ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্যের এক নিবেদিত প্রাণ
আজ, ৩ নভেম্বর, বাংলার সাহিত্য ও গবেষণার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম, আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন-এর শুভ জন্মতিথি। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ এবং বাংলা লোকসাহিত্য উদ্ধার ও সংরক্ষণের মহান কারিগর। তিনি কেবল গ্রন্থ প্রণয়ন করেননি, বরং প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য ও সাহিত্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক নতুন দিগন্ত দিয়েছে।
১. একজন পথিকৃৎ গবেষকের উত্থান
দীনেশচন্দ্র সেনের প্রাথমিক জীবন শুরু হয় সাধারণ পরিবেশে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামে এবং জন্ম মাতুলালয়ে, মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন মানিকগঞ্জ আদালতের উকিল।
- শিক্ষাজীবন: জগন্নাথ স্কুল থেকে এনট্রান্স (১৮৮২) এবং ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ (১৮৮৫) পাসের পর, বহিরাগত ছাত্র হিসেবে তিনি ১৮৮৯ সালে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
- কর্মজীবনের সূচনা: ১৮৮৭ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পরবর্তীতে কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) ও ভিক্টোরিয়া স্কুলের (১৮৯০) প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
২. গবেষণায় দীনেশচন্দ্রের অক্ষয় কীর্তি
কিশোর বয়স থেকেই দীনেশচন্দ্র সেনের সাহিত্য-অনুরাগ এবং দেশের সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমতা ছিল, যা তাঁকে অতীতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
ক. ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ (১৮৯৬)
কুমিল্লায় অবস্থানকালে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রাচীন বাংলার পুথি সংগ্রহ শুরু করেন। এই ব্যাপক শ্রমসাধ্য কাজের ফসল হিসেবে ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আকরগ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পথিকৃৎ এই সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক গবেষণাগ্রন্থটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করে। এ অসাধারণ গ্রন্থের মাধ্যমে দীনেশচন্দ্র সেন এ বিষয়ে ‘পথিকৃৎ’-এর সম্মান ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি লাভ করেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সমকালের পণ্ডিতদের প্রশংসা অর্জন করেন।
খ. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯০৫-১৯৩২)
দীনেশচন্দ্রের মেধা ও গবেষণার গভীরতা তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
- পরীক্ষক ও রীডার: উপাচার্য স্যর আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহবানে তিনি প্রথমে বিএ পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের পরীক্ষক (১৯০৫) এবং পরে রীডার পদে (১৯০৯) নিযুক্তি লাভ করেন।
- ‘History of Bengali Language and Literature’ (১৯১১): এই গ্রন্থটি তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এর জন্য তিনি পাশ্চাত্যের গবেষক ও সাহিত্য-সমালোচকদের কাছ থেকে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেন।
- বিভাগীয় প্রধান: ১৯২০ সালে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ নামে একটি নতুন বিভাগ খোলা হয়, তখন তিনি এর প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৩২ সালে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি যোগ্যতার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করেন।
গ. লোকসাহিত্য উদ্ধার: মৈমনসিংহ-গীতিকা
দীনেশচন্দ্র সেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো বিলুপ্তপ্রায় লোকসাহিত্য উদ্ধার ও সংরক্ষণ।
- মৈমনসিংহ-গীতিকা ও পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা: ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলোশিপ’ পেয়ে মৈমনসিংহ-গীতিকাসহ পূবর্ববঙ্গ-গীতিকা (চার খন্ড, ১৯২৩-১৯৩২) সংকলন ও সম্পাদনা করেন।
- বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন: এর ইংরেজি ভাষ্য ‘Eastern Bengal Ballads’ (চার খন্ড, ১৯২৩-১৯৩২) প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যকে বিশ্ববাসীর সামনে সফলভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর এই কাজ বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
৩. সৃজনশীলতা ও আত্মজীবনী
গবেষণার পাশাপাশি সৃজনশীল লেখক হিসেবেও দীনেশচন্দ্র সেনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
- সৃজনশীল কাজ: তাঁর প্রথম গ্রন্থ ছিল ‘কুমার ভূপেন্দ্রসিংহ’ (১৮৯০), যা একটি আখ্যান কাব্য। সব মিলে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৬০-এর বেশি।
- আত্মজীবনী: তাঁর ‘ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য’ (১৯২২) গ্রন্থটি বাংলা জীবনী সাহিত্যের ইতিহাসে একটি মূল্যবান সংযোজন। এতে তিনি নিজের বেড়ে ওঠা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতসহ তাঁর সাহিত্যিক জীবনের কথা অত্যন্ত সরল ও মনোহর ভাষায় বিবৃত করেছেন।
- সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ‘বৃহৎ বঙ্গ’ (দুই খন্ড, ১৯৩৫) গ্রন্থটি বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি আকরগ্রন্থ।
৪. সম্মাননা ও স্বীকৃতি
বাংলা সাহিত্য ও গবেষণায় তাঁর অনবদ্য অবদানের জন্য দীনেশচন্দ্র সেন একাধিকবার সম্মানিত হয়েছেন:
- ১৯২১ সালে: ভারত সরকার কর্তৃক ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট ডিগ্রি লাভ করেন।
- ১৯৩১ সালে: তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন।
৫. প্রধান গ্রন্থসমূহ (এক নজরে)
দীনেশচন্দ্র সেনের প্রধান ও উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ:
- গবেষণা ও ইতিহাস: বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, বৃহৎ বঙ্গ (১ম ও ২য় খণ্ড), প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান, The Vaisnava Literature of Medieval Bengal, History of Bengali Language and Literature।
- লোকসাহিত্য: মৈমনসিংহ গীতিকা, বাংলার পুরনারী, Ramayani Katha, The Folk Literature of Bengal।
- আত্মজীবনী ও প্রবন্ধ: ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য, আশুতোষ-স্মৃতিকথা।
উপসংহার: দীনেশচন্দ্রের উত্তরাধিকার
আজ এই মহান মনীষীর জন্মদিনে, আমরা তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য, লোকসাহিত্য রক্ষার নিরলস প্রচেষ্টা এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় তাঁর পথিকৃৎ ভূমিকাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁর কাজগুলো বাংলা ভাষার মূল শেকড়কে শক্তিশালী করেছে এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।
সূত্র:
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা: দীনেশচন্দ্র সেন আর্কাইভস ও ফেলোশিপ রেকর্ড।
- বাংলাপিডিয়া: আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন নিবন্ধ।
- বাংলাদেশ ও ভারতের ঐতিহাসিক সাহিত্য গবেষণা জার্নাল।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রযুক্তি প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা: বর্তমান যুগ স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর হাই-ডেফিনিশন পর্দার যুগ। প্রযুক্তির এই বিশালত্বের ভিড়ে আমরা ‘ক্যালকুলেটর’ নামক ক্ষুদ্র যন্ত্রটির গুরুত্বের কথা প্রায় ভুলেই গেছি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পকেটে থাকা সামান্য একটি চিপ কীভাবে চোখের পলকে বিশাল অংকের গুণ বা ভাগ করে ফেলে? আজ আমরা উন্মোচন করব ক্যালকুলেটরের ভেতরের সেই বিস্ময়কর ইলেকট্রনিক মহাযজ্ঞ।

১. মানুষের ভাষা বনাম মেশিনের ভাষা: বাইনারি রহস্য
মানুষের হাতে ১০টি আঙুল থাকায় আমরা ‘ডেসিমাল’ বা ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে (০-৯) অভ্যস্ত। কিন্তু ক্যালকুলেটর একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা কেবল বিদ্যুতের উপস্থিতি (On) এবং অনুপস্থিতি (Off) বোঝে। সম্প্রতি জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক টক-শো ‘টেক জংশন ২০২৬’-এ বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন যে, ক্যালকুলেটর মূলত একটি ‘বাইনারি ক্যালকুলেটিং মেশিন’। এর সার্কিটগুলো শুধু ০ এবং ১-এর সংকেত বোঝে। আমরা যখন কিপ্যাডে কোনো সংখ্যা চাপি, ক্যালকুলেটর সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে বাইনারি কোডে রূপান্তর করে নেয়।
২. যোগের মাধ্যমেই সব হিসেব!

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, ক্যালকুলেটর মূলত কেবল যোগ করতে জানে। এর ভেতরের গাণিতিক বিন্যাস এমনভাবে তৈরি যে:
- বিয়োগ: ১০ থেকে ৫ বিয়োগ করতে বললে ক্যালকুলেটর ১০-এর সাথে (-৫) যোগ করে।
- গুণ: কোনো সংখ্যাকে গুণ করতে বললে এটি নির্ধারিত সংখ্যাটিকে বারবার যোগ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
৩. লজিক গেট: ক্যালকুলেটরের ‘মগজ’

এই সব যোগ-বিয়োগের পেছনে মূল কারিগর হলো অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির লজিক গেট (Logic Gate)। এই গেটগুলো আসলে হাজার হাজার ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি এক ধরণের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সুইচ। গত বছরের ‘সায়েন্স ডেইলি’-র একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি সাধারণ পকেট ক্যালকুলেটরেও কয়েক হাজার ট্রানজিস্টর থাকে যা আলোর গতিতে ডেটা প্রসেস করে। আপনি যখন সমান (=) চিহ্ন চাপেন, এই লজিক গেটগুলো বাইনারি ফলাফলকে পুনরায় ডেসিমালে রূপান্তর করে আমাদের সামনে পেশ করে।
৪. সেভেন-সেগমেন্ট ডিসপ্লে: সংখ্যা দেখার জাদু
হিসেব শেষ হওয়ার পর সংখ্যাগুলো স্ক্রিনে দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয় সেভেন-সেগমেন্ট এল ই ডি (7-Segment Display)। প্রতিটি ডিজিট দেখানোর জন্য সাতটি ছোট ছোট আলোর বার থাকে। বাইনারি ফলাফল অনুযায়ী নির্দিষ্ট বারগুলো জ্বলে উঠে আমাদের পরিচিত ডেসিমাল সংখ্যা (০-৯) তৈরি করে। এটি এমন এক নিখুঁত প্রযুক্তি যা গত কয়েক দশকেও অপরিবর্তিত থেকেছে।
৫. ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
অ্যাবাকাস থেকে শুরু করে বিশাল আকারের মেকানিক্যাল মেশিন, আর আজকের সোলার চালিত স্লিম ক্যালকুলেটর—এই বিবর্তন কয়েকশ বছরের। যদিও স্মার্টফোনে এখন সব অ্যাপ পাওয়া যায়, তবুও প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের কাছে ডেডিকেটেড ক্যালকুলেটরের নির্ভুলতা আজও অতুলনীয়।
উপসংহার:
একটি ক্ষুদ্র ক্যালকুলেটর আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লজিক বা অংশের (যেমন ০ ও ১) মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তাই ক্যালকুলেটর ভাঙার প্রয়োজন নেই, এর ভেতরের অদৃশ্য লজিকই আমাদের আধুনিক পৃথিবীর বড় বড় হিসেব নিকেশের মেরুদণ্ড।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. HowStuffWorks – Logic Circuits and Binary System Report. ২. সায়েন্স ডেইলি (Science Daily) – বিবর্তন ও ট্রানজিস্টর প্রযুক্তি আর্কাইভ। ৩. টেক জংশন ২০২৬ (টিভি টক-শো) – ‘অদৃশ্য প্রযুক্তির কার্যকারিতা’ পর্ব। ৪. গুগল টেকনিক্যাল লজিক অ্যানালাইসিস ডেটাবেস।
বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
পরিবেশ ও প্রযুক্তি প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সিডনি: আজ থেকে ৬ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার আকাশ থেকে যখন টকটকে লাল গাজর আর মিষ্টি আলু বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছিল, তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু সেই ‘গাজর-বৃষ্টি’ কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না; তা ছিল দাবানলে পুড়তে থাকা কয়েক হাজার ব্রাশ-টেইলড রক-ওয়ালাবির (Brush-tailed Rock-wallaby) জীবন বাঁচানোর একমাত্র আশা। আজ আমরা ফিরে দেখব সেই ‘অপারেশন রক ওয়ালাবি’-এর নেপথ্য কাহিনী, যা আধুনিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
১. আগুনের লেলিহান শিখা ও অস্তিত্বের সংকট

২০২০ সালের শুরুর দিকে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দাবানল বন্যপ্রাণীর অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। পাথুরে ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী ব্রাশ-টেইলড রক-ওয়ালাবিরা আগুনের হাত থেকে কোনোমতে বাঁচলেও পরে তারা তীব্র অনাহারের সম্মুখীন হয়। তাদের চারণভূমির সব গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় তাদের কাছে কোনো প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস অবশিষ্ট ছিল না।

২. ‘অপারেশন রক ওয়ালাবি’ ও হেলিকপ্টারের মিশন

বিপন্ন এই প্রাণীদের বাঁচাতে নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) সরকার এক সাহসী পদক্ষেপ নেয়। দুর্গম এলাকায় মানুষের যাতায়াত অসম্ভব হওয়ায় তারা হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ‘অপারেশন রক ওয়ালাবি’ নামে পরিচিত এই অভিযানে হেলিকপ্টার থেকে ১,০০০ কিলোগ্রামেরও বেশি মিষ্টি আলু এবং গাজর ওয়ালাবিদের বসবাসের খাড়া পাহাড় ও পাথুরে খাঁজে সতর্কতার সাথে ফেলা হয়।
৩. প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ
এই অভিযান কেবল খাবার ফেলেই শেষ হয়নি। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা পাথুরে অঞ্চলে ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন যাতে দেখা যায় প্রাণীরা খাবারগুলো খুঁজে পাচ্ছে কি না। গুগল আর্থ ও উন্নত ড্রোনের মাধ্যমে করা এক পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই খাবারের যোগান ওয়ালাবিদের মৃত্যুর হার প্রায় ৭০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি ছিল ‘সক্রিয় সংরক্ষণ’ (Active Conservation) পদ্ধতির একটি শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
৪. কেন এটি আজও প্রাসঙ্গিক?
বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও টক-শোতে এই অভিযান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক টক-শো ‘আর্থ ওয়াচ’ (Earth Watch)-এ বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন যে, সাধারণত প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে সেরে ওঠে। কিন্তু দাবানলের মতো চরম দুর্যোগে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া বিরল প্রজাতি রক্ষা করা অসম্ভব। অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগ আজ ২০২৬ সালেও বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণী রক্ষা নীতিমালার একটি মডেলে পরিণত হয়েছে।
৫. শত শত কোটি প্রাণীর ক্ষতি ও আমাদের শিক্ষা
সরকারি তথ্যমতে, সেই দাবানলে প্রায় ৩০০ কোটিরও বেশি প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রক-ওয়ালাবিদের জন্য এই বিশাল খাদ্য-অভিযান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আমাদের উদ্ভাবনী হতে হবে।
উপসংহার: প্রকৃতি ও মানুষের এই মরণপণ লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে জয়ী হয়েছিল। ‘অপারেশন রক ওয়ালাবি’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সহানুভূতি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বিপন্ন প্রাণীদের ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. National Geographic (২০২০ আর্কাইভ) – ‘Australia Drops Carrots from Helicopters to Feed Hungry Animals’. ২. NSW National Parks and Wildlife Service – অফিশিয়াল মিশন রিপোর্ট ২০২০। ৩. The Guardian (পরিবেশ বিভাগ) – বন্যপ্রাণী পুনরুদ্ধার বিশেষ কলাম। ৪. ‘গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস’ (২০২৬ সংস্করণ) – দুর্যোগ পরবর্তী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা।
প্রতিবেদন তৈরি করেছেন: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
সংস্কৃতি প্রতিবেদক | ১ মে ২০২৬
ঢাকা: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লোগো কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক নয়, বরং এর প্রতিটি রেখায় মিশে আছে এদেশের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা এবং মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে এই লোগো। আজ আমরা আলোকপাত করব সেই বিবর্তনের ধারায়।
১. ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের লোগো

১৯২১ সালে যাত্রা শুরুর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে ব্রিটিশ ছাপ স্পষ্ট ছিল। তখন লোগোতে ছিল চাঁদ-তারা ও স্বস্তিকা (卐) চিহ্ন। এর ট্যাগলাইন ছিল ইংরেজিতে— “Truth Shall Prevail”। তবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর এবং পাকিস্তান আমলের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্বস্তিকা চিহ্নটি বাদ দেওয়া হয়। সেখানে আরবি হরফে বই এবং বাংলার চিরচেনা নদী-নৌকার দৃশ্য সংযোজন করা হয়েছিল।
২. ১৯৭২: জয়নুল আবেদীনের সেই পেন্সিল স্কেচ

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন উপাচার্য শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের শরণাপন্ন হলে তিনি লোগোর একটি পেন্সিল খসড়া বা স্কেচ তৈরি করে দেন। তিনি নিজে গ্রাফিক ডিজাইনার না হওয়ায় তাঁর ছাত্র এবং যোগ্য উত্তরসূরি শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীকে এটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার দায়িত্ব দেন। এই লোগোতেই প্রথমবারের মতো বাংলা লিপি এবং ‘শিক্ষাই আলো’ স্লোগানটি যুক্ত করা হয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সূর্যরশ্মিতে শাপলা’।
৩. ১৯৭৩: বর্তমান লোগো ও শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী

১৯৭২ সালের লোগোটি সর্বজনীনভাবে পছন্দ না হওয়ায় ১৯৭৩ সালে পুনরায় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরী বর্তমান লোগোটি তিনটি অংশে সাজান:
- ওপরের অংশ: একটি প্রজ্বলিত প্রদীপের আলো এবং তার ওপরে লেখা ‘শিক্ষাই আলো’।
- ডান পাশ: একটি সজাগ চোখ। শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর মতে, এই চোখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী সচেতন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতীক। চোখের মনিতে স্থান পেয়েছে বাংলা স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষর ‘অ’।
- বাম পাশ: জাতীয় ফুল শাপলা, যা আমাদের প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
৪. কারিগর পরিচিতি: একুশে পদকপ্রাপ্ত সমরজিৎ রায়চৌধুরী

এই লোগোর রূপকার সমরজিৎ রায়চৌধুরী ১৯৩৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ছিলেন। ৪৩ বছর শিক্ষকতার পর ২০০৩ সালে তিনি অবসর নেন। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো নয়, বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করা শিল্পীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। শিল্পকলায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৪ সালে তিনি ‘একুশে পদক’ লাভ করেন।
উপসংহার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোর প্রতিটি অংশ আমাদের শিক্ষা ও চেতনার ধারক। ১৯২১ থেকে ১৯৫২, আর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩—এই পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁক আসলে আমাদের জাতীয় পরিচয় নির্মাণের এক একটি ধাপ। বর্তমানের এই লোগোটি আগামী বহু শতাব্দী ধরে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও সংগ্রামের আলো হয়ে পথ দেখাবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ, শিল্পী সমরজিৎ রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার এবং চারুকলা অনুষদ রেকর্ড। সংগ্রহ ও উপস্থাপনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সম্পাদনায়: নিউজ ডেস্ক
বিস্তারিত তথ্যের জন্য: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।




একটি রেসপন্স
Thanks for sharing. I read many of your blog posts, cool, your blog is very good. https://accounts.binance.info/en/register?ref=JHQQKNKN