জাতীয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস: জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও এনসিপি’র শক্তি ও দুর্বলতা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল

নিউজ ডেস্ক

October 17, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: হাদী উল ইসলাম


বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাস: জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং এনসিপির ভূমিকা

বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর থেকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং তাদের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে একটি জটিল ও শক্তিশালী দ্বন্দ্বের মধ্যে চলে এসেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি—এই দলগুলো প্রতিনিয়ত দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে। তবে, তাদের গতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, এবং জনপ্রিয়তার ওপর বিশ্লেষণ করতে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে।

১. আওয়ামী লীগ: স্বাধীনতা ও শাসনকালের অভিজ্ঞতা

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এই দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, বিশেষত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা হিসেবে পরিচিত।

আওয়ামী লীগের শক্তি:

  • স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতীয় ঐক্য গঠনে তাদের ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর শিকড় বিস্তার করেছে।
  • বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এই দলের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি।
  • দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, সমাজসেবা, ও অবকাঠামো নির্মাণ-এ আওয়ামী লীগের ব্যাপক অবদান রয়েছে।

আওয়ামী লীগের দুর্বলতা:

  • একদলীয় শাসন, বাক স্বাধীনতা হরণের অভিযোগ, এবং বিরোধী দলের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
  • জনগণের আস্থা হারানো এবং স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসেবে তাদের ইতিহাস অনেকের কাছে তর্কিত।
  • আওয়ামী লীগের শাসনামলে, মাঝে মাঝে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দলের প্রতি জনগণের নিরাশা দেখা দিয়েছে।

২. বিএনপি: ক্ষমতা হারানো ও প্রত্যাবর্তনের কৌশল

বিএনপি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এর ইতিহাস ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক শূন্যতার দিকে চলে আসে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একনায়ক শাসক হিসেবে বাংলাদেশে প্রথম সেনা অভ্যুত্থান ঘটান এবং ক্ষমতায় আসেন।

বিএনপির শক্তি:

  • জিয়াউর রহমানের শাসন জনগণের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাকে বিএনপি ও সামরিক শাসনের মহান নেতা হিসেবে মানা হয়।
  • তার পুত্র তারেক রহমান বর্তমানে দলের শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির নেতৃত্ব পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন।
  • বিএনপি কিছু ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করে প্রতিবাদী রাজনীতি চালিয়ে গেছে, যা জনগণের মধ্যে এদের সমর্থন পুনর্গঠন করেছে।

বিএনপির দুর্বলতা:

  • ক্ষমতায় থেকে জনগণের মধ্যে হতাশাঅব্যবস্থাপনার অভিযোগ বিএনপির কপালে রয়ে গেছে।
  • একাধিক গোছলহীন তীব্র আন্দোলন এবং আন্তরিকতা ও ঐক্যের অভাব তাদেরকে ভোটের মাঠে শক্তিহীন করেছে
  • জামায়াতের সঙ্গে জোট করার কারণে তারা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

৩. জামায়াতে ইসলামী: ইতিহাসের অন্ধকারে

জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যদিও এই দলের সাথে নানা বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে জামায়াত বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির অংশ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে, জামায়াত বিভিন্ন গণহত্যায় অংশ নেয়।

জামায়াতের শক্তি:

  • অর্গানাইজড এবং শৃঙ্খলিত সদস্যবৃন্দ এবং তাদের নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক যেটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরিলক্ষিত হয়েছে।
  • তাদের ধর্মীয় অনুশাসন এবং সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব রয়েছে, যা শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে প্রচারিত হয়।

জামায়াতের দুর্বলতা:

  • স্বাধীনতা বিরোধী চর্চা, গণহত্যার অভিযোগ, এবং সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের জন্ম দিয়েছে।
  • দেশের শাসন ব্যবস্থাগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের বিরোধীতা অনেক ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করেছে
  • আন্তর্জাতিকভাবে অস্বীকৃতি এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্বব্যাপী নিন্দিত

৪. এনসিপি: নবীন শক্তি

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বাংলাদেশের একটি নবীন রাজনৈতিক দল, যা বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আলাদা কৌশল নিয়ে তাদের অবস্থান তৈরি করেছে। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

এনসিপির শক্তি:

  • উন্নয়ন কর্মসূচি এবং দীর্ঘকালীন আন্দোলন তাদের রাজনৈতিক শক্তিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
  • বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ তাদের শক্তির নতুন মাত্রা দিয়েছে।

এনসিপির দুর্বলতা:

  • নতুন দল হিসেবে, তাদের ভোট ব্যাংক তৈরিতে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।
  • প্রতিষ্ঠানগত শক্তির অভাব এবং ব্যাপক জনগণের আস্থা গড়তে তারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, এবং এনসিপি সবারই গুরুত্ব রয়েছে, তবে তাদের কর্মপন্থা ও লক্ষ্য পৃথক। তবে, স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যন্ত এই দলগুলো প্রতিনিয়ত একই পথে চলতে চাইলেও তাদের মধ্যে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত দিক সামনে এসেছে।

তবে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি নতুন মোড় নিতে পারে, যেখানে এই দলগুলো এক সাথে বা পৃথকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।


সূত্র:

  1. বাংলাদেশ জাতীয় ইতিহাস, রাজনীতি ও দলগুলোর ভূমিকা
  2. ইতিহাসের পাতা, জামায়াত ও বিএনপির রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
  3. বাংলাদেশ টেলিভিশন, রাজনৈতিক আলোচনার পর্যালোচনা

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

২ Responses

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জাফর সরেশওয়ালা

নিউজ ডেস্ক

April 30, 2026

শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় বিতর্কের শেষ নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশে তার ভাবমূর্তি নিয়ে কট্টর ও নমনীয়—উভয় ধরণের মতবাদই প্রচলিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে ‘মুসলিম বিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, পর্দার আড়ালে তার সাথে মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ভারতের প্রভাবশালী মুসলিম নেতৃবৃন্দের ঘনিষ্ঠতা এক ভিন্ন বার্তা দেয়।

জাফর সরেশওয়ালা: মোদী-মুসলিম সেতুবন্ধনের নায়ক নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত আহমেদাবাদ-ভিত্তিক মুসলিম ব্যবসায়ী জাফর সরেশওয়ালা। তিনি কেবল একজন সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং ইসলামের কঠোর অনুসারী ‘তাবলিগী জামাত’-এর একজন সক্রিয় সদস্য। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকেই তিনি মোদীর অন্যতম সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হন।

সরেশওয়ালা আহমেদাবাদ-ভিত্তিক একটি মুসলিম পরিবার থেকে এসেছেন। তিনি তার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক বিশ্বের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক সমস্যা সমাধানে একটি ‘মুসলিম উপদেষ্টা গ্রুপ’ গঠন করেন, সরেশওয়ালা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি সাচার কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং শিশুদের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার (RTE) আইনের একজন প্রধান প্রবক্তা।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও জিএসটি সরেশওয়ালা ভারতের গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স (GST)-এর অন্যতম সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই কর ব্যবস্থা ব্যবসায়িক খরচ কমিয়ে ভারতীয় ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। জিএসটি কাউন্সিলের মিটিংগুলোতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থন ভারতের ব্যবসায়িক মহলে সমাদৃত হয়েছে।

বিদ্বেষ নাকি কূটনীতি? সমালোচকরা প্রায়ই দাবি করেন মোদী মসজিদে যান না। তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী কেবল ভারতের ভেতরেই নয়, রাষ্ট্রীয় সফরে বিভিন্ন মুসলিম দেশে গিয়ে মসজিদে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। মিসরের আল-হাকিম মসজিদ থেকে শুরু করে ওমানের সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ—সর্বত্রই তার পদচারণা ছিল। এমনকি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলো তাকে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা প্রদান করেছে।

তথ্য ও বিশ্লেষণের অভাব বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের একটি বড় অংশ নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে কেবলমাত্র ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ধারণা পোষণ করে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘ব্যাবাম (Vyapam) কেলেঙ্কারি’র মতো বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা দুর্নীতির খবর অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ফলে গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে কেবল ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ তকমা দিয়েই অনেক আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে।

উপসংহার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে জাফর সরেশওয়ালার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত ইমেজ এবং রাষ্ট্রীয় পরিচালনার নীতি সব সময় এক নয়। সরেশওয়ালা বর্তমানে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন, যা অনেকের কাছে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোদীর উদ্যোগগুলোর প্রতি তার সমর্থন আগামী দিনগুলোতে ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে আরও প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


তথ্যসূত্র: জাফর সরেশওয়ালা আর্কাইভ, উইকিপিডিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংবাদ।

বিস্তারিত তথ্যের জন্য ভিজিট করুন: bdsbulbulahmed.com

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

ব্রুস লি

নিউজ ডেস্ক

April 29, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

মার্শাল আর্ট শব্দটি শুনলেই বিশ্বজুড়ে যে নামটি সবার আগে ভেসে ওঠে, তিনি হলেন ব্রুস লি (Bruce Lee)। তিনি কেবল একজন অভিনেতা বা ফাইটার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক, লেখক এবং আধুনিক ফিটনেস বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক। মাত্র ৩২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি বিশ্বকে যা দিয়ে গেছেন, তা আজও কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।

১. জন্ম ও শৈশব: হংকং থেকে আমেরিকার যাত্রা

ব্রুস লির জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৯৪০ সালে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোতে, ড্রাগন বছরে এবং ড্রাগন ঘন্টায়। তার বাবা ছিলেন একজন অপেরা শিল্পী। জন্মের কয়েক মাস পর তারা হংকংয়ে ফিরে যান। হংকংয়ের রাস্তায় বেড়ে ওঠার সময় তিনি প্রায়ই মারামারি বা গ্যাং ফাইটে জড়িয়ে পড়তেন। এই বিশৃঙ্খল জীবন থেকে নিজেকে বাঁচাতে এবং আত্মরক্ষা শিখতে তিনি কিংবদন্তি ওস্তাদ আইপি ম্যান (Ip Man)-এর কাছে ‘উইং চুন’ (Wing Chun) শেখা শুরু করেন।

১৮ বছর বয়সে ব্রুস লি পুনরায় আমেরিকা ফিরে আসেন এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে (Philosophy) পড়াশোনা শুরু করেন। সেখানে তিনি কেবল মার্শাল আর্ট শেখানোই শুরু করেননি, বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে যুদ্ধের কৌশলকে মিলিয়ে এক অনন্য দর্শন তৈরি করেন।

২. ‘জিত কুনে দো’ (Jeet Kune Do): প্রথা ভাঙার দর্শন

ব্রুস লি প্রচলিত মার্শাল আর্টের কঠিন এবং অকেজো নিয়মগুলো পছন্দ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, লড়াই হওয়া উচিত পানির মতো—সহজ এবং অভিযোজনযোগ্য। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তার নিজস্ব শৈলী ‘জিত কুনে দো’। তার বিখ্যাত উক্তি ছিল:

“Be water, my friend. Empty your mind, be formless, shapeless — like water.”

তিনি বিশ্বাস করতেন, যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচ নেই। পরিস্থিতির সাথে নিজেকে বদলে ফেলাই হলো প্রকৃত যোদ্ধার পরিচয়।

৩. কিংবদন্তি হয়ে ওঠা: হলিউড এবং হংকং

হলিউডে ‘দ্য গ্রিন হর্নেট’ সিরিয়ালে কাজ করার পর তিনি বুঝতে পারেন এশিয়ানদের জন্য সেখানে মূল চরিত্রে সুযোগ কম। এরপর তিনি হংকং ফিরে গিয়ে ‘দ্য বিগ বস’, ‘ফিস্ট অফ ফিউরি’ এবং ‘দ্য ওয়ে অফ দ্য ড্রাগন’ সিনেমাগুলো করেন। তার অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা এবং অ্যাকশন স্টাইল সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার শেষ এবং সবচেয়ে সফল সিনেমা ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ মুক্তির মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

৪. রহস্যময় মৃত্যু: ‘সেরিব্রাল এডিমা’ না অন্য কিছু?

২০ জুলাই ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ব্রুস লির মৃত্যু হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল ‘সেরিব্রাল এডিমা’ (মস্তিষ্কে অতিরিক্ত পানি জমে ফুলে যাওয়া)। তবে তার মৃত্যু নিয়ে আজও অনেক রহস্য রয়েছে। কেউ মনে করেন অতিরিক্ত পরিশ্রম, কেউ বলেন ড্রাগ রিয়েকশন, আবার অনেক ভক্ত মনে করেন এটি ছিল কোনো ষড়যন্ত্র। তবে তার আকস্মিক বিদায় মার্শাল আর্টের ইতিহাসে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।

৫. ব্রুস লির দর্শনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: নিউরোপ্লাস্টিসিটি

ব্রুস লির একটি বিখ্যাত স্লোগান ছিল—“He was right”। ব্রুস লি বিশ্বাস করতেন, জীবন বদলাতে শুধু পরিকল্পনা নয়, দরকার প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের ধারাবাহিকতা। আধুনিক নিউরোসায়েন্স একে বলে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ (Neuroplasticity)

  • মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তন: বিজ্ঞান বলে, আমরা যখন প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু কাজ (যেমন পাঞ্চিং প্র্যাকটিস বা পড়াশোনা) করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে নতুন ‘নিউরাল পাথওয়ে’ তৈরি হয়।
  • দক্ষতা অর্জন: ব্রুস লি বলেছিলেন, “আমি সেই ব্যক্তিকে ভয় পাই না যে ১০ হাজার কিক একবার অনুশীলন করেছে, আমি তাকে ভয় পাই যে একটি কিক ১০ হাজার বার অনুশীলন করেছে।” এটিই নিউরোসায়েন্সের ভাষায় ‘মাসল মেমোরি’ এবং নিউরাল কানেকশন মজবুত করার শ্রেষ্ঠ উপায়।

৬. ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে ব্রুস লির প্রাসঙ্গিকতা

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন বাংলাদেশ তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ গড়ার স্বপ্ন দেখছে এবং স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে আধুনিকায়ন হচ্ছে, তখন ব্রুস লির ‘গতিশীল থাকা’ (In Motion) দর্শন অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত জীবনে কর্মতৎপরতা এবং সরকারি কাজে স্বচ্ছতা—উভয়ই ব্রুস লির সততার দর্শনের সাথে মিলে যায়।

উপসংহার

ব্রুস লি খুব অল্প সময় পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রমান করে গেছেন যে আপনার জীবনের মান নির্ভর করে আপনি প্রতিদিন বাস্তবে কী কাজ করছেন তার ওপর। তিনি আজ কেবল একজন মার্শাল আর্টিস্ট নন, বরং সফলতার একটি বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

নিকোলা টেসলা

নিউজ ডেস্ক

April 28, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: [BDS Bulbul Ahmed]

বিভাগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি / ইতিহাস

উৎস: (প্রথম আলো ও ঐতিহাসিক আর্কাইভের সহায়তায়)

১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এক মায়াবী আলোয় ঝলমল করছে। মানুষ বিস্ময়ে দেখছে ‘পরিবর্তী বিদ্যুৎ’ বা এসি কারেন্টের জাদু। যার হাত ধরে এই আলোকসজ্জা, তিনি ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং প্রতিভাবান বিজ্ঞানী— নিকোলা টেসলা। এডিসনের সমবিদ্যুৎ (DC) যখন জঞ্জাল আর সীমাবদ্ধতায় আটকে ছিল, তখন টেসলা পৃথিবীকে দেখালেন চিকন তারে মাইলকে মাইল বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্ন।

১. মেধাবী ছাত্র থেকে ‘ডিগ্রিহীন’ প্রকৌশলী

১৮৫৬ সালে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া টেসলা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অনন্য। গণিতের জটিল ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস তিনি মুখে মুখেই সমাধান করে ফেলতেন। হাইস্কুলের চার বছরের কোর্স শেষ করেছিলেন মাত্র তিন বছরে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা দাবি করেন, কমিউটেটর ছাড়াই ডায়নামো তৈরি সম্ভব। তাঁর এই অদম্য জেদ আর অধ্যাপকদের সাথে মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি ছাড়াই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়।

২. এডিসনের সাথে সংঘাত ও ‘আমেরিকান কৌতুক’

১৮৮৪ সালে টেসলা যখন নিউইয়র্কে টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে যোগ দেন, তখন সূচিত হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত দ্বৈরথ। এডিসনের ডিসি জেনারেটরের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ সফলভাবে শেষ করার পর টেসলাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০ হাজার ডলার দিতে অস্বীকার করেন এডিসন। এডিসন রসিকতা করে বলেন, “তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝোনি।” এই অভিমানে টেসলা পদত্যাগ করেন এবং শুরু হয় ‘কারেন্ট ওয়ার’ বা বিদ্যুতের যুদ্ধ।

৩. বিনা তারে বিদ্যুৎ ও টেসলা কয়েল

টেসলার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন। ১৮৯৩ সালের প্রদর্শনীতে তিনি দেখান, কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই একটি বাতি জ্বালানো সম্ভব। তাঁর স্বপ্ন ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়্যারলেস সিস্টেম’, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবী বিনা তারে বিদ্যুৎ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। যদিও অর্থের অভাবে তাঁর ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ প্রকল্প সফল হয়নি, তবে আজকের রেডিও এবং ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির ভিত্তি সেই টেসলা কয়েল।

৪. ৩০০ পেটেন্টের অধিকারী এক নিঃস্ব জাদুকর

রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে আমরা মার্কনিকে চিনলেও, মার্কনি টেসলার ১৭টি পেটেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট টেসলাকেই রেডিওর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এক্স-রে থেকে শুরু করে রিমোট কন্ট্রোল নৌকা, এমনকি আজকের হেলিকপ্টারের আদি ধারণা—সবই ছিল টেসলার মস্তিষ্কের অবদান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ অর্থকষ্টে। শেষ জীবনে নিউইয়র্কার হোটেলের একটি কক্ষে পায়রাদের সাথে সময় কাটিয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি মারা যান।

৫. টেসলার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালে চৌম্বক ক্ষেত্রের এককের নাম দিয়েছেন ‘টেসলা’। আজ যখন আমরা বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা শুনি, সেই বিখ্যাত ‘Tesla’ কোম্পানির নামটিও এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি সম্মান জানিয়ে রাখা। আজকের স্মার্ট দুনিয়া যে বেতার তরঙ্গে চলে, তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নিকোলা টেসলার নাম।


এক নজরে নিকোলা টেসলা

বিষয়তথ্য
জন্ম১০ জুলাই ১৮৫৬, ক্রোয়েশিয়া।
আবিষ্কারএসি বিদ্যুৎ, ইন্ডাকশন মোটর, টেসলা কয়েল, রেডিওর মূল নকশা।
পেটেন্ট সংখ্যাপ্রায় ৩০০টি।
সম্মাননাচৌম্বক ক্ষেত্রের একক ‘টেসলা’ (T)।
মৃত্যু৭ জানুয়ারি ১৯৪৩, নিউ ইয়র্ক।

বি.ডি.এস ডিজিটাল এডিটোরিয়াল ইনসাইট: নিকোলা টেসলার জীবন আমাদের শেখায় যে, উদ্ভাবন কেবল ব্যবসার জন্য নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। টেসলা হয়তো ব্যবসা বোঝেননি, কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎ বুঝেছিলেন। তাঁর সেই ভবিষ্যৎ আজ আমাদের বর্তমান।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ