ইতিহাস
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
সম্পাদনা ও গবেষণা: ইতিহাস ও গবেষণা বিভাগ
প্রকাশের তারিখ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬
প্রকাশের সময়: দুপুর ১২:৩০ মিনিট (বিএসটি)
মূল বিষয়শ্রেণী (Category): ইতিহাস ও ঐতিহ্য / রাজনীতি / বাংলাদেশ
অবিভক্ত বাংলার মুসলিম সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, শিক্ষা বিস্তার ও অধিকার আদায়ে যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে অগ্রণী, তিনি নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের নিজ বাসভবনে তিনি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যু সাধারণ অসুস্থতা নাকি কোনো গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে আজও ইতিহাসে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা-কল্পনা রয়েছে।
কীভাবে মারা গিয়েছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ? (মৃত্যু ও রহস্য)
সরকারি ও চিকিৎসাগত রেকর্ডে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ বা স্ট্রোক উল্লেখ করা হলেও, সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিষ প্রয়োগের শক্ত সন্দেহ ঘনীভূত হয়:
নবাব সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত বলা হলেও, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ঘটনার আকস্মিকতার কারণে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগে হত্যাকাণ্ড বা গভীর ষড়যন্ত্রের জোরালো গুঞ্জন রয়েছে।
মৃত্যুর ঘটনা ও প্রধান রহস্যসমূহ
- আকস্মিক অসুস্থতা ও গুঞ্জন: মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত নবাব সুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর দিন রাতে হঠাৎ তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্রুতই তাঁর মৃত্যু হয়। সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এবং পরবর্তী সময়ে বহু গবেষকের লেখায় দাবি করা হয়, ব্রিটিশদের কোনো গোপন নীলনকশার অংশ হিসেবে অথবা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দ্বারা তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
- রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপট: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নবাব সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে। এর ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাথে নবাবের চরম বিরোধ তৈরি হয়। তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং বড় ধরনের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যা ব্রিটিশদের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
- মরদেহ নিয়ে চরম গোপনীয়তা: ১৯১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি নবাবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী খাজা শামসুল হকের ডায়েরির বিবরণ থেকে জানা যায়, নবাবের মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পরিবারের কোনো সদস্য বা স্বজনদের স্পর্শ করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি মৃত্যুর পর তাঁর মুখমণ্ডল দেখতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল।
- কঠোর নিরাপত্তা ও জানাজা: কলকাতা থেকে বিশেষ স্টিমারে করে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও কঠোর পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। সাধারণ মানুষকে মরদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি এবং অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ঢাকার বেগমবাজারে জানাজা শেষে তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে (উর্দু রোড) দাফন করা হয়।
- সশস্ত্র পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত নবাব সলিমুল্লাহর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য এবং ব্রিটিশ পুলিশ দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত নজিরবিহীন। ধারণা করা হয়, ময়নাতদন্তের জন্য কেউ যেন লাশ চুরি বা উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।
যদিও ব্রিটিশ সরকার বা তৎকালীন তদন্তে এই মৃত্যুকে হৃদরোগ বা স্বাভাবিক অসুস্থতা হিসেবে ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও এই ঐতিহাসিক উপাত্ত ও অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কারণে আজও নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠন
পূর্ববঙ্গ ও আসাম (Eastern Bengal and Assam) ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি স্বল্পস্থায়ী প্রদেশ, যা ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ (Partition of Bengal) আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর একক প্রচেষ্টা এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই নতুন প্রদেশটি আত্মপ্রকাশ করে।
নিচে এই প্রদেশ গঠনের পটভূমি, কাঠামো এবং এর প্রভাব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রদেশ গঠনের পটভূমি ও কারণ
- প্রশাসনিক বিশালতা: অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বাংলা, বিহার ও ওড়িশা) ছিল আয়তনে বিশাল এবং এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ কোটি ৮৫ লাখ। একজন গভর্নরের পক্ষে এই বিশাল অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনভার পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
- পূর্ববঙ্গের অবহেলা ও অনগ্রসরতা: তৎকালীন সমস্ত সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা ছিল কলকাতা-কেন্দ্রিক। ফলে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) অর্থনীতি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছিল।
- নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকা: ১৯০৪ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ববঙ্গের মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। তিনি জোরালো যুক্তি দেখান যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে আলাদা প্রদেশ না হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়।
২. প্রদেশ গঠন ও ভৌগোলিক কাঠামো (১৯০৫)
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের চূড়ান্ত আদেশে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিকে বিভক্ত করে নতুন প্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ গঠন করা হয়।
- ভৌগোলিক এলাকা: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ, মালদহ, ত্রিপুরা এবং সমগ্র আসাম অঞ্চল নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়।
- রাজধানী ও জনসংখ্যা: নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী করা হয় আসামের শিলংকে। প্রদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ, যার মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ ছিলেন মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ ছিলেন হিন্দু। ফলে এটি একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে পরিণত হয়।
- প্রথম গভর্নর: স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার (Sir Bampfylde Fuller) এই নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।
৩. নতুন প্রদেশের প্রভাব ও উন্নয়ন
প্রদেশটি গঠিত হওয়ার পর মাত্র ৬ বছরে পূর্ববঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসে:
- ঢাকার আধুনিকায়ন: দীর্ঘকাল পর ঢাকা পুনরায় রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় এখানে কার্জন হল, হাইকোর্ট ভবন, সেক্রেটারিয়েট (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ অংশ) এবং গভর্নমেন্ট হাউস নির্মিত হয়। ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে।
- শিক্ষার প্রসার: পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল, কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ এক লাফে অনেক বেড়ে যায়।
- অর্থনৈতিক জোয়ার: চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হয় এবং ঢাকার সাথে অন্যান্য জেলার রেল ও নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ফলে পাট ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
৪. প্রদেশের বিলুপ্তি বা বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)
মুসলিমরা এই প্রদেশ গঠনে খুশি হলেও কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়, আইনজীবী এবং জাতীয় কংগ্রেস এটিকে ‘বঙ্গমাতা’র অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যায়িত করে তীব্র ‘স্বদেশী আন্দোলন’ ও ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলন শুরু করে।
তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর উপলক্ষে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির দরবারে আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল থেকে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায়।
নবাব সলিমুল্লাহর জোরালো দাবিতে লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে নতুন প্রদেশ গঠন করেন এবং ঢাকাকে এর রাজধানী করা হয়।
অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা
অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ (All India Muslim League) ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল。 এটি ছিল ব্রিটিশ ভারতে মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, যার হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়。
নিচে এই ঐতিহাসিক দলটির প্রতিষ্ঠা, পটভূমি এবং গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি
- বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন (১৯০৫): ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নতুন আশার আলো জাগে。 কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং কলকাতার হিন্দু সমাজ এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করলে মুসলিম নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের অধিকার রক্ষার জন্য নিজস্ব একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল প্রয়োজন。
- শিমলা ডেপুটেশন (১৯০৬): ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর স্যার আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল শিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সাথে সাক্ষাৎ করেন。 তাঁরা মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা ও চাকরিতে কোটার দাবি জানান, যা ইতিবাচক সাড়া পায়。
২. ঐতিহাসিক সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠা
- এডুকেশনাল কনফারেন্স: ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকার শাহবাগে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশনাল কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়。
- রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব: কনফারেন্সের শেষ দিন, ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষায় একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দল গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন。
- সমর্থন ও অনুমোদন: এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাকিম আজমল খান, জাফর আলী খান এবং মাওলানা মোহাম্মদ আলী。 উপস্থিত প্রায় ৩,০০০ প্রতিনিধি সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেন এবং ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ আত্মপ্রকাশ করে。
৩. প্রথম নেতৃত্ব ও সদর দপ্তর
- প্রথম সভাপতি (অস্থায়ী): ঢাকার এই ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মূলক।
- প্রথম স্থায়ী সভাপতি: ১৯০৮ সালে করাচি অধিবেশনে স্যার আগা খানকে দলের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।
- প্রধান কার্যালয়: দলটির প্রথম সদর দপ্তর বা কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল উত্তর প্রদেশের লখনউ শহরে।
৪. মুসলিম লীগের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
দলটি মূলত তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল:
- ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলিমদের আনুগত্য বৃদ্ধি করা এবং সরকারের নীতি সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা。
- ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং তাদের দাবি ও আশা-আকাঙ্ক্ষা সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরা。
- মুসলিম লীগের মূল উদ্দেশ্যের ক্ষতি না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা。
নবাব সলিমুল্লাহর দূরদর্শিতা এবং ঢাকার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগই পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে。
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল মূলত ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের (বাতিল) ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতৃবৃন্দের জোরালো ও আপসহীন দাবির মুখেই ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল।
নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির পটভূমি ও ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. দাবির মূল পটভূমি (বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১১)
- মুসলিমদের হতাশা: ১৯০৫ সালে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ প্রদেশ গঠনের পর ঢাকায় শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার হিন্দু নেতা ও কংগ্রেসের তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার আকস্মিকভাবে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করে।
- অধিকার হরণ: বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ঢাকা আবার তার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং পূর্ববঙ্গ পুনরায় কলকাতার অধীনে চলে যায়। এতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করে।
২. লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে ঐতিহাসিক স্মারকলিপি (১৯১২)
- নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্ব: বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের শান্ত করতে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় বা বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।
- দাবি উত্থাপন: ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীসহ ১৯ জন বিশিষ্ট নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
- ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিনিধি দলটি বড়লাটের কাছে জোরালো দাবি জানান যে, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঢাকায় অবিলম্বে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. ব্রিটিশ সরকারের সম্মতি ও নাথান কমিটি
- বড়লাটের ঘোষণা: মুসলিম নেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও যৌক্তিক দাবির মুখে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করা হয়।
- কলকাতার হিন্দু মহলের বিরোধিতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কলকাতার একদল হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও নেতা (যাঁদের মধ্যে ড. রাসবিহারী ঘোষ, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী এবং স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় অন্যতম)। তাঁদের যুক্তি ছিল, ঢাকার মতো জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার মান কমে যাবে এবং এটি হবে “টাকা অপচয়”।
- নাথান কমিটি গঠন: সমস্ত বিরোধিতা উপেক্ষা করে ১৯১২ সালের মে মাসে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ‘নাথান কমিটি’ গঠন করা হয়, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা ও খসড়া তৈরি করে।
নবাব সলিমুল্লাহর অটল দাবি এবং ৬০০ একর জমি দানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে।
আকস্মিক প্রয়াণ
নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আকস্মিক প্রয়াণ (মৃত্যু) ছিল তৎকালীন বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় ধাক্কা এবং একটি গভীর রহস্য। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার চৌরঙ্গী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মৃত্যুর আকস্মিকতা ও সন্দেহ
নবাব সলিমুল্লাহ মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম ছিলেন। ১৬ জানুয়ারি রাতে ডিনারের পর তিনি হঠাৎ তীব্র পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হন এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। কোনো পূর্ব অসুস্থতা ছাড়া একজন শীর্ষ নেতার এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বাংলায় খাবারে বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
২. রাজনৈতিক বিরোধ ও কারণ
১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার মুসলিমদের স্বার্থ উপেক্ষা করে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করার পর থেকে নবাব সলিমুল্লাহর সাথে ব্রিটিশ রাজের চরম দূরত্ব তৈরি হয়।
- তিনি ব্রিটিশদের দেওয়া ‘জি.সি.আই.ই’ (GCIE) উপাধি বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
- তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের ছক আঁকছিলেন।
- ধারণা করা হয়, তাঁর এই কঠোর অবস্থান ব্রিটিশ শাসক বা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
৩. নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও পাহারা
নবাবের প্রয়াণের পর ব্রিটিশ সরকারের কিছু রহস্যজনক আচরণ এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়:
- মরদেহ স্পর্শে নিষেধাজ্ঞা: তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার বাড়িতে স্বজনদের লাশ স্পর্শ করতে বা মুখ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
- কঠোর প্রহরায় ঢাকা আনা: ময়নাতদন্ত ছাড়াই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে বিশেষ স্টিমারে করে পুলিশি পাহারায় তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়।
- কবর পাহারা: দাফনের পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত তাঁর কবরটি সশস্ত্র গুর্খা সৈন্য দিয়ে দিন-রাত পাহারা দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন। অনেকের মতে, মৃত্যুর আসল কারণ আড়াল করতে কেউ যেন লাশ তুলে পুনরায় পরীক্ষা (Post-mortem) করতে না পারে, সেজন্যই এই পাহারা বসানো হয়েছিল।
নবাব সলিমুল্লাহর এই আকস্মিক প্রয়াণ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জাগরণকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দিয়েছিল এবং বাংলার ইতিহাসে এটি আজও একটি অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং ঢাকার আধুনিকায়নে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের ঐতিহাসিক অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে এই পরিবারের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশাল ত্যাগ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনি ঢাকাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার মূল কারিগরও ছিলেন এই নবাবরা।

নিচে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার সার্বিক উন্নয়নে নবাব পরিবারের ঐতিহাসিক অবদানসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নবাব পরিবারের অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল নবাব স্যার সলিমুল্লাহর আপসহীন দাবি এবং তাঁর পরিবারের বিশাল ত্যাগের ওপর।
- রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণের দাবি: ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিবাদে ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের সাথে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ববঙ্গের শিক্ষার অনগ্রসরতা দূর করতে তাঁরা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান।
- বিশাল জমি দান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নবাব সলিমুল্লাহ এবং তাঁর পরিবার ঢাকার রমনা এলাকায় তাঁদের নিজস্ব জমিদারি থেকে প্রায় ৬০০ একর নিষ্কর জমি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দান করেন। এই বিশাল জমির ওপরই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস অবস্থিত।
- অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরির জন্য গঠিত ‘নাথান কমিটি’ (Nathan Committee)-র অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ। যদিও ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি চালুর আগেই ১৯১৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়, তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর পরিবার ব্রিটিশ সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে গেছে।
- স্মৃতি ও স্বীকৃতি: নবাব সলিমুল্লাহর এই ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসিক হলের নাম রাখা হয় ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ (SM Hall)।
২. ঢাকার আধুনিকায়ন ও সমাজকল্যাণে নবাব পরিবারের অবদান
শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে নবাব পরিবারের অবদান অপরিসীম। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি পাওয়ার পর এই পরিবার ঢাকার চেহারা বদলে দেয়।
- বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্টেশন (নবাব আব্দুল গণি): ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট ছিল এবং কলেরা-টাইফয়েডের মতো মহামারি লেগেই থাকত। নবাব খাজা আব্দুল গণি ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে নিজস্ব অর্থায়নে ‘ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস’ বা পানির ফিল্টার স্টেশন স্থাপন করেন, যা ঢাকাবাসীকে প্রথম বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ করে দেয়।
- প্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (নবাব খাজা আহসানুল্লাহ): ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর নবাব খাজা আহসানুল্লাহর উদ্যোগে এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো হয়। পরবর্তীতে তাঁর অর্থায়নেই ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাজপথে বৈদ্যুতিক বাতির আলো ছড়িয়ে পড়ে।
- চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন: ঢাকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে নবাব পরিবার বিপুল অর্থ অনুদান দিয়েছিল। তৎকালীন মিটফোর্ড হাসপাতাল (বর্তমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) এবং লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উন্নয়নে এই পরিবার নিয়মিত অর্থ ও জমি দান করত।
- যোগাযোগ ও সংস্কৃতির বিকাশ: ঢাকায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নবাবদের ভূমিকা ছিল প্রধান। এছাড়া আহসান মঞ্জিলকে কেন্দ্র করে নাটক, থিয়েটার, কাওয়ালি এবং সাহিত্য চর্চার এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
- আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাসস্থান এবং পূর্ববঙ্গের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু, যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
আহসান মঞ্জিল পরিদর্শনের আধুনিক তথ্য

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর বর্তমানে সম্পূর্ণ অনলাইন ই-টিকিট ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৩ সালে সংস্কারের পর এর গ্যালারিগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকার এই ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদটি পরিদর্শনের জন্য ২০২৬ সালের সর্বশেষ আপডেট ও আধুনিক তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. অনলাইন ই-টিকিট কাটার নিয়ম ও মূল্য
আহসান মঞ্জিলে প্রবেশের জন্য এখন আর কাউন্টারে কোনো টিকিট বিক্রি করা হয় না। দর্শনার্থীদের মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অগ্রিম টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়।
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: টিকিট কাটার জন্য আহসান মঞ্জিল ই-টিকিট পোর্টাল (ahsanmanzilticket.gov.bd) ভিজিট করতে হবে।
- টিকিটের মূল্য তালিকা:
- দেশী প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী: ৪০ টাকা (অনলাইন চার্জসহ প্রায় ৪২ টাকা)
- শিশু (১২ বছরের কম): ২০ টাকা
- সার্কভুক্ত দেশের পর্যটক: ৩০০ টাকা
- অন্যান্য বিদেশী পর্যটক: ৫০০ টাকা
- (বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন হয় না।)
২. বর্তমান সময়সূচি (২০২৬)
সপ্তাহের একেক দিন আহসান মঞ্জিলের পরিদর্শনের সময় ভিন্ন হয়ে থাকে:
- শনিবার থেকে বুধবার: সকাল ১০:৩০ টা থেকে বিকাল ০৪:৩০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় বিকাল ৪:০০ টা)।
- শুক্রবার: বিকাল ০৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ০৭:০০ টা পর্যন্ত (অনলাইনে টিকিট কেনার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬:০০ টা)।
- সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এছাড়া অন্যান্য প্রধান সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও এটি বন্ধ থাকে।
৩. আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভেতরের পরিবেশ
- ডিজিটাল গ্যালারি: আহসান মঞ্জিলের মোট ২৩টি গ্যালারিকে আধুনিক আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী করা হয়েছে। এখানে নবাব আমলের রাজকীয় আসবাবপত্র, ডাইনিং রুম, নাচঘর, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র এবং ঐতিহাসিক দুর্লভ আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে।
- নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: প্রাসাদের মূল ভবনের ভেতরে সব ধরনের ক্যামেরা, ট্রাইপড এবং ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ নিষেধ (মহিলাদের ছোট পার্স বাদে)। কাউন্টারের পাশে লকার রুমে এগুলো জমা রাখতে হয়। ভবনের ভেতরে ছবি বা সেলফি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তবে বাইরের বিশাল সবুজ বাগান ও সিঁড়িতে ছবি তোলা যায়।
- সহজ যাতায়াত: পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের খুব কাছেই এর অবস্থান। যানজট এড়াতে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্থান এসে সেখান থেকে রিকশা বা সিএনজি নিয়ে আহসান মঞ্জিল পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ।
বাংলার শিক্ষা, রাজনীতির রূপরেখা পরিবর্তন ও অধিকার আদায়ে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়া এই মহান নেতার মৃত্যু ইতিহাসের পাতায় আজও এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ভূ-রসায়ন (Geochemistry), ভূতত্ত্ব ও আধুনিক স্ফটিক বিজ্ঞান
- প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): International Gemological Institute (IGI), American Gem Society, এবং জার্নাল অব ক্রিস্টাল গ্রোথ।
পৃথিবীর উপরিভাগ ও অভ্যন্তরে পাথর বা শিলার সৃষ্টি এক জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর গভীরে থাকা গলিত ম্যাগমা বা লাভা, ভূত্বকের তীব্র চাপ-তাপ এবং বিভিন্ন খনিজের রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমেই প্রাকৃতিক পাথর ও বিভিন্ন রঙের রত্নপাথর (Gemstones) গঠিত হয়।
১. ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিলা ও পাথরের প্রধান সৃষ্টিপ্রক্রিয়া

ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিলা ও পাথরের প্রধান সৃষ্টিপ্রক্রিয়া প্রধানত তিনটি চক্রাকার ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ভূত্বক ও ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপ, চাপ, টেকটনিক প্লেটের গতিবিধি এবং কোটি কোটি বছরের রাসায়নিক ও ভৌত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হয়।
ভূতত্ত্বে শিলাকে তাদের উৎপত্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি শিলার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিচে শিলা চক্রের (Rock Cycle) এই তিনটি মূল সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আগ্নেয় শিলা (Igneous Rocks) এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া
পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা প্রচণ্ড উত্তপ্ত গলিত পদার্থ (ম্যাগমা বা লাভা) ঠান্ডা ও জমাট বেঁধে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি হয়। এটিই পৃথিবীর প্রাথমিক শিলা হিসেবে পরিচিত। এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া দুইভাবে ঘটে:
• অন্তঃস্থ আগ্নেয় শিলা (Intrusive/Plutonic Rocks): ভূগর্ভের ভেতরের গলিত ম্যাগমা যখন ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করে কিন্তু ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পেরে ভূত্বকের ভেতরেই আটকে যায়, তখন তা অত্যন্ত ধীরে ধীরে (কোটি কোটি বছর ধরে) ঠান্ডা হয়। ধীরে ঠান্ডা হওয়ার কারণে এর ভেতরের খনিজ আয়নগুলো সুবিন্যস্ত হয়ে বড় বড় ক্রিস্টাল ল্যাটিস (যেমন: গ্রানাইট, গ্যাব্রো) গঠনের পর্যাপ্ত সময় পায়।
• বহিঃস্থ আগ্নেয় শিলা (Extrusive/Volcanic Rocks): আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে গলিত লাভা যখন ভূপৃষ্ঠে চলে আসে, তখন তা বাতাসের সংস্পর্শে এসে খুব দ্রুত ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে যায়। দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার ফলে এর খনিজগুলো বড় ক্রিস্টাল গঠনের সময় পায় না, ফলে এগুলো সূক্ষ্ম দানাদার বা কাঁচের মতো মসৃণ হয় (যেমন: ব্যাসল্ট, অবসিডিয়ান)।
পাললিক শিলা (Sedimentary Rocks) এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া
আগে থেকে বিদ্যমান শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে এবং সেই পলি জমে জমে এই শিলা তৈরি হয়। এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া প্রধানত ৪টি ধাপে সম্পন্ন হয়:
1. ক্ষয়ীভবন ও পরিবহন (Weathering & Erosion): বৃষ্টি, বাতাস, নদী বা হিমবাহের প্রভাবে পাহাড় বা পাথরের উপরিভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালি, কাদা ও নুড়িতে পরিণত হয় এবং পানির স্রোতে পরিবাহিত হয়ে সমুদ্র, নদী বা হ্রদের তলদেশে জমা হয়।
2. পলি সঞ্চয়ন (Deposition): বছরের পর বছর ধরে এই পলিগুলো স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে।
3. সংনমন (Compaction): ওপরের স্তরের পলির প্রচণ্ড ভার ও ওজনের চাপে নিচের স্তরের পলির মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান ও পানি কমে যায় এবং কণাগুলো একে অপরের খুব কাছে চলে আসে।
4. সিমেন্টেশন (Cementation): পলির ফাঁকে থাকা ভূগর্ভস্থ জলীয় দ্রবণে দ্রবীভূত বিভিন্ন খনিজ লবণ (যেমন: ক্যালসিয়াম কার্বনেট \(CO_{3}^{2-}\), সিলিকা \(SiO_{2}\), আয়রন অক্সাইড) প্রাকৃতিক আঠা বা সিমেন্টের মতো কাজ করে বালিকণাগুলোকে শক্ত আনবিক বন্ধনে আটকে দেয়। এভাবেই বেলেপাথর (Sandstone) বা চুনামাটি জমে চুনাপাথর (Limestone) তৈরি হয়।
রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rocks) এর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া
পূর্বে সৃষ্ট আগ্নেয় বা পাললিক শিলা যখন ভূগর্ভের গভীরের প্রচণ্ড তাপ (Heat) এবং চাপের (Pressure) সংস্পর্শে আসে, তখন তরল না হয়েও সম্পূর্ণ কঠিন অবস্থায় এর গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে।
• প্রক্রিয়া: টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষ বা ভূগর্ভস্থ ম্যাগমার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে শিলাগুলো প্রায় ২০০° থেকে ৮০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বিশাল ভূখণ্ডগত চাপের মুখোমুখি হয়। এই চরম পরিবেশে শিলার ভেতরের মূল ক্রিস্টাল ল্যাটিস বা খনিজ বিন্যাসগুলো ভেঙে যায়। খনিজ আয়নগুলো স্থানান্তরিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন, আরও ঘন এবং শক্তিশালী স্ফটিক কাঠামো তৈরি করে।
• উদাহরণ: পাললিক শিলা 'চুনাপাথর' রূপান্তরিত হয়ে অত্যন্ত শক্ত ও মসৃণ মার্বেল পাথরে পরিণত হয়। আবার 'কাদা পাথর' (Shale) রূপান্তরিত হয়ে স্লেট পাথরে (Slate) রূপান্তরিত হয়।
শিলা চক্রের গতিশীলতা
এই তিনটি প্রক্রিয়া একটি অবিচ্ছিন্ন চক্রের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত। একটি আগ্নেয় শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পাললিক শিলায় পরিণত হতে পারে, আবার সেই পাললিক শিলা তাপে রূপান্তরিত শিলা হতে পারে। রূপান্তরিত শিলা আবার ভূগর্ভে গলে গিয়ে ম্যাগমায় পরিণত হয়ে নতুন আগ্নেয় শিলার জন্ম দিতে পারে।
২. ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম রত্নপাথর তৈরি (Synthetic Crystal Growth)
ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম রত্নপাথর তৈরি বা সিন্থেটিক ক্রিস্টাল গ্রোথ (Synthetic Crystal Growth) হলো একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ভূ-রসায়নিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে প্রকৃতির তৈরি করা চরম তাপমাত্রা, প্রচণ্ড চাপ এবং সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক পরিবেশকে ল্যাবরেটরির ভেতরে কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করেন।

ল্যাবে তৈরি এই রত্নপাথরগুলো (যেমন: রুবি, স্যাফায়ার, ডায়মন্ড, পান্না বা অ্যামেথিস্ট) কোনো নকল বা কাঁচের তৈরি পাথর নয়; বরং এগুলোর আণবিক গঠন, রাসায়নিক সংকেত, ভৌত ও আলোকীয় বৈশিষ্ট্য (Optical properties) প্রাকৃতিক পাথরের মতোই ১০০% নিখুঁত ও সমমানের হয়ে থাকে।
ল্যাবরেটরিতে বাণিজ্যিক ও বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে ক্রিস্টাল বড় করার প্রধান ৪টি বিশ্বস্ত পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
হাইড্রোথার্মাল সিন্থেসিস (Hydrothermal Synthesis)
এই পদ্ধতিটি হুবহু মাটির গভীরে টেকটনিক ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে প্রাকৃতিক রত্ন তৈরির প্রক্রিয়াকে অনুকরণ করে। পান্না (Emerald) এবং অ্যামেথিস্ট (Amethyst) তৈরিতে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
- রাসায়নিক পরিবেশ: একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, সিল করা এবং পুরু ইস্পাতের তৈরি বিশেষ পাত্র নেওয়া হয়, যাকে অটোক্লেভ (Autoclave) বলে। এর ভেতরে নির্দিষ্ট খনিজ উপাদান (যেমন অ্যামেথিস্টের জন্য সিলিকা ও আয়রন আয়ন) এবং ক্ষারীয় জলীয় দ্রবণ রাখা হয়।
- প্রক্রিয়া: অটোক্লেভের নিচের অংশে তাপমাত্রা প্রায় ৩০০° থেকে ৬০০° সেলসিয়াস এবং চাপ প্রায় ৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ psi পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পাত্রের ওপরের অংশটি সামান্য ঠান্ডা রাখা হয় এবং সেখানে একটি খাঁটি সীড ক্রিস্টাল (Seed Crystal) ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
- ক্রিস্টাল বৃদ্ধি: উচ্চ তাপে নিচের খনিজগুলো গলে দ্রবণে পরিণত হয় এবং পরিচলন স্রোতের (Convection current) কারণে ওপরের তুলনামূলক ঠান্ডা অংশে উঠে আসে। তাপমাত্রা কম থাকায় আয়নগুলো সম্পৃক্ত হয়ে সীড ক্রিস্টালের গায়ে নির্দিষ্ট জ্যামিতিক ক্রিস্টাল ল্যাটিস (Crystal lattice) গঠনে স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে। এই পদ্ধতিতে ১ মিলিমিটার ক্রিস্টাল বাড়তে কয়েক দিন সময় লাগে।
চোক্রালস্কি পদ্ধতি বা ক্রিস্টাল পুলিং (Czochralski / Crystal Pulling Process)
অতি উচ্চ মানের এবং নিখুঁত একক স্ফটিক (Single Crystal) তৈরির জন্য এই পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এর মাধ্যমে মূলত রুবি (Ruby), স্যাফায়ার (Sapphire) এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পের সেমিকন্ডাক্টর সিলিকন ওয়েফার তৈরি করা হয়।
- রাসায়নিক পরিবেশ: একটি রিফ্রেক্টরি পাত্রে (Crucible) রত্নপাথরের মূল উপাদানগুলোকে (যেমন রুবির জন্য অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড এবং ক্রোমিয়াম আয়ন) নেওয়া হয়।
- প্রক্রিয়া: পাত্রটিকে উপাদানগুলোর গলনাঙ্কের ওপরে (প্রায় ২,০৫০° সেলসিয়াস) উত্তপ্ত করে সম্পূর্ণ তরলে পরিণত করা হয়। এরপর একটি মেকানিক্যাল রডের মাথায় ছোট একটি সীড ক্রিস্টাল লাগিয়ে সেই গলিত তরলের উপরিভাগে আলতো করে ছোঁানো হয়।
- ক্রিস্টাল বৃদ্ধি: রডটিকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রতি মিনিটে নির্দিষ্ট গতিতে ঘোরানো হয় এবং খুব ধীরে ধীরে (ঘণ্টায় মাত্র কয়েক মিলিমিটার বেগে) ওপরের দিকে টানা (Pull) হতে থাকে। তরল থেকে ওপরে ওঠার সময় তাপমাত্রা সামান্য কমতেই গলিত খনিজটি সীড ক্রিস্টালের অক্ষ বরাবর জমাট বেঁধে একটি বড় নলাকার একক ক্রিস্টাল (যাকে বুল বা Boule বলা হয়) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ফ্লেম ফিউশন বা ভের্নুইল পদ্ধতি (Flame Fusion / Verneuil Process)
এটি কৃত্রিম রত্নপাথর তৈরির ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও সাশ্রয়ী পদ্ধতি। ফরাসি রসায়নবিদ অগাস্ট ভের্নুইল ১৯০২ সালে প্রথম এই পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে রুবি তৈরি করেন।
- প্রক্রিয়া: এই পদ্ধতিতে কোনো তরল দ্রবণ বা পাত্রের প্রয়োজন হয় না। রত্নপাথরের কাঁচামালকে প্রথমে অতি সূক্ষ্ম পাউডারে পরিণত করা হয়। এই পাউডারকে একটি ফার্নেসের ওপর থেকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে নিচে ফেলা হয়, যা একটি অক্সিজেন-হাইড্রোজেন টর্চের ২,০০০° সেলসিয়াসেরও বেশি উত্তপ্ত শিখার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে।
- ক্রিস্টাল বৃদ্ধি: আগুনের শিখার সংস্পর্শে আসার সাথে সাথেই পাউডারটি গলে ফোঁটা ফোঁটা তরলে পরিণত হয় এবং নিচে থাকা একটি সিরামিক পেডেস্টালের ওপর পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে জমাট বাঁধে। এভাবে বিন্দুর পর বিন্দু খনিজ জমে জমে একটি লম্বাটে আকৃতির ক্রিস্টাল তৈরি হয়।
উচ্চ চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রা পদ্ধতি (HPHT – High Pressure High Temperature)
মূলত ল্যাবরেটরিতে খাঁটি হীরা বা ডায়মন্ড (Lab-grown Diamond) তৈরির জন্য এই বিশেষ পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়। হীরা কার্বনের একটি রূপভেদ যা তৈরিতে চরম পরিবেশের প্রয়োজন।
- প্রক্রিয়া: ল্যাবের প্রকোষ্ঠে একটি কার্বন উৎসকে (যেমন গ্রাফাইট) খাঁটি ডায়মন্ড সীডের সাথে রাখা হয়। এরপর বিশাল অ্যানভিল বা হাইড্রোলিক প্রেসের সাহায্যে সেখানে প্রায় ১,৫০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৬০,০০০ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheres) প্রয়োগ করা হয়। এই চরম চাপে গ্রাফাইটের পরমাণুগুলো ভেঙে হীরার হেক্সাগোনাল ও টেট্রাহেড্রাল ল্যাটিস কাঠামো গঠন করে সীডের ওপর বৃদ্ধি পায়।
প্রাকৃতিক বনাম কৃত্রিম রত্নপাথরের পার্থক্য করার উপায়
যেহেতু ল্যাবে তৈরি ক্রিস্টালের রাসায়নিক উপাদান প্রাকৃতিকের মতোই হুবহু এক, তাই খালি চোখে বা সাধারণ মাইক্রোস্কোপে এদের পার্থক্য করা অসম্ভব। অভিজ্ঞ রত্নবিদরা (Gemologists) অত্যন্ত শক্তিশালী ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে এদের আলাদা করেন:
- অন্তর্ভুক্তি বা ইনক্লুশন (Inclusions): প্রাকৃতিক পাথরের ভেতরে প্রাকৃতিক গ্যাস, তরল বা অন্যান্য খনিজের ক্ষুদ্র কণা আটকে থাকে। অন্যদিকে, ল্যাবে তৈরি পাথরে অতি সূক্ষ্ম বাঁকানো বৃদ্ধির রেখা (Curved growth lines) বা হাইড্রোথার্মাল পদ্ধতির ক্ষেত্রে ধাতব উপাদানের মাইক্রোস্কোপিক অবশেষ দেখা যেতে পারে।
- ফ্লুরোসেন্স (Fluorescence): অতিবেগুনি রশ্মির (UV Light) নিচে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পাথর ভিন্ন ভিন্ন রঙের আভা ছড়ায়, যা থেকে এদের উৎস নিশ্চিত করা যায়।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
প্রকৃতির কোটি কোটি বছরের রাসায়নিক পরিবর্তন এবং ভূগর্ভস্থ চাপকে অনুকরণ করে আধুনিক বিজ্ঞান আজ ল্যাবরেটরিতে হুবহু একই আণবিক ও রাসায়নিক গঠনের কৃত্রিম রত্নপাথর তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। প্রাকৃতিক কিংবা ল্যাব-গ্রোন—উভয় ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট আয়ন ও ল্যাটিস বিন্যাসই পাথর বা ক্রিস্টালের মূল সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তি
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ক্রীড়ার ইতিহাস, ফিটনেস ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
- প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): NABBA World Bodybuilding Archives, Indian Bodybuilding Records, এবং Historic Sport Chronicles.
বাঙালির শৌর্য, বীরত্ব এবং শারীরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেই যাঁদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে বিশ্বশ্রী মনোহর আইচ এবং মনতোষ রায় অন্যতম। প্রতিকূলতাকে জয় করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজের ও ব্রিটিশ ভারতের পতাকা উড়িয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন যে দৃঢ় মনোবল থাকলে উচ্চতা বা ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কখনো সাফল্যের অন্তরায় হতে পারে না।
১. বিশ্বশ্রী মনোহর আইচের শরীরচর্চার রুটিন (Workout Routine)

মনোহর আইচ (১৭ মার্চ ১৯১২ – ৫ জুন ২০১৬), যিনি তার মাত্র ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং অবিশ্বাস্য পেশীবহুল শরীরের জন্য বিশ্বজুড়ে “পকেট হারকিউলিস” (Pocket Hercules) নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন, ১৯৫২ সালে ভারতের জন্য দ্বিতীয় মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) শিরোপা জয় করেন। ১০৪ বছর বছর বাঁচার পেছনে তার কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, স্টেরয়েড ও সাপ্লিমেন্টমুক্ত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক শরীরচর্চার রুটিন এবং সাধারণ জীবনযাত্রা আজীবন অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।
তার শরীরচর্চার রুটিন এবং দৈনন্দিন লাইফস্টাইলকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. প্রাথমিক জীবন ও জেলখানার কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম (ক্যালিস্থেনিক্স)
- ১২ বছর বয়সে শুরু: শৈশবে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মনোহর আইচের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। নিজের শক্তি ফিরে পেতে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি পুশ-আপ, স্কোয়াট, পুল-আপ, লেগ রেইজ এবং সিট-আপের মতো বডিওয়েট ব্যায়াম শুরু করেন। ওই বয়সেই তিনি প্রতি সেটে প্রায় ১০০টি করে রেপস (Reps) দিতে পারতেন。
- কারাগারে ১২ ঘণ্টার সাধনা: ১৯৪২ সালে রয়্যাল এয়ার ফোর্সে যোগ দেওয়ার পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাকে কারাগারে বন্দি করা হয়। কারাগারে কোনো জিমের সরঞ্জাম বা ওজন (Weights) ছিল না। সেখানে তিনি দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে কঠোর ফ্রি-হ্যান্ড এবং ক্যালিস্থেনিক্স ব্যায়াম করতেন, যা তার শরীরের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
২. পাওয়ার বডিবিল্ডিং ও জিমের রুটিন (যৌবন ও প্রতিযোগিতার সময়)
পরবর্তীতে যখন তিনি পুরোদমে ওয়েট ট্রেনিং শুরু করেন, তখন আধুনিক জটিল মেশিনের চেয়ে প্রাচীন ভারতীয় ব্যায়ামপদ্ধতি এবং ভারী ‘কম্পাউন্ড এক্সারসাইজ’-এর ওপর জোর দিতেন।
- সকালের ওয়ার্কআউট: তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে টানা ৯০ মিনিট শরীরচর্চা করতেন।
- প্রিয় ব্যায়ামসমূহ: তিনি পূর্ণাঙ্গ বডি ওয়ার্কআউটের অনুসারী ছিলেন। তার মূল রুটিনে থাকত ভারী স্কোয়াট (Squats), ডন-বৈঠক (Push-ups & Squats), বেঞ্চ প্রেস (Bench Press), ওভারহেড শোল্ডার প্রেস (Overhead Press), বারবেল রো (Barbell Rows), এবং বারবেল কার্ল (Barbell Curls)।
- পাওয়ার স্টান্টের প্রস্তুতি: দাঁত দিয়ে স্টিল বাঁকানো, তরবারির ডগায় পেট ঠেকিয়ে রাখা কিংবা বুক দিয়ে লোহার রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য সব স্টান্ট প্রদর্শনের জন্য তিনি ঘাড় ও কোর মাসল মজবুত করার বিশেষ ব্যায়াম করতেন।
৩. শেষ বয়সের রক্ষণাবেক্ষণ রুটিন (Maintenance Schedule)
- বয়স ৯০ পার হওয়ার পরও তিনি ব্যায়াম করা থামাননি। তবে শেষের দিকে হৃদযন্ত্রের মৃদু সমস্যার কারণে তিনি ভারী ওজন তোলা বন্ধ করে দেন।
- শেষ বয়সে তিনি কেবল শরীরের ফিটনেস ধরে রাখতে হালকা ওজনের ডাম্বেল এবং বেশি রেপসের ৬ থেকে ৭টি ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতেন। এমনকি ১০০ বছর পার করার পরও তিনি তার জিমের ছাত্রদের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যায়াম শেখাতেন।
ডায়েট ও লাইফস্টাইল: দীর্ঘায়ুর গোপন চাবিকাঠি
মনোহর আইচ কোনো আধুনিক প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট বা স্টেরয়েড ব্যবহার করেননি। তার সুস্থ ১০৪ বছর বাঁচার মূল রহস্য ছিল খাঁটি বাঙালি খাবার:
- খাদ্যাভ্যাস: সকালের নাস্তায় দুধ, চিঁড়ে এবং কফি। দুপুরে ও রাতে একদম সাধারণ ভাত, ডাল, নানা রকম তরকারি এবং টাটকা মাছের ঝোল। এছাড়া তার খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে দুধ, ফলমূল (আম, কাঁঠাল, ডাব) এবং শাকসবজি থাকত।
- নেশামুক্তি: তিনি জীবনে কখনো মদ্যপান বা ধূমপান করেননি।
- মানসিক প্রশান্তি: তিনি সবসময় বলতেন, “আমি কখনোই কোনো ধরনের মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাকে প্রশ্রয় দিই না। তরুণ বয়স থেকে উপার্জনের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমি সবসময় হাসিখুশি থেকেছি।”
২. এশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স: মনতোষ রায়
মনতোষ রায় (২১ অক্টোবর ১৯১৭ – ২৯ জুন ২০০৫) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি বডিবিল্ডার বা শরীরচর্চাবিদ, যিনিএশিয়ার প্রথম মিস্টার ইউনিভার্স (Mr. Universe) খেতাব অর্জনের গৌরব লাভ করেন। ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতায় তিনি “গ্রুপ ৩ অ্যামেচার” (শর্ট মেন ডিভিশন) বিভাগে এই বিশ্বসেরা শিরোপা জয় করেছিলেন।

তার জীবন ও কীর্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রারম্ভিক জীবন ও সাধনা
- জন্ম: ১৯১৭ সালের ২১শে অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী গজারিয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
- শৈশব ও সংগ্রাম: চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া মনতোষ রায় মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই শরীরচর্চা শুরু করেন।
- গুরু: তিনি বিখ্যাত বডিবিল্ডার এবং যোগগুরু বিষ্ণুচরণ ঘোষের (মহর্ষি পরমহংস যোগানন্দের ছোট ভাই) শিষ্য ছিলেন। গুরুর ছবি সামনে রেখে দ্রোণাচার্যের একলব্যের মতো নিষ্ঠা নিয়ে তিনি প্রথম দিকে ব্যায়াম সাধনা চালিয়ে যেতেন।
বডিবিল্ডিং ক্যারিয়ার ও সাফল্য
- ১৯৩৯ সালে প্রথম প্রতিযোগিতায় নেমে সফল না হলেও তিনি দমে যাননি, বরং অনুশীলনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন।
- ১৯৪২ সালে তিনি ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ১৯৪৭ সালে ‘অল ইন্ডিয়া বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ জয় করেন।
- মিস্টার ইউনিভার্স জয় (১৯৫১): লন্ডনের মঞ্চে তার সুগঠিত ও নান্দনিক শরীর দেখে দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষ করে তার ‘যীশু খ্রিস্ট’ পোজের (Jesus Christ posing routine) প্রদর্শনীটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতিযোগিতা শেষে তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত।
অবদান ও পরবর্তী জীবন
- মিস্টার ইউনিভার্স জেতার পর ভারতে ফিরে তিনি ‘ইন্ডিয়ান বডিবিল্ডিং ফেডারেশন’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এবং এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
- তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ল কলেজে আইন বিভাগে শরীরচর্চা ও যোগব্যায়ামের শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তিনি শরীরচর্চার ওপর বইও লিখেছেন।
- খালি হাতে স্টিলের রড বাঁকানোর মতো অবিশ্বাস্য শারীরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।
- তার মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র মলয় রায় (যিনি নিজে ৮ বারের মিস্টার ইন্ডিয়া এবং অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বডিবিল্ডার) পিতার প্রতিষ্ঠিত মাল্টিজিমটি পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য, মলয় রায়কে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রে কাশীর হোটেলের সেই ব্যায়ামবীরের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল।
২০০৫ সালের ২৯শে জুন কলকাতার একটি নার্সিং হোমে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮৮ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৩. বাংলার শক্তিচর্চার আরেক রত্ন: গোবর গোহ
গোবর গোহ (জন্মনাম: যতীন চরণ গুহ; ১৩ মার্চ ১৮৯২ – ২ জানুয়ারি ১৯৭২) ছিলেন বাংলার শক্তিচর্চা ও কুস্তির ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি। ১৯২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কুস্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলকে (Ad Santel) পরাজিত করে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে বিশ্ব পেশাদার কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ (World Light Heavyweight Championship) জয়ের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।

শরীরচর্চা ও কুস্তির ক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঐতিহ্য, অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা এবং অবদান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
পারিবারিক ঐতিহ্য ও হাতেখড়ি
- কুস্তিগীর পরিবার: গোবর গোহ জন্মসূত্রে কলকাতার এক বিখ্যাত কুস্তিগীর পরিবারে এসেছিলেন। তার ঠাকুরদাদা আম্বিকা চরণ গুহ (অম্বু বাবু) ছিলেন বাংলার কুস্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, যার আখড়ায় নামী-দামী সব কুস্তিগীর তৈরি হতেন।
- প্রশিক্ষণ: শৈশবেই নিজের কাকা এবং তৎকালীন ভারতের অন্যতম সেরা কুস্তিগীর ক্ষেত্রচরণ গুহের কাছ থেকে তিনি কুস্তির প্রাথমিক পাঠ নেন। পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত কুস্তিগীর রহমানী পালোয়ানের কাছেও তালিম নেন।
কুস্তি ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক সাফল্য
- ইউরোপ সফর (১৯১০-১৯১৩): মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইউরোপ সফরে যান। সেখানে ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়ার সেরা কুস্তিগীরদের পরাজিত করে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। ১৯১৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক প্রতিযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জর্জ হ্যাকেনস্মিডকে (George Hackenschmidt) কুস্তির চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন।
- বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা (১৯২১): ১৯২০ সালে তিনি পুনরায় ইউরোপ ও আমেরিকা সফরে যান। ১৯২১ সালের ৩০ আগস্ট সান ফ্রান্সিসকোতে তৎকালীন ওয়ার্ল্ড লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন অ্যাড স্যানটেলের মুখোমুখি হন গোবর গোহ। ১ ঘণ্টা ৩ মিনিট স্থায়ী এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর তিনি স্যানটেলকে পরাস্ত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের বেল্ট নিজের করে নেন।
- শারীরিক গঠন: ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতা এবং প্রায় ১২০ কেজি ওজনের গোবর গোহের সুগঠিত শরীর ও পেশীর সঞ্চালনা দেখে পশ্চিমা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
কুস্তির নিজস্ব শৈলী ও অবদান
- ‘গোহ স্টাইল’ উদ্ভাবন: তিনি ভারতীয় কুস্তির ঐতিহ্যবাহী কৌশলগুলোর সাথে পশ্চিমা ‘ক্যাচ-অ্যাস-ক্যাচ-ক্যান’ (Catch-as-catch-can) ও গ্রেকো-রোমান শৈলীর এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়ে কুস্তির একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানা তৈরি করেন, যা কুস্তি মহলে ‘গোহ স্টাইল’ নামে পরিচিত ছিল।
- আখড়া প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি: ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতার হেদুয়ার কাছে (গোয়াবাগান এলাকায়) নিজের পারিবারিক আখড়াটি নতুন রূপে প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ ‘গোবর গুহ’স জিমনেসিয়াম’ নামে পরিচিত। তার এই আখড়া থেকেই তৈরি হয়েছিলেন ভারতের বহু নামী কুস্তিগীর এবং পরবর্তীতে অলিম্পিয়ানরা।
কুস্তির পাশাপাশি তিনি ফুটবল এবং সংগীতের দারুণ অনুরাগী ছিলেন। বাংলার যুবসমাজকে শক্তিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পেছনে এই বীর কুস্তিগীরের অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি এই মহান ক্রীড়াবিদ কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সংক্ষেপিত পর্যালোচনা
মনোহর আইচ, মনতোষ রায় এবং গোবর গোহ—এই কিংবদন্তিরা প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক সুস্থতা, অদম্য ইচ্ছা এবং সঠিক শৃঙ্খলার কাছে প্রতিকূল পরিস্থিতিও হার মানে। তাঁদের বর্ণাঢ্য জীবন ও প্রাকৃতিক শরীরচর্চার পদ্ধতি বর্তমান প্রজন্মের ফিটনেস প্রেমীদের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।
নিউজ ডেস্ক
শেয়ার করুন
- প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (Senior Content & SEO Consultant)
- বিভাগ (Category): ইতিহাস, বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলন
- প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬
- তথ্যসূত্র (Sources): ১৯৬৫ সালের যুদ্ধভিত্তিক ঐতিহাসিক দলিল, খাজা শাহাবুদ্দীনের বেতার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ঘোষণা, এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিহাস।
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই এবং রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অবিচ্ছেদ্য প্রেরণার নাম। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) যখনই বাঙালির জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের “কালো মেঘ” ঘনিয়ে এসেছে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সেই লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানে। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে “ইসলাম-বিরোধী” বা “ভারতীয় সংস্কৃতি” হিসেবে তকমা দিয়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এই কৃত্রিম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসাহিত্য ও রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির জন্য আত্মপরিচয় রক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল।
২. রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বুদ্ধিজীবীদের লড়াই
১৯৬১ সালে বিশ্বকবির জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে পাকিস্তানি সরকার নানা বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি তাদের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে গণ্য করে।
- এর প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
- ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন ও রবীন্দ্রসংগীতের চর্চাকে আন্দোলনের রূপ দেয়।
- এই লড়াইটি কেবল গান গাওয়ার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ সংগ্রাম।
৩. রাজনৈতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রচেতনা
রাজনৈতিক শোষণের কালো মেঘ যখনই পূর্ব বাংলার আকাশকে গ্রাস করতে চেয়েছিল, তখনই রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির মুক্তিকামী চেতনাকে উজ্জীবিত করেছে।
- ছয় দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি জনসভায় রবীন্দ্রসংগীতের পরিবেশনা ছিল নিয়মিত ঘটনা।
- জাতীয় সংগীতের রূপরেখা: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা” গানটি গেয়ে বাঙালি তাদের স্বাধীন সত্তার জানান দেয়, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্থান পায়।
৪. অন্ধত্ব ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা
রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার ভাল দিক কি কি ?
রবীন্দ্রনাথের দর্শন ছিল মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করতে চেয়েছিল, তখন রবীন্দ্র রচনাবলী বাঙালিকে শিখিয়েছে কীভাবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে উদার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন করতে হয়।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার লড়াই ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন ও তার সৃষ্টির ইতিবাচক বা ভালো দিকগুলো ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাঙালির চেতনা গঠনে তার চিন্তাধারার প্রধান ভালো দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- অসাম্প্রদায়িক চেতনা: রবীন্দ্রনাথের পুরো দর্শনই ছিল মানুষের জয়গানে মুখর। তিনি ধর্ম, বর্ণ বা জাতির সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকেরা যখন ধর্মকে পুঁজি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, তখন তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সাহায্য করেছে।
- মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতা: তাঁর সাহিত্য ও কবিতা মানুষকে কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্ব এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে উদার হতে অনুপ্রাণিত করে। এটি সমাজের গোঁড়ামি দূর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
- ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অহংকার: রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকর্মের কারণেই বাঙালি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করার সাহস এবং শক্তি পেয়েছিল।
- প্রতিরোধের মানসিকতা: তাঁর গান ও কবিতা (যেমন: “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে” বা “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান”) যেকোনো অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং প্রতিবাদ করার সাহস জোগায়।
- প্রকৃতি ও স্বদেশের প্রতি নিখাদ প্রেম: তাঁর প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান মানুষের মনে দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগের মূল অনুপ্রেরণা ছিল।
রবীন্দ্রনাথের নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো
রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাহিত্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাঁর প্রভাবের কোনো বস্তুগত বা নৈতিক “খারাপ দিক” ছিল না। তবে, পাকিস্তান আমলের শাসকগোষ্ঠী ও কট্টরপন্থী মহল রবীন্দ্রচর্চাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল এবং রবীন্দ্রচেতনার অতি-ব্যবহার নিয়ে পরবর্তী সময়ে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সেই নেতিবাচক প্রচার ও সমালোচনার দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- পাকিস্তান সরকারের চোখে “ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য”: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এবং তৎকালীন কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্রনাথকে একজন “অমুসলিম এবং ভারতীয় কবি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, রবীন্দ্রচর্চার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা তাদের ইসলামী সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মেনে নিচ্ছে।
- বাঙালি সংস্কৃতির বুর্জোয়া বা উচ্চবিত্ত রূপায়ণ: সমাজতাত্ত্বিক ও বামপন্থী সমালোচকদের একাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন মূলত জোড়াসাঁকোর জমিদার পরিবারের জমিদারি আমেজ এবং উচ্চবিত্ত (বুর্জোয়া) শ্রেণির জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। ফলে পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রচর্চাকে যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান প্রতীক করা হয়, তখন তা সাধারণ খেটে খাওয়া গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির চেয়ে শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্তের সংস্কৃতিকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করেছিল।
- অন্যান্য দেশীয় উপাদান উপেক্ষিত হওয়ার বিতর্ক: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ে রবীন্দ্রনাথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাসন রাজা বা গ্রামীণ লোকগান) এবং কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী ও গণমুখী চেতনা সাময়িকভাবে কিছুটা কম গুরুত্ব পেয়েছিল।
সংক্ষেপে, রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না; বরং তাঁর সৃষ্টিকে তৎকালীন পাকিস্তানি রাজনীতি যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিল এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রচর্চাকে যেভাবে শ্রেণি-স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, সমালোচনাগুলো মূলত সেই চর্চাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
পাকিস্তান আমলে খাজা শাহাবুদ্দিনের রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধের যুক্তিগুলো
১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন জাতীয় পরিষদে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন । এই সিদ্ধান্তের পেছনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের কট্টরপন্থী তল্পিবাহকদের প্রধান যুক্তিগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ।
তাদের উত্থাপিত প্রধান যুক্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- “পাকিস্তানের আদর্শের” পরিপন্থী: খাজা শাহাবুদ্দিনের মূল আনুষ্ঠানিক যুক্তি ছিল যে, রবীন্দ্রনাথের গান ও সৃষ্টি “পাকিস্তানি আদর্শের” (Ideology of Pakistan) সাথে খাপ খায় না । তিনি দাবি করেছিলেন, রেডিও-টেলিভিশনে এমন কোনো কিছু প্রচার করা যাবে না যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে।
- রবীন্দ্রনাথ আমাদের সংস্কৃতির অংশ নন: জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাজা শাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির কেউ নন” । তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ একজন অমুসলিম এবং তাঁর জীবন ও কর্মের মূল ভিত্তি ছিল অবিভক্ত ভারত (বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি-ঘেঁষা), তাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে তাকে গণ্য করা যায় না ।
- “মুসলিম তমদ্দুন” বা ইসলামী সংস্কৃতির অবমাননা: সরকারের পক্ষ থেকে এবং তাদের সমর্থক কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, রবীন্দ্রসংগীতের ভাষা, সুর ও ধারণা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম ঐতিহ্য বা “মুসলিম তমদ্দুনকে” অবজ্ঞা করে । তাদের মতে, রবীন্দ্রচর্চা বজায় রাখার অর্থ হলো পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
- ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক প্রচার: ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রবীন্দ্র-বিরোধী মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে । পাকিস্তানি শাসকদের যুক্তি ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয়তা আসলে ভারতের মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যেরই অংশ। তারা দাবি করেছিল, রবীন্দ্রচর্চাকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে
বাঙালির প্রতিক্রিয়া:
খাজা শাহাবুদ্দিনের এই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলোকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেন । তৎকালীন পূর্ব বাংলার শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন এবং ছায়ানটের মতো সংগঠনগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রসংগীতকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে তোলেন
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: পালসবাংলাদেশ ওয়েবসাইটে।



