ঐতিহ্যবাহী স্থান ও স্থাপনা

বাংলাদেশে সেনাপ্রধান: ইতিহাস, দায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বাংলাদেশ সেনাপ্রধান ইতিহাস |

নিউজ ডেস্ক

October 14, 2025

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান বা সেনাপ্রধান (Chief of Army Staff) দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থাকেন। সেনাপ্রধানের দায়িত্ব কেবল সামরিক কমান্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা, সংবিধান রক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী ও জরুরি পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এই পদে অনেক খ্যাতিমান কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন।


স্বাধীনতার পর থেকে সেনাপ্রধানদের তালিকা ও সময়কাল

১. জেনারেল এম এ জি ওসমানী (Gen. M A G Osmani)

  • পদবী: জেনারেল, পিএসসি
  • সময়কাল: ১২ এপ্রিল ১৯৭১ – ০৬ এপ্রিল ১৯৭২
  • গুরুত্ব: মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনাপ্রধান হিসেবে দেশের স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২. মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ (Maj. Gen. K M Shafiullah)

  • পদবী: মেজর জেনারেল, বিইউ, পিএসসি
  • সময়কাল: ০৭ এপ্রিল ১৯৭২ – ২৪ আগস্ট ১৯৭৫
  • গুরুত্ব: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্থিতিশীল সেনা কাঠামো তৈরি।

৩. লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (Lt. Gen. Ziaur Rahman)

  • পদবী: লেফটেন্যান্ট জেনারেল, বিইউ, পিএসসি
  • সময়কাল: ২৫ আগস্ট ১৯৭৫ – ২৮ এপ্রিল ১৯৭৮
  • গুরুত্ব: বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অস্থির পরিস্থিতিতে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেতৃত্ব প্রদান।

৪. লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ (Lt. Gen. H M Ershad)

  • পদবী: লেফটেন্যান্ট জেনারেল, এনডিসি, পিএসসি
  • সময়কাল: ২৯ এপ্রিল ১৯৭৮ – ৩০ আগস্ট ১৯৮৬
  • গুরুত্ব: দীর্ঘমেয়াদি সেনা প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত।

৫. অন্যান্য সেনাপ্রধানরা (১৯৮৬ – বর্তমান)

নামপদবী / যোগ্যতাসময়কাল
লেঃ জেনারেল এম আতিকুর রহমানজি +৩১ আগস্ট ১৯৮৬ – ৩০ আগস্ট ১৯৯০
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম নূরউদ্দিন খানপিএসসি৩১ আগস্ট ১৯৯০ – ৩০ আগস্ট ১৯৯৪
লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমবিবি, পিএসসি৩১ আগস্ট ১৯৯৪ – ১৯ মে ১৯৯৬
লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানপিএসসি২০ মে ১৯৯৬ – ২৩ ডিসেম্বর ১৯৯৭
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম মুস্তাফিজুর রহমানবিবি, এনডিসি, পিএসসি, সি২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৭ – ২৩ ডিসেম্বর ২০০০
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন-অর-রশিদবিপি, আরসিডিএস, পিএসসি২৪ ডিসেম্বর ২০০০ – ১৫ জুন ২০০২
লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মাশুদ চৌধুরীওসিসি, পিএসসি১৬ জুন ২০০২ – ১৫ জুন ২০০৫
জেনারেল মইন ইউ আহমেদএনডিসি, পিএসসি১৬ জুন ২০০৫ – ১৫ জুন ২০০৯
জেনারেল মোঃ আবদুল মুবীনএনডিসি, পিএসসি১৬ জুন ২০০৯ – ২৫ জুন ২০১২
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াএসবিপি, পিএসসি২৬ জুন ২০১২ – ২৫ জুন ২০১৫
জেনারেল আবু বেলাল মুহাম্মদ শফিউল হকএনডিসি, পিএসসি২৬ জুন ২০১৫ – ২৫ জুন ২০১৮
জেনারেল আজিজ আহমেদবিএসপি, বিজিবিএম, পিবিজিএম, বিজিবিএমএস, পিএসসি, জি২৫ জুন ২০১৮ – বর্তমান

দ্রষ্টব্য:

  • খালেদ মোশাররফ ১৯৭৫ সালের ৩–৭ নভেম্বর সেনাপ্রধান ছিলেন, তবে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত নয়।
  • ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান মোহাম্মদ আবদুর রবকেও সেনাপ্রধান তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব

  1. সেনা ও নিরাপত্তা: দেশের নিরাপত্তা ও সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণ।
  2. রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা: জরুরি সময়ে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রদান।
  3. সংবিধান রক্ষা: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সংবিধান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
  4. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক কৌশলগত নেতৃত্ব।

সেনাপ্রধানরা দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাদের পদকালীন সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিপর্যয় বা অভ্যুত্থান সামলানোও দায়িত্বের অংশ।


প্রামাণিক সূত্র

  1. Bangladesh Army – Chiefs of Army Staff: https://www.army.mil.bd/Chiefs-of-Army-Staff
  2. Wikipedia – List of Chiefs of Army Staff (Bangladesh): https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Chiefs_of_Army_Staff_(Bangladesh)

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক

June 21, 2026

শেয়ার করুন

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ডেস্ক | পালস বাংলাদেশ

ফ্যাক্ট-চেক ও সম্পাদনা: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior SEO Consultant)

সর্বশেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬

আমাদের চিরচেনা এই বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে, তা আমরা অনেকেই পুরোপুরি জানি না। রাজনীতি, কূটনীতি, ফ্যাশন কিংবা প্রকৃতির অপার বিস্ময়—সবখানেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। নিচে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের সম্পর্কে এমন কিছু অসাধারণ তথ্য তুলে ধরা হলো, যার কিছু হয়তো আপনার জানা, আর কিছু তথ্য আপনাকে নতুন করে ভাবাবে:

১. সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসেছে এক অভূতপূর্ব সাফল্য। চীন ও ভারতের পরই বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈশ্বিক রফতানিতেও অবদান রাখছে।

২. বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল এবং জাপানের চিরকৃতজ্ঞতা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে (টোকিও ট্রায়াল) একমাত্র বাঙালি তথা এশীয় বিচারপতি ছিলেন রাধাবিনোদ পাল। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে রায় দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে একপাক্ষিকভা‌বে কেবল জাপানিদের যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা ন্যায়সংগত নয়। তাঁর এই অকুতোভয় ও সুবিচারের রায়ের কারণে জাপান এক বিরাট ক্ষতিপূরণের বোঝা ও গ্লানি থেকে মুক্তি পায়। এই ঐতিহাসিক উপকারের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ জাপান চিরকাল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে।

৩. বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপসাগর: বঙ্গোপসাগর

আমাদের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal) হলো পৃথিবীর বৃহত্তম উপসাগর। এর বিস্তৃতি এবং ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৪. আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকন: বিবি রাসেল

জর্জিও আরমানি বা পিয়েরে কারডিনের মতো বিশ্ববিখ্যাত ডিজাইনারদের পাশে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। ইউরোপের র‍্যাম্প মডেলিং কাঁপানোর পর তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এবং খাদি কাপড়কে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন।

৫. দৈনিক পত্রিকার বিশাল সমাহার

বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগৎ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ২,৮০০-এরও বেশি, যা দেশের মানুষের তথ্যের প্রতি আগ্রহ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এক অনন্য নজির।

৬. নদীর দেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নদী। ছোট-বড়, শাখা ও উপনদী মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ৭,০০০টি নদী রয়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে সত্যি বিরল।

একটু সংশোধন: মালয়েশিয়ার রাজনীতি ও বাঙালি সংযোগের সঠিক ইতিহাস

ইন্টারনেটে মালয়েশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়ে কিছু ভুল তথ্য বা ‘মিথ’ প্রচলিত আছে, যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সংশোধন করে নেওয়া উচিত:

  • ডা. মাহাথির মোহাম্মদ: মালয়েশিয়ার আধুনিকায়নের রূপকার মাহাথির বিন মোহাম্মদের দাদা (পিতার দিক থেকে) ছিলেন একজন ভারতীয় মুসলিম (কেরালা থেকে আগত), যিনি একজন মালয় নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাই তিনি মূলত মালয় ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত, বাংলাদেশি নন।
  • খায়ের জামালউদ্দিন চৌধুরী: মালয়েশিয়ার সাবেক যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী খায়ের জামালউদ্দিনের জন্ম কুয়েতে হলেও তাঁর পৈতৃক পরিবার মালয়েশিয়ারই নাগরিক। তাঁর নামের শেষে ‘চৌধুরী’ পদবিটি যুক্ত থাকার কারণে ইন্টারনেটে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি বাংলাদেশি, যা আসলে সঠিক নয়।
  • চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর: চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হলেও, এটি একমাত্র “প্রাকৃতিক সমুদ্র বন্দর” নয়। পৃথিবীর আরও অনেক বিখ্যাত বন্দর (যেমন- সিডনি হারবার বা নিউইয়র্ক হারবার) প্রাকৃতিক বন্দর হিসেবে স্বীকৃত। তবে এটি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

পালস বাংলাদেশ-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ

বাঙালিদের মেধা, সততা এবং এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে আমাদের এক আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সমসাময়িক ইতিহাস এবং ক্যারিয়ারের সব গুরুত্বপূর্ণ আপডেট সবার আগে পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অফিশিয়াল পোর্টাল পালস বাংলাদেশ-এ।

আপনার জন্য একটি ফলো-আপ প্রশ্ন: এই তথ্যগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যজনক বা নতুন মনে হয়েছে? কমেন্ট করে আমাদের জানান!

প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক

June 2, 2026

শেয়ার করুন

এ ধরণের কয়েকটি প্রশ্ন পেয়েছি। ‌ সে সব উত্তর থেকে একটা কিছুটা কাটছাঁট করে পেস্ট করে দেয়া হলো।

মিশরীয় সভ্যতা

সময়কাল ৩১৫০-৩০ খ্রিস্টপূর্ব

নীল নদের তীরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা উন্নত কালচার, পরাক্রমশালী ফারাও, পিরামিড, স্ফিংস, মমি, হিয়েরোগ্লাইফিক লিপি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছে।

নীল নদে জনপদের উন্মেষ ঘটে ব্রোঞ্জ যুগে। বিভিন্ন যুগ পেরিয়ে খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০ সালে প্রথম ফারাও মিশরকে একীভূত করে নয়া মিশরীয় সভ্যতার সূচনা করেন।

মিশরীয় রাজাদের উপাধি ছিল ফারাও। ফারাও রামেসিস এতটাই দাপুটে ছিলেন যে তার আমলে সমসাময়িক অন্য একটি সভ্যতা নুবিয়ান তার সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। ফারাও সচরাচর ফেরাউন নামে পরিচিত।

ফারাও রামেসিসের মমি

ইহুদি খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থে ফেরাউন রামেসিস-২ এর সাথে ইহুদিদের পয়গম্বর মুসা (আ:) বিবাদ-বিসংবাদের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। এ জন্য সাধারণ মানুষ ফেরাউন নামটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে থাকে।

রাজা রামেসিস-২ প্রতিকৃতি

মিশরের রাজারা দাবি করতেন তারা সূর্য দেবতা আমনের বংশধর। সূর্য দেবতার বংশধর হিসাবে মিশরীয় রাজারা মনে করতেন তারা অমর অজেয়। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে মৃত্যুর পর মমি করে তাঁদের ধন-রত্ন, পাইক বরকন্দাজসহ সমাধিস্থ করা হত। সমাধির উপরে নির্মাণ হতো হতো বিশাল আকৃতির সব পিরামিড। পিরামিডের বিস্ময়কর নির্মাণশৈলীর রহস্য এখনো কেউ উদঘাটন করতে পারেনি।

প্রধান দেবতা আমন ছাড়াও মিশরীয়দের অন্য একজন শক্তিশালী দেবতা ছিলেন ওসাইরিস। তাঁর দায়িত্ব ছিল ন্যাচারাল রিসোর্স, কৃষি কর্ম ও নীল নদ।

ফারাও চতুর্থ আমেনহোটেপ বহু দেবতার বদলে এক দেবতা অর্থাৎ সূর্যদেবতার পূজা করার প্রচলন করেন। তিনি সূর্য দেবতার নাম বদলে ‘আতেন’ রাখেন এবং তার সাথে মিলিয়ে নিজের নাম দেন ‘আখেনাতেন’। সে হিসাবে তাঁকে একেশ্বরবাদী বলা যায় বৈকি।

রানী ক্লিওপেট্রা

মূর্তি নির্মাণে সে যুগে মিশরীয়দের জুড়ি ছিল না। রানী নেফারতিতির চুনাপাথরের মূর্তি দেখলে এখনো তাকে জীবন্ত মনে হয়। মিশরীয় সভ্যতার শেষ পর্বে টলেমি রাজবংশের রানী ক্লিওপেট্রোর সৌন্দর্য যুগে যুগে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছে।

রানী নেফারতিতি

তাদের নির্মিত সূক্ষ্ম কারুকার্য খচিত সুউচ্চ স্তম্ভ (obelisk) বিস্ময় উদ্রেক করে। মিশর বিজয়ের পর রোমানরা অন্তত আটটি স্তম্ভ রোমে নিয়ে যায়। রোম ভ্রমণের সময় এ ধরণে কয়েকটি স্তম্ভ দেখার সুযোগ হয়েছিল।

রোম শহরে পুনঃস্থাপিত মিশরীয় স্তম্ভ (obelisk)

লেখাপড়ার দুনিয়ায় প্রাচীন যুগে মিশরীয়রা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছে। তাদের চিত্রলিপির নাম ‘হায়ারোগ্লিফিক’, তা লেখার জন্য ব্যবহার করত নীল নদীর তীরে গজিয়ে ওঠা নলখাগড়া দিয়ে তৈরি প্যাপিরাস কাগজ।

হায়ারোগ্লিফিক লিপি

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিত শাস্ত্রেও মিশরীয়রা তাদের অবিস্মরনীয় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, পিরামিডের মতো নিখুঁত ত্রিকোণ স্থাপনা তাদের উন্নত জ্যামিতিক জ্ঞানের পরিচয় বহন করে প্রাচীন যুগ থেকে আকাশপানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

মিশরের পিরামিড

মেসোপটেমিয়া সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৫০০

অবস্থান: আধুনিক ইরাক সিরিয়া এবং তুরস্ক

দজলা ফোরাত যা ইউরোপিয়ানদের কাছে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদী নামে পরিচিত, তার মধ্যবর্তী আধুনিক ইরাক এবং প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অনেকগুলো সভ্যতার জন্ম ভূমি। এক কথায় বলা যায় সভ্যতার প্রাচীনতম সূতিকাগার।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সঠিক সূচনা কাল অতীতের গর্ভে লুকিয়ে আছে তবে তার আগে অন্য কোন সভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সত্যিকার অর্থে সভ্য সমাজ বলতে যা বোঝায় এখানেই তার উন্মেষ ঘটে, প্রথম সভ্য মানুষের কলকাকলিতে মুখরিত হয়।

মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৭৫০ সাল পর্যন্ত মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সময়কাল বিবেচনা করা হয়। পরিপূর্ণ সভ্যতা বিকাশের আগে‌ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০ সাল অর্থাৎ আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে কৃষি ও কৃষি কাজে খাদ্যের জন্য পোষ মানিয়ে পশু পালনের চিন্তা মানুষের মাথায় আসে।

মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আগে মানুষ শিল্পকলা জানত না তা নয়‌, তবে তা ছিল‌ লোকজ কালচারের অঙ্গ হিসেবে। মেসোপটেমিয়ায় প্রথম বারের মতো লোকজ কালচারকে সভ্যতার আবরণে মুড়ে পরিশীলিত করে ধাপে ধাপে প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়া হয়।

মেসোপটেমিয়ায় সর্বপ্রথম যে সভ্যতার সূচনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে, এখন থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে। তাদের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে নয়া লিখন পদ্ধতির ‘কিউনিফর্ম’ (Cuneiform), লেখা হতো কাদামাটির নরম শ্লেটে।

কিউনিফর্ম লিপি

সুমেরীয়দেরও দেবতার অভাব ছিল না। মিশরীয়দের মত তাদেরও প্রধান দেবতা ছিল সূর্য দেবতা। নাম ‘শামাশ’।

সুমেরীয় সভ্যতা; প্রাচীন ব্যাবিলন

সুমেরীয় সভ্যতা

মেসোপটেমিয় অঞ্চলের পরবর্তী বিখ্যাত সভ্যতার পত্তন হয় ২০৫০ খ্রিস্টপূর্বে। অ্যামোরাইট নামে সিরিয়ার মরুভূমি থেকে আসা একদল মানুষ এ সভ্যতা গড়ে তোলে। প্রাচীন পৃথিবীতে হাম্মুরাবি ছিলেন এ সভ্যতার প্রাণ পুরুষ। তাঁকে প্রাচীন পৃথিবীতে প্রথম আইন প্রণেতা হিসাবে গণ্য করা হয়। ‌ ভাষা ছিল কিউনিফর্ম। ব্যাবিলনের রয়েছে ‘গিলগামেশের মহাকাব্য’।

রাজা হামুরাবির প্রস্তর মূর্তি

আসিরিয় সভ্যতা

মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে টাইগ্রিস নদীর তীর ঘেঁষে ‘আশুর’ শহর ঘিরে গড়ে ওঠে আসিরিয় সভ্যতা। তাদের সভ্যতাল শুরুতে বিকাশ ঘটে কৃষিকাজ কেন্দ্র করে। শক্তি সঞ্চয় হলে সব যুগেই অন্য জনপদের দিকে নজর পড়ে। আসিরিয়রাও আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে এ কালের উপনিবেশবাদীদের মত লুটপাট করে নিজেদের জনপদ সম্পদশালী করে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়।

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অস্ত্রশস্ত্র সেনাবাহিনী দরকার হয়। সে যুগে তারা তখনকার দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলা। কামান বন্দুক আণবিক বোমা বানানোর টেকনোলজি তাদের জানা ছিল না। তাই লোহার অস্ত্রপাতি তৈরি করে এখনকার ভাষায় গোলন্দাজ বাহিনী বা armoured corps গঠন করে। এখনকার ট্যাংকের প্রাচীন ভার্সনও তারা তৈরি করে, নাম যুদ্ধ রথ।

আসিরিয়রা যে লেখাপড়া পিছিয়ে ছিল না তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। শেষ সম্রাট ‘আশুরবানিপাল’ কর্তৃক নির্মিত কিউনিফর্ম পদ্ধতিতে লেখা ২২০০টি কাদামাটির শ্লেট সম্বলিত লাইব্রেরি পাওয়া গেছে।

সব সভ্যতার পতন হয়। আসিরিয় সভ্যতা টিকে ছিল ৩০০ বছর, পতন হয় ৬১২ খ্রিস্টপূর্বে।

আসিরিয় সভ্যতা; ক্যালডীয় সভ্যতা

ব্যাবিলন শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ক্যালডীয় সভ্যতা। একে নতুন ব্যাবিলনীয় সভ্যতাও বলা হয়। এ সভ্যতার স্বর্ণযুগে ক্ষমতার দেদীপ্যমান ছিলেন নেবুচাদনেজার। খ্রিস্টান, ইহুদি এবং মুসলমানদের ধর্ম পুস্তকে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তার সাম্রারাজ্যের অন্তর্গত জেরুজালেমে ইহুদিদের চিরাচরিত বেয়াড়াপনা এবং বিদ্রোহ করার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের বাসভূমি জেরুজালেম ধ্বংস করে সবাইকে বন্দী করে ব্যাবিলনে নিয়ে আসেন। ইতিহাসে এর নাম Babylonian Captivity অর্থাৎ ব্যাবিলনে বন্দিদশা।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান

প্রাচীন সপ্তাশ্চার্য ভিতর একটা নাম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান। এর নির্মাতা ছিলেন নেবুচাদনেজার। এমন একটা উদ্যান গড়ার জন্য তার রানীর শখ মেটাতে তিনি শহরের চারি দিকের দেয়ালের উপরে এ উদ্যানটি নির্মাণ করেন।

সম্রাট নেবুচাদনেজার।

শুধু ঝুলন্ত উদ্যান নয়, জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাদের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছে। দিনপঞ্জি রচনায় তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ক্যালডীয়রা সপ্তাহকে সাত দিনে এবং দিনকে ১২ জোড় ঘণ্টায় ভাগ করে। তারা আকাশে ১২টি নক্ষত্রপুঞ্জ‌ চিহ্নিত করে ১২টি রাশি চক্রের সৃষ্টি করেন। সে ধারণা সম্বল করে রাশিচক্র নিয়ে ব্যবসা করে এখনো অনেকে আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে চলেছে। বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও তাতে বিশ্বাস করার লোকেরও অভাব নাই।

পূর্বসূরীদের মতো ক্যালডীয়দেরও দেবতার অভাব ছিল না। প্রধান দেবতা ছিল ‘মারডক’।

মেসোপটিয়া সভ্যতার সব থেকে বড় অবদান চাকা আবিষ্কার। এ জন্য এখনো একটা কথা চালু আছে, You don’t have to reinvent the wheel. কারণ, মেসোপোটেমিয়ারা ছয় হাজার বছর আগে তা আবিষ্কার করেছে।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে পারস্যের পদানত হয়ে বেবিলন সভ্যতার পতন হয়।

সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০-১৯০০

অবস্থান: সিন্ধু নদীর অববাহিকায়

আধুনিক উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান এবং উত্তর ভারত।

সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা প্রাচীন পৃথিবীর সব চেয়ে তিনটি পুরনো সভ্যতার একটি। সে তিনটার মধ্যে সাড়ে বারো লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সিন্ধু সভ্যতা ছিল সর্ববৃহৎ। ‌পরবর্তীতে এ অঞ্চলে আরো অনেকগুলো সভ্যতা গড়ে ওঠে। আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে এক নতুন সভ্যতা সাথে করে এনে যুগ যুগ ধরে উপমহাদেশে জনজীবনে যুগান্তকারী প্রভাব রেখেছে। আর্য সভ্যতাও এ অঞ্চলের গান্ধারা এলাকা থেকে শুরু হয়।

সিন্ধু নদীর অববাহিকায় সভ্যতা মহেঞ্জোদারো এবং হরপ্পা সভ্যতা নামে অভিহিত করা হয়।

সিন্ধু অববাহিকা সভ্যতার‌ স্বর্ণ যুগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত। সিন্ধু সভ্যতার রাজধানী নতুন এবং পরিশীলিত টেকনোলজি এবং উন্নত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এ অঞ্চলের সর্বপ্রথম শহর।

খনন করে যে সব দ্রব্যাদি খুঁজে পাওয়া গেছে তাতে প্রমাণ হয় তারা দৈর্ঘ্য, ঘনত্ব এবং সময় পরিমাপের জন্য কলাকৌশল ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিল। চিত্র শিল্প, মৃৎশিল্প এবং আসবাবপত্র তৈরিতেও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিল।

মহেঞ্জোদারো ‌

কোন এক রহস্যজনক কারণে এদুটো সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও সিন্ধু সভ্যতায় নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত যে আধুনিক নগর গড়ে উঠেছিল তা এ যুগের অনেক নগরীকেও হার মানায়।

ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের সড়ক ছিল, পানি সরবরাহের জন্য কূপসহ নানা ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ড্রেন , স্নানাগার , রাস্তায় ড্রেন ও সড়ক বাতি, নগরীতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। মহেঞ্জোদারোর মেয়র সাহেবের নাম জানা যায় নাই তবে আধুনিক যুগের স্ট্যান্ডার্ডেও চার-পাঁচ হাজার বছর আগে তিনি যে এ যুগের অনেকের চেয়ে দক্ষ প্রশাসক ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই।

পারস্য সভ্যতা

সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০-৩৩১

অবস্থান: পশ্চিমে মিশর, উত্তরে তুরস্ক, মেসোপটেমিয়া থেকে সিন্ধু নদ

এক সময় সভ্যতার ধারক পারস্য সাম্রাজ্য ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য।মাত্র দুই শত বছরে ২০ লক্ষ বর্গ মাইল ভূখণ্ডে পারস্য সাম্রাজ্য দক্ষিন মিশর থেকে, গ্রিসের একাংশ, পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের একাংশ পর্যন্ত বিস্তার করেন। বিজ্ঞ সম্রাট এবং সামরিক শক্তি ছিল তাদের সাফল্যের মূলমন্ত্র।

সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ার পূর্বে পারস্যে কয়েক জন নেতা কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন খন্ডে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। কিন্তু সাইরাস, যাকে পরে সাইরাস দি গ্রেট নামে অভিহিত করা হয়, পারস্যকে একীভূত করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।‌ শুরুতেই তিনি ব্যবিলন দখল করেন। তিনি এত দ্রুত গতিতে সাম্রাজ্যঃ সম্প্রসারণ করে চলেছিলেন যে ৫৩৩ খ্রিষ্টপূর্বে সুদূর ভারতীয় উপমহাদেশে অভিযান পরিচালনা করেন।

সাইরাসের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরিরাও দ্বিগুন উৎসাহে সাম্রাজ্য সম্প্রসারনের জন্য দিকে দিকে অভিযান চালান। সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছে তারা সমগ্র মধ্য এশিয়া এবং মিশর সাম্রাজ্যের আওতাভুক্ত করে ফেলে।

তাদের বিজয় রথ থেমে যায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে। মেসিডোনিয়ার কিংবদন্তির সমর নায়ক আলেকজান্ডার দি গ্রেট তাদের পদানত করে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটান।

পারস্যের সম্রাট সাইরাস-২ দি গ্রেট: আচেমিও সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা

পারস্য রাজারা আধুনিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, ডাক ব্যবস্থা প্রচলন করেছিল।

পারস্য রাজাদের শাসন ব্যবস্থা অবকাঠামো নির্মাণের টেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে পরবর্তী অনেক সাম্রাজ্য এমনকি মোগল সাম্রাজ্যও অনুকরণ করেছিল। দিল্লির পাঠান সম্রাট শেরশাহ পারসিক সম্রাটদের রীতিনীতি অবলম্বন করে রাজ্য পরিচালনা করেন। পারস্য রাজাদের অনুকরনে তিনি তৈরি করেন গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড, প্রচলন করেন ঘোড়ার ডাকের ব্যবস্থা।

বিখ্যাত পারস্য সম্রাট দারিয়ুসকে Darius the Great নামে অভিহিত করা হয়। তার সম্রাজ্য ইউরোপের দানিয়ুব নদীর তীর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার পাঞ্জাব নাগাদ বিস্তৃত ছিল।

আনাতোলিয়া সভ্যতা

প্রাচীনকাল থেকেই তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলটি ছিল সভ্যতার সূতিকাগার–নানা জাতির মিলন কেন্দ্র। এলাকাটিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুগে যুগে‌ বিভিন্ন শক্তির মধ্যে বেজে উঠেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি।

আনাতোলিয়ায় সভ্যতার বিকাশ ঘটতে থাকে নয়া নিওলিথিক যুগে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিওলিথিক যুগ শুরু হয় প্রায বার হাজার বছর আগে। নয়া প্রস্তর যুগে মানুষ শিকার ছেড়ে পশুপালন ও চাষবাসের দিকে মনোযোগ দেয়। ৫০-৬০ পরিবার-পরিজনের সদস্যদের নিয়ে এক একটা ইউনিটে বাস করত।

নয়া প্রস্তর যুগের শেষ দিকে আনাতোলিয়া অঞ্চলের শাসন কেন্দ্র কাটালহয়ুকের লোক সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। বর্তমান প্রেক্ষিতে সংখ্যাটি এমন কিছু বড় নয়, তবে প্রাগৈতিহাসিক যুগে তা’ ছিল পৃথিবীর সব চেয়ে জনবহুল শহর।

আনাতোলিয়া–হিট্টাইট সভ্যতা

আনাতোলিয়া সভ্যতা ক্রমবিকাশের ধারাবাহিকতায় চার হাজার বছর আগে কৃষ্ণ সাগরের ওপার থেকে প্রাচীন যুগের অন্যতম সভ্য হিট্টাইট জাতি আনাতোলিয়া হাজির হয়। তারা নিজস্ব কালচারের সাথে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কালচারের মেলবন্ধন এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে উন্নত এক সভ্যতা গড়ে তোলে।

হিট্টাইটরা লোহা উৎপাদন এবং তা থেকে আসবাবপত্র ও অস্ত্রপাতি তৈরিতে দক্ষ ছিল। তাদের তৈরি তীরের ফলা, কুঠার, বর্শাসহ নানা ধরনের দ্রব্যাদির সন্ধান পাওয়া গেছে।

হিট্টাইটরা আনাতোলিয়া এসে থেমে যায়নি। সিরিয়া পর্যন্ত তাদের প্রভাববলয় বিস্তার করলে মুখোমুখি হয় সে যুগের অন্যতম বড় শক্তি মিশরের সাথে। তখন দ্বিতীয় রামেসিস ছিলেন মিশরের ফারাও যাকে আমরা জানি ফেরাউন নামে।

খ্রিস্টপূর্ব ১২৮৬ সালে হিট্টাইট ও মিশরীয়রা শক্তি পরীক্ষায় লেগে গেল। সে যুদ্ধের রণকৌশল ও অন্যান্য ঘটনার বিবরণ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। দুই বছর যুদ্ধের পরও জয় পরাজয়ের মীমাংসা না হাওয়ায় তারা শান্তি চুক্তি করে। এটা ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত শান্তি চুক্তি।

আনাতোলিয়ায– ফিজিয়ান সভ্যতা

কোন শক্তি চিরকাল স্থায়ী হয় না। ইউরোপের উন্নত ফিজিয়ান জাতি হিট্টাইটদের পরাভূত করে আনাতোলিয়ায় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র রাজ্য গঠন করে। কিংবদন্তির মাইডাস যার হাতের ছোয়ায় সব কিছুই স্বর্ণে পরিণত হয়ে যেত, তিনি ছিলেন এই ফিজিয়ান রাজবংশে একজন রাজা।

রাজা মাইডাসের কোন একটা কর্মে মুগ্ধ হয়ে সুরা বা মদের দেবতা তার একটা ইচ্ছা পূরণে সম্মত হন। রাজা চাইলেন, আমি যাতে হাত দিব তাই যেন স্বর্ণের পরিনিত হয়। দেবতা বললেন, ব্যাটা তোমার কপালে দুঃখ আছে, তুমি অন্য কিছু চাও। মাইডাস গোঁ ধরলেন, না, আমার সোনাই চাই। তথাস্তু, ইচ্ছা পূরণ করে দেবতা অলিম্পিক পর্বতে তাঁর বাসস্থানে ফিরে গেলেন।

রাজা মাইডস

দেবতার সাথে দীর্ঘ সময় বাহাস করে তাঁর ক্ষুধা পেয়ে গিয়েছিল। খেতে বসে এক টুকরা মাংসে হাত নিলে তা সঙ্গে সঙ্গে সোনায় পরিণত হয়। যাতেই হাত লাগে সোনা হয়ে যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মাইডাসের বোধোদয় হলো, এ ইচ্ছেটা না করাই ভালো ছিল। তাঁর করুণ অবস্থা দেখে মাইডাসের অতি আদরের কন্যা তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলো। ব্যস, সাথে সাথে সোনার মূর্তিতে পরিণত হয়ে গেল‌ (উপরের ছবিতে দেখুন)। রাজা নদীর কাছে গিয়ে কান্না শুরু করে দিলেন। নদীর বালি স্বর্ণ কণায় পরিণত হয়ে গেল। তাঁর চোখের জলে ইচ্ছেটা ধুয়ে মুছে আবার স্বাভাবিক মানুষে পরিণত হলেন।

ফিজিয়ান রাজ্যকে ঘিরে আরো অনেক কিংবদন্তি আছে। তার একটি গর্ডিয়ান নট। বাংলায় বলা যায় গর্ডিয়ান গিট্টু। বড্ড জটিল গিট্টু। ফিজিয়ান রাজা রাজ্যের প্রবেশ দ্বারে একটা বিমে এ গিট লাগিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যিনি তা খুলতে পারবেন তিনি ভবিষ্যতে এশিয়া শাসন করবেন। কিংবদন্তি আছে, মহাবীর আলেকজান্ডার সে গর্ডিয়ান নট তরবারির একটা আঘাতে দ্বিখন্ডিত করে এশিয়ায় প্রবেশ করেন।

আনাতোলিয়া –লিডিয়া সভ্যতা

রাজা আসে রাজা যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালে আনাতোলিয়ার পশ্চিমে লিডিয়ায় এক উন্নত সভ্যতার উদ্ভব ঘটে। লিডিয়ার রাজা ক্রয়েসাস সে যুগের অন্যতম সুন্দর রাজধানী গড়ে তোলেন। এর পর পারস্য সাম্রাজ্যের শক্তিশালী সম্রাট সাইরাস খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৬ সালে রাজ্যটি দখল করেন।

ক্ষমতার পালাবদলের নিয়মে আলেকজান্ডার পার্শিয়ানদের হটিয়ে আনাতোলিয়া কেড়ে নেন। এর পর দৃশ্যপটে উদয় হয় রোমানদের।

আলেকজান্ডার দি গ্রেট

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার বিনা যুদ্ধে আনাতোলিয়া দখল করে যে উক্তি করেছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে—veni vidi vici, আসলাম দেখলাম জয় করলাম।

প্রাচীন চীন সভ্যতা

সময় কাল: খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০-১০৪৬

অবস্থান: ইয়েলো নদী এবং ইয়াংসি অঞ্চল

চীন সভ্যতা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রধান বহুমুখী সভ্যতা। চীন দেশে যে সমস্ত বংশ প্রথম থেকে শেষ নাগাদ রাজত্ব করেছে তা হিসাবে আনলে চীন সভ্যতার ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিশাল।

চীন সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় ইয়েলো নদীর অঞ্চলে। খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালের কাছাকাছি সময় কিংবদন্তির সম্রাট তার শাসন শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখান থেকে অনেক বংশ চিন ভূখণ্ডে শাসন করেন।

খ্রিস্টপূর্ব ২০৭০ সালে Xia dynasty সর্বপ্রথম সমগ্র চীন ভূখন্ড শাসন করতেন। ‌ তারপর এক এক বংশ বিভিন্ন সময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। পরিশেষে ১৯১২ সালে Xinhai বিদ্রোহের ফলে Qing dynasty পতন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তত দিনে চীন সভ্যতা দুনিয়াকে অনেক কিছু প্রয়োজনীয় আবিষ্কার এবং পণ্য উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে বারুদ কাগজ মুদ্রণ শিল্প, কম্পাস, কামান এবং অন্যান্য অনেক ব্যবহারিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান ও চিন্তাধারা।

চীনারা বিশ্বাস করতো তাদের সমৃদ্ধির পেছনে ড্রাগনের ভূমিকা রয়েছে। চীনের বিভিন্ন শাসনামলের মধ্যে রয়েছে হুয়াংতি রাজা, শাং রাজা, চৌ রাজাদের শাসন। চৈনিক সভ্যতার প্রত্যেকের কিছু কিছু আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। চীনের প্রাচীন দার্শনিক ছিলেন লাও জু। তার চিন্তাকে নাম দেয়া হয় তাওবাদ। চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন কনফুসিয়াস। কনফুসিয়াসের প্রধান অনুসারী মেনসিয়াসও বিখ্যাত।

চীনাদের মধ্যে পূর্বপুরুষ পূজার রীতি চালু ছিল। চীনা বিশ্বাস মতে, পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রভাব পড়ে বংশধরদের উপর। তাই পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তির জন্য তারা খাবার উৎসর্গ করতেন।

শুনতে অবাক লাগতে পারে, বিশ্বকোষ প্রণয়নের সূত্রপাত ঘটে সতের’শ বছর আগে সভ্যতার অন্যতম সূতিকাগার চীন দেশে। তৃতীয় শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী নাগাদ‌ চীনের পন্ডিত বর্গ ও আমলারা মিলে ৬০০ চাইনিজ স্টাইলে বিশ্বকোষ প্রণয়ন করেন। তার প্রায় দু’শটি এখনো টিকে আছে এবং প্রায় ২০ টি ঐতিহাসিকরা ব্যবহার করে থাকেন।

পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজবংশের নির্দেশে চীনারা বিশ্বকোষ প্রণয়ন করতে থাকে। কিং (Qing) রাজবংশের সময় প্রণীত বিশ্বকোষে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তুলনায় তিন চার গুণ বেশি তথ্য সন্নিবেশ করা রয়েছে। চীনের বিশ্বকোষ শুধু তথ্য ভান্ডার নয় বরং অভিধানও বট

গ্রিক সভ্যতা

সময় কাল; খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০–৪৭৯

অবস্থান: ইটালি, সিসিলি, উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিমে সুদূর ফ্রান্স পর্যন্ত

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা সবচেয়ে পুরনো না হলেও দুনিয়ার বুকে অন্যতম যুগান্তকারী সভ্যতা।

গ্রীক সভ্যতার স্থায়ীকাল এত দীর্ঘ যে ঐতিহাসিকরা তা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছে: সনাতন ক্লাসিকাল এবং হেলেনিক যুগ। এত দীর্ঘ সময় যে সমস্ত গ্রিক পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন তাঁরা দুনিয়ায় চিন্তাধারার ক্ষেত্রে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাদের কথা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‌

পৃথিবীর মানুষকে তারা যে সব উপহার দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে অলিম্পিকস এবং গণতন্ত্র ও সিনেট সম্পর্কে ধারনা। জ্যামিতি, জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যার ভিত্তি রচনা করেছেন। পিথাগরাস, আর্কিমিডিস সক্রেটিস ইউক্লিড প্লেটো অ্যারিস্টোটল আলেকজান্ডার দি গ্রেট, তাদের আবিষ্কার, থিওরি, মতবাদ এবং শৌর্যবীর্য পরবর্তী সভ্যতাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।

গ্রীক সভ্যতার আমলে এথেন্সে তৈরি হয়েছিল আধুনিক গণতন্ত্রের কাঠামো। সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল তার নাগরিকদের। গ্রিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসক পেরিক্লিস এথেন্সের ক্ষমতায় বসেন ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই যুগকে এথেন্সের স্বর্ণযুগ বলা হয়। কিন্তু এক সময় স্পার্টার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পেলোপনেসীয় ও এথেন্সের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ডেলিয়ান লীগের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায় এবং এথেন্সের পতন হয়। এরপর এথেন্স স্পার্টার অধীনে চলে যায়।

ভৌগলিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন।‌ নগর রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ হতো না তা নয়। তবে বহিঃশত্রুর আক্রমণ করলে তারা যৌথভাবে তা মোকাবেলা করতে। বারবার পারস্য সাম্রাজ্যের আক্রমণ ঠেকাতে তারা যূথবদ্ধভাবে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। ‌ একবার ম্যারাথন অঞ্চলে শক্তির মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধে গ্রীকরা জয়লাভ করলে একজন গ্রিক সেনা ৪৩ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে দ্রুত এথেন্সে সংবাদ বয়ে আনে, কিন্তু পরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার স্মরণে এখনো অলিম্পিক গেমসের ম্যারাথন দৌড়ের একটা আইটেম রাখা হয়েছে।

দর্শন ইতিহাস জ্যোতির্বিজ্ঞান চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে গ্রিক সভ্যতা মূল্যবান অবদান রেখেছে। ‌মানুষ ও পৃথিবীর উৎস সম্পর্কে ‘সফিস্ট’ (Sophist) নামের এক শ্রেণীর যুক্তিবাদী দার্শনিকের উদ্ভব হয়। বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস এই সফিস্টদের দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিলেন।

দার্শনিক সক্রেটিস

বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের চিন্তা-ধারা ও দর্শন যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। কিন্তু গ্রিসের রাজন্যবর্গ যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে তাকে ৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বে হেমলক বিষ খাইয়ে হত্যা করে। তার ছাত্র দার্শনিক প্লেটো ‘রিপাবলিক’ বইটিতে আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করেন, কিন্তু কোথাও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। তিনি সক্রেটিসের দর্শন সম্পর্কে ‘ডায়ালগস অব সক্রেটিস’ নামের আরেকটি গ্রন্থ লিখে রেখেছেন। নাট্যকার এসকাইলাস লেখেন ‘প্রমিথিউস বাউণ্ড’ এবং ‘আগামেমনন’ নামের দুটি নাটক। একশোটিরও বেশি নাটক লেখেন সফোক্লিস। হেরোডেটাসকে বলা হয় ইতিহাসের জনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন ‘হিপোক্রেটাস’। সূর্যের আলোর প্রতিফলন আমাদের পৃথিবীতে আসে অথচ তিনিই প্রথম উপস্থাপন করেন। এরিস্টটল, পিথাগোরাস এবং টলেমির মতো এক ঝাঁক রত্ন গ্রিক সভ্যতাকে মহিমান্বিত করেছিলেন।

হেলেনিস্টিক সভ্যতা

গ্রিসের উত্তরে মেসিডন অঞ্চলে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা যা হেলেনিস্টিক সভ্যতা নামে পরিচিত। রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ৩৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ভূখণ্ডের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। পারস্যের বিরুদ্ধে গ্রিক শক্তিগুলোকে একত্র করে তিনি হেলেনিক লিগ তৈরি করেন। গুপ্তঘাতকের হাতে ফিলিপ মারা যাওয়ার পর তার ছেলে বীর আলেকজান্ডার পারস্য দখল করেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ৩২৩ খ্রিস্টাপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে মারা যান আলেকজান্ডার। ইতিহাসে তিনি ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট’ নামে পরিচিত। তার মৃত্যুর পর সেনাপতিরা নিজেদের মধ্যে বিশাল সাম্রাজ্য ভাগ করে নেন। হেলেনিস্টিক সভ্যতায়ও প্রচুর জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা হতো।

রোমান সভ্যতা

সময় কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৪৬৫ খ্রিস্টাব্দ

রোমান সাম্রাজ্য খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ৬০০ বছর আগে দৃশ্যপটে উদয় হয়। রোম নগরীর স্থাপনের ব্যাপারে একটা বহুল প্রচলিত কিংবদন্তি রয়েছে। ল্যাটিনদের রাজা রোমিউলাস রোম নগরীর পত্তন করেন।

ক্ষমতার মধ্য গগনে রোম সাম্রাজ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোসহ বিশাল ভূখণ্ড বিস্তার লাভ করেছিল।

প্রাচীন রোমে রাজারা শাসন করতেন কিন্তু তাদের মাত্র ৭ জন ক্ষমতায় থাকতে পারেন। জনগণ তাদের নিজেদের শহর শাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। পরে একটা কাউন্সিল গঠন করে যার নাম সিনেট। রোমের শাসনভার সিনেটের উপর ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবে প্রতিষ্ঠা হয় রোমান রিপাবলিক। রোমের বিখ্যাত শাসনকর্তাদের মধ্যে জুলিয়াস সিজার, ট্রাজন অগাস্টাস উল্লেখযোগ্য নাম।

প্রাচীন পৃথিবীতে রোমান সাম্রাজ্য পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থা অর্থনৈতিক কাঠামো মুদ্রা প্রচলন আইন প্রণয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। এখনো বিভিন্ন দেশের রোমান আইনের আদলে অন্যান্য আইন তৈরি করা হয়েছে।

আইনের শাসন তৈরি করলেও রোমানদের দাস ব্যবস্থা নিষ্ঠুরতার একটা বড় উদাহরন হিসেবে রয়ে গেছে। তারা মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নেহায়েৎ আমোদ-প্রমোদের জন্য তারা গ্লাডিয়েটরদের মধ্যে অস্ত্র যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে লাগিয়ে দিয়ে সম্রাট সহ দর্শকদের বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন। শয্যাশায়ী পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিহত করার জন্য সম্রাটের সিগন্যাল পেলেই তার বুকে বসিয়ে দিত তরবারি।

১১০ খ্রিস্টপূর্বৈ পর থেকে রোম জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী অন্তর্দ্বন্দ্বে। বিখ্যাত জুলিয়াস সিজারকে তার এক ঘনিষ্ঠজন বুকে ছুরি বসিয়ে হত্যা করে। ঘনিষ্ঠজনের বিশ্বাসঘাতকতায় অবাক হয়ে জুলিয়াস সিজার যে উক্তি করেছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে–ব্রুটাস তুমিও !!

জুলিয়াস সিজার

সিজারের মৃত্যুর পর রোমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এসময় উত্থান ঘটে অক্টাভিয়ান সিজার, মার্ক অ্যান্টনি ও লেপিডাসের। পরবর্তীতে অক্টাভিয়ান সিজার লেপিডাসকে পরাজিত করেন

মায়া সভ্যতা

সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ

অবস্থান: বর্তমান মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, এল সালভেদর, বেলিজ

প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকায় বিশাল এলাকা জুড়ে প্রাচীন পৃথিবীর ‌‌অবিশ্বাস্য রকমের সমৃদ্ধ মায়া সভ্যতা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। পুরাতত্ত্ববিদেরা হিসেব করে বলেছেন সভ্যতার যখন রমরমা অবস্থা তখন জনসংখ্যা পৌঁছে যায় এক কোটিতে।

সেন্ট্রাল আমেরিকায় মায়া সভ্যতার অবস্থান

মায়াদের প্রাচীন শহর ইউকাতান থেকে বাঙ্গালীদের অতি পরিচিত মায়া শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে। ইউকাতান ছিল মায়া সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী খ্রিষ্টপূর্ব (২০০০-২৫০ খ্রিষ্টাব্দ)। এ সভ্যতা টিকেছিল প্রায় ২৫০০ বছর। প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে বর্তমান ইংল্যান্ডের দ্বিগুণ জায়গা জুড়ে মায়া

মায়া সভ্যতার সুদীর্ঘ সাড়ে চার হাজার বছর স্থায়ী কালকে তিনটি যুগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। (১) প্রি-ক্লাসিক যুগ (২) ক্লাসিক যুগ, ও (৩) পোস্ট ক্লাসিক যুগ।

বয়স বিবেচনায় মেসোপটেমিয়া, সিন্ধু অববাহিকা এবং মিসরের সভ্যতার চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও মায়ারা সভ্যতার পথে যাতায়াত শুরু করার প্রায় এক হাজার বছর পরে চীন সে পথে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে, পরাক্রমশালী পারস্য ও রোমানদের সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেতে আরও দুই হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।‌ শিল্প বিপ্লবের আগে ইউরোপকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো বহু যুগ। যখন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার বাইরে ইউরোপের জনপদ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়ারা ‌ তখন সভ্যতার প্রদীপ জ্বালিয়ে চারিদিকে উদ্ভাসিত করে ফেলেছিল।

যখন গুটিকয়েক প্রাচীন সভ্যতার বাইরে মানুষ জানত না কীভাবে আবাস গড়তে হয়, সে সময়ে মায়ানরা গড়ে তুলেছিল উঁচু উঁচু স্থাপনা, সমৃদ্ধ করেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগত, উদ্ভাবন করেছিল এমন অনেক কিছু, যা ঐ সময়ের তো বটেই, এ মানুষকেও বিস্ময়ে অভিভূত করে।

দুনিয়ার রীতি–সাম্রাজ্য ও সভ্যতা ধীর লয়ে শুরু হয়, এক সময় সমৃদ্ধির মধ্য গগনে পৌঁছে যায়, তারপর শুরু হয় পতন।

মায়া উন্নতির মধ্যগগনে পৌঁছে সভ্যতার দীপ্তি ক্ষীণ হতে হতে এক সময় বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। পুরাতত্ত্ববিদেরা ঊনবিংশ শতাব্দীতে মায়াদের রেখে যাওয়া স্থাপনা, পুঁথি পত্র ও অন্যান্য আলামত বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধির কথা শুনিয়ে দুনিয়ার মানুষকে চমকে দেন।

পোশাক-আশাক

তখনকার লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পশুর চামড়া ও পশম দিয়ে তৈরি কাপড়চোপড় পরতো।‌ গ্রীষ্মকালে পুরুষেরা উদোম গায়ে থাকলেও শীতকালে নারী পুরুষ নির্বিশেষে কম্বল দিয়ে তৈরি পোশাক পরতো। মেয়েদের মত ছেলেরা লম্বা চুল রাখতো। বিবাহিত মেয়েরা শরীরে উল্কি লাগিয়ে ‌ নো ভ্যাকান্সি‌ নোটিশ টানিয়ে দিত। ভুট্টা দিয়ে তৈরি খাদ্য ‌ তাদের প্রধানত প্রোটিনের যোগান দিত।

জ্যোতির্বিদ্যা‌

তাদের চিন্তা ভাবনা শুধু মাটির দুনিয়ায় আবদ্ধ ছিল না আকাশের গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে ও তাদের গতিবিধি সম্পর্কে নানা তথ্য রেখে গেছে। মঙ্গল ও বৃহস্পতি তাদের গবেষণার বাইরে ছিল না।

মায়াদের তৈরি জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত জটিল চিত্র

মায়া ক্যালেন্ডার

মায়ানরা সময় গণনার ক্ষেত্রে অদ্ভুত বিচক্ষণতার পরিচয় রেখে গেছে। তাদের হিসাব মতে এক বছর সমান ৩৬৫.২৪২০ দিন। বহু শতাব্দী পরে অনেক হিসাব-নিকাশ, যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আধুনিক যুগে বের করেছে এক বছরের সমান ৩৬৫.২৪২৫‌। প্রকৃত সময়ের এত কাছাকাছি কি করে তারা পৌঁছেছিল তা ভাবলে অবাক লাগে।

বিশটা প্রতীক এবং দশটি সংখ্যা বিশিষ্ট মায়াদের তৈরি ক্যালেন্ডার

চান্দ্রমাস চন্দ্র ও চান্দ্র বছরের ব্যাপ্তিও তারা নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করেছিল। অথচ বেশি দিনের কথা নয় ষষ্ঠদশ শতাব্দীতেও সূর্যের চারপাশে পৃথিবী চক্কর দেয় বলে যে মতবাদ প্রকাশ করার জন্য গ্যালিলিওকে ভ্যাটিকানের ধর্ম পণ্ডিতেরা ফাঁসিতে চড়ানোর মতলব করেছিল।

লিখন পদ্ধতি

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকেই মায়ানরা ভিন্ন স্টাইলে হায়ারোগ্লিফিক পদ্ধতিতে ছবি এঁকে ক্যালেন্ডার তৈরি করত। সমস্ত আমেরিকান সভ্যতার তুলনায় মায়ারা লেখার জন্য সবচেয়ে উন্নত রূপ আবিষ্কার করেছিল, যা গ্লাইফস নামে পরিচিত। গ্লাইফস হচ্ছে ছবি বা চিহ্নের মাধ্যমে কোনো বর্ণ বা সাউন্ডকে বর্ণনা করা।

লেখার জন্য মায়ানরা প্রায় ৭০০টিরও অধিক গ্লাইফস ব্যবহার করত। আশ্চর্যজনকভাবে মায়ানদের ব্যবহৃত গ্লাইফসের প্রায় ৮০ শতাংশ বর্তমান সময়ে এসেও পাঠোদ্ধার করা গেছে। মায়ারা তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন ছিল। তাই তারা তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বিবরণ পিলার, দেয়াল এবং পাথরে লিখে রাখত। শুধু তা-ই নয়, তারা বইও লিখত। বইয়ের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই থাকত ঈশ্বর, প্রাত্যহিক জীবনযাপন এবং রাজাদের নানা কথা।

লেখার জন্য গ্লাইফাস

ওষুধ

রোগ ব্যাধির কারণ এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে তা উপশমের উপায় বের করেছিল। কেটে ছিঁড়ে গেলে সেলাই করা শিখেছিল, হাড় ভেঙে গেলে প্লাস্টার, দাঁতের ফাঁকে ফিলিং করার টেকনিক রপ্ত করেছিল। দেড় হাজারেরও বেশি গাছপালা থেকে ওষুধ তৈরি করতো।

ধর্ম ও বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি

শিল্পকর্ম

মায়াদের শিল্পকলা ছিল যুগের তুলনায় অনেক অগ্রসর। কাঠের শিল্পকর্ম, কাচের শিল্প, মৃণ্ময় পাত্র, পাথরের শিল্পকর্ম, দেয়াল লিখন আজও মানুষের মনে বিস্ময় উদ্রেক করে।

কি সুন্দর শিল্পকলা

প্রাচীন যুগে এত সুন্দর শিল্প ভাবতেই অবাক লাগে

মুখোশ

মায়ানরা বিশ্বাস করত পাতাল থেকে দৈত্য এসে তাদেরকে মেরে ফেলতে পারে। এসব দৈত্যদের ভয় দেখাতে মায়ানরা বিভিন্ন মুখোশ পরত। তাদের মুখোশগুলো ছিলো মূলত দৈত্যদের ভয়ের প্রতীক। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। পাতাল থেকে নয় আটলান্টিকের ওপার থেকে স্প্যানিশ দর্সুরা এসে তাদের শেষ চিহ্নটুকু ধূলায় মিশিয়ে দেয়।

ভয়ঙ্কর মুখোশ

পিরামিড

অন্যান্য সমসাময়িক সভ্যতার তুলনায় মায়ারা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক উন্নত ছিল। মায়া এবং আজটেকরা অনেকগুলো পিরামিড তৈরি করেছিল যার কয়েকটি মিশরীয় পিরামিডের চেয়ে বড়।

মায়াদের তৈরি বিশালাকৃতির পিরামিড

মায়া সভ্যতা কি করে হঠাৎ পতন শুরু হলো এবং তারা কোথায় বা হারিয়ে গেল ইতিহাসের এক রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। তাদের বংশধররা এখনো সেন্ট্রাল আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ইনকা সভ্যতা

সময় ১৪৩৭-১৫৩২

বর্তমান পেরু ইকুয়েডর এবং চিলি অঞ্চলে ইনকা সভ্যতা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বে সবচেয়ে বড় সভ্যতা। বর্তমান পেরুতে ছিল তাদের প্রধান শাসনকেন্দ্র এবং দুর্গ।

ইনকারা অত্যন্ত উন্নত সভ্যতা গড়ে তোলে। মিশরের ন্যায় ‌ মৃতদেহ মমি করার কলা কৌশল আয়ত্ত্ব করেছিল। মিশরীয়দের মত এদের প্রধান দেবতাও ছিল সূর্য দেবতা। তাদের দেবতার নামটা কিছু ভিন্ন: ইন্তি। তারা রাজাকে মনে করতেন সাপা ইনকা অর্থাৎ সূর্যের পুত্র।

ইনকাদের সূর্য দেবতা

ইনকা রাজ্যের প্রথম সম্রাট Pachacuti একটা গ্রামকে সমৃদ্ধশালী নগরে পরিণত করেন। তিনি ট্রাডিশন অনুযায়ী পূর্বপুরুষের পূজা করতেন। তার মৃত্যুর পর শাসনভার পুত্রকে দেওয়া হতো কিন্তু সম্পত্তি আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হতো। ফলে তাদের মধ্যে রেষারেষি কম হতো, রাজার উপর শ্রদ্ধাবোধ থাকতো। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মিশরীয়দের মত রাজাকে মমি বানিয়ে রাখত।

তাদের নির্মাণশৈলী ছিল অত্যন্ত উচ্চ স্তরের। তাদের স্থাপিত মাচুপিচু এবং রাজধানী শহর Cusco এখনো বিষ্ময় উদ্রেক করে।

ইনকাদের তৈরি মাচুপিচু শহর

মিশরীয়দের মত ইন করাও প্রেমের তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল।

ইনকাদের তৈরি পিরামিড

আজটেক সভ্যতা

সময় কাল ১৩৪৫-১৫২১

কলম্বাস হানা দেওয়ার আগে মধ্য আমেরিকার বিখ্যাত মায়া সভ্যতার পতন হলে প্রায় ১০০ বছর পরে দৃশ্যপটে আসে আজটেক সভ্যতা। যে সময় আজটেক সভ্যতার উদ্ভব হয় তখন দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা সভ্যতা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বর্তমান মেক্সিকোর তিনটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তিনটা নগরে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিল। ১৩২৫ সালের কাছাকাছি তারা ঝগড়া বিবাদ মিটিয়ে একটা শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তোলে।

তাদের সামরিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল Tenochtitlan শহরে। সেখান থেকে তারা নতুন অঞ্চল দখল করতে থাকে। তবে, রাজা অধিকৃত অঞ্চলের শাসনভার ক্ষমতা গ্রহণ করতেন না। স্থানীয়দের উপর শাসনভার ছেড়ে দিতেন। বিনিময়ে তাদের মোটা অংকের কর প্রদান করতে হত।

ষোড়শ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে ত্রি-শক্তি সম্মিলিত আজটেক সভ্যতা যখন উন্নতির মধ্যগগনে তখন কুখ্যাত হারনান কর্টৈজ স্পেন থেকে তার লুটেরা বাহিনী নিয়ে হাজির হয়। চূড়ান্ত যুদ্ধ আজটেকরা পরাজিত হলে সে সভ্যতার উপর যবনিকা নেমে আসে।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

নিউজ ডেস্ক

May 20, 2026

শেয়ার করুন

বুধবার, ২০ মে ২০২৬: পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে রূপপুর নামক এলাকায় নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ ($Rooppur\ Nuclear\ Power\ Plant$)। রাশিয়া সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিতব্য এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের জ্বালানি খাতে এক যুগান্তকারী বিপ্লব আনতে যাচ্ছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রকল্পের কাজ ২০২৩-২০২৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, বৈশ্বিক করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কারিগরি জটিলতার কারণে এর সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান ২০২৬ সালের সর্বশেষ অফিশিয়াল অগ্রগতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চূড়ান্ত নির্মাণ কাজ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়সূচি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজের উদ্বোধন হয় ৩০ নভেম্বর, ২০১৭ সালে। প্রকল্পটিতে দুটি ইউনিট রয়েছে, যার প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট করে সর্বমোট ২,৪০০ মেগাওয়াট।

  • প্রথম ইউনিট (Unit-1): এই ইউনিটের নির্মাণ কাজ ও পরমাণু জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) হস্তান্তরের মূল ধাপগুলো সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে এর কমিশনিং ও পরীক্ষামূলক চালনা (Test Run) শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
  • দ্বিতীয় ইউনিট (Unit-2): প্রথম ইউনিটের কাজের ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় ইউনিটের রিয়্যাক্টর প্রেশার ভেসেলসহ প্রধান ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তথ্যসমৃদ্ধ গভীর বিশ্লেষণ: নির্মাণ কাজ কত সালে শেষ হবে?

প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ২০২৩ ও ২০২৪ সাল থাকলেও, বর্তমান ২০২৬ সালের বাস্তব পরিস্থিতি এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ ($PGCB$)-এর সঞ্চালন লাইন (Transmission Line) নির্মাণের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে সংশোধিত সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে:

১. প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন (২০২৬-২০২৭)

প্রথম ইউনিটের ভৌত অবকাঠামো ও পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের কাজ প্রায় শতভাগ শেষ। ২০২৬ সালের বর্তমান কোয়ার্টারের তথ্য অনুযায়ী, এটি এখন পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। সঞ্চালন লাইনের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়া সাপেক্ষে, ২০২৬ সালের শেষভাগ অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।

২. দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন (২০২৭-২০২৮)

দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। বর্তমান কাজের গতি বজায় থাকলে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা ২০২৮ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটটির নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ করে এটি থেকেও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, ২০২৮ সালের মধ্যে রূপপুর প্রকল্পের দুটি ইউনিটই পুরোপুরি সচল হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প মেট্রিিক্স ও সময়সীমা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (RNPP) বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং প্রথম পারমাণবিক মেগা প্রকল্প, যা বর্তমানে উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম (Rosatom) এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের মূল মেট্রিিক্স এবং সময়সীমা নিচে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলো:

১. প্রকল্প মেট্রিক্স (Project Metrics)

  • মোট উৎপাদন ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট (দুটি ইউনিট, প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াট)।
  • প্রযুক্তি ও রিঅ্যাক্টর টাইপ: রাশিয়ান ৩+ প্রজন্মের VVER-1200 রিঅ্যাক্টর (যা সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড সম্পন্ন)।
  • প্রাক্কলিত মোট ব্যয়: চুক্তি অনুযায়ী ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ডলারের অবমূল্যায়ন ও টাকার মান হ্রাসের কারণে টাকার অঙ্কে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৩৯ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি) টাকা
  • অর্থায়ন: প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯০% ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া (যা ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য), বাকি ১০% বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।
  • স্থায়িত্ব ও আয়ুষ্কাল: এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর বাড়ানো সম্ভব।
  • জ্বালানি সরবরাহ: একবার জ্বালানি (ইউরেনিয়াম-২৩৫) লোড করার পর তা দিয়ে কেন্দ্রটি টানা দেড় বছর (১৮ মাস) নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে।

২. বর্তমান কাজের অগ্রগতি (Current Status)

  • ১ম ইউনিট: ভৌত নির্মাণ কাজ প্রায় ৯৮% সম্পন্ন। হট এবং কোল্ড রান সহ যাবতীয় প্রাথমিক পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে।
  • ২য় ইউনিট: ভৌত নির্মাণ কাজ প্রায় ৯৩% সম্পন্ন হয়েছে।
  • মোট খরচ: প্রকল্পের নির্ধারিত বাজেটের ৮১% এর বেশি অর্থ ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে।

৩. সংশোধিত প্রকল্প সময়সীমা (Project Timeline)

কোভিড-১৯ মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের (Transmission Line) বিলম্বের কারণে প্রকল্পের মূল সময়সীমা কয়েক দফা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের সর্বশেষ চুক্তি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সময়সীমা নিম্নরূপ:

  • ১ম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন (পরীক্ষামূলক): ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে এটি পূর্ণাঙ্গ ১,২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যাবে।
  • ১ম ইউনিটের চূড়ান্ত বাণিজ্যিক হস্তান্তর: সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী ১ম ইউনিটের কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার ডেডলাইন ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৬
  • ২য় ইউনিটের বাণিজ্যিক হস্তান্তর: দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ সম্পন্ন ও প্রাথমিক হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রা ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৭
  • পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প সমাপ্তি: রাশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ চুক্তির মাধ্যমে পুরো প্রকল্পের সামগ্রিক আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির সময়সীমা জুন, ২০২৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হলে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৯ শতাংশ পূরণ করবে। [

ভবিষ্যৎ রূপরেখা: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কার্বনমুক্ত অর্থনীতি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে তা বাংলাদেশের বেস-লোড বিদ্যুৎ (Base-load Power) সরবরাহের প্রধান উৎসে পরিণত হবে। কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এটি দেশকে দীর্ঘমেয়াদী এবং সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে কোনো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হবে না, যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এবং বাংলাদেশের কার্বনমুক্ত গ্রিন এনার্জি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

প্রতিবেদক: Senior SEO Consultant BDS Bulbul Ahmed

পোর্টফোলিও ও যোগাযোগ: BDS Bulbul Ahmed Portfolio

বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্ট, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিড ও জ্বালানি খাতের আপডেট এবং সমসাময়িক উন্নয়ন খবরের গভীর ও প্রফেশনাল ইনফরমেশনাল কন্টেন্ট পড়তে নিয়মিত ভিজিট করুন পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ