উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ

দুই প্রজন্ম, দুই সেতু: সিলেটের পিতা–পুত্রের প্রকৌশল কীর্তি
ডাউকি থেকে পদ্মা

নিউজ ডেস্ক

October 24, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ


ইতিহাসের দুই প্রান্তে সেতুবন্ধন

যারা সিলেট হয়ে মেঘালয় ভ্রমণে যান, তারা প্রায় সবাই ডাউকি সীমান্ত অতিক্রম করেন। আবার যারা জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টে যান, তারা ভারতের সীমান্তে উমগট নদীর ওপর ঝুলন্ত একটি সেতু দেখতে পান। এই সেতুটি শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়—এটি ইতিহাসের অংশ। নির্মাণ হয়েছিল ১৯৩২ সালে, আর এর প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন সিলেটের সন্তান আবিদ রেজা চৌধুরী

এই সেতুই ছিল তৎকালীন শ্রীহট্ট (বর্তমান সিলেট)শিলং—দুই শহরের মধ্যে প্রথম সরাসরি সড়ক সংযোগের প্রতীক। প্রায় এক শতাব্দী পরে, তারই পুত্র অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আরেকটি সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন—পদ্মা সেতু, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করেছে।


ডাউকি সেতুর জন্মকথা: রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা

১৯১৯ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং সফরে গেলে তৎকালীন শ্রীহট্টবাসীরা তাঁকে সিলেটে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যাত্রাপথে।
তখন উমগট নদীর উপর কোনো সেতু ছিল না, এমনকি ঘোড়ার গাড়ি বা মোটর চলাচলের পথও অনুপস্থিত। নদী পার হতো মানুষ মানুষের পিঠে চড়ে। কবিগুরু এমনভাবে যাত্রা করতে রাজি হননি। ফলে তিনি ঘুরপথে ট্রেনে করে সিলেট আসেন গৌহাটি–বদরপুর–লাতু (শাহবাজপুর)–কুলাউড়া রুটে।

এই ঘটনার পরেই শিলং–সিলেট সরাসরি সড়ক নির্মাণের আলোচনা শুরু হয়। ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশে তৎকালীন প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ও মন্ত্রী, সিলেটের বুরুঙ্গা গ্রামের বসন্ত কুমার দাস, বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হন। তাঁর প্রচেষ্টায় প্রকল্পের বাজেট অনুমোদিত হয়।


প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী: এক কিংবদন্তির সূচনা

সেতুর নকশা ও নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে তখনকার তরুণ প্রকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরীর ওপর, যিনি শিলংয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর পরিবারিক মূল ছিল করিমগঞ্জে, পরে তাঁরা স্থায়ী হন বড়লেখার শাহবাজপুরে

১৯৩০ সালে তাঁর নকশা ও নির্দেশনায় উমগট নদীর ওপর শুরু হয় সেতু নির্মাণ। ১৯৩২ সালে উদ্বোধন হয় ডাউকি সেতু—একটি লৌহ কাঠামোর ঝুলন্ত সেতু, যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।

সেতুটি সংযুক্ত করেছে খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া পাহাড়শ্রেণি, এবং সিলেট-শিলং সড়কপথকে করে তুলেছে আসাম প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক রুট।


এক শতাব্দী পর আরেক প্রজন্মের সেতু

প্রায় ৯০ বছর পর, আবিদ রেজারই পুত্র অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী (১৯৪৩–২০২০) বাংলাদেশের আরেকটি ঐতিহাসিক সেতু প্রকল্পে প্রধান পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—পদ্মা সেতু, উদ্বোধন ২০২২ সালে।

তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের অধ্যাপক, পরবর্তীতে বুয়েট উপাচার্য, এবং দেশের নাগরিক প্রকৌশলের পথিকৃৎ। তাঁর প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার ফলেই পদ্মা সেতুর কাজ সম্পূর্ণ হয় দেশীয় অর্থায়নে—যা বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে।


দুই সেতু, দুই ইতিহাস

সেতুর নামনদীনির্মাণ সালপ্রধান ব্যক্তিদায়িত্বঅবস্থান
ডাউকি সেতুউমগট নদী১৯৩২আবিদ রেজা চৌধুরীপ্রধান প্রকৌশলীপশ্চিম জয়ন্তিয়া জেলা, মেঘালয় (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত)
পদ্মা সেতুপদ্মা নদী২০২২অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীপ্রধান পরামর্শকমুন্সিগঞ্জ–শরীয়তপুর জেলা, বাংলাদেশ

দুই প্রজন্মের এই সেতুবন্ধন শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, বরং বাংলার প্রকৌশল ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। একজন ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক হিসেবে শুরু করেছিলেন; অপরজন স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে শেষ করেছেন।


শ্রদ্ধা দুই কীর্তিমানকে

একজন সেতু নির্মাণ করে মানুষকে যুক্ত করেছিলেন পর্বত ও নদীর দুই প্রান্তে, আরেকজন সেতু নির্মাণ করে যুক্ত করেছেন বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকে নতুন যুগে।
তাদের দুজনের কাজই—একটি ১৯৩২ সালে, অন্যটি ২০২২ সালে—দুই সময়ের মধ্যবর্তী প্রকৌশল-ইতিহাসের প্রতীকী সেতুবন্ধন।

মানুষের চলাচলের পথ সহজ করে দেওয়া এই দুই কীর্তিমান পিতা-পুত্রকে শ্রদ্ধা।


সূত্র

  1. “History of Dawki Suspension Bridge,” The Shillong Chronicle, 2024.
  2. “Padma Bridge: Bangladesh’s Dream Made Real,” The Daily Star, 2022.
  3. “Engineer Abid Reza to Professor Jamilur Reza: Two Generations of Bridge Builders,” Prothom Alo Features, 2023.

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন

নিউজ ডেস্ক

April 18, 2026

শেয়ার করুন

ভূমিকা বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অর্জন হলো স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে যার নাম অবিনশ্বর, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে তিনি কীভাবে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেন, সেটি এক বিস্ময়কর আখ্যান। তাঁর রাজনীতি ছিল ত্যাগ, সংগ্রাম এবং জনগণের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক সংমিশ্রণ।

১. রাজনীতির হাতেখড়ি: কার হাত ধরে শুরু?

শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক চেতনা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মজ্জাগত।

  • শৈশব ও প্রথম প্রতিবাদ: ১৯৩৮ সালে বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ. কে. ফজলুল হক এবং শিল্পমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী টুঙ্গিপাড়া পরিদর্শনে আসেন। তখন তরুণ মুজিব স্কুল হোস্টেলের ছাদ মেরামতের দাবি নিয়ে তাঁদের পথ আগলে দাঁড়ান। এটিই ছিল তাঁর সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের গুণের প্রথম প্রকাশ।
  • হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শিষ্যত্ব: বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে এসে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। সোহরাওয়ার্দী তাঁকে ‘রাজনৈতিক পুত্র’ হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং শেখ মুজিবের সাংগঠনিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনকে শক্তিশালী করেন।

২. রাজনৈতিক পদ-পদবি ও পর্যায়ক্রমিক উত্থান

শেখ মুজিবুর রহমান ধাপে ধাপে নিজের যোগ্যতায় নেতৃত্বের শীর্ষে আরোহণ করেন:

  • মুসলিম ছাত্রলীগ (১৯৪৩): নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
  • আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন (১৯৪৯): ২৩ জুন যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়, শেখ মুজিব তখন কারাগারে। বন্দি অবস্থাতেই তাঁকে নবগঠিত দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
  • সাধারণ সম্পাদক (১৯৫৩): তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তাঁরই উদ্যোগে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা করা হয়।
  • মন্ত্রীত্ব ত্যাগ (১৯৫৭): দলকে সুসংগঠিত করার জন্য তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন—যা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। তিনি দলের পূর্ণকালীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
  • সভাপতি (১৯৬৬): দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং বাঙালির বাঁচার দাবি ‘৬ দফা’ পেশ করেন।
  • রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী (১৯৭১-১৯৭৫): স্বাধীনতার পর তিনি নবীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

৩. রাজনৈতিক সাফল্য: হিমালয়সম উচ্চতা

বঙ্গবন্ধুর সাফল্য কেবল পদ-পদবিতে নয়, বরং একটি জাতির ভাগ্য বদলে দেওয়ার মধ্যে নিহিত:

  • ৫২-র ভাষা আন্দোলন: কারাগারে থেকেও তিনি ভাষা আন্দোলনের সংহতি প্রকাশ করেন এবং অনশন ধর্মঘট করেন।
  • ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: মুসলিম লীগের মতো শক্তিশালী দলকে পরাজিত করতে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল মূল চাবিকাঠি।
  • ৬ দফা আন্দোলন (১৯৬৬): একে বলা হয় বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’। স্বায়ত্তশাসনের এই দাবিই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নেয়।
  • ৬৯-র গণঅভ্যুত্থান: আইয়ুব শাহীর পতন ঘটিয়ে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
  • ১৯৭০-র নির্বাচন: নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে তিনি প্রমাণ করেন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র বৈধ মুখপাত্র তিনিই।
  • ৭ই মার্চের ভাষণ: এই একটি ভাষণেই একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তর করেন তিনি। ইউনেস্কো একে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
  • স্বাধীনতা অর্জন: দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য।

৪. রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও সমালোচনা: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে তাঁর শাসনামলে কিছু সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল, যা ইতিহাসের অংশ:

  • বাকশাল গঠন (১৯৭৫): সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এটি তাঁর গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
  • দুর্নীতি ও চাটুকারিতা: স্বাধীনতার পর তাঁর চারপাশের কিছু নেতার দুর্নীতি এবং চাটুকারিতা তিনি শক্ত হাতে দমন করতে পারেননি। তাঁর সেই বিখ্যাত আক্ষেপ— “সবাই পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি”—এর প্রমাণ দেয়।
  • রক্ষীবাহিনী গঠন: রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছিল।
  • ৭৪-র দুর্ভিক্ষ: প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা তাঁর জনপ্রিয়তাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল।

৫. চারিত্রিক গুণাবলি: ভালো ও মন্দ দিক

ভালো দিক:

  • নির্ভীকতা: তিনি ফাঁসির মঞ্চকেও ভয় পাননি। বারবার কারাবরণ করেও তিনি আপস করেননি।
  • মানবিকতা: তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের জন্য ছিল অগাধ ভালোবাসা। শত্রুও তাঁর কাছে এলে তিনি ক্ষমা করে দিতেন।
  • বাগ্মিতা: তিনি জানতেন কীভাবে কোটি মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালাতে হয়।

খারাপ বা দুর্বল দিক:

  • অত্যধিক সরলতা ও বিশ্বাস: তিনি কল্পনাও করতে পারেননি কোনো বাঙালি তাঁর গায়ে হাত তুলতে পারে। এই অতি-বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রাণের বিনিময়ে মূল্য দিতে হয়েছে।
  • আবেগী সিদ্ধান্ত: অনেক সময় আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতেন, যা অভিজ্ঞ আমলাতন্ত্রের সাথে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না।

৬. মহাপ্রয়াণ ও উত্তরকাল

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন তিনি। এটি কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, বরং বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাকে থামিয়ে দেওয়ার এক বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র ছিল। ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর জনগণকে ভালোবেসে সেই সতর্কবার্তা এড়িয়ে গিয়েছিলেন।


উপসংহার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো দল বা গোষ্ঠীর নন, তিনি সমগ্র বাঙালির। তাঁর সাফল্য যেমন আমাদের গৌরবান্বিত করে, তাঁর জীবনের ভুলগুলো আমাদের শিক্ষা দেয়। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে একটি সত্য চিরন্তন—বঙ্গবন্ধু না থাকলে বাংলাদেশ হতো না। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন বাঙালির অস্তিত্বের শেকড় হয়ে।


তথ্যসূত্র: ১. অসমাপ্ত আত্মজীবনী – শেখ মুজিবুর রহমান। ২. কারাগারের রোজনামচা – শেখ মুজিবুর রহমান। ৩. বাংলাদেশ: রক্তের ঋণ – অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ৪. মুজিব – মফিদুল হক। ৫. উইকিপিডিয়া ও বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

সালমান শাহ

নিউজ ডেস্ক

April 17, 2026

শেয়ার করুন

লিখেছেন: [BDS Bulbul Ahmed]

সর্বশেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬

ঢালিউড ইতিহাসের ধূমকেতু, আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের ফ্যাশন আইকন এবং কোটি প্রাণের স্পন্দন চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ওরফে সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি যে উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন, তা গত তিন দশকে আর কেউ করতে পারেনি। আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা তাঁর জীবনের অজানা অধ্যায় এবং ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেটগুলো তুলে ধরছি।

১. ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট: হত্যা মামলার বর্তমান অবস্থা

সালমান শাহর মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এই বিতর্ক ৩০ বছর হতে চললেও এখনো অমীমাংসিত। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী:

  • তদন্তের নতুন মোড়: গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি আদালত সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ১৪ মে ২০২৬ তারিখ ধার্য করেছেন।
  • আসামিদের অবস্থা: মামলার বাদী (সালমান শাহর পরিবার) অভিযুক্ত ১১ জন আসামির (যার মধ্যে স্ত্রী সামিরা ও আজিজ মোহাম্মদ ভাই অন্যতম) স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আবেদন জানিয়েছেন। আদালত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন।

২. পর্দার পেছনের মানুষ: ইমন থেকে সালমান শাহ

সালমান শাহর চলচ্চিত্রে আসার গল্পটি বেশ নাটকীয়।

  • শৈশব ও কৈশোর: ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া ইমনের রক্তে ছিল অভিনয়। তাঁর মাতামহ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম অভিনেতা।
  • প্রথম আলোচিত কাজ: ১৯৮৫ সালে হানিফ সংকেতের মিউজিক ভিডিও ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’-তে এক মাদকাসক্ত তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রথম নজর কাড়েন।
  • নাম পরিবর্তন: ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ করার সময় পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান এবং স্ত্রী সামিরার সাথে পরামর্শ করে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘সালমান শাহ’।

৩. অসমাপ্ত চলচ্চিত্র ও উত্তরসূরিদের ওপর প্রভাব

১৯৯৬ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর সময় বেশ কিছু চলচ্চিত্রের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল।

  • যেভাবে শেষ হয়েছিল সিনেমাগুলো: সালমানের অকাল প্রয়াণের পর ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ সিনেমায় ডামি ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘শুধু তুমি’ ছবিতে অন্য এক অভিনেতাকে কাস্ট করা হয় এবং ‘প্রেম পিয়াসী’র গল্প আংশিক পরিবর্তন করে সিনেমাগুলো মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
  • অনুপ্রেরণার উৎস: বর্তমান সময়ের সুপারস্টার শাকিব খান থেকে শুরু করে হালের সব অভিনেতাই সালমান শাহকে তাঁদের অনুপ্রেরণা হিসেবে মানেন। শাকিব খান একবার জানিয়েছিলেন, তাঁর দেখা প্রথম সিনেমাটি ছিল সালমান শাহ অভিনীত।

৪. কেন তিনি আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী? (ইউনিক ফ্যাক্টস)

  • বক্স অফিস রেকর্ড: তাঁর অভিনীত ২৭টি চলচ্চিত্রের প্রায় প্রতিটিই ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছিল। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ঢালিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমার তালিকায় আজও শীর্ষে।
  • ফ্যাশন আইকন: আজকের যুগে যা ‘ট্রেন্ড’, সালমান শাহ তা নব্বই দশকেই শুরু করেছিলেন। কানে দুল, চুলে ব্যান্ডেনা, ব্যাক ব্রাশ হেয়ার স্টাইল এবং রঙিন সানগ্লাস দিয়ে তিনি একটি পুরো প্রজন্মকে বদলে দিয়েছিলেন।
  • কণ্ঠশিল্পী সালমান: খুব কম মানুষই জানেন যে সালমান শাহ একজন চমৎকার গায়কও ছিলেন। ‘প্রেমযুদ্ধ’ এবং ‘ঋণ শোধ’ সিনেমায় তিনি প্লে-ব্যাক করেছিলেন।

৫. একনজরে পরিসংখ্যান (Quick Facts)

তথ্যবিস্তারিত
সর্বাধিক জুটিশাবনূরের সাথে (১৪টি সিনেমা)
সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাবুকের ভেতর আগুন (১৯৯৭ – মরণোত্তর)
মৃত্যুর পর আত্মহত্যাপ্রিয় নায়কের শোকে প্রায় ১২ জন তরুণী আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।
সর্বশেষ মামলার তারিখ১৪ মে ২০২৬ (তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন)

বিডিএস পর্যবেক্ষণ: সালমান শাহ কেবল একটি নাম নয়, তিনি ঢালিউডের একটি অধ্যায়। ৩০ বছর পরও যখন তাঁর সিনেমা টেলিভিশনে চলে, তখন মানুষ সব কাজ ফেলে টিভি সেটের সামনে বসে পড়ে। এই ভালোবাসাই প্রমাণ করে যে মহানায়করা মরেও অমর হয়ে থাকেন।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

হুমায়ুন আজাদের দৃষ্টি

নিউজ ডেস্ক

April 17, 2026

শেয়ার করুন

বিশ্লেষণে: BDS Bulbul Ahmed

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর নেপথ্য কারিগরদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ নেই। তবে প্রথাবিরোধী লেখক ও বুদ্ধিজীবী ড. হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থে এই বিতর্ককে এক নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, কেবল একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করে ‘ঘোষক’ হওয়া যায়, কিন্তু একটি জাতির ‘মহাস্থপতি’ হওয়া যায় না।

১. বন্দী মুজিব: ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী এক প্রেরণা

হুমায়ুন আজাদ মনে করেন, ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা না দিয়ে যদি পালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দিতেন, তবে তিনি হতেন একজন ‘সামান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী’। কিন্তু তাঁর বন্দীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল এক অপরাজেয় ও অদম্য ভাবপ্রতিমা।

তিনি লিখেছেন, “যোদ্ধা মুজিবের থেকে বন্দী মুজিব ছিলেন অনেক শক্তিশালী ও প্রেরণাদায়ক। তিনি তখন হয়ে উঠেছিলেন মহানায়ক, ঘোষকের অনেক ওপরে যাঁর স্থান।” ১৯৭১ সালে প্রতিটি বাঙালির মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল— ‘মুজিব কোথায়?’ তাঁর বেঁচে থাকার সংবাদই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি।

২. মেজর জিয়া: এক ঐতিহাসিক আকস্মিকতা

২৭শে মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ অত্যন্ত নির্মোহ বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানকে একটি ‘আকস্মিক কিংবদন্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

  • সুযোগ ও আকস্মিকতা: লেখক মনে করেন, কালুরঘাটের বেতারযন্ত্রীরা একজন মেজরকে খুঁজছিলেন একটি জোরালো ঘোষণার জন্য। সেই মুহূর্তে অন্য কোনো মেজর থাকলেও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠতেন।
  • উত্তেজনা ও স্বস্তি: জিয়ার সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ সাধারণ মানুষকে আলোড়িত করেছিল মূলত এই কারণে যে, তারা জানতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন এবং তাঁর নামেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

হুমায়ুন আজাদের ভাষায়, “রবীন্দ্রনাথ বা মুজিব বা আইনস্টাইন হওয়ার জন্য লাগে দীর্ঘ সাধনা, কিন্তু কেউ কেউ হঠাৎ মেজর জিয়া হয়ে উঠে সারা দেশকে আলোড়িত করতে পারেন।”

৩. কেন মুজিবই মহাস্থপতি?

আজাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি সেকেন্ডে, প্রতিটি গুলিতে এবং প্রতিটি আত্মত্যাগে কেবল একটি নামই কাজ করেছে—তা হলো মুজিব। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কেউ হাজারবার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব জনমত আমাদের পক্ষে আসত না এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত না।

তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “মুজিব বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে পৌঁছে দিয়েছিলেন, বন্দী থেকেও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, মহাস্থপতি; তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায় না।”

৪. ‘শহীদ’ বনাম ‘নিহত-অমর’

প্রবন্ধে হুমায়ুন আজাদ ধর্মীয় পরিভাষার চেয়ে ইহলৌকিক শব্দকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান হয়তো মুজিবকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব হতেন আরও বেশি শক্তিশালী। যারা দেশের জন্য প্রাণ দেন, তারা মূলত ‘নিহত-অমর’ হয়ে ইতিহাসের পাতায় টিকে থাকেন।


বিডিএস পর্যবেক্ষণ: হুমায়ুন আজাদের এই লেখাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মেরুকরণের উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের সত্যকে খুঁজতে সাহায্য করে। তাঁর মতে, ঘোষণা কে দিয়েছেন সেই তর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো—কার নেতৃত্বে এবং কার নামে একটি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেই একক নেতৃত্বের নাম, যিনি একটি কাল্পনিক রাষ্ট্রকে মানচিত্রে রূপ দিয়েছিলেন।


এক নজরে লেখকের মূল বক্তব্য:

বিষয়হুমায়ুন আজাদের মত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিববাংলাদেশের মহাস্থপতি, যাঁর স্থান ঘোষকের অনেক ওপরে।
মেজর জিয়াঐতিহাসিক আকস্মিকতায় উদ্ভূত একজন ট্র্যাজিক নায়ক ও কিংবদন্তি।
মুক্তিযুদ্ধের চালিকাশক্তিবঙ্গবন্ধুর নাম ও ভাবপ্রতিমা।
বন্দীত্বের গুরুত্বপালিয়ে গিয়ে ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বন্দীত্ব ছিল বেশি মর্যাদাপূর্ণ।

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ