মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা

নোয়াখালী বিভাগ চাই”: ইতিহাস, ভূগোল ও উন্নয়নের দাবির প্রেক্ষাপট
নোয়াখালী বিভাগ চাই

নিউজ ডেস্ক

October 10, 2025

শেয়ার করুন

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ


বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের ঐতিহ্যবাহী জেলা নোয়াখালী—যার পূর্বনাম ছিল ভুলুয়া—এখন দেশের সবচেয়ে ধনী ও সম্ভাবনাময় জেলাগুলোর একটি। বর্তমানে “নোয়াখালী বিভাগ চাই” দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আন্দোলন জোরদার হচ্ছে।

তবে, এই দাবিকে ঘিরে দেখা দিয়েছে বিতর্কও—বিশেষ করে কুমিল্লা অঞ্চলের কিছু নাগরিক এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন।

নোয়াখালীর পরিচয়: ইতিহাস ও নামের উৎপত্তি

নোয়াখালী জেলার ইতিহাস প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো।
১৭৭২ সালে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করেন।
তখন বাংলাদেশে ১৯টি জেলা ছিল, তার একটি ছিল কলিন্দা, যা মূলত নোয়াখালী অঞ্চলের প্রশাসনিক রূপ।

১৭৮৭ সালে প্রশাসন পুনর্গঠনের পর ‘ভুলুয়া’ নামটি আসে,
এবং ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলার নাম পরিবর্তন করে “নোয়াখালী” রাখা হয়।

“নোয়াখালী” নামের উৎপত্তি

ইতিহাসবিদদের মতে—

“ত্রিপুরার পাহাড় থেকে নেমে আসা ডাকাতিয়া নদীর বন্যায় ভুলুয়ার বিশাল অংশ ডুবে যাওয়ার পর, ১৬৬০ সালে একটি নতুন খাল খনন করা হয়।
স্থানীয়রা একে বলত ‘নোয়া খাল’ (অর্থাৎ নতুন খাল)।
এই নাম থেকেই অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় ‘নোয়াখালী’।”

ভূগোল ও প্রশাসনিক কাঠামো

নোয়াখালী জেলার আয়তন ৩,৬৮৫.৮৭ বর্গকিলোমিটার।
এর উত্তরে কুমিল্লা ও চাঁদপুর, দক্ষিণে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফেনী ও চট্টগ্রাম, পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা জেলা।

নোয়াখালী বাংলাদেশের একমাত্র জেলা যার নিজের নামে কোনো শহর নেই —
জেলার প্রশাসনিক সদর দপ্তর মাইজদি (মাইজদীকোর্ট) নামে পরিচিত।

বর্তমানে জেলাটিতে ৯টি উপজেলা রয়েছে:
সোনাইমুড়ী, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, সেনবাগ, কবিরহাট, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া ও সদর উপজেলা।

নোয়াখালী: বৃহত্তর অঞ্চল থেকে বর্তমান জেলা

নোয়াখালী একসময় ছিল একটি বিশাল প্রশাসনিক অঞ্চল—
নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে গঠিত “বৃহত্তর নোয়াখালী”।

১৯৮৪ সালে সরকারি প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তে
প্রতিটি মহকুমাকে পৃথক জেলা করা হয়—
ফলে ফেনী ও লক্ষ্মীপুর আলাদা জেলা হয়,
আর নোয়াখালী নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো পায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যমতে,
নোয়াখালী এখন দেশের অন্যতম ধনী জেলা,
যেখানে মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৩৫% বেশি।

  • প্রবাসী আয় (Remittance) এ জেলার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি।
  • বেগমগঞ্জ শিল্পাঞ্চল ও সোনাইমুড়ী চৌমুহনী বাণিজ্যকেন্দ্র দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল হাব হিসেবে গড়ে উঠেছে।
  • নবীন উদ্যোক্তা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও জাহাজ-নির্মাণ শিল্পেও নোয়াখালী এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

“নোয়াখালী বিভাগ চাই” আন্দোলন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও প্রবাসী নোয়াখালীবাসী “নোয়াখালী বিভাগ চাই” আন্দোলন শুরু করেছেন।
তাদের যুক্তি—

“ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের কারণে নোয়াখালী বিভাগ এখন সময়ের দাবি।”

প্রস্তাবিত বিভাগে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও ভোলা জেলার অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন—

“একটি বিভাগ গঠিত হলে স্থানীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, প্রশাসনিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।”

বিরোধিতাও আছে

অন্যদিকে, কুমিল্লা ও চাঁদপুরের কিছু নাগরিক সংগঠন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে।
তাদের যুক্তি—

“নতুন বিভাগ মানে প্রশাসনিক খরচ বৃদ্ধি, এবং কুমিল্লা অঞ্চল ইতিমধ্যেই চট্টগ্রাম বিভাগের আওতায় ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে।”

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন বিভাগ তৈরি হলে
উন্নয়ন পরিকল্পনা বিকেন্দ্রীকরণ হবে,
এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি পাবে।

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় উন্নয়নের দাবি

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মো. রাশেদুল হক বলেন,

“নোয়াখালী এক সময় সমতট সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল।
এর ইতিহাসে প্রশাসনিক গুরুত্ব বহুবার প্রমাণিত হয়েছে।
এখন বিভাগ করা হলে এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতীক নয়,
অর্থনৈতিকভাবে দক্ষিণ উপকূলের নতুন প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হবে।”

উপসংহার

ভুলুয়া থেকে নোয়াখালী—আর এখন বিভাগ দাবির পথে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নোয়াখালী বরাবরই ছিল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দ্বীপাঞ্চল, উপকূল ও স্থলবন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা এই জনপদে
“নোয়াখালী বিভাগ” প্রতিষ্ঠা শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়,
বরং দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত উপকূলের উন্নয়নের এক নতুন সম্ভাবনা।

সূত্র

  1. Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) — “District Economic Profiles 2024”
  2. Prothom Alo / Jugantor Archives — “নোয়াখালী বিভাগ চাই আন্দোলন জোরদার” (২০২৫)
  3. Noakhali Heritage Foundation — “ভুলুয়া থেকে নোয়াখালী: ইতিহাস ও নামকরণের গল্প”

প্রতিবেদক:  বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

একটি রেসপন্স

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

| Award-Winning Photography Tours & Expeditions

নিউজ ডেস্ক

September 25, 2026

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ—নদীমাতৃক এই বদ্বীপটি যেন এক অন্তহীন দৃশ্যের ক্যানভাস। কুয়াশাচ্ছন্ন চা বাগান থেকে শুরু করে পুরোনো ঢাকার প্রাণবন্ত অলিগলি, বরিশালের ব্যাকওয়াটার থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের ভারী শিল্প বা ইটের ভাটার রোমাঞ্চকর জীবনযাত্রা—প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে আছে হাজারো না বলা গল্প। তবে একজন প্রফেশনাল ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার, ট্রাভেল ক্রিয়েটর বা আন্তর্জাতিক শৌখিন আলোকচিত্রীর জন্য দেশের এই লুকানো রত্নগুলো এককভাবে খুঁজে বের করা এবং সেগুলোর সঠিক ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই পেশাদার চ্যালেঞ্জটিকেই নিখুঁতভাবে সমাধান করতে এবং গ্লোবাল কমিউনিটির সামনে দেশের আসল রূপ তুলে ধরতে আত্মপ্রকাশ করেছে Photo Tour Bangla

১. প্রতিষ্ঠাতা ও লিডারশিপ: যার হাত ধরে গড়ে উঠেছে প্ল্যাটফর্মটি

একটি সফল ফটোগ্রাফি এক্সপিডিশনের প্রাণ হলো তার গাইড বা মেন্টর। এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা ও কিউরেট করছেন দেশের অন্যতম উদীয়মান ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ। তিনি কেবল একজন ট্যুর লিডারই নন, বরং তার অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেছেন বিশ্বমানের সব accolades—যার মধ্যে রয়েছে সিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস (ইতালি) ফাইনালিস্ট, হিপা (HIPA) ফাইনালিস্ট এবং বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার ক্যাটেগরি উইনার হওয়ার গৌরব। এছাড়া Solent News (UK) এবং Zuma Press (UK)-এর মতো বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে তার ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিকতার কাজ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে, তার নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিটি ট্যুর সম্পূর্ণ প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখে।

২. সাধারণ ট্যুরিজম বনাম প্রিমিয়াম ফটোগ্রাফি এক্সপিডিশন

সাধারণ পর্যটকরা যেখানে শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন, সেখানে Photo Tour Bangla ফোকাস করে ‘ইমার্সিভ ও এথিক্যাল ফটোগ্রাফি’-এর ওপর। এখানে কোনো গতানুগতিক রুট ফলো করা হয় না; বরং আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফার, ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং গবেষকদের জন্য ডিজাইন করা হয় এক্সক্লুসিভ শ্যুটিং এক্সপিডিশন। যেমন:

  • ইন্ডাস্ট্রিয়াল ন্যারেটিভস: দেশের ভারী শিপব্রেইকিং ইয়ার্ড ও ঐতিহ্যবাহী ইটের ভাটার র এবং ড্রামাটিক ভিজ্যুয়াল ক্যাপচার।
  • ভ্যানিস অব বাংলাদেশ: বরিশালের ভাসমান বাজার (পেঁয়ারা ও আমড়ার বাজার) এবং ব্যাকওয়াটারের জীবন্ত ও কালারফুল রুট।
  • কালচারাল ও ওয়াইল্ডলাইফ ডাইভার্সিটি: শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং মণিপুরি আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা ও ফোক কালচার।

৩. আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ও লজিস্টিকস এক্সিলেন্স

একজন আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফারের কাছে ক্যামেরা গিয়ারের নিরাপত্তা, সঠিক সময়ে আলোর উপস্থিতি এবং স্মুথ লোকাল লজিস্টিকস সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। Photo Tour Bangla এই জায়গাটিতে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করে:

  • এসি প্রাইভেট ভেহিকেল, দেশীয় নৌকা, স্পিডবোট এবং লঞ্চ কেবিনের সুব্যবস্থা।
  • রিমোট এরিয়াগুলোতে স্থানীয় পারমিট, গাইডেন্স এবং নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়।
  • ইথিক্যাল ফটোগ্রাফি প্র্যাকটিস—যাতে স্থানীয় কমিউনিটি বা সাবজেক্টদের সাথে সম্মানজনক ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রেখে ফ্রেমবন্দী করা যায়।

৪. কেন বিশ্বমানের ফটোগ্রাফারদের প্রথম পছন্দ Photo Tour Bangla?

  • গ্লোবাল ক্রেডিবিলিটি: আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিযোগিতায় বহুবার পুরস্কৃত লিডার দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় এখানে শেখার পরিধি অনেক বিস্তৃত।
  • ভিজ্যুয়াল ও টেকনিক্যাল গাইডেন্স: কেবল ছবি তোলা নয়, বরং শ্যুটিং অ্যাঙ্গেল, লাইটিং, এবং অ্যাডভান্সড পোস্ট-প্রসেসিং ও ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ গাইডলাইন প্রদান।
  • বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা: ট্যুর শেষে অংশগ্রহণকারীরা কেবল কিছু সাধারণ ছবিই পান না, বরং আন্তর্জাতিক মানের পোর্টফোলিও তৈরির মতো শক্তিশালী গল্প ও ফ্রেম নিয়ে ঘরে ফেরেন।

আপনি যদি একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার বা ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলর হন এবং বাংলাদেশের খাঁটি আত্মাকে আপনার ক্যামেরার ফ্রেমে চিরতরে অমর করে রাখতে চান, তবে আজই ভিজিট করুন Photo Tour Bangla এবং বুক করে নিন আপনার পরবর্তী বিশ্বমানের ফটোগ্রাফি এক্সপিডিশন।

আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

পৈতৃক শিকড়

নিউজ ডেস্ক

September 20, 2026

শেয়ার করুন

  • প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
  • বিভাগ (Category): ইতিহাস, রাজনীতি ও বায়োগ্রাফি
  • প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • তথ্যসূত্র (Sources): প্রখ্যাত রাজনৈতিক ইতিহাস নথিপত্র, আর্কাইভাল রেকর্ড ও পারিবারিক ইতিহাস গাইড।

একটি পরিবারের বা ব্যক্তির পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, কর্মস্থল, স্থায়ী বসবাস এবং মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার স্থান—এই বিষয়গুলো ইতিহাস ও জীবনযাত্রার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় নির্দেশ করে। চাকরি, ব্যবসা, রাজনীতি কিংবা দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনধারা স্থানান্তরিত হওয়া ইতিহাসজুড়ে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিএনপি নেতা তারেক রহমানের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর দাদা-দাদির করাচিতে সমাহিত হওয়ার মূল কারণও এই ঐতিহাসিক ও পেশাগত পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত।

    ১. পৈতৃক শিকড় ও পরিবারের ধারাবাহিকতা

    বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক পরিবার মূলত বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার বাসিন্দা।

    • পৈতৃক মূল রূপরেখা: জিয়াউর রহমানের নিজের দাদা মৌলভী কামালউদ্দিন মণ্ডল বগুড়ার মহিষাবান এলাকা থেকে বাগবাড়ীতে আগমন করেন এবং মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করেন। তিনি বাগবাড়ী মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
    • জিয়াউর রহমানের জন্ম: ১৯৩৬ সালে জিয়াউর রহমান বগুড়ার বাগবাড়ীতেই জন্মগ্রহণ করেন।
    • মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুন: জিয়াউর রহমানের বাবা মনসুর রহমান ছিলেন পেশায় একজন রসায়নবিদ এবং তিনি সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন।

    ২. দেশভাগ, চাকরি ও করাচিতে স্থানান্তরের প্রেক্ষাপট

    মনসুর রহমান ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একটি সরকারি দপ্তরে রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

    • দেশভাগের প্রভাব (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হলে মনসুর রহমান সরকারি চাকরি সূত্রে এবং পরিবারসহ তৎকালীন পাকিস্তানের নতুন রাজধানী করাচিতে স্থানান্তরিত হন।
    • জিয়াউর রহমানের শৈশব ও শিক্ষা: জিয়াউর রহমানও তখন বাবার কর্মস্থল সূত্রে করাচিতে যান এবং সেখানেই তাঁর স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
    • কবরের অবস্থান: ১৯৪৭ সালের পর মনসুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী জাহানারা খাতুন (তারেক রহমানের দাদা ও দাদি) করাচীতেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁদের দাফন করাচিতে সম্পন্ন হয়।

    ৩. ইতিহাসে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের নজির

    পৈতৃক শিকড় বা জন্মভূমি এক জায়গায়, কিন্তু জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে দাফন বা শেষ শয্যা অন্য দেশে হওয়া ইতিহাসে কোনো বিরল ঘটনা নয়। মানব ইতিহাসের হাজার বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনৈতিক নির্বাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার, পেশাগত কারণ এবং দেশভাগের মতো ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন বৈচিত্র্য দেখা গেছে।

    ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বপৈতৃক শিকড় / জন্মস্থানশেষ জীবন / সমাহিত হওয়ার স্থান
    কাজী নজরুল ইসলামচুরুলিয়া, বর্ধমান (ভারত)ঢাকা, বাংলাদেশ
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরপূর্ববঙ্গের জমিদারি অঞ্চল (শিলাইদহ/শাহজাদপুর)কলকাতা, ভারত
    শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক-এর পরিবার: শিকড় বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), চাচার কবর কলকাতায়বরিশালবাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের পৈতৃক শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) অঞ্চলে হলেও তাঁর চাচা ও ওস্তাদ ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দি সুরাওয়ার্দীর মতো পরিবারের অনেক সদস্যের কর্মজীবন ও শেষ শয্যা হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী এবং বড় শহরের কেন্দ্রিকতার কারণে এটি ঘটেছিল।
    মুহাম্মদ আলী জিন্নাহগুজরাট (ভারত)করাচি, পাকিস্তান
    হযরত ইব্রাহিম (আ.)মেসোপটেমিয়া (ইরাক)হেবরন (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল)

    ইতিহাসের পাতা থেকে পৈতৃক শিকড় ও দাফনের স্থানের বৈচিত্র্যের আরো ৪ টি উল্লেখযোগ্য নজির নিচে তুলে ধরা হলো:

    ১. সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর: পৈতৃক শিকড় দিল্লি, দাফন ইয়াঙ্গুন (মিয়ানমার)

    মুঘল রাজবংশের পৈতৃক শিকড় ছিল ভারতের দিল্লি এবং আগ্রা কেন্দ্রিক। তবে সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) পর ব্রিটিশরা শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে (বর্তমান ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) নির্বাসিত করে। ১৮৬২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় এবং ব্রিটিশরা অত্যন্ত গোপনে একটি গ্যারিসনের কাছে তাঁকে সমাহিত করে। বর্তমান যুগেও তাঁর মাজার মিয়ানমারে একটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান।

    ২. বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, শেষকৃত্য নিউ জার্সি (যুক্তরাষ্ট্র)

    সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানিতে। তবে ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইহুদি নিধনের প্রেক্ষাপটে তিনি জার্মানি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটনে তাঁর মৃত্যু হয় এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জাঁকজমকপূর্ণ কবর না বানিয়ে মৃতদেহ পুড়িয়ে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

    ৩. কার্ল মার্ক্স: পৈতৃক শিকড় জার্মানি, দাফন লন্ডন (যুক্তরাজ্য)

    সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্সের পৈতৃক শিকড় ও জন্ম ছিল জার্মানির প্রুশিয়ায়। তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক লেখার কারণে তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়াম থেকে বহিষ্কৃত হন। জীবনের শেষ তিন দশক তিনি লন্ডনে কাটান এবং ১৮৮৩ সালে সেখানেই মারা যান। লন্ডনের বিখ্যাত হাইগেট সেমেটারিতে (Highgate Cemetery) তাঁর সমাধি অবস্থিত।

    ৪. মুঘল সম্রাট বাবর: পৈতৃক শিকড় ফারগানা (উজবেকিস্তান), জন্ম ও মৃত্যু ভারত, চূড়ান্ত দাফন কাবুল (আফগানিস্তান)

    মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের পৈতৃক শিকড় ছিল মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ফারগানা উপত্যকায়। তিনি ভারত জয় করে সাম্রাজ্য গড়েন এবং ১৫৩০ সালে ভারতের আগ্রায় মারা যান। প্রথমে তাঁকে আগ্রার আরামবাগে দাফন করা হলেও, তাঁর পূর্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তীতে তাঁর দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং “বাগ-ই-বাবর” (বাবরের বাগান) নামক স্থানে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হয়।


    এই বৈচিত্র্যের মূল কারণগুলো কী কী?

    • ভূ-রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন: ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ বা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতো ঘটনার কারণে বহু মানুষের পৈতৃক ভিটা এক দেশে আর বর্তমান নাগরিকত্ব বা শেষ ঠিকানা অন্য দেশে পরিণত হয়েছে।
    • পেশাগত স্থানান্তর: ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে চাকুরিসূত্রে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন এবং সেখানেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
    • রাজনৈতিক নির্বাসন: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধের কারণে ইতিহাসের বহু রাজপরিবার বা রাজনৈতিক নেতাকে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়েছে এবং সেখানেই সমাহিত হতে হয়েছে।

    মূল নির্যাস

    পৈতৃক শিকড়, জন্মস্থান, বসবাসের স্থান, কর্মস্থল, মৃত্যুর স্থান এবং সমাহিত হওয়ার স্থান—এই ছয়টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনো ব্যক্তির পরিবারের কেউ ভিন্ন দেশে সমাহিত হওয়া মানে এই নয় যে তাঁর ঐতিহাসিক বা পারিবারিক পৈতৃক শিকড় বদলে গেছে। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও বগুড়া তাঁর বংশানুক্রমিক পৈতৃক মাটি, আর করাচীতে তাঁর দাদা-দাদির সমাহিত হওয়াটা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সরকারি চাকরির ঐতিহাসিক স্থানান্তরের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা।

    আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

    প্রথম শহীদ

    নিউজ ডেস্ক

    September 20, 2026

    শেয়ার করুন

    • প্রতিবেদনের শিরোনাম: মহান মুক্তিযুদ্ধ: প্রথম শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠদের রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা
    • প্রতিবেদক / লেখক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
    • বিভাগ (Category): ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় ঐতিহ্য
    • প্রকাশের তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
    • তথ্যসূত্র (Sources): মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম ও জাতীয় ইতিহাস মহাফেজখানা।

    ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, কোটি মানুষের ত্যাগ এবং হাজারো অকুতোভয় সেনানী ও সাধারণ মানুষের বীরত্বগাথার ঐতিহাসিক মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে রয়েছে রক্তঝরা ইতিহাস।

    ১. স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তিম সূচনা: প্রথম শহীদ শঙ্কু সমজদার

    ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ—বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা দেশে তখন তীব্র অসহযোগ আন্দোলন ও সর্বাত্মক হরতাল চলছিল। সেদিন রংপুরের কাচারি বাজার থেকে স্বাধিকারের দাবিতে বের হওয়া এক উত্তাল মিছিলে যোগ দিয়েছিল কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী শঙ্কু সমজদার।

    মিছিলটি আলমনগর ও জাহাজ কোম্পানির মোড় অতিক্রম করার সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী অ-বাঙালিদের অতর্কিত গুলিতে রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। ঘটনাস্থলেই অকাতরে প্রাণ ঢেলে দেন কিশোর শঙ্কু। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি-ই মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ ও প্রথম শিশু শহীদ। পরবর্তীতে ২০১২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে এই ঐতিহাসিক মর্যাদা প্রদান করা হয়।

    ২. সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক: সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ

    মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সাতজন মহান সন্তানকে দেওয়া হয় দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘বীরশ্রেষ্ঠ’।

    • প্রথম ও শেষ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ: মুক্তিযুদ্ধে সর্বপ্রথম শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফ (৮ এপ্রিল, ১৯৭১)। তবে সাধারণ জ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রে অপশনে তাঁর নাম না থাকলে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালকে (১৮ এপ্রিল, ১৯৭১) বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শত্রুর মুখোমুখি যুদ্ধে শহীদ হন সর্বশেষ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর (১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১)।

    সাত বীরশ্রেষ্ঠর সংক্ষেপিত পরিচিতি ও সমাধিস্থল

    নাম ও পদবিবাহিনী ও সেক্টরশাহাদাতের তারিখচিরনিদ্রায় শায়িত যেখানে
    ল্যান্স নায়ক মুন্সী আব্দুর রউফইপিআর (১ নং সেক্টর)৮ এপ্রিল, ১৯৭১বুড়িঘাট, নানিয়ারচর, রাঙামাটি
    সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামালসেনাবাহিনী (২ নং সেক্টর)১৮ এপ্রিল, ১৯৭১দরুইন গ্রাম, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
    ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানবিমানবাহিনী২০ আগস্ট, ১৯৭১মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা
    ল্যান্স নায়ক নূর মোহাম্মদ শেখইপিআর (৮ নং সেক্টর)৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১কাশীপুর, শার্শা, যশোর
    সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানসেনাবাহিনী (৪ নং সেক্টর)২৮ অক্টোবর, ১৯৭১মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ঢাকা
    ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার-১ মোহাম্মদ রুহুল আমিননৌবাহিনী (১০ নং সেক্টর)১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১বাগমারা, রূপসা, খুলনা
    ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরসেনাবাহিনী (৭ নং সেক্টর)১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

    ৩. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক শাহাদাত

    পাকিস্তানের রিসালপুর থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। ডিসেম্বরের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন তিনি।

    ১৪ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক দোতলা ভবন থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভারী মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলি বর্ষণ হচ্ছিল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে এগুনো অসম্ভব করে তোলে। এই সংকটময় মুহূর্তে ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর এক হাতে এসএমজি এবং অন্য হাতে গ্রেনেড নিয়ে বুক ডলে হামাগুড়ি (ক্রলিং) দিয়ে শত্রুর বাঙ্কারের একদম কাছে পৌঁছে যান। প্রখর নিশানায় গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুর মেশিনগান পোস্টটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশের ভবন থেকে এক পাকিস্তানি স্নাইপারের বুলেট তাঁর কপালে এসে বিদ্ধ হয়। দেশের এই অকুতোভয় বীর বাঙ্কারের সামনেই শাহাদাতবরণ করেন, যার পরদিনই (১৫ ডিসেম্বর) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।

    ৪. রণাঙ্গনের অবিশ্বাস্য সব বীরত্বগাথা

    • নৌ-কমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’: ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে খালি গায়ে, পায়ে ফিন্স ও বুকে লিম্পেট মাইন বেঁধে সাঁতরে গিয়ে চট্টগ্রাম, মংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে হামলা চালান বীর নৌ-কমান্ডোরা। তাঁদের গুঁড়িয়ে দেওয়া ২৬টি ধান ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে যায় বিশ্ব।
    • ঢাকার বুকে আতঙ্কের নাম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’: ঢাকার তরুণ গেরিলা যোদ্ধাদের গঠিত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ অবরুদ্ধ রাজধানীতে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন চালায়। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বড় বড় নিরাপত্তা চৌকিতে তাদের সফল গ্রেনেড হামলা পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বক্ষণিক আতঙ্কে রাখত।
    • অস্ত্র হাতে নারীদের প্রতিরোধ: তারামন বিবি (বীর প্রতীক) সরাসরি রণাঙ্গনে শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছেন। ডা. সিতারা বেগম ফিল্ড হাসপাতাল পরিচালনা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং অমানবিক নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি বিশটিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
    • স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র: ইথারের তরঙ্গে ‘চরমপত্র’ (এম আর আখতার মুকুল) এবং উদ্দীপনামূলক দেশাত্মবোধক গানগুলো ছিল রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য আসল অক্সিজেন।
    • বিদেশী বন্ধুদের অবদান: জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। এছাড়া বাটা সু কোম্পানির অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তা ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড গোপনে অস্ত্র ও তথ্য দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন, যিনি একমাত্র বিদেশী হিসেবে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত হন।

    উপসংহার

    বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো উপহার ছিল না; এটি ছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী ও অকুতোভয় সেনাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এক লাল-সবুজ পতাকা। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তা শঙ্কু সমজদার থেকে শুরু করে সাত বীরশ্রেষ্ঠ এবং ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

    আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।

    ১১ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ