‘হরি ধান’-এর আসল উদ্ভাবক কোনো ডিগ্রিধারী ডক্টর ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঝিনাইদহের সাধুহাটি ইউনিয়নের আসাননগর গ্রামের এক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন সাধারণ কৃষক।

আবিষ্কারের নেপথ্য ও বৈশিষ্ট্য:

  • প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection): ১৯৯২-১৯৯৬ সালের দিকে বিআর-১১ (BR-11) ধানের জমিতে একটি ব্যতিক্রমী ও শক্তিশালী ধানের গোছা লক্ষ্য করেন তিনি। সেই গোছার বীজ আলাদা করে সংরক্ষণ ও বপন করে তিনি এই নতুন জাতের বিকাশ ঘটান।
  • কম খরচে উচ্চ ফলন: এই ধানে সার ও কীটনাশক অনেক কম লাগে এবং বিঘা প্রতি ১৮ থেকে ২২ মণ ফলন পাওয়া যায়।
  • জাতীয় স্বীকৃতি: তাঁর এই অবদান এখন ষষ্ঠ ও নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষা পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়।

২. বৈজ্ঞানিক গবেষণার জনক’: ড. মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০ – ১৯৭৭)

জৈব রসায়নবিদ, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. কুদরাত-এ-খুদা দেশের স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্পায়নের পথ দেখিয়েছিলেন।

যুগান্তকারী অবদানসমূহ:

  • পারটেক্স (Partex) ও বিকল্প জ্বালানি: পাটকাঠি থেকে শক্ত বোর্ড (Partex) এবং পাট থেকে বায়ো-ফুয়েল বা বিকল্প পেট্রোল তৈরির সফল সূত্র আবিষ্কার করেন।
  • তেলাকুচা থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ: দেশীয় ঔষধি গাছ ‘তেলাকুচা’ থেকে ১২টি আলাদা রাসায়নিক যৌগ পৃথক করেন।
  • কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭৪): স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১ম থেকে ৮ ১ম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ঐতিহাসিক সুপারিশ করেন।

৩. ‘পাটের জাদুকর’: ড. মোবারক আহমদ খান (জন্ম: ১৯৫৮)

বিজেএমসি (BJMC)-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা ড. মোবারক আহমদ খান পাট ও পলিমার কেমিস্ট্রির ওপর গবেষণা করে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।

                  [ ড. মোবারক আহমদ খানের প্রধান উদ্ভাবন ]
                                     │
     ┌───────────────────────────────┼───────────────────────────────┐
     ▼                               ▼                               ▼
 [ সোনালী ব্যাগ ]               [ জুটিন (Jutin) ]            [ পাটের হেলমেট ও টাইলস ]
• পলিথিনের পচনশীল বিকল্প        • পারটেক্সের মতোই মজবুত        • মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য
• মাটিতে ৩-৪ মাসে মিশে যায়      হালকা ও মরিচারোধী টিন          হালকা ও বুলেটপ্রুফ কভার

৪. ‘সনো ফিল্টার’ ও আর্সেনিক মুক্তি: ড. আবুল হুসাম

কুষ্টিয়ার সন্তান অধ্যাপক ড. আবুল হুসাম ভূগর্ভস্থ পানির বিষাক্ত আর্সেনিক দূর করার জন্য ‘সনো ফিল্টার’ (SONO Filter) উদ্ভাবন করেন।

  • বৈশ্বিক প্রভাব: অত্যন্ত কম খরচে তৈরি এই ফিল্টারটি লাখ লাখ মানুষকে আর্সেনিকযুক্ত বিষাক্ত পানি থেকে রক্ষা করেছে।
  • আন্তর্জাতিক সম্মাননা: এই উদ্ভাবনের জন্য ২০০৭ সালে জাতীয় প্রকৌশল একাডেমি তাঁকে বিশ্বখ্যাত ‘গ্রেঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ’ ($1 Million) প্রদান করে।

৫. পেঁপে ও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন: ড. মাকসুদুল আলম (১৯৫৪ – ২০১৪)

ফরিদপুরের সন্তান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অণুজীব বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম জিনোম সিকোয়েন্সিং বা জীবনরহস্য উন্মোচনে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

  • ঐতিহাসিক সাফল্য: তিনি পরপর পেঁপে, রাবার এবং বাংলাদেশের প্রাণ ‘তোষা ও সাদা পাট’-এর জেনোম সিকোয়েন্স (Genome Sequence) সফলভাবে আবিষ্কার করেন।
  • কৃষি খাতে প্রভাব: এর ফলে রোগপ্রতিরোধী এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার মতো পাটের নতুন জাত উদ্ভাবনের পথ উন্মুক্ত হয়।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. বিসিএসআইআর অফিশিয়াল পেপার্স: ড. কুদরাত-এ-খুদার পেটেন্ট ও গবেষণা আর্কাইভ
  2. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS): কৃষক বিজ্ঞানী হরিপদ কাপালীর উদ্ভাবন ও হরি ধানের ব্যাকগ্রাউন্ড
  3. ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং (USA): ড. আবুল হুসামের সনো ফিল্টার ও গ্রেঞ্জার প্রাইজ রিকগনিশন
  4. বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (BJMC): ড. মোবারক আহমদ খানের সোনালী ব্যাগ প্রজেক্ট ফাইল

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

কাজী নজরুল

নিউজ ডেস্ক

August 12, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাক

“বিদ্রোহী” কিংবা “সাম্যবাদী” পরিচয়ের বাইরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন এতটাই বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় যে, সাধারণ কোনো ফ্রেমে তাঁকে বন্দি করা অসম্ভব। আমরা তাঁকে চিনি আমাদের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে, অনুধাবন করি তাঁর অগ্নিঝরা কবিতার শক্তি। কিন্তু পর্দার নেপথ্যে নারদমুনির বেশে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়, ফুটবল মাঠে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের হয়ে উল্লাস কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিনের নীরব মৌনব্রতের কথা কজনই বা জানেন?

ইতিহাসের পাতা ও নজরুল গবেষকদের অনুসন্ধানে বিদ্রোহী কবির জীবনের এমন কিছু চাঞ্চল্যকর ও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে, যা সাধারণ পাঠকের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে।

১. আইনি জটিলতার অবসান: এখন তিনি দাপ্তরিকভাবেও ‘জাতীয় কবি’

দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে গণমানুষের হৃদয়ে ও পাঠ্যপুস্তকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে পরিচিত থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট ছিল না। অবশেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি ঐতিহাসিক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

উক্ত গেজেটে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭২ সালের ২৪ মে (কবির সপরিবারে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে আগমনের দিন) থেকেই এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদাটি ভূতাপেক্ষভাবে (Retroactively) কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে নজরুলের জাতীয় কবির খেতাব সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের দাপ্তরিক অস্পষ্টতার চিরসংগ্রাম শেষ হয়।

২. রূপালি পর্দায় অল-রাউন্ডার নজরুল: পরিচালক, অভিনেতা ও ‘সুর ভাণ্ডারি’

১৯৩১ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কলকাতার চলচ্চিত্রে নজরুল একাধারে সফল অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন:

                  [ নজরুল: টকি সিনেমার স্বর্ণযুগ (১৯৩১-১৯৪২) ]
                                       │
     ┌─────────────────────────────────┼─────────────────────────────────┐
     ▼                                 ▼                                 ▼
 [ অভিনয় ]                        [ পরিচালনা ]                      [ সংগীত ]
• 'ধ্রুব' (১৯৩৪): নারদ চরিত্র     • সত্যেন্দ্রনাথের সাথে যৌথভাবে     • 'জামাই ষষ্ঠী'-তে সুর ভাণ্ডারি
• 'পাতালপুরী': খনি শ্রমিক           'ধ্রুব' চলচ্চিত্র পরিচালনা      • 'গোরা', 'বিদ্যাপতি', 'সাপুড়ে'
• 'হাল বাংলা': রসাত্মক চরিত্র    • 'বেঙ্গল টাইগার পিকচার্স'-এর প্রধান     ছবিতে বিখ্যাত কালজয়ী সুর
  • দেবর্ষি নারদ চরিত্রে আত্মপ্রকাশ: ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে নজরুল স্বয়ং ‘নারদ’ চরিত্রে অভিনয় করেন। কেবল অভিনয়ই নয়, এই ছবির ১৮টির মধ্যে ১৭টি গান তাঁর লেখা ছিল এবং তিনি নিজে ৪টি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।
  • সুর ভাণ্ডারি: ১৯৩১ সালে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’-তে সুরকার ও গায়কদের উচ্চারণ শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করায় তাঁকে সেসময় চলচ্চিত্র পাড়ায় ‘সুর ভাণ্ডারি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘গোরা’ (১৯৩৮) সিনেমার সংগীতেও তাঁর সুরের জাদুকরী ছোঁয়া ছিল।

৩. লাল-হলুদ ব্রিগেডের ইস্টবেঙ্গল সমর্থক

আজকের ফুটবল উন্মাদনার বহু আগেই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘ইস্টবেঙ্গল ক্লাব’-এর অন্ধ ভক্ত। মাঠে গিয়ে খেলা দেখার পাশাপাশি ১৯৩৪ সালে ইস্টবেঙ্গল দল যখন আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ওঠে, তখন প্রিয় ক্লাবের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উৎসাহ দিতে তিনি একটি উদ্দীপনামূলক গানও রচনা করেছিলেন।

৪. সুস্থ অবস্থাতেও বৃহস্পতিবারের ‘মৌনব্রত’

জীবনের শেষ ৩৪টি বছর নজরুল ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick’s Disease) নামের স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক কাটিয়েছেন। তবে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী ও কবি পরিবারের স্মৃতি থেকে জানা যায়—নজরুল যখন শতভাগ সুস্থ ও চঞ্চল ছিলেন, তখনও তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার অংশ হিসেবে সপ্তাহে একদিন (বৃহস্পতিবার) সম্পূর্ণ নীরব বা মৌনব্রত পালন করতেন। এই দিনটিতে তিনি কারো সাথে কথা বলতেন না।

৫. আসানসোলের রুটির দোকান থেকে ময়মনসিংহের স্কুল

আমাদের জাতীয় কবির প্রতিভা বিকাশের নেপথ্যে অন্যতম অবদান ছিল এক পুলিশ অফিসারের। আসানসোলের রুটির দোকানে কাজ করা কিশোর নজরুলের অসাধারণ মেধা লক্ষ্য করে দারোগা কাজী রফিজ উদ্দিন তাঁকে নিজ দায়িত্বে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে এনে ভর্তি করিয়ে দেন।

পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে নজরুল ‘৪৯তম বাঙালি ব্যাটালিয়ন’-এর সৈনিক হিসেবে করাচি সেনানিবাসে যোগ দেন এবং পদোন্নতি পেয়ে ‘হাবিলেদার’ পদে উন্নীত হন।

৬. রবীন্দ্রনাথের সেই ঐতিহাসিক অনশন ভাঙার বার্তা

১৯২৩ সালে রাজনৈতিক কারণে হুগলি জেলে বন্দী থাকাকালীন ব্রিটিশদের অন্যায়ের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৩৯ দিন আমরণ অনশন করেন। কবির সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন:

“GIVE UP HUNGER STRIKE. OUR LITERATURE CLAIMS YOU.”

ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ চরম হীনম্মন্যতার পরিচয় দিয়ে টেলিগ্রামটির গায়ে “Addressee not found” লিখে ফেরত পাঠায়। পরবর্তীতে মাতৃসম বিরজাসুন্দরী দেবী জেলে গিয়ে লেবুর রস খাইয়ে কবির অনশন ভাঙান।

৭. অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক

১৯২৮ সালে রচিত তাঁর ‘চল চল চল’ গানটি স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর অফিশিয়াল রণসঙ্গীত (National Marching Song) হিসেবে সংরক্ষিত। তিনি একদিকে যেমন লিখেছিলেন ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’, তেমনি অন্য হাতে সৃষ্টি করেছিলেন ৫০০-র বেশি কালজয়ী ‘শ্যামাসঙ্গীত’ ও ভজন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালন করতেই তিনি নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন দুই ধর্মের সংস্কৃতির সমন্বয়ে—’কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ’ এবং ‘কাজী অনিরুদ্ধ’।

সংগৃহীত তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  1. সরকারি প্রজ্ঞাপন দাপ্তরিক কপি: সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গেজেট (২৪ ডিসেম্বর ২০২৪)
  2. জাতীয় আর্কাইভ ও নজরুল ইনস্টিটিউট: কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্য কর্মসংকলন
  3. চলচ্চিত্র ইতিহাস গ্রন্থ: বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিবৃত্ত ও কাজী নজরুল ইসলাম (বাংলা একাডেমি প্রকাশনা)
  4. স্মৃতিগ্রন্থ: মোস্তফা জামান আব্বাসী লিখিত নজরুলের স্মৃতিকথা

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ভূ-রাজনৈতিক

নিউজ ডেস্ক

August 11, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ

বিশেষ প্রতিবেদন — জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামরিক অভ্যুত্থানের গোপন সমীকরণ এবং আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর অন্যতম। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (RAW) বা পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ISI)-এর মতো সংস্থাসমূহের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা একটি অনুমিত বাস্তবতা হলেও, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সুরক্ষার মূল দায়িত্বটি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ওপরই বর্তায়।

১. আঞ্চলিক গোয়েন্দা প্রভাব: অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতা

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব বিস্তারের মূল সুযোগ তৈরি হয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নতজানু কূটনীতির কারণে।

[ রাজনৈতিক কোন্দল ও ক্ষমতার মোহ ] ──► [ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ] ──► [ অনাকাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক প্রভাব ]

অভ্যন্তরীণ দায়বদ্ধতা

  • রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রবৃত্তি: ক্ষমতা ধরে রাখা বা ক্ষমতায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বিদেশি সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রবণতা দরকষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
  • গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা: নিরপেক্ষ জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের অভাবেই রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
  • দলীয় স্বার্থ বনাম জাতীয় নিরাপত্তা: সংকীর্ণ রাজনৈতিক লাভালাভকে দেশীয় সার্বভৌমত্বের চেয়ে গুরুত্ব দেওয়া বিদেশি সংস্থাকে সুযোগ করে দেয়।

কাঠামোগত ও ভূ-রাজনৈতিক দিক

  • কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান: ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণে ভারতের যে কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে, তা মোকাবেলায় সমতার ভিত্তিতে শক্তিশালী কূটনীতির অভয়াব দেখা গেছে।

২. প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড: তথ্য, বিতর্ক ও অনুসন্ধানের বর্তমান চিত্র

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে চার দশক ধরে নানা রাজনৈতিক আলোচনা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বিদ্যমান রয়েছে।

                      [ ১৯৮১: জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড ]
                                     │
      ┌──────────────────────────────┼──────────────────────────────┐
      ▼                              ▼                              ▼
[ আইনি ও বিচারিক নথি ]      [ রাজনৈতিক বিতর্ক ও তত্ত্ব ]   [ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ]
• জিওসি মঞ্জুরের নেতৃত্ব      • 'র' (RAW)-এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ • ফারাক্কা ও তালপট্টি বিরোধ
• কোর্ট মার্শিয়ালে সাজা       • সুব্রমনিয়াম স্বামীর বক্তব্য   • নিরপেক্ষ দলিলের অভাব

ক. প্রাতিষ্ঠানিক ও আদালতের নথিপত্র

  • সেনা কর্মকর্তাদের অসন্তোষ: সরকারি তথ্য ও বিচারিক নথির তথ্য অনুসারে, চট্টগ্রাম ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে সেনাসদস্যদের একটি অসন্তুষ্ট অংশ এই বিদ্রোহ পরিচালনা করে।
  • কোর্ট মার্শালের বিচার: ঘটনার পর দ্রুত গঠিত সামরিক আদালতের (Court Martial) বিচারে অভিযুক্তদের সাজা কার্যকর করা হয়।

খ. ‘র’ (RAW)-এর সম্পৃক্ততা সংক্রান্ত দাবি ও নিরপেক্ষতা বিশ্লেষণ

  • রাজনৈতিক দলীয় অভিযোগ: জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি-র শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘র’-এর মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়।
  • সুব্রমনিয়াম স্বামীর বক্তব্য: ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুব্রমনিয়াম স্বামী এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে ‘র’ প্রধান আর. এন. কাও এবং শঙ্করন নায়ার এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে ভারত সরকার এই বক্তব্য কখনোই স্বীকার করেনি এবং এটিকে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • প্রমাণের সীমাবদ্ধতা: ঐতিহাসিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি সংস্থার পরোক্ষ উসকানি বা গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে জল্পনা থাকলেও জনসমক্ষে কোনো অকাট্য বা প্রমাণিত দাপ্তরিক প্রমাণ আসেনি।

৩. বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া, তড়িঘড়ি বিচার ও মঞ্জুর হত্যা মামলা

জিয়া হত্যার পর ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচনে গঠিত পদক্ষেপ এবং পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

বিচার প্রক্রিয়া / ঘটনাবিস্তারিত বিবরণ ও বিতর্ক
বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনবিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে কমিশন গঠিত হলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। কেবল একটি সংক্ষিপ্ত ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশ করা হয়।
ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল১৯৮১ সালের ১০ জুন মেজর জেনারেল আবদুর রহমানের নেতৃত্বে বিচারে ৩১ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা১ জুন ১৯৮১ সালে বন্দি অবস্থায় মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৫ সালে দায়ের করা এই হত্যা মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ প্রধান আসামি হলেও রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতায় দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে বিচারাধীন থাকে।

৪. রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সামরিক ক্ষমতা দখল

প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বেসামরিক শাসন উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করেন।

[ জিয়াউর রহমান নিহত (মে ১৯৮১) ]
               │
               ▼
[ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের জয় (নভেম্বর ১৯৮১) ]
               │
               ▼
[ সেনাবাহিনীর চাপের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তর (১৯৮১-৮২) ]
               │
               ▼
[ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থান ও শাসন জারি (মার্চ ১৯৮২) ]

১. পেশাদার সিভিল শাসনের ওপর চাপ: নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার সরকারের ওপর সেনাপ্রধান এরশাদ প্রশাসনে সেনাবাহিনীর “সরাসরি অংশীদারিত্বের” দাবি চাপিয়ে দেন।

২. ১৯৮২ সালের অভ্যুত্থান: ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ, রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয় সংবিধান স্থগিত করে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন।

বিশ্লেষকদের একটি বৃহৎ অংশের মতে, ১৯৮১ সালে দ্রুততার সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার ও ফাঁসি মূলত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোকে নিঃশর্তভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এরশাদের একটি পরিকল্পিত কৌশল ছিল।

সারসংক্ষেপ

ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক শক্তি বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময়ই নিজেদের জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ অনুসরণে সচেষ্ট থাকে। তবে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সচেতনতা, বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং পেশাদার সেনা-বেসামরিক সম্পর্ক বজায় রাখাই হলো যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য বৈদেশীক প্রভাবমুক্ত থাকার একমাত্র টেকসই পথ।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ