রাজনীতি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
মোদী-মমতা টানাপোড়েনে উত্তর-পূর্ব ভারতের (Seven Sisters) ভবিষ্যৎ, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিষয়ক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলোর জটিল প্রভাব আছে। রাজনীতিতে কেউ অস্থায়িত্ব বা সীমান্ত সংঘাতকে দ্রুত নিজের লাভের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে — কিন্তু ঐতিহাসিক এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ বলে: “সেভেন-সিস্টার্স ভাঙলে মমতা ব্যানার্জির স্বাভাবিক লাভ হবে না”। বরং রাজ্যের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-যাপনেই গুরুতর ক্ষতি হবে — যা রাজনৈতিক নেতার জনপ্রিয়তাকেই ক্ষয় করবে। নিচে ইতিহাস, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও সূত্রবিশ্লেষণসহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হলো।
১) “সেভেন-সিস্টার্স” (Seven Sisters) কি এবং কেন ভাঙার কথা বলা হয়
উত্তর-পূর্ব ভারতের Seven Sisters বলতে বুঝায় — আরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়া, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা। ভূগোলগতভাবে এরা মূল ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন; বহু এথনো-রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র আবেদন এখানে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যমান। ইতিহাস ও সামাজিক–রাজনৈতিক পটভূমি থেকে অটোনমি-চাহিদা, ভাষাগত ও জাতিগত ভিন্নতা—এসব কারণে এ অঞ্চলে কখনো কখনো “বিভাজন” বা স্বায়ত্তশাসন-আন্দোলনের কথা উঠে আসে। এমন সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতার কথাবার্তা সামাজিক মিডিয়া বা রাজনৈতিক মিমে সময়মতো জোরালোও হয় — কিন্তু বাস্তবে এর জটিলতা অসামান্য।
২) যদি উত্তর-পূর্ব ভেঙে যায় — মমতা-বিত্রিক্ত কি সরাসরি লাভ পেতে পারেন? (বিশ্লেষণ)
উত্তর — বাস্তবে না। তার কয়েকটি কারণ:
ক. প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা-অস্থিতিশীলতা: কোনো রাজ্য বা অঞ্চল ভেঙে গেলে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসন উভয়ের মধ্যকার সমন্বয় ভাঙে; আইন-শৃঙ্খলা নড়বড়ে হয় এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী/বহিঃপ্রবাহিত সংঘঠনের সুযোগ বাড়ে — যা সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করে। দীর্ঘমেয়াদে এমন অস্থিরতাই রাজ্য-শাসকের জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
খ. অর্থনৈতিক ও মানবিক দায়: সীমান্ত-বিভাজন কিংবা সশস্ত্র সংঘাতে ব্যবসা, কৃষি, রেলপথ ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; উদ্বাস্তু স্রোত ও শরণার্থী সঙ্কট তৈরি হয়। এসব চ্যালেঞ্জ রাজ্য সরকারের কর্মক্ষমতা ও ভোট-ভিত্তিক বিশ্বাসযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে — তাই মমতার রক্ষণশীল ভোট-ভিত্তিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গ. কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের বাড়তি সুযোগ: সীমান্তে বড় ধরনের অশান্তি সৃষ্টি হলে কেন্দ্র সাধারণত নিরাপত্তা-প্রশাসন জোরদার করে; প্রয়োজনীয়তায় কেন্দ্র রাজ্যে অতিরিক্ত শক্তি মোতায়েন বা হস্তক্ষেপ করতে পারে — এমন পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমে যায়। ভারতীয় সংবিধানের Article 356–এর ব্যবহার অথবা রাষ্ট্রপতি শাসন (President’s Rule)-এর প্রাধান্য এমন পরিস্থিতিতে যে-কোনো রাজ্যের জন্য জটিলতা বাড়াতে পারে (তবে আদালত ও আইনি বাধ্যবাধকতার আলোচনা থাকে)। সৌজন্যসূত্র: Article-356 বিশ্লেষণ ও S.R. Bommai মামলার পর আদালত-নিয়ন্ত্রিত বিধি।
এগুলোকে মিলিয়ে দেখা গেলে — দেশান্তর বা সীমান্ত-উত্তেজনা থেকে মমতার “তাত্ক্ষণিক লাভ”ের সম্ভাবনা অতি কম; বরং রাজ্য-স্তরে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বেশি দেখা যাবে।
৩) মমতা কেন মোদির বিরুদ্ধে বারবার কণ্ঠ তুলে থাকেন? (প্রেক্ষাপট ও কারণ)
মোদী-বিরোধে মমতার বক্তব্য কেবল ব্যক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নয়; এর পেছনে কয়েকটি স্থায়ী কারণ রয়েছে:
- ফেডারেল বনাম কেন্দ্রীয়করণ: মমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয়করণের বিরুদ্ধে—তিনি রাজ্য স্বায়ত্তশাসন ও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে সরব; সেই ভূমিকা থেকেই তিনি মোদী সরকারের নীতির সমালোচনা করেন।
- রাজনৈতিক কৌশল ও ভোট-গণনা: তৃণমূল-বিজেপি প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী; জাতীয় পর্যায়ে বিজেপির প্রসারের সঙ্গে রাজ্য-রাজনীতির সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় মমতা মোদীর সাপেক্ষে কড়া বক্তব্য নেয়া চালিয়ে যাচ্ছেন।
- সামাজিক-ধর্মীয় ইস্যুতে ভিন্নতা: মমতা প্রায়ই ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের পক্ষে রটান; তিনি বুঝেন এ ইস্যু রাজ্যের ভোট-পরিবেশে সংবেদনশীল।
সংক্ষেপে, মমতার বিরোধিতা ব্যক্তিগত স্তরের তিক্ততা নয়—এটি রাজ্য-স্বার্থ, ফেডারেল নীতির রক্ষা ও ভোটীয় কৌশল মিলিয়ে গঠিত প্রতিক্রিয়া।
৪) সীমান্তে সমস্যা হলে “সেভেন-সিস্টার্স” ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি — বাস্তব উদাহরণ ও সাম্প্রতিক সূচক
- Push-back অবস্থা ও মানবাধিকারের উদ্বেগ: সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, ভারতীয় সীমান্তে অননুমোদিত অনুপ্রবেশকারীদের ‘push-back’ বা ঠেলে দেয়ার ঘটনা বেড়েছে, যা বাংলাদেশে মানবতাবিধ দ্বন্দ্ব ও কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে — এ ধরনের ঘটনাবলী সীমান্তগত উত্তপ্ত পরিবেশ তৈরি করে।
- উত্তর-পূবের ইতিহাস ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঝুঁকি: উত্তর-পূর্বে জাতিগত ও স্বাধীনতাবাদী বিস্তার থাকায় বাইরে থেকে উসকানি বা সংঘাত হলে সেখানকার রাজ্যগুলোর দিকে অগ্নিবিন্দু সরানো সহজ হয়; দখল-সহায়তা বা বিদ্বেষমূলক ঘটনা উভয়-পক্ষেরই জন্য ক্ষতিকর।
এই সব বিবেচনায় সীমান্তে সংঘাত হলে পশ্চিমবঙ্গও সরাসরি মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ক্ষতির মুখে পড়বে — যা কোনো রাজ্যনেতার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।
৫) আইনি/রূপকারীর প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ: ইতিহাস ও বিধি
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট S.R. Bommai v. Union of India (1994)–এর রায় কেন্দ্রের আর্টিকেল-356 ব্যবহারে নিয়ামক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে; আদালত জানিয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসন আরোপ স্বতঃস্ফূর্ত নয়—তবে বাস্তবে রাজনৈতিক সংকটের সময় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের পথ খোলা থাকে এবং এটি রাজ্য-রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। অতঃপর, সীমান্তে বড় অশান্তি গেলে কেন্দ্রীয় জোরদার পদক্ষেপের সম্ভাবনা থাকে।
উপসংহার — নীতিগত সিদ্ধান্ত (সংক্ষিপ্ত)
- সেভেন-সিস্টার্স ভাঙার ফলে মমতা-ব্যানারজির সরাসরি ও টেকসই লাভের সম্ভাবনা নগণ্য। বিভাজন সাধারণত প্রশাসনিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় — যা রাজ্য নেতাদের ক্ষমতা দুর্বল করে।
- মমতার মোদি-বিরোধ বিতর্কমূলক হলেও তা রাজ্য-স্বার্থ, কেন্দ্রীয়করণ বিরোধ ও ভোট-কৌশল থেকে উদ্দীপ্ত।
- সীমান্ত সংঘাত হলে উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; রাজনৈতিক ‘লাভ’ নয়, বিপর্যয় সম্ভাব্য।
রেফারেন্স (চয়নিত উৎস — গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি)
- The Diplomat, “India Persists With ‘Push Back’ of Undocumented Migrants”.
- Al Jazeera, “Foreigners for both nations: India pushing Muslims ‘back’ to Bangladesh”.
- The Daily Star / TBS (Bangladesh), প্রতিবেদন: BSF push-ins এবং সীমান্তপ্রসঙ্গ।
- Wikipedia — S. R. Bommai v. Union of India (1994) (Article 356-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা)।
- Conflict & insurgency analyses — উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস ও সমস্যা (সংগ্রহীত বিশ্লেষণ ও রিপোর্ট)।
- সাম্প্রতিক সংবাদ: Times of India, Mamata-Modi সাম্প্রতিক টানাপোড়েন (উল্লেখিত জাতীয় রাজনৈতিক মন্তব্য)।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: জাতীয়
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গণপরিষদের কার্যবিবরণী, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনা।
আজ ৪ নভেম্বর, ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ সংবিধান দিবস’। ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় এই দিনটি উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়েছিল। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১১ মাসের মাথায় কীভাবে একটি বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী সংবিধান লাভ করেছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। নিচে বাংলাদেশের সংবিধান রচনা ও গ্রহণের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

১. পটভূমি ও গণপরিষদ আদেশ জারি
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজস্ব আইনি কাঠামোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। এর পরদিনই অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি তিনি ‘অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন করা হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে এই গণপরিষদ গঠিত হয়, যার মূল দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
২. খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন
গণপরিষদের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘সংবিধান প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। এই কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এছাড়া তৎকালীন বিরোধী দলের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
কমিটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশের সংবিধান পর্যালোচনা এবং দেশের আপামর জনসাধারণের মতামত সংগ্রহের জন্য তারা ব্যাপক উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরের জনগণের কাছ থেকে মোট ৯৮টি লিখিত প্রস্তাব সংগ্রহ করা হয়েছিল। ভারত ও যুক্তরাজ্যের সংবিধানকে মূল ভিত্তি ধরে খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলে।
৩. খসড়া উত্থাপন ও বিতর্ক
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান বিল আকারে উত্থাপন করেন। ১৯ অক্টোবর থেকে এর ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।
সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও ধারা নিয়ে গণপরিষদে ব্যাপক বিতর্ক ও আলোচনা হয়। গণপরিষদের সদস্যরা বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মোট ৪১টি অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার পর সংবিধানের প্রতিটি বিষয়কে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয়।
৪. সংবিধান গ্রহণ ও কার্যকর
অবশেষে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সালে গণপরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশের সংবিধান’ গৃহীত হয়। সংবিধান গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্তে লিখিত, এ সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।”
এর ঠিক দেড় মাস পর, অর্থাৎ বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী—১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২ থেকে এই সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল হাতে লেখা, যা শিল্পী হাশেম খানের নকশায় এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রউফের হাতের লেখায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেছিলেন গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ।
একটি দেশের সংবিধান কেবল কিছু আইনের সমষ্টি নয়, এটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ ছিল চারটি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সময়ের আবর্তে এই সংবিধানে বহু পরিবর্তন ও সংশোধনী আনা হলেও, ৪ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সবসময়ই অনস্বীকার্য। তরুণ প্রজন্মের জন্য নিজেদের অধিকার ও রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা বুঝতে সংবিধান রচনার এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৪ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: অর্থনীতি
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank FX Reference), ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (EBL Currency Tracker), জাগোনিউজ২৪ মুদ্রা বাজার প্রতিবেদন এবং ওয়াইজ (Wise) রিয়েল-টাইম এক্সচেঞ্জ ডেটা।
বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় (Remittance) পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলার, ইউরো ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের বর্তমান রেট জানা অত্যন্ত জরুরি। ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সর্বশেষ অফিসিয়াল ডেটা এবং খোলা বাজারের লেনদেন হারের ওপর ভিত্তি করে আজকের বিস্তারিত রেট নিচে তুলে ধরা হলো।
১. একনজরে আজকের প্রধান প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার
আন্তর্জাতিক ইন্টারব্যাংক মার্কেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী আজকের প্রধান তিনটি মুদ্রার গড় ক্রয় (Buying Rate) ও বিক্রয় মূল্য (Selling Rate) নিচে দেওয়া হলো:
- মার্কিন ডলার (USD): বাংলাদেশ ব্যাংকের আজকের অফিসিয়াল এফএক্স রেফারেন্স রেট অনুযায়ী প্রতি ডলারের মূল্য ১২৪.৩৫ টাকা থেকে ১২৪.৫০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। ব্যাংকভেদে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি ১২৩.৩০ টাকা (ক্রয়) এবং ১২৪.৮০ টাকা (বিক্রয়) পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে।
- ইউরো (EUR): ইউরোপীয় একক মুদ্রা ইউরোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আজ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশি টাকায় আজ ১ ইউরোর গড় বাজার মূল্য বা মিড-মার্কেট রেট প্রায় ১৪০.১১ টাকা। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এটি সর্বোচ্চ ১৪১.৭৪ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হচ্ছে।
- মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR): মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য আজ রিঙ্গিতের রেট বেশ স্থিতিশীল। ৪ নভেম্বর ২০২৬-এর লাইভ কারেন্সি চার্ট অনুযায়ী ১ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত সমান ৩০.৬৩ টাকা (মিড-মার্কেট রেট)। বিভিন্ন রেমিট্যান্স হাউজ ও ব্যাংকে এটি ৩০.২৫ টাকা (ক্রয়) এবং ৩০.৬৬ টাকা (বিক্রয়) সীমার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।

২. বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (MYR) রেটের তুলনা
প্রবাসীদের সুবিধার্থে নিচে একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো। মালয়েশিয়া থেকে ১০০০ রিঙ্গিত বাংলাদেশে পাঠালে আজ কোন মাধ্যমে চার্জ ছাড়া আনুমানিক কত টাকা পাওয়া যাবে তা দেখে নিন:
- Wise (অনলাইন ট্রান্সফার): বিনিময় হার ৩০.৫৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৫৪০ টাকা।
- Agrani Remittance House: বিনিময় হার ৩০.৪৫ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৫০ টাকা।
- Al-Rajhi Bank: বিনিময় হার ৩০.৪৪ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৪৪Tokens বা টাকা।
- Western Union (ক্যাশ পিকআপ): বিনিময় হার ৩০.৩৯ টাকা। ১০০০ রিঙ্গিতে পাবেন ৩০,৩৯০ টাকা।
৩. আন্তর্জাতিক কার্ড পেমেন্ট ও ই-কমার্স রেট
আপনি যদি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড (যেমন- EBL, City Bank, বা অন্যান্য ডুয়াল কারেন্সি কার্ড) ব্যবহার করে ই-কমার্স পারচেজ কিংবা ফেসবুক/গুগল বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করতে চান, তবে আপনার জন্য রেট কিছুটা ভিন্ন হবে। আজ বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড এনডোর্সমেন্ট রেট প্রতি ডলারের জন্য ১২৪.৯৫ টাকা থেকে ১২৫.২০ টাকা পর্যন্ত ধার্য করা হয়েছে (ভ্যাট ও ব্যাংক প্রসেসিং ফি আলাদা প্রযোজ্য)।
- রেট পরিবর্তনশীল: কারেন্সি এক্সচেঞ্জ রেট বা মুদ্রার মান প্রতি সেকেন্ডে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টাকা কিংবা রেমিট্যান্স পাঠানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আপনার নিকটস্থ ব্যাংক শাখা বা অনুমোদিত মানি চেঞ্জারের লাইভ স্ক্রিন থেকে রেটটি কনফার্ম করে নিন।
- হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম বর্জন করুন: যেকোনো ধরনের অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে টাকা পাঠানো আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল কিংবা সরকার অনুমোদিত মানি ট্রান্সফার অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠালে সরকার ঘোষিত ২.৫% নগদ প্রণোদনা সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হবে এবং আপনার কষ্টার্জিত অর্থ শতভাগ নিরাপদ থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিষয়ঃ
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: পালস বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশের তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বিভাগ: ইতিহাস
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪, বাংলা ট্রিবিউন ও যুগান্তরের প্রতিবেদন এবং আদালতের রায়-সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন
৩ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত, অন্ধকারের दिन এবং দ্বিতীয় কলঙ্কময় অধ্যায়, যা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নিরাপদ প্রকোষ্ঠে বন্দি অবস্থায় স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার চার জাতীয় নেতা হলেন:
- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুজিবনগর সরকারের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
- তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী)
- ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী (মুজিবনগর সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী)
- এ এইচ এম কামারুজ্জামান (মুজিবনগর সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী)
নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে একদল সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। তৎকালীন এই খুনি সরকার আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে, যার ধারাবাহিকতায় এই শীর্ষ চার নেতাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে খন্দকার মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান (Counter-coup) শুরু হয়। খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পতন আসন্ন। যদি আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ চার নেতা জীবিত থাকেন, তবে তারা পুনরায় দেশের হাল ধরবেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালিত হবে। তাই দেশকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বহীন ও অভিভাবকহীন করার চূড়ান্ত নীল নকশা হিসেবে কারাগারে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

সেই ভয়াল রাতে কারাগারে যা ঘটেছিল
৩ নভেম্বর ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে খাকি পোশাক পরিহিত এবং স্টেনগান ও এসএলআর (SLR)-এ সজ্জিত পাঁচজন সেনাসদস্য একটি পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। এদের নেতৃত্বে ছিলেন রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।
তৎকালীন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) কাজী আবদুল আউয়াল প্রথমে তাদের কারাগারে ঢুকতে বাধা দেন। তবে বঙ্গভবন থেকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি নির্দেশ পাওয়ার পর কারা কর্তৃপক্ষ খুনিদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। এরপর জেলার আমিনুর রহমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় আলাদা আলাদা সেলে থাকা চার নেতাকে ডেকে এনে একটি কক্ষে একত্রিত করার জন্য। চার নেতাকে একটি কক্ষে একত্র করার পর ঘাতকেরা তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে। গুলি করার পর মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাদের শরীর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়।
মামলার এজাহার (FIR) ও তদন্তের বিবরণ
হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তৎকালীন ডিআইজি প্রিজনস কাজী আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার প্রথম তথ্য বিবরণী বা এজাহারে (FIR) উল্লেখ করা হয় যে, ৩ নভেম্বর ভোররাতে রাষ্ট্রপতির মৌখিক নির্দেশের কথা বলে কয়েকজন অবাধ্য সেনাসদস্য জোরপূর্বক কারাগারে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন জেনারেলে সেলে বন্দি জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে স্টেনগান ও রাইফেল দিয়ে ব্রাশফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
মামলার পর তৎকালীন উপ-পুলিশ সুপার সাইফুদ্দিন আহমেদকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হলেও তাকে কারাগারে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে সামরিক সরকারগুলোর অনীহার কারণে দীর্ঘ ২১ বছর মামলার নথিপত্র, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচার বিভাগীয় কমিশনের ফাইল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আইনগত বাধা দূর হওয়ার পর সিআইডি (CID)-র তৎকালীন কর্মকর্তা আব্দুল কাহাত আকন্দ নতুনভাবে তদন্তভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৮ সালে ২৩ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন।
তৎকালীন আইনি নথি ও আদালতের চূড়ান্ত রায়
দীর্ঘ আইনি জটিলতা শেষে বিচারিক আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সর্বমোট ১৫ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়:
- মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (৩ জন): সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি (১২ জন): অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সহযোগিতার জন্য (দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ ধারা) খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, রাশেদ চৌধুরী, আহমেদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, মোহাম্মদ কিসমত হাশেম এবং নাজমুল হোসেন আনসারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
(উল্লেখ্য, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও মহিউদ্দিন আহমেদকে অন্য একটি মামলা অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে)।
২০০৮ সালের হাইকোর্টের বিতর্কিত রায় ও ২০১৩ সালের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
২০০৪ সালের বিচারিক (নিম্ন) আদালত রায় দিলেও ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে (تৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে) হাইকোর্ট বিভাগ এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত রায় প্রদান করেন।
হাইকোর্টের তৎকালীন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে কেবল ১ জন আসামির (রিসালদার মোসলেম উদ্দিন) মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অন্যদিকে, নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ২ জন আসামি—দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে সম্পূর্ণ খালাস দেওয়া হয়। সেই সাথে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৪ জন আসামি—সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও এই মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়। আদালতের যুক্তি ছিল, এই চারজনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
২০০৯ সালে এই বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি) দায়ের করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের ২০০৮ সালের রায়টিকে আইনি ভিত্তির অভাব ও ভুল পর্যালোচনার কারণে সম্পূর্ণ বাতিল (Dismiss) করে দেন।
আপিল বিভাগ তাদের রায়ে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা এবং একই খুনি চক্রের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক নীল নকশা। তাই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে আসামিদের খালাস দেওয়া আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। আপিল বিভাগ ২০০৮ সালের হাইকোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ২০০৪ সালের নিম্ন আদালতের মূল রায়টিকেই হুবহু বহাল রাখেন। এর ফলে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড পুনরায় পুনর্বহাল হয় এবং বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে।
পলাতক আসামিদের বর্তমান অবস্থা ও প্রত্যর্পণের আইনি বাধা
আইনি নথির ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত মূল আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক রয়েছেন এবং ১ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে। এদের বর্তমান সর্বশেষ অবস্থা নিম্নরূপ:
১. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; ভারতে আত্মগোপনে থাকার গুঞ্জন থাকলেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনও অজানা।
২. দফাদার মারফত আলী শাহ (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; তার বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
3. দফাদার আবুল হাসেম মৃধা (মৃত্যুদণ্ড): পলাতক; নিখোঁজ ও অবস্থান অজানা।
৪. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আব্দুর রশিদ (যাবজ্জীবন): পলাতক; লিবিয়া ও পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করার তথ্য রয়েছে।
৫. লে. কর্নেল (অব্যাহতি) শরিফুল হক ডালিম (যাবজ্জীবন): পলাতক; পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়।
৬. লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক;加拿大য় রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৭. লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী (যাবজ্জীবন): পলাতক; যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।
৮. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার (যাবজ্জীবন): পলাতক; কানাডায় অবস্থান করছেন।
৯. মেজর (অব.) আহমেদ শরিফুল হোসেন (যাবজ্জীবন): পলাতক; অবস্থান অজ্ঞাত।
১০. াক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ কিসমত হাশেম (যাবজ্জীবন): পলাতক থাকা অবস্থায় কানাডায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
১১. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আব্দুল মাজেদ (যাবজ্জীবন): সাজা কার্যকর। দীর্ঘদিন ভারতে পলাতক থাকার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি বাধা:
লে. কর্নেল এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং লে. কর্নেল রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক থাকলেও দেশ দুটির অভ্যন্তরীণ আইনি জটিলতার কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
কানাডার ‘Extradition Act’ (কানাডিয়ান প্রত্যর্পণ আইন) এবং ‘কানাডিয়ান চার্টার অব রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডমস’-এর ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী—কানাডা সরকার এমন কোনো দেশে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ বা ফেরত পাঠাতে পারে না যেখানে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেহেতু নূর চৌধুরী বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তাই কানাডা তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (Asylum) নিয়ে অবস্থান করছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে নিজ দেশে ফেরত গেলে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অবিচারের শিকার হতে পারেন, তবে তাকে সুরক্ষামূলক আশ্রয় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চাওয়ার পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের ফাইলটি নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও, সে দেশের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের আপিল ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঝুলে রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের সাথে কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকাও একটি বড় আইনি প্রতিবন্ধকতা।
জাতীয় চার নেতার রাজনৈতিক সততা, সাহস এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল আনুগত্য চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



