বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
বিভাগ: বিনোদন / বিশেষ ফিচার
সম্পাদকীয় প্যানেল: কালচার ও এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬ | রাত ০১:০২ (বিএসটি)
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বিশেষ ফিচার: শূন্য হাতে শূন্য থেকে শুরু করে আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম ধনীতম তারকা—শাহরুখ খান শুধু একটি নাম নন, একটি বৈশ্বিক অনুভূতি। তবে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় তাঁর পপুলারিটি ও গ্রহণযোগ্যতা যেন এক ভিন্ন মাত্রায় বিরাজ করে।
আজ আমরা আলোচনা করব কলকাতায় তাঁর অতিরিক্ত চাহিদার কারণ, তাঁর সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প, মোট সম্পত্তি এবং আগামী ২৪ ডিসেম্বর ২০২৬ মুক্তি প্রতীক্ষিত মেগা প্রজেক্ট ‘কিং’ নিয়ে।
১. কলকাতায় অন্যান্য তারকার চেয়ে শাহরুখ কেন এত বেশি প্রিয়?
বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির সাথে শাহরুখ খানের সম্পর্ক কেবল একজন হিন্দি সিনেমার নায়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
[ কলকাতায় শাহরুখের রাজত্ব ]
│
┌────────────────────────────────────┼────────────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ KKR ও ফুটবলের শহর ] [ সাংস্কৃতিক দূত ] [ আবেগীয় বন্ধন ]
• কেকেআর-এর মাধ্যমে 'ঘরের ছেলে' • পশ্চিমবঙ্গের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর • বাংলায় কথা বলার আন্তরিক প্রচেষ্টা
• ইডেন গার্ডেন্সে তাঁর উপস্থিতি • কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) মুখ • দেবদাস চরিত্রে বাঙালি হৃদয়ে স্থান
- আইপিএল ও কেকেআর (KKR): ২০০৮ সালে Kolkata Knight Riders-এর মালিকানা নেওয়ার পর থেকে শাহরুখ নিজেকে কলকাতার ব্র্যান্ডের সাথে একাত্ম করে ফেলেছেন।
- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত মুখ: পশ্চিমবঙ্গের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে এবং প্রতিবছর কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (KIFF) তাঁর উপস্থিতি বাঙালিদের কাছে পরম ভালোবাসার।
- শ্রদ্ধা ও বিনয়: মঞ্চে প্রবীণ বাঙালি শিল্পীদের (যেমন অমিতাভ বচ্চন, রাখী গুলজার বা শর্মিলা ঠাকুর) পা ছুঁয়ে প্রণাম করা এবং ভাঙা ভাঙা বাংলায় ভালোবাসা ব্যক্ত করা তাঁকে সাধারণ মানুষের আপন করে তুলেছে।

২. শূন্য থেকে আন্তর্জাতিক বাদশা: অনুপ্রেরণামূলক জীবনসংগ্রাম
- স্বজন হারানোর ট্র্যাজেডি: মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্যানসারে বাবাকে হারান এবং এর কিছুকাল পর মা লতিফ ফাতেমাকেও হারান।
- ১,৫০০ টাকা নিয়ে মুম্বাই আগমন: পকেটে মাত্র ১৫০০ টাকা নিয়ে ভাগ্য অন্বেষণে মুম্বাই এসে পৌঁছান শাহরুখ। বন্ধুরা ও মুম্বাইয়ের সৈকতই ছিল তাঁর রাতের আশ্রয়।
- অ্যান্টি-হিরো ঝুঁকি: নব্বইয়ের দশকে অন্য নায়কেরা যখন চকোলেট বয় ইমেজ ধরে রাখতে ব্যস্ত, শাহরুখ তখন ‘ডর’ ও ‘বাজিগর’-এর মতো অ্যান্টি-হিরো চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্ব মাতান।
৩. একনজরে ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা ও বক্স অফিস রেকর্ড
| সিনেমা | ধরণ / ক্যাটাগরি | বৈশ্বিক কালেকশন | রোমাঞ্চকর অজানা তথ্য |
| দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে (DDLJ) | সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার | ~৬১ কোটি রুপি (১৯৯৫) | শাহরুখ প্রথমে ছবিতে রোমান্টিক হিরো হতে চাননি, ডিরেক্টর জোর করে মানিয়েছিলেন। |
| দেবদাস | সাহিত্যনির্ভর ধ্রুপদী | ~১৬৮ কোটি রুপি (২০০২) | মদ্যপ দেবদাসের দৃশ্য নিখুঁত করতে শাহরুখ সেটে আসলেও সত্যি সামান্য মদ খেতেন। |
| স্বদেশ | সমালোচক-প্রশংসিত | আন্তর্জাতিক ব্যবসা সফল | এটিই প্রথম ভারতীয় ছবি যা আমেরিকার NASA সদর দপ্তরের ভেতরে শুট করা হয়। |
| জওয়ান | মেগা অ্যাকশন হিট | ১,১৬০ কোটি রুপি (২০২৩) | শাহরুখের ন্যাড়া মাথার লুকটি স্ক্রিপ্টে ছিল না, অন-দ্য-স্পট মাথায় এসে শুট করা হয়। |
৪. মন্নত ও সম্পদ সাম্রাজ্য: ২০২৬ সালের চিত্র
২০০ কোটি রুপি মূল্যের বিখ্যাত সমুদ্রমুখী প্রাসাদ ‘মন্নত’-এর অধিপতি শাহরুখ খান বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম ধনী তারকা।
[ ২০২৬ Hurun India Rich List অনুযায়ী ]
│
┌────────────────────────────────┼────────────────────────────────┐
▼ ▼ ▼
[ মোট সম্পদ ] [ উপার্জনের উৎস ] [ সন্তান ও লাক্সারি ]
• $১.৩ - $১.৪ বিলিয়ন • প্রযোজনা (Red Chillies) • সুহানা: Mercedes S-Class
(প্রায় ১২,৪৯০ কোটি রুপি) • KKR ফ্র্যাঞ্চাইজি ও সিনেমা • আরিয়ান: Mercedes AMG, BMW 7
ধর্মনিরপেক্ষ পারিবারিক পরিবেশ:
গৌরী খানের (বিবাহপূর্ব গৌরী ছিব্বর) সাথে ১৯৯১ সালে ঐতিহ্যবাহী বৈদিক হিন্দু মতে বিয়ে হয়। বিয়ের পরও গৌরী নিজের ধর্ম ত্যাগ করেননি। মন্নতে যেমন পবিত্র কোরআন স্থান পায়, তেমনই দুর্গা পূজা ও গণেশ চতুর্থী সমান মর্যাদায় পালিত হয়।
৫. ২০২৬-এর মেগা ধামাকা: ‘কিং’ (King)

চলতি ২০২৬ সালের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত বলিউড সিনেমা হলো সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত ‘কিং’।
- মুক্তির তারিখ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৬ (ক্রিসমাস রিলিজ)।
- বাজেট: প্রায় ৩৫০ কোটি রুপি।
- কাস্ট: শাহরুখ খান (গ্যাংস্টার ডন), সুহানা খান (শিষ্য), অভিষেক বচ্চন (মূল ভিলেন)। দীপিকা পাড়ুকোন ও রানী মুখার্জি ক্যামিও চরিত্রে থাকছেন।
- বিশেষ আকর্ষণ: রিয়েল লাইফ বাবা-মেয়ে পর্দায় হাজির হচ্ছেন গুরু-শিষ্যের আন্ডারওয়ার্ল্ড চরিত্রে। ইউরোপের শুটিংয়ে প্রায় ৫০ কোটি রুপি খরচ করে আন্তর্জাতিক স্কেলের স্টান্ট অ্যাকশন করা হয়েছে।
শেষ কথা:
বলিউড থেকে বিশ্বমঞ্চ, আর কলকাতা থেকে সমগ্র বিশ্ব—শাহরুখ খানের প্রভাব কেবল তাঁর সিনেমা দিয়ে মাপা যায় না; বরং তাঁর মেধা, পরিশ্রম ও পারিবারিক উদারতা তাঁকে এক চিরন্তন কিংবদন্তিতে রূপ দিয়েছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
বিভাগ (Category): ইতিহাস, আন্তর্জাতিক
প্রকাশের তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তথ্যসূত্র (Sources): এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব টার্কি, অটোমান ইতিহাসবিষয়ক প্রামাণ্য গবেষণা, লুসান চুক্তি ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী নথিপত্র
ঢাকা: ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্যগুলোর একটি ছিল অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্য। প্রায় ৬২৩ বছর (১২৯৯-১৯২২) টিকে থাকা এই রাজবংশ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা, তিন মহাদেশে শাসন করেছে। সাম্রাজ্যের রাজধানী ইস্তাম্বুল ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনস্থল। আজকের মধ্যপ্রাচ্য, বলকান অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার রাজনীতি বুঝতে হলে এই সাম্রাজ্যের ইতিহাস জানা জরুরি।
আনাতোলিয়ার ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে সাম্রাজ্যের সূচনা
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে আনাতোলিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোগুত নামের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য বা বেইলিক থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সূচনা হয়েছিল।

সাম্রাজ্য সূচনার নেপথ্য ইতিহাস ও বিস্তার
- উসমান গাজীর ভূমিকা: সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৩ শতকের শেষের দিকে (আনুমানিক ১২৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) তুর্কি উপজাতীয় নেতা প্রথম উসমান আনাতোলিয়ায় এই ক্ষুদ্র রাজ্যটির গোড়াপত্তন করেন।
- বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন: এই সময়ে দুর্বল হয়ে পড়া বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সীমানাসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এই ক্ষুদ্র রাজ্যটি ধীরে ধীরে আশেপাশের দুর্বল রাজ্যগুলো দখল করে নিজেদের শক্তি বাড়াতে থাকে।
- বিশাল সাম্রাজ্যে রূপান্তর: পরবর্তীতে উসমানীয় শাসকরা আনাতোলিয়া ছাড়িয়ে ইউরোপের বলকান অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় তাদের শাসন বিস্তার করেন। ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মেহেমদ কনস্টান্টিনোপল জয় করার মাধ্যমে এই ক্ষুদ্র রাজ্যটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও অপরাজেয় সাম্রাজ্যে রূপ দেন।
সম্প্রসারণ ও সুলেমানের স্বর্ণযুগ
ষোড়শ শতকে সাম্রাজ্য শক্তির শীর্ষে পৌঁছায়। প্রথম সেলিম ১৫১৪ সালে চালদিরানের যুদ্ধে সাফাভি পারস্যকে পরাজিত করেন, আর ১৫১৬-১৭ সালে মামলুকদের হটিয়ে সিরিয়া, মিসর ও হিজাজ অটোমান শাসনে আনেন। এর ফলে মক্কা-মদিনার তত্ত্বাবধানও অটোমানদের হাতে আসে।

তাঁর পুত্র সুলেমান (১৫২০-১৫৬৬), যিনি ইউরোপে “ম্যাগনিফিসেন্ট” এবং তুর্কি ভাষায় “কানুনি” (আইনপ্রণেতা) নামে পরিচিত, সাম্রাজ্যকে স্বর্ণযুগে নিয়ে যান। তাঁর আমলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- ১৫২১ সালে বেলগ্রেড এবং ১৫২২ সালে রোডস দ্বীপ জয়
- ১৫২৬ সালের মোহাচের যুদ্ধে হাঙ্গেরির বাহিনীকে দ্রুত পরাজিত করা, যেখানে রাজা দ্বিতীয় লুইয়ের মৃত্যু হয়
- ১৫২৯ সালে ভিয়েনা অবরোধ, যা ব্যর্থ হলেও ইউরোপে আতঙ্ক সৃষ্টি করে
- ১৫৩৪ সালে বাগদাদ দখল এবং ১৫৩৮ সালে প্রেভেজার নৌযুদ্ধে ভূমধ্যসাগরে নৌআধিপত্য
- ১৫৩৬ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতা ও বাণিজ্যচুক্তি, যা ইউরোপীয় রাজনীতিতে অটোমানদের প্রভাব বোঝায়
শাসনব্যবস্থা, সমাজ ও সিংহাসনের রাজনীতি
অটোমান শাসন ছিল কেন্দ্রীভূত, তবে বহুজাতিক সাম্রাজ্য চালাতে তারা “মিল্লাত” ব্যবস্থা ব্যবহার করত। এতে খ্রিস্টান, ইহুদিসহ ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো নিজস্ব ধর্মীয় আইন ও প্রতিষ্ঠান বজায় রাখার সুযোগ পেত। সমসাময়িক ইউরোপের তুলনায় এটি তুলনামূলক সহনশীল ব্যবস্থা ছিল, যদিও অমুসলিমদের জন্য আলাদা কর ও সামাজিক বৈষম্যও ছিল। কাজেই একে পুরোপুরি “সমান অধিকারের” ব্যবস্থা বলা ঠিক হবে না।

সামরিক শক্তির মেরুদণ্ড ছিল জানিসারি বাহিনী। “দেভশিরমে” প্রথায় বলকানের খ্রিস্টান পরিবার থেকে কিশোরদের নিয়ে এসে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এদের অনেকে পরে সেনাপতি ও উজিরে আজমের মতো শীর্ষ পদেও পৌঁছেছেন।
সিংহাসন নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব এড়াতে একসময় নতুন সুলতানের ভাইদের হত্যা করার রীতি ছিল। ১৫৯৫ সালে তৃতীয় মেহমেদ সিংহাসনে বসে ১৯ ভাইকে হত্যা করান বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। পরবর্তীকালে এই প্রথার বদলে শাহজাদাদের প্রাসাদের ভেতরে কার্যত অন্তরীণ রাখার ব্যবস্থা চালু হয়। সুলেমান নিজেও ১৫৫৩ সালে পুত্র মুস্তফা এবং ১৫৬১ সালে বায়েজিদকে হত্যার আদেশ দেন, যা উত্তরাধিকার-সংকটের বীজ বপন করে। সুলেমানের স্ত্রী হুররেম সুলতান (রক্সেলানা) ও পরবর্তী সময়ে হেরেমের প্রভাবশালী নারীরা রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখেন।
স্থাপত্য, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতি
অটোমান স্থাপত্য মূলত সেলজুক, বাইজেন্টাইন ও ইসলামী ধারার সমন্বয়। প্রধান স্থপতি মিমার সিনান নির্মাণ করেন সুলেমানিয়া মসজিদ (১৫৫৭) ও এদির্নের সেলিমিয়া মসজিদ (১৫৭৫)। ইস্তাম্বুলের সুলতান আহমেদ বা নীল মসজিদ (১৬০৯-১৬১৬) এবং তোপকাপি প্রাসাদও এই যুগের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। হাগিয়া সোফিয়া অবশ্য ষষ্ঠ শতকে বাইজেন্টাইনদের তৈরি, ১৪৫৩ সালের পর সেটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়।
ক্যালিগ্রাফি, কার্পেট, ক্ষুদ্রচিত্র ও কফিহাউস সংস্কৃতি অটোমান জীবনের অংশ ছিল। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তাকিউদ্দিন ষোড়শ শতকে যান্ত্রিক ঘড়ি ও জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্রে অবদান রাখেন এবং ১৫৭৭ সালে ইস্তাম্বুলে মানমন্দির স্থাপন করেন, যদিও কয়েক বছরের মধ্যেই তা ভেঙে ফেলা হয়। হেজারফেন আহমেদ চেলেবির গালাতা টাওয়ার থেকে উড়ে বসফরাস পাড়ি দেওয়ার কাহিনি ভ্রমণকারী এভলিয়া চেলেবির বর্ণনায় পাওয়া যায়, তবে এটি ঐতিহাসিকভাবে যাচাইযোগ্য নয়, কিংবদন্তি হিসেবেই গণ্য। আর ১৭১৭ সালে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী মেরি ওয়ার্টলি মন্টাগু ইস্তাম্বুলে বসন্তের টিকা দেওয়ার প্রচলিত লোকজ পদ্ধতি (ভ্যারিওলেশন) দেখে ইংল্যান্ডে তা জনপ্রিয় করেন। এটিকে আধুনিক ভ্যাকসিন বলা যায় না।
পতনের ধাপে ধাপে কারণ
অটোমান সাম্রাজ্য “রাতারাতি” ভেঙে পড়েনি, পতন ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
- সামরিক বিপর্যয়: ১৬৮৩ সালে দ্বিতীয় ভিয়েনা অবরোধ ব্যর্থ হয়। ১৬৯৯ সালের কার্লোভিৎস চুক্তিতে হাঙ্গেরিসহ বড় অঞ্চল হাতছাড়া হয়, যা পতনের শুরু হিসেবে ধরা হয়।
- অর্থনৈতিক পরিবর্তন: আটলান্টিক পথে ইউরোপীয় বাণিজ্য বাড়ায় ও নতুন বিশ্বের সম্পদ আসায় স্থলপথনির্ভর অটোমান অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- প্রশাসনিক দুর্বলতা: সুলেমানের পর অনেক সুলতান রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্বল ছিলেন, দুর্নীতি বাড়ে এবং জানিসারি বাহিনী নিজেই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। ১৮২৬ সালে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ এই বাহিনী বিলুপ্ত করেন।
- জাতীয়তাবাদের উত্থান: ১৮২১-৩০ সালের গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সার্ব, বুলগেরিয়, রোমানিয়া প্রভৃতি জাতিও স্বাধীন হতে থাকে। ইউরোপে সাম্রাজ্যটি “ইউরোপের রুগ্ণ মানুষ” নামে পরিচিত হয়।
- সংস্কার প্রচেষ্টা: ১৮৩৯ থেকে তানজিমাত সংস্কার, ১৮৭৬ সালে প্রথম সংবিধান এবং ১৯০৮ সালের ইয়াং টার্ক বিপ্লবের মাধ্যমে সাংবিধানিক শাসন ফেরানো হয়। কিন্তু এসব সংস্কার সাম্রাজ্যের পতন ঠেকাতে পারেনি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের অবসান

বলকান যুদ্ধে (১৯১২-১৩) ইউরোপের প্রায় সব অংশ হারানোর পর ১৯১৪ সালে অটোমানরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে যোগ দেয়। যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯১৮ সালের মুদ্রোস যুদ্ধবিরতিতে ইস্তাম্বুল মিত্রশক্তির দখলে যায়। আরব অঞ্চলগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ম্যান্ডেটের অধীনে চলে যায়। এই সময়ের আর্মেনীয় নির্বাসন ও গণহত্যার ঘটনা আজও ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক বিতর্কের বিষয়, যেখানে তুরস্ক “গণহত্যা” শব্দটি প্রত্যাখ্যান করে আর বহু ইতিহাসবিদ ও দেশ একে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা জয়ী হয়। ১৯২২ সালের ১ নভেম্বর সালতানাত বিলুপ্ত করা হয়, শেষ সুলতান ছিলেন ষষ্ঠ মেহমেদ। ১৯২৩ সালে লুসান চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক তুরস্কের সীমানা স্বীকৃত হয় এবং ২৯ অক্টোবর প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হয়। ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ খিলাফতেরও বিলুপ্তি ঘটে।
১৯৫০-পরবর্তী বিশ্বে অটোমান উত্তরাধিকার

অটোমান সাম্রাজ্যের পতন আজও বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে:
- মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা: সাইকস-পিকো চুক্তি (১৯১৬) ও ম্যান্ডেট ব্যবস্থার ওপর গড়ে ওঠা সীমানা থেকেই ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন প্রশ্নের জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা ১৯৫০-এর দশক থেকে আজ পর্যন্ত অঞ্চলটির অস্থিরতার অন্যতম প্রেক্ষাপট।
- সাইপ্রাস ও বলকান: অটোমান শাসনের সময় গড়ে ওঠা জনবিন্যাস সাইপ্রাস সংকট (১৯৭৪) ও ১৯৯০-এর দশকের বলকান সংঘাতে ভূমিকা রেখেছে।
- উপমহাদেশের সংযোগ: ১৯১৯-২৪ সালের খিলাফত আন্দোলন বাংলাসহ ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
- সমকালীন তুরস্ক: ২০২০ সালের জুলাইয়ে হাগিয়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে রূপান্তর এবং অটোমান ঐতিহ্য নিয়ে জনপ্রিয় টিভি সিরিজগুলো এই ইতিহাসকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। বিশ্লেষকরা একে “নব্য-অটোমানবাদ” বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত করেন, যেখানে সমর্থক ও সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
উপসংহার
অটোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাস ক্ষমতা, স্থাপত্য, প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের যেমন গল্প, তেমনি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, সংস্কারে ব্যর্থতা ও বৈশ্বিক পরিবর্তন মোকাবিলায় অক্ষমতার শিক্ষাও। এর গৌরব ও ব্যর্থতা দুটোই বুঝলে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও আধুনিক তুরস্ককে ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
এই প্রতিবেদনটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।
একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।
১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।
- পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
- জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
- মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।
২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট
মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
- দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
- জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।
৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।
| ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব | পৈতৃক শিকড় / জন্মস্থান | শেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান |
| কাজী নজরুল ইসলাম | চুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত) | ঢাকা, বাংলাদেশ |
| রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | পূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর) | কলকাতা, ভারত |
| শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায় | বরিশাল | বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল। |
| মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ | গুজরাট (ভারত) | করাচি, পাকিস্তান |
| হযরত ইব্রাহিম (আ.) | মেসোপটেমিয়া (ইরাক) | হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল) |
ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)
মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।
২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)
সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)
সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।
৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।
এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?
- ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
- পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
- রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।
মূল নির্যাস
পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদনের শিরোনাম: মহান মুক্তিযুদ্ধ: প্রথম শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠদের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা
- প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ঐতিহ্য
- প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও জাতীয় ইতিহাস মহাফেজখানা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কোটি মানুষের ত্যাগ এবং হাজারো অকুতোভয় সেনানী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস।
১. স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তিম সূচনা: প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা দেশে তখন তীব্র অসহযোগ আন্দোলন ও সর্বাত্মক হরতাল চলছিল। সেদিন রংপুরের কাচারি বাজার থেকে স্বাধিকারের দাবিতে বের হওয়া এক উত্তাল মিছিলে যোগ দিয়েছিল কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শঙ্কু সমজদার।
মিছিলটি আলমনগর ও জাহাজ কোম্পানির মোড় অতিক্রম করার সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী অ-বাঙালিদের অতর্কিত গুলিতে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। ঘটনাস্থলেই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দেন কিশোর শঙ্কু। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ও প্রথম শিশু শহীদ। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করা হয়।
২. সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক: সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মহান সন্তানকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’।
- প্রথম ও শেষ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধে সর্বপ্রথম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ (৮ এপ্রিল, ১৯৭১)। তবে সাধারণ জ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে অপশনে তাঁর নাম না থাকলে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে (১৮ এপ্রিল, ১৯৭১) বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন সর্বশেষ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)।
সাত বীরশ্রেষ্ঠর সংক্ষেপিত পরিচিতি ও সমাধিস্থল
| নাম ও পদবি | বাহিনী ও সেক্টর | শাহাদাতের তারিখ | চিরনিদ্রায় শায়িত যেখানে |
| ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ | ইপিআর (১ নং সেক্টর) | ৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙামাটি |
| সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল | সেনাবাহিনী (২ নং সেক্টর) | ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ | দরুইন গ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান | বিমানবাহিনী | ২০ আগস্ট, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ল্যান্স নায়ক নূর মোহাম্মদ শেখ | ইপিআর (৮ নং সেক্টর) | ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ | কাশীপুর, শার্শা, যশোর |
| সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান | সেনাবাহিনী (৪ নং সেক্টর) | ২৮ অক্টোবর, ১৯৭১ | মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা |
| ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার-১ মোহাম্মদ রুহুল আমিন | নৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর) | ১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | বাগমারা, রূপসা, খুলনা |
| ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর | সেনাবাহিনী (৭ নং সেক্টর) | ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১ | সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
৩. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক শাহাদাত

পাকিস্তানের রিসালপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ডিসেম্বরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৪ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দোতলা ভবন থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছিল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগুনো অসম্ভব করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক হাতে এসএমজি এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে বুক ডলে হামাগুড়ি (ক্রলিং) দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারের একদম কাছে পৌঁছে যান। প্রখর নিশানায় গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের ভবন থেকে এক পাকিস্তানি স্নাইপারের বুলেট তাঁর কপালে এসে বিদ্ধ হয়। দেশের এই অকুতোভয় বীর বাঙ্কারের সামনেই শাহাদাতবরণ করেন, যার পরদিনই (১৫ ডিসেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।
৪. রণাঙ্গনের অবিশ্বাস্য সব বীরত্বগাথা

- নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’: ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে খালি গায়ে, পায়ে ফিন্স ও বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে সাঁতরে গিয়ে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে হামলা চালান বীর নৌ-কমান্ডোরা। তাঁদের গুঁড়িয়ে দেওয়া ২৬টি ধান ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব।
- ঢাকার বুকে আতঙ্কের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’: ঢাকার তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ অবরুদ্ধ রাজধানীতে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালায়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বড় বড় নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের সফল গ্রেনেড হামলা পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখত।
- অস্ত্র হাতে নারীদের প্রতিরোধ: তারামন বিবি (বীর প্রতীক) সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ডা. সিতারা বেগম ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি বিশটিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ইথারের তরঙ্গে ‘চরমপত্র’ (এম আর আখতার মুকুল) এবং উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানগুলো ছিল রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য আসল অক্সিজেন।
- বিদেশী বন্ধুদের অবদান: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। এছাড়া বাটা সু কোম্পানির অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড গোপনে অস্ত্র ও তথ্য দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, যিনি একমাত্র বিদেশী হিসেবে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার ছিল না; এটি ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী ও অকুতোভয় সেনাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক লাল-সবুজ পতাকা। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা শঙ্কু সমজদার থেকে শুরু করে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



