ঐতিহ্যবাহী স্থান ও স্থাপনা
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
🖊 প্রতিবেদক:
বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস: ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি
ঢাকা, বাংলাদেশের রাজধানী, যেটি তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত, এর প্রতিটি এলাকা এবং সড়কের নামের পেছনে রয়েছে অনেক ধরনের গল্প। এই নামগুলো শুধু শহরের ভূগোল নয়, বরং এর ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনধারা প্রতিফলিত করে। ঢাকার প্রতিটি নামকরণের পেছনে এক সময়কার ইতিহাস, ব্যক্তিগত অবদান বা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। আসুন, এক নজরে দেখি ঢাকা শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকার নামকরণের ইতিহাস।
ভুতের গলি:
ঢাকার পুরনো অঞ্চলের অন্যতম পরিচিত নাম “ভুতের গলি”। এটি একটি আকর্ষণীয় নাম, যার পেছনে রয়েছে এক ব্রিটিশ ব্যক্তি, যার নাম ছিল Mr. Boot। তার নাম থেকেই “বুটের গলি” নামকরণ হয়েছিল, যা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে “ভুতের গলি” হয়ে যায়।
এলিফ্যানট রোড:
এলিফ্যানট রোডের নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা। পিলখানা থেকে হাতিগুলো “হাতির ঝিল” এ গোসল করতে যেতো এবং এরপর রমনাপার্কে রোদ পোহাতো। এই হাতিদের যাতায়াতের পথের নাম হয়ে যায় এলিফ্যানট রোড, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করে।
ধানমন্ডি:
ঢাকার ধানমন্ডি এলাকাটি এক সময় বিখ্যাত ছিল ধান এবং অন্যান্য শস্য বিক্রির জন্য। এখানে এক সময় একটি বিশাল হাট বসতো, যা এলাকার নামকরণের অন্যতম কারণ ছিল।
গেন্ডারিয়া:
“গেন্ডারিয়া” নামটি এসেছে ইংরেজি শব্দ “Grand Area” থেকে, যা প্রাচীন ঢাকার অভিজাত মহলকে চিহ্নিত করতো। এই এলাকায় এক সময় ধনী ব্যবসায়ী ও সমাজপতিরা বসবাস করতেন।
মহাখালী:
মহাখালী নামটি “মহা কালী” মন্দিরের নাম থেকে এসেছে। এটি ঢাকার অন্যতম পুরনো এবং ঐতিহাসিক মন্দিরগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যার ভিত্তিতে এই এলাকার নামকরণ হয়।
ইন্দিরা রোড:
এই রাস্তাটির নামকরণ হয়েছে “দ্বিজদাস বাবু” নামে এক বিত্তশালী ব্যক্তির বড় কন্যা ইন্দিরার নামে। তিনি এই রাস্তা নিজেই নির্মাণ করেছিলেন এবং তার নামেই রাস্তাটির নামকরণ করা হয়।
পিলখানা:
ইংরেজ শাসনামলে পিলখানায় হাতি পোষ মানানোর এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার জায়গা ছিল। এই কারণেই এই এলাকা “পিলখানা” নামে পরিচিত হয়, যা পরবর্তীতে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে।
কাকরাইল:
ঢাকার কমিশনার মিঃ ককরেল ১৯ শতকের শেষ দশকে একটি নতুন শহর তৈরি করেন, যার নাম ছিল “কাকরাইল”, যা আজও পরিচিত।
রমনা পার্ক:
রমনা পার্কের নামকরণ হয়েছে “রমনা কালী মন্দির” থেকে, যা একটি বিশাল ফুলের বাগান ও খেলার মাঠ দ্বারা ঘেরা ছিল। এই এলাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
গোপীবাগ:
গোপীনাথ নামক এক ধনী ব্যবসায়ী তার নিজ খরচে “গোপীনাথ জিউর মন্দির” তৈরি করেন। এই মন্দিরের পাশেই ছিল ফুলের বাগান, যা পরবর্তীতে “গোপীবাগ” নামে পরিচিতি পায়।
টিকাটুলি:
ঢাকার এই এলাকাটির নাম এসেছে “হুক্কা” বা “টিকা” কারখানা থেকে, যেখানে হুক্কার টিকা তৈরি হতো। এখান থেকেই এলাকাটির নামকরণ হয় “টিকাটুলি”।
তোপখানাঃ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাহিনীর অবস্থান ছিল ঢাকার এই তোপখানায়। এখানে গোলন্দাজ বাহিনী ছিল, যার কারণে এটি “তোপখানা” নামে পরিচিতি লাভ করে।
পুরানা পল্টন, নয়া পল্টন:
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ঢাকাস্থ সেনানিবাস থেকে “পল্টন” নামটি এসেছিল। পরবর্তীতে এটি “পুরানা পল্টন” এবং “নয়া পল্টন” নামে বিভক্ত হয়।
বায়তুল মোকারম:
ব্রিটিশ সৈন্যরা এক সময় “পল্টন পুকুর”-এ গোসল করত। ১৯৬৮ সালে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে “বায়তুল মোকারম” মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও ঢাকার অন্যতম প্রধান মসজিদ।
পরীবাগ:
এই এলাকার নামকরণ হয়েছে নবাব আহসানউল্লাহর মেয়ে পরীবানুর নামে, যিনি এখানকার একটি বড় বাগান তৈরি করেছিলেন।
পাগলাপুল:
১৭ শতকে মীর জুমলা নদীর উপর একটি সুন্দর পুল তৈরি করেছিলেন, যা দর্শকদের আকর্ষণ করত। এ থেকেই এলাকা “পাগলাপুল” নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ফার্মগেট:
বৃটিশ শাসনামলে কৃষি উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য একটি খামার স্থাপন করা হয়েছিল, যার নাম থেকে এলাকা “ফার্মগেট” হয়ে যায়।
শ্যামলী:
১৯৫৭ সালে সমাজকর্মী আব্দুল গণি হায়দার এবং তার সহকর্মীরা এখানে বসবাস শুরু করেছিলেন। গাছপালা ও সবুজ পরিবেশের কারণে এটি “শ্যামলী” নামে পরিচিত হয়।
সূত্রাপুর:
এলাকার নাম এসেছে “সূত্রধর” থেকে, যিনি কাঠের কাজ করতেন। এখানেই ছিল সূত্রধরদের বসবাস, যার কারণে এই নামকরণ।
সূত্রসমূহ
- The Daily Star: History Behind Dhaka’s Streets
- Prothom Alo: The Origins of Dhaka’s Street Names
- BDNews24: Dhaka’s Rich Cultural History
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা: বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেবল তার অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষের জন্যই নয়, বরং তার ভৌগোলিক অবস্থানের পেছনে থাকা সুদীর্ঘ ইতিহাসের জন্যও আলোচিত। বুয়েট ক্যাম্পাসের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির সাথে যুক্ত, যা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আইনি ও সাংস্কৃতিক আলোচনা বিদ্যমান。
ঐতিহাসিক পটভূমি: বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তি

শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা。 আদি যুগে এই মন্দিরের সীমানা এবং দেবোত্তর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল বিশাল。 ব্রিটিশ আমল এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পর্যন্ত মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও ধর্মীয় কাজের জন্য মাইলের পর মাইল বিস্তৃত খোলা জমি, বাগান এবং পুকুর উৎসর্গ করা হয়েছিল。
বুয়েট ক্যাম্পাসের সম্প্রসারণ ও জমি অধিগ্রহণ

১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার জনস্বার্থে এবং শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে。 এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তির একটি বড় অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। বুয়েট ক্যাম্পাসের বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম দিকের এলাকা এবং তৎসংলগ্ন আবাসিক হলগুলোর জমি একসময় ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মালিকানাধীন ছিল。
ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিতর্ক
জমির ক্ষতিপূরণ বা বাজারমূল্য পরিশোধের বিষয়টি আজও একটি অমীমাংসিত ঐতিহাসিক অধ্যায়。
- সরকারি নথিপত্র: তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ আইন (Land Acquisition Act)-এর অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জমিটি নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়মানুযায়ী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বরাদ্দ করা হয়。
- অস্পষ্টতা: ঐতিহাসিকদের মতে, তৎকালীন সময়ে মন্দিরের সেবায়েতরা সেই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছিলেন কি না বা সেই মূল্যটি তৎকালীন বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে。
- ধর্মীয় আইনি অবস্থান: হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি অনুযায়ী, দেবোত্তর সম্পত্তি হস্তান্তর করা ধর্মীয় আইনের পরিপন্থী এবং এই জমিগুলো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বা নামমাত্র মূল্যে নেওয়া হয়েছিল。
বর্তমান বাস্তবতা ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া
ঢাকেশ্বরী মন্দির কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে。 ১. জমি পুনরুদ্ধার: ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দফায় দফায় প্রায় ১.৫ বিঘা জমি সরকার মন্দির কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে。 ২. অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো: বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে যাওয়া মূল ক্যাম্পাস এলাকার জমিগুলো আর ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ সেখানে এখন স্থায়ী অ্যাকাডেমিক অবকাঠামো বিদ্যমান。 ৩. বিকল্প সুবিধা: সরকার বিভিন্ন সময়ে মন্দিরের উন্নয়নে অনুদান এবং বিকল্প সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে。
তথ্যসূত্র: ১. ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ঢাকেশ্বরী মন্দির সংরক্ষণ রিপোর্ট ২. ভূমি অধিগ্রহণ আইন ও দেবোত্তর সম্পত্তি বিষয়ক নথিপত্র ৩. বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের ঐতিহাসিক স্মারকলিপি
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬ অনুসন্ধানী ডেস্ক

ঢাকা: দীর্ঘ ৫৪ বছরের স্বাধীন পথচলায় বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বুদ্ধিজীবী মহল, বিভিন্ন টকশো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসছে— বাংলাদেশের প্রকৃত অবকাঠামোগত ভিত্তি কি পাকিস্তান আমলেই স্থাপিত হয়েছিল? ব্রিটিশদের ২০০ বছরের অবজ্ঞা এবং পরবর্তী ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের উন্নয়নের পরিসংখ্যান বর্তমান প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদরা যখন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন উঠে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সেই আলোচনার সূত্র ধরে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
১. ব্রিটিশ আমলের অবজ্ঞা ও কলকাতার ‘দাদা-বাবু’ সংস্কৃতি

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭—এই ১৯০ বছরে ব্রিটিশরা পূর্ব বাংলাকে কেবল কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। কলকাতার প্রভাবশালী ‘দাদা-বাবু’ বা এলিট শ্রেণি কখনোই চায়নি ঢাকা বা পূর্ব বাংলা উন্নত হোক।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১): ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করতে ১৯১২ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ এটি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।
- ইতিহাস ও বিরোধিতা: এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী মহল। তাদের যুক্তি ছিল, পূর্ব বাংলার কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। কলকাতার তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জি পর্যন্ত এর বিপক্ষে ছিলেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯২১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ছিল ব্রিটিশ আমলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়।
২. পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর: উচ্চশিক্ষার মহাবিপ্লব

ইতিহাস আমাদের শেখায় পাকিস্তান ২৪ বছর শোষণ করেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের আধুনিক উচ্চশিক্ষা ও প্রকৌশল খাতের মেরুদণ্ড এই ২৪ বছরেই তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের ইতিহাস:
পাকিস্তান আমলে মোট ৫টি বড় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়:
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩): উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রাণের দাবি মেটাতে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী ছিলেন এর প্রথম উপাচার্য।
- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬): প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর কার্যক্রম শুরু করে।
- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০): দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮): মূলত ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ কলেজকে ১৯৬৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়, যা আজ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।
- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১): ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা:
বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি প্রধান সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যার ৪টিই (৮০%) পাকিস্তান আমলের অবদান।
- বুয়েট (BUET – ১৯৬২): ১৮৭৬ সালের সার্ভে স্কুল থেকে ১৯৬২ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
- রুয়েট (১৯৬৪), চুয়েট (১৯৬৮), কুয়েট (১৯৬৯): এই আঞ্চলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলো পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে নির্মিত হয়। পরবর্তী ৫০ বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১টি নতুন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)।
৩. চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্য খাতের গোড়াপত্তন
ব্রিটিশদের ২০০ বছরে মাত্র ১টি মেডিকেল (ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ১৯৪৬) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিপরীতে পাকিস্তান আমলে ৮টি সরকারি মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়।
নাম ও ইতিহাস:
- চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭): বন্দর নগরীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল কাম কলেজ।
- রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮): উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র।
- ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান।
- সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২): তৎকালে সিলেট মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত ছিল।
- স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩): মিডফোর্ড হাসপাতালের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে।
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক IPGMR – ১৯৬৬): স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণার জন্য এটি পাকিস্তান আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮): দক্ষিণবঙ্গের মানুষের আস্থার প্রতীক।
- রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০): পাকিস্তান আমলের শেষ বড় উপহার।
৪. বিশেষায়িত ও কারিগরি শিক্ষা
পাকিস্তান আমলে কারিগরি শিক্ষায় যে জোয়ার এসেছিল, তা স্বাধীনতার পরের ৫০ বছরে অনেকটা ম্লান।
- পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট: পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে ১৭টি পলিটেকনিক করেছিল। বাংলাদেশ ৫০ বছরে করেছে ৩২টি।
- ক্যাডেট কলেজ: ফৌজদারহাট (১৯৫৮), মির্জাপুর (১৯৬৩), ঝিনাইদহ (১৯৬৩) এবং রাজশাহী (১৯৬৫)—এই ৪টি ঐতিহাসিক ক্যাডেট কলেজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়।
- বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (১৯৬২): নৌ-অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
- বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বুটেক্স – ১৯৫০): এটি ‘ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
৫. শিল্পায়ন ও ভারী অবকাঠামো
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলো পাকিস্তান আমলের পরিকল্পনার ফসল।
- শিল্পনগরী: তেজগাঁও, হাজারীবাগ এবং খালিশপুর শিল্প এলাকা পাকিস্তান আমলে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়।
- আদমজী জুট মিল (১৯৫১): নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল।
- চন্দ্রঘোনা পেপার মিল (১৯৫৩): এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল।
- ইস্টার্ন রিফাইনারি (১৯৬৮): দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার যা আজও সচল।
- জাতীয় স্থাপনা: সংসদ ভবন, সচিবালয়, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (বর্তমান শাহজালাল) এবং বাইতুল মোকাররম মসজিদ—প্রতিটিই পাকিস্তান আমলের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা।
৬. পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ: বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
১৯৭১-এর যুদ্ধের পর পাকিস্তান ‘ঘাস খেয়ে হলেও’ পারমাণবিক বোমা তৈরির শপথ নিয়েছিল। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।
- পারমাণবিক অস্ত্র: ১৭০টি ওয়ারহেড এবং শাহীন-৩ (২৭৫০ কিমি পাল্লার) মিসাইল নিয়ে পাকিস্তান এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
- বিমান বাহিনী: জেএফ-১৭ থান্ডার এবং জে-১০সি নিয়ে তারা বিশ্বের সপ্তম শক্তিশালী বাহিনী। সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত।
- কূটনীতি: বর্তমানে পাকিস্তান ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিগ প্লেয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিপরীতে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে যতটা মাতামাতি করেছে, অবকাঠামোগত স্বনির্ভরতা ও আধুনিকায়নে কি ততটা এগোতে পেরেছে? আজ সংসদে আধুনিকতা বড় নাকি চেতনা বড়—তা নিয়ে শত শত অধিবেশন পার হয়ে যাচ্ছে।
উপসংহার ও পর্যালোচনা
ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শোষণ এবং ২৪ বছরের পাকিস্তান আমলের বৈষম্যের গল্প যেমন সত্য, তেমনি এই অঞ্চলের আধুনিক অবকাঠামোর গোড়াপত্তন যে পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল—তাও অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রিটিশ আমলে যেখানে মাত্র ১২% শিক্ষিত ছিল, পাকিস্তান আমলে তা দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করে।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত, আমরা কি কেবল আগের আমলের করা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেই দায়িত্ব শেষ করছি, নাকি নতুন প্রজন্মের জন্য প্রকৃত আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে পারছি?
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: ১. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ঐতিহাসিক ডাটা। ২. ড. এম.এ. রহিম, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৭১)। ৩. আল-জাজিরা ও এনডিটিভি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা রিপোর্ট ২০২৬। ৪. বিগত ২৬-২৮ এপ্রিল ২০২৬-এর টেলিভিশন টকশো ‘ইতিহাসের সত্য’।
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রযুক্তি প্রতিবেদক | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাকা: বর্তমান যুগ স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আর হাই-ডেফিনিশন পর্দার যুগ। প্রযুক্তির এই বিশালত্বের ভিড়ে আমরা ‘ক্যালকুলেটর’ নামক ক্ষুদ্র যন্ত্রটির গুরুত্বের কথা প্রায় ভুলেই গেছি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পকেটে থাকা সামান্য একটি চিপ কীভাবে চোখের পলকে বিশাল অংকের গুণ বা ভাগ করে ফেলে? আজ আমরা উন্মোচন করব ক্যালকুলেটরের ভেতরের সেই বিস্ময়কর ইলেকট্রনিক মহাযজ্ঞ।

১. মানুষের ভাষা বনাম মেশিনের ভাষা: বাইনারি রহস্য
মানুষের হাতে ১০টি আঙুল থাকায় আমরা ‘ডেসিমাল’ বা ১০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে (০-৯) অভ্যস্ত। কিন্তু ক্যালকুলেটর একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যা কেবল বিদ্যুতের উপস্থিতি (On) এবং অনুপস্থিতি (Off) বোঝে। সম্প্রতি জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক টক-শো ‘টেক জংশন ২০২৬’-এ বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন যে, ক্যালকুলেটর মূলত একটি ‘বাইনারি ক্যালকুলেটিং মেশিন’। এর সার্কিটগুলো শুধু ০ এবং ১-এর সংকেত বোঝে। আমরা যখন কিপ্যাডে কোনো সংখ্যা চাপি, ক্যালকুলেটর সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে বাইনারি কোডে রূপান্তর করে নেয়।
২. যোগের মাধ্যমেই সব হিসেব!

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, ক্যালকুলেটর মূলত কেবল যোগ করতে জানে। এর ভেতরের গাণিতিক বিন্যাস এমনভাবে তৈরি যে:
- বিয়োগ: ১০ থেকে ৫ বিয়োগ করতে বললে ক্যালকুলেটর ১০-এর সাথে (-৫) যোগ করে।
- গুণ: কোনো সংখ্যাকে গুণ করতে বললে এটি নির্ধারিত সংখ্যাটিকে বারবার যোগ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
৩. লজিক গেট: ক্যালকুলেটরের ‘মগজ’

এই সব যোগ-বিয়োগের পেছনে মূল কারিগর হলো অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতির লজিক গেট (Logic Gate)। এই গেটগুলো আসলে হাজার হাজার ট্রানজিস্টর দিয়ে তৈরি এক ধরণের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সুইচ। গত বছরের ‘সায়েন্স ডেইলি’-র একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি সাধারণ পকেট ক্যালকুলেটরেও কয়েক হাজার ট্রানজিস্টর থাকে যা আলোর গতিতে ডেটা প্রসেস করে। আপনি যখন সমান (=) চিহ্ন চাপেন, এই লজিক গেটগুলো বাইনারি ফলাফলকে পুনরায় ডেসিমালে রূপান্তর করে আমাদের সামনে পেশ করে।
৪. সেভেন-সেগমেন্ট ডিসপ্লে: সংখ্যা দেখার জাদু
হিসেব শেষ হওয়ার পর সংখ্যাগুলো স্ক্রিনে দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয় সেভেন-সেগমেন্ট এল ই ডি (7-Segment Display)। প্রতিটি ডিজিট দেখানোর জন্য সাতটি ছোট ছোট আলোর বার থাকে। বাইনারি ফলাফল অনুযায়ী নির্দিষ্ট বারগুলো জ্বলে উঠে আমাদের পরিচিত ডেসিমাল সংখ্যা (০-৯) তৈরি করে। এটি এমন এক নিখুঁত প্রযুক্তি যা গত কয়েক দশকেও অপরিবর্তিত থেকেছে।
৫. ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
অ্যাবাকাস থেকে শুরু করে বিশাল আকারের মেকানিক্যাল মেশিন, আর আজকের সোলার চালিত স্লিম ক্যালকুলেটর—এই বিবর্তন কয়েকশ বছরের। যদিও স্মার্টফোনে এখন সব অ্যাপ পাওয়া যায়, তবুও প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের কাছে ডেডিকেটেড ক্যালকুলেটরের নির্ভুলতা আজও অতুলনীয়।
উপসংহার:
একটি ক্ষুদ্র ক্যালকুলেটর আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যাগুলোকেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লজিক বা অংশের (যেমন ০ ও ১) মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। তাই ক্যালকুলেটর ভাঙার প্রয়োজন নেই, এর ভেতরের অদৃশ্য লজিকই আমাদের আধুনিক পৃথিবীর বড় বড় হিসেব নিকেশের মেরুদণ্ড।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: ১. HowStuffWorks – Logic Circuits and Binary System Report. ২. সায়েন্স ডেইলি (Science Daily) – বিবর্তন ও ট্রানজিস্টর প্রযুক্তি আর্কাইভ। ৩. টেক জংশন ২০২৬ (টিভি টক-শো) – ‘অদৃশ্য প্রযুক্তির কার্যকারিতা’ পর্ব। ৪. গুগল টেকনিক্যাল লজিক অ্যানালাইসিস ডেটাবেস।
বিশ্লেষণে: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সিনিয়র এসইও কনসালট্যান্ট ও ডিজিটাল পাবলিশার
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
ওয়েবসাইট: bdsbulbulahmed.com



