ইতিহাস

নিকোলা টেসলা: আধুনিক পৃথিবীর সেই ‘পাগল’ জাদুকর ও বিস্মৃত এক মহানায়ক
নিকোলা টেসলা

নিউজ ডেস্ক

April 28, 2026

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: [BDS Bulbul Ahmed]

বিভাগ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি / ইতিহাস

উৎস: (প্রথম আলো ও ঐতিহাসিক আর্কাইভের সহায়তায়)

১৮৯৩ সালের শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। পুরো মেলা প্রাঙ্গণ এক মায়াবী আলোয় ঝলমল করছে। মানুষ বিস্ময়ে দেখছে ‘পরিবর্তী বিদ্যুৎ’ বা এসি কারেন্টের জাদু। যার হাত ধরে এই আলোকসজ্জা, তিনি ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এবং প্রতিভাবান বিজ্ঞানী— নিকোলা টেসলা। এডিসনের সমবিদ্যুৎ (DC) যখন জঞ্জাল আর সীমাবদ্ধতায় আটকে ছিল, তখন টেসলা পৃথিবীকে দেখালেন চিকন তারে মাইলকে মাইল বিদ্যুৎ পাঠানোর স্বপ্ন।

১. মেধাবী ছাত্র থেকে ‘ডিগ্রিহীন’ প্রকৌশলী

১৮৫৬ সালে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার এক গ্রামে জন্ম নেওয়া টেসলা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অনন্য। গণিতের জটিল ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস তিনি মুখে মুখেই সমাধান করে ফেলতেন। হাইস্কুলের চার বছরের কোর্স শেষ করেছিলেন মাত্র তিন বছরে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় টেসলা দাবি করেন, কমিউটেটর ছাড়াই ডায়নামো তৈরি সম্ভব। তাঁর এই অদম্য জেদ আর অধ্যাপকদের সাথে মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত ডিগ্রি ছাড়াই তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে হয়।

২. এডিসনের সাথে সংঘাত ও ‘আমেরিকান কৌতুক’

১৮৮৪ সালে টেসলা যখন নিউইয়র্কে টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে যোগ দেন, তখন সূচিত হয় বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত দ্বৈরথ। এডিসনের ডিসি জেনারেটরের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ সফলভাবে শেষ করার পর টেসলাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫০ হাজার ডলার দিতে অস্বীকার করেন এডিসন। এডিসন রসিকতা করে বলেন, “তুমি আমেরিকান কৌতুক বোঝোনি।” এই অভিমানে টেসলা পদত্যাগ করেন এবং শুরু হয় ‘কারেন্ট ওয়ার’ বা বিদ্যুতের যুদ্ধ।

৩. বিনা তারে বিদ্যুৎ ও টেসলা কয়েল

টেসলার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল তারবিহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন। ১৮৯৩ সালের প্রদর্শনীতে তিনি দেখান, কোনো তারের সংযোগ ছাড়াই একটি বাতি জ্বালানো সম্ভব। তাঁর স্বপ্ন ছিল ‘ওয়ার্ল্ড ওয়্যারলেস সিস্টেম’, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবী বিনা তারে বিদ্যুৎ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে পারবে। যদিও অর্থের অভাবে তাঁর ‘ওয়ার্ডেনক্লিফ টাওয়ার’ প্রকল্প সফল হয়নি, তবে আজকের রেডিও এবং ওয়াই-ফাই প্রযুক্তির ভিত্তি সেই টেসলা কয়েল।

৪. ৩০০ পেটেন্টের অধিকারী এক নিঃস্ব জাদুকর

রেডিওর আবিষ্কারক হিসেবে আমরা মার্কনিকে চিনলেও, মার্কনি টেসলার ১৭টি পেটেন্ট ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট টেসলাকেই রেডিওর প্রকৃত উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এক্স-রে থেকে শুরু করে রিমোট কন্ট্রোল নৌকা, এমনকি আজকের হেলিকপ্টারের আদি ধারণা—সবই ছিল টেসলার মস্তিষ্কের অবদান। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দারুণ অর্থকষ্টে। শেষ জীবনে নিউইয়র্কার হোটেলের একটি কক্ষে পায়রাদের সাথে সময় কাটিয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি মারা যান।

৫. টেসলার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ

বিজ্ঞানীরা ১৯৬০ সালে চৌম্বক ক্ষেত্রের এককের নাম দিয়েছেন ‘টেসলা’। আজ যখন আমরা বৈদ্যুতিক গাড়ির কথা শুনি, সেই বিখ্যাত ‘Tesla’ কোম্পানির নামটিও এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি সম্মান জানিয়ে রাখা। আজকের স্মার্ট দুনিয়া যে বেতার তরঙ্গে চলে, তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নিকোলা টেসলার নাম।


এক নজরে নিকোলা টেসলা

বিষয়তথ্য
জন্ম১০ জুলাই ১৮৫৬, ক্রোয়েশিয়া।
আবিষ্কারএসি বিদ্যুৎ, ইন্ডাকশন মোটর, টেসলা কয়েল, রেডিওর মূল নকশা।
পেটেন্ট সংখ্যাপ্রায় ৩০০টি।
সম্মাননাচৌম্বক ক্ষেত্রের একক ‘টেসলা’ (T)।
মৃত্যু৭ জানুয়ারি ১৯৪৩, নিউ ইয়র্ক।

বি.ডি.এস ডিজিটাল এডিটোরিয়াল ইনসাইট: নিকোলা টেসলার জীবন আমাদের শেখায় যে, উদ্ভাবন কেবল ব্যবসার জন্য নয়, বরং মানবজাতির কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। টেসলা হয়তো ব্যবসা বোঝেননি, কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎ বুঝেছিলেন। তাঁর সেই ভবিষ্যৎ আজ আমাদের বর্তমান।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শাপলা চত্বর

নিউজ ডেস্ক

August 3, 2026

শেয়ার করুন

বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন | পালস বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৩ সালের ৫ মে একটি ভয়াবহ ও রক্তঝরা মাইলফলক। ওই দিন রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আয়োজিত ‘ঢাকা অবরোধ’ ও পরবর্তী মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ লীগ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে বলপ্রয়োগ করে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনার সঠিক তদন্ত, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ও দায়ীদের বিচার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একধরনের নীরবতা ও তথ্য গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটার পর, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবির মুখে শাপলা চত্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) আইনি বিচার প্রক্রিয়া নতুন মাত্রা লাভ করে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি ও নীতি-নির্ধারকের বিরুদ্ধে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (Formal Charge) দাখিল ও আমলে নেওয়া হয়েছে। এই নিবন্ধে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের পটভূমি, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি, ৫ মে মধ্যরাতের যৌথ অভিযান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত প্রতিবেদন, আসামিদের তালিকা এবং আইনগত পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।

১. বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সম্প্রতি ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত নির্মম গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিয়েছেন।

মামলার প্রধান ধারা ও আইনি কাঠামো

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ (সি) ধারা (Crimes against Humanity and Genocide) অনুযায়ী তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পদাধিকারী ও নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে এই চার্জ গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৫ মে মধ্যরাতে unarmed বা নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর আধুনিক রাষ্ট্রীয় অস্ত্র, প্রাণঘাতী গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে যে অপারেশন চালানো হয়েছে, তা ছিল একটি সুপরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ।

[১৩ দফা দাবি ও শাপলা চত্বরে অবস্থান (৫ মে ২০১৩)] 
                      ↓
['অপারেশন সিকিউর শাপলা' ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ (৫-৬ মে মধ্যরাত)]
                      ↓
[এক দশকের তথ্য গোপনীয়তা ও আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন]
                      ↓
[ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পুনস্তদন্ত]
                      ↓
[শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা]

হাইপ্রোফাইল অভিযুক্তদের তালিকা (৪১ জন)

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা ফরমাল চার্জে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সামরিক-পুলিশ কর্মকর্তা, আমলা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তিদের অভিযুক্ত করা হয়েছে:

১. প্রধান আসামি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব:

  • শেখ হাসিনা: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল নির্দেশদাতা আসামি।
  • মহীউদ্দীন খান আলমগীর: তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
  • শামসুল হক টুকু: তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
  • হাসানুল হক ইনু: তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী।
  • ডা. দীপু মনি: তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেত্রী।
  • আবদুল লতিফ সিদ্দিকী: তৎকালীন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতা।

২. শীর্ষ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা:

  • জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ: তৎকালীন বিজিবি প্রধান ও সাবেক সেনাপ্রধান।
  • বেনজীর আহমেদ: তৎকালীন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP) কমিশনার ও সাবেক আইজিপি।
  • হাসান মাহমুদ খন্দকার: তৎকালীন আইজিপি।
  • এ কে এম শহীদুল হক: তৎকালীন অতিরিক্ত আইজিপি ও সাবেক আইজিপি।
  • মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান: তৎকালীন এনটিএমসি (NTMC) প্রধান ও র‍্যাবের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।

৩. সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব:

  • শাহরিয়ার কবির: সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
  • ইমরান এইচ সরকার: মুখপাত্র, গণজাগরণ মঞ্চ।
  • মোজাম্মেল বাবু: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একাত্তর টিভি।
  • ফারজানা রুপা: সাবেক প্রধান প্রতিবেদক, একাত্তর টিভি।

বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বর্তমানে ৪১ জন আসামির মধ্যে ৯ জন আসামি কারাগারে আটক রয়েছেন (যাঁদের মধ্যে দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, শহীদুল হক, শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু এবং ফারজানা রুপা অন্যতম)।

ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ মামলার অন্য সকল পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে কারাগারে থাকা আসামিদের পরবর্তী নির্দিষ্ট ধার্য তারিখে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

৩. পটভূমি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি

২০১৩ সালের প্রথমভাগে শাহবাগ কেন্দ্রিক ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন এবং কতিপয় ব্লগারের ইসলামবিদ্বেষী লেখার প্রতিক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন ‘হেফাজেত ইসলাম বাংলাদেশ’ চট্টগ্রাম থেকে তাদের আন্দোলন শুরু করে। চট্টগ্রামভিত্তিক শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত এই সংগঠনটি সরকারের কাছে তাদের ১৩ দফা দাবি পেশ করে এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা স্তব্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচির ডাক দেয়।

┌────────────────────────────────────────────────────────────────────────┐
│                   হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ১৩ দফা দাবি                 │
├────────────────────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন।         │
│ ২. ইসলাম অবমাননা ও মহানবী (সা.)-এর শানে কটুুক্তিকারীদের মৃত্যুদণ্ড।     │
│ ৩. শাহবাগ কেন্দ্রিক নাস্তিক্যবাদী ব্লগারদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তি।    │
│ ৪. নারী নীতি ও শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারা বাতিল।                     │
│ ৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা।       │
│ ৬. কাদিয়ানীদের সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা।                          │
│ ৭. সামাজিক অনাচার, নগ্নতা, ও ফ্রি-মিক্সিং বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।        │
│ ৮. খ্রিষ্টান মিশনারি ও এনজিওগুলোর বিতর্কিত ধর্মান্তরকরণ বন্ধ।          │
│ ৯. মসজিদ-মাদ্রাসার ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও চাপ সৃষ্টি বন্ধ।            │
│ ১০. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংক্রান্ত বিতর্ক নিরসন ও আলেম মুক্তি। │
│ ১১. আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।         │
│ ১২. পার্বত্য অঞ্চলে বিদেশি এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারি নিয়ন্ত্রণ।         │
│ ১৩. গণমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার বন্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতি প্রচার।      │
└────────────────────────────────────────────────────────────────────────┘

১৩ দফা দাবির বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. সংবিধানের মূলনীতি: সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ ফিরিয়ে আনা এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার আইনি বাধ্যবাধকতা।

২. ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন: মহানবী (সা.) এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা অবমাননা করার অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’-র বিধান রেখে কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন করা।

৩. ব্লগারদের গ্রেফতার: মহানবী (সা.)-এর চরিত্র হরণকারী এবং ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকারী ব্লগারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করা।

৪. শিক্ষানীতি ও নারী নীতি সংশোধন: তৎকালীন সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি এবং শিক্ষানীতির ইসলামবিরোধী ধারাগুলো বাতিল করা।

৫. ইসলামি শিক্ষা বাধ্যবাধকতা: সর্বস্তরের শিক্ষা পাঠ্যক্রমে ইসলামি ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

৬. কাদিয়ানী ইস্যু: আহমেদিয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়কে সরকারি ও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমুসলিম’ ঘোষণা করা।

৭. সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতি: সমাজ থেকে নগ্নতা, অনাচার, মেলামেশা ও পশ্চিমা ‘লাইফস্টাইল’ প্রচার বন্ধ করা।

৮. মিশনারি ও এনজিও নিয়ন্ত্রণ: পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে খ্রিষ্টান মিশনারি ও বিদেশি এনজিওর কার্যক্রম কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা।

৯. আলেমদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার: বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত আলেম-ওলামাদের মুক্তি প্রদান এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মামলা বাতিল করা।

তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী এবং ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল সমাজ এই ১৩ দফার কঠোর সমালোচনা করে এটিকে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। তবে লক্ষ লক্ষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই দাবির সপক্ষে শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোগ দেন।

৪. ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’: ৫ মে মধ্যরাতের অভিযান ও যৌথ বাহিনীর ভূমিকা

২০১৩ সালের ৫ মে সকাল থেকেই ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখ লাখ হেফাজত কর্মী মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, বিজয়নগর ও বায়তুল মোকাররম এলাকা পূর্ণ করে ফেলে। সমাবেশ শেষে রাত ঘনিয়ে এলে তৎকালীন সরকার তাদের শাপলা চত্বর ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু আয়োজকরা সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

অভিযানে ব্যবহৃত বাহিনী ও কমান্ড স্ট্রাকচার

রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয় ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ বা ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’

  • বাংলাদেশ পুলিশ (DMP): তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের সাঁজোয়া ও পদাতিক ইউনিট।
  • র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB): অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের সরাসরি কমান্ডে থাকা স্ট্রাইকিং ফোর্স।
  • বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB): তৎকালীন প্রধান আজিজ আহমেদের অধীনে সাঁজোয়া যান ও বিজিবি ব্যাটালিয়ন।

অভিযানের কৌশল ও বর্বরতা

অপারেশনের কৌশল হিসেবে পুরো মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঘোর অন্ধকার তৈরি করা হয়। সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, গ্যাস গান, লেজার গান এবং স্বয়ংক্রিয় আধুনিক মারণাস্ত্র থেকে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে চতুর্দিক থেকে বেষ্টনী তৈরি করা হয়।

ঘোর অন্ধকারে ঘুমন্ত ও ক্লান্ত সমাবেশকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো এই যৌথ অভিযান তৎকালীন সময়ে এক চরম বিভীষিকার জন্ম দেয়।

৫. নিহতের তথ্য ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণ (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত প্রতিবেদন)

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অভিযানের পরপরই দাবি করেছিল যে শাপলা চত্বরের অভিযানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি এবং পুলিশ কেবল সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ব্যবহার করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক নিরপেক্ষ তদন্তে এই তথ্যের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছে।

                                      [শাপলা চত্বর গণহত্যা ও বিস্তৃত সহিংসতা]
                                                         │
         ┌──────────────────────────────┬────────────────┴──────────────────────────────┐
         ▼                              ▼                                               ▼
   [ঢাকার শাপলা চত্বর]         [সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ]                        [চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা]
   - তারিখ: ৫ মে মধ্যরাত         - তারিখ: ৬ মে সকাল-দুপুর                         - তারিখ: ৫-৬ মে
   - নিহত: ৩২ জন                - নিহত: ২০ জন                                   - নিহত: ৬ জন (চট্টগ্রাম ৫, কুমিল্লা ১)

এলাকাভিত্তিক নিহতের সংখ্যা (মোট নিশ্চিত: ৫৮ জন, আনুমানিক: ৬১ জন)

স্থান/এলাকানিহতের সংখ্যাঅভিযানের বিবরণ ও সময়
ঢাকা (শাপলা চত্বর, মতিঝিল)৩২ জন৫ মে মধ্যরাতের ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ অভিযানের সময় সরাসরি গুলিতে নিহত।
সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)২০ জন৬ মে সকালে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভে গুলি।
চট্টগ্রাম০৫ জন৫ ও ৬ মে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দমনে গুলিবর্ষণ।
কুমিল্লা০১ জনমহাসড়ক অবরোধকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত।
মোট শনাক্তকৃত৫৮ জনতদন্ত সংস্থা কর্তৃক প্রতিটি নিহতের নাম, ঠিকানা ও জাতীয় পরিচযপত্র যাচাই করে নিশ্চিত করা হয়েছে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: তদন্ত সংস্থার সার্বিক প্রতিবেদনে অভিযান সংক্রান্ত সংঘাত ও পরবর্তী সহিংসতায় ৭ জন নিরাপত্তাকর্মীসহ মোট নিহতের সংখ্যা ৬১ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে।)

৬. আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

শাপলা চত্বরের এই ঘটনা কেবল দেশের অভ্যন্তরেই রাজনীতিতে গভীর দাগ কাটে নাই, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও এর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা:

  • হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW): ঘটনার পরপরই ‘উই ড্রাইভ দেম আউট লাইক ডগস’ (We Drive Them Out Like Dogs) শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দাবি করে।
  • এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করে unarmed বা নিরস্ত্র মানুষের ওপর মারণাস্ত্র ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানায়।
  • অধিকার (Odhikar): অধিকার নামক বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থা ৬১ জন নিহতের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করেছিল, যার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অধিকার-এর সম্পাদক আদিলুর রহমান খান ও পরিচালক নাসিরুদ্দিন এলানকে গ্রেপ্তার করে ও সাজা দেয়।

২. বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব:

  • ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর রূপান্তর: শাপলা চত্বরের ঘটনার পর দেশের দক্ষিণপন্থি ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র আকার ধারণ করে।
  • তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন: ৫ মে-র পর থেকে দেশে বিরোধী রাজনৈতিক মত, আলেম-ওলামা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অভূতপূর্ব পর্যায়ে বৃদ্ধি পায়। একই রাতে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৭. উপসংহার ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ

২০১৩ সালের ৫ মে-র শাপলা চত্বর ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সমাবেশের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের এক চরম দৃষ্টান্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জন উচ্চপর্যায়ের দায়ীদের অভিযুক্ত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল এই হত্যাকাণ্ডে জীবন উৎসর্গকারী ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ এক দশক পর কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার লাভ করতে পারে। ট্রাইব্যুনালের এই আইনি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও যেকোনো ধরনের ‘গণহত্যা’ প্রতিরোধে ঐতিহাসিক নজির হিসেবে কাজ করবে।

পালকি

নিউজ ডেস্ক

August 3, 2026

শেয়ার করুন

সংস্কৃতি ও ইতিহাস ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

একসময় গ্রামবাংলা কিংবা শহর—সবত্রই মেঠো পথে ধূলো উড়িয়ে চলে যেত এক কাঠের তৈরি চারকোনা বন্ধ বা ছাদখোলা আভিজাত্যের সিন্দুক। ভেতরের যাত্রী আরাম করে বসতেন, আর বাইরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাইলের পর মাইল সেই ভারী বোঝা কাঁধে বয়ে নিয়ে চলতেন একদল মানুষ। হারিয়ে যাওয়া সেই ঐতিহ্যবাহী বাহনটির নাম ‘পালকি’

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মোটরগাড়ি, ট্রেন কিংবা আধুনিক যানবাহনের দাপটে পালকি আজ ইতিহাস। তবে কেবল একটি বাহন হিসেবেই নয়, সামন্তবাদী সমাজের আভিজাত্যের প্রতীক, রাজপরিবারের ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির এক অনন্য অনুষঙ্গ হিসেবে পালকির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

১. পালকির উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

পালকির ইতিহাস ঠিক কত হাজার বছরের পুরনো, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন হলেও প্রাচীন সভ্যতায় এর অস্তিত্বের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

  • প্রাচীন সভ্যতায় উপস্থিতি: মিসরীয় এবং মায়া সভ্যতার চিত্রলিপিতে পালকি সদৃশ বাহনের ছবি পাওয়া যায়। আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে রচিত মহর্ষি বাল্মীকি-র ‘রামায়ণ’-এ দেব-দেবী ও রাজপরিবারের পরিবহনে পালকির ব্যবহারের বহু উল্লেখ রয়েছে।
  • ধারণার উৎস: ঐতিহাসিকদের মতে, আদিম যুগের মানুষ যখন শিকার করা বড় পশু লাঠির মাঝামাঝি ঝুলিয়ে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসত, মূলত সেই পদ্ধতি থেকেই পরবর্তীতে মানুষ বহনের বাহন বা ‘পালকি’র ধারণার জন্ম হয়।
  • মোগল ও ঔপনিবেশিক আমল: মোগল আমলে রাজপরিবারের নারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ পালকির ব্যবহার ব্যাপক রূপ নেয়। জানা যায়, সম্রাট হুমায়ুনের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা অবস্থায় পালকিতে করে গুজরাটের মরুপ্রান্তরে ভ্রমণকালেই জন্ম দিয়েছিলেন সম্রাট আকবরের। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে এবং জমিদারি প্রথায় ধনকুবের ও রাজ-রাজড়াদের মূল বাহন হয়ে ওঠে এই পালকি।

২. গঠন ও বেহারাদের কঠোর জীবনসংগ্রাম

পালকি মূলত কাঠ দিয়ে তৈরি সিন্দুক বা চেয়ারের আকৃতির একটি হস্তচালিত বাহন।

  • গঠনশৈলী: উপমহাদেশের পালকিগুলো সাধারণত চারকোনা হতো, যার দুপাশে দরজা ও কাপড়ের পর্দা থাকত। কিছু পালকি আবার সিংহাসনের মতো ছাদখোলা হতো। সামনে ও পেছনে থাকা দীর্ঘ কাঠ বা হাতল ধরে কাঁধে তুলে নেওয়া হতো এটি।
  • বেহারা বা কাহার: যাঁরা পালকি বহন করতেন, তাঁদের বলা হতো ‘বেহারা’ বা ‘কাহার’। পালকির আকৃতি ও ওজনের ওপর নির্ভর করে দুই, চার, ছয়, আট এমনকি ষোলো জন বেহারার প্রয়োজন হতো।
  • শ্রমসংগীত ও ‘হুনহুনা’ ছন্দ: মাইলের পর মাইল ভারী বোঝা বইতে গিয়ে ক্লান্তি দূর করা এবং নিজেদের হাঁটার তাল ঠিক রাখার জন্য বেহারারা মুখে মুখে গান বা বিশেষ সুর ভাঁজতেন—যেমন: “হুন হুঁ না, হুন হুঁ না” কিংবা সামনে গর্ত থাকলে বলতেন “সামাল হেঁকে, চলল বেঁকে”। এই গীতিময় শব্দগুলোই মূলত পালকির শ্রমসংগীত হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে পালকির মর্যাদা

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্যানভাসে পালকি ও বেহারাদের জীবনকাহিনি অমর হয়ে রয়েছে।

  • ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত: তাঁর বিখ্যাত ‘পালকির গান’ কবিতায় গ্রামবাংলার তপ্ত রোদে বেহারাদের যাত্রার অনবদ্য ছবি এঁকেছেন:“পালকি চলে! পালকি চলে!/ গগন তলে আগুন জ্বলে!/ স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে/ যাচ্ছে কারা রৌদ্রে সারা…” পরবর্তীতে কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সুরসম্রাট সলিল চৌধুরীর সুরে গান হিসেবে এটিকে অমর করে তোলেন।
  • রবীন্দ্রনাথ ও তারাশঙ্কর: বিশ্বকবির ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় যেমন পালকির কথা আছে, তেমনি জমিদার থাকাকালীন রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে প্রজা পরিদর্শনের জন্য ষোলো বেহারার পালকি ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে শোষিত ও দরিদ্র কাহার সমাজের করুণ বাস্তবচিত্র তুলে ধরেন।

৪. গণসংগীতে পালকি: ভূপেন হাজারিকার ‘দোলা হে দোলা’

পালকিকে কেবল নস্টালজিয়ার বাহন হিসেবে না দেখে, শোষিত শ্রমজীবী মানুষের আড়ালে থাকা ক্ষোভ ও শ্রেণীসংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন কালজয়ী সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা

আমেরিকায় মানবাধিকার কর্মী পল রবসনের সান্নিধ্যে এসে বিশ্ব সাম্যবাদের যে শিক্ষা হাজারিকা পেয়েছিলেন, তারই ফসল তাঁর প্রখ্যাত গান ‘দোলা হে দোলা’ (বাংলা রূপান্তর: শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)। গানে তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন—

  • পালকির ভেতরে যে বসে থাকে, সে হীরে-সোনায় ঝলমল করে।
  • আর যে তাকে কাঁধে নিয়ে চলে, তার পরনে শতছিন্ন কাপড়, পিঠে ক্ষতের চিহ্ন।

গানটির শেষভাগে তিনি চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে গেয়ে ওঠেন— বেহারারা যদি একদিন এক হয়ে কাঁধ সরিয়ে নেয়, তবে রাজা-মহারাজাদের ওই দম্ভের প্রাসাদ ও দোলা এক নিমেষেই ধূলোয় মিশে যাবে।

সমাপনী

রাজত্ব গেছে, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে; প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে এসেছে বাস, ট্রেন ও বিলাসবহুল গাড়ি। ইতিহাসের নিয়মে পালকি আজ রাজপথ ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছে রবীন্দ্রকুঠি, জাতীয় জাদুঘর কিংবা সিনেমার ফ্রেমে। তবে মেঠো পথের ধূলোয় বেহারাদের পায়ের ছাপ আর “হুনহুনা” সুরটি আজও বাঙালি সংস্কৃতির স্মৃতিপটে এক চিরন্তন স্মারক হয়ে রয়ে গেছে।

পিসির স্লো স্পিড দূর করার উপায়

নিউজ ডেস্ক

August 3, 2026

শেয়ার করুন

টেক অ্যান্ড গ্যাজেট ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

দৈনন্দিন অফিসিয়াল কাজ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধীরগতির কম্পিউটার বা ল্যাপটপ কাজের গতি কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি করে চরম মানসিক বিরক্তি। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রসেসর যতই শক্তিশালী হোক না কেন, পর্যাপ্ত র‍্যাম (RAM) এবং এসএসডি (SSD) ছাড়া ডিভাইসের পূর্ণ ক্ষমতা পাওয়া অসম্ভব। বিশেষ করে বর্তমান যুগের আধুনিক অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য ৮ জিবি র‍্যাম এবং উচ্চগতির এসএসডি সংযোগ করা এখন সময়ের দাবি।

র‍্যামের মেমোরি ম্যানেজমেন্ট: যেভাবে বাড়ে কাজের গতি

র্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি বা র‍্যাম মূলত প্রসেসর (CPU) এবং মূল স্টোরেজের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে কাজ করে। ব্যবহারকারী যখন কোনো অ্যাপ বা উইন্ডোজ ফাইল চালনা করেন, তখন সেই ডেটা সাময়িকভাবে র‍্যামে জমা হয়।

  • মসৃণ মাল্টিটাস্কিং: ৮ জিবি র‍্যাম থাকলে গুগল ক্রোম ব্রাউজারে একাধিক ট্যাব খোলা রেখে কাজ করার পাশাপাশি ভারী প্রেজেন্টেশন বা অফিসিয়াল ডকুমেন্ট সহজে সামলানো যায়।
  • ল্যাগ মুক্ত অভিজ্ঞতা: ব্যাকগ্রাউন্ডে জুম (Zoom) বা মাইক্রোসফট টিমস (Teams)-এ অনলাইন মিটিং চলাকালীন ল্যাপটপ হ্যাং হওয়ার ঝুঁকি প্রায় থাকেই না।
  • স্টোরেজের ওপর চাপ কম: পর্যাপ্ত র‍্যাম থাকলে ডিভাইসকে অতিরিক্ত কাজের জন্য ধীরগতির ভার্চুয়াল মেমোরির ওপর নির্ভর করতে হয় না, যা পিসির সার্বিক গতি অক্ষুণ্ণ রাখে।

হার্ড ডিস্ক বনাম এসএসডি: ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি গতি

শুধুমাত্র র‍্যাম বাড়ালেই পিসির স্পিড পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় না, যদি তাতে প্রথাগত মেকানিক্যাল হার্ড ডিস্ক (HDD) যুক্ত থাকে। ডাটা স্থানান্তরে নতুন গতি এনে দিয়েছে সলিড স্টেট ড্রাইভ (SSD)

বৈশিষ্ট্যের তুলনাপ্রথাগত হার্ড ডিস্ক (HDD)আধুনিক এসএসডি (SSD)
উইন্ডোজ চালু হতে সময়১ মিনিট বা তার বেশিমাত্র ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড
অ্যাপ ওপেনিংক্লিকে সময় নেয়, লোডিং বেশিতাৎক্ষণিক (Instant)
শব্দ ও স্থায়িত্বযন্ত্রাংশ ঘোরে, শব্দ হয় বেশিনিঃশব্দ, ঠান্ডা ও তুলনামূলক টেকসই
ব্যাটারি খরচবেশি শক্তি ব্যবহার করেবিদ্যুৎ সাশ্রয়ী (ল্যাপটপের ব্যাটারি বেশি থাকে)

পিসিতে এসএসডি আছে কিনা তা জানার উপায়

আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে দ্রুতগতির এসএসডি রয়েছে কি না, তা সহজেই ডিভাইস থেকে পরীক্ষা করে নেওয়া সম্ভব:

১. কিবোর্ডের Control + Shift + Escape চাপ দিয়ে ‘Task Manager’ খুলুন।

২. বামপাশে বা ওপরের ‘Performance’ ট্যাবে ক্লিক করুন।

৩. বামপাশের ‘Disk’ অপশনে গেলে ডানপাশে আপনার ড্রাইভারটি SSD নাকি HDD তা স্পষ্ট দেখতে পাবেন।

বাজার দর ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

অফিসিয়াল ফাইলপত্র এবং ব্রাউজিংয়ের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতে ২৫৬ জিবি (256GB) স্টোরেজ যথেষ্ট। তবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের জন্য ৫১২ জিবি (512GB) নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

বর্তমানে দেশের বাজারে একটি মানসম্মত ২৫৬ জিবি NVMe SSD পাওয়া যাচ্ছে ৫,০০০ থেকে ৭,৫০০ টাকার মধ্যে এবং ৫১২ জিবি SSD বিক্রি হচ্ছে ৮,৫০০ থেকে ১০,৫০০ টাকার মধ্যে।

সারসংক্ষেপ: কম বাজেটে যেকোনো পুরনো বা নতুন ল্যাপটপকে দ্বিগুণ গতিশীল করতে ৮ জিবি র‍্যামের পাশাপাশি একটি এসএসডি যুক্ত করাই হতে পারে সেরা টেকনিক্যাল সমাধান।

২০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ