স্বাস্থ্য
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
শীতের শুরুতেই কেন হঠাৎ বাড়ে ছত্রাক সংক্রমণ?
শীতকাল বাংলায় শুধু ঠান্ডা-কাশির মৌসুম নয়—এই সময়ে ছত্রাক সংক্রমণ (ফাঙ্গাল ইনফেকশন) চোখে পড়ার মতো বাড়তে থাকে। ত্বক শুকিয়ে যাওয়া, আর্দ্রতার তারতম্য, মোজাজুতা বেশি সময় পরা, রোদের কম উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ক্যানডিডাসহ বিভিন্ন ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বছরে ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যুর পেছনে দায়ী ফাঙ্গাল সংক্রমণ। গবেষকরা বলছেন—ক্যানডিডাইসিস এখন শুধু ত্বকের সমস্যা নয়, তা গুরুতর সংক্রমণ থেকে সেপসিস ও অঙ্গ বিকলতার কারণও হতে পারে।
কতটা মারাত্মক ক্যানডিডা সংক্রমণ?
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন—শরীরের একটি ছোট্ট ঘা, ফোঁড়া বা তিলের মতো দাগও গভীর ছত্রাক সংক্রমণের সূচনা হতে পারে। ২০২2–24 সালের গ্লোবাল ডেটা দেখায়, ছত্রাক সংক্রমণের হার আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বছরে বিশ্বে মোট মৃত্যুর ৬.৮% কেবল ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে ঘটে।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ক্যানডিডা।
- প্রতি বছর অন্তত ১৫ লাখ মানুষ ক্যানডিডা সংক্রমণে আক্রান্ত হন।
- রক্ত পরীক্ষায় ক্যানডিডার মাত্র ৪০% কেস শনাক্ত হয়।
- চিকিৎসা দেরি হলে ইনফেকশন রক্তে ছড়িয়ে সেপসিস তৈরি করতে পারে, যা মৃত্যুঝুঁকি একাধিকগুণ বাড়ায়।
কীভাবে হয় ক্যানডিডা সংক্রমণ?
বিজ্ঞানীরা বলছেন—ক্যানডিডা আসলে আমাদের শরীরেই অল্প পরিমাণে উপস্থিত থাকে। এটি মুখ, ত্বক, অন্ত্রসহ বিভিন্ন জায়গায় নির্দোষভাবে বসবাস করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন—
- প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়
- শরীরে জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হয়
- অ্যান্টিবায়োটিক বেশি ব্যবহার করা হয়
- দীর্ঘদিন আর্দ্রতা-আবদ্ধ পরিবেশে থাকতে হয়
এই পরিস্থিতিতে ক্যানডিডার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে সংক্রমণ তৈরি করে।
সংক্রমণ হতে পারে—
- মুখ ও জিভে
- গলা ও কাঁধে
- ত্বকে
- যৌনাঙ্গে
- নখে
বাড়াবাড়ি হলে রক্তের মাধ্যমে অস্থি, হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্কেও ছড়াতে পারে। এটিকেই বলা হয় ইনভেসিভ ক্যানডিডাইসিস, যা জীবন-সংশয়ী।
কোন লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন?
প্রথমদিকে লক্ষণগুলো হয় খুব সাধারণ—তাই অনেকেই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এগুলো দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে।
- আক্রান্ত স্থানে তীব্র চুলকানি
- ত্বক লাল হয়ে ফোলা
- ছোট ছোট ফুসকুড়ি বা ফোস্কা
- জায়গাটা ছুঁলে ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
- সাদা আবরণ (বিশেষত মুখ ও জিভে)
- যৌনাঙ্গে পোড়া অনুভূতি বা স্রাব
এই উপসর্গগুলি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
সবাই ক্যানডিডায় আক্রান্ত হতে পারে, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
১) ডায়াবেটিস রোগী
উচ্চ রক্তে-চিনি ছত্রাক বৃদ্ধির আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তাই এরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
২) কিডনি রোগী ও ডায়ালাইসিসে থাকা ব্যক্তিরা
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ইনফেকশন দ্রুত রক্তে ছড়াতে পারে।
৩) সদ্যোজাত শিশু
ইমিউন সিস্টেম গড়ে ওঠার আগেই মুখে থ্রাশ বা ত্বকে ক্যানডিডা দেখা দিতে পারে।
৪) বয়স্ক নাগরিক
দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতার কারণে সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে।
৫) সার্জারি করা রোগী / ক্যাথিটার ব্যবহারকারী
অপারেশন বা ক্যাথিটারের মাধ্যমে ক্যানডিডা দেহে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়ে।
কানাডিডার সংক্রমণ বাড়ে শীতে কেন?—বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে শীতকালে ছত্রাক সংক্রমণ বাড়ার কয়েকটি কারণ:
- লোকজন কম গোসল করে, ত্বক শুকিয়ে যায়
- মোজা ও জুতা ভেজা বা ঘেমে থাকা অবস্থায় ব্যবহার করা হয়
- রোদ কম থাকায় আর্দ্রতা জমে
- শীতের পোশাক ধোয়া হয় কম, ঘাম থেকে ব্যাকটেরিয়া–ফাঙ্গাস বৃদ্ধি পায়
- ডায়াবেটিস রোগীদের শীতে রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা বেশি
এই সব মিলিয়ে শীত হলো ফাঙ্গাল ইনফেকশনের পিক সিজন।
কীভাবে বাঁচবেন?—৩টি মূল নিয়ম
✔ ত্বক শুকনো রাখুন
ঘাম জমে থাকা মোজা, জুতা, ব্রা বা টাইট পোশাক বেশি সময় পরবেন না।
✔ অ্যান্টিবায়োটিক কম নিন
অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ক্যানডিডার প্রসার বাড়ায়।
✔ ডায়াবেটিস রোগীরা রক্তে-চিনির নিয়ন্ত্রণে রাখুন
চিনি বেশি হলে ছত্রাক দ্রুত বাড়ে।
সূত্র
– WHO Global Fungal Infection Burden 2023
– CDC: Invasive Candidiasis Epidemiology
– Lancet Infectious Diseases Review on Global Fungal Mortality
– International Mycology Society: Winter Fungal Risk Factors
– বাংলাদেশে ফাঙ্গাল সংক্রমণের উপর জাতীয় গবেষণা প্রতিবেদন (ICDDR,B)
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
টিপস অ্যান্ড ট্রিক্স
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
দেওয়ালে বা সিলিংয়ে ঝুলে থাকা টিকটিকির লেজ খসে পড়া কিংবা কেটে যাওয়া লেজের লাফালাফি করা কেবল একটি অবাক করা দৃশ্যই নয়, এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। আবার অন্যদিকে, ঘরে টিকটিকির উপদ্রব বাড়লে তা আমাদের স্বাস্থ্য ও খাবারের সুরক্ষার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা টিকটিকির লেজ খসে পড়ার আসল রহস্য, প্রাকৃতিক উপায়ে ঘর থেকে টিকটিকি তাড়ানোর পদ্ধতি এবং টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
১. টিকটিকির লেজ খসে পড়ার বৈজ্ঞানিক কারণ (Autotomy)

বিজ্ঞানের ভাষায় টিকটিকির আত্মরক্ষার্থের জন্য নিজ থেকে অঙ্গ বিচ্ছিন্ন করার এই প্রাকৃতিক ক্ষমতাকে ‘অটোটমি’ (Autotomy) বা ‘স্ব-অঙ্গচ্ছেদ’ বলা হয়।
[ শিকারি প্রাণীর আক্রমণ (বিড়াল/পাখি) ]
│
▼
[ লেজের কশেরুকার ফাটল অংশে (Fracture Plane) চাপ ]
│
▼
[ পেশির দ্রুত স্বয়ংক্রিয় সংকোচন (রক্তপাতহীন বিচ্ছেদ) ]
│
▼
[ বিচ্ছিন্ন লেজের স্বয়ংক্রিয় স্পন্দন ও শিকারি বিভ্রান্ত ]
│
▼
[ নিরাপদ পলায়ন ও কিছুদিন পর তরুণাস্থির (Cartilage) লেজ গজানো ]
প্রধান কারণসমূহ:
- শিকারির দৃষ্টি সরানো: বিড়াল, পাখি বা অন্য কোনো প্রাণী টিকটিকির লেজ ধরে ফেললে, জীবন বাঁচাতে টিকটিকি লেজটি খসিয়ে দেয়।
- বিচ্ছিন্ন লেজের স্পন্দন: স্নায়ুতন্ত্রের অবশিষ্টাংশ (Spinal Cord Motor Centers)-এর কারণে লেজটি খসে পড়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ মাটিতে পড়ে লাফালাফি করতে থাকে। ফলে শিকারি প্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে সেই লেজের দিকে নজর দেয় এবং টিকটিকিটি চট করে পালিয়ে যায়।
- বিশেষ কশেরুকা ও রক্তপাত না হওয়া: টিকটিকির লেজের মেরুদণ্ডে নির্দিষ্ট কিছু ‘ফ্র্যাকচার প্লেন’ (Fracture Planes) বা ফাটল থাকে, যা খুব হালকা সংযোগযুক্ত। লেজ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথেই ধমনী ও পেশিগুলো বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রক্তপাত হয় না।
- পুনরায় লেজ গজানো: লেজ খসে পড়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন লেজ গাজায়, তবে এটি হাড় দিয়ে তৈরি না হয়ে প্রধানত তরুণাস্থি (Cartilage) দিয়ে গঠিত হয়।
২. ঘর থেকে প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি তাড়ানোর উপায়

টিকটিকি অতিরিক্ত ঠান্ডা এবং কোনো কোনো উপাদানের তীব্র বা ঝাঁঝালো গন্ধ সহ্য করতে পারে না। কেমিক্যাল ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে টিকটিকি দূর করার সেরা পদ্ধতিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ক) তীব্র গন্ধের ব্যবহার
- ডিমের খোসা: ডিমের গন্ধকে টিকটিকি ভয় পায়। ঘরের কোণে বা ভেন্টিলেটরে ডিমের ফাঁকা খোসা রেখে দিলে সে অঞ্চল এড়িয়ে চলে।
- রসুন ও পেঁয়াজের রস: রসুনের কোয়া কোণায় ঝুলিয়ে রাখা কিংবা পেঁয়াজের রস পানিতে মিশিয়ে দেওয়ালে স্প্রে করলে এর তীব্র গন্ধে টিকটিকি পালিয়ে যায়।
- গোলমরিচের স্প্রে: পানিতে গোলমরিচ বা লাল মরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে স্প্রে বোতলে নিয়ে দেওয়াল ও আসবাবপত্রের পেছনে ছিটান।
- ন্যাপথলিন বল: আলমারির নিচে, ড্রয়ার বা কোণে ন্যাপথলিন রেখে দিলে টিকটিকির আগমন কমে যায়।
খ) পরিবেশগত পরিবর্তন
- বরফ ঠান্ডা পানি: টিকটিকি শীতল রক্তের প্রাণী। এর গায়ে হঠাৎ বরফ ঠান্ডা পানি স্প্রে করলে তা সাময়িকভাবে অবশ হয়ে পড়ে, যা সহজে ঘর থেকে বের করা সম্ভব হয়।
- পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রণ: ঘরে লাইটের আলো কমানো এবং ছোট পোকা নিয়ন্ত্রণ করলে খাবারের অভাবে টিকটিকি নিজে থেকেই চলে যায়।
- তাপমাত্রা কমানো: এসি থাকলে ঘরের তাপমাত্রা ২৫° সেলসিয়াসের নিচে রাখলে টিকটিকি টিকতে পারে না।
৩. টিকটিকি কামড়ালে বা খাবারে পড়লে করণীয়

টিকটিকি বিষাক্ত প্রাণী নয় এবং সাধারণত কামড়ায় না। তবে এদের লালা, মলমূত্র ও ত্বকে সালমোনেলা (Salmonella) নামক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানবদেহে প্রবেশ করলে তীব্র পেটব্যথা ও ফুড পয়েন্টনিং হতে পারে।
[ টিকটিকির স্পর্শ বা কামড় ]
│
├───► ১. অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ও হালকা গরম পানিতে ধোয়া (৫-১০ মিনিট)
│
├───► ২. অ্যান্টিসেপটিক মলম (Dettol/Savlon/Neomycin) ব্যবহার
│
└───► ৩. প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টিটেনাস (Toxoid) ইনজেকশন নেওয়া
ক) টিকটিকি কামড়ালে পদক্ষেপ:
- ক্ষতস্থান ধোয়া: গরম পানি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান দিয়ে ক্ষতস্থানটি অন্তত ৫-১০ মিনিট ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
- অ্যান্টিসেপটিক দেওয়া: ধোয়ার পর স্থানটি শুকিয়ে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বা লিকুইড দিন এবং পরিষ্কার ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখুন।
- টিটেনাস শট: ক্ষত গভীর হলে এবং গত ৫ বছরে টিটেনাস নেওয়া না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী টিটেনাস শট নিন।
খ) খাবারে টিকটিকি পড়লে বা মুখ দিলে:
- খাবার ফেলে দিন: কোনো খাবারে টিকটিকি মুখ দিলে বা মরে পড়ে থাকলে সেটি কখনোই খাওয়া যাবে না, খাবারটি পুরোপুরি ফেলে দিতে হবে।
- বাসনপত্র পরিচ্ছন্ন করা: সংশ্লিষ্ট পাত্রটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
- অসাবধানতাবশত খেয়ে ফেললে: তীব্র পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া বা জ্বর শুরু হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
উপসংহার
টিকটিকির লেজ খসে পড়া প্রকৃতিতে বিবর্তিত একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক আত্মরক্ষা কৌশল। বাসা-বাড়িতে একে মারার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় অনুসরণ করা যেমন নিরাপদ, তেমনি খাবারের ক্ষেত্রে টিকটিকির ব্যাকটেরিয়া থেকে সতর্ক থাকাও অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র (References)
- Journal of Herpetology: Mechanisms and Physiology of Tail Autotomy in Reptiles.
- Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Reptiles and Salmonella Risk Guidelines.
- Biological Sciences Study Reports: Natural Repellents and Environmental Control for Domestic Geckos.
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ
আমাদের দেশে গরম, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ত্বকের যেসব চর্মরোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সাধারণ চুলকানি এবং দাউদ বা রিংওয়ার্ম (Ringworm)। শরীরের চ্যাপ্টা ও ঢাকা জায়গাগুলোতে (যেমন—কুঁচকি, বগল, কোমর ও পায়ের ভাজ) এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় সচেতন না হলে কিংবা ভুল চিকিৎসার আশ্রয় নিলে দাউদ ক্রমশ পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

দাউদ কী এবং কেন হয়?
অনেকে দাউদকে পোকা বা কৃমিজনিত সংক্রমণ মনে করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এটি মূলত ‘ডার্মাটোফাইট’ (Dermatophytes) নামক এক প্রকার ছত্রাকজনিত সংক্রমণ (Fungal Infection)। এই ছত্রাকগুলো মানুষের ত্বকের মৃত কোষ, চুল এবং নখে থাকা ‘কেরাটিন’ নামক প্রোটিন খেয়ে বেঁচে থাকে।
সংক্রমণের প্রধান কারণ ও ঝুঁকি:
- ঘাম ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ: শরীরের চাপা ভাঁজে ঘাম জমে থাকা এবং ত্বক ঠিকমতো পরিষ্কার ও শুকনো না রাখা।
- সরাসরি সংক্রামিত হওয়া: আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে, জামাকাপড়, সাবান, চিরুনি বা অন্তর্বাস ব্যবহার করলে।
- গৃহপালিত পশুর মাধ্যমে: সংক্রামিত কুকুর বা বিড়ালের সংস্পর্শে আসা।
- সংবেদনশীল ত্বক: যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
প্রধান লক্ষণসমূহ
- গোল চাকার দাগ: ত্বকের ওপর গোল চাকার মতো লালচে আংটির আকার নেয়, যার চারপাশ কিছুটা উঁচু ও খসখসে হয়।
- তীব্র চুলকানি: আক্রান্ত স্থানে প্রচণ্ড চুলকানি ও জ্বালা-পোড়া অনুভূত হয়।
- আংশিক চামড়া ওঠা: আক্রান্ত স্থানে খুশকির মতো আবরণ বা ছোট ছোট ফোসকা পড়তে পারে।
দাউদ ও চুলকানির বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (CDC)-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী দাউদের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়:
১. টপিকাল অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম (বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য)

সংক্রমণ শরীরের সীমিত অংশে থাকলে নিম্নের ওভার-দ্য-কাউন্টার (OTC) অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিমগুলো দিনে ২ বার ব্যবহার করা যায় (লক্ষণ কমে গেলেও ডাক্তারদের পরামর্শে অন্তত ২-৪ সপ্তাহ ব্যবহার চালিয়ে যেতে হয়):
- ক্লোট্রিমাজোল (Clotrimazole 1%)
- টারবিনাফাইন (Terbinafine 1%)
- কেটোকোনাজল (Ketoconazole 2%)
২. ওরাল অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ (গুরুতর বা মাথার ত্বকের জন্য)
সংক্রমণ যদি নখে বা মাথার ত্বকে (Tinea Capitis) ছড়ায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টারবিনাফাইন বা ইট্রাকোনাজল (Itraconazole)-এর মতো মুখে খাওয়ার ওষুধ ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত গ্রহণ করতে হতে পারে।
বিশেষ সতর্কবার্তা (CDC নির্দেশিত): দাউদের চুলকানি কমাতে ভুলও কোনো স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম (Steroid Cream) ব্যবহার করবেন না। স্টেরয়েড সাময়িকভাবে চুলকানি কমালেও ত্বকের স্থানীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়; ফলে ছত্রাক আরও দ্রুত ও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তাৎক্ষণিক উপশমে কার্যকর ঘরোয়া যত্ন
- অ্যালোভেরা জেল: তাজা অ্যালোভেরার প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক উপাদান চুলকানি ও জ্বালাপোড়া দ্রুত কমায়।
- কাঁচা হলুদ ও রসুন: কাঁচা হলুদের কার্কুমিন এবং রসুনের অ্যালিসিন পেস্ট করে আক্রান্ত স্থানে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেললে তা ফাঙ্গাস প্রতিরোধে সাহায্য করে।
- কোল্ড কম্প্রেস (বরফ সেঁক): চুলকানি মাত্রাতিরিক্ত হলে একটি পরিষ্কার সুতি ভেজা কাপড় বা আইস প্যাক দিয়ে চেপে ধরলে চুলকানি প্রশমিত হয়।
- ক্যালামাইন লোশন: সাধারণ চুলকানির ক্ষেত্রে ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শে ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে।
চিরতরে মুক্তি ও প্রতিরোধে জীবনযাত্রার পরিবর্তন

১. ত্বক পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখুন: গোসল বা ব্যায়ামের পর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ ভালোভাবে মুছে শুকনো রাখুন।
২. সুতির ঢিলেঢালা পোশাক: আঁটসাঁট জিন্স বা সিন্থেটিক কাপড় এড়িয়ে সুতি ও বাতাস চলাচল করতে পারে এমন পোশাক পরুন।
৩. ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার না করা: গামছা, তোয়ালে, চিরুনি, সাবান ও জামাকাপড় পরিবারের অন্য কারো সাথে শেয়ার করা বন্ধ করুন।
৪. নখ ছোট রাখা: চুলকানোর সময় নখের মাধ্যমে ফাঙ্গাস যেন শরীরের অন্য অংশে না ছড়ায়, তাই নখ ছোট রাখুন।
তথ্যসূত্র (Sources)
- World Health Organization (WHO): Ringworm (Tinea) Fact Sheet
- Centers for Disease Control and Prevention (CDC): Treatment of Ringworm Guidelines
- National Center for Biotechnology Information (NCBI) – StatPearls: Tinea Corporis Clinical Treatment
- জাতীয় শিক্ষক বাতায়ন (বাংলাদেশ সরকারি ওয়েব পোর্টাল): দাদের সতর্কীকরণ ও প্রতিরোধ নির্দেশিকা
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
দাঁতে তীব্র ব্যথা বা কালো গর্ত দেখা দিলে আমাদের দেশে প্রচলিত ভাষায় বলা হয় ‘দাঁতে পোকা লেগেছে’। এমনকি তামাকের ধোঁয়া বা গাছের বীজ দিয়ে কানের কাছ থেকে ‘পোকা বের করার’ মতো নানাবিধ কবিরাজি ও প্রতারণামূলক অপচিকিৎসার কথাও শোনা যায়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়—দাঁতে পোকা বা কীটের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
এটিকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলা হয় ডেন্টাল ক্যারিজ (Dental Caries) বা দাঁতের ক্ষয়রোগ। সঠিকভাবে না জানার কারণে অনেকেই অপচিকিৎসার শিকার হয়ে অকালে দাঁত হারান।
১. ‘দাঁতে পোকা’ বা ডেন্টাল ক্যারিজ কেন হয়?

আমাদের মুখে সবসময় অসংখ্য অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া থাকে। যখন আমরা মিষ্টি, শর্করা (ভাত, রুটি, চিপস) বা আঠালো খাবার খাই, তখন দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা সেই খাবারের সাথে ব্যাকটেরিয়াগুলো বিক্রিয়া করে।
[মিষ্টি/শর্করা খাবার] + [মুখের ব্যাকটেরিয়া] ➔ [ক্ষতিকর অ্যাসিড তৈরি] ➔ [এনামেল ক্ষয়] ➔ [ক্যাভিটি/গর্ত]
- অ্যাসিড তৈরি: ব্যাকটেরিয়া খাবার হজম করার সময় এক ধরনের ক্ষতিকর অ্যাসিড তৈরি করে।
- এনামেল ক্ষয়: এই অ্যাসিড দাঁতের শক্ত বাইরের স্তর বা ‘এনামেল’ গলিয়ে ফেলে।
- ক্যাভিটি বা গর্ত: এনামেল ক্ষয়ে ডেন্টিন ও ভেতরে দাঁতের নরম রগ (Pulp)-এ পৌঁছালে তীব্র ব্যথা ও শিরশির ভাব শুরু হয়।
প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম বৈজ্ঞানিক সত্য

| প্রচলিত ভুল ধারণা | বৈজ্ঞানিক সত্য |
| দাঁতের ভেতর সত্যি সত্যি জীবন্ত পোকা থাকে। | এটি ব্যাকটেরিয়া ও অ্যাসিডের কারণে তৈরি হওয়া স্রেফ একটি গর্ত। |
| ধোঁয়া বা বাষ্প দিলে পোকা বের হয়ে আসে। | এটি সম্পূর্ণ ভণ্ডামি ও প্রতারণা। মুখে সুতা বা বীজ রেখে এমন ভেলকি দেখানো হয়। |
| শুধু মিষ্টি খেলেই দাঁত নষ্ট হয়। | ভাত, রুটি বা প্রসেসড কার্বোহাইড্রেট দাঁতে আটকে থাকলেও ক্যারিজ হতে পারে। |
| দুধের দাঁত ক্ষয়ে গেলে সমস্যা নেই, নতুন তো আসবেই। | দুধের দাঁতের ইনফেকশন মাড়ির নিচে থাকা স্থায়ী দাঁতের কুঁড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। |
২. সঠিক ও আধুনিক ডেন্টাল চিকিৎসা
ডেন্টিস্টরা দাঁতের ক্ষয়ের গভীরতার ওপর ভিত্তি করে ৩টি মূল চিকিৎসা করে থাকেন:
- ডেন্টাল ফিলিং (Dental Filling): ইনফেকশন রগ পর্যন্ত না পৌঁছালে আক্রান্ত অংশ পরিষ্কার করে দাঁতের রঙের কম্পোজিট বা জিআইসি দিয়ে ভরাট করা হয়।
- রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট (Root Canal Treatment – RCT): ইনফেকশন রগ বা পাল্পে পৌঁছালে রুট ক্যানেল করে সংক্রামিত রগ পরিষ্কার করে কৃত্রিম উপাদানে সিল করে দেওয়া হয়। এতে দাঁত না ফেলে বাঁচানো যায়।
- ডেন্টাল ক্রাউন বা ক্যাপ (Dental Crown): রুট ক্যানেল করার পর দুর্বল দাঁতের ওপর মেটাল, পোর্সেলিন বা জিরকোনিয়ার ক্যাপ পরানো হয় যেন দাঁতটি ভেঙে না যায়।
৩. বাংলাদেশে রুট ক্যানেল ও ক্যাপের খরচ (২০২৬ আপডেট)
২০২৬ সালের মান অনুযায়ী বাংলাদেশে রুট ক্যানেল ও ক্যাপের আনুমানিক খরচ নিচে দেওয়া হলো:
- সরকারি ডেন্টাল হাসপাতাল (যেমন: ঢাকা ডেন্টাল): ৳৫০০ – ৳১,৫০০ টাকা (অত্যন্ত সাশ্রয়ী)।
- সাধারণ ডেন্টাল ক্লিনিক: ৳২,৫০০ – ৳৪,০০০ টাকা (প্রতি দাঁত)।
- আধুনিক ও কর্পোরেট ক্লিনিক: ৳৫,০০০ – ৳১০,০০০+ টাকা।
- দাঁতের ক্যাপ/ক্রাউনের খরচ (আলাদা): উপাদানভেদে পিস প্রতি ৳৩,০০০ থেকে ৳১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
মনে রাখবেন: মাড়ির পেছনের দাঁতে ৩–৪টি ক্যানেল/রগ থাকে বলে সামনের দাঁতের চেয়ে পেছনের দাঁতের রুট ক্যানেল খরচ কিছুটা বেশি হয়।
৪. আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (ADA) অনুমোদিত ব্রাশ করার সঠিক নিয়ম
ভুল নিয়মে জোরাজুরি করে ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যায় এবং মাড়ি নিচে নেমে যায়।
৪৫-ডিগ্রি কৌশল (The 45-Degree Technique)
- কোণ তৈরি: ব্রাশটিকে দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে ৪৫ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে ধরুন।
- ঘূর্ণন গতি: সোজা আগে-পিছে না ঘষে আলতো বৃত্তাকারে (Circular motion) এবং মাড়ি থেকে দাঁতের মাথার দিকে এনে ব্রাশ করুন।
- ভেতরের অংশ: সামনের দাঁতের ভেতরের অংশ পরিষ্কার করতে ব্রাশ খাড়া বা উলম্বভাবে (Vertical) ধরে ওপর-নিচ করুন।
- জিহ্বা পরিষ্কার: ব্রাশ শেষে আলতো করে জিহ্বা পরিষ্কার করুন, যা মুখের দুর্গন্ধ দূর করবে।
৫. ব্রাশ ও টুথপেস্ট নির্বাচনের গাইডলাইন
- ব্রাশের ধরন: সবসময় নরম (Soft/Ultra-soft) ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ নির্বাচন করুন। শক্ত ব্রাশ এনামেলের ক্ষতি করে।
- টুথপেস্ট: অবশ্যই ফ্লোরাইডযুক্ত (Fluoride) পেস্ট ব্যবহার করুন, যা দাঁতের এনামেল পুনঃগঠনে সাহায্য করে।
- পরিবর্তন: প্রতি ৩ মাস পর পর অথবা ব্রাশের ব্রিসল বাঁকা হয়ে গেলে দ্রুত ব্রাশ বদলে ফেলুন।
- সময়সূচি: দিনে দুইবার—সকালে নাস্তার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত ২ মিনিট ধরে ব্রাশ করুন।
বিশেষ পরামর্শ: দাঁতে ব্যথা বা ডেন্টাল সমস্যা দেখা দিলে কবিরাজি প্রতারণায় না পড়ে সরাসরি একজন বিডিএস (BDS) ডিগ্রিধারী রেজিস্টার্ড ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন।



